ইয়েমেনে ইসলামী বিপ্লব ও ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী বিপ্লব সম্পর্কে আহলে বাইত থেকে বেশ কিছু সংখ্যক রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু রেওয়ায়েত সহীহ সনদ বিশিষ্ট। এ সব সহীহ রেওয়ায়েতে এ বিপ্লবের বিজয় যে অবশ্যম্ভাবী তা স্পষ্ট উল্লিখিত হয়েছে। এ বিপ্লবকে হেদায়েতের প্রতীক এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ও সহায়তা দানকারী বলে এ সব রেওয়ায়েতে স্পষ্ট উল্লখ করা হয়েছে। এমনকি কতিপয় রেওয়ায়েতে আবির্ভাবের যুগে ইয়েমেনের ইসলামী বিপ্লবকে সবচেয়ে অধিক হেদায়েতকারী বিপ্লব হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। প্রাচ্য অর্থাৎ ইরানের বিপ্লবকে সাহায্য করা ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে যতটা গুরুত্বারোপ করা হয়েছে তার চেয়েও ইয়েমেনের ইসলামী বিপ্লবকে সাহায্য করার ব্যাপারে অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রজব মাসে সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও বিদ্রোহের সমসাময়িক হবে ইয়েমেনের বিপ্লব। অর্থাৎ হযরত মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের কয়েক মাস আগে এ বিপ্লব বিজয় লাভ করবে এবং এর কেন্দ্রস্থল হবে ইয়েমেনের রাজধানী সানআ।
তবে রেওয়ায়েতসমূহে এ বিপ্লবের নেতা ‘ইয়েমেনী’ নামে প্রসিদ্ধ। একটি রেওয়ায়েতে তাঁর নাম হাসান অথবা হুসাইন বলা হয়েছে এবং তিনি হযরত যাইদ ইবনে আলীর বংশধর হবেন। তবে মাতন (মূল ভাষ্য) এবং সনদের দিক থেকে রেওয়ায়েতটি নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে।
ইয়েমেনী বিপ্লব সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেওয়ায়েতসমূহ
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: “আল কায়েম আল মাহ্দীর আন্দোলনের আগে পাঁচটি নিদর্শন অবশ্যম্ভাবী: ১. ইয়েমেনী ২. সুফিয়ানী ৩. আকাশ থেকে গায়েবী আওয়াজ ৪. এক পবিত্র আত্মার অধিকারী ব্যক্তির (নাফসে যাকিয়াহ্) হত্যাকাণ্ড এবং ৫. মরুপ্রান্তরে ভূমিধ্বস ও ভূ-গর্ভে প্রোথিত হওয়া। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২০৪)
তিনি আরো বলেছেন: “ইয়েমেনী, সুফিয়ানী ও খোরাসানী একই বছরে, একই মাসে এবং একই দিনে আবির্ভূত হবে। তাদের ধারাক্রম হবে একের পর এক সাজানো মেরুদণ্ডের অস্থিসমূহের ন্যায়। সবদিক থেকে অস্থিরতা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং দুঃখ-দুর্দশা প্রকাশ পাবে। ঐ ব্যক্তির জন্য আক্ষেপ যে তাদের সাথে বিরোধিতা ও শত্রুতা পোষণ করবে। পতাকাসমূহের (আন্দোলনসমূহের) মধ্যে ইয়েমেনী পতাকা ব্যতীত আর কোন পতাকাই অধিকতর হেদায়েতকারী হবে না। কারণ তা হবে সত্যের পতাকা এবং তোমাদেরকে তা তোমাদের নেতার (ইমাম মাহ্দীর) দিকে আহবান করবে। যখন ইয়েমেনী বিপ্লব করবে তখন জনগণের কাছে অস্ত্র বিক্রয় করা হারাম হয়ে যাবে। আর যখন সে অগ্রযাত্রা শুরু করবে তখন তার দিকে ছুটে যাবে; কারণ তার পতাকা হবে হেদায়েতের পতাকা। তার বিরুদ্ধাচরণ করা কোন মুসলমানের জন্য জায়েয হবে না। আর যদি কেউ এমন করে তাহলে সে জাহান্নামী হবে। কারণ সে জনগণকে সত্য এবং সরল-সঠিক পথের দিকে আহবান করবে। (বিশারাতুল ইসলাম, পৃ. ৯৩, নুমানীর গাইবাত গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত)
ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন: “এ ঘটনার (ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের) আগে সুফিয়ানী, মারওয়ানী এবং শুআইব ইবনে সালিহ্ আসবে; অতএব, মানুষ কিভাবে (ইমাম মাহ্দীর আগমনের ব্যাপারে) এ কথা, সে কথা বলবে? (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৩৩)
আল্লামা মাজলিসী বলেছেন: মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম বা অন্য কোন ব্যক্তি যে বিদ্রোহ করবে সে কিভাবে দাবী করে বলবে: ‘আমিই আল কায়েম আল মাহ্দী’? আর রেওয়ায়েতে উল্লিখিত মারওয়ানীর অর্থ আবকা অথবা ঐ ব্যক্তিও হতে পারে যে মূলত হবে খোরাসানী। উল্লেখ্য যে, লিপিকাররা ভুলবশত খোরাসানীর স্থলে মারওয়ানী লিখে থাকতে পারেন।”
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: “খোরাসানী, সুফিয়ানী ও ইয়েমেনী- এ তিন ব্যক্তির আবির্ভাব একই বছরে, একই মাসে এবং একই দিনে সংঘটিত হবে। ইয়েমেনী পতাকা সব কিছুর চেয়ে অধিকতর হেদায়েতকারী হবে। কারণ সে সত্যের দিকে আহবান করবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২১০)
হিশাম ইবনে হাকাম বলেন: “‘যখন সত্যান্বেষী ব্যক্তি বিপ্লব করবে… তখন আবু আবদিল্লাহ্ (ইমাম সাদিক)-কে বলা হলো: আপনি কি আশাবাদী যে, এ ব্যক্তি ইয়েমেনী হতে পারে?” হযরত সাদিক (আ.) বললেন, “না, ইয়েমেনী আলী (আ.)-এর প্রেমিক, আর এ ব্যক্তিটি (সুফিয়ানী) তার থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ৭৫)
এ রেওয়ায়েতেই বর্ণিত হয়েছে যে, ইয়েমেনী ও সুফিয়ানী যেন দু’টি প্রতিযোগী অশ্বের ন্যায় যার একটি অন্যটির চেয়ে অগ্রগামী হতে চায়।
ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ব্যাপারে কতিপয় রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, “তিনি ইয়েমেন এবং কারআহ্ নাম্নী একটি জনপদ থেকে আবির্ভূত হবেন।”
রেওয়ায়েতে উল্লিখিত ব্যক্তিই যে ইয়েমেনী হতে পারে তা অসম্ভব নয়। তিনি এ অঞ্চল (ইয়েমেনের কারাআহ্) থেকে বিপ্লব শুরু করবেন। কারণ রেওয়ায়েতসমূহে যা কিছু মুতাওয়াতির (বহু সূত্রে বর্ণিত ও অকাট্য) তা হচ্ছে এই যে, পবিত্র মক্কা ও মসজিদুল হারাম থেকে মাহ্দী (আ.) বিপ্লব করবেন।
‘বিশারাতুল ইসলাম’ নামক গ্রন্থে বর্ণিত আছে: “যখন হুসাইন অথবা হাসান নামক এক শাসনকর্তা (নেতা) সানআ থেকে বিপ্লব করবেন এবং তাঁর বিপ্লবের মাধ্যমে সকল ফিতনার অবসান হবে তখন পবিত্র ও কল্যাণময় ব্যক্তি (মাহ্দী) আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর ছত্রছায়ায় আঁধার দূরীভূত হয়ে যাবে এবং গোপন থাকার পর সত্য তাঁর মাধ্যমে প্রকাশিত হবে। (বিশারাতুল ইসলাম, পৃ. ১৭৮)
ইয়েমেনীর বিপ্লবে ব্যাপারে কতিপয় পর্যালোচনা
এ বিপ্লবের ভূমিকা: স্বাভাবিকভাবেই ইয়েমেনে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী বিপ্লব- যা তাঁর আন্দোলনকে সহায়তা প্রদান এবং হিজায বিপ্লবকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে একটি বিরাট ভূমিকা রাখবে- রেওয়ায়েতসমূহে এ ভূমিকার কথা উল্লিখিত না হওয়া এ ভূমিকার অস্তিত্বের সাথে মোটেও সাংঘর্ষিক নয়। বরং যাতে করে এ ভূমিকা বা বিপ্লব সংরক্ষিত থাকে এবং ক্ষতিগ্রস্ত না হয সেজন্য রেওয়ায়েতে তা গোপন রাখা হতে পারে। আর আমরা শীঘ্রই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলন সংক্রান্ত আলোচনায় উল্লেখ করর যে, মক্কা ও হিজাযে যে জনশক্তি আন্দোলন ও বিপ্লব করবে এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সেনাবাহিনী গঠন করবে তারা মূলত তাঁর হিজাযী ও ইয়েমেনী সঙ্গী-সাথী হবে।
