মূল : আলী আসগার রেজওয়ানী
অনুবাদ : আবুল কাসেম
কবর জিয়ারতের নিয়তে সফরের শরীয়তগত বৈধতা
পূর্বে আমরা ওয়াহাবী আলেমদের ফতোয়ার আলোচনায় উল্লেখ করেছি তাদের সাম্প্রতিক আলেমগণ কবর জিয়ারতকে বৈধ মনে করলেও কবর জিয়ারতের নিয়তে যাত্রাকে বৈধ ও জায়েয মনে করেন না,বরং একে ‘বিদআত’ বলে অভিহিত করেছেন,এমনকি যদি তা রাসূল (সা.)-এর কবর জিয়ারতের নিয়তেও হয়। তবে ইবনে তাইমিয়া কবর জিয়ারতকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ফতোয়া দিয়েছেন।
এখন আমরা কবর জিয়ারতের নিয়তে (বিশেষত রাসূলের কবর জিয়ারত) সফরের শরীয়তগত (শারয়ী) বৈধতাকে প্রমাণ করব :
১। মহান আল্লাহ বলেছেন :
(وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا)
আয়াতটিতে (সূরা নিসা : ৬৪) ‘جاءوک’ বলা হয়েছে যাতে নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সকল স্থান হতে রাসূলের নিকট গমনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়।
২। যে হাদীসটিতে মহানবী (সা.) বলেছেন من زار قبری তাতে জিয়ারতের শব্দটিও নিকট ও দূরবর্তী উভয় স্থানকে শামিল করবে। বিশেষত যে হাদীসটিতে ইবনুস সাকান সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন তাতে উল্লেখও হয়েছে من جائنی زائراً অর্থাৎ যে আমার নিকটে আসবে জিয়ারতকারী হিসেবে যা জিয়ারতের সফরের প্রতিই ইঙ্গিত করছে। বাহ্যিকভাবে তা হতে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর বোঝা যায়।
৩। কোন কোন হাদীস হতে স্পষ্টভাবে অথবা বাক্যের ধরন হতে জিয়ারত মুস্তাহাব ও জায়েয হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়,এমনকি জিয়ারতের নিয়ত করা ও জিয়ারতের নিয়তে সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সে উদ্দেশ্যে যাত্রার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়।
মুসলিম ও অন্যান্যরা সহীহ সনদে বুরাইদা আসলামী হতে বর্ণনা করেছেন মহানবী (সা.) বলেছেন: ‘আমি তোমাদেরকে আমার কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম,কিন্তু আমাকে আমার মাতার কবর জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এখন হতে তোমরাও কবর জিয়ারত কর,তা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।’
মহানবী (সা.) বলেছেন,‘আমাকে আমার মাতার কবর জিয়ারত করার অনুমতি দেয়া হয়েছে’- বাক্যটি হতে বোঝা যায় কোন স্থান হতে জিয়ারতের নিয়তে বের হতে কোন অসুবিধা নেই।
সামআনী ইমাম আলী (আ.) হতে বর্ণনা করেছেন যে,এক আরব বেদুইন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর দাফনের তিনদিন পর মদীনায় প্রবেশ করে সরাসরি তাঁর কবরের নিকট গিয়ে তাঁর কবরের উপর উপুড় হয়ে মাটি উঠিয়ে নিজের মাথার উপর ফেলতে লাগল এবং তাঁর উদ্দেশে বলল,‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের উদ্দেশে বলেছেন এবং আমরাও আপনার কথা শুনেছি। আপনি আল্লাহর নিকট হতে কোরআনের আয়াত গ্রহণ করেছেন এবং আমরা আপনার নিকট থেকে তা গ্রহণ করেছি। আপনার উপর অবতীর্ণ আয়াতের একটি হলো ولو أنّهم إذ ظلموا أنفسهم جاءوک… আমি আমার উপর জুলুম (অনিষ্ট সাধন) করেছি। এখন আপনার নিকট এসেছি,আমার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন।(ওয়াফা উল ওয়াফা, সামহুদী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬১২)
হযরত বেলালের স্বপ্ন দেখা এবং সিরিয়া থেকে মদীনার উদ্দেশে রাসূলের জিয়ারতের লক্ষ্যে যাত্রার বিষয়টি যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি,কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রার বৈধতাকে ভালোভাবেই প্রমাণ করে। (উসদুল গাবা, ১ম খণ্ড, পৃ . ৩০৭-৩০৮; মুখতাছারে তারিখে দামেস্ক, ৪র্থ খণ্ড, ১১৮,তাহজীবুল কামাল, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৮৯)
