সর্বশেষ যুগ অর্থাৎ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের যুগে ইহুদীদের ভূমিকা সম্পর্কে সূরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতগুলো ব্যতীত আমাদের কাছে যদি আর কিছু অবশিষ্ট নাও থাকত তবুও ঐ আয়াতগুলো আমাদের জন্য যথেষ্ট হতো। কারণ সংক্ষিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও এ সব আয়াত হচ্ছে ঐশী বাণী বা প্রত্যাদেশ এবং এতটা বলিষ্ঠ ও সাবলীল যা ইহুদী জাতির ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অংশ বর্ণনা করেছে এবং অলৌকিক ও সূক্ষ্মভাবে তাদের ভবিষ্যৎ ভাগ্য স্পষ্ট করে চিত্রিত করেছে। এ সব আয়াত এবং অন্যান্য আয়াত ছাড়াও কিছু রেওয়ায়েত ও হাদীস আছে যেগুলোর কিয়দংশ আয়াতসমূহের ব্যাখ্যার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং বাকী কিছু অংশ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব ও বিপ্লবের যুগে ইহুদীদের সার্বিক অবস্থার ওপর আলোকপাত করে। আমরা আয়াতসমূহ ব্যাখ্যা করার পর ঐ রেওয়ায়েতগুলোও বর্ণনা করব।
ইহুদীদের ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহর প্রতিজ্ঞা :
)بسم الله الرحمان الرحيم سبحان الّذي أسرى بعبده ليلاً من المسجد الحرام إلى المسجد الأقصى الّذي بركنا حوله لنريه من آياتنا إنّه هو السّميع البصير، واتينا موسى الكتاب وجعلناه هدىً لبني إسرائيل ألّا تتّخذوا من دوني وكيلاً، ذرّية مَنْ حملنا مع نوحٍ انّه كان عبداً شكوراً(.
“পরম করুণাময় চিরদয়ালু আল্লাহর নামে। পরম পবিত্র ও মহিমান্বিত ঐ সত্তার প্রশংসা যিনি নিজ বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন যার চারদিকে আমরা পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে আমাদের (কুদরত ও মহিমার) কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও সর্বদ্রষ্টা। আর আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং সে কিতাবকে বনি ইসরাইলের জন্য হেদায়েতের পথ হিসাবে মনোনীত করেছি। (আর তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছি) তোমরা আমাকে ছাড়া আর কাউকে কার্যনির্বাহী স্থির করো না। তোমরা তাদের সন্তান (বংশধর) যাদেরকে আমি নূহের সাথে সওয়ার করিয়েছিলাম। নিশ্চয়ই সে ছিল কৃতজ্ঞ বান্দা। (বনি ইসরাইল : ১-৩)
)وقضينآ إلى بني إسرائيل في الكتاب لتفسدنَّ في الأرضِ مرّتين ولتعلنّ علوًّا كبيراً(
“আমি বনি ইসরাইলকে (তাদের) কিতাবে স্পষ্ট বলে দিয়েছি যে, তোমরা পৃথিবীতে দু’বার ফিতনা-ফাসাদ করবে এবং অন্যদের ওপর বড় ধরনের দম্ভ ও অহংকার প্রকাশ করবে। (বনি ইসরাইল : ৪)
অর্থাৎ যে তাওরাত আমরা তাদের জন্য নাযিল করেছি সেই গ্রন্থে তাদের ধ্বংস হওয়ার অমোঘ বিধানও লিখে দিয়েছি। কারণ তোমরা অচিরেই সৎপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পুনরায় সমাজে ফিতনা-ফাসাদে লিপ্ত হবে। কারণ তোমরা শীঘ্রই অন্যদের ওপর গর্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে বসবে।
)فإذا جآء وعْد أُوْلهما بعثنا عليهم عباداًلّنا أولي بأسٍ شديدٍ فجاسوا خلالَ الدِّيار، وكان وعداً مفعولاً(.
“অতঃপর যখন উক্ত ফাসাদদ্বয়ের প্রথমটির প্রতিশ্রুতিকাল উপস্থিত হবে তখন আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কতিপয় কঠোর যোদ্ধা বান্দাকে প্রেরণ করব। অতঃপর তারা (তোমাদের) প্রতিটি জনপদের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত প্রবেশ করবে। আর এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবেই।(বনি ইসরাইল : ৫)
তোমাদের প্রথম ফিতনা সৃষ্টি করার জন্য তোমাদের শাস্তির মুহুর্ত ঘনিয়ে এলে আমার তরফ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে এমন সব বান্দাকে প্রেরণ করব যারা হবে অত্যন্ত কঠোর যোদ্ধা যাতে করে তারা তোমাদেরকে প্রচণ্ড শাস্তি দেয় এবং তোমাদের ঘরে ঘরে তল্লাশী চালায়। আর এটি হবে অবশ্যম্ভাবী ঐশী অঙ্গীকার।
)ثمّ رددنا لكم الكرّة عليهم وأمددناكم بأموالٍ و بنينَ وجعلناكم أكثر نفيراً(
“অতঃপর আমি তোমাদের অনুকূলে তাদের বিরুদ্ধে পালা ঘুরিয়ে দেব, তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও পুত্র-সন্তান দ্বারা সাহায্য করব এবং তোমাদের জনবল বৃদ্ধি করে দেব (এবং তোমাদের সামরিক শক্তিও বাড়িয়ে দেব)। (বনি ইসরাইল : ৬)
ব্যাখ্যা : অতঃপর যাদেরকে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করব (তোমাদের অন্যায়-অপরাধের শাস্তি প্রদান করার জন্য) তাদের বিপক্ষে তোমাদের অনুকূলে বিজয়ের পালা আবার ঘুরিয়ে দেব। আমি তোমাদেরকে প্রভূত ধন-সম্পদ এবং বহু সন্তান-সন্ততি দান করব এবং তোমাদেরকে অধিক জনবল ও সাহায্যকারীর অধিকারী করব যারা তোমাদের সাহায্যার্থে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে।
)إنْ أحسنتم أحسنتم لأنفسكم قف وإنْ أسأتم فلها فإذا جاء وعْد الآخرةِ ليسوءا وجوهكم وليدخلوا المسجد كما دخلوه أوّل مرّةٍ وليتبّروا ما علوا تتبيراً(.
