Press "Enter" to skip to content

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর মনোনীত খলিফা তাঁর রক্তজ বংশধর থেকে

ইমাম আবুল হাসান আলী ইবনে মূসা আর-রেযা (আঃ) থেকে বর্ণিত বিষয়সমূহঃ
ইস্তিফা (রাসুলের সাঃ উত্তরসুরি নির্বাচিতকরণ) এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইমাম (আ.)-এর বক্তব্যঃ
(হাদিস গ্রন্থঃ তুহাফুল উকুল, মুলঃ শেখ আবু মু আল হাসান ইবনে আলী ইবনিল হুসাইন ইবনে শু’বা আল-হাররানি রহ., অনুবাদ হুজ্জাতুল ইসলাম ড আব্দুল কুদ্দুস বাদশা)
ইমাম রেযা (আঃ) যখন মামুনের জলসায় উপস্থিত হলেন এবং ইরাক ও খোরাসানের একদল পন্ডিত সে জলসায় বসা ছিলেন, মামুন উপস্থিতবৃন্দকে বললেন : আমাকে এ আয়াতের অর্থ সম্পর্কে অবগত করুন : ‘অতঃপর আমরা কিতাবের উত্তরাধিকার করেছি তাদেরকে যাদেরকে নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে বেছে নিয়েছি।’
পন্ডিতবর্গ সকলেই বললেন : ‘এখানে বাছাইকৃত বান্দাদের বলতে আল্লাহর উদ্দেশ্য সকল উম্মত।’
মামুন ইমাম রেযা (আঃ)-কে বললেন : হে আবাল হাসান! আপনি কী বলেন? উত্তরে ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : যদি উদ্দেশ্য সকল উম্মত হয়ে থাকে তাহলে সকলেরই উচিত বেহেশতে যাওয়া। কারণ, আল্লাহ্ এর পরেই বলেন : ‘তাদের কেউ কেউ নিজের প্রতি জুলুম করে আর কেউ কেউ ন্যায়ানুগ আচরণ করে। আর কেউ কেউ যে কোনো কল্যাণ কাজে অগ্রবর্তী হয় আল্লাহর অনুমতিক্রমে। এটাই হলো সে মহান মর্যাদা।’
অতঃপর তাদের সকলকেই বেহেশতের অধিকারী বলেছেন : ‘আদ্ন বেহেশত যেখানে তারা প্রবেশ করে।’ সুতরাং উত্তরাধিকারিত্ব কেবল পবিত্র আহলে বাইতের জন্য নির্দিষ্ট। অন্যদের নয়। অতঃপর ইমাম রেযা (আঃ) বলেন : এরা হলো তাঁরা, আল্লাহ্ স্বীয় কিতাবে যাদের গুণ বর্ণনা করেছেন।
ইরশাদ হচ্ছে : ‘আল্লাহ্ তো চান শুধু তোমাদের থেকে সকল পঙ্কিলতা দূর করতে হে আহলে বাইত! এবং তোমাদেরকে পূত- পবিত্র করতে।’ এবং যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : ‘নিশ্চয় আমি দু’টি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি : আল্লাহর কিতাব এবং আমার ইতরাত (আমার আহলে বাইত)। এ দু’টি কখনোই একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না হাউযে কাউসারে আমার সাথে মিলবে। লক্ষ্য করবে কীভাবে তাদের ব্যাপারে আমার স্থলাভিষিক্ত হও। হে লোকসকল! তাদেরকে শেখাতে যেও না। কারণ, তারা তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী।’
পন্ডিতরা বললেন : হে আবাল হাসান! আমাদেরকে বলুন : ইতরাত কি ঐ ‘আল’ নাকি ‘আল’ ব্যতীত অন্য কিছু?
ইমাম রেযা (আঃ) বলেন : ইতরাত ঐ ‘আল’ই।
পন্ডিতবৃন্দ বললেন : কিন্তু স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন : ‘আমার উম্মতের সকলেই আমার আল।’ আর যেহেতু হাদীসটি মুস্তাফিয (তিনের অধিক) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে তাই তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য নয়। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, আলে মুহাম্মাদ হলো তাঁরই উম্মত।
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : আমাকে বলুন দেখি, সাদাকা (যাকাত ও দান) আলে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর ওপর নিষিদ্ধ নাকি নিষিদ্ধ নয়?
তারা বললেন : জি, নিষিদ্ধ।
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : সাদাকা কি সকল উম্মতের ওপরে নিষিদ্ধ?
তাঁরা বললেন : না।
ইমাম বললেন : এটাই হলো উম্মত ও আলের মধ্যে পার্থক্য। ধিক আপনাদের ! আপনারা কোথায় সরে গেছেন? আপনারা কি কোরআনের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছেন নাকি আপনারা অবিবেচক দল? আপনারা কি জানেন না যে, রেওয়ায়েত বাহ্যত নির্বাচিত পথপ্রাপ্তদের সম্পর্কে, অন্যদের সম্পর্কে নয়?
তাঁরা বললেন : হে আবাল হাসান! কিসের ভিত্তিতে বলছেন?
