মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর রাসুল (ﷺ) কে প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কুরআনে বর্ণনা করেন,
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ.
তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি এটাকে সকল (বাতিল) দ্বীনের উপর বিজয়ী করতে পারেন।
(সূরা তাওবা ৯/৩৩; ফাতাহ ৪৮/২৮; সফ ৬১/০৯)
আল্লাহর রাসুল (ﷺ) হিজরতের পর মদীনায় গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় সূচনা করেন। এ কাজে উনার অন্তত ১৩ বছর সময় লেগেছ। ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের এই ১৩ বছরে তাঁকে অকাতরে সহযোগিতা করেছেন কিছু দ্বীনদার আল্লাহভীরু মানুষ তথা অগ্রগামী সাহাবী। যাদের বিষয়ে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ.
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য। (সূরা তাওবা ৯/১০০)
অন্যিদকে এই ১৩ বছরে আশপাশের অনেক মানুষ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর বিরোধিতা করেছে ও তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে দ্বীন ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য। ফলে এসব লোকদেরকে ভালো করে চিনতেন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর অনুসারী সাহাবীগণ। এতো বিরোধিতা করা সত্ত্বেও দ্বীনের বিজয় যখন ঠেকা গেল না বরং ইসলামের শত্রুরা পরাজিত হয়ে গেল এবং এক পর্যায়ে সেটি আশপাশের মানুষের আকর্ষণের প্রধান বিষয় হয়ে গেল, তখন বিরোধিতাকারীদের অনেকের জীবনের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। তারা দেখতে পেলেন যে, দলে দলে মানুষ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) দশ হাজার জানবাজ মর্দে মুজাহিদ সাহাবায়ে কেরাম নিয়ে মক্কা আক্রমণ করে দ্বীনের বিজয় ছিনিয়ে আনলেন। ফলে শত্রুতা বাধ্য হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল।
তবে একদিন কোনো একটি বিষয়ে তাদের একজন অগ্রগামী সাহাবীদের একজনের সাথে ঝগড়া করে এবং কটু কথা বলে। ঘটনাটি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর কানে গেলে তিনি তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন :
الله الله فى أصحابي لا تتخذوهم غرضا من بعدي.
“খবরদার! আমার কষ্টের দিনের অকৃত্রিম সাথীদেরকে কটু কথা বলবে না এবং আমার পরে তাদেরকে টার্গেট করবে না (কষ্ট দিবে না)।”
নিচের হাদীসটি লক্ষ্য করুন, হযরত আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَ بَيْنَ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ وَبَيْنَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ شَيْءٌ فَسَبَّهُ خَالِدٌ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَسُبُّوا أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِي فَإِنَّ أَحَدَكُمْ لَوْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ.
খালিদ বিন ওয়ালীদ ও আবদুর রহমান বিন আউফের মাঝে কোনো বিষয়ে ঝগড়া হয়েছিল। এতে খালিদ তাঁকে গালি দিলেন। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “তোমরা আমার সাহাবীদের গালি দিও না। কারণ, তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় সমান সোনা দান করলেও তাদের এক মুঠো ও আধা মুঠোর সমান হবে না।” (সহীহ মুসলিম হাঃ ২৫৪১; মুসনাদে আহমদ হাঃ ১৩৮৩৯)
হযরত ছাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (ﷺ) আরো বলেন,
“إِذَا ذُكِرَ أَصْحَابِي فَأَمْسِكُوا” .