তোমরা যদি ভালো কর তবে নিজেদের জন্যই ভালো করবে। আর যদি মন্দ কর তবে তাও (তোমাদের) নিজেদের জন্যই। এরপর যখন দ্বিতীয় অঙ্গীকারের সময় এসে যাবে তখন (অন্য) বান্দাদেরকে প্রেরণ করব যারা তোমাদের মুখমণ্ডল বিকৃত করে দেবে, মসজিদে ঢুকে পড়বে যেমন প্রথমবার তারা ঢুকেছিল এবং যা কিছু তাদের করায়ত্বে আসবে তারা তা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। (বনি ইসরাইল : ৭)
আর তখন তোমাদের অবস্থা এমনই হবে এবং তোমরা যদি তওবা কর, যে সব নেয়ামত অর্থাৎ ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে সেগুলোর মাধ্যমে সৎকাজ কর, তাহলে তা তোমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। আর যদি তোমরা অসৎকর্ম সম্পাদন, সীমা লঙ্ঘন, নাফরমানী এবং অন্যদের চেয়ে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করতেই থাক, তাহলে তোমাদের এ আচরণের অশুভ পরিণতি তোমাদেরকেই বহন করতে হবে। তবে তোমরা শীঘ্রই ভালো কাজ তো করবেই না, বরং গর্হিত অন্যায় কাজেই হাত দেবে (এবং তা করতেই থাকবে)। তোমাদের দ্বিতীয় ফিতনার জন্য তোমাদের শাস্তিপ্রাপ্তির সময় আসা পর্যন্ত আমরা তোমাদেরকে সুযোগ দিচ্ছি। দ্বিতীয় অপরাধের শাস্তির সময় যখন আসবে তখন আমরা আমাদের তরফ থেকে এমন সব ব্যক্তিদেরকে প্রেরণ করব যারা তোমাদের সাথে প্রথম বারের চেয়েও অনেক বেশি কঠোর আচরণ প্রদর্শন করবে। যে সব বিপদ তোমাদের অপছন্দ তোমাদের ওপর সেই সব বিপদ তারা আনয়ন করবে। অতঃপর তারা বিজয়ীবেশে মসজিদুল আকসায় প্রবেশ করবে এবং প্রথমবার শত্রুরা যেভাবে তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছিল ও তোমাদের ঘরবাড়ীগুলোয় তল্লাশী চালিয়েছিল ঠিক সেভাবে তারা তোমাদের ঘরে ঘরে তল্লাশী চালাবে এবং তোমাদের শ্রেষ্ঠান্বেষী মনোবৃত্তি এবং গোলযোগ সৃষ্টি ও অপরাধ করার প্রবণতার ধ্বংস সাধন করবে।
)عسى ربّكم ان يرحمكم وإن عدتم عدنا وجعلنا جهنّم للكافرين حصيراً(.
হয়তো তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। কিন্তু যদি পুনরায় তদ্রূপ কর, আমিও পুনরায় তাই করব। আমি জাহান্নামকে কাফিরদের জন্য সংকীর্ণ কয়েদখানা হিসাবে নির্ধারণ করেছি। (বনি ইসরাইল: ৮)
সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক দ্বিতীয়বার শাস্তি প্রদান করার পর অনুগ্রহ করে তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন; আর দ্বিতীয়বার শাস্তিপ্রাপ্তির পর যদি তোমরা আবারও বিচ্যুত হও, তাহলে আমরাও তোমাদেরকে আবার শাস্তি দেব এবং তোমাদের ওপর এ পার্থিব জগতেই সীমাবদ্ধতা আরোপ করব। আর আখেরাতে দোযখকে তোমাদের জন্য সংকীর্ণ জেলখানায় পরিণত করব।
আমরা পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহ থেকে প্রথম যে সিদ্ধান্তে উপনীত হই তা হলো : হযরত মূসা (আ.)-এর পরে তাদের চূড়ান্ত ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত ইহুদী জাতির ইতিহাসের সারসংক্ষেপ হচ্ছে এই যে, তারা সমাজে ফিতনা-ফাসাদ অব্যাহত রাখবে। এরপর যখন তাদের শাস্তিপ্রাপ্তির মুহূর্ত উপস্থিত হবে তখন মহান আল্লাহ্ তার পক্ষ থেকে একদল বান্দাকে প্রেরণ করবেন যারা তাদের ওপর বিজয়ী হবে। অতঃপর মহান আল্লাহ্ বিশেষ কিছু কল্যাণের ভিত্তিতে ইহুদীদেরকে তাদের ওপর বিজয়ী করে দেবেন। তাদেরকে বিপুল ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি প্রদান করবেন এবং পৃথিবীতে ঐ জাতির চেয়েও তাদের সমর্থকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেবেন। কিন্তু ইহুদীরা তাদের এ সম্পদ এবং সঙ্গী-সাথীদেরকে যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করবে না, বরং তারা এ সব নেয়ামতের অপব্যবহারই করবে। তারা দ্বিতীয়বারের মত পৃথিবীতে ফিতনা করবে। অবশ্য এবার তারা ফিতনা ছাড়াও দম্ভ ও শ্রেষ্ঠত্বকামিতার দোষেও আক্রান্ত হবে। তারা নিজেদেরকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য ও জাহির করবে। আর যখন তাদের শাস্তি প্রদানের সময় এসে যাবে তখন তিনি পুনরায় ঐ জাতিকে তাদের ওপর বিজয়ী করে দেবেন এবং তাদেরকে তিন পর্যায়ে এবং প্রথমবারের চেয়েও অত্যধিক কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।
দ্বিতীয় ফলাফল ও সিদ্ধান্ত হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ্ যে জাতিকে তাদের বিরুদ্ধে প্রথমবার প্রেরণ করবেন, খুব সহজেই তাদেরকে ইহুদীদের ওপর বিজয়ী করবেন এবং তারা তাদের ঘরে ঘরে তল্লাশী চালাবে। তখন তারা মসজিদুল আকসায় প্রবেশ করে তাদের সামরিক শক্তি ধ্বংস করে দেবে। এরপর মহান আল্লাহ্ দ্বিতীয় বার তাদেরকে প্রেরণ করবেন এবং তাদের ওপর ইহুদীদের প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব এবং সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক ও সঙ্গী-সাথীদের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও বিপরীতে তিন পর্যায়ে তারা তাদের ওপর তীব্র মরণাঘাত হানবে। প্রথম পর্যায়ে তারা ইহুদীদের অপবিত্র কুৎসিত চেহারা প্রকাশ এবং তাদেরকে অপমানিত করবে। যেমনভাবে তারা প্রথমবার মসজিদুল আকসায় প্রবেশ করেছিল ঠিক তদ্রূপ তারা মসজিদুল আকসায় বিজয়ীবেশে প্রবেশ করবে। এরপর তারা ইহুদীদের দম্ভ ও অন্যান্য জাতির ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্বের দর্পকে চূর্ণ করে দেবে।
মুফাসসিররা যে মৌলিক প্রশ্নটি এ স্থলে উত্থাপন করেছেন সেটি হচ্ছে এই যে, এ দু’ধরনের ফিতনা যার একটির সাথে দম্ভ ও শ্রেষ্ঠত্বকামিতাও যুক্ত রয়েছে তার কি পরিসমাপ্তি ঘটেছে অথবা উক্ত প্রতিশ্রুত শাস্তিদ্বয় কি ইতোমধ্যে তাদেরকে দেয়া হয়েছে নাকি এখনো দেয়া হয়নি।