সাবকী বর্ণনা করেছেন,‘খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ প্রায়শই সিরিয়া হতে কাউকে না কাউকে মদীনায় তাঁর পক্ষ হতে জিয়ারত করতে ও রাসূলের প্রতি সালাম দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করতেন।(শিফাউস সিকাম, পৃ. ৫৫)
খাতিব বাগদাদী হাম্বালী ফিকাহর শীর্ষস্থানীয় আলেম আবি আল খাল্লাল হতে বর্ণনা করেছেন যে,তিনি তাঁর সময়ে যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় হযরত মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর কবর জিয়ারতের নিয়ত করতেন ও সে উদ্দেশ্যে যাত্রা করতেন। তিনি তাঁর প্রতি তাওয়াসসুল করতেন (অর্থাৎ তাঁর মধ্যস্থতায় ও মর্যাদার শানে আল্লাহর নিকট চাইতেন)। ফলে তাঁর সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। (তারিখে বাগদাদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২০)
পূর্বে উল্লিখিত আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে মুয়াম্মালের বর্ণনা হতেও আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রার বৈধতা প্রমাণিত হয়।(তাহজীবুত তাহজীব, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৩৯)
তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ্ও বর্ণনা করেছেন যে,রাসূল (সা.) সাহাবীদের নিয়ে ওহুদের শহীদদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে গিয়েছেন। (সুনানে আবি দাউদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১৮, হাদীস নং ৩৫৭)
হযরত আয়েশা বলেছেন,‘যে রাতগুলোতে আমার পালা থাকত এবং রাসূল (সা.) আমার ঘরে থাকতেন শেষ রাত্রিতে তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে কবর জিয়ারতে যেতে দেখতাম। (মুসতাদরাকে হাকিম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩৩)
উপরিউক্ত হাদীসগুলো থেকে কবর জিয়ারতের নিয়তে যাত্রা শুধু জায়েযই নয়,এমনকি মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়।
৪। মুসলমানদের ইতিহাসের ধারায় এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে,তারা আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতেন।
৫। আহলে সুন্নাতের সহীহ হাদীস গ্রন্থসমূহে রাসূল (সা.) হতে অসংখ্য বর্ণনায় বলা হয়েছে,যদি কেউ মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ ফেলে তার প্রতি পদে মর্যাদা বৃদ্ধি পায় ও তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হয়। (সহীহ মুসলিম)
এই সওয়াব লাভের বিষয়টি মসজিদে অবস্থানের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে যাত্রা ও পদক্ষেপ গ্রহণের কারণেই ঘটে থাকে,তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে তাঁর ওলীদের কবর জিয়ারতের প্রস্তুতি গ্রহণ ও এজন্য যাত্রাও আল্লাহর নিকট পছন্দনীয়।
কবর জিয়ারত হারাম হওয়ার বিষয়গুলোতে ওয়াহাবীদের দলীল
কবর জিয়ারত হারাম হওয়ার বিষয়ে [এমনকি রাসূল (সা.)-এর কবরও] ওয়াহাবীদের প্রধান দলিল হলো আবু হুরাইরা বর্ণিত এ হাদীসটি : রাসূল (সা.) বলেছেন : ‘তিনটি মসজিদ,যথা মসজিদুল হারাম,মসজিদুন নবী ও মসজিদুল আকসা ব্যতীত অন্য কোন স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা কর না।’ (সহীহ বুখারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৩৬, কিতাবুস সালাত; সহীহ মুসলিম, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১২৬,কিতাবুল হজ্জ্ব)
