লেখকঃ আবু বকর সিদ্দিক
ছিয়াম বা রোজা কতক্ষন পর্যন্ত পূর্ণ করতে হবে ? সূর্যাস্ত পর্যন্ত ? নাকি রাত পর্যন্ত ? অর্থাৎ ইফতারের সময় কখন থেকে শুরু হয়ল? সন্ধায় ? না কি রাতের আগমন ঘটলে? তাহলে রাত কখন থেকে শুরু হয়? রাত কখন শেষ হয়? রাত কাকে বলে? রোজা কি ভাঙতে হয়? নাকি রোজা পূর্ণ করতে হয়? আল্লাহ কি রোজা ভাঙতে বলেছেন নাকি রোজা পূর্ণ করতে বলেছেন? এই বিষয়গুলো সম্পর্কে কুরআন কি বলে?
যুগ যুগ ধরে মানুষ সূর্য ডোবার সাথে সাথে ইফতার করলেও বা রোজা ভাঙলেও বর্তমান সময় ইফতার বা রোজা ভাঙ্গা নিয়েও ফেসবুকসহ নানান মানুষের মুখে নানানরকম কথা শোনা যায়। কেউ বলে সূর্যাস্তের সাথে সাথে রোজা ভাঙতে হবে। কেউ বলে রাত না হওয়া পর্যন্ত ছিয়াম পূর্ণ করতে হবে। কেউ বলে সূর্যাস্তের ১০/ ১৫ মিনিট পরেই রাত শুরু হয়ে যায়। আবার অধিকাংশ মানুষ বলে যে, সূর্য ডোবার সাথে সাথেই রাত আরম্ভ হয়ে যায়। তাই আমারও প্রশ্ন জাগে যে, কতক্ষন পর্যন্ত ছিয়াম পূর্ণ করতে হবে? সূর্যাস্ত পর্যন্ত? সন্ধা পর্যন্ত? নাকি রাত না হওয়া পর্যন্ত? এ বিষয়ে আল্লাহ ক্বুরআনে কি বলেছেন? এই বিষয়টি বোঝার জন্য আমি আল ক্বুরআনের অনেকগুলো অনুবাদ পড়েছি। ত্রিশ পারা ক্বুরআনের মধ্যে মাত্র একটি আয়াতেই আল্লাহ ছিয়াম পূর্ণ করতে বলেছেন। আর তা হলো-
وَ كُلُوۡا وَ اشۡرَبُوۡا حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَكُمُ الۡخَیۡطُ الۡاَبۡیَضُ مِنَ الۡخَیۡطِ الۡاَسۡوَدِ مِنَ الۡفَجۡرِ۪ ثُمَّ اَتِمُّوا الصِّیَامَ اِلَی الَّیۡلِ ۚ
অর্থঃ- আর পানাহার করো যতক্ষণ না রাতের কালো রেখা থেকে (ফজরের) ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর ছিয়াম পূর্ণ করো নিশাগম পর্যন্ত/ রাত পর্যন্ত/ রাত না হওয়া পর্যন্ত/রাতের আগমন পর্যন্ত। ছূরা বাক্বারা আয়াত নং ১৮৭।
.আলোচনাঃ “নিশাগম পর্যন্ত” অর্থাৎ রাতের আগমন পর্যন্ত। “নিশি” অর্থ রাত। ছিয়াম পূর্ণ করার ব্যাপারে আল ক্বুরআনে “লাইল” অর্থাৎ “রাত” শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। ক্বুরআনের প্রতিটি অনুবাদেও “রাত” শব্দ লেখা হয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহ সরাসরি “ইলাল লাইল” বাক্য উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ রাত পর্যন্ত, “লাইল” অর্থ রাত। এই আয়াতের ভিত্তিতে ছিয়াম বা রোজা পূর্ণ করতে হবে রাত না হওয়া পর্যন্ত। এ কথাগুলো আমি বলিনি, এ কথাগুলো সরাসরি আল্লাহ নিজেই আল ক্বুরআনে বলে দিয়েছেন। আল্লাহ সরাসরি “লাইল” তথা রাতের কথাই বলেছেন। তাহলে এখন জানার বিষয় হলো রাত কখন থেকে শুরু হয় এবং রাত কখন শেষ হয়? তাহলে আল্লাহর কথা অনুযায়ী এ দুটি বিষয় আল ক্বুরআন থেকে বোঝতে পারলে এর একটা সমাধান পাওয়া যাবে ইনশা-আল্লাহ।
