ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের আন্দোলন এবং আবির্ভাবের যুগে আরব জাতি এবং তাদের সার্বিক অবস্থা ও শাসনকর্তাদের প্রসঙ্গে অসংখ্য রেওয়ায়েত ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ সব রেওয়ায়েতের মধ্যে ইয়েমেনে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী হুকুমত সংক্রান্ত হাদীসসমূহ বিদ্যমান; এ সব রেওয়ায়েত ও হাদীস সার্বিকভাবে উক্ত হুকুমতের প্রশংসায় বর্ণিত হয়েছে। আমরা মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এ সব হাদীস স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আলোচনা করব।
মিশরীয়দের আন্দোলন সংক্রান্ত রেওয়ায়েত ও হাদীসসমূহও উক্ত রেওয়ায়েত ও হাদীসমূহের মধ্যে বিদ্যমান। এ সব হাদীস ও রেওয়ায়েতে মিশরীয়দের প্রশংসা করা হয়েছে, বিশেষ করে ঐ সব রেওয়ায়েত ও হাদীস যেগুলোয় বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কতিপয় সঙ্গী-সাথী ও সহকারী মিশরীয় হবেন। আরো কতিপয় হাদীসে বিধৃত আছে যে, মিশর হযরত মাহ্দী (আ.)-এর মিম্বার অর্থাৎ মুসলিম বিশ্বের প্রচার ও চিন্তাধারার কেন্দ্রস্থল হবে। মিশরে প্রবেশ করে সে দেশের মিম্বারে আরোহণ করে ইমাম মাহ্দী (আ.) যে ভাষণ প্রদান করবেন তৎসংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ বিদ্যমান আছে। এ কারণে মিশরীয় আন্দোলন ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী আন্দোলনসমূহের অন্তর্ভুক্ত এবং তাঁর আবির্ভাবের আন্দোলনের অংশ বলে গণ্য করা হয়েছে। আমরা এ আন্দোলন সম্পর্কে পৃথকভাবে আলোচনা করব।
ঠিক একইভাবে ইরাকে বিদ্যমান দলসমূহ এবং সেখানকার প্রকৃত মুমিনদের সাথে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহও বিদ্যমান। তাদেরকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সঙ্গী-সাথীদের অন্তর্ভুক্ত বলে রেওয়ায়েতসমূহে স্মরণ করা হয়েছে এবং যথাসময়ে তা আমরা বর্ণনা করব।
আরব জাতি সংক্রান্ত রেওয়ায়েত ও হাদীসসমূহের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে মাগরিবীদের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহ যেগুলোয় মিশর, সিরিয়া, জর্ডান এবং ইরাকে মাগরিবী সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সব হাদীস ও রেওয়ায়েত থেকে তাদের নিন্দিত হওয়ার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। আর শক্তিশালী সম্ভাবনার ভিত্তিতে আরব দেশসমূহে ইসলামী আন্দোলন এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে ইসলামের শত্রুদের পক্ষ থেকে এ সেনাবাহিনী প্রেরিত হবে যা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীর ভূমিকা পালন করবে অথবা আরব জাতীয়তাবাদ সংরক্ষণকারী বাহিনী সদৃশ হবে। আমরা পরে এতৎসংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করব।
ঠিক একইভাবে শিয়া ও সুন্নী সূত্রসমূহে সার্বিকভাবে আরব শাসক ও রাজন্যবর্গকে নিন্দা ও ভর্ৎসনা করে বেশ কিছু সংখ্যক রেওয়ায়েত ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেমন: নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতটি মুস্তাফীদ। (মুস্তাফীদ: ঐ খবরে ওয়াহেদকে বলা হয় যা প্রতি স্তরে তিনজনেরও অধিক রাবী কর্তৃক বর্ণিত)
রেওয়ায়েত: “আরবদের (অথবা তাগুতীদের) জন্য আক্ষেপ ঐ অনিষ্ট থেকে যা তাদেরকে ধরাশায়ী করে ফেলবে।”
আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন: “মহান আল্লাহর শপথ, আমি যেন তাকে (ইমাম মাহ্দী) রুকন ও মাকামের মাঝখানে দেখতে পাচ্ছি যে জনগণ তার সাথে একটি নতুন গ্রন্থ নিয়ে বাইআত করছে অথচ এ বিষয়টি মেনে নেয়া আরবদের কাছে খুবই কঠিন ও কষ্টকর হবে। আরব তাগুতী ও সীমা লঙ্ঘনকারীদের জন্য আক্ষেপ ঐ অনিষ্ট থেকে যা অতি সত্বর তাদেরকে আষ্টে-পৃষ্টে বেঁধে ফেলবে। আর হাকিমের মুস্তাদরাকে বর্ণিত হয়েছে: “আরবদের জন্য আক্ষেপ ঐ অনিষ্ট থেকে যা শীঘ্রই তাদের কাছে উপস্থিত হবে। (বিহারুল আনওয়ার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ১১, হাকিম প্রণীত মুস্তাদরাক, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৩৯)
এখানে নতুন গ্রন্থ বলতে পবিত্র কোরআনকেই বোঝানো হয়েছে যা হবে পরিত্যক্ত (অর্থাৎ তদনুসারে আমল করা হবে না) এবং হযরত মাহ্দী (আ.) আবার নতুন করে তা উপস্থাপন করবেন এবং একে নব জীবন দেবেন।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: “যখন আল কায়েম আল মাহ্দী কিয়াম করবে (জনসমক্ষে আবির্ভূত হবে ও আন্দোলন করবে) তখন সে জনগণকে নতুন করে ইসলাম ধর্মের দিকে আহবান জানাবে এবং যে বিষয়টি পরিত্যক্ত হয়ে গেছে এবং যা থেকে সাধারণ জনগণ পৃথক হয়ে যাওয়ার কারণে বিচ্যুতির পথে পা দিয়েছে সে বিষয়টির দিকে পরিচালিত করবে। আর সে এ কারণে ‘মাহ্দী’ নামে অভিহিত হয়েছে যে, সে জনগণকে একটি হারানো বিষয়ের দিকে দিক নির্দেশনা দেবে। আর তাকে ‘কায়েম’ বলা হয়েছে এ কারণে যে, সে সত্যসহ কিয়াম করবে। (শেখ মুফীদ প্রণীত কিতাবুল ইরশাদ, পৃ. ৩৬৪)
ইসলাম ধর্ম শাসকশ্রেণী এবং অধিকাংশ সাধারণ মানুষের কাছে কঠিন ও অপ্রীতিকর হবার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা এ ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। আর এ কারণেই পবিত্র কোরআন ও খাঁটি ইসলাম ধর্মের দিকে প্রত্যাবর্তন, হযরত মাহ্দী (আ.)-এর হাতে বাইআত এবং ইসলামী বিধি-বিধান অনুসারে আমল করা তাদের জন্য কঠিন ও দুঃসাধ্য হয়ে যাবে।
নতুন গ্রন্থ বলতে সূরা ও আয়াতসমূহের নতুন বিন্যাস সমেত এ পবিত্র কোরআনকেই বোঝানো হয়ে থাকতে পারে। রেওয়ায়েত ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: “মহানবী (সা.) এবং অন্য সকল নবীর বিদ্যমান জিনিসপত্রসহ উল্লিখিত পবিত্র কোরআন ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে সংরক্ষিত আছে এবং আমাদের হাতে যে পবিত্র কোরআন বিদ্যমান সেই কোরআনের সাথে উক্ত কোরআনের কোন পার্থক্য নেই, এমনকি তাতে আমাদের কাছে বিদ্যমান কোরআন অপেক্ষা একটি বর্ণও কম-বেশি নেই।
তবে আমাদের কাছে বিদ্যমান কোরআনের সাথে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে বিদ্যমান কোরআনের পার্থক্যটা হচ্ছে কেবল সূরা ও আয়াতসমূহের বিন্যাস সংক্রান্ত। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে বিদ্যমান এ কোরআনটি রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কর্তৃক পঠিত এবং হযরত আলী (আ.)-এর হাতে লিখিত। এ দুই অর্থে (অর্থাৎ সূরা ও আয়াতসমূহের বিন্যাস এবং পবিত্র কোরআনের পরিত্যক্ত বিধি-বিধানসমূহ বাস্তবে বলবৎ করা) পবিত্র কোরআন তাদের কাছে নতুন গ্রন্থ বলে মনে হবে।
আবদুল্লাহ্ ইবনে আবু ইয়াফুর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমি ইমাম সাদিক (আ.)-এর নিকট থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন: আরব বিদ্রোহীদের জন্য ধ্বংস রয়েছে ঐ অমঙ্গলের মধ্যে যা অতি শীঘ্রই তাদেরকে সবদিক থেকে ঘিরে ফেলবে। আমি বললাম: আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত হই। হযরত কায়েম আল মাহ্দীর সাথে কজন আরব থাকবে?