কতিপয় মুফাসসির বিশ্বাস করেন যে, উক্ত প্রতিশ্রুত শাস্তিদ্বয় বাস্তবায়িত হয়েছে এভাবে যে, প্রথম ফিতনার শাস্তি বানুখায্ নাসর (বখতুন নাসর) এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের ফিতনার শাস্তি রোমান ‘টাইটাসের’ হাতে সংঘটিত হয়েছে। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে, প্রতিশ্রুত শাস্তিদ্বয় এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিমত হচ্ছে এই যে, ইহুদীদের প্রথমবারের ফিতনার বরাবরে প্রথম শাস্তি ইসলামের প্রাথমিক যুগেই মুসলমানদের হাতে বাস্তবায়িত হয়েছে। আর যখন মুসলমানরা ইসলাম ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় তখন মহান আল্লাহ্ ইহুদীদেরকে তাদের ওপর বিজয়ী করে দিয়েছেন। এ পর্যায়ে আবারও ইহুদীরা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ও সীমা লঙ্ঘন করেছে। আর যখনই মুসলমানরা ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে তখনই দ্বিতীয় শাস্তির সময় এসে যাবে এবং তা মুসলমানদের হাতে পুনরায় বাস্তবায়িত হবে। আর এ ব্যাখ্যারই ভিত্তিতে আহলে বাইতের ইমামদের থেকে বেশ কিছু রেওয়ায়েতও বর্ণিত হয়েছে। যেমন : মহান আল্লাহ্ যে গোষ্ঠীকে দ্বিতীয় পর্যায়ে ইহুদীদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করবেন তাঁরা হবেন ইমাম মাহ্দী (আ.) এবং তাঁর সঙ্গীসাথীরা যাঁরা হবেন কোমবাসী এবং তাঁরা মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের আগেই প্রেরিত হবেন। তাফসীরে আইয়াশীতে ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি
)بعثنا عليكم عباداً لنا أُولي بأسٍ شديد(
‘তোমাদের ওপর আমাদের একদল বান্দাকে প্রেরণ করব যারা হবে কঠোর যোদ্ধা ও শক্তির অধিকারী’- এ আয়াতটি পাঠ করে বললেন: এ আয়াতের উদ্দেশ্য হলো হযরত কায়েম আল মাহ্দী এবং তার সঙ্গীসাথী যারা হবে শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী ও দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন।
‘নূরুস সাকালাইন’ নামক তাফসীরে ও ‘রওযাতুল কাফী’ গ্রন্থ হতে ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে :
“হযরত কায়েম আল মাহ্দীর আবির্ভাবের আগে মহান আল্লাহ্ এমন এক জাতিকে প্রেরণ করবেন যারা আলে মুহাম্মদ (সা.)-এর একজন শত্রুকেও জীবিত রাখবে না।
‘বিহারুল আন্ওয়ার’ গ্রন্থে ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত : “যখন তিনি এ আয়াতটি পাঠ করলেন তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম : আপনার জন্য আমরা উৎসর্গীত হই, তাঁরা কারা?” ইমাম তিনবার বললেন : মহান আল্লাহর শপথ, তারা কোমের অধিবাসী; মহান আল্লাহর শপথ, তারা কোমের অধিবাসী। (বিহার ৬০তম খণ্ড, পৃ. ২১৬)
এ তিন রেওয়ায়েত অর্থ ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে এক ও পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল এবং এগুলোর মধ্যে কোন বিরোধ নেই। কারণ কোমের অধিবাসীরা অর্থাৎ ইরানীরাই হবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সঙ্গী-সাথী যাঁদেরকে মহান আল্লাহ্ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য প্রেরণ করবেন এবং রেওয়ায়েতসমূহ অনুসারে হযরত মাহ্দীর (আ.) আবির্ভাবকালে তাঁর বিশেষ সঙ্গীসাথীদের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক ব্যক্তি কোমবাসী অর্থাৎ ইরানীদের মধ্যে হতে বিদ্যমান থাকবে। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভূত হওয়া পর্যন্ত এ সব জনগণ এবং তাদের মুসলিম সমর্থকদের বিরুদ্ধে ইহুদীদের প্রতিরোধ কয়েক ধাপে সম্পন্ন হবে। তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর নেতৃত্বে এবং তাঁর শক্তিশালী হস্তেই ইহুদীদের চূড়ান্ত ধ্বংস সাধন হবে।
ইহুদীদের প্রতিশ্রুত দ্বিতীয় শাস্তিপ্রাপ্তি যে মুসলমানদের হাতেই হবে তা নির্দেশকারী যে সব বিষয় আছে সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত এ বিষয়টিও যে, যে জাতিকে ইহুদীদের বিরুদ্ধে পুনরায় প্রেরণ করার প্রতিশ্রুতি মহান আল্লাহ্ দিয়েছেন আসলে তারা একই উম্মতভুক্ত এবং তাদের যে সব বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো এবং ইহুদীদের সাথে তাদের যুদ্ধের বিশেষত্বসমূহ কেবল মুসলমানদের সাথেই মিলে যায়। কারণ মিশর, ব্যাবিলন, গ্রীস, ইরান, রোমের বাদশাহরা এবং অন্যান্য জাতির শাসকবৃন্দ যারা ইহুদীদের ওপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য কায়েম করেছিল তাদের সাথে عباداً لنا (আমাদের কতিপয় বান্দা)- এ বৈশিষ্ট্যটি খাপ খায় না। আর প্রথম শাস্তির বর্ণনা সম্বলিত আয়াতের পরের আয়াতগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী ঐ সব রাজা-বাদশাহ্ ও শাসকবর্গের ওপর ইহুদীদের বিজয়ী হবারও কোন ঘটনা এখনো ঘটে নি। অথচ ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানদের হাতে ইহুদীদের প্রথম শাস্তিভোগের পর তারা বর্তমানে আমাদের ওপর বিজয়ী হয়েছে। আর মহান আল্লাহ্ তাদেরকে এমনভাবে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করেছেন যে বিশ্বে তাদের সমর্থকদের সংখ্যা মুসলমানগণ এবং তাদের মিত্রদের চেয়েও বেশি এবং তারা পরাশক্তিবর্গের সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই আমাদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছে ও বিদ্রোহ করেছে। আর এ সব ইহুদীই পৃথিবীর বুকে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ করছে এবং আমাদের ও অন্যান্য বঞ্চিত জাতির ওপর গর্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্য বিস্তার করছে। কুফরের বিরুদ্ধে সংগ্রামকারী ইসলামের মুজাহিদরাই তাদের ঘৃণ্য কুৎসিত দেহ ও মুখমণ্ডলের ওপর তীব্র আঘাত হানবে এবং তাদেরকে ধ্বংস করবে।