আমরা জানি যে, সাধারণতঃ চারটি দিক রয়েছে, যথা পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিন। এখানেই শেষ নয়, এই চারটি দিকের চারটি কর্ণারে আরও চারটি দিক রয়েছে, যথা ঈশাণ, বায়ু, অগ্নি, নৈঋত, এখানেও শেষ নয় আরও দুটি দিক রয়েছে যথা উর্ধ্ব, অধঃ। তদ্রুপ রাত এবং দিনই শেষ নয়। রাত এবং দিনের মধ্যবর্তি স্থানে আলো-আঁধারের সংমিশ্রণে আরও দুটি সময় রয়েছে যথা (১) ফজর (২) সাফাক্ব। অর্থাৎ ভোর বা প্রভাত এবং অস্তরাগ বা সন্ধ্যা। ফজরের আজান থেকেই রাত শেষ হয়ে যায় এবং সেই সময় তারকাগুলোও অস্ত যায়। ফজরের আজান থেকে রাত শেষ হয়ে সূর্যদয়ের আগ পর্যন্ত আলো-আঁধারের সংমিশ্রণের সময়কে বলা হয় ভোর/ প্রভাত/ ফজর/ ছুবহে (ছাদেক)। তদ্রুপ সূর্যাস্ত থেকে পুরোপুরি অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত আলো-আঁধারের সংমিশ্রণের সময়কে বলা হয় গোধূলি/ সন্ধ্যা/ অস্তরাগ/ সাফাক্ব। বিজ্ঞানের ভাষায় এ দুটি সময়কে বলা হয় “twilight” (টুইলাইট)। বিজ্ঞানের মতে এ দুটি সময়ের পরিমাণ ৭২ মিনিট। তবে অনেকের মতে এ সময়ের পরিমাণ ৩০ বা ৪০ মিনিট। আরও গবেষণা করলে এ সময় দুটির সঠিক পরিমাণ বলা যাবে। তবে এদুটি সময় দিনেরই অংশ। যেহেতু আল ক্বুরআনে অন্ধকারকে রাত বলা হয়েছে, যার প্রমাণ একটু পরেই পাওয়া যাবে।
অধিকাংশ মানুষ ধরে নেয় যে, সূর্য ডোবার সাথে সাথেই দিন শেষ হয়ে রাত শুরু হয়ে যায়, এবং আরবি সাল বা হিজরী সাল গণনায় সূর্যাস্ত থেকেই তার পরের দিন ধরা হয়, যার কারণে মানুষ সূর্য ডোবার সাথে সাথেই রোজা ভাঙ্গা শুরু করে, অথচ তখনও দিনের আলো পরিষ্কারভাবে দেখা যায় এবং ঐ সময় থেকে রাতও শুরু হয় না। আল ক্বুরআনের গবেষণায় দেখা যায় যে, যতক্ষন আলো থাকবে ততক্ষন দিন থাকবে। অল্প আলো থাকলেও তা দিনের অংশ, ফজরের আজানের পর এবং সূর্য ডোবার পরে আলো-আঁধারের সংমিশ্রণের সময়টুকুও দিনের অংশ। কারণ, দিন হলো দেখার জন্য।
.এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানুষের ধরে নেয়া বা এই চিন্তা-ভাবনা কতটুকু সঠিক? আসলেই কি সূর্যাস্ত থেকে রাত শুরু হয়? নাকি “সাফাক্ব” বা সন্ধার পরে রাত শুরু হয়? এখন জানার বিষয় হলো রাত কখন থেকে শুরু হয়?।
.যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন আছমান যমিন, চন্দ্র-সূর্য, এবং যিনি দিন-রাত সৃষ্টি করেছেন তিনিই কেবল তাঁর নাজিলকৃত আল ক্বুরআনে বলে দিবেন যে, কখন থেকে রাত শুরু হয় এবং কখন থেকে দিন শুরু হয়। আল্লাহ আল ক্বুরআনে ফজর, ছুবহে (ছাদেক), অস্তরাগ, সাফাক্ব, সকাল-সন্ধ্যা, রাত, দিন, ও দশদিকেরও বর্ণনা দিয়েছেন। আমরা মানুষের কথায় কান না দিয়ে আল ক্বুরআন থেকে জেনে নেবো যে, কখন থেকে রাত শুরু হয়।
