Press "Enter" to skip to content

ওহাবী ওরফে সালাফিদের উৎপত্তির ইতিহাস- ১

ইয়াসীর আরাফাত হিন্দি

নজদের ইতিবৃত্ত

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলিমজাহানের প্রাণকেন্দ্র জাজিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপের ‘নজদ’ অঞ্চলে ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক বিপ্লব, যা পরবর্তী সময়ে মুসলিমবিশ্ব, বিশেষ করে আরব উপদ্বীপের মুসলিমদের ওপর সুদূপ্রসারী প্রভাব ফেলে। ওই সময়টি ছিল, বিশ্ব-ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। খিলাফতসমূহের অন্যতম-উসমানি খিলাফতের সূর্য তখন প্রায় ছয় শতাব্দীব্যাপী সগৌরবে কিরণ ছড়ানোর পর ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। ক্রমশ নুয়ে পড়ছিল প্রায় হাজার বছরের ইসলামি খিলাফত ও সভ্যতার গৌরবময় মিনার। সাম্রাজ্যের ভেতরে-বাইরে চলছিল গভীর ষড়যন্ত্র। চলছিল উসমানি খিলাফতের মজবুত প্রাসাদটি ভেঙে ফেলার গোপন পরিকল্পনা। একই সঙ্গে চলছিল ইসলামি বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার মহার্ঘ আয়োজন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে ইউরোপে ঘটে যাওয়া শিল্পবিপ্লব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে, পরিবর্তন আনে ইউরোপীয় রাজনীতিতে। এতদিন যারা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস আর দুর্নীতির অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, শিল্পবিপ্লবের ফলে এখন তারা নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করল। ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লবের বিষয়টি ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। ইতিহাসবিদ কার্লো সিপোল্লার ভাষায়, ‘কোনো বিপ্লবই শিল্পবিপ্লবের মতো নাটকীয় ছিল না।(আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস, জীবন মুখোপাধ্যায়)

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের (১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দ) ফলে কৃষি ও বাণিজ্যব্যবস্থা থেকে শুরু করে সব স্তরে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর সমুদ্রযাত্রা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের পথ খুলে দেয়। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে ইউরোপীয়রা প্রযুক্তির দিক দিয়ে অন্যদের থেকে এগিয়ে যেতে শুরু করে।

এ সময় তারা নতুন করে বিশ্ব শাসনের ইচ্ছা পোষণ করতে থাকে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো পুরো বিশ্বের ওপর একচ্ছত্র প্রভাব ও কর্তৃত্ব স্থাপনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে; কিন্তু তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় উসমানি খিলাফত ও ইসলাম। উসমানি খিলাফতের বিশালতা, ঐক্য ও নির্ভিকতা তাদের সর্বদা আতঙ্কিত করে রেখেছিল। সে কারণে তারা ইসলাম ও উসমানি খিলাফতের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়; কিন্তু উসমানিদের ঐক্য তাদের হতাশ করতে থাকে। তখন এক ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রতিনিধি ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সে পবিত্র কুরআন হাতে নিয়ে বলেছিল, ‘ইউরোপকে মনে রাখতে হবে, কুরআন যতদিন মুসলিমদের দিকনির্দেশক হয়ে থাকবে, আমরা ততদিন তাদের দেশসমূহে ঔপনিবেশিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারব না।’ ফলে পশ্চিমারা মুসলিম সাম্রাজ্য, ইসলাম এবং সর্বোপরি মুসলিমদের ঐক্যের বিনাশ কীভাবে ঘটানো যায়, সে উপায় খুঁজতে থাকে। তারা বুঝে নেয়, মুসলিমদের ঐক্য ধ্বংস আর উসমানিদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য নষ্ট করতে না পারলে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার ওপর থেকে তাদের কর্তৃত্ব খর্ব করা সম্ভব নয়। এ ভাবনার সিঁড়ি বেয়েই মুসলিমদের ঐক্য ধ্বংস করতে তারা ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসি প্রয়োগ করে।

এ পলিসির মাধ্যমে উসমানি খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ ও যুদ্ধের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। ফলে একদিকে বলকান অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। (রাশিয়া ও পশ্চিমাদের উসকানিতে এ অঞ্চলে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়, ইতিহাসে তা ‘পূর্বাঞ্চলীয় সমস্যা’ বা The Eastern Question নামে পরিচিত।) অপরদিকে উসমানিদের আরবিয় ‘ওলাআত’ বা প্রদেশগুলোতে জাতীয়তাবাদীদের উৎপাত ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে মিসরে মুহাম্মাদ আলি পাশার ক্ষমতায়নের পর মিশরিয় শাসননীতিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনেন। এ সময় মিশর খিলাফত থেকে অনেকটা স্বাধীন হয়ে পড়ে। স্বল্পদিনে মিসর হয়ে ওঠে উসমানিবিরোধী ‘আরব জাতীয়তাবাদের’ আখড়া। সেখান থেকে উগ্র-জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে থাকে সমগ্র আরবে।