যখন আমার সাহাবাদের সম্পর্কে আলোচনা হয় তখন তোমরা তোমাদের জিহ্বার উপর লাগাম দিও। (আল মু’জামুল কাবীর লিত ত্বাবারানী হাঃ ১৪২৭)
এরপর থেকে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) আর কখনোই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সুখ-দুঃখের সঙ্গী অগ্রগামী সাহাবীদের সাথে ঝগড়া করেননি এবং তাদের গালমন্দ করেননি। এমনকি খলিফা হযরত উমার (রাঃ) খলিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) কে সেনাপতির পদ থেকে অপসরণ করলে, তিনি কোনো প্রতিবাদ না করে খলিফার রায় নির্দ্বিধায় মেনে নেন। কিন্তু বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের কেউ কেউ (যেমন মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান) রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর ইন্তেকালের পর তাঁর অকৃত্রিম সাহাবীদের অনেককের সাথে (খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত আলী রাঃ ও তাঁর সহযোগী সাহাবীদের সাথে) দুর্ব্যবহার করে এবং একপর্যায়ে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থেকে তাদেরকে বের করে দেবার চেষ্টা করে। আর এই খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে লোকমুখে ওইসব পরগাছার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় উঠে এবং এই নিন্দা অংশ পরম্পরায় চলতে থাকে। আরো পরিষ্কার করে বলে যায় যে, মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে এমন একটি দল বের হয়, যারা আল্লাহর রাসুল (ﷺ) এর প্রিয় সাহাবী খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত আলী (রাঃ), তাঁর অনুসারী সম্মানিত সাহাবী সহ আহলে বাইতের সদস্যের গালমন্দ করতে থাকে, যারা ইসলামের ইতিহাসে নাসিবী ফিরকা নামে পরিচিত।
আহলে বাইতের দুশমন এই নাসিবী সম্প্রদায় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) পূর্বেই সতর্ক করে ভবিষ্যত বাণী করেছেন,
«إِنَّ اللَّهَ اخْتَارَنِي وَاخْتَارَ أَصْحَابِي وَإِنَّهُ سَيَجِيءُ قَوْمٌ يَنْتَقِصُونَهُمْ وَيُعِيبُونَهُمْ وَيَسُبُّونَهُمْ فَلَا تُجَالِسُوهُمْ وَلَا تُؤَاكِلُوهُمْ وَلَا تُشَارِبُوهُمْ وَلَا تُصَلُّوا مَعَهُمْ وَلَا تُصَلُّوا عَلَيْهِمْ»
“অতি শীঘ্রই একটি দল বের হবে, যারা আমার সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগনকে গালি দিবে, উনাদের নাকিছ বা অপূর্ন বলবে। সাবধান! সাবধান! তোমরা তাদের মজলিসে বসবে না, তাদের সাথে পানাহার করবে না, তাদের সাথে বিয়ে-শাদীর ব্যবস্থা করবে না। অন্য রেওয়াতে আছে, তাদের পেছনে নামাজ পড়বে না এবং তাদের জন্য দোয়া করবে না।” (খতিব বাগদাদী, জামেউল আখলাক্ব, হা/১৩৫৩)
উমাইয়া রাজা আমীরে মুয়াবিয়ার শাসনামলে তিনি নিজে এবং তার নির্দেশে তার গভর্নরগণ মিম্বরে দাড়িয়ে খুতবায় খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত আলী (রাঃ) ও তাঁর অনুসারী সম্মানিত সাহাবীদের গালমন্দ শুরু করেন। শুধু তাই নয় রাস্তা ঘাটে, অলিতে-গলিতে সর্বস্তরে গালাগালির ব্যাপারটা এত প্রচণ্ড আকার ধারণ করে করেছিল যে, আমীরে মুয়াবিয়া নিজেই হযরত আলী (রাঃ) গালমন্দ করার জন্য সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) কে নির্দেশ দেন এবং গালাগাল না করায় তাঁকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দেখুন-
০১. সহীহ হাদীসে এসেছে,
أَمَرَ مُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ سَعْدًا فَقَالَ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسُبَّ أَبَا التُّرَابِ فَقَالَ أَمَّا مَا ذَكَرْتُ ثَلَاثًا قَالَهُنَّ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَنْ أَسُبَّهُ لَأَنْ تَكُونَ لِي وَاحِدَةٌ مِنْهُنَّ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ .
মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান হযরত সা’দ (রাঃ)-কে (গালির) নির্দেশ দেন অতঃপর বলেন, আবূ তুরাব (আলী) কে গালি দিতে তোমায় বাধা দিল কিসে? সা’দ (রাঃ) বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তিনটি কথা মনে রাখব, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সে সময় পর্যন্ত আমি তাকে গালমন্দ করব না। ঐগুলোর একটি কথাও আমার নিকটে লাল রংয়ের উট লাভের তুলনায় বেশি প্রিয়…..। (সহীহ মুসলিম হাঃ ২৪০৪, জামে তিরমিযী হাঃ ৩৭২৪, নাসায়ী সুনানে কুবরা হাঃ ৮৩৪২)
০২. হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানী তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সহীহ বুখারীর শরাহ ‘ফাতহুল বারী’তে বলেন, হযরত আলী (রাঃ) কে গালমন্দ করার জন্য মুয়াবিয়া যখন সা’দ (রাঃ) কে নির্দেশ দেন তখন সা’দ (রাঃ) উত্তরে বলেন,
لو وضع المنشار على مفرقي على أن أسب عليا ما سببته أبدا.