.রাত ও ছুবাহঃ
[৭৪:৩৩-৩৪] (আল্লাহ বলেন) শপথ রাতের যখন তার অবসান হয়। শপথ ছুবহের (প্রভাতকালের) যখন তা আলোকিত হয়। ৭৪ নং ছূরা মুদ্দাছছির আয়াত ৩৩-৩৪।
.আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন যে, “শপথ” প্রভাতকালের যখন তা আলোকোদ্ভাসিত হয় বা আলোকিত হয়। আল্লাহর কথায় ইহাই প্রমাণ হলো যে, সূর্য উঠার আগের সময় প্রভাত, আর প্রভাতের সময় থেকেই সবকিছু আলোকিত হয়ে যায়। আল্লাহ প্রথমে শপথ করলেন “রাতের”, তার পর শপথ করলেন “ছুবাহ” বা “প্রভাতের”। আল্লাহর কথায় ইহাই প্রমাণ হলো যে, প্রথমে রাত থাকে, তারপর ছুবাহ বা প্রভাত হয়। আল্লাহ আবারও বললেন-
.রাত ও ছুবাহঃ
[৮১:১৭-১৮] (আল্লাহ বলেন) শপথ নিশাবসানের। (শপথ) ছুবহের (প্রভাত আগমন কালের। ৮১ নং ছূরা তাকবীর আয়াত ১৭-১৮।
.আলোচনাঃ এই আয়াতেও আল্লাহ প্রথমে শপথ করলেন “নিশার অবসান” বা “নিশির অবসান” অর্থাৎ “রাতের অবসানের”, অর্থাৎ “রাতের” বিদায়কালের শপথ করলেন। তারপর শপথ করলেন “ছুবাহ” বা “প্রভাতের”। এই দুটি ছূরার চারটি আয়াতে আল্লাহ প্রথমে “রাতের” কথা বলে তারপর বলেছেন “ছুবাহ”, “ভোর” বা “প্রভাতের” কথা। তাহলে এখানে আগে “রাত”, তারপরে “ভোর” বা “প্রভাত”। লক্ষ্য করুন! আল্লাহ এখানে রাতের পরে দিনের কথা বলেননি। আল্লাহ বলেছেন রাতের পরে ছুবাহ বা প্রভাত। পুনরায় লক্ষ্য করুন! আল্লাহ এখানে রাতের পরে দিনের কথা বলেননি। আল্লাহর কথা অনুযায়ী রাতের পরে ছুবাহ বা প্রভাত হয়। তাহলে আমরা এখানে দুটি সময় পেলাম, যথা রাত ও প্রভাত। ঠিক তদ্রুপ সন্ধ্যা তারপর রাত। যেমনঃ-
.সাফাক্ব, রাত ও নক্ষত্রঃ
فَلَا أُقْسِمُ بِالشَّفَقِ
আমি শপথ করি সন্ধ্যাকালীন লাল আভার
وَاللَّيْلِ وَمَا وَسَقَ
এবং রাত্রির, এবং তাতে যার সমাবেশ ঘটে [সুরা ইনশিকাক – ১৬-১৭]
আলোচনাঃ এই আয়াতে আল্লাহ প্রথমে শপথ করলেন “সন্ধ্যার”, তারপর শপথ করলেন “রাতের”। এই আয়াতের লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো আল্লাহ প্রথমে সাফাক্ব/ অস্তরাগ বা “সন্ধ্যার” কথা বলেছেন, তারপরে বলেছেন “রাতের” কথা। আল্লাহর কথা অনুযায়ী বোঝা গেলো যে, প্রথমে সন্ধ্যা হয় তারপরে রাত হয়। আবার লক্ষ্য করুন! আল্লাহ প্রথমে বললেন “সন্ধ্যা”, তারপর বললেন “রাত”। আল্লাহর কথায় ইহাই প্রমাণ হলো যে, আগে সন্ধ্যা হবে, তারপরে রাত হবে। তাহলে রাতের আগে সন্ধ্যা আছে। তাহলে সন্ধ্যা কখনোই রাত নয়। তাহলে আমরা এখানেও দুটি সময় পেলাম যথা সন্ধ্যা ও রাত। এই আয়াতের শেষে আল্লাহ রাতে “নক্ষত্র” বা “তারকার” সমাবেশের কথা বলেছেন, অর্থাৎ রাত শুরু হলেই আকাশে বহুসংখ্যক তারকার সমাবেশ ঘটবে যা সন্ধ্যায় ঘটে না। আল্লাহর কথায় ইহাই প্রমাণ হলো যে, রাত আরম্ভ হলেই আকাশে বহুসংখ্যক তারকা দেখা যাবে যা রাত শেষ হলেই অর্থাৎ ফজরের আজান থেকেই অস্ত যায়। কাজেই, সন্ধ্যা কখনোই রাত নয়।
