মূল: আল্লামা সৈয়দ মুরতযা আসকারী
অনুবাদ নূর হোসেন মজিদী
বিগত এক হাজার বছর যাবৎ ঐতিহাসিকগণ “আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা” ও তার অনুসারী “সাবায়ীদের” সম্পর্কে বিস্ময়কর কাহিনি বর্ণনা করে আসছেন। প্রশ্ন হচ্ছে-
ক) আব্দুল্লাহ কে ছিল এবং তারা অনুসারী সাবায়ীরা কারা ছিল?
খ) আব্দুল্লাহ কী বলেছিল এবং সে কী করেছিল?
ঐতিহাসিকদের লেখা কাহিনির সারসংক্ষেপ
তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমানের শাসনামলে সানু’আ (ইয়ামান)-এর জনৈক ইয়াহুদি ইসলাম গ্রহণের ভান করে এবং ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। সে দেশ ভ্রমণে বের হয় এবং কুফা, বসরা, দামেক্ ও কায়রোর ন্যায় তৎকালীন বড় বড় শহরে গমন করে। সে এসব জায়গায় প্রচার করে যে, কিয়ামতের পূর্বে হযরত ঈসা (আ.)-এর পৃথিবীর বুকে প্রত্যাবর্তনের ন্যায় রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.) পুনরুজ্জীবিত হবেন। সে আরো প্রচার করে যে, অন্যান্য নবী-রাসূলের (আ.) যেমন ওয়াসি বা উত্তরাধিকার ছিলেন ঠিক সেভাবেই হযরত আলী হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওয়াসি বা উত্তরাধিকারী এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যেমন খাতামুল আম্বিয়া (শেষ নবী) তেমনি হযরত আলী হচ্ছেন খাতামুল আওছিয়া (শেষ অছি)। কিন্তু হযরত ওসমান তাঁর অধিকার আত্মসাৎ করেছেন এবং তাঁর প্রতি অন্যায় করেছেন। অতএব, হযরত ওসমানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করা এবং যার অধিকার তাঁকে ফিরিয়ে দেয়া অপরিহার্য।
ঐতিহাসিকগণ এ কাহিনির নায়কের নাম আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার লকব বা ডাকনাম ইবনে আমাতুস্ সাওদা’ (কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসীর পুত্র) বলে উল্লেখ করেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা তৎকালীন ইসলামি খেলাফতের আওতাধীন মুসলিম অধ্যুষিত শহরগুলোতে নিজের পক্ষ থেকে মুবাল্লিগ (প্রচারক) পাঠায় এবং তাদেরকে এ মর্মে নির্দেশ দেয় যে, তারা যেন ‘আম্ বিল্ মা’রূফ্ ওয়া নাহী ‘আনিল্ মুন্কার (ভালো কাজের আদেশ দান ও মন্দ কাজ প্রতিরোধ)-এর নামে সমকালীন প্রশাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ও তাদেরকে হত্যা করে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মুসলমান তার ভক্ত হয়ে যায় এবং তার কর্মসূচি কার্যকর করণের লক্ষ্যে অংশগ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত আবু যার, ‘আম্মার বিন্ ইয়াসার, আবদুর রহমান বিন্ ‘আদীস্ প্রমুখ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় আসহাবে রাসূল (সা.) এবং মালেক আস্তারের ন্যায় কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেককার তাবে’ঈ’ (যে ঈমানদার ব্যক্তি কোনো না কোনো সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছেন। অনুবাদক) তার দলে শামিল হয়ে যান।