হযরত আলী (রাঃ) এর গালমন্দ করার জন্য যদি আমার মাথার ওপর করাতও রাখা হয় তবুও আমি তাকে গালি দিতে পারব না। (সুনান নাসায়ী কুবরা হাঃ ৮৪৭৭; ফাতহুল বারী ৭/৭৪)
০৩. হযরত আবু হাযিম কর্তৃক সাহল বিন সা’দ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
اسْتُعْمِلَ عَلَى الْمَدِينَةِ رَجُلٌ مِنْ آلِ مَرْوَانَ قَالَ فَدَعَا سَهْلَ بْنَ سَعْدٍ فَأَمَرَهُ أَنْ يَشْتِمَ عَلِيًّا قَالَ فَأَبَى سَهْلٌ فَقَالَ لَهُ أَمَّا إِذْ أَبَيْتَ فَقُلْ لَعَنَ اللَّهُ أَبَا التُّرَابِ……
(হযরত মুয়াবিয়ার প্রধান সহযোগী) মারওয়ান পরিবারের এক লোক মদিনার প্রশাসক পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হলো। সে সাহল বিন সা’দ (রাঃ) কে ডেকে আলী (রাঃ) কে গালি দিতে বললো। এতে সাহল (রাঃ) অস্বীকৃতি জানালেন। সে বললো, তুমি যদি তাকে গালি নাই দাও, তবে এতটুকু বলো যে, আবু তোরাব (আলী) এর উপর আল্লাহর লানত।…… (সহীহ মুসলিম হাঃ ২৪০৯)
০৪. ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন, উমাইর ইবন ইসহাক বলেন,
كَانَ مَرْوَان أَمِيرا علينا سِتّ سِنِين فَكَانَ يسب عليا كل جُمُعَة ثمَّ عزل ثمَّ اسْتعْمل سعيد بن الْعَاصِ سنتَيْن فَكَانَ لَا يسبه ثمَّ أُعِيد مَرْوَان فَكَانَ يسبه.(العلل ومعرفة الرجال لأحمد رواية ابنه عبد الله: ٤٧٨١)
“মারওয়ান (মুয়াবিয়ার শাসনকালে মদিনায়) ৬ বছর আমাদের উপর আমীর ছিল, এবং সে প্রতি জুমু’আয় আলীকে গালি দিত। এরপর তাকে সরিয়ে সাঈদ ইবনুল আসকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তিনি আলীকে গালি দিতেন না। তাই পরবর্তীতে মারওয়ানকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয় এবং সে পুনরায় আলীকে গালি দেওয়া শুরু করে”। (আল ইলাল ওয়া মা’রিফাতুর রিজাল, হাঃ ৪৭৮১)
০৫. তাবেয়ী আবদুর রহমান বিন সাবিত হযরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাছ (রাঃ) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে,
قَدِمَ مُعَاوِيَةَ فِي بَعْضِ حَجَّاتِهِ ، فَدَخَلَ عَلَيْهِ سَعْدٌ ، فَذَكَرُوا عَلِيُّاً. فَنَالَ مِنْهُ ، فَغَضِبَ سَعْدٌ ، وَقَالَ: تَقُولُ هَذَا لِرَجُلٍ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلَّمْ يَقُولُ: «مَنْ كُنْت مَوْلاَهُ فَعَلِيُّ مَوْلاَهُ». وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: «أَنْتَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُونَ مِنْ مُوْسَى إِلاَّ أَنَّهُ لاَ نَبِيَّ بَعْدي». وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: «لأُعْطِيَنَّ الرَّأَيةَ الْيَوْمَ رَجُلاً يُحِبُّ اللَّه وَرَسُولَه».