.উপরোক্ত কথাগুলো আমি ক্বুরআন থেকে প্রমাণ দেখানো সত্ত্বেও হয়তো কেউ কেউ ভিন্ন কিছু দেখিয়ে আপনাকে বিভ্রান্ত করতে চাইবে। যেমন, ক্বুরআন থেকে দলীল-প্রমাণসহ “রাতে” ইফতার প্রসঙ্গে আমি ফেসবুকে পোষ্ট দেওয়াতে ক্বুরআন পড়ুয়া এক ভাই তা অস্বীকার করলেন এবং তিনি ছূরা ত্বারেক্বের ১-৩ আয়াত দেখিয়ে বলে উঠলেন যে, সূর্য ডোবার ১০/ ১৫ মিনিট পরেই সন্ধ্যার সময় আকাশে একটি তারকা দেখা দিলেই রাত শুরু হয়ে যায় এবং ঠিক তখনই ইফতার করা যাবে। আমি তার উদ্দ্যেশ্যে বলবো যে, সন্ধার সময় আকাশে একটি অতিরিক্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখা যায় যাকে বলা হয় (evening star) শুক তারা, সাঁঝের তারা বা সন্ধ্যা তারা। আল ক্বুরআনে ঐ তারকাটিকে বলা হয়েছে “নাজমুছ ছাক্বিব” যার অর্থ দ্বীপ্তিমান নক্ষত্র বা উজ্জ্বল নক্ষত্র।
আল ক্বুরআনের ছূরা ত্বারেক্বের ১-২ নং আয়াতের আরবিতে “লাইল” অর্থাৎ রাত শব্দটি নেই, প্রনাউনেও “রাত” শব্দটি নেই। যেহেতু তারকা রাতেই দেখা যায় তাই অধিকাংশ অনুবাদকগণই ঐ দুই আয়াতের অনুবাদের সাথে “রাত” শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন, যার কারণে কেউ কেউ বলে থাকেন যে, ঐ তারকাটিই “রাত” হওয়ার প্রমাণ। কিন্তু আল্লাহ তা বলেননি এবং রাত হওয়া না হওয়ার ব্যাপারেও ঐ তারকাটির কোনো সম্পর্কও নেই। কারণ, রাতের তারকার তুলনায় ঐ তারকাটি অতিরিক্ত আলো বা অতিরিক্ত উজ্জ্বল হওয়াতে সূর্য আড়াল হওয়ার সাথে সাথে ঐ তারকাটি সন্ধ্যার সময় থেকেই দেখা যায়। তাই ঐ তারকাটি হচ্ছে সাঁজের তারা বা সন্ধ্যা তারা। তাই আল্লাহ ছূরা ইনশিক্বক্বের ১৭ নং আয়াতে রাতের তারকাগুলোর শপথ করেও ভিন্নভাবে ঐ উজ্জ্বল তারকাটির শপথ করেছেন। আরও জানার বিষয় হলো যে, ঐ একটিমাত্র তারকা ব্যতীত সন্ধ্যার সময় বহু “তারকার” সমাবেশ ঘটে না, যা ছূরা ইনশিক্বক্ব এর ১৭ এর আয়াত অনুযায়ী প্রমাণিত, অর্থাৎ রাত হলেই বহু “তারকার” সমাবেশ ঘটবে। ছূরা ত্বারেক্বের ঐ তারকা সম্পর্কিত তিনটি আয়াত ও শব্দার্থ লক্ষ্য করলেই আমার কথার সত্যতা প্রমাণ হবে ইনশা-আল্লাহ।
.নাজমুছ ছাক্বিবঃ
وَالسَّمَاء وَالطَّارِقِ
শপথ আকাশের এবং রাত্রিতে আগমনকারীর।
وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ
আপনি জানেন, যে রাত্রিতে আসে সেটা কি?
