ইয়াসীর আরাফাত হিন্দি
মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদি (১২০৬ হি.)
জাজিরাতুল আরব তখন মহান উসমানি খিলাফতের অধীনে। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগের কথা। এ সময় আরব ছিল মুসলিম জাহানের প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিমরা সমবেত হতেন হিজাজ, নজদ, ইয়ামেন, শামসহ বিভিন্ন আরবি দেশে। কেউ হজ পালন করতে, কেউ জ্ঞানান্বেষণের উদ্দেশ্যে, আবার কেউ বাণিজ্যিক কারণে দূরদূরান্ত থেকে পাড়ি জমাতেন। এ সময় মহান মহান জ্ঞানবীর, পণ্ডিত, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ, উলামা এবং আওলিয়াদের চরণধূলিতে সমগ্র আরব হয়ে উঠেছিল জ্ঞানতীর্থের প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞানতাপস শিক্ষার্থীরা জড়ো হতেন এখানকার মসজিদ ও মাদরাসাগুলোতে। উসমানি যুগে মক্তব বা কাতাতিব, মসজিদ বা জামে এবং মাদরাসা ছিল দীন শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। উসমানিদের তত্ত্বাবধানে সেগুলো পৌঁছে যায় উন্নতির চরম শিখরে। সেকালে আরবজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশেষ বিশেষ কিছু ইলমগাহ হলো, মাদরাসাতুন নিজামিয়া, মাদরাসাতুল মুসতানসিরিয়া, মাদরাসাতুস সুলায়মানিয়া, জামিউল হুসাইনিয়া প্রভৃতি। দেশ-বিদেশের বিদগ্ধ পণ্ডিতরা এসব মাদরাসায় জ্ঞানসুধা বিতরণ করতেন।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হজ পালনের জন্যও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মুসলিমরা হিজাজে আসতেন। বিশেষ করে শাম, মিসর, ইসতাম্বুল প্রভৃতি জায়গার লোকজন হজ করতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে মক্কার
উদ্দেশে পাড়ি জমাতেন। নির্দিষ্ট আমিরের তত্ত্বাবধানে বিশাল দলবল নিয়ে তারা যাত্রা করতেন। পথে চোর-ডাকাতের খপ্পর থেকে বাঁচতে তারা সঙ্গে ‘মাহমাল’ বহন করতেন। মাহমাল হলো, পবিত্র কাবার আদলে তৈরি চতুষ্কোণ বিশিষ্ট ঘর স্বরূপ, যা বাহনের উপর স্থাপন করা হতো। তার উপরে কাবার গিলাফের ন্যায় গিলাফ লাগানো হতো। গিলাফে সুন্দর হরফে খচিত করা হতো কুরআনের আয়াত।
সেকালে এ ঘরটিকে ‘মাহমাল শরিফ’ বলা হতো। হাজিরা একে বাহনের পিঠে বসিয়ে নিয়ে যেতেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, নবীযুগ থেকেই মাহমালের প্রচলন ছিল। তখন মাহমাল বলতে হাওদাকে বোঝাত, যার ওপর কুরআনের আয়াত খচিত থাকত। হাওদা শব্দটি আরবি হাওদাজ শব্দ থেকে নির্গত। হাওদাজ বলতে মূলত মাহমালকেই বোঝানো হতো। মাহমাল বা হাওদাজের প্রচলন জাহিলি যুগেও ছিল। সে যুগে আরববাসীরা রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে হাওদাজ ব্যবহার করত।