বলা হয়েছে, সাবায়ীরা যেখানেই ছিল সেখানেই তাদের নেতার পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্যে স্থানীয় প্রশাসকদের বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলে ও বিদ্রোহ সৃষ্টি করে। তারা সমকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে প্রচারপত্র লিখত এবং তা অন্যত্র পাঠাত। তাদের এ প্রচারের ফল হলো এই যে, এ উস্কানিতে ক্ষিপ্ত হয়ে একদল মুসলমান মদিনায় রওয়ানা হয়ে যায়। তারা খলিফা হযরত ওসমানকে তাঁর গৃহে অবরুদ্ধ করে এবং শেষ পর্যন্ত ঘটনা তাঁর হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়ায়। এ সমস্ত কাজই সাবায়ীদের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে সংঘটিত হয়।
আরো বলা হয়েছে, মুসলমানরা খলিফা হিসেবে হযরত আলীর অনুকূলে বাই’আত (আনুগত্য শপথ) করার পর ত্বাল্হা ও যুবাইর ওসমানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণ ও জঙ্গে জামালে (উটের যুদ্ধে) অংশগ্রহণের জন্যে বসরায় চলে যান। সেখানে বছরার বাইরে জঙ্গে জামালের সেনাপতি
হিসেবে এক পক্ষে তাঁদের দু’জনের ও অপরপক্ষে খলিফা হিসেবে হযরত আলীর মধ্যে সমঝোতা ও সন্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন সাবায়ীরা দেখল যে, এ ধরনের সমঝোতা অনুষ্ঠিত হলে সাবায়ীরাই যে ওসমান হত্যার আসল নায়ক এ তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে। ফলে তারা বিপদে পড়ে যাবে। তাই তারা রাতের বেলা সিদ্ধান্ত নিল যে, যেকোনো পন্থায় ও যেকোনো কৌশলেই হোক তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করবে। সিদ্ধান্ত হয় যে, গোপনে তাদের একটি দল হযরত আলীর বাহিনীতে এবং অপর একদল ত্বাল্হা ও যুবাইরের বাহিনীতে যোগদান করবে ও উভয় বাহিনীকেই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার জন্যে এমনভাবে উস্কানি দেবে যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে, এর পিছনে সাবায়ীদের ষড়যন্ত্র কাজ করেছে।
তারা অত্যন্ত ভালোভাবেই এ ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত করে। ত্বাল্হা ও যুবাইরের বাহিনীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সাবায়ীরা রাতের অন্ধকারে হযরত আলীর বাহিনীর দিকে এবং হযরত আলীর বাহিনীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সাবায়ীরা ত্বাল্হা ও যুবাইরের বাহিনীর প্রতি তির বর্ষণ করে। ফলে উভয় বাহিনীর মধ্যেই পরস্পরের প্রতি ভয় ও সন্দেহ সৃষ্টি হয় এবং এর পরিণামে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
বলা হয়েছে, জঙ্গে জামাল এভাবেই সংঘটিত হয়। নইলে দুই পক্ষের সেনাপতিদের কেউই যুদ্ধ করতে চাননি এবং তাঁরা জানতেন না এ যুদ্ধের জন্যে প্রকৃত দায়ী কে।
এ ঘটনার মূল বর্ণনাকারী সাইফ বিন্ ওমর সাবায়ীদের গল্পকে এখানেই শেষ করেছে। এর পর তাদের কী হলো সে সম্পর্কে আর কোনো কথা বলেনি।
মোটামুটি এই হলো সাবায়ীদের কাহিনি। এ বর্ণনার যথার্থতা সম্বন্ধে বিস্তারিত বিশ্লেষণের আগে আমরা দেখব যে, এতে কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সাবায়ী বলে উল্লেখ করা হয়েছে; এরপর তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরব। এ পর্যায়ের ব্যক্তিগণ হলেন-