এমন এক কঠিন সময়ে অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে নজদে উত্থান ঘটা ওয়াহাবি বিপ্লব হিজাজে উসমানি শাসনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। তথাকথিত তাওহিদ প্রতিষ্ঠার স্লোগান তুলে হিজাজ ও নজদে শুরু হওয়া এ বিপ্লবটি এক সময় পরিণত হয় ব্রিটিশদের হাতের পুতুল। ফলে ব্রিটিশরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে উসমানি খিলাফতের বিরুদ্ধে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে।

কোনো বিপ্লবের ইতিহাস জানতে এর উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে ধারণা রাখার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, বিপ্লবের উৎপত্তির কারণ, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের ওপর উৎপত্তিস্থলের বড় প্রভাব থাকে। সে ক্ষেত্রে উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে না জানলে-জানাটা অপূর্ণ থেকে যায়। কাজেই ওয়াহাবি বিপ্লবের ইতিহাস জানতে এর উৎপত্তিস্থল নজদ সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা রাখা জরুরি। এ অধ্যায়ে আমরা নজদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরব।

এর আরব উপদ্বীপ হলো, ইসলামের নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ জন্মভূমি। ষষ্ঠ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আরবের প্রাণকেন্দ্র মক্কার বুকে যে নুরের স্ফুরণ ঘটে, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তা ছড়িয়ে পড়ে দিক দিগন্তে। সে নুরের স্পর্শে বর্বর, হিংস্র একটি জাতি চরিত্র ও সভ্যতায় হয়ে ওঠে অনন্য। একপর্যায়ে তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত বিজয়ের মাধ্যমে এমন একটি সাম্রাজ্যের জন্ম দিয়েছিল, যা প্রথম সহস্রাব্দের শেষ ভাগ থেকে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষ ভাগ পর্যন্ত হাজার বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, জ্বালিয়েছিল শিক্ষা ও সভ্যতার দীপ্ত মশাল। ইতিহাসে এ সভ্যতাটি ইসলামি সভ্যতা নামে পরিচিত।

ইসলামের এ স্বর্ণালী সভ্যতার কথা বলতে গিয়ে ইতিহাসবিদ ফিলিপ কে. হিট্টি বলেছেন, ‘মধ্যযুগে আরব ও আরবি বলা মানুষেরা মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে যে ভূমিকা পালন করেছিল, অন্য কেউ তা পারেনি।”( History of the Arabs by Phillip K Hitti, pg. 4)

পশ্চিম ইউরোপ থেকে শুরু করে পূর্বে দক্ষিণপূর্ব এশিয়াজুড়ে সুবিস্তৃত ইসলামি সাম্রাজ্য জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি, প্রযুক্তিসহ সব ক্ষেত্রেই বিশ্বকে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে দেয়; যার কাছে রোম, ব্যাবিলন, গ্রিক, ভারত এবং পারসিক সভ্যতাও ম্লান হয়ে যায়। এ সোনালি সভ্যতার বিকাশ এবং বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরব বীরদের চূড়ান্ত সাফল্যের পেছনে যেসব বিষয় মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তার একটি হলো রাজনৈতিক পারদর্শিতা। এ সময় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য থেকে মানুষ চাকরি, শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞান আহরণের জন্য পাড়ি দিত মদিনা, দামেশক, বাগদাদ, কর্ডোভা, বুখারা, ইসফাহান ও ইসতাম্বুলের মতো জ্ঞান-নগরীগুলোতে। মুসলিম সাম্রাজ্যে অমুসলিমদের জন্য ছিল অবাধ স্বাধীনতা। অন্যদিকে অমুসলিম শাসিত রাষ্ট্রসমূহ থেকে নিরাপত্তার অভাবে মুসলিম খিলাফতে পালিয়ে আসত অমুসলিমরা।

ভারতীয় ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মুসলিম খিলাফতে অমুসলিমদের অবাধ স্বাধীনতার বিষয়ে সুন্দর লিখেছেন, ‘শাসনকার্য সম্পাদনের জন্য মুসলিম খলিফারা ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানদের মতো অমুসলিম ও অনারব বিশেষত ইরানিদের -যাদের অধিকাংশই ছিল জরাথ্রুস্টবাদী ও বৌদ্ধ- নিয়োগ দিতে কোনো প্রকার দ্বিধা করতেন না। আব্বাসি খলিফারা ধর্মভীরু মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও সব ক্ষেত্রে অমুসলিম ও অনারবদের শিক্ষার জন্য খিলাফতের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, যতক্ষণ-না তারা ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াত। বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ ইসলামি খিলাফতে স্বাধীনভাবে ভ্রমণ করত এবং যেখানে চাইত সেখানে বসবাস করতে পারত। ওই সময় এমন স্বাধীনতা চার্চের কঠোর আচরণের জন্য ইউরোপেও মেলা ভার ছিল।”( A History of Mediaeval India by Satish Chandra: 6/8)