ইমাম বললেন : আল্লাহর বাণী থেকে। ইরশাদ হচ্ছে : ‘আর প্রেরণ করেছি নূহ ও ইবরাহীমকে এবং তাঁদের বংশে দিয়েছি নবুওয়াত ও কিতাবকে, তাদের কিছু কিছু পথপ্রাপ্ত হয়েছে আর তাদের অনেকেই অনাচারী।’ সুতরাং নবুওয়াত ও কিতাবের উত্তরাধিকার থেকেছে পথপ্রাপ্তদের মধ্যেই, অনাচারীদের মধ্যে নয়। আপনারা কি জানেন না যে, নূহ তাঁর প্রতিপালকের কাছে আবেদন করলেন এবং বললেন: ‘নিশ্চয় আমার পুত্র আমার আহলভুক্ত এবং নিশ্চয় আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য।’ একথা এজন্য ছিল যে, আল্লাহ্ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁকে তাঁর পরিবারবর্গসহ ডুবে যাওয়া থেকে নাজাত দান করবেন। তখন তাঁর প্রতিপালক মহামহিম আল্লাহ্ বলেন : ‘নিশ্চয় সে তোমার আহলভুক্ত নয়। নিশ্চয় সে অসঙ্গত কর্ম (মন্দকর্মের প্রতিকৃতি)। অতএব, যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সে ব্যাপারে আমার কাছে আবেদন করবে না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।’ (সূরা হূদ : ৪৬)
মামুন জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ্ কি ইতরাতকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন?
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : নিশ্চয় মহীয়ান গরীয়ান আল্লাহ্ ইতরাতকে অন্যদের ওপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন স্বীয় সৃদৃঢ় কিতাবে।
মামুন বললেন : এটা আল্লাহর কিতাবের কোথায়?
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : আল্লাহর এই বাণীতে : ‘নিশ্চয় আল্লাহ্ আদম, নূহ, আলে ইবরাহীম ও আলে ইমরানকে জগৎবাসীর ওপরে নির্বাচিত করেছেন। তারা এমন এক বংশধর যারা একে অপরের থেকে।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩৩-৩৪)।
অন্যত্র মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন : ‘নাকি তারা হিংসা করে মানুষের সাথে আল্লাহ্ তাঁদের স্বীয় করুণা থেকে যা দান করেছেন সেজন্য। অবশ্য আলে ইবরাহীমকে দান করেছি কিতাব ও প্রজ্ঞা এবং দান করেছি মহান রাজত্ব।’ (সূরা নিসা : ৫৪) অতঃপর অন্যান্য মুমিনের উদ্দেশে কথা বলেন এবং ইরশাদ করেন : ‘হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে উলুল আমরের।’ (সূরা নিসা : ৫৯) অর্থাৎ যাদেরকে কিতাব ও প্রজ্ঞার উত্তরাধিকারী করেছেন এবং যারা অন্যদের হিংসার মুখে পড়েছেন। আল্লাহর এ বাণীর প্রেক্ষিতে : ‘তবে কি তারা হিংসা করে মানুষের সাথে, আল্লাহ্ আপন করুণা থেকে তাদের যা দান করেছেন সেজন্য। অবশ্যই আমি আলে ইবরাহীমকে দান করেছি কিতাব ও প্রজ্ঞা এবং দান করেছি মহান রাজত্ব।’ (সূরা নিসা : ৫৪) এখানে উদ্দেশ্য, মনোনীত পূত-পবিত্রদের আনুগত্যের অধিকার। আর এখানে ‘মুল্ক’ (রাজত্ব) বলতে আনুগত্যের অধিকার বুঝানো হয়েছে।
মজলিসের পন্ডিতবৃন্দ বললেন : ‘আল্লাহ্ কি ইসতিফা (বাছাইকৃত, মনোনীত, নির্বাচিত)-কে কোরআনে ব্যাখ্যা করেছেন?