ক) আবু যার
খ) ‘আম্মার বিন্ ইয়াসির
গ) মুহাম্মাদ বিন্ আবি হুযাইফাহ্
ঘ) আবদুর রহমান বিন্ ‘আদীস্
ঙ) মুহাম্মাদ বিন্ আবু বাক্
চ) ছা’ছা’আহ্ বিন্ ছুহান্
ছ) মালেক আন্তার্।
১) আবু যার
তাঁর মূল নাম জুন্দু বিন্ জুনাদাহ্, ডাকনাম আবু যার গিফারী। তিনি হচ্ছেন ইসলাম গ্রহণকারী চতুর্থ ব্যক্তি। এমনকি ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তিনি একজন তাওহীদবাদী ছিলেন। তিনি পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদুল হারামে তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ্য ঘোষণা করেন। এ কারণে কুরাইশরা তাঁর ওপরে নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়, কিন্তু তিনি বেঁচে যান এবং রাসূলে আকরাম (সা.)-এর নির্দেশে স্বীয় গোত্রের নিকট ফিরে যান। বদর ও উহুদ যুদ্ধের পর তিনি মদিনায় চলে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ইন্তেকালের সময় পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর আবু যারকে শামে’ (তৎকালীন শাম বা বৃহত্তর সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান সিরিয়া, জর্দান, ফিলিস্তিন ও লেবানন) (দামেক) পাঠানো হয়। সেখানে তিনি শামের প্রাদেশিক আমীর মু’আবিয়ার সাথে খাপখাওয়াতে পারেননি। এ কারণে মু’আবিয়া তৃতীয় খলিফা ওসমানের নিকট তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তখন খলিফা ওসমান তাঁকে মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী রাবাযাহ্ নামক স্থানে নির্বাসনে পাঠান। আবু যার হিজরি ৩২ সালে সেখানেই ইন্তেকাল করেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কর্তৃক আবু যারের প্রশংসা সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- “নীল আকাশ এমন কারো ওপরে ছায়া বিস্তার করেনি এবং ধরণী এমন কারো ভার বহন করেনি যে আবু যারের চেয়ে অধিকতর সত্যবাদী।” (ত্বাবাকাতে ইবনে সা’দ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৬১-১৭১; মুসনাদে আহমাদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৬৩, ১৭৫, ২৬৩, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৪৭, ১৫৫, ১৫৯, ১৬৫, ১৬৬, ১৭২, ১৭৪, ৩৫১, ৩৫৬; ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪৪২; সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সহীহ তিরমিযী, কিতাবুল মানাক্বিব; সুনানে ইবনে মাজাহ, ভূমিকা, ১১তম বাবু; মুসনাদে ত্বাইয়ালিসী, হাদিস নং ৪৫৮, তাবারী ও ইবনে আছীর (তাবুক যুদ্ধ প্রসঙ্গ); আল-ইছাবাতু ফী তামিযিছ ছাহাবাহ ও উদ্দুল্ খাবাহ (আবু যার-এর পরিচয়))
২) ‘আম্মার বিন্ ইয়াসির
তাঁর ডাকনাম আবু ইয়াকুযান্। তিনি ছিলেন বনু ছা’লাবা লোক এবং তিনি বনু মাখযূমের সাথে বন্ধুত্ব চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল ইয়াসির্ ও মাতার নাম ছিল সুমাইয়াহ্। তিনি ও তাঁর পিতামাতা ছিলেন সর্বপ্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। ক্রমের বিবেচনায় তিনি ছিলেন প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণকারী সপ্তম ব্যক্তি। তাঁর পিতা ও মাতা ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁরা তিন জনই কুরাইশদের আক্রোশের শিকার হন এবং তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়।