মধ্যযুগীয় আরবি সভ্যতা নিয়ে বিষদ আলোচনা ইসলামের ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। যাইহোক, এ মহান ইসলামি সভ্যতার জন্মদাতা আরবদের পরিচয় আমাদের জেনে রাখা দরকার। জাতিগতভাবে আরবরা হলো, সামীয়(Semetic) জাতিগোষ্ঠীর একটি শাখা। সেমেটিক বলা হয়, নুহ আ.-এর ছেলে সাম ইবনে নুহের বংশধরদের। এরা যে ভাষায় কথা বলত, তা সামীয় ভাষাগোষ্ঠী নামে পরিচিত।

আরবি জাতিগোষ্ঠীকে ইতিহাসবিদ ও কুলাচার্যরা (Genealogists) প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো, বায়িদা, আরিবা এবং মুসতারিবা। এ তিন ভাগের উৎপত্তি নূহ আ.-এর ছেলে সামের বংশ থেকে। বায়িদা বা ‘আল-আরবুল বায়িদা’ বলা হয়, ওই সমস্ত আরব জাতিকে, যারা ধরাবক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আগমনের আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বায়িদ শব্দটির অর্থ হলো ধ্বংসপ্রাপ্ত। এরা যেহেতু আল্লাহর আজাব বা অন্যান্য কারণে ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই এদের বলা হয়, ‘আল-আরবুল বায়িদা’। এদের মধ্যে রয়েছে, আদ, সামুদ, আমালেক, জিদ্দিস, তাসম প্রভৃতি। আদ ও সামুদের নাম দুটি ইতিহাসে বিখ্যাত। সামুদ হলো, খোদাদ্রোহী একটি জাতি, যারা আল্লাহর আজাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল; যাদের বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এসেছে। সালিহ আ.-এর আদেশ অস্বীকার করাতে এরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। আর আদ জাতি ধ্বংস হয়েছিল হুদ আ.-এর আদেশ অমান্য করার কারণে। সম্ভবত প্রাচীন হাজারামাউত ছিল এদের প্রাণকেন্দ্র। আমালেকার বর্ণনা পবিত্র কুরআন ও বাইবেলে এসেছে। তাফসির ও বাইবেল থেকে জানা যায়, আল্লাহর অবাধ্য এ শক্তিশালী জাতিকে ইউশা ইবনে নুন (Jousha) ও কালিব আ. পরাস্ত করেছিলেন।

দ্বিতীয় প্রকার হলো, ‘আল-আরবুল আরিবা’, এরা হলো খাঁটি আরব। আরিবা বলা হয় মূলত দক্ষিণ ইয়ামেনের কাহতানিদের। এরা প্রাচীন যুগ থেকে আরব উপদ্বীপের বুকে বসবাস করে আসছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, কাহতানি বংশের ইয়ারুব ইবনে কাহতানের নামানুসারে আরবিয়দের ভাষাকে আরবি নামকরণ করা হয়। ইয়ারুবকে আবুল আরব বা আরবদের পিতাও বলা হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে এরা হিমইয়ার ও কাহলান নামে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। এরপর এদের থেকে আরও শাখা-প্রশাখার জন্ম হয়।

তৃতীয় প্রকার হলো মুসতারিবা। এরা ছিল নুহ আ.-এর প্রপৌত্র সালিহ বা সালিখের ছেলে আবিরের (Eber) বংশধর। বিভিন্ন জায়গা থেকে এরা আরবে আসে এবং নিজেদের আরবিকরণের মাধ্যমে, আরবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে বিধায় এদের মুসতারিবা নামে নামকরণ করা হয়। উত্তরের হিজাজ ও নজদজুড়ে ছিল এদের বসবাস।

অতএব দেখা যাচ্ছে, ইয়ামেন হলো খাঁটি আরবদের দেশ। ইয়ারুব ইবনে কাহতান থেকে যে বংশধারা পরবর্তীকালে বিকশিত হয়, তা কাহতানি নামে পরিচিত। আর উত্তর-আরবরা অর্থাৎ, মুসতারিবা আরবরা পরিচিত আদনানি নামে, যা বংশপরম্পরায় ইবরাহিম আ.-এর ছেলে ইসমাইল আ. পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ আদনানিদের মধ্য থেকে কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন সাইয়িদুনা রাসূলুল্লাহ।