النَّجْمُ الثَّاقِبُ
সেটা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। [সুরা তারিক – ১-৩]
.আলোচনাঃ উক্ত আয়াতগুলোর আরবির দিকে লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, আরবিতে “লাইল” অর্থাৎ “রাত” শব্দটি নেই। সর্বনাম দ্বারাও “রাত” শব্দটি নেই। এমনকি রাত হলেই ঐ তারকাটি উঠে না, ঐ তারকাটি সন্ধ্যায় উঠে। এবার একটি শব্দার্থ ক্বুরআনের সঠিক অনুবাদ লক্ষ্য করুন!
(১) শপথ আকাশের ও ত্বারেক্বের/ আগমনকারীর/ সুপারনোভার (supernova)।
(২) আর তুমি কি জানো ত্বারেক/ আগমনকারী/ সুপারনোভা কি?
(৩) (তা) উজ্জ্বল নক্ষত্র।
.আলোচনাঃ এই একটি মাত্র অনুবাদ পেলাম যেখানে আরবির সাথে মিল রেখে “রাত” শব্দটি দেওয়া হয়নি। এটি একক তারকা, অতি উজ্জ্বল, যা সন্ধ্যায় উঠে। ছূরা ইনশিক্বক্ব এর ১৭ নং আয়াতে আল্লাহ রাতের বহুসংখ্যক তারকার শপথ করেছেন যা আমি পূর্বে দেখিয়েছি। কাজেই, ছূরা ত্বারেকের শপথকৃত তারকাটি রাতের তারকা নয়, এটি সন্ধ্যা তারা বা সাঁজের তারা যা উজ্জ্বল নক্ষত্র।
.আরও প্রমাণ হয় যে, ঐ একটিমাত্র তারকা ব্যতীত সন্ধ্যার সময় বহুসংখ্যক “তারকার” সমাবেশ ঘটে না। রাত শুরু হলেই বহুসংখ্যক “তারকার” সমাবেশ ঘটে। আরও লক্ষ্য করুন! কোন সময় তারকাগুলো অস্তমিত হয়? অর্থাৎ যেরকম একটি সময় তারকাগুলো অস্তমিত হয় ঠিক সেরকম একটি সময় না হওয়া পর্যন্ত তারকাগুলো উদয় হয় না। আরও লক্ষ্য করুন-
.[৫২:৪৯] (আল্লাহ আরও বলেন) এবং রাত্রির কিছু অংশে এবং তারকা অস্তমিত হওয়ার সময় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করুন। ছূরা ত্বূর আয়াত ৪৯।
.[৫৩:১] (আল্লাহ বলেন) শপথ তারকার যখন তা অস্ত যায়। ছূরা নাজম আয়াত ১।
.আলোচনাঃ এবার ভেবে দেখুন তো! কোন সময় থেকে তারকাগুলোর অস্ত যাওয়া শুরু হয়? সূর্য উঠার ১০/ ১৫ মিনিট আগেও কি তারকাগুলো দেখা যায়? নাকি ফজরের আজান থেকেই তারকাগুলো অস্ত যায়? কোন টি? তাই যদি হয় তাহলে ফজরের আজান থেকেই রাত শেষ। ফজরের আজান থেকে সূর্য উদয় পর্যন্ত যতটুকু সময় পাওয়া যায়, সূর্য অস্ত যাওয়ার পরও ঠিক ততটুকু সময় পর তারকাগুলো উঠতে শুরু করবে, আর সেই সময় থেকেই রাত শুরু হবে। কাজেই, সন্ধ্যার সময় আকশজুড়ে সেই তারকাগুলোর সমাবেশ দেখা যায় না বিধায় সন্ধ্যা কখনোই রাত নয়। আর আল্লাহও বলেছেন যে, ছিয়াম পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত।