মুয়াবিয়া তার কোনো এক হজ থেকে প্রত্যাবর্তন করলে সা’দ (রাঃ) তার কাছে গেলেন। তখন দরবারের লোকজন আলী (রাঃ) এর কথা আলোচনা করলো। তখন তিনি তাঁর মানহানি করলেন। তখন সা’দ ক্ষুব্ধ হলেন এবং বললেন, তুমি কি এমন একজন লোকের ব্যাপারে এই কথা বলেছো, যার ব্যাপারে আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি, “আমি যার বন্ধু/অভিভাবক, আলীও তার বন্ধু/অভিভাবক।” তাঁকে আমি আরো বলতে শুনেছি, “তুমি আমার জন্য সেই রকম, যেরকম মূসার জন্য হারূন ছিলেন। তবে আমার পরে আর কোনো নবী নেই।” তাঁকে আমি আরো বলতে শুনেছি, “আজকে আমি এমন একজন লোককে জিহাদের ঝান্ডা দেবো, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ হাঃ ১২১; নাসায়ী সুনানে কুবরা হাঃ ৮৩৯৯; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা হাঃ ৩২০৭৮; সহীহাহ ৪/৩৩৫)।
√ হযরত আলী (রাঃ) কে গালি দেওয়া ও মানহানি করার বিরুদ্ধে উম্মুল মু’মিনীন উম্মে সালামা (রা.) এর প্রতিবাদ ও রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর সতর্কবাণী:
عن أبي عبد الله الجدلي قال: دخلت على أم سلمة فقالت لي: أَيُسَبُّ رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم فيكم؟! قلت: معاذ الله أو سبحان الله أو كلمة نحوها ! قالت: سمعت رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم يقول: «مَنْ سَبًّ عَلِيًّا فَقَدْ سَبَّنِي».
তাবেয়ী আবু আবদুল্লাহ আল-জাদালী বলেন, আমি (হযরত মুয়াবিয়ার শাসনামলে) হযরত উম্মে সালামার (উম্মুল মুমিনীনের অন্যতম) কাছে গেলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, তোমাদের মাঝে কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কে গালি দেওয়া হয়? আমি তখন মাআযাল্লাহ (আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই) বা সুবহানাল্লাহ (আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি) অথবা এ রকম অন্য কোনো শব্দ বললাম। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “যে আলীকে গালি দিল সে আমাকেই গালি দিল”। (সহীহ সনদে মুসনদে আহমদ হাঃ ২৬২০৮, ২৬৭৯১; মুস্তাদরাক হকীম হাঃ ৪৬১৫; নাসায়ী, সুনানুল কোবরা: ৮৪৭২; হাফেজ হাইছামী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৯/১৩০; শায়খ শুয়াইব আরনাঊত তাঁর মুসনদে আহমদের তাহকীক হাঃ ২৬৭৯১; আলবানী, সিলসিলা সহীহা হাঃ ৩৩৩২)
অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল পাক (ﷺ) বলেন,
مَن سبَّ عليًّا فقد سبَّني، و مَن سبَّني فقد سبَّ اللهَ.
“যে ব্যক্তি আলী (রাদিআল্লাহু আনহু)-কে গালমন্দ করে, সে আমাকেই গালমন্দ করে। আর যে ব্যক্তি আমাকে গালমন্দ করে, সে আল্লাহকেই গালমন্দ করে”। (সুয়ুতী, আল জামেউস্ সাগীর হাঃ ৮৭১৭)
মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ানের অনুসারী নাসিবীরা যখন খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত আলী (রাঃ), তাঁর অনুসারী সম্মানিত সাহাবী ও আহলে বাইতের সদস্যদের গালি দিত তখন উম্মুল মু’মিনীন উম্মে সালমা (রাঃ), সা’দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) এর মত সাহাবীদের অনেকেই তার প্রতিবাদ করতেন। যেমন গালিবাজ নাসিবীদের লক্ষ্য করে ইবনু উমার (রাঃ) বলতেন,
لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَلَمَقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةً خَيْرٌ مِنْ عَمَلِ أَحَدِكُمْ عُمْرَهُ .