ভৌগোলিক তথ্য ও উপাত্তের নিরিখে জাজিরাতুল আরবকে ভূতত্ত্ববিদরা প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করেছেন, আন-নুফুদ, আদ-দাহনা ও আল-হাররা। উত্তর-আরবে সুবিস্তীর্ণ ঈষৎ রক্তিম ও শ্বেতবর্ণের যে বালুকাসিন্ধু রয়েছে, তা আন-নুফুদ নামে পরিচিত। প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ৬০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এ মরুসমুদ্রের চারিদিকে বালু ও মরীচিকায় পূর্ণ। মাঝেমধ্যে সেখানে দেখা যায় মরুসিংহের আনাগোনা। মেঘলা দিন, মহাকবি লাবিদের দাক্কুর রাওয়ায়িদ (মেঘগর্জনের ঘনঘটা), রিহাম (ঝিরঝিরে বৃষ্টি) অথবা জাওদের (ঝমঝমে বৃষ্টি) বিলাসিতা সেখানে দেখা যায় না। বছরে একবার বা দুবার বৃষ্টি তার মুখ দেখায়। নুফুদের চারদিকে ধু-ধু করা বালি ও ক্যাকটাসগাছ ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। তবে মাঝেমধ্যে রয়েছে মরূদ্যান; যেখানে খেজুর, সবজি, বার্লি প্রভৃতির চাষবাস হয়।

উত্তরে আন-নুফুদ থেকে দক্ষিণে আর-রাবুল খালির সীমান্ত পর্যন্ত বালুকাময় অঞ্চলটি আদ-দাহনা নামে পরিচিত। প্রায় হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত এ এলাকাটি আল-আহসা প্রদেশ ও নজদের মধ্যে বিভক্তিরেখা হিসেবে বিরাজ করছে। মরুভূমির মাঝেমধ্যে পাওয়া যায় এবড়োখেবড়ো গভীর খাদ। এ খাদগুলোর কিছু কিছুকে আরবরা কুয়া হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়া তরঙ্গায়িত লাভাময় অঞ্চলটি আল-হাররা নামে পরিচিত।

এ বিশাল মরু অঞ্চলের একপ্রান্তে অবস্থিত ইতিহাসপ্রসিদ্ধ নজদ, যাকে ওয়াহাবিভূমিও বলা হয়ে থাকে। চুনাপাথরময় নজদের চারিদিকে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে মরুখণ্ড। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামি সাহিত্যের (Semetic Literature) স্বনামধন্য অধ্যাপক ফিলিপ কে. হিট্টি নজদের ব্যাপারে লেখেন,

Within this ring of desert and steppe lies an elavated core, Nejd, the Wahhabiland. In Nejd the limestone has long been generally exposed; here and there are occasional strips of sand. (History of the Arabs by Phillip K Hitti: 17)

নজদ অঞ্চলটি জাজিরাতুল আরবের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে গঠিত।

নজদ বলতে ঠিক কোন অঞ্চলটিকে বোঝানো হয়, এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের বিস্তর মতভেদ রয়েছে। কারও মতে নজদ হলো, ইয়ামামা, যে অঞ্চলটি সৌদিআরব ও ইয়ামেন সীমান্তে বর্তমানে নজদ নামে পরিচিত, তা-ই নজদ। আবার কেউ বলেন, ইরাককে নজদ বলা হয়। তবে সঠিক এবং প্রণিধানযোগ্য মত হলো, সুদূর হিজাজ প্রদেশের সীমান্ত থেকে ইরাক এবং ইয়ামেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত উচ্চভূমি হাজবাতু নজদ বা নজদ উচ্চভূমি নামে পরিচিত। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে নজদকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়। পূর্ব নজদকে বলা হয়, নিম্ন নজদ বা নজদুস সুফলা এবং পশ্চিম নজদকে বলা হয়, উচ্চ নজদ বা নজদুল উলয়া।

প্রখ্যাত ইরাকি ভাষাতত্ত্ববিদ ইবনে আরাবি র. নজদের সীমানা নির্ণয়পূর্বক বলেন, ‘নজদ হলো, দুটি নামের সমষ্টি-উচ্চ নজদ ও নিম্ন নজদ। নিম্ন নজদ হলো, ইরাকের কাছে একটি অঞ্চলের নাম এবং উচ্চ নজদ হলো, হিজাজ ও তিহামার নিকটবর্তী অঞ্চলের নাম। “( বিলাদুল আরব, ইমাম ইসফাহানি: ৩৩৬)

আরেক ভাষাতত্ত্ববিদ আসমায়ি র. বলেন, ‘আপনি যদি বসরা প্রান্তস্থ আজলাজে পৌঁছে যান, তাহলে ধরে নেবেন নজদে পৌঁছেছেন। আর কুফা প্রান্তস্থ সামিরা ইত্যাদি অঞ্চলে পৌঁছুলে ধরে নেবেন নজদে পৌঁছেছেন।’