তিনি বললেন: খুব অল্প সংখ্যক। আমি বললাম: মহান আল্লাহর শপথ, যারা তাদের (আরবদের) ব্যাপারে এ কথা বর্ণনা করে তারা সংখ্যায় অনেক। তিনি বললেন: তবে অবশ্যই মানুষকে পরীক্ষা করা হবে এবং তাদেরকে পরস্পর থেকে ছেঁকে বের করে আনা হবে। আর অনেক লোকই পরীক্ষার মাধ্যমে (ইসলাম ধর্মের সীমানা থেকে) বের হয়ে যাবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২১৪)
এ সব রেওয়ায়েতের অন্তর্গত হচ্ছে ঐ সব রেওয়ায়েত যেগুলোয় ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবকালে আরবদের মধ্যকার মতবিরোধের কথা বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এ মতবিরোধ (কতিপয়) আরবের মাঝে গৃহযুদ্ধের কারণ হবে।
ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন: “জনগণ এক ধরনের তীব্র ভয়-ভীতি এবং ফিতনা ও বিপদাপদ কবলিত না হওয়া পর্যন্ত আল কায়েম কিয়াম করবে না। আর এর পূর্বে আছে তাদের মহামারীতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। এর পরপরই আরবদের মাঝে ধারালো তরবারি কর্তৃত্বশীল ও ফয়সালাকারী হবে। জনগণের মাঝে মতপার্থক্য, ধর্মের ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্তি এবং তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খল অবস্থার উদ্ভব হবে। আর তা এমনভাবে হবে যে, মানুষের মাঝে পারস্পরিক হিংস্রতা, নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতা প্রত্যক্ষ করে সবাই তখন সকাল-সন্ধ্যায় মৃত্যু কামনা করবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৩১)
আর বেশ কিছু সংখ্যক রেওয়ায়েত ও হাদীস আছে যেগুলো সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থেকে আরবদের দূরে সরে যাওয়া, চিন্তাবিদগণ কর্তৃক তাদের নিজস্ব অভিমত ও ধ্যান-ধারণা ব্যক্ত করা এবং অন্যদেরকে তা গ্রহণ করার জন্য আহবান করার সাথে সংশ্লিষ্ট।
এ সব রেওয়ায়েত ও হাদীসের মধ্যে ইরানীরা অথবা ইরানের শাসকবর্গ ও আরবদের মধ্যকার মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব সংক্রান্ত হাদীসসমূহও বিদ্যমান। আর এ দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবকাল পর্যন্ত চলতে থাকবে।
যখন আমরা ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী, কালো পতাকাবাহীদের আন্দোলন এবং কুদ্স অভিমুখে তাদের অগ্রযাত্রা এবং সুফিয়ানীর শত্রুতামূলক তৎপরতা সংক্রান্ত রেওয়ায়েত ও হাদীসগুলো প্রত্যক্ষ করি তখন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, আরব শাসক ও রাজা-বাদশাহদের মাঝে কালো পতাকাবাহীদের বিরোধী মনোভাব ও ভূমিকা থাকবে। তবে ইয়েমেনী আন্দোলন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে। অর্থাৎ তারা এবং অন্যান্য যে সব ইসলামী আন্দোলন ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের মাধ্যমে হবে তারা আরব শাসকদের থেকে ভিন্ন নীতি গ্রহণ করবে অর্থাৎ আরব দেশসমূহের ঐ সব ইসলামী আন্দোলন, ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী কালো পতাকাবাহী ইরানীদের সহযোগী হবে। উল্লেখ্য যে, সুফিয়ানী কুদ্স অভিমুখে অগ্রসরমান ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী কালো পতাকাবাহী ইরানীদের অগ্রযাত্রার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চাইবে।