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : ‘ইসতিফা’কে কোরআনে (যে সকল আয়াতে) বাতেনী অর্থে (এসেছে) ছাড়া যাহেরীভাবেও ১২টি স্থানে ব্যাখ্যা করেছেন :
প্রথমত, আল্লাহর এ বাণী ‘এবং সতর্ক করুন নিকটতম আত্মীয়বর্গকে এবং আপনার নিষ্ঠাবান জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে’ উবাই ইবনে কাব এর পঠনে (সংকলিত কোরআনে) এরূপ রয়েছে। আর আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদের মুসহাফেও তা লিপিবদ্ধ রয়েছে। (অতঃপর যখন খলিফা ওসমান, যায়েদ বিন সাবিতকে কোরআন সংকলনের নির্দেশ দেন তখন এ আয়াতের ব্যাখ্যামূলক অংশটিকে কোরআন থেকে বাদ দেন)। এ হলো উচ্চস্থান মহান করুণা এবং উন্নত মর্যাদা যখন আল্লাহ্ এ শব্দটি দ্বারা ‘আল’-কে উদ্দেশ্য করেছেন। এটা হলো একটি।
ইসতিফা সম্পর্কে দ্বিতীয় আয়াত হলো আল্লাহর এ বাণী ‘হে আহলে বাইত! আল্লাহ্ তো চান শুধু তোমাদের থেকে সকল অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূত-পবিত্র রাখতে।’ (সূরা আহযাব : ৩৩) এটা এমন এক মর্যাদা যা কোনো অস্বীকারকারীই অস্বীকার করতে পারে না। কারণ, এটা স্পষ্ট মর্যাদা।
তৃতীয় আয়াতটি হলো যখন আল্লাহ্ পূত-পবিত্রদেরকে তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক করেছেন। মোবাহিলার আয়াতে স্বীয় নবীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন : ‘বলুন (হে মুহাম্মাদ!) এস, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদেরকে ও তোমাদের পুত্রদেরকে এবং আমাদের নারীদেরকে ও তোমাদের নারীদেরকে এবং আমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের নিজেদেরকে। তারপর (আল্লাহর কাছে) অভিশাপ কামনা করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষণ করি।’ (সূরা আলে ইমরান : ৬১) তখন নবী (সাঃ) আলী, হাসান, হুসাইন ও ফাতিমা (আঃ)-কে নিয়ে বের হলেন এবং তাঁদেরকে নিজের সঙ্গী করলেন।
আপনারা কি জানেন ‘আমাদের নিজেদের’ ও ‘তোমাদের নিজেদের’ এর অর্থ কী?
পন্ডিতবৃন্দ বললেন : ‘এর অর্থ স্বয়ং মহানবী (সাঃ)।’
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : ভুল বলেছেন। নিশ্চয় একথার উদ্দেশ্য আলী (আঃ)। এর একটি প্রমাণ হলো নবী (সাঃ)-এর বক্তব্য যখন তিনি বললেন : ‘বনি ওলিয়াহ (ইয়েমেনের কিন্দাহর একটি গোত্র)-কে অবশ্যই বিরত হতে হবে। নতুবা আমি এমন একজন লোককে তাদের উদ্দেশ্যে পাঠাব যে হবে স্বয়ং আমার মতো।’ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আলী (আঃ)।
এটা এমন এক বৈশিষ্ট্য যে ব্যাপারে কেউই আলীর অগ্রগামী হতে পারেনি। আর এমন এক গুণ কোনো মানুষই যাতে পৌঁছতে পারেনি। আর এমন এক মর্যাদা যে ব্যাপারে কেউই আলীকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। কারণ, আলীকে স্বয়ং নিজের স্থলে দিয়েছেন। এটা হলো তৃতীয়।
চতুর্থটি হলো, সকল লোককে তাঁর মসজিদ থেকে বের করে দিলেন, শুধু ইতরাত ব্যতীত। তারপর লোকেরা যখন এ প্রসঙ্গে কথা বলল এবং আব্বাস ও বললেন : ‘হে রাসূলুল্লাহ্! আলীকে ছেড়ে দিলেন আর আমাদেরকে বের করে দিলেন যে?’
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন : ‘আমি তাকে ছেড়ে দেইনি এবং তোমাদেরকে বের করে দেইনি; বরং আল্লাহ্ই তাকে ছেড়ে দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে বের করে দিয়েছেন।’ আর এরই মধ্যে রয়েছে আলী (আঃ)-এর ব্যাপারে তাঁর এ কথার ব্যাখ্যা অর্থাৎ ‘আমার নিকট তোমার স্থান মূসার নিকট হারুনের স্থানের ন্যায়।’
পন্ডিতবৃন্দ বললেন : এটা কোরআনের কোথায় আছে?