বিশিষ্ট গবেষক জুহানির আলোচনা থেকেও নজদ সম্পর্কে এ ধারণাটি পরিস্ফুট হয়। তিনি বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা নজদকে দুভাবে ভাগ করেছেন, পশ্চিম অংশ, যা স্থানগতভাবে আলিয়াতু নজদ (বা উচ্চ নজদ) নামে পরিচিত; আর পূর্ব নজদ, যেটা স্থানগতভাবে সাফিলাতু নজদ (বা নিম্ন নজদ) নামে পরিচিত। “( দ্য হিস্ট্রি অব নজদ: ৪৮)

ইবনে খালদুনও তাঁর গ্রন্থে এমন মত দিয়েছেন। মোটকথা, নজদ বলতে বোঝায় ইরাকের বসরা থেকে হিজাজ এবং সিরিয়া থেকে ইয়ামেন পর্যন্ত বিস্তৃত উচ্চভূমিকে।

নিম্ন নজদ বা নাজদুস সুফলার মধ্যে পড়ে ঐতিহাসিক আল-ইয়ামামা; যেখান থেকে ইসলামি সভ্যতার সূচনালগ্নে মুসায়লামাতুল কাজ্জাবের আবির্ভাব ঘটে। পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চল থেকে একাধিক খারিজি দলও মাথাচাড়া দেয়। আলোচ্য ওয়াহাবি মতবাদেরও অভ্যুদয় ঘটে এখান থেকেই।

ইয়ামামার ইতিহাস সুপ্রাচীন হলেও ততটা সমৃদ্ধ নয়। ঐতিহাসিক ভাষ্যে জানা যায়, প্রাচীন যুগ থেকে ইয়ামামা ছিল জাজিরাতুল আরবের সব থেকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাসমূহের একটি।

জাহিলি যুগে অথবা তারও আগে নজদে প্রধানত দুটি গোত্রের বসবাস ছিল-তাসম ও জিদ্দিস। সাম্প্রতিক গবেষণামতে গোত্র দুটি পরবর্তী সময়ে বিলুপ্ত হয়ে যায় বিধায় তাদের বায়িদা গোত্রসমূহে গণ্য করা হয়। এ গোত্র দুটি পেশায় ছিল রাজমিস্ত্রি ও কৃষক। কথিত আছে, এরা সর্বদা পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল এবং এ দ্বন্দ্বই এক সময় তাদের ধ্বংস ও বিপর্যয় ডেকে আনে। আনুমানিক ৫০০ শতাব্দীতে জনৈক হিমইয়ারি (Himyarite) রাজা ইয়ামামায় আক্রমণ করেন। ফলে অন্যদের মতো তাসম আর জিদ্দিসও বিধ্বস্ত হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।

ইয়ামামায় বনু হানিফা, বনু আফলাজ, বনু তামিম প্রভৃতি গোত্রের বসবাস ছিল। ইসলামি যুগের প্রায় দুই শতাব্দী আগে হিজাজ, উচ্চ নজদ অঞ্চল থেকে বনু ওয়াইল ও বনু বকর নামের বড় দুটি গোত্র ইয়ামামা ও বাহরাইনে হিজরত করে। একসময়কার তাসম ও জিদ্দিসদের নীড় ইয়ামামার সমৃদ্ধ অঞ্চলে গড়ে ওঠে এদের কেল্লা। পরে এ দুই গোত্র থেকে উৎপত্তি ঘটে বনু হানিফা, বনু ইয়াশকুর, বনু সালাবাসহ বহু গোত্র-উপগোত্রের। ইয়ামামার দক্ষিণ অঞ্চলটি ছিল চাষ-উপযোগী। সেখানকার কিছু এলাকার অধিবাসীদের বংশানুক্রমিক মূল পর্যন্ত পৌঁছায়নি বিধায় এসব এলাকাকে আফলাজ; আর এর অধিবাসীদের বনু আফলাজ বলা হয়। পরবর্তী সময়ে এদের থেকে বনু কাব, বনু উকাইলসহ বহু গোত্র-উপগোত্র আরবের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