‘আম্মারের প্রশংসায় রাসূলে আকরাম (সা.) থেকে বহু সহীহ্ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি হাদিস হচ্ছে এই যে, রাসূলে আকরাম (সা.) এরশাদ করেছেন- “অবশ্যই আম্মারের সত্তা ঈমানে পরিপূর্ণ।”
তিনি জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফ্ফিনের সময় হযরত আলীর পাশে থেকে যুদ্ধ করেন। তিনি হিজরি ৩৭ সালের ৯ই সফর ৯৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, ১৭তম বার; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান; সুনানে ইবনে মাজাহ্, ভূমিকা, ১১তম বাব; সুনানে তিরমিযী, ভূমিকা, ৩৩তম বাবু; মুসনাদে ত্বাইয়ালিসী, হাদিস নং ১১৭, ৬০৩, ৬৪৩, ৬৪৯, ১১৫৬, ১৫৯৮, ২১৬৮, ২২০২; আল-ইস্তি’আব্, ‘আইন্ হরফ, ২য় খণ্ড/ ৪৬৯; উদ্দুল খাবাহ্ ৪র্থ খণ্ড/ ৪৩; আল-ইছাবাহ্, ২য় খণ্ড/৫০৫; মাস্’উদীর মুরুজুয যাহাব, ২য় খণ্ড, ২১ ও ২২; ত্বাবারী ও ইবনে আছীর (হিজরি ৩৬-৩৭ সালের ঘটনাবলি); বালায়ূরীর আছাবুল ইশরাফ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৪৮-৮৮; ত্বাবাকাতে ইবনে সা’দ, তৃতীয় খণ্ড, ক্বাফ: ১, ১৬৬-১৮৯; মুসনাদে আহমাদ, ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ খণ্ড (মূলে ২৬টি হাদিসের উল্লেখ আছে; সংক্ষেপণের স্বার্থে উল্লেখ করা হলো না)
৩) মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফাহ্
তাঁর ডাকনাম আবুল কাসেম। তিনি উৎবাহ্ বিন্ রাবি’আহ্ আল-আশামী (ডাকনাম আবু হুযাইফাহ্)-এর সন্তান। তাঁর মায়ের নাম সাহলাহ বিনতে সুহাইল্ বিন্ ‘আম্ ‘আমেরিয়্যাহ্। তিনি রাসূলে আকরাম (সা.)-এর যুগে হাবাশায় জন্যগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবু হুযাইফাহ্ ইয়ামামাহ্র যুদ্ধে শহাদাতবরণ করলে হযরত ওসমান তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন ও লালন-পালন করেন।
মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফাহ্ বড় হবার পর হযরত ওসমান খলিফা হলে তিনি খলিফার অনুমতি নিয়ে মিসরে গমন করেন। কিন্তু তাঁর মিসরে পৌঁছার পর তিনি জনগণকে হযরত ওসমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্যে আহ্বান জানান এবং এ ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে অগ্রবর্তী ছিলেন। হিজরি ৩৫ সালে মিসরের প্রাদেশিক প্রশাসক আব্দুল্লাহ আবি সারাহ্ যখন মদিনায় যান এবং ‘উকুবাহ্ বিন্ ‘আমেরকে স্বীয় সহকারী নিয়োগ করে রেখে যান তখন মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফাহ্ মিসরের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক ‘উকুবাহ্ বিন্ ‘আমেরের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করেন ও তাঁকে মিসর থেকে বের করে দেন। মিসরের জনগণ মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফার অনুকূলে আনুগত্য শপথ গ্রহণ করে এবং তাঁর নেতৃত্বে আব্দুল্লাহ আবি সারাহকে মিসরে প্রবেশে বাধা দেয়। মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফাহ্ এরপর আবদুর রহমান বিন্ ‘আদীস্কে ছয় শ’ যোদ্ধাসহ হযরত ওসমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে মদিনায় পাঠান।