ইরাকে ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ইয়েমেনীদের ভূমিকা:
রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত আছে: ইয়েমেনীর বিরুদ্ধে সুফিয়ানীর যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই ইয়েমেনী ইরাকে প্রবেশ করবেন। সুফিয়ানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য ইয়েমেনী ও ইরানী বাহিনীসমূহ ময়দানে অবতীর্ণ হবে। আর রেওয়ায়েতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সুফিয়ানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর ভূমিকা হবে ইরানী সেনাবাহিনীকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা প্রদান। কারণ রেওয়ায়েতসমূহের ভাষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সুফিয়ানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত পক্ষ হবে প্রাচ্যদেশীয় জনগণ অর্থাৎ খোরাসানী ও শুআইবের সঙ্গী-সাথীরা। সম্ভবত ইরানী সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার পর ইয়েমেনীরা ইয়েমেনে প্রত্যাবর্তন করবে।
তবে হিজায ছাড়াও পারস্যোপসাগরীয় অঞ্চলে ইয়েমেনীদের প্রধান ও মৌলিক ভূমিকা থাকবে। যদিও রেওয়ায়েতসমূহে এ বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়নি। তবে স্বাভাবিকভাবে আবির্ভাবের ঘটনাপ্রবাহ এবং অত্র অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থার দিকে দৃষ্টি দিলে ইয়েমেন, হিজায এবং পারস্যোপসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিকভাবে ইয়েমেনী বাহিনীর হাতে ন্যস্ত থাকবে যারা হবে হযরত মাহ্দী (আ.)-এর অনুসারী।
ইয়েমেনী পতাকা খোরাসানী পতাকা অপেক্ষা অধিকতর হেদায়েতকারী হওয়ার কারণ
খোরাসানী পতাকা ও প্রাচ্যবাসীদের পতাকাকে সার্বিকভাবে হেদায়েতের পতাকা বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং তাদের নিহতদেরকে শহীদ বলে গণ্য করা হয়েছে এবং মহান আল্লাহ্ তাদের মাধ্যমে স্বীয় ধর্মকে সাহায্য করবেন। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বহু মন্ত্রী ও উপদেষ্টা এবং বিশেষ বিশেষ সঙ্গী-সাথী হবেন ইরানী। তাদের মধ্যে ইরানী সেনাবহিনী প্রধান শুআইব ইবনে সালিহ্ থাকবেন যাঁকে ইমাম মাহ্দী (আ.) নিজ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করবেন। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলন ও বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকরণের সার্বিক পর্যায়ে ইরানীদের এক ব্যাপক ভূমিকা থাকবে।
যখন তারা তাদের বিপ্লব ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলনের শুভ সূচনা করবে তখন স্বভাবতই তাদের এক বিশেষ ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে। আর আমরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের যুগে তাদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করব। অতএব, কিভাবে ইয়েমেনী বিপ্লব ও তাঁর পতাকা ইরানী জাতি এবং তাদের পতাকা অপেক্ষা অধিকতর হেদায়েতকারী হবে?