যারা ইহুদী জাতির ইতিহাস সম্পর্কে সামান্য পড়াশোনা করেছেন এবং জানেন তাদের কাছে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট। আর আমরা তা খুব শীঘ্রই উল্লেখ করব।
ইহুদীদের ওপর চিরস্থায়ী বিজয় লাভ করার ব্যাপারে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি
মহান আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে বলেছেন : “তোমার প্রভু ঘোষণা করেছেন : তিনি এমন সব ব্যক্তিকে ইহুদীদের ওপর বিজয়ী করবেন যারা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তাদেরকে শাস্তি দেবে। আর মহান আল্লাহ্ই দ্রুত শাস্তি দানকারী। তিনিই ক্ষমাকারী ও দয়ালু। মহান আল্লাহর শাস্তিসমূহের একটি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে পৃথিবীতে দলে দলে বিভক্ত করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৎকর্মশীল এবং কেউ কেউ অসৎকর্মশীল। আর আমরা তাদেরকে ভালো ও মন্দ দিয়ে পরীক্ষা করেছি; সম্ভবত তারা তওবা করে সত্য ও হেদায়েতের পথে প্রত্যাবর্তন করবে। (সূরা আল আরাফ : ১৬৭-১৬৮)
এ দু’ আয়াতের অর্থ হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন এবং অবধারিত করে দিয়েছেন যে, অতি শীঘ্রই তিনি কাউকে ইহুদীদের ওপর কর্তৃত্বশীল করে দেবেন যে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তাদের শাস্তি দেবে। মহান আল্লাহ্ই দ্রুত শাস্তি বিধায়ক এবং তিনিই ক্ষমাকারী ও দয়ালু। ইহুদীদের ব্যাপারে মহান আল্লাহর একটি শাস্তি হচ্ছে এ রকম : পৃথিবীর বুকে তিনি তাদেরকে দলে দলে বিভক্ত এবং একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবেন। তাদের মধ্যকার একদল হবে সৎকর্মশীল এবং অপর দলটি হবে অসৎকর্মশীল; আর তিনি তাদেরকে ভালো ও মন্দ দিয়ে পরীক্ষা করবেন। এর ফলে আশা করা যায় যে, তারা তওবা করবে এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত হবে।
হযরত মূসা (আ.), হযরত ইউশা (আ.), হযরত দাউদ (আ.) এবং হযরত সুলায়মান (আ.)-এর মতো নবীদের শাসনকাল ব্যতীত ইতিহাসের অন্যান্য পর্যায়ে ইহুদীদেরকে শাস্তি দান সংক্রান্ত মহান আল্লাহর ওয়াদা বাস্তবায়িত হওয়ার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করি। মহান আল্লাহ্ বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়কে ইহুদীদের ওপর কর্তৃত্বশীল করে দিয়েছিলেন যারা তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দিয়েছে এবং বিভিন্ন ধরনের বেদনাদায়ক নির্যাতনও চালিয়েছে।
কখনো কখনো বলা হয়ে থাকে যে, মিশর, ব্যাবিলন, গ্রীস, প্রাচীন পারস্য (ইরান), রোমের বাদশাহরা ও অন্যান্যরা ইহুদীদের ওপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার করে তাদেরকে কঠোর শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করিয়েছে। কিন্তু মুসলমানরা তাদের সাথে এ ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করেনি, বরং তারা কেবল তাদের সামরিক শক্তির ওপর বিজয়ী হয়েছিল এবং এরপর বিজয়ী মুসলমানরা ইসলামী হুকুমতের ছায়াতলে ইহুদীদের বসবাস ও জীবন যাপন, তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক স্বাধীনতা এবং যাবতীয় অধিকার ভোগ করার বিষয়টি তাদের জিযিয়া কর প্রদানের বিনিময়ে মেনে নিয়েছিল।
তবে এর উত্তরে বলতে হয় যে : তাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তির স্বাদ মুসলমানরা আস্বাদন করিয়েছিল এর অর্থ এ নয় যে, সব সময় তারা তাদেরকে হত্যা অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করেছে অথবা কারাগারে বন্দী করে রেখেছে ঠিক যেমনভাবে ইসলাম-পূর্ব বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী তাদের ওপর বিজয়ী ও কর্তৃত্ব লাভের পর করেছিল। বরং এর অর্থ হচ্ছে, তারা সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এমন প্রশাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল যাদেরকে মহান আল্লাহ্ তাদের ওপর কর্তৃত্বশীল ও বিজয়ী করেছিল এবং এ ক্ষেত্রে মুসলমানরা ইহুদীদের শাস্তি ও নির্যাতন করার ব্যাপারে অন্যান্য জাতি ও সম্প্রদায়ের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কোমল আচরণ ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছে। তবে তারা (বিজয়ী মুসলমানরা) ছিল ইহুদীদের ওপর কর্তৃত্বশীল এবং এটিও তাদেরকে শাস্তি-প্রদানের বাস্তব নমুনা।
কখনো কখনো বলা হয় যে : ইহুদীদের ইতিহাস তাদের ওপর মহান আল্লাহর (অবিরত শাস্তি প্রদানের) এ ওয়াদা বাস্তবায়নের বিষয়ে সাক্ষ্য দান করে। কিন্তু বর্তমানে এক শতাব্দী অথবা অর্ধ শতাব্দী গত হয়ে যাওয়ার পরও যে ব্যক্তি তাদেরকে শাস্তি দেবে সে তাদের ওপর এখনো কর্তৃত্ব স্থাপন করেনি। উপরন্তু অর্ধ শতাব্দীরও অধিককাল ধরে অর্থাৎ ১৯৩৬ সাল থেকে ইহুদীরা ফিলিস্তিন ও অন্যান্য অঞ্চলে মুসলমানদের ওপর সবচেয়ে জঘন্য পন্থায় নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। তাই এ বিষয়কে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে?