তাদের উপস্থাপিত এই দলিলের জবাবে বলব,এই হাদীসে তিনটি স্থানকে ব্যতিক্রম ধরা হয়েছে অর্থাৎ আরবী ব্যকরণের ভাষায় ‘মুসতাসনা মিনহু’র অনুবর্তী। ‘মুসতাসনা মিনহু’ অর্থাৎ যার হতে ব্যতিক্রম করা হয়েছে তা দু’ধরনের হতে পারে।
প্রথমত মুসতাসনা মিনহু ‘مسجد من المساجد’ অর্থাৎ মসজিদসমূহের মধ্যে তিনটি মসজিদ ব্যতিক্রম। সেক্ষেত্রে হাদীসটির অর্থ হবে : মসজিদগুলোর মধ্যে তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্যগুলোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করা বৈধ ও জায়েয নয়।
দ্বিতীয়ত যদি ‘মুসতাসনা মিনহু’ স্থানসমূহ হয়,সেক্ষেত্রে স্থানসমূহের মধ্যে তিনটি মসজিদের উদ্দেশ্যে ছাড়া যাত্রা করা জায়েয নয়।
প্রথম অর্থে মহানবী (সা.)-এর কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রার ক্ষেত্রে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ মহানবীর কবর মসজিদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
দ্বিতীয় অর্থে নিষেধাজ্ঞা সার্বিক হয়ে পড়ে,সেক্ষেত্রে যে কোন ধরনের সফরই নিষিদ্ধ হয়ে যায়,এমনকি যদি তা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে নাও হয়। কোন ব্যক্তিই এরূপ নিষেধাজ্ঞায় বিশ্বাসী নয়।
তাই আমরা বলতে পারি,যদি হাদীসটি সহীহ ও সঠিক হয়ে থাকে তবে রাসূলের ঐ নিষেধ নিষিদ্ধ ঘোষক নয়,বরং উপদেশমূলক এ অর্থে যে,যেহেতু প্রত্যেক শহরেই মসজিদ রয়েছে তাই অন্য শহরের মসজিদের উদ্দেশ্যে যাত্রা বাঞ্ছনীয় নয় ও অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু আল্লাহর ওলীগণের কবর জিয়ারত এরূপ নয়। উপরন্তু তাঁদের কবর জিয়ারতের বরকত ও আধ্যাত্মিক ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আমরা পরবর্তীতে এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করব।
গাজ্জালী এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন : ‘সফর করা একটি মুস্তাহাব ইবাদত। যেমন আল্লাহর নবী,সাহাবী,তাবেয়ী,ওলীগণ ও আলেমদের কবর জিয়ারত। সার্বিকভাবে যে সকল ব্যক্তির জীবদ্দশায় তাঁদের হতে বরকত ও আধ্যাত্মিক ফায়দা লাভ করা যায় তাঁদের মৃত্যুর পরও কবর জিয়ারতের মাধ্যমে তাঁদের হতে বরকত ও ফায়দা লাভ করা যায়। তাই এ উদ্দেশ্যে যাত্রা বৈধ ও জায়েয। এ বিষয়টির সাথে মহানবী (সা.) হতে উদ্ধৃত হাদীসটির-তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করো না-কোন বৈপরীত্য নেই। কারণ হাদীসটি মসজিদ সম্পর্কিত এবং সকল মসজিদ মর্যাদার দিক থেকে পরস্পর সমান। তাই একটির উপর অপরটির কোন প্রাধান্য নেই যে,তার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে তিনটি মসজিদের শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশেষত্ব রযেছে,তাই সেগুলোর উদ্দেশ্যে যাত্রার ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা নেই। আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা এ বিষয়টি হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। (ইহইয়াউল উলুম,গাজ্জালী,২য় খণ্ড,পৃ. ২৪৭,সফরের আদব অধ্যায়)
ডক্টর আবদুল মালিক সাদী বলেছেন: ‘অন্য সকল মসজিদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা নিষেধ এজন্য যে,এরূপ কর্ম অর্থহীন যেহেতু সকল মসজিদের সওয়াব সমান,তিনটি মসজিদ ব্যতীত।’ (আল বিদআহ,ডক্টর আবদুল মালিক সাদী,পৃ. ৬০)
কবর জিয়ারত ও নারিগণ
ওয়াহাবীরা যদিও জিয়ারতের নিয়তে যাত্রা ব্যতীত কবর জিয়ারতকে পুরুষদের জন্য জায়েয মনে করে,কিন্তু নারীদের জন্য কোনভাবেই কবর জিয়ারত জায়েয মনে করে না।