নবিজির ইনতিকালের পরেও গিলাফবেষ্টিত মাহমাল প্রেরণের প্রথা প্রায় সমগ্র মুসলিমবিশ্বে চালু ছিল। খলিফা ওয়াসিকবিল্লাহর যুগ থেকে সুররা প্রেরণের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ফাতিমি, মামলুক, উসমানি যুগে সরকারিভাবে হারামাইন শরিফাইনে মাহমাল ও সুররা প্রেরণের প্রথা জারি হয়। বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থ ও চিঠিপত্র থেকে উসমানিদের সুররা প্রেরণের প্রমাণ মেলে। উসমানি খিলাফতের সূচনালগ্ন থেকেই হারামাইনে সুররা প্রেরণের প্রথা ছিল। তুরস্কের ইসতাম্বুলের ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা ‘উসমানলি আরশিবি’ (Osmanlı Arşivi) থেকে প্রাপ্ত একাধিক পত্র থেকে জানা যায়, সুলতান বায়জিদের কাছ থেকে প্রেরিত প্রথম সুররাতে আশি হাজার স্বর্ণখচিত কাপড়খণ্ড ছিল। পত্রসমূহে লেখা রয়েছে, ৮০ হাজার স্বর্ণখচিত কাপড়খণ্ড হারামাইনের জনহিতকর কাজে ব্যয়ের জন্য সুলতানি ফরমান জারি হয়েছে। সেগুলো গরিব-ফকির, গুণীজন, নেতৃবৃন্দ এবং আলিমদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
সুলতান প্রথম মুহাম্মাদ ৮৪০ হিজরিতে হারামাইনে সুররা পাঠান, যার মধ্যে থাকা কিসওয়ার পরিমাণ কত ছিল, তা জানা যায় না। সুলতান মুরাদ প্রতিবছর ৩৫ হাজার কিসওয়া সম্বলিত সুররা পাঠাতেন বলে জানা যায়। এভাবে উসমানি যুগের শেষ পর্যন্ত মাহমাল ও সুররা পাঠানোর প্রচলন ছিল। সিরিয়া ও মিসরে মাহমালের প্রচলন সম্ভবত মামলুকদের শাসনামলে সুলতানা শাজারাতুদ দুরের কালে শুরু হয়।
সেকালে এ ঘরটিকে ‘মাহমাল শরিফ’ বলা হতো। হাজিরা একে বাহনের পিঠে বসিয়ে নিয়ে যেতেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, নবীযুগ থেকেই মাহমালের প্রচলন ছিল। তখন মাহমাল বলতে হাওদাকে বোঝাত, যার ওপর কুরআনের আয়াত খচিত থাকত। হাওদা শব্দটি আরবি হাওদাজ শব্দ থেকে নির্গত। হাওদাজ বলতে মূলত মাহমালকেই বোঝানো হতো। মাহমাল বা হাওদাজের প্রচলন জাহিলি যুগেও ছিল। সে যুগে আরববাসীরা রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে হাওদাজ ব্যবহার করত।
নবিজির ইনতিকালের পরেও গিলাফবেষ্টিত মাহমাল প্রেরণের প্রথা প্রায় সমগ্র মুসলিমবিশ্বে চালু ছিল। খলিফা ওয়াসিকবিল্লাহর যুগ থেকে সুররা প্রেরণের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ফাতিমি, মামলুক, উসমানি যুগে সরকারিভাবে হারামাইন শরিফাইনে মাহমাল ও সুররা প্রেরণের প্রথা জারি হয়। বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থ ও চিঠিপত্র থেকে উসমানিদের সুররা প্রেরণের প্রমাণ মেলে। উসমানি খিলাফতের সূচনালগ্ন থেকেই হারামাইনে সুররা প্রেরণের প্রথা ছিল। তুরস্কের ইসতাম্বুলের ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা ‘উসমানলি আরশিবি’ (Osmanlı Arşivi) থেকে প্রাপ্ত একাধিক পত্র থেকে জানা যায়, সুলতান বায়জিদের কাছ থেকে প্রেরিত প্রথম সুররাতে আশি হাজার স্বর্ণখচিত কাপড়খণ্ড ছিল। পত্রসমূহে লেখা রয়েছে, ৮০ হাজার স্বর্ণখচিত কাপড়খণ্ড হারামাইনের জনহিতকর কাজে ব্যয়ের জন্য সুলতানি ফরমান জারি হয়েছে। সেগুলো গরিব-ফকির, গুণীজন, নেতৃবৃন্দ এবং আলিমদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