এর জবাব হচ্ছে : ইহুদীদের ইতিহাসের এ অধ্যায়টি আলাদা করে হিসাব করা উচিত। কারণ এটি হচ্ছে তাদের ক্ষমতা ও শক্তি অর্জনের যুগ- যার প্রতিশ্রুতি মহান আল্লাহ্ সূরা ইসরায় দিয়ে বলেছেন : “অতঃপর আমরা (যাদেরকে তোমাদের বিরুদ্ধে জয়ী করেছিলাম) তাদের ওপর তোমাদেরকে বিজয়ী করব এবং তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেব এবং তাদের সংখ্যার চেয়েও তোমাদের বন্ধু ও হিতাকাঙ্ক্ষীদের সংখ্যা বেশি করে দেব যাতে করে তোমাদের সহযোগিতায় তারা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।” সুতরাং এ যুগটি ইহুদী জাতির ওপর অন্যদের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার সংক্রান্ত সার্বিক অঙ্গীকার থেকে বাইরে। আর এ অবস্থাটি মুসলমানদের হাতে ইহুদী জাতির পুনরায় শাস্তি প্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।এক্ষেত্রে পবিত্র ইমামদের থেকে প্রচুর রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহর এ অঙ্গীকারটিও মুসলমানদের হাতেই বাস্তবায়িত হবে। বিশেষ করে এ ব্যাপারে ‘মাজমাউল বায়ান’ গ্রন্থের রচয়িতা আল্লামা তাবারসী উপরিউক্ত আয়াতের তাফসীরে এ অর্থ ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মুফাসসিরদের ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করে বলেছেন : সকল মুফাসসিরের দৃষ্টিতে এ আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত। আর ঠিক এ অর্থ ও ব্যাখ্যাই ইমাম বাকির (আ.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। আলী ইবনে ইবরাহীম কোমী এ অর্থটি তাঁর তাফসীর গ্রন্থে আবীল জারুদের সূত্রে ইমাম বাকির থেকে বর্ণনা করেছেন।
ইহুদীদের সৃষ্ট যুদ্ধের আগুন নির্বাপিত করা সংক্রান্ত মহান আল্লাহর অঙ্গীকার
মহান আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে বলেছেন : “ইহুদীরা বলে, মহান আল্লাহর হাত বাঁধা। তাদের হাতই বাঁধা হয়ে যাক। আর এ কথা বলার কারণে তারা মহান আল্লাহর রহমত হতে দূরে সরে গেছে। বরং মহান আল্লাহর হস্তদ্বয় উন্মুক্ত ও প্রসারিত এবং তিনি যেভাবে চান সেভাবে দান করেন।… যা কিছু আপনার প্রভুর পক্ষ থেকে আপনার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে তা তাদের অবাধ্যতা, বিরুদ্ধাচরণ ও কুফরী আরো বাড়িয়ে দেয় এবং আমরা তাদের মাঝে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত শত্রুতা নিক্ষেপ করেছি। আর যখনই তারা যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছে ঠিক তখনই মহান আল্লাহ্ তা নির্বাপিত করে দিয়েছেন। তারা পৃথিবীতে ফিতনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। আর মহান আল্লাহ্ ফিতনা সৃষ্টিকারীদেরকে ভালোবাসেন না। (সূরা মায়েদাহ্ : ৬৪)
ইহুদীরা যে সব যুদ্ধের আগুন লাগাবে সেগুলো নির্বাপিত করা সংক্রান্ত এই হচ্ছে মহান আল্লাহর ওয়াদা। প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করার স্বভাব ও মনোবৃত্তি তাদের থাকুক অথবা অন্যদেরকে তারা এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকুক না কেন, মহান আল্লাহর এ ওয়াদার কোন ব্যতিক্রম নেই। কারণ كلّما أوقدوا অর্থাৎ যখনই তারা যুদ্ধের আগুন লাগাবে -এ বাক্য সহকারে উক্ত আয়াতটিতে মহান আল্লাহর এ অঙ্গীকার বর্ণিত হয়েছে।
ইহুদীদের অতীত ও বর্তমান ইতিহাস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তারা যুদ্ধ ও গোলযোগের আগুন প্রজ্বলিত করার ব্যাপারে সর্বদা চেষ্টা করত। কিন্তু মহান আল্লাহ্ মুসলিম উম্মাহ্ ও মানব জাতির ব্যাপারে তাঁর ওয়াদা বাস্তবায়ন করেছেন, তাদের নীলনক্সা ও ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছেন এবং তাদের প্রজ্বলিত যুদ্ধের আগুনও নির্বাপিত করেছেন। সম্ভবত তাদের সবচেয়ে বৃহত্তম যুদ্ধ ও গোলযোগের আগুন যা তারা মুসলিম উম্মাহ্ ও সমগ্র বিশ্বের বিরুদ্ধে প্রজ্বলিত করেছে তা হচ্ছে বর্তমান কালের যুদ্ধ যার বিস্তৃতি ঘটানোর জন্য তারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকেও উস্কে দিচ্ছে। আর তারা নিজেরাই প্রত্যক্ষভাবে ফিলিস্তিনে এবং পরোক্ষভাবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বিবাদমান পক্ষ। আর এ যুদ্ধ প্রশমিত করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর ওয়াদা বাস্তবায়িত হওয়ার তেমন কিছু বাকী নেই। তবে উল্লিখিত আয়াত থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, তাদের দ্বারা প্রজ্বলিত যুদ্ধের আগুন নির্বাপিত করার একটি পথ হলো তাদের অভ্যন্তরীণ শত্রুতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত যা মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। এ কথার পক্ষে প্রমাণ হচ্ছে, উক্ত আয়াতে তাদের মাঝে অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও শত্রুতার বীজ বপন করার পরপরই إطفاءُ النّار অর্থাৎ যুদ্ধের আগুন নির্বাপিত করার কথা উল্লিখিত হয়েছে। যেন প্রজ্বলিত যুদ্ধের আগুন নির্বাপিত করার বিষয়টি তাদের নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ ও শত্রুতার উদ্ভব ঘটানোর মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে।