আরবদের সাথে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর যুদ্ধ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ এবং পবিত্র মক্কা নগরী মুক্ত করার পরপরই সুফিয়ানী বাহিনীর হাত থেকে মদীনা মুক্ত করার পর অথবা মুক্ত করার সময় হিজাযের ক্ষয়িষ্ণু প্রশাসন ও সরকারের অবশিষ্টাংশের সাথে তিনি যে যুদ্ধ করবেন তৎসংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ যেমন বিদ্যমান আছে ঠিক তেমনি (এরপর) ইরাকে সুফিয়ানীর বিরুদ্ধে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বেশ কয়েকটি যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনে সুফিয়ানীর বিরুদ্ধে ইমামের বৃহৎ যুদ্ধ সংক্রান্ত রেওয়ায়েতও বর্ণিত হয়েছে। (এ সব রেওয়ায়েত ও হাদীসের মধ্য থেকে) গুটিকতক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) ইরাকে তাঁর বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করবেন এবং সেখানকার ৭০টি গোত্রের রক্তপাত হালাল গণ্য করবেন। (ইরাক ও শামদেশের ঘটনাবলী বর্ণনা করার সময় এ ব্যাপারে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব)। এতদপ্রসঙ্গে ইমাম সাদিক (আ.)-এর নিকট থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন: “যখন আল কায়েম আবির্ভূত হবে তখন তার, আরব ও কুরাইশদের মাঝে একমাত্র তরবারী ব্যতীত আর কোন ফয়সালাকারী থাকবে না। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ৩৫৫)
আরব উপদ্বীপ, শাম, বাগদাদ, বাবিল (ব্যাবিলন) ও বসরায় ভূমিধ্বসসমূহ এবং হিজায অথবা হিজাযের পূর্ব দিকে অগ্নির আবির্ভাব ও তা প্রজ্বলিত হওয়া সংক্রান্ত হাদীসসমূহও উক্ত হাদীস ও রেওয়ায়েতসমূহের অন্তর্গত। উল্লেখ্য যে, উক্ত অগ্নি তিন দিন অথবা সাত দিন পর্যন্ত অবিরামভাবে জ্বলতে থাকবে এবং তা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের নিদর্শনাদির অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।
শাম দেশ ও সুফিয়ানীর অভ্যুত্থান
ইসলামের ইতিহাস ও হাদীস শাস্ত্রের সূত্র ও গ্রন্থসমূহে বর্তমান সিরিয়া ও লেবানন যা শামের মরুভূমি এবং লেবাননের পার্বত্য অঞ্চল বলেও অভিহিত এবং জর্দান ও অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড সমবেতভাবে শাম বা বৃহত্তর শামদেশের অন্তর্ভুক্ত (বহুবচন শামাত)। যদিও প্রধানত সমগ্র এ অঞ্চলকে শাম ও ফিলিস্তিন বলা হতো; আর শামদেশের রাজধানী দামেশক ‘শাম’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল।
আবির্ভাবের যুগে শামদেশ এবং এর ঘটনাবলী ও বিভিন্ন ব্যক্তিত্বসংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েত অগণিত। আর এ সব রেওয়ায়েতের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সুফিয়ানীর আন্দোলন যে শামের ওপর নিজ কর্তৃত্ব স্থাপন করে সমগ্র দেশকে নিজ শাসনাধীনে নিয়ে আসবে। সুফিয়ানীর সেনাবাহিনী ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সে শামে তার শত্রুদেরকে নির্মূল করার পর তুর্কীদের (রুশদের) বিরুদ্ধে কিরকীসীয়ায় এক বৃহৎ যুদ্ধে লিপ্ত হবে। অতঃপর সে ইরাকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ইরানীদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। সে হিজাযেও ভূমিকা রাখবে এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে হিজাযের শাসনকর্তাকে সাহায্য করার জন্য সেখানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করবে। কিন্তু মক্কা নগরীর অদূরে প্রতিশ্রুত মুজিযা (ভূগর্ভে তাদের প্রোথিত হওয়া) বাস্তবায়িত হবে।
সার্বিকভাবে সুফিয়ানীর জন্য সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হবে ফিলিস্তিন বিজয় ও হযরত মাহ্দী (আ.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ইহুদী ও রোমানরা (পাশ্চাত্য) এ যুদ্ধে সুফিয়ানীকে সাহায্য ও সমর্থন দেবে। আর সুফিয়ানীর পরাজিত ও নিহত হওয়া, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিজয়, তাঁর মাধ্যমে ফিলিস্তিন মুক্ত হওয়া এবং আল কুদসে তাঁর প্রবেশের মাধ্যমে এ গোলযোগের পরিসমাপ্তি হবে। আমরা এ বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করতে চাই।
সুফিয়ানীর অভ্যুত্থানের আগে শামের ঘটনাবলী