সুলতান প্রথম মুহাম্মাদ ৮৪০ হিজরিতে হারামাইনে সুররা পাঠান, যার মধ্যে থাকা কিসওয়ার পরিমাণ কত ছিল, তা জানা যায় না। সুলতান মুরাদ প্রতিবছর ৩৫ হাজার কিসওয়া সম্বলিত সুররা পাঠাতেন বলে জানা যায়। এভাবে উসমানি যুগের শেষ পর্যন্ত মাহমাল ও সুররা পাঠানোর প্রচলন ছিল। সিরিয়া ও মিসরে মাহমালের প্রচলন সম্ভবত মামলুকদের শাসনামলে সুলতানা শাজারাতুদ দুরের কালে শুরু হয়।
উসমানি যুগে খিলাফতের আরবভূমি জ্ঞান ও সমৃদ্ধিতে পৌঁছেছিল এক অনন্যতায়। পবিত্র হিজাজ উম্মতে মুসলিমার ধর্মীয় প্রাণকেন্দ্র হওয়ার পাশাপাশি পরিণত হয়েছিল ইসলামি সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে; কিন্তু অষ্টাদশ শতকে ঘটে গেল ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক ঘটনা। নজদের বুকে জন্ম নিল ওয়াহাবি মতবাদ। মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদি এবং মুহাম্মাদ ইবনে সৌদের নেতৃত্বে পরিচালিত এ আন্দোলন অল্পদিনের মধ্যে বদলে দিলো জাজিরাতুল আরবের মানচিত্র।
গবেষণার অপ্রতুলতা এবং ঐতিহাসিক উপাদানের স্বল্পতার কারণে ওয়াহাবি মতাদর্শ নিয়ে মুসলিমবিশ্বে মতভেদের অন্ত নেই। অনেকে মনে করেন, এটি ছিল স্রেফ সংস্কারবাদী একটি আন্দোলন। যেমনটা ছিল ভারত উপমহাদেশের দেওবন্দ আন্দোলন। তাদের মতে, আরবের বুকে শিরক ও বিদআত নির্মূল করতে হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী ইবনে আবদুল ওয়াহহাব যে আন্দোলন চালিয়েছিলেন, তা-ই ওয়াহাবি আন্দোলন নামে পরিচিত। তারা এ আন্দোলনকে একটি সংস্কারবাদী আন্দোলন এবং নজদিকে একজন সংস্কারপন্থী মুজাদ্দিদ হিসেবে মনে করে থাকেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ওয়াহাবি আন্দোলন মূলত বৃটিশ গোয়েন্দাদের হাতে গড়া একটি ষড়যন্ত্র। তাদের মতানুসারে, বৃটিশরা উসমানি সাম্রাজ্য ধ্বংস করার নিমিত্তে নজদিকে ফুসলিয়ে এ আন্দোলনের জন্ম দেয়। তবে আহলুস সুন্নাতের আইম্মায়ে কিরাম এবং বিদগ্ধ পণ্ডিতদের মতানুসারে, ওয়াহাবিরা ছিল কট্টরপন্থি তাকফিরি ও খারিজি দল, যারা দীনের মধ্যে বিকৃতি সাধনের মাধ্যমে আরবে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিয়েছিল, যা মুসলিমদের ওপর ইসলামের শত্রু ব্রিটিশের কর্তৃত্ব স্থাপনে সুবিধা করে দিয়েছিল।
ওয়াহাবি মতাদর্শ সম্পর্কে বিস্তৃত মতভেদ এবং তথ্য বিকৃতির কারণে মতাদর্শটি সম্পর্কে বিচ্ছিন্ন পড়াশোনা অনুসন্ধিৎসুকে আন্দলনটির প্রকৃতি সম্পর্কে যথাযথ ধারণালাভে অন্তরায় সৃষ্টি করে। এ কারণে প্রয়োজন মতাদর্শটি সম্পর্কে গভীর ও দালিলিক অধ্যয়ন। আমরা সামনে ওয়াহাবি মতাদর্শ ও তার ইতিহাস নিয়ে দালিলিকরূপে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।