“আর আমরা রোজ কিয়ামত পর্যন্ত তাদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে দিয়েছি; আর যখনই তারা কোন যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করবে, মহান আল্লাহ্ তখনই তা নিভিয়ে দেবেন।”
এটি হলো ইহুদীদের ইতিহাসের একটি অংশ মাত্র। ‘ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের ক্ষেত্রপ্রস্তুতকারীরা’ নামক গ্রন্থে আমরা পবিত্র কোরআনের যে সব আয়াতে ইহুদীদের ব্যাপারে মহান আল্লাহর অঙ্গীকারত্রয়ের কথা ব্যক্ত হয়েছে সেগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি।
আবির্ভাবের যুগে ইহুদীদের ভূমিকা সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহের মধ্য থেকে গুটিকতক রেওয়ায়েত ইহুদীদের অস্তিত্ব বিলুপ্তকারী যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার আগে ফিলিস্তিনে ইহুদীদের আগমন ও বসতি স্থাপন এবং তাদের সে দেশটি জবর দখলের সাথেই সংশ্লিষ্ট। আর এ রেওয়ায়েতগুলো নিম্নোক্ত আয়াতেরও ব্যাখ্যাস্বরূপ। আয়াতটি হলো: “আর তার পরে আমরা বনি ইসরাইলকে বললাম : তোমরা পৃথিবীতে বসবাস কর। আর যখন কিয়ামত দিবস ঘনিয়ে আসবে তখন তোমাদেরকে একে অন্যের সাথে মিশ্রিত করে পুনরুত্থিত করব। (মুস্তাদরাক, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৪৭৬)
অর্থাৎ আমরা তোমাদেরকে প্রতিটি প্রান্ত অর্থাৎ এলাকা থেকে অথবা তোমাদের সকলকে একত্রিত করব। আর ঠিক এভাবেই ‘নূরুস সাকালাইন’ নামক তাফসীর গ্রন্থেও এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। আক্কায় তাদের আগমন এবং সেখানে তাদের যুদ্ধের ব্যাপারেও উপরিউক্ত হাদীসটি থেকে এ ধারণা জন্মে। মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “তোমরা কি ঐ নগরীর নাম শুনেছ যার খানিকটা অংশ সমুদ্রের ভিতরে।” যখন তাঁকে সবাই হ্যাঁ বলল, তখন মহানবী বললেন : “নবী ইসহাক (আ.)-এর বংশধর হতে সত্তর হাজার ব্যক্তি কর্তৃক ঐ শহর আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। (মুস্তাদরাক, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৪৭৬)
হযরত আলী (আ.) বলেছেন : “আমি মিশরে একটি মিম্বার স্থাপন করে অবশ্যই দামেশক ধ্বংস করব এবং আরবের শহর ও নগরসমূহ থেকে ইহুদীদেরকে বিতাড়িত করব। আর এ লাঠি দিয়েই আমি আরবদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যাব।” এ হাদীসটির রাবী (আবায়াহ্ আল আসাদী) বলেন : “আমি জিজ্ঞাসা করলাম : হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি এমনভাবে বলছেন এবং ভবিষ্যতের খবর দিচ্ছেন যেন আপনি নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর পর জীবিত হবেন?” তখন তিনি বললেন, “হে আবায়াহ্! তুমি আমাদের পথ হতে ভিন্ন পথ ও মতানুযায়ী কথা বলছ। আমার বংশধারা হতে এক ব্যক্তি (ইমাম মাহ্দী) এ সব কাজ সম্পাদন করবে। (বিহার, ৫৩তম খণ্ড, পৃ. ৬০)
এ রেওয়ায়েত থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইহুদীরা আরবদের বহু শহর ও নগরের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে অথবা সে সব শহর ও নগরে তাদের জোর প্রভাব বিস্তারমূলক সক্রিয় উপস্থিতি থাকবে। আর আমরা শামদেশের এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের আন্দোলনকেন্দ্রিক ঘটনাবলী বর্ণনা করার সময় সুফিয়ানী ও ইহুদীদের বিরুদ্ধে ইমাম মাহ্দীর যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা করব।
রেওয়ায়েতসমূহের মধ্যে ইহুদীদের উপাসনালয় আবিষ্কারের হাদীসটিও আছে। আর ‘উপাসনালয় আবিষ্কার’- ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের নিদর্শনসমূহের মধ্যে গণ্য হয়েছে। সম্ভবত হযরত সুলাইমান (আ.)-এর উপাসনালয়ই আবিষ্কৃত হবে। ইমাম আলী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের বেশ কিছু নিদর্শন আছে। নিদর্শনগুলো হচ্ছে : গোপনে ওঁৎ পাতা এবং পাথর নিক্ষেপ করার মাধ্যমে কুফা নগরীকে অবরুদ্ধ করা, কুফার রাস্তা ও অলিগলির বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরা, ৪০ দিবারাত্রি মসজিদসমূহ বন্ধ রাখা (নামায পড়তে না দেয়া), উপাসনালয় আবিষ্কার এবং বড় মসজিদের (মসজিদুল হারাম) চারপাশে পতাকাসমূহের পত্পত্ করে ওড়া। এ যুদ্ধের হত্যাকারী ও নিহত উভয়ই জাহান্নামী হবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৭৩)
তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারীদের পক্ষ থেকেও ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের একটু আগে উপাসনালয়টি আবিষ্কৃত হতে পারে। কারণ রেওয়ায়েতে উল্লিখিত হয় নি যে, কে সেটি আবিষ্কার করবে। ঠিক একইভাবে তা কোন ঐতিহাসিক নিদর্শনও হতে পারে যা হযরত সুলাইমান (আ.) কর্তৃক নির্মিত উপাসনালয় হতে ভিন্ন কিছু এবং বাইতুল মুকাদ্দাসে না হয়ে অন্য কোন স্থানে তা অবস্থিত। কারণ, ‘উপাসনালয় আবিষ্কার’- এ কথাটি কোন শর্ত ছাড়াই উল্লিখিত হয়েছে।