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : আমার কাছে এ সম্পর্কে কোরআন (এর আয়াত) রয়েছে এবং তোমাদের জন্য পাঠ করব।
তারা বললেন : আনুন।
তিনি বললেন : মহামহিম আল্লাহর এ বাণী ‘এবং আমি ওহী করলাম মূসা ও তাঁর ভাইয়ের প্রতি যে তোমরা দু’জন তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্য মিশরে বাড়িঘর প্রস্তুত কর এবং আপন আপন ঘরসমূহকে কিবলা বানাও।’ (সূরা ইউনুস : ৮৭)
এ আয়াতেই নিহিত রয়েছে মূসার নিকট হারুনের মর্যাদা ও স্থানের ব্যাখ্যা। আর এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকট আলী (আঃ)-এর মর্যাদারও নির্দেশনা। আর এর সাথে প্রকাশ্য প্রমাণ রয়েছে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর কথায় যখন তিনি বলেন : ‘নিশ্চয় এটা মসজিদ, সেখানে কোনো জানাবাতগ্রস্ত ও হায়েযগ্রস্ত ব্যক্তির অবস্থান বৈধ নয়, কেবল মুহাম্মাদ ও আলে মুহাম্মাদের জন্য ছাড়া।’
তখন পন্ডিতবৃন্দ উচ্চকিত হয়ে বললেন : এই ব্যাখ্যা এবং এই বয়ান আপনাদের রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর আহলে বাইতের নিকট ছাড়া পাওয়া যায় না।
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : কে আছে এর অস্বীকারকারী? যখন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন : ‘আমি হলাম জ্ঞানের নগরী আর আলী তার দরজা। যে ব্যক্তি জ্ঞানের নগরীতে প্রবেশ করতে চায় তাকে তার দরজা দিয়ে ঢুকতে হবে।’
আমরা এই যা কিছু ফযল ও মর্যাদা সম্পর্কে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছি এবং অগ্রগামিতা, ইসতিফা ও পবিত্রতা সম্পর্কে যা কিছু বলেছি, তা এমন জিনিস যে শত্রু ব্যতীত কেউ তা অস্বীকার করবে না। আর সেজন্য সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই। এ হলো চতুর্থ।
পঞ্চমটি হলো : মহামহিম আল্লাহর এ বাণী ‘আর নিকটাত্মীয়কে তার অধিকার প্রদান করুন।’ (সূরা বনি ইসরাঈল : ২৬) এটা এমন এক বৈশিষ্ট্য মহীয়ান গরীয়ান আল্লাহ্ যা দ্বারা তাঁদেরকে নির্দিষ্ট করেছেন এবং সকল উম্মতের ওপরে তাঁদেরকে মনোনীত করেছেন। যখন এই আয়াত রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর প্রতি অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বললেন : ‘ফাতিমাকে আমার কাছে ডেকে আন।’ তাঁকে ডেকে আনা হলো।
তখন নবী বললেন : ‘হে ফাতিমা।’
ফাতিমা বললেন : ‘জি, হে রাসূলুল্লাহ।’
তখন বললেন : ‘ফাদাক হলো এমন সম্পত্তি যা অশ্বারোহী ও উষ্ট্রারোহী বাহিনীর জোরে হস্তগত হয়নি এবং স্বয়ং আমারই জন্য নির্দিষ্ট মুসলমানদের বিপরীতে। আর আমি তা তোমাকে দিলাম। কেননা, আল্লাহ্ আমাকে তার নির্দেশ দিয়েছেন। তাকে তোমার জন্য, তোমার সন্তানদের জন্য গ্রহণ কর।’ এ হলো পঞ্চম।
ষষ্ঠটি হলো : মহান আল্লাহর বাণী ‘বলুন : আমি তোমাদের থেকে পারিশ্রমিক চাই না, শুধু নিকটাত্মীয়ের ভালোবাসা ব্যতীত।’ (সূরা শূরা : ২৩)
এটা হলো অন্যান্য নবীর ওপর মহানবী (সাঃ)-এর একটি শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর আলের জন্য একটি বৈশিষ্ট্য, অন্যদের বিপরীতে। আর এটা একারণে যে, আল্লাহ্ হযরত নূহ (আঃ)-এর স্মৃতিকথা বর্ণনা প্রসঙ্গে নবীদের থেকে তুলে ধরেছেন : ‘হে আমার সম্প্রদায়! এর বিনিময়ে আমি তোমাদের নিকট ধনসম্পদ যাঞ্ছা করি না। আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহরই নিকট এবং মুমিনদিগকে তাড়িয়ে দেওয়া আমার কাজ নয়। তারা নিশ্চিতভাবে তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভ করবে। কিন্তু আমি তো দেখছি তোমরা এক অজ্ঞ সম্প্রদায়।’ (সূরা হূদ : ২৯)
আর হূদ (আঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন : ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমি এর বিনিময়ে তোমাদের নিকট পারিশ্রমিক যাঞ্ছা করি না। আমার পারিশ্রমিক আছে তাঁরই নিকট যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি তবুও অনুধাবন করবে না?’ (সূরা হূদ : ৫১)
আর তাঁর নবীকে বলেছেন : ‘বলুন, আমি তোমাদের থেকে কোনো পারিশ্রমিক চাই না, শুধু নিকটাত্মীয়ের ভালোবাসা ছাড়া।’ আল্লাহ্ তাঁদের ভালোবাসাকে ওয়াজিব করেছেন। একারণে যে, তিনি জানতেন, তাঁরা কখনই দীন থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন না এবং কখনই পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত হবেন না।
আরেকটি কথা হলো এই যে, যদি কেউ কারো অনুরাগী হয় ও তাকে ভালোবাসে, কিন্তু তার পরিবারের কেউ তাকে শত্রু মনে করে তাহলে তার অন্তর তাকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে আর নিখাদ থাকে না। তাই আল্লাহ্ চেয়েছেন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর অন্তরে মুমিনদের সম্পর্কে যেন কোনো উৎকণ্ঠা না থাকে।
আর এজন্যই নিকটাত্মীয়ের ভালোবাসাকে তাদের ওপর ফরয করেছেন যাতে যে ব্যক্তি তদনুযায়ী আমল করবে এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ও তাঁর আহলে বাইতকে ভালোবাসবে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাদেরকে ঘৃণা করতে পারবেন না। আর যে তা বর্জন করবে এবং তা গ্রহণ করবে না এবং তাঁর নবীর আহলে বাইতের প্রতি ঘৃণা পোষণ করবে, তাহলে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর জন্য ন্যায্য হবে তাকে ঘৃণা করা। কারণ, সে আল্লাহর ওয়াজিবকৃত একটি ওয়াজিব বর্জন করেছে। আর কোন্ অনুগ্রহ ও মর্যাদা আছে যা এর চেয়ে অগ্রগণ্য হতে পারে? তাই যখন আল্লাহ্ এ আয়াতকে তাঁর নবী (সাঃ)-এর ওপর অবতীর্ণ করলেন : ‘বলুন এর বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কিছুই চাই না, কেবল নিকটাত্মীয়ের ভালোবাসা ব্যতীত’, তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্বীয় সাহাবীদের মাঝে দাঁড়িয়ে গেলেন, অতঃপর আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি জ্ঞাপন করলেন এবং বললেন : ‘হে লোকসকল! নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের ওপর একটি কাজ ফরয করেছেন। তোমরা কি তা পালন করবে?’