ইয়ামামা অঞ্চলের পশ্চিম ও দক্ষিণ ভাগে ছিল বিখ্যাত তামিম গোত্রের বসবাস। এ ছাড়া সাদির, আল-ওয়াশম এবং দক্ষিণপূর্ব আল-কাসিম এলাকাতেও তাদের বসবাস ছিল। বনু তামিম বিষয়ে হাদিসে সতর্কবাণী এসেছে। হাদিসের বর্ণনায় এ গোত্র থেকে খারিজিদের উদ্ভবের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ একজন তামিমি সম্পর্কে বলেছিলেন, “…ওকে যেতে দাও। তার কিছু সঙ্গী-সাথি রয়েছে-তোমাদের কেউ তাদের সালাতের তুলনায় নিজের সালাত এবং তাদের সিয়ামের তুলনায় নিজের সিয়ামকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন তিলাওয়াত করবে; কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালির নিম্নদেশে (হৃদয়ে) প্রবেশ করবে না। তারা দীন থেকে এত দ্রুত বেরিয়ে যাবে, যেমন তীর শিকার ভেদ করে বেরিয়ে যায়…। “( সহিহ বুখারি: ৩৬১০; সহিহ মুসলিম: ১০৬৪)

খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর যুগে সংঘটিত রিদ্দার যুদ্ধে মুসলিমবাহিনীর বিপক্ষে মুরতাদবাহিনীর হয়ে বনু তামিম মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ওয়াহাবি মতাদর্শের জনক ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদিসহ একাধিক খারিজি নেতা বনু তামিম থেকেই আবির্ভূত হন। অবশ্য নজদির তামিমি হওয়া নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে তিনি আরবের বনু তামিম গোত্র থেকে উদ্ভূত হয়েছেন, আবার কোনো কোনো ঐতিহাসিক তাঁকে তুর্কির বুরসা নগরীর এক ইয়াহুদি বংশোদ্ভূত তামিম নামক ব্যক্তির বংশধর হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, তার দিকে নিসবত করে তাঁকে তামিমি বলা হয়।

প্রথম ইসলামি যুগে ইয়ামামায় সর্বাধিক প্রভাব ছিল বনু হানিফার; কিন্তু ১১ হিজরিতে সংঘটিত রিদ্দার যুদ্ধে বনু হানিফা খিলাফতের বিরুদ্ধে শত্রুদের হয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। সে যুদ্ধে চরমভাবে পর্যদুস্ত হলে তাদের ক্ষমতায় ভাটা আসে এবং ইয়ামামায় তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। নজদ ও ইয়ামামা খিলাফতের অধীনে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও তারা ব্রাত্য হয়ে পড়ে; কিন্তু বনু হানিফা তাদের পরাজয়ের গ্লানি সহজে ভুলতে পারেনি।

আমিরুল মুমিনিন মুআবিয়া রা.-এর ইনতিকালের পর খিলাফতে রাজনৈতিক যে অস্থিরতা ও ডামাডোল শুরু হয়, এর সদ্ব্যবহার করে বনু হানিফার নাজদা ইবনে আমির হানাফি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বনু হানিফার দিকে সম্বন্ধ করে তাকে ‘হানাফি’ বলা হতো। সে ছিল নাজদাত নামক খারিজি দলের নেতা। আনুমানিক ৬৪ হিজরির দিকে সে ইয়ামামাবাসী ও বনু হানিফাকে তার আনুগত্যে রাজি করায়। এরপর তথাকথিত তাওহিদ প্রতিষ্ঠার নামে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। একে একে আফলাজ, বাহরাইন, ওমান, ইয়ামেন, হাজরামাউতসহ বিভিন্ন এলাকায় সে অভিযান চালায় এবং সেসব জায়গায় তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এমনকি পবিত্র আরাফাতের ময়দানে নাজদাতের পতাকা উড্ডীন হয়; কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই উমাইয়া শাসক এদের বিদ্রোহ দমাতে উদ্যত হলে তাদের তৎপরতায় ভাটা আসে। ৭২ হিজরিতে নাজদা হানাফিকে তারই অনুসারী আবু ফুদাইক হত্যা করে।

পরবর্তী বছর উমাইয়া সেনাবাহিনী বনু হানিফার ওপর আক্রমণ করে আবু ফুদাইককে হত্যা করে। ফলে নাজদাত বিপ্লবের কফিনে শেষ পেরেকটি ঢুকে যায়।

এরপর খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান নজদে উমাইয়া শাসন মজবুত করার লক্ষ্যে প্রবল প্রতাপশালী ব্যক্তি ইবরাহিম ইবনে আরাবি কিনানিকে ইয়ামামার শাসক নিযুক্ত করেন। ইবনে আরাবি কঠোরভাবে বিদ্রোহীদের দমন করেন। এমনকি সেখানে বিদ্রোহী ও চোরদের জন্য একটি কারাগারও নির্মাণ করেন।

