Press "Enter" to skip to content

 মহানবীর (সা.) বিশেষ কিছু আচরণে আলী (আ.)-এর মর্যাদা

রাসূল (সা.)-এর বিশেষ কিছু আচরণ গাদীরের হাদীসকে বুঝতে যে সকল উপাদান আমাদেরকে সাহায্য করে থাকে তার মধ্যে একটি উপাদান হচ্ছে আলী (আ.)-এর সাথে রাসূল (সা.)- এর আচরণ। এই মাপকাঠির ভিত্তিতে যদি রাসূল (সা.) আলী (আ.)-এর সাথে অন্য কোন সাহাবীর মত এমন কি যদি কোন একজন নিকটাতাত্মীয়র মতও আচরণ করতেন এবং এ ক্ষেত্রে তার সাথে বিশেষ আচরণ না করতেন তবে গাদীরের হাদীসের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝার জন্য রাসূল (সা.)-এর আচরণ থেকে কিছুই প্রমাণ করা যেত না। কিন্তু আমরা দেখি যে, আলী (আ.)-এর সাথে রাসূল (সা.)-এর আচরণ ও অন্যান্য সাহাবীগণের সাথে আচরণের মধ্যে পার্থক্যকে আছে, যার প্রতি সামান্য একটু যদি লক্ষ্য করি তাহলেই এ সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারব যে, আলী (আ.) রাসূল (সা.)-এর দৃষ্টিতে অন্যান্য সকল মুসলমানদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তিনি (সা.) তার সারাটি জীবন বিশেষ করে তার নবুয়্যতি জীবনে সর্বদা এই প্রচেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন যে, তাকে (আলীকে) যেন সর্ববৃহৎ ও মহান কাজের জন্য গড়ে তুলতে পারেন এবং সকল মুসলমানকে তার মর্যাদাসমূহের সাথে পরিচিত করাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে রাসূল (সা.)-এর প্রত্যেকটি আচরণই গাদীরের হাদীসকেই সমর্থন করে। সামগ্রিকভাবে আলী (আ.)-এর প্রতি তার এ ধরনের আচরণ এক ও অভিন্ন এক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের প্রতি ইঙ্গিত করে। রাসূল (সা.) তার এই আচরণ দ্বারা এই বিষয়টি বুঝাতে চেয়েছেন যে, আলী (আ.) অন্যান্য মানুষের চেয়ে আলাদা ও এমন এক ব্যক্তি যে রাসূল (সা.)-এর অনুরূপ ও আল্লাহর বিশেষ দৃষ্টির অধিকারী হিসেবে ইসলামী সমাজের নেতৃত্ব ও মুসলমানদের পথ প্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত। আমরা এ অধ্যায়ে দৃষ্টান্ত হিসেবে আলী (আ.)-এর সাথে রাসূল (সা.)-এর কিছু আচরণ তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

১. দরজাসমূহ বন্ধকরণ

মসজিদে নববী, মদীনায় এমন স্থানে নির্মান করা হয়েছিল যে, সেখানের অধিবাসীদের বাড়ি-ঘর দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। এ কারণে সকলের যাতায়াতের পথ ছিল মসজিদের ভিতর দিয়ে। মসজিদ নির্মানের পর বেশ কিছুদিন যাবৎ লোকজন মসজিদের ভিতর দিয়েই চলাচল করত। হযরত আলী (আ.)-এর বাসাটিও সেখানেই ছিল।

অনেকদিন অতিবাহিত হওয়ার পর রাসূল (সা.) সমস্ত দরজাসমূহ বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন শুধু মাত্র আলী (আ.)-এর দরজা ব্যতীত। একদল লোক এ ধরনের বৈষম্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রকাশ্য এবং গোপনে আপত্তি ও প্রতিবাদ করতে লাগলো। রাসূল (সা.) তাদের উত্তরে বললেনঃ আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, আলীর দরজা ব্যতীত সকল দরজা বন্ধ করে দেওয়া হোক, কিন্তু কেউ কেউ তোমাদের মধ্য হতে আপত্তি তুলেছে, আল্লাহর শপথ; আমি (স্বেচ্ছায়) না কোন দরজা বন্ধ করেছি, না কোন দরজা খুলেছি বরং আমি নির্দেশ প্রাপ্ত হয়েছি এবং তার বাস্তবায়ন করেছি। (তারিখে দামেশক, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৮১, হাদীস-৩২৫)

অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেছেনঃ আমি সেটাকে উম্মুক্ত করিনি বরং আল্লাহই তা উম্মুক্ত করেছেন। (তারিখে দামেশক, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৮১, হাদীস-৩২৬)

এই হাদীসটি “ইবনে আসাকির” বেশকিছু সংখ্যক সাহাবী হতেও এভাবে বর্ণনা করেছেন। (তারিখে দামেশক, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৭৫-২৯৬, হাদীস-৩২৩-৩৩৫ পর্যন্ত) জুয়াইনী, ফারায়েদ-এ লিখেছেন সাদ্দুল আবওয়াব (দরজা বন্ধের) হাদীসটি প্রায় ৩০ জন (ত্রিশ জন) সাহাবী বর্ণনা করেছেন। (ফারায়েদুস সিমতাঈন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২০৮)

২. বিশেষ মনোযোগ

মহান সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, আলী (আ.)-এর সাথে রাসূল (সা.)-এর এমনই এক সম্পর্ক ছিল, যা অন্য কারো সাথেই ছিল না। (তারিখে দামেশক, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৫৩, হাদীস-৯৮২)

স্বয়ং হযরত আলী (আ.) হতে বর্ণিত আছে যে, আমি যখনই প্রশ্ন করতাম উত্তর পেতাম যখন নিশ্চুপ থাকতাম তিনি নিজেই আমাকে সবকিছু বলতেন। (তারিখে দামেশক, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৫৪, হাদীস-৯৮৪-৯৮৭ পর্যন্ত)

৩. চুপিসারে আল্লাহর সাথে কথা বলা

তায়েফের যুদ্ধের দিন রাসূল (সা.) আলীকে (আ.) নিয়ে নির্জনে গিয়ে চুপিসারে আস্তে করে কথা বলেছিলেন, সাহাবীগণের মধ্য হতে কয়েকজন বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আপনারা দীর্ঘক্ষণ ধরে চুপি চুপি কথা বললেন… তিনি বললেনঃ আমি তার সাথে চুপিসারে কথা বলিনি বরং আল্লাহ স্বয়ং তার সাথে চুপিসারে কথা বলছিলেন। (তারিখে দামেশক, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩০৮, হাদীস-৮১৬-৮২১ পর্যন্ত)

৪. আমিরুল মু’মিনীন উপাধি

রাসূল (সা.)-এর সাহাবী বুরাইদা আসলামী (রা.) বর্ণনা করেছেনঃ আমরা সাতজন ছিলাম, যার মধ্যে আমি ছিলাম তরুন। রাসূল (সা.) আমাদেরকে বললেনঃ আলীকে সালাম দাও এবং বল, শান্তি বর্ষিত হোক আপনার উপর হে আমিরুল মু’মিনীন। (তারিখে দামেশক, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৬০, হাদীস-৭৮৪)

৫. সূরা বারায়াতের (তওবার) প্রচার

রাসূল (সা.) আবু বকরকে নির্দেশ দিলেন যেন সে হজ্জের মৌসুমে হাজীদের মাঝে সূরা বারায়াত (তওবা) প্রচার করে। অতঃপর আলীকে পাঠালেন যাতে আবু বকরের নিকট থেকে সূরাটি নিয়ে স্বয়ং নিজেই পাঠ করে। তিনি বললেনঃ এই সূরাটি আমার পরিবারের সদস্য ব্যতীত অন্য কেউ যেন প্রচার ও পাঠ না করে। (তারিখে দামেশক,  ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৭৬, ও ৮৭৮-৮৮৫ পর্যন্ত)