সুফিয়ানীর আন্দোলনের শুরু থেকে আল কুদ্স মুক্ত করার যুদ্ধে তার পরাজয় বরণ পর্যন্ত ঘটনাবলী ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব সংক্রান্ত হাদীসসমূহ থেকে বের করা তুলনামূলকভাবে সহজ। তবে এর বিপরীতে যে সব ঘটনা সুফিয়ানীর আগে সংঘটিত হবে সেগুলো ঐ রেওয়ায়েতসমূহ থেকে বের করা বেশ কঠিন। কারণ উক্ত ঘটনাবলী সাধারণত সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে এবং রেওয়ায়েত ও হাদীসসমূহে ঘটনাসমূহের ধারাবাহিকতা আগে-পরে করা হয়েছে। তবে এ সব কিছুর ফলাফল নিম্নরূপ:
১. সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ওপর সর্বগ্রাসী ফিতনা-ফাসাদের প্রাদুর্ভাব এবং তাদের ওপর রোম (পাশ্চাত্য) ও তুর্কীদের (রুশ জাতি) আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
২. শামে একটি বিশেষ ফিতনার উৎপত্তি যা তাদের মাঝে মতবিরোধ, দুর্বলতা ও আর্থিক সংকটের উদ্ভব ঘটাবে।
৩. শামে মূল শক্তিশালী দু’দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ।
৪. দামেশকে ভূমিকম্প যার ফলে ঐ শহরের মসজিদের পশ্চিম পার্শ্ব এবং এর আরো কিছু এলাকা ধ্বংস হয়ে যাবে।
৫. শামে ইরানী ও পাশ্চাত্যের (মাগরিবী) সম্মিলিত বাহিনীর আগমন।
৬. শামে ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণকে কেন্দ্র করে তিন নেতার মধ্যকার দ্বন্দ্ব: এ তিন নেতা হবে আবকা, আসহাব এবং সুফিয়ানী। বাকী দু’জনের ওপর সুফিয়ানীর বিজয়, সমগ্র সিরিয়া ও জর্দানের ওপর তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং সমগ্র অঞ্চলটি তার শাসনাধীন হওয়া।
ঠিক একইভাবে হাদীস ও রেওয়ায়েতসমূহে সুফিয়ানীর আন্দোলনের আগেকার আরো কিছু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যেগুলোর বিবরণ আগেই দেয়া হয়েছে অথবা এতৎসংক্রান্ত বিশেষ অধ্যায়ে তা দেয়া হবে। যেমন: রোমান ও তুর্কীদের যুদ্ধ এবং এ অঞ্চলে তাদের নিজ নিজ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা, মিশরে মিশরীয় বিপ্লবীর আবির্ভাব ও বিপ্লব, সে দেশে পাশ্চাত্য বাহিনীর আগমন এবং ইরাকে শাইসাবানীর বিদ্রোহ ইত্যাদি।
তবে রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রতিশ্রুত ইয়েমেনীর আবির্ভাব সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও অভ্যুত্থানের সমসাময়িক হবে অথবা তিনি সুফিয়ানীর আবির্ভাবের খুব কাছাকাছি সময় আবির্ভূত হবেন। তবে এ কালো পতাকাবাহীরা হবে ইরানী এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের প্রথম ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী এ দলটি সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও উত্থানের বেশ কিছুকাল আগে আবির্ভূত হবে এবং তাদের সেনাবাহিনী সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও অভ্যুত্থানের আগেই শামে উপস্থিত হবে (পরে বিস্তারিত বর্ণিত হবে)। তাদের নেতা হবেন খোরাসানী সাইয়্যেদ এবং তাদের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হবে শুআইব ইবনে সালিহ্; এ দু’ব্যক্তিই প্রতিশ্রুত এবং তাঁরা আবির্ভূত হবেন। কতিপয় রেওয়ায়েতে উল্লিখিত হয়েছে যে, এ দু’জন প্রতিশ্রুত ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব সুফিয়ানীর আবির্ভাবের কাছাকাছি সময় হবে। তবে আরো কিছু সংখ্যক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, সুফিয়ানীর আবির্ভাবের ৬ বছর আগে এ দু’জনের আবির্ভাব হবে। মহান আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে আমরা সংশ্লিষ্ট অধ্যায়েই তা আলোচনা করব।
তথ্যসূত্র: ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশ
লেখক: আল্লামা আলী আল কুরানী
অনুবাদ: মোহাম্মদ মুনীর হোসেন খান