দ্বীনি মাসয়ালার জবাব দানের জন্য গঠিত ওয়াহাবীদের স্থায়ী সদস্য কমিটি ঘোষণা করেছে ‘কবর জিয়ারত কেবল পুরুষদের জন্য জায়েয,তদুপরি তা সে উদ্দেশ্যে যাত্রার নিয়ত ব্যতীত হতে হবে। কিন্তু নারীদের জন্য কোন কবর জিয়ারত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (আল লাজনাতুদ দায়িমাহ,১ম খণ্ড,পৃ. ২৮৮)
শেখ আবদুল আজিজ বিন বায বলেছেন : ‘কবর জিয়ারত নারীদের জন্য জায়েয নয়। কারণ রাসূল (সা.) যে সকল নারী কবর জিয়ারতে যায় তাদের উপর অভিশাপ কামনা করেছেন।’ (মাজমুয়াতু ফাতাওয়া,বিন বায,২য় খণ্ড,পৃ. ৭৫৭)
অন্যত্র এই নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে বলেছে,‘যেহেতু নারীদের ধৈর্যশক্তি কম,সেহেতু তারা কবরের নিকট আবেগতাড়িত হয়ে মর্সিয়া পাঠ করে ও তাদের মুখ হতে ধৈর্যের পরিপন্থী কথা বেরিয়ে আসে।’ (মাজমুয়াতু ফাতাওয়া,বিন বায,২য় খণ্ড,পৃ. ৭৫৩,৭৫৪)
এই আপত্তির জবাবে আমরা বলব : প্রথমত এই ফতোয়া রাসূলের সাহাবীদের ফতোয়া ও আচরণনীতির পরিপন্থী। কারণ হযরত ফাতিমা (আ.) রাসূলের জীবদ্দশায় প্রতি শুক্রবার (জুমআর দিনে) হযরত হামজা (রা.)-এর কবর জিয়ারতে যেতেন। তিনি তাঁর পিতা রাসূলের ইন্তেকালের পর স্বীয় পিতার কবর জিয়ারতে নিয়মিত যেতেন। প্রথম ক্ষেত্রে স্বয়ং রাসূল (সা.) তাঁর এ কর্মে বাধা দেন নি। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে হযরত আলী (আ.) ও অন্যান্য সাহাবী তাঁকে নিষেধ করেন নি। ইবনে আবি মালিকা বলেছেন,‘আমি হযরত আয়েশাকে তাঁর ভ্রাতা আবদুর রহমান ইবনে আবু বকরের কবর জিয়ারতে নিয়মিত যেতে দেখতাম।’ (আল মুসান্নাফ,আব্দুর রাজ্জাক,৩য় খণ্ড,পৃ. ৫৭২;আস সুনান আল কুবরা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৩১)
দ্বিতীয়ত ‘হে আল্লাহ কবর জিয়ারতকারী নারীর উপর অভিশাপ বর্ষণ কর’- এ হাদীসটি সনদের দিক থেকে দুর্বল। যে তিনটি সনদে,যথা: হাসসান ইবনে সাবেত,ইবনে আব্বাস ও আবু হুরাইরা হতে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তিনটি সূত্রেই দুর্বল রাবী (হাদীস বর্ণনাকারী) রয়েছেন।
তৃতীয়ত এ হাদীস হযরত আয়েশা হতে বর্ণিত হাদীসের (রাসূল কবর জিয়ারত নিষেধ করেছিলেন,কিন্তু পরে অনুমতি দিয়েছেন) পরিপন্থী।
চতুর্থত যদি নারীদের কম ধৈর্যের কারণে কবর জিয়ারত হতে তাদের নিষেধ করা হয়ে থাকে তবে যে সকল নারীর ধৈর্য অধিক ও আপত্তিজনক কথা তাদের মুখ হতে বের হয় না,তাদের ক্ষেত্রে জিয়ারত নিষিদ্ধ নয়। কারণ হারাম হওয়ার প্রাথমিক শর্ত তাদের মধ্যে নেই। হারাম তখনই হবে যখন কোন জায়েয কর্ম নিশ্চিতরূপে মানুষকে হারামে ফেলে। তাই আহলে সুন্নাতের অনেক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিই নারীদের কবর জিয়ারকে ধৈর্যধারণের শর্তে জায়েয বলেছেন।
কবর জিয়ারতের ইতিবাচক প্রভাবসমূহ
কবর জিয়ারত মানুষকে কোন অন্যায়ে তো ফেলেই না,বরং কোন কোন হাদীসে এর কল্যাণমূলক প্রভাবের কথা উল্লিখিত হয়েছে। এখানে আমরা এরূপ কয়েকটির প্রতি ইশারা করছি :
১। জিয়ারতকারীর মধ্যে বিনয় সৃষ্টি করে এবং মৃত্যু ও আখেরাতের স্মরণ করায়;সন্দেহ নেই মৃত ব্যক্তিদের কবর জিয়ারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো আখেরাতের স্মরণ।
মুসলিম,আহমাদ ইবনে হাম্বাল,ইবনে মাজা এবং অন্যান্য হাদীসগ্রন্থ প্রণেতা নিজ নিজ সূত্রে রাসূল (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন,‘তোমরা কবর জিয়ারতে যাও,কেননা তা তোমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’(সহীহ মুসলিম,২য় খণ্ড,পৃ. ৩৬৫,হাদীস নং ১০৬;মুসনাদে আহমাদ,৩য় খণ্ড,পৃ. ১৮৬,হাদীস নং ৯৩৯৫;সুনানে ইবনে মাজা,১ম খণ্ড,পৃ. ৫০১,হাদীস নং ১৫৭২)
২। মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া : এ বিষয়টি একটি উন্নত নৈতিক পদ্ধতি যা মৃত্যুর পরও সমাজে একজন মুসলমানের মর্যাদাকে রক্ষা ও সমুন্নত রাখার প্রমাণ বহন করে। উপরন্তু সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ,ভালোবাসা,পারস্পরিক সম্প্রীতি ও অধিকার রক্ষার মনোবৃত্তিকে জাগরুক রাখে।
মহানবী (সা.) বলেছেন,‘তোমাদেরকে আমি কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন হতে তোমরা কবর জিয়ারত কর এবং তাদের জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা কর।’(আল মোজামুল কাবির,তাবরানী,২য় খণ্ড,পৃ. ৯৪,হাদীস নং ১৪১৯)
৩। মৃতের অধিকার রক্ষা : নিঃসন্দেহে কোন কোন মৃত ব্যক্তি জীবিতদের উপর বিশেষ অধিকার রাখেন। এই অধিকারের দাবী হলো জীবিতরা তাঁদের কবর জিয়ারত করবে। ইমাম রেজা (আ.) বলেছেন,‘প্রতি ইমামের তাঁদের অনুসারীদের উপর অধিকার ও প্রতিশ্রুতি রয়েছে যা পালনের সর্বোত্তম পন্থা হলো তাঁদের কবর জিয়ারত।’(তাহজীবুল আহকাম,৬ষ্ঠ খণ্ড,পৃ. ৭৮-৭৯,হাদীস নং ৩)
আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারতের দর্শন
আল্লাহর ওলীদের বিশেষত মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ইমামদের কবর জিয়ারতের বিশেষ আধ্যাত্মিক প্রভাব ও বরকত রয়েছে। এখানে আমরা আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারতের কিছু আত্মিক প্রভাবের উল্লেখ করছি:
১। আল্লাহর ওলী ও ধর্মীয় ব্যক্তিগণ প্রকৃতপক্ষে সকলের আদর্শ যাদের অনুসরণের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য লাভ ও পূর্ণতায় পৌঁছা যায়। শুধু মুসলিম সমাজেই নয়,বরং যে কোন সমাজেই তাঁদের অনুসরণীয় ব্যক্তিদের মহৎ হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস চালায় যাতে করে অন্যরাও তাঁদের অনুসরণের মাধ্যমে পূর্ণতা ও সাফল্যের পথে পা রাখতে পারে। যদিও এই অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গ জীবিত নেই কিন্তু তাঁদের কবর ও স্মৃতি সৌধে গমনের আহ্বান তাঁদের পথে চলতে অন্যদের অনুপ্রাণিত করে।
অনেক দেশেই কোন বিশেষ চত্বর বা ভাস্কর্যকে নাম না জানা আত্মত্যাগী সৈনিকদের নামে নামকরণ করা হয়। কারণ তারা দেশ প্রেমের প্রতীক এবং এ পথে নিজ জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছে। এ কর্মের মাধ্যমে ঐ জাতি চায় নতুন প্রজন্মকে তাদের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বহিঃশত্রুর হাত হতে দেশ রক্ষার মহান ব্রত নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
জাতির মহান ব্যক্তিবর্গ ও আদর্শ নেতাদের কবরের নিকট যাওয়ার বিশেষ আত্মিক প্রভাব রয়েছে মনস্তত্ত্ববিদগণ এ বিষয়ের উপর বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছেন।
আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ বলেছেন : সময়ের পরিক্রমায় এমন দিন আসল যখন হুসাইন (আ.)-এর জন্য সকল পথ রুদ্ধ করে কারবালার দিকে যেতে তাঁকে বাধ্য করা হল। আজ পর্যন্ত কারবালার ইতিহাস ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে,প্রকৃত প্রস্তাবে তা মানবজাতির ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়েছে।
কারবালা বর্তমানে এমন এক স্থানে পরিণত হয়েছে,যেখানে মুসলমানগণ শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে জিয়ারতে যায়। এমনকি অমুসলমানরাও সেখানে ভ্রমণ ও দর্শনের উদ্দেশ্যে যায়। কিন্তু কারবালার অধিকার তখনই আদায় হবে যখন তা মানুষের জন্য পবিত্রতা ও মর্যাদায় বিশ্বাসী প্রতিটি ব্যক্তির জিয়ারতের স্থানে পরিণত হবে। কারণ আমার এমন কোন স্থানের কথা জানা নেই যা কারবালার ন্যায় মানবতার সকল মর্যাদাপূর্ণ ও ইতিবাচক সুন্দর দিকের স্মৃতি বহন করছে এবং এ বৈশিষ্ট্য সেটি ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের মাধ্যমে অর্জন করেছে। (আবুশ শুহাদা,আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ,পৃ. ১২৯)