এ রেওয়ায়েতের প্রথম দিকে কুফা নগরীর যুদ্ধাবস্থার কথা উল্লিখিত হয়েছে। আর অন্যান্য রেওয়ায়েতে কুফার পরিবর্তে ইরাকের যুদ্ধাবস্থার কথা উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু এ রেওয়ায়েত কুফা নগরী অবরোধ, সেখানে প্রস্তর নিক্ষেপ এবং এ নগরীর অলি-গলি ও মহাসড়কসমূহে প্রতিরক্ষাব্যূহ নির্মাণ অর্থেই হবে। তবে মসজিদুল হারামের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের পতাকা হিজাযের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সে দেশের গোত্রসমূহের সংঘর্ষ ও দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকেই ইঙ্গিত দান করে যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের সামান্য আগ দিয়ে সংঘটিত হবে। আর এ ব্যাপারে প্রচুর রেওয়ায়েত বিদ্যমান।
আরো কিছু রেওয়ায়েত আছে যেগুলোতে ঐ সব ব্যক্তির নাম স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে যাঁদেরকে মহান আল্লাহ্ ইহুদীদের ফিতনা সৃষ্টি এবং আধিপত্য বিস্তারের পর তাদের ওপর কর্তৃত্বশীল ও বিজয়ী করে দেবেন। এ সব রেওয়ায়েতের মধ্যে গুটিকতক রেওয়ায়েত পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহ ব্যাখ্যা করার জন্য বর্ণনা করা হয়েছে এবং কতিপয় রেওয়ায়েত আবির্ভাবকালে ইরান ও ইরানী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সংক্রান্ত। যেমন : কালো পতাকাসমূহের রেওয়ায়েত যা অর্থগতভাবে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত। “খোরাসান থেকে কালো পতাকাসমূহ বের হবে পবিত্র কুদসে (বাইতুল মুকাদ্দাস) পত্পত্ করে ওড়া পর্যন্ত কোন কিছুই সেগুলোকে প্রতিহত ও ফিরিয়ে রাখতে সক্ষম হবে না।”
ইমাম মাহ্দী (আ.) কর্তৃক শাম, ফিলিস্তিন ও তাবারীয়ার হ্রদের নিকট অবস্থিত একটি পাহাড় এবং আনতাকীয়ার গুহা থেকে প্রকৃত তাওরাত উদ্ধার এবং উদ্ধারকৃত ঐ তাওরাতের মাধ্যমে ইহুদীদের কাছে [ইমাম মাহ্দী (আ.) কর্তৃক] যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহও এ সব রেওয়ায়েতেরই অন্তর্ভুক্ত।
মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “তাওরাত ও ইঞ্জিল এমন এক স্থান থেকে উদ্ধার করা হবে যা ‘আনতাকীয়াহ্’ নামে পরিচিত। (বিহার, ৫১তম খণ্ড, পৃ. ২৫)
মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “(পবিত্র সিন্দুকটি) আনতাকিয়াস্থ একটি গুহা থেকে এবং তাওরাতের অধ্যায়সমূহ (পাণ্ডুলিপি) শামের একটি পাহাড় থেকে বের করে আনা হবে। আর ঐ গ্রন্থের মাধ্যমে ইহুদীদের কাছে যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ পেশ করা হবে। আর পরিশেষে তাদের মধ্য থেকে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করবে। (মুনতাখাবুল আসার, পৃ. ৩০৯)
মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত : “তার দ্বারাই তাবারীয়ার হ্রদ হতে পবিত্র সিন্দুক উদ্ধার কাজ শুরু হবে। ঐ সিন্দুকটি বাইতুল মুকাদ্দাসে আনা হবে এবং তার সামনে রাখা হবে। আর যখন ইহুদীরা তা দেখবে তখন তাদের মধ্য থেকে কতিপয় ব্যক্তি ব্যতীত সবাই ঈমান আনবে। (আল মালাহিম ওয়াল ফিতান, পৃ. ৫৭)
আর প্রশান্তির ঐ তাবূত (সিন্দুক) সম্পর্কে মহান আল্লাহর বাণীতেও বর্ণিত হয়েছে : “তাদের নবী বললেন : তার রাজত্ব ও বাদশাহীর নিদর্শন হচ্ছে, তোমাদের কাছে একটি তাবূত আসবে যার মধ্যে আছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রশান্তি এবং যা কিছু মূসার বংশধর এবং হারূনের বংশধররা রেখে গেছে সেগুলো। ঐ তাবূত ফেরেশতারা বহন করে আনবে, আসলে এর মধ্যে আছে তোমাদের জন্য মু’জিযা ও দলিল-প্রমাণ। (সূরা বাকারা : ২৪৮)
উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণিত হয়েছে যে, উক্ত পবিত্র সিন্দুক যার মধ্যে মহান নবীদের উত্তরাধিকার বিদ্যমান এবং লিখিত রয়েছে কোন্ ব্যক্তি নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্বের জন্য উপযুক্ত। এ কারণেই উক্ত সিন্দুক বনি ইসরাইলের জন্য এক বিরাট নিদর্শন এবং ফেরেশতারা তা এনে বনি ইসরাইলের মাঝ দিয়ে হযরত তালূত (আ.)-এর সামনে উপস্থিত করেন। এরপর তালূত (আ.) তা হযরত দাউদ (আ.)-এর কাছে, তিনি হযরত সুলাইমান (আ.)-এর কাছে এবং তিনি তাঁর প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত আসিফ ইবনে বারখিয়া (আ.)-এর কাছে অর্পণ করেছিলেন। আর হযরত সুলাইমান (আ.)-এর পর বনি ইসরাইল যেহেতু তাঁর (স্থলাভিষিক্তের) আনুগত্য করে নি এবং আরেক জনের আনুগত্য করেছিল, সেহেতু তারা সিন্দুকটি হারিয়ে ফেলে।
فيسلم كثير منهم (অতঃপর তাদের মধ্য থেকে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করবে) অথবা