কেউ তাঁর উত্তর দিলেন না। অতঃপর দ্বিতীয় দিনে তিনি তাঁদের মাঝে দাঁড়ালেন এবং আগের দিনের মতো বললেন। কিন্তু কেউ তাঁকে উত্তর দিলেন না।
তিনি তৃতীয় দিনে তাঁদের মাঝে দাঁড়ালেন এবং বললেন : ‘হে লোকসকল! নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের ওপর একটি কাজ ফরয করেছেন। তোমরা কি তা পালন করবে?’ তখনও কেউ তাঁর উত্তর দিলেন না। অতঃপর তিনি বললেন : ‘এ ফরয কাজটি স্বর্ণ বা রৌপ্য কিংবা খাদ্য বা পানীয় সম্পর্কিত নয়।’
তারা বললেন : ‘তাহলে সেটা আনুন।’
তখন তিনি এ আয়াতটি তাদের সামনে পাঠ করলেন। তারা বললেন : ‘যদি এটাই হয়ে থাকে, তাহলে হ্যাঁ (পালন করব)।’ অথচ তাঁদের অধিকাংশই তাঁদের কথা রাখেননি।
তারপর ইমাম রেযা (আঃ) বলেন : আমার পিতা আমার পিতামহ থেকে এবং তিনি স্বীয় পিতৃপুরুষদের মাধ্যমে হুসাইন ইবনে আলী (আঃ) থেকে আমার জন্য বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন : ‘মুহাজির ও আনসাররা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকট এসে বললেন : ‘হে রাসূল! নিশ্চয় আপনার নিজের জন্য এবং যেসব অতিথি আপনার কাছে আসে তাদের জন্য খরচ প্রয়োজন রয়েছে। আমরা আমাদের সমুদয় সম্পদ ও জীবন আপনার হাতে তুলে দিলাম। এ সম্পর্কে আপনি যে নির্দেশই দিবেন তা সঠিক সিদ্ধান্ত ও এজন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত হবেন। আপনি যা চান দান করুন আর যা চান রেখে দিন কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই।’ তখন মহামহিম আল্লাহ্ রুহুল আমীনকে প্রেরণ করলেন এবং বললেন : ‘হে মুহাম্মাদ! ‘বলুন, আমি এর বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক চাই না, শুধু নিকটাত্মীয়ের ভালোবাসা ব্যতীত।’ আমার পরে আমার নিকটাত্মীয়দের কষ্ট দিও না।’ তারপর সবাই বের হয়ে গেল।
তখন তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পরস্পরে বলতে লাগলেন : ‘রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আমাদের প্রস্তাবকে গ্রাহ্য করলেন না। আমাদেরকে তাঁর নিকটাত্মীয়ের ভালোবাসতে প্রবৃত্ত না করা ছাড়া। আর এই যে আয়াত তিনি পড়লেন তাঁর মজলিসে, এটা তাঁর নিজেরই উদ্ভাবিত।’ তাঁদের এ বক্তব্য অনেক বড় কথা ছিল। তাই আল্লাহ্ এ আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন : ‘তবে কি তারা বলে যে, সে (রাসূল) এটা উদ্ভাবন (রচনা) করেছে। বলুন, যদি আমি এটা উদ্ভাবন করে থাকি তবে তোমরা তো আল্লাহর শাস্তি থেকে আমাকে কিছুতেই রক্ষা করতে পারবে না। তোমরা যে বিষয়ে আলোচনায় লিপ্ত আছ, সে সম্বন্ধে আল্লাহ্ সর্বাধিক অবহিত। আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসাবে তিনিই যথেষ্ট এবং তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আহকাফ : ৮)
তখন নবী (সাঃ) তাঁদের সন্ধানে প্রেরণ করলেন এবং বললেন : ‘নতুন কিছু কি (তোমরা বলেছ)?’