হযরত আলী খলিফা হবার পর মুহাম্মাদ বিন্ আবি হুযাইফাহকে মিসরের প্রশাসক পদে বহাল রাখেন। এরপর মু’আবিয়া সিফফ্ফিনের পথে মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফার দিকে অগ্রসর হলে তিনি মিসর থেকে বেরিয়ে এসে মু’আবিয়াকে বাধা দেন এবং তাঁর ফুস্তাতে প্রবেশ প্রতিহত করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উভয়ের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয় এবং সন্ধির শর্ত অনুযায়ী নিরাপত্তার আশ্বাসে মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফাহ্ ও আবদুর রহমান বিন্ ‘আদীস্ অপর ২৯ জন সঙ্গীসাথিসহ মিসর ত্যাগ করেন। কিন্তু মিসরের বাইরে এলে মু’আবিয়া কৌশলে তাঁদেরকে বন্দি করেন ও দামেকে নিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। কিছুদিন পর মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফাহ্ মু’আবিয়ার গোলাম রুদাইন কর্তৃক নিহত হন।
মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফাহ্ ছিলেন রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সাহচর্যপ্রাপ্ত সাহাবিদের অন্যতম।(ত্বাবারী ও ইবনে আছীর, হিজরি ৩০ থেকে ৩৬ সাল পর্যন্তকার ঘটনাবলির বর্ণনা; আল-ইসাবাহ্, মীম্ হরফ, ক্বাফ: ১, ৩য় খণ্ড/ ৫৪; উদুল্ খাবাহ্, ৪র্থ খণ্ড/ ৩১৫; আল-ইস্তি’আব্, ৩য় খণ্ড/৩২১-৩২২)
৪) আবদুর রহমান বিন্ ‘আদীস্ বালাভী
তিনি ছিলেন হুদাইবিয়ায় বৃক্ষতলে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর হাতে আনুগত্য শপথ গ্রহণকারীদের (আহলে বাই’আতে শাজারাহ) অন্যতম। তিনি মিসর বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানে নিজ হাতে জমিন আবাদ করে তার মালিক হন। খলিফা ওসমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি মিসর থেকে মদিনায় আগত যোদ্ধাদের সেনাপতিত্ব করেন। মু’আবিয়া মুহাম্মাদ বিন আবি হুযাইফার সাথে সন্ধি করার পর কৌশলের আশ্রয় নিয়ে মুহাম্মাদ বিন্ আবি হুযাইফাহ্, আবদুর রহমান বিন্ ‘আদীস্ ও তাঁদের অপর ২৯ জন সঙ্গী-সাথিকে বন্দি করেন। মু’আবিয়া আবদুর রহমান বিন্ ‘আদীকে ফিলিস্তিনে কারাগারে রাখেন। হিজরি ৩৬ সালে তিনি মু’আবিয়ার কারাগার থেকে পলায়ন করতে সক্ষম হন, কিন্তু অচিরেই পুনরায় তাঁকে বন্দি করা হয়। এরপর তাঁকে বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয়। (তাবারী ও ইবনে আছীর, হিজরি ৩০ থেকে ৩৬ সাল পর্যন্তকার ঘটনাবলির বর্ণনা; আল-ইছাবাহ্, ৪র্থ খণ্ড/১৭১, ‘আইন হরফ, ক্বাফ: ১; আল-ইস্তি’ আবু, ‘আইন হরফ)
৫) মুহাম্মাদ বিন আবু বাক্র