আব্বাসি খিলাফতের যুগ ছিল ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগ। এ যুগ অন্যান্য অঞ্চলের মতো নজদে বিশেষত ইয়ামামার ইতিহাসেও উন্নয়ন ও বিকাশের যুগ ছিল। আব্বাসিরা ক্ষমতায় এসে হাশিমি বংশের সিররি ইবনে আবদুহ হাশিমিকে নজদে পাঠায়। ইবনে আবদুল্লাহ ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসক। তাঁর ক্ষমতায়ন এবং নজদে আব্বাসিদের শাসন কায়িমের পর থেকে দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দী পর্যন্ত সেখানে তেমন কোনো বিদ্রোহ বা আপদের উৎপত্তি ঘটেনি।

তৃতীয় হিজরি শতাব্দীর প্রথমার্ধে নজদে বনু নামির গোত্র আব্বাসিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। ফলে আব্বাসি খলিফা ওয়াসিকবিল্লাহ বিদ্রোহ দমাতে দুর্ধর্ষ তুর্কি বীর বুগা কাবিরকে সেখানে পাঠান। ২২৭ থেকে ২৩২ হিজরি পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর যুদ্ধের পর নজদি বিদ্রোহীদের তিনি সফলভাবে দমন করেন। বুগা কাবিরের আক্রমণ ছিল নজদে আব্বাসিদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার সর্বশেষ প্রচেষ্টা।

বুগা কাবিরের আক্রমণের পর ২৫২ হিজরিতে মুহাম্মাদ উখাইজির আব্বাসিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে নজদের শাসনক্ষমতা দখল করে নেয়। এরপর দীর্ঘ বছর ধরে বনু আমির, বনু স্ব’স্বয়া, বনু লাম, জাবারিরা একে একে নজদের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে।

আব্বাসিদের পতনের পর নজদ উসমানি খিলাফতের দখলে চলে যায়। উসমানিরা সুদীর্ঘকাল নজদকে শান্তি ও নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে রাখে।

উসমানিদের শাসন ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে নজদের চিত্র পরিবর্তিত হয়ে যায়। খিলাফতের অধীনে আসার পর থেকে নজদ হয়ে ওঠে আলিম ও অলিদের প্রাণকেন্দ্র। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলেও তা সেখানকার জ্ঞানপ্রদীপগুলোকে নেভাতে পারেনি। নজদে ইসলাম আগমনের পর থেকে সেখানকার আলিমরা মানুষদের মধ্যে ইসলামি জ্ঞানসুধা বিলাতে থাকেন। নজদ ছিল মূলত হাম্বলি মাজহাব প্রভাবিত অঞ্চল। তারা ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের অনুসরণ করত। নজদি আলিমদের সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন পার্শ্ববর্তী শামী (সিরিয়) ও মিসরি আলিমরা। জ্ঞানাহরণের জন্য নজদ থেকে আলিম ও তালিবুল ইলমরা বিভিন্ন দেশে সফর করতেন। বিশেষ করে সিরিয়া ও মিসর হয় তাদের ইলমি সফরের তীর্থস্থান। সেখানকার বিদগ্ধ আলিম ও ইমামদের সান্নিধ্যে থেকে নজদিরা ইলম চর্চা করতেন। দশম থেকে দ্বাদশ হিজরির বিখ্যাত নজদি ইমামদের অন্যতম হলেন আহমাদ আসকারি, মুসা হাজ্জাবি, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মুশরিফ, মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল, আহমাদ ইবনে বাসসাম, মুহাম্মাদ বুসাইরি, আহমাদ মানকুর প্রমূখ।

ওয়াহাবিদের উত্থানপূর্বে নজদ ছিল আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের একটি স্বর্গোদ্যান। আলিম ও অলিদের পদধূলিতে ধন্য এ ভূমি ছিল জ্ঞানতাপসদের মিলনস্থল। ওয়াশমের উশাইকির )الاشيقي(, আরিজের মুকরিন ও আইনিয়া ছিল নজদের জ্ঞানের তীর্থক্ষেত্রসমূহের অন্যতম। এসব স্থানে সে যুগের স্বনামধন্য ইমামদের বসবাস ছিল। ওয়াহাবিদের উত্থানের আগে অর্থাৎ, অষ্টাদশ শতাব্দীতে নজদের স্বনামধন্য ২৮ জন ইমামের ১৫ জন ছিলেন উশাইকির অঞ্চলের। তাঁরা নজদজুড়ে দীনের খিদমাতে নিজেদের উৎসর্গ করেন। এদের মধ্যে অন্যতম দুজন ইমাম হলেন, আহমাদ ইবনে বাসসাম এবং সুলায়মান ইবনে আলি। তাঁরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দীনের দাওয়াত দিতে দিতে একসময় উয়ায়নাতে এসে বসবাস শুরু করেন। নজদি আলিমরা ফিকহ, তাফসির, হাদিসসহ শরিয়তের প্রতিটি বিভাগে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। একই সঙ্গে তাঁরা ছিলেন বিদআত ও খোরাফাতের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত। বিদআতে লিপ্ত না হতে মানুষকে বিশুদ্ধ দীনের শিক্ষা দিতেন।