তোমরা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবীদের গালি দিও না। অবশ্যই তাদের কারো এক মুহূর্তের সৎকাজ তোমাদের কারো সারা জীবনের সৎকাজের চেয়েও উত্তম। (সুনানে ইবনে মাজাহ হাঃ ১৬২)
এ প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক সাহাবীকে অন্যায় অত্যাচারও সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি হুজর বিন আদী (রাঃ) মত জলিলুল কদর সাহাবীদের জীবনও দিতে হয়েছে।
উমাইয়া রাজা আমীরে মুয়াবিয়ার শাসনামলে আমীরুল মু’মিনীন খলিফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা ওয়া মাওলানা আলী (রাঃ) এর বিরুদ্ধে গালমন্দ করার যে নিকৃষ্ট প্রথা (বিদয়াত) চালু করা হয়, পরবর্তী উমাইয়া শাসকরাও তা যুগ যুগ ধরে জারী রাখেন। দেখুন-
০১. ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন:
ثم اشتد الخطب فتنقصوه واتخذوا لعنه على المنابر سنة. (فتح الباري ٧/٧١)
“এরপর পরিস্থিতি মারাত্মক খারাপ দিকে চলে গেল, এবং তারা (উমাইয়ারা) আলীকে ছোট করা ও মিম্বারে তার উপর লানত করাকে প্রচলন বানিয়ে ফেলল”। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৭/৭১)
০২. ইবনু রজব হাম্বালী বলেন:
فأما أن تكلم بكلام محرم، كبدعةٍ أو كسب السلف، كما كان يفعله بنو أمية، سوى عمر بن عبد العزيز –رحمة الله عليه -،
“..এবং খুতবায় হারাম কথা বার্তা বলা, যেমন বিদ’আত (এর কথা) অথবা সালাফ তথা অগ্রগামী সাহাবীদের গালি দেওয়া, যেমনটি করত বনু উমাইয়ারা, শুধু উমার ইবন আব্দুল আযীয রহিমাহুল্লাহ ব্যতিক্রম ছিলেন”। (ইবনু রজব, ফাতহুল বারী ৫/১০৪)
০৩. হাফিয ইবনু আব্দিল বার আল মালিকী বলেন,
وقد كان بنو أمية ينالون منه وينقصونه فما زاده الله بذلك إلا سموا وعلواً ومحبةً عند العلماء (الإستيعاب في معرفة الأصحاب)
“এবং বনু উমাইয়ারা তাকে (আলীকে) গালি দিত ও ছোট করত, কিন্তু এর মাধ্যমে আল্লাহ তার সম্মান, মর্যাদা ও উলামাদের কাছে তার জন্য মুহাব্বত শুধু বৃদ্ধিই করেন। (আল ইসতিয়াব ১/৩৫৩)
০৪. প্রখ্যাত আলিম ও ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন বলেন,
وكان بنو أمية يسبون علياً فكتب عمر إلى الآفاق بترك ذلك. (تاريخ ابن خلدون ٣/٧٤)
“বনু উমাইয়ারা আলীকে গালি দিত, এরপর উমার ইবন আব্দুল আযীয (উমাইয়া রাজতন্ত্র শুরুর প্রায় ৬০ বছর পর) তার রাজত্বের সকল প্রান্তে (ফরমান) লিখে পাঠান এটি বন্ধ করার জন্য। (ইবনে খালদুন, তারীখ ৩/৭৪)
০৫. ইবনুল আছীর আল জাযারী বলেনঃ
كان بنو أمية يسبون أمير المؤمنين علي بن أبي طالب، إلى أن ولي عمر بن عبد العزيز الخلافة، فترك ذلك وكتب إلى العمال في الآفاق بتركه
“বনু উমাইয়ারা আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ) কে গালি দিত, এরপর উমার ইবন আব্দুল আযীয খিলাফাতের দ্বায়িত্ব গ্রহনের পর এটি বন্ধ করেন এবং সকল প্রান্তের গভর্নরদেরও (এই ঘৃণ্য পাপ) বন্ধ করতে লিখে পাঠান। (কামিল ফিত তারীখ ৪/৩১৪)
০৬. শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া বলেনঃ
وأعظم ما نقمه الناس على بني أمية شيئان أحدهما تكلمهم في علي والثاني تأخير الصلاة عن وقتها
“এবং বনু উমাইয়াদের বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের বিষয় হল দুটি জিনিস: প্রথম হল আলী’র ব্যাপারে তাদের সমালোচনা এবং দ্বিতীয় হল নির্ধারিত ওয়াক্তের থেকে নামাজে বিলম্ব করা। (মিনহাজুস সুন্নাহ ৮/১৮০)