এ প্রশ্নের উত্তর এটি হতে পারে যে, ইয়েমেনী ইয়েমেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসন পরিচালনা করার ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা প্রবর্তন করবেন তা অধিকতর সঠিক এবং সরলত্ব ও অকাট্যতার দিক থেকে ইসলাম ধর্মের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পদ্ধতির অধিকতর নিকটবর্তী হবে। অথচ ইরানীদের রাষ্ট্র ও প্রশাসন ব্যবস্থা জটিলতা, একই কাজের পুনরাবৃত্তিকরণ এবং দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত নয়। অতএব, প্রশাসন পরিচালনা সংক্রান্ত এ দুই অভিজ্ঞতার মধ্যকার পার্থক্য ইয়েমেনী সমাজের সরল ও গোত্রীয় প্রকৃতি এবং ইরানী সমাজের জটিল গঠন প্রকৃতি ও এর ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করে।
ইয়েমেনী বিপ্লব অধিকতর হেদায়েতকারী হতে পারে এ দিক থেকে যে, এর রাজনীতি ও নির্বাহী ব্যবস্থা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও স্পষ্ট এবং তাঁর অধীনে থাকবে একান্ত নিষ্ঠাবান ও আনুগত্যশীল বাহিনী। তিনি তাদের ব্যাপারে সব সময় জোরালো তদারকী করবেন। অবশ্য এটিই হচ্ছে ঐ দিক নির্দেশনা যা ইসলাম ধর্ম মুসলিম উম্মাহর সার্বিক বিষয়ের তত্ত্বাবধায়কদেরকে প্রদান করেছে যার ভিত্তিতে তাঁরা তাদের অধীন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে প্রশাসনিক আচরণ করে থাকেন। আর মিশরের শাসনকর্তা এবং সে দেশস্থ ইমামের প্রতিনিধি মালিক আশতারের কাছে আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর লেখা প্রশাসনিক চিঠিতে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়। আর ঠিক একইভাবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর গুণাবলী সংক্রান্ত বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে: “তিনি তাঁর অধীন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর এবং দুঃস্থ-নিঃস্বদের ব্যাপারে অত্যন্ত দয়ালু হবেন।” অথচ ইরানীরা এ ধরনের নীতির আলোকে কাজ করে না। তারা দোষী অথবা মুসলমানদের স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে অন্য সকলের শিক্ষা নেবার জন্য প্রকাশ্যে শাস্তি দান করে না। কারণ তারা ভয় পায় যে, এ কাজ ইসলামী রাষ্ট্র- যা হচ্ছে ইসলাম ধর্মের অস্তিত্বেরই বহিঃপ্রকাশস্বরূপ তাকে দুর্বল করে দেবে।
ইসলাম ধর্মের বিশ্ব-পরিকল্পনা উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে প্রচুর অপ্রধান বিষয়, সমসাময়িক ধ্যান-ধারণা এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালা মেনে না চলার দিক থেকে ইয়েমেনী পতাকার (বিপ্লবের) অধিকতর হেদায়েতকারী হবার সম্ভাবনা আছে। অথচ ইরানের ইসলামী বিপ্লব (বর্তমান বিশ্ব-পরিস্থিতির কারণেই) ঐ সব আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও আধুনিক ধ্যান-ধারণা মেনে চলতে বাধ্য।
তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও পছন্দনীয় দলিল হচ্ছে এই যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এ বিপ্লব পরিচালিত ও সফল হবে এবং তা তাঁর আন্দোলনের প্রভাববলয় বা অঞ্চলের মধ্যেই সংঘটিত হবে। আর এ বিপ্লবের পথিকৃৎ নেতা ইয়েমেনী ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করবেন এবং তাঁর কাছ থেকে তিনি সরাসরি প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা ও আদেশ-নির্দেশ লাভ করবেন। এ বক্তব্যের দলিল হচ্ছে ইয়েমেনীদের বিপ্লবের সাথে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহ যেগুলোয় ইয়েমেন-বিপ্লবের নেতা ইয়েমেনীর ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে এবং তাঁর ব্যাপারে এভাবে বলা হয়েছে যে, ‘তিনি সত্যের দিকে হেদায