নজদি মানুষের সঙ্গে আলিমদের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বন্ধনে তাঁরা আবদ্ধ ছিলেন। সেখানকার আলিমরা ফিকহ ও বিচারকার্য শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন। নজদে ওয়াহাবিদের উত্থানের ঠিক আগের একটি হিসাব অনুযায়ী সেখানকার বিখ্যাত মোট ৯৫ জন আলিমের ৬৫ জনই ছিলেন কাজি। হিজাজসহ অন্যান্য আরবি আলিমদের মতো তখনকার নজদি আলিমরা ছিলেন উম্মাহর প্রহরীস্বরূপ। ওয়াহাবি এবং পরবর্তীকালের কিছু ইতিহাসবিদ ওয়াহাবিদের রচনার ওপর ভিত্তি করে বলে থাকেন, ওয়াহাবিদের উত্থানপূর্বে নজদে শিরক ও বিদআতের প্রসার ঘটেছিল। এ বক্তব্য আদৌও ঠিক নয়। কারণ, ওয়াহাবিপূর্ব নজদ ছিল আহলুস সুন্নাতের একটি ইলমি মারকাজ। সেখানকার আলিমরা শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে ছিলেন সদা সোচ্চার।

এ পর্যন্ত আমরা নজদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ইতিহাসের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করলাম। আশাকরি পাঠকমণ্ডলী নজদ সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা অর্জন করেছেন।

একাধিক হাদিসে প্রিয় হাবিব এ ঐতিহ্যবাহী নজদের বিষয়ে উম্মতে মুসলিমাকে সতর্ক করেছেন। এ অঞ্চল থেকে ফিতনা-ফাসাদ প্রকাশ পাওয়া এবং সেখান থেকে খারিজিদের উত্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায় বিভিন্ন হাদিসে। যেমন: একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

“পূর্বাঞ্চল থেকে একদল লোকের আবির্ভাব ঘটবে। তারা কুরআন তিলাওয়াত করবে; কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তারা দীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেভাবে তির শিকার ভেদ করে বেরিয়ে যায়। তারা আর দীনের মধ্যে ফিরে আসবে না, যেমনভাবে তির ধনুকে ফিরে আসে না। জিজ্ঞেস করা হলো, তাদের আলামত কী? নবীজি স্টার বললেন, ‘তাদের আলামত হচ্ছে মাথা মুণ্ডন করা। “( বুখারি: ৭৫৬২)

অপর এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে; আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেছেন, “একবার আল্লাহর নবী দু’আ করলেন, ‘আল্লাহ, আমাদের জন্য বরকত দাও শামে (সিরিয়াতে)। আল্লাহ, বরকত দাও আমাদের জন্য ইয়ামেনে।’ সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল, আর আমাদের নজদের (ইরাকের) জন্য (দুআ করুন)?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ, আমাদের জন্য বরকত নাজিল করো শামে। আল্লাহ, আমাদের জন্য বরকত দাও ইয়ামেনে।’ তারা বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল, আমাদের নজদের মধ্যেও?’ আমার ধারণা তিনি তৃতীয়বারে বললেন, ‘সেখান থেকে ভূমিকম্প, ফিতনা হবে এবং শয়তানের শিং উদিত হবে। “( বুখারি: ৭০৯৪)

প্রিয় হাবিব আরও বলেছেন, رأس الكفر نحو المشرق – “কুফুরের শির পূর্ব দিকে।” সাইয়িদ হাবিব আলাবি র. একটি বর্ণনা এনেছেন, যেখানে স্থানের নাম উল্লেখপূর্বক বলা হয়েছে, ফিতনা নজদের ইয়ামামা অঞ্চল থেকে উদ্ভূত হবে। বর্ণনাটি এরকম:

يخرج في آخر الزمان في بلد مسيلمة رجل يغير دين الاسلام عاد (মিসবাহুল আনাম)

রাসূলুল্লাহ-এর করা ভবিষ্যদ্বাণীগুলো পরবর্তী সময়ে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আমরা ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখব, ইসলামের প্রথম যুগ থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো খারিজি দলের উৎপত্তি হয়েছে, সেগুলোর উৎপত্তি অধিকাংশই নজদ থেকে। এমনকি বর্তমানে যে দায়িশি-খারিজি ফিতনার উৎপত্তি হয়েছে, সেটাও নজদ থেকে অর্থাৎ, নজদুল উলয়া থেকে। একইভাবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ওয়াহাবি মতাদর্শের জন্মও হয়েছে নজদের ইয়ামামা থেকে, যা রচনা করে খাওয়ারিজদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম রক্তাক্ত অধ্যায়।