তিনি প্রথম খলিফা হযরত আবুবকরের পুত্র। তাঁর মায়ের নাম আসস্মা’ বিনতে ‘আমীস্ খাছমিয়্যাহ্। আস্থা’ প্রথমে জা’ফার ইবনে আবি তালিবের স্ত্রী ছিলেন; জা’ফারের শাহাদাতের পর তিনি আবুবকরকে বিবাহ করেন। বিদায় হজের সময় মক্কার পথিমধ্যে মুহাম্মাদ বিন আবুবকর জন্মগ্রহণ করেন। আবুবকরের ইন্তেকালের পর মুহাম্মাদ বিন আবুবকর হযরত আলীর কাছে ও তাঁর স্নেহ-মমতায় লালিত-পালিত হন। জঙ্গে জামালের সময় তিনি হযরত আলীর পাশে থেকে যুদ্ধ করেন এবং তাঁর পদাতিক বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি সিফফিনের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন এবং যুদ্ধের পরে হযরত আলী তাঁকে প্রশাসক নিয়োগ করে মিসরে পাঠান। তিনি হিজরি ৩৭ সালের ১৫ রামাযান মিসরে প্রবেশ করেন। এমতাবস্থায় মু’আবিয়া মিসর জয়ের জন্য ‘আম্ ইবনুল ‘আছের সেনাপতিত্বে সেনাবাহিনী পাঠান। হিজরি ৩৮ সালে যুদ্ধ হয় এবং তিনি ‘আমর ইবনুল ‘আসের নিকট পরাজিত ও বন্দি হন। ‘আম্মু ইবনুল ‘আসের নির্দেশে মুহাম্মাদ বিন আবুবকরকে বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয় এবং তাঁর লাশকে গাধার চামড়ার মধ্যে পুরে পুড়িয়ে ফেলা হয়।(তাবারী ও ইবনে আছীর, হিজরি ৩৭ থেকে ৩৮ সাল পর্যন্তকার ঘটনাবলির বর্ণনা; আল-ইসাবাহ্, ৩য় খণ্ড/ ৪৫১, মীম হরফের বর্ণনা, ক্বাফ: ২; আল-ইসৃতি’আব্, ৩য় খণ্ড/ ৩২৮ ও ৩২৯)
৬) ছা‘ছা‘আহ্ বিন্ ছুহান্ ‘আব্দী
তিনি রাসূলে আকরাম (সা.)-এর যুগে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বাচন বিশেষজ্ঞ ও বাগ্মী। তিনি জঙ্গে সিফফীনে হযরত আলীর পক্ষে যুদ্ধ করেন। মু’আবিয়া কুফাহ্ দখল করার পর তাঁকে বাহরাইনে নির্বাসিত করেন। তিনি সেখানেই ইন্তেকাল করেন। (আল-ইসাবাহ্, ৩য় খণ্ড/১৯২, দ্বাদু হরফ; আল-ইসৃস্তি’আর, ২য় খণ্ড/১৮৯)
৭) মালেক আন্তার্ আন্-নাখা‘ঈ
তিনি রাসূলে আকরাম (সা.)-কে দেখেছেন। তবে তিনি তাবেঈ হিসেবে এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তাবে’ঈগণের অন্যতম হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকেন। মালেক আন্তার্ ছিলেন তাঁর গোত্রের প্রধান। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তাঁর চোখ জখম হয়, এ কারণে তাঁকে আন্তার্ বলা হতো। তিনি জঙ্গে জামালে ও সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলীর পক্ষে যুদ্ধ করেন এবং খুবই বীরত্ব প্রদর্শন করেন। হিজরি ৩৮ সালে হযরত আলী তাঁকে মিসরের প্রশাসক নিয়োগ করেন। তখন তিনি মিসর অভিমুখে রওয়ানা হন। কিন্তু তিনি লোহিত সাগরের নিকট পৌঁছার পর, মু’আবিয়া স্বীয় গুপ্তচরদের কাছে বিষ মিশ্রিত মধু পাঠিয়ে তা মালিক আন্তাকে খাওয়াতে সক্ষম হলে তিনি ইন্তেকাল করেন। (আল-ইসৃতি’আব্, ৩য় খণ্ড/ ৩২৭; আল-ইসাবাহ, ৩য় খণ্ড/ ৪৫৯, মীম্ হরফ; তাবারী, হিজরি ৩৬ থেকে ৩৮ সাল পর্যন্তকার ঘটনাবলির বিবরণ)
এই হলো উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের পরিচিতি। কিন্তু আফসোস! কীভাবে অনেক ঐতিহাসিক এই ব্যক্তিদেরকে তাঁদের নিকট অপরিচিত একজন ইয়াহুদির অনুসারী হবার অপবাদ দিতে পারলেন!
আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নাম দিয়ে রচিত কল্পকাহিনির সাথে পরিচিত হলাম। এবার আমরা এ কাহিনির উৎস অনুসন্ধান করব এবং দেখব এ কল্পকাহিনি কার রচিত এবং এর বর্ণনাকারী (রাবী) কারা? ….. চলবে