.এ বিষয়গুলো এখানে টানার কারণ এই জন্য যে, যারা সন্ধ্যার সময় রোজা ভাঙ্গাকে জায়েজ করার জন্য “নাজমুছ ছাক্বিব” বা সন্ধ্যা তারাকে রাতের তারা বলে চালিয়ে দিতে চায়, উপরোক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে তারা ভুল পথে রয়েছেন। আর এক শ্রেণী রয়েছে যারা ক্বুরআন থেকে বিধান নিতে চায় না, তারা এই বিষয়গুলো না বুঝে আল্লাহর শিখানো আগে “সন্ধ্যা” তার পর “রাত” এ কথা মানতে রাজি না। তাদের দলীল ছাড়া একটাই কথা তা হলো, সূর্যাস্তের সাথে সাথেই রাত শুরু হয়ে যায়, কিন্তু আল্লাহ তা বলেননি। আল্লাহ আগে সন্ধ্যার কথা বলেছেন তারপর রাতের কথা বলেছেন। আল্লাহর কথায় ইহাই প্রমাণ হলো যে, সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে “রাত” হয় না।
.আরও একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো আল্লাহ রোজা “ভাঙতে” বলেননি, আল্লাহ রোজা “পূর্ণ” করতে বলেছেন। ভাঙ্গা আর পূর্ণ করা এক নয়। যেমন, ছয় তলাবিশিষ্ট একটি বিল্ডিং ছয় তলা পর্যন্তই পূর্ণ করতে হয়। কিন্তু পঞ্চম তলায় এসেই যদি বলা হয় যে, বিল্ডিং ভাঙ্গো তাহলে তার ছয় তলা পর্যন্ত পূর্ণ করা হলো না।
.এখন কেউ যদি সূর্য ডোবার সাথে সাথে রোজা ভাঙ্গে তাহলে সে সন্ধ্যায় রোজাটা ভেঙ্গে ফেললো, তার পক্ষে সম্পূর্ণ রোজা পূর্ণ করা হলো না, সে রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করলো না এবং সে রাত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষাও করলো না, সে রোজা পূর্ণ করার আগেই সন্ধ্যার সময় তার রোজাটা ভেঙ্গে ফেললো। তাহলে সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করলো। কারণ, আল্লাহ আল ক্বুরআনে সন্ধ্যার বর্ণনা দিয়েছেন এবং রাতেরও বর্ণনা দিয়েছেন।
.রোজা যদি সূর্যাস্ত পর্যন্ত হতো তাহলে আল্লাহ বলতেন যে, “অতঃপর ছিয়াম পূর্ণ করো সূর্যাস্ত পর্যন্ত/ ছিয়াম পূর্ণ করো সন্ধ্যা পর্যন্ত”/ ছিয়াম পূর্ণ করো অস্তরাগ পর্যন্ত/ ছিয়াম পূর্ণ করো সাফাক্ব পর্যন্ত। কিন্তু আল্লাহ এই কথাগুলোর কোনো একটি কথাও বলেছেন কি? ছিয়াম পূর্ণ করার ব্যাপারে আল্লাহ সূর্যাস্তের কথা বলেছেন কি? আল্লাহ সন্ধ্যার কথা বলেছেন কি? বা সাফাক্বের কথা বলেছেন কি? আল্লাহ তো সরাসরি রাতের কথাই বলেছেন। তাহলে মানুষ কোন যুক্তিতে সন্ধ্যায় রোজা ভাঙ্গে? মানুষ না জেনে শুধু ভুল করে আর মিথ্যাই বলে যায়। আর রোজা পূর্ণ না করে সূর্যাস্তের সাথে সাথে রোজা ভঙ্গ করে প্রতিটি মানুষের ছিয়াম তথা রোজা নষ্ট করে। কাজেই, আল্লাহর কথা অনুযায়ী সন্ধ্যা শেষ হয়ে যখন রাত আরম্ভ হবে ঠিক ততক্ষন পর্যন্ত অপেক্ষা করে ছিয়াম পূর্ণ করতে হবে, অর্থাৎ রাত শুরু হলেই পানাহার করা যাবে যা আল্লাহ বলেছেন।
চলবে…।