অন্যত্র বর্ণনায় এসেছে তিনি বলেছেনঃ আমার বাণীকে স্বয়ং আমি অথবা আলী ব্যতীত অন্য কেউ যেন না পৌছায়। (ফারায়েদুস সিমতাঈন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৮ ও ৬১)

৬. আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সেনাপতি

যতদিন পর্যন্ত যুদ্ধ প্রাচীন নিয়মে চলছিল ও আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র তখনও রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেনি সে সময় সৈন্যদলের অবস্থা নির্দেশক একটি পতাকা বহন করা হত যার নাম ছিল “লাওয়া”। এই “লাওয়া” উড্ডীয়মান থাকার অর্থই ছিল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার আছে আর উড্ডীয়মান না থাকার অর্থ হচ্ছে সৈন্য বাহিনীর বিপর্যয় ঘটেছে। এ কারণেই মৌল পতাকাটি ঐ ব্যক্তি রণক্ষেত্রে বহন করতেন যিনি উচ্চ মান-মর্যাদার অধিকারী, যিনি দূর্দান্ত সাহসী ও দৃঢ়। কাফেরদের বিরুদ্ধে রাসূল (সা.)-এর সকল যুদ্ধের মৌলিক পতাকা বা “লাওয়া” হযরত আলী ইবনে আবী তালিবের হাতে ছিল। (তারিখে দামেশক, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৬৩, হাদীস-২০৬-২০৮ পর্যন্ত)

হাদীস অনুযায়ী বর্ণিত আছে যে, যখনই রাসূলকে (সা.) প্রশ্ন করা হত, হাশরের দিন কে আপনার “লাওয়া” বহন করবে? তিনি বলতেনঃ তিনিই বহন করবেন যিনি দুনিয়াতে তা বহন করেন, অর্থাৎ আলী ইবনে আবী তালিব। (তারিখে দামেশক, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৭৯, হাদীস-৮৮৫ এবং ফারায়েদুস সিমতাঈন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৮-৬১)

৭. হযরত ফাতিমা যাহরার (সা. আ.) সাথে বিবাহ

হযরত ফাতিমার (সা. আ.) সাথে পরিণয়ের ক্ষেত্রে হযরত আলী (আ.)-এর প্রস্তাবে রাসূল (সা.)-এর ইতিবাচক জবাবও রাসূল (সা.)-এর সাথে আলী (আ.)-এর বিশেষ সম্পর্কের পরিচয় বহন করে। অথচ ইতিপূর্বে বিশিষ্ট সাহাবাদের অনেকেই ফাতিমার (সা.আ.) বিবাহের বিষয়ে তার মহান পিতার নিকট প্রস্তাব পেশ করেছিলেন কিন্তু তাতে তিনি কোন সাড়া দেননি এর বিপরীতে যখনই আলী (আ.) তার নিকট প্রস্তাব উত্থাপন করলেন কালবিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ ইতিবাচক জবাব দিলেন। কিছু কিছু বর্ণনার ভিত্তিতে আলী (আ.)-এর পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসার পূর্বেই যখন একদল সাহাবী তার নিকট আলী (আ.)-এর সঙ্গে হযরত ফাতিমা (সা.)-এর বিবাহের বিষয়টি উত্থাপন করেন তখন তিনি কোনরূপ বিলম্ব ছাড়া তাদের সামনেই বিবাহের খুতবা পড়া শুরু করেন ও বললেনঃ আল্লাহ আমার নিকট ওহী পাঠিয়েছেন যে, ফাতিমার বিবাহ যেন আলীর সাথে দেই। (ফারায়েদুস সিমতাঈন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৮, হাদীস-৬৮। ফারায়েদুস সিমতাঈন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৯০, হাদীস-৫৯)

তথ্যসূত্র: আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে গাদীর

মূল: মুহাম্মদ রেজা জাব্বারান

ভাষান্তর: মুহাদ্দিস এমরহমান (কামিল)