২। জিয়ারত ভালবাসার প্রকাশ ও প্রতিচ্ছবি সন্দেহ নেই। আহলে বাইতের ভালবাসা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের উপর ওয়াজিব। মহানবী (সা.) বলেছেন : أحبُّوا اهل بیتی لِحُبّی ‘আমার আহলে বাইতকে আমার ভালবাসার কারণে ভালবাস।’(মুসতাদরাকে হাকিম,৩য় খণ্ড,পৃ. ১৪৯)
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ভালবাসা যেমনি ওয়াজিব তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ভালবাসাও তদ্রুপ ওয়াজিব। আমরা জানি ভালবাসার অবশ্যই প্রকাশ আছে যা শুধু তাঁদের আনুগত্য ও আন্তরিক ভালোবাসা পোষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের কবর জিয়ারতও ঐ আন্তরিক ভালোবাসার প্রকাশ।
৩। মহানবী (সা.) আহলে বাইতের পবিত্র ব্যক্তিদের কবর জিয়ারত তাঁর রেসালতের দায়িত্বে একরূপ বিনিময় স্বরূপ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
(قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى)
“(হে নবী!) বলুন,আমি আমার রেসালতের দায়িত্বের বিনিময় স্বরূপ আমার নিকটাত্মীয়ের ভালবাসা ব্যতীত কিছুই চাই না।”( সূরা শুরা : ২৩)
রাসূলের নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা পোষণের অন্যতম প্রকাশ হলো তাঁদের কবর জিয়ারত।
৪। আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারত তাঁদের অনুসৃত পথের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের গভীরতার নিদর্শন।
৫। আল্লাহর ওলিগণের কবর জিয়ারত বাস্তবিক ভাবে তাঁদের সঙ্গে নতুন করে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হওয়া যে,তাঁদের আদর্শ ও পথকে আমরা চিরজাগরুক রাখব। আমরা জানি আহলে বাইতের ইমামগণ আমাদের উপর অধিকার ও অভিভাবকত্ব রাখেন। তাই আমাদেরও উচিত তাঁদের অভিভাবকত্ব ও আমাদের উপর অধিকারকে মেনে নিয়ে তাদের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া। এই প্রতিশ্রুতি শুধু মুখে ঘোষণার মাধ্যমে নয়,বরং নিজেদের কর্মের মাধ্যমে এই আন্তরিক প্রতিশ্রুতির প্রকাশ ঘটাব। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁদের কবর জিয়ারত ও তাঁদের রওজায় উপস্থিতির মাধ্যমে এই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি ঘটাব। এ কারণেই ইমাম রেজা (আ.)-এর হাদীসে এসেছে- নিশ্চয়ই প্রতি ইমামের তাঁদের অনুসারীদের উপর অধিকার ও প্রতিশ্রুতি রয়েছে যা রক্ষা ও পালনের সর্বোত্তম পন্থা হলো তাঁদের কবর জিয়ারত করা।’ (তাহজীবুল আহকাম,৬ষ্ঠ খণ্ড,পৃ. ৭৮-৭৯)
৬। আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারত মানুষের আধ্যাত্মিকতাকে বৃদ্ধি করে ও হৃদয়ে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে।
৭। আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারত তাঁদের সন্তুষ্টির কারণ হয় এবং তাঁদের দোয়ার ফলে ঐশী বরকত জিয়ারতকারীর উপর অবতীর্ণ হয়।
৮। ওলিগণের কবরের নিকটে গেলে তাঁদের ঐতিহাসিক অবদান ও আত্মত্যাগের কথা সকলের স্মরণ হয় যা তাঁদের অনুসৃত পথে চলার দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে তাদের উদ্বুদ্ধ করে।
৯। সর্বোপরি তাঁদের কবর জিয়ারত তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সন্ধির এবং তাঁদের শত্রুদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা স্বরূপ।