তাঁরা বললেন : ‘জ্বি, আল্লাহর কসম, হে রাসূলুল্লাহ! আমাদের কেউ কেউ অনেক বড় কথা বলেছে যা আমরা অপছন্দ করেছি।’
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁদের জন্য এ আয়াতটি পাঠ করলেন। ফলে তাঁরা কেঁদে ফেললেন এবং অঝরে কাঁদলেন। তখন আল্লাহ্ এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন : ‘তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন ও পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন।’ এ হলো ষষ্ঠ।
আর সপ্তমটি হলো : মহান আল্লাহ্ বলেন: ‘নিশ্চয় আল্লাহ্ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপরে দরূদ প্রেরণ করেন। হে ইমানদারগণ! তোমরাও নবীর জন্য দরূদ প্রেরণ কর এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।’
তাঁদের শত্রুরাও জানে যে, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন বলা হলো : ‘হে রাসূলুল্লাহ্! আপনার ওপর দরূদ প্রেরণ আমরা বুঝলাম। কিন্তু আপনার ওপর সালাওয়াত কিভাবে?’
তিনি বললেন : ‘বলবে : ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া আলি মুহাম্মাদ কামা সল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।’
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : হে লোকসকল! এ ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে কি কোনো মতপার্থক্য রয়েছে?
তারা বলল : না।
মামুনও বললেন : এ ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য নেই। এটা সর্বসম্মত। আপনাদের কি ‘আল’ সম্পর্কে কোরআনে এর থেকে স্পষ্টতর আর কিছু রয়েছে?
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : আপনারা আমাকে বলুন দেখি : ‘ইয়াসীন, শপথ জ্ঞানগর্ভ কোরআনের, আপনি অবশ্যই রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত, আপনি সরল পথে প্রতিষ্ঠিত।’ (সূরা ইয়াসীন : ১-৪) এখানে ‘ইয়াসীন’ বলতে কী বুঝানো হয়েছে?
সকল পন্ডিত বললেন : ইয়াসীন হলো মুহাম্মাদ (সাঃ), এতে কোনো সন্দেহ নেই।
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : আল্লাহ্ এর মাধ্যমে মুহাম্মাদ ও আলে মুহাম্মাদকে এক শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, আপনাদের মধ্যে কেউ যতই বুদ্ধি খরচ করুন না কেন এর মর্ম উপলব্ধি করতে পারবেন না। এটা এজন্য যে, আল্লাহ্ কারো ওপর সালাম প্রেরণ করেননি, নবীগণ ব্যতীত। মহামহিম আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন : ‘সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহের ওপর সালাম (শান্তি) বর্ষিত হোক।’ (সূরা সাফফাত : ৭৯) আরো বলেন : ‘সালাম (শান্তি) বর্ষিত হোক মূসা ও হারুনের ওপর।’ (সূরা সাফফাত : ১২০) আল্লাহ্ কিন্তু বলেননি : ‘সালাম বর্ষিত হোক আলে নূহের ওপর।’ কিংবা বলেননি : ‘সালাম বর্ষিত হোক আলে ইবরাহীমের ওপর’, কিংবা বলেন নি : ‘সালাম বর্ষিত হোক মূসা ও হারুনের আলের ওপর’। তবে আল্লাহ্ বলেছেন : ‘সালাম বর্ষিত হোক আলে ইয়াসীনের ওপর’। (সূরা সাফফাত : ১৩০) অর্থাৎ আলে মুহাম্মদ।
মামুন বললেন : আমি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি যে, এই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নবুওয়াতের খনির মধ্যেই নিহিত। এ হলো সপ্তম।
অষ্টমটি হলো আল্লাহ্ বলেন : ‘আর জেনে রাখ, তোমরা যা গনীমত অর্জন করবে তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসূলের এবং নিকটাত্মীয়ের।’ (সূরা আনফাল : ৪১) এখানে নিকটাত্মীয়ের অংশকে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর অংশের সাথে উল্লেখ করেছেন। এটাই হলো আল ও উম্মতের মাঝে পার্থক্য। কারণ, আল্লাহ্ তাঁদেরকে এক স্থানে নির্ধারণ করেছেন আর সকল উম্মতকে নির্ধারণ করেছেন তা থেকে নিম্নতর স্থানে। আর আলের জন্য সে জিনিসই পছন্দ করেছেন যা নিজের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাঁদেরকে নির্বাচিত করেছেন। অতঃপর নিজেকে দিয়ে শুরু করেছেন, তারপর স্বীয় রাসূলকে দ্বিতীয় স্থানে এনেছেন, তারপর নিকটাত্মীয়কে যা কিছু ফাই (শত্রুর থেকে বিনা যুদ্ধে লব্ধ সম্পদ), গনীমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) ইত্যাদি থেকে আল্লাহ্ নিজের জন্য পছন্দ করেছেন, তা তাঁদের জন্যও পছন্দ করেছেন ও বলেছেন (আর তাঁর কথা সত্য) : ‘জেনে রাখ, তোমরা যা গনীমত অর্জন করবে তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসূলের এবং নিকটাত্মীয়ের।’ এটা হলো তাঁদের জন্য জোরালো গুরুত্বারোপ ও স্থির নির্দেশ, কিয়ামতের দিন পর্যন্ত, আল্লাহর সবাক কিতাবের মধ্যে যে কিতাবের মধ্যে বাতিলের প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই, না তার সামনে থেকে, না তার পেছন থেকে এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে প্রজ্ঞাবান প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে। তবে, এই আয়াতের বাকি অংশে যে বলেছেন, ইয়াতীম ও মিসকীনদেরও অংশ রয়েছে (এটা সাময়িক), কারণ, যখন ইয়াতিম সাবালক হয় তখন গনীমতের ব্যয় থেকে বাইরে চলে যায় এবং কোনো প্রাপ্য থাকে না। তদ্রুপ মিসকীনও যখন সামর্থ্যবান হয়ে যায়, তখন আর গনীমতের কোনো প্রাপ্য পায় না, তা থেকে গ্রহণ করা বৈধ থাকে না। আর নিকটাত্মীয়ের অংশ কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকে, সামর্থ্যবান থাকুক আর দরিদ্র থাকুক। কারণ, নিকটাত্মীয়রা ব্যতীত কেউ নেই যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অংশ গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহ্ নিজের জন্য তা থেকে একটি ভাগ বরাদ্দ রেখেছেন এবং তাঁর রাসূলের জন্য এক ভাগ। আর যা কিছু নিজের জন্য ও তাঁর রাসূলের জন্য পছন্দ করেছেন, তাদের জন্যও তা পছন্দ করেছেন। তদ্রুপ ফাই (শত্রুর থেকে বিনা যুদ্ধে লব্ধ সম্পদ) থেকে যা কিছু নিজের জন্য ও তাঁর রাসূলের জন্য পছন্দ করেছেন, নিকটাত্মীয়ের জন্যও তা পছন্দ করেছেন। (সূরা হাশর : ৭) যেমনভাবে গনীমতের বেলায় তাদের জন্য অনুমোদন করেছেন। নিজের দ্বারা শুরু করেছেন, তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এবং তারপর নিকটাত্মীয়। আর তাঁদের ভাগকে নিজের ভাগের ও স্বীয় রাসূলের ভাগের সাথেই যুক্ত করেছেন। মহান আল্লাহর আনুগত্যের বেলায়ও ঠিক এরূপ।
ইরশাদ হচ্ছে : ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে উলিল আমরের।’ (সূরা নিসা : ৫৯) এখানেও নিজেকে দিয়ে শুরু করেছেন। অতঃপর তাঁর রাসূলকে এবং তারপর তাঁর আহলে বাইতকে।
বেলায়াতের আয়াতের ক্ষেত্রেও একই কথা। ইরশাদ হচ্ছে : ‘তোমাদের অভিভাবক তো আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং মুমিনগণ।’ (সূরা মায়িদা : ৫৫) এখানে তাঁদের বেলায়াতকে রাসূলের বেলায়াতের সহযোগে তাঁর নিজের বেলায়াতের সাথে যুক্ত করেছেন। যেমনভাবে নিজের অংশকে রাসূলের অংশের সহযোগে তাঁদের অংশসমূহের সাথে যুক্ত করেছেন, গনীমতের ক্ষেত্রে ও ফাই-এর ক্ষেত্রে। কাজেই বরকতময় মহান আল্লাহ্, তাঁর নেয়ামত এ আহলে বাইতের ওপর কতই না মহান! আর যখন সাদাকার প্রসঙ্গ আসল তখন তিনি যাঁর স্মরণ মহীয়ান নিজেকে যেমন তা থেকে মুক্ত ঘোষণা করলেন, তেমনি তাঁর রাসূল এবং তাঁর আহলে বাইতকেও তা থেকে মুক্ত ঘোষণা করলেন। ইরশাদ হচ্ছে : সাদাকা তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান। এখানে কি কোথাও পাবেন যে, তাঁর নিজের জন্য কোনো ভাগ বরাদ্দ রেখেছেন কিংবা তাঁর রাসূলের কিংবা নিকটাত্মীয়ের জন্য? কারণ, যেহেতু নিকটাত্মীয়কে সাদাকা থেকে পবিত্র জেনেছেন, নিজেকেও পবিত্র জেনেছেন, তাঁর রাসূলকেও পবিত্র জেনেছেন এবং আহলে বাইতকেও পবিত্র জেনেছেন? না, বরং সাদাকা তাঁদের জন্য হারাম করেছেন। কারণ, সাদাকা মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর আহলে বাইতের জন্য হারাম। (কেননা,) তা জনমানুষের উচ্ছিষ্ট এবং তাঁদের জন্য হালাল নয়। কারণ, তাঁরা সকল নোংরা ও ময়লা থেকে পবিত্র হয়েছেন, (আল্লাহ্) যেহেতু তাঁদেরকে পবিত্র করেছেন এবং নির্বাচিত করেছেন, সুতরাং তাঁদের জন্য সেটাই পছন্দ করেছেন যা নিজের জন্য পছন্দ করেছেন। আর তাঁদের জন্য খারাপ মনে করেছেন যা কিছু নিজের জন্য খারাপ মনে করেছেন।
আর নবমটি হলো আমরা হলাম সেই আহলে যিকর যা আল্লাহ্ তাঁর মজবুত কিতাবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে : ‘তোমরা জিজ্ঞাসা কর আহলে যিকরকে, যদি না জান।’
তখন পন্ডিতবৃন্দ বলে উঠলেন : এখানে তো ইঙ্গিত করা হয়েছে ইহুদি ও নাসারাদেরকে।
ইমাম রেযা (আঃ) বললেন : এ রকম নির্দেশ কি শোভন যখন তারা আমাদেরকে ডাকে তাদেরই দীনের দিকে এবং দাবি করে যে, তা ইসলামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ?