০৭. ইমাম ইবনু হাযম বলেন,
إلا أنهم (أي خلفاء بني العباس) لم يعلنوا بسب أحد من الصحابة، رضوان الله عليهم ، بخلاف ما كان بنو أمية يستعملون من لعن عليّ بن أبي طالب رضوان الله عليه ، ولعن بنيه الطاهرين من بني الزهراء ؛ وكلهم كان على هذا حاشا عُمر بن عبد العزيز ويزيد بن الوليد رحمهما الله تعالى فإنهما لم يستجيزا ذلك (جوامع السيرة وخمس رسائل أخرى لابن حزم ١/٣٦٦)
“বনু আব্বাস এর খলীফারা বনু উমাইয়াদের মত প্রকাশ্যে সাহাবীদের মধ্যে কোন একজন সাহাবীকেও (আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন) গালি দিত না; বিপরীতে বনু উমাইয়ারা আলী ইবনু আবী ত্বলিব রাদিআল্লাহু আনহু কে গালি দিত, এবং বনু যাহরার পবিত্র বংশধরদেরকেও গালি দিত। তাদের সকলেই এ কাজে জড়িত ছিল শুধুমাত্র উমার ইবনু আব্দুল আযীয ও ইয়াযীদ ইবনুল ওয়ালীদ ব্যতীত, আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর রহম করুন, কেননা তারা এ কাজের অনুমতি দেন নি।
০৮. মুহাদ্দিস শাহ আব্দুল আযীয (রাহঃ) বলেন,
“হযরত আলী (রাঃ) কে গালমন্দ করা কিংবা গালমন্দ করার নির্দেশ দেওয়ার ঘৃণিত কাজটি মুয়াবিয়া কর্তৃক হয়েছিল, এ কথা অপ্রিয় হলেও সত্য। তবে এটা ইসলামের প্রথম ঘৃণ্য কাজ নয়। কেননা হত্যার তুলনায় এটাতো খুবই কম ঘৃণিত। হাদীসে তো পরিষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে, سباب المسلم فسوق وقتاله كفر ‘মু’মিনকে গালমন্দ করা ফাসিকী আর হত্যা করা কুফুরী’। মুয়াবিয়া কর্তৃক হত্যা ও হত্যা করার নির্দেশ পূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে যখন অস্বীকার করার উপায় নেই, তখন এ অপরাধে দোষী ব্যক্তি (মুয়াবিয়া) কে অন্ততঃ কবীরা গুনাহগার মনে করাই ভাল। তবে গালমন্দ করা থেকে মুখ সংযত রাখা উচিত।” (ফাতাওয়ায়ে আযীযিয়া, পৃঃ ৪১৩)
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর মজলুম সাহাবী আমীরুল মু’মিনীন খলিফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা ওয়া মাওলানা হযরত আলী (রাঃ) কে ভালবাসে আমরা যখন এসব ইতিহাস বর্ণনা করি তখন বর্তমান জামানার নাসিবীরা বনু উমাইয়াদের সাহাবী বিদ্বেষী না বলে আমাদের সাহাবী বিদ্বেষী বলে ব্যঙ্গ করে। তাহলে তো হাদীস, শরাহ, সীরাত, তারীখ ও ফাতাওয়া গ্রন্থে পূর্ববর্তী যে সকল ইমাম, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকীহ ও ঐতিহাসিকগণ এসব ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তাঁদেরকেও সাহাবী বিদ্বেষী বলতে হয়! এ চেয়ে বড় হাস্যকর বিষয় আর কি হতে পারে? প্রকৃতপক্ষে আহলে বাইতের দুশমন নাসিবীরাই সাহাবী বিদ্বেষী। শুধু তাই নয় বরং তারা আল্লাহরও দুশমন। দেখুন, আল-বারাআ ইবনু আযিব (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
ﻓَﻬَﺬَﺍ ﻭَﻟِﻲُّ ﻣَﻦْ ﺃَﻧَﺎ ﻣَﻮْﻟَﺎﻩُ ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﻭَﺍﻝِ ﻣَﻦْ ﻭَﺍﻟَﺎﻩُ ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﻋَﺎﺩِ ﻣَﻦْ ﻋَﺎﺩَﺍﻩُ
“আমি যার অবিভাবক আলীও তার (মাওলা) অবিভাবক। হে আল্লাহ্! যে তাকে ভালোবাসে আপনি তাকে ভালোবাসুন। হে আল্লাহ! যে তার সাথে দুশমনি করে আপনিও তার সাথে দুশমনি করুন। (সুনান ইবনে মাজাহ হাঃ ১১৬, মুসনাদে আহমাদ হাঃ ৯৫৩, ১৮০১১, সিলসিলা সহীহাহ হাঃ ১৭৫০)