أسلمت إلا قليلا منهم (তাদের মধ্য থেকে গুটিকতক লোক ব্যতীত সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে)- এ বাক্যগুলোর অর্থ ঐ সব ইহুদী হতে পারে যারা পবিত্র সিন্দুক দেখবে অথবা যে সব ব্যক্তির কাছে ইমাম মাহ্দী (আ.) তাওরাতের মাধ্যমে যুক্তি প্রমাণ পেশ করবেন তারা। তা ছাড়া ফিলিস্তিন মুক্তকরণ এবং পরাজিত হবার পরও যে সব ইহুদীকে সেখানে বসবাস করার জন্য ইমাম মাহ্দী (আ.) অনুমতি দেবেন তারাও হতে পারে।
আরেকটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে ত্রিশ হাজার ইহুদী তাঁর প্রতি ঈমান আনবে যাদের সংখ্যা সমগ্র ইহুদী জনসংখ্যার তুলনায় নগণ্য।
এ সম্পর্কিত অন্যান্য রেওয়ায়েতগুলি ইহুদীদের সাথে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারীদের যুদ্ধ এবং আরব উপদ্বীপ থেকে ইমাম মাহ্দী কর্তৃক তাদেরকে বহিষ্কার করার সাথে সংশ্লিষ্ট। যে রেওয়ায়েতটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে সেই রেওয়ায়েতটিতে যে ইহুদীদের অনেকের আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে তা তাদের ওপর বিজয় এবং তাদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বহিষ্কার করা ব্যতীত সম্ভব হবে না। আর অন্যদিকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বৃহৎ যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহও বিদ্যমান। উল্লেখ্য যে, এ যুদ্ধে তাঁর প্রতিপক্ষ সরাসরি সুফিয়ানী এবং তার ইহুদী ও রোমীয় পৃষ্ঠপোষক ও মিত্ররা হবে। আর এ যুদ্ধের বিস্তৃতি আনতাকিয়া থেকে আক্কা পর্যন্ত অর্থাৎ সিরিয়া-লেবানন-ফিলিস্তিনের সমুদ্র উপকূল বরাবর প্রসারিত হবে। এরপর এ যুদ্ধ তাবারিস্তান, দামেশক ও আল কুদ্স পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে ও অব্যাহত থাকবে। তাদের (ইহুদীদের) প্রতিশ্রুত চরম পরাজয় সেখানে বাস্তবায়িত হবে এমনভাবে যে, পাথর ও গাছ পর্যন্ত চিৎকার করে বলতে থাকবে : “হে মুসলমান! যে ব্যক্তি আমার পেছনে লুকিয়ে আছে সে ইহুদী; অতএব, তাকে হত্যা কর।” আমরা এ বিষয়টি ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের আন্দোলনের ঘটনাবলী সংক্রান্ত অধ্যায়ে আলোচনা করব।
পূর্বোল্লিখিত হাদীসসমূহের মধ্যে ‘মারজ আক্কার’ যুদ্ধ সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহও আছে। আর এ যুদ্ধ পূর্ববর্তী বৃহৎ যুদ্ধের একটি অংশ মাত্র; কিন্তু যে সম্ভাবনাটি অধিক তা হচ্ছে এই যে, এ যুদ্ধ আসলে পাশ্চাত্য এবং তাদের ইহুদী সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকদের সাথে মাহ্দী (আ.)-এর দ্বিতীয যুদ্ধেরই একটি অংশ হবে- যা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং পাশ্চাত্য ও ইহুদীদের পরাজয় দু’তিন বছর গত হওয়ার পরেই সংঘটিত হবে। রেওয়ায়েতসমূহের ভাষ্য অনুযায়ী, এ যুদ্ধের পর ইমাম মাহ্দী (আ.) রোমীয়দের সাথে সাত বছর মেয়াদী যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করবেন।
সম্ভবত হযরত ঈসা (আ.) এ চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার ব্যাপারে মধ্যস্থতা করবেন। কিন্তু পাশ্চাত্য চুক্তি স্বাক্ষরের দু’বছর পরে তা ভঙ্গ করবে এবং আশি ডিভিশন সৈন্য নিয়ে ইমাম মাহ্দীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। আর এটি হবে সর্ববৃহৎ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মহান আল্লাহর অগণিত শত্রু নিহত হবে।
রেওয়ায়েত ও হাদীসে এ যুদ্ধ ‘মহাবীরত্ব’ ও ‘মারজ আক্কার দস্তরখান’ বলে উল্লিখিত হয়েছে। অর্থাৎ সেটি হবে এমন এক দস্তরখান যেখানে ভূ-পৃষ্ঠের জীব-জন্তু এবং আকাশের পাখিগুলো অত্যাচারীদের মাংস ভক্ষণ করবে। ইমাম সাদিক (আ.) এতদপ্রসঙ্গে বলেছেন, সত্তর হাজার মুসলমানের তাকবীর ধবনিতে রোম (পাশ্চাত্য) বিজিত হবে। এমতাবস্থায় মারজ আক্কায় মহাবীরত্বসূচক ঘটনা এবং মহান আল্লাহর দস্তরখান সবার দৃষ্টিগোচর হবে। সেখানে অত্যাচারীরা ধ্বংস হবে এবং তাদের অন্যায়ের অবসান ঘটবে। (বিশারাতুল ইসলাম, পৃ. ২৯৭)
এ সম্পর্কিত হাদীসগুলোর মধ্যে ইমাম মাহদী (আ.)-এর যুগে আক্কা শহরের সামরিক অবস্থান ও গুরুত্ব সংক্রান্ত হাদীসসমূহও বিদ্যমান। হযরত মাহ্দী (আ.) ইউরোপ দখল করার জন্য ঐ শহরকে নৌঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করবেন।
রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে : “ইমাম মাহ্দী (আ.) আক্কার সমুদ্র উপকূলে চারশ’ যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করবেন এবং নিজ সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে রোমীয়দের ভূ-খণ্ড অভিমুখে যাত্রা করবেন এবং তা পদানত করবেন। (ইলযামুন নাসিব, পৃ. ২২৪)
ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ঘটনাবলী বর্ণনা করার সময় এতৎসংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
তথ্যসূত্র: ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশ (আসরে যুহুর)
লেখক : আল্লামা আলী আল কুরানী
অনুবাদ : মোহাম্মদ মুনীর হোসেন খান