তখন মামুন বললেন : হে আবাল হাসান! আপনার কাছে কি কোনো ব্যাখ্যা আছে যা পন্ডিতবৃন্দ যা বলেছেন তার বিপরীত হবে?
ইমাম বললেন : হ্যাঁ, এখানে যিকর বলতে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে আর আমরা তাঁর আহল। আল্লাহ্ এ অর্থটিকে স্বীয় কোরআনে বর্ণনা করেছেন সূরা তালাকে তাঁর বাণীর মধ্যে। ইরশাদ হচ্ছে : ‘অতএব, তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর, হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা! যারা ঈমান এনেছ। নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যিকর কে। এক রাসূল যে তোমাদের নিকট আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করে।’ (সূরা তালাক : ১০-১১) সুতরাং ‘যিকর’ হলেন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আর আমরা তাঁর আহল। এ হলো নবম।
দশমটি হলো আয়াতে তাহরীম-এ মহান আল্লাহর বাণী : ‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, কন্যা ও ভগ্নীদেরকে (আয়াতের শেষ পর্যন্ত)।’ (সূরা নিসা : ২৩) আমাকে বলুন দেখি, আমার কন্যা, আমার পুত্রের কন্যা কিংবা যে কেউ আমার বংশ থেকে আসবে, যদি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) জীবিত থাকেন তাহলে কি তাদের কাউকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে পারবেন?
তাঁরা বললেন : না।
ইমাম বললেন : বলুন তো, আপনাদের কন্যাদেরকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে পারবেন কি না?
তাঁরা বললেন : জ্বি।
ইমাম বললেন : এটা নিজেই একথা স্পষ্ট করে দেয় যে, আমরাই তাঁর আল। আর আপনারা তাঁর আল নন। যদি তাঁর আল হতেন তাহলে আপনাদের কন্যারাও তাঁর জন্য হারাম থাকত। যেমনভাবে আমার কন্যারা তাঁর জন্য হারাম। কেননা, আমরা হলাম তাঁর আল আর আপনারা তাঁর উম্মত। আর এটা হলো আল ও উম্মতের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য। কারণ, আল হলো তাঁর থেকে। আর উম্মত যারা তাঁর বংশ থেকে নয় তারা তাঁর থেকে নয়। এ হলো দশম।
এগারতম হলো আল্লাহ্ সূরা মুমিনের মধ্যে এক ব্যক্তির উল্লেখ করে বলেছেন : ‘ফিরআউনের পরিবারভুক্ত একজন মুমিন ব্যক্তি যে স্বীয় ঈমানকে গোপন রাখত, সে বলল : তোমরা কি এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করছ, যে বলছে, ‘আমার প্রতিপালক হলেন মহান আল্লাহ্’, অথচ সে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণসমূহ তোমাদের কাছে এনেছে?’ (সূরা মুমিন : ২৮০) সে ছিল ফিরআউনের খালাতো ভাই। তাকে ফিরআউনের পরিবার ও বংশভুক্ত জেনেছেন ও তার স্বধর্মী বলেন নি। তদ্রুপ আমরা হলাম রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বংশভুক্ত। আর অন্য মুসলমানদের সাথে স্বধর্মী হিসাবে একীভূত। এটাও হলো উম্মত ও আলের মধ্যে আরেকটি পার্থক্য। এ হলো এগারতম।
বারতম হলো মহান আল্লাহর এ বাণীটি : ‘এবং তোমার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দাও ও তার ওপর অবিচল থাক।’ (সূরা ত্বাহা : ১৩২) এ দ্বারা আমাদেরকে বিশেষ এক মর্যাদায় আসীন করেছেন যখন আমাদেরকে তাঁর আদেশ দ্বারা আদিষ্ট করেছেন উম্মতের বিপরীতে স্বতন্ত্রভাবে। এজন্য রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে নয় মাস যাবৎ প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সময় হলে আলী ও ফাতেমা (আঃ)-এর ঘরের দরজার কাছে আসতেন। আর বলতেন : ‘নামাযকে ধরে থাক। আল্লাহ্ তোমাদের রহমত দান করুন।’
আল্লাহ্ কোনো নবীর বংশধরকে এভাবে সম্মানিত করেননি যা তিনি আমাদের করেছেন উম্মতের মাঝে আমাদেরকে স্বতন্ত্র করার মাধ্যমে। আল ও উম্মতের মধ্যে এটাও একটি পার্থক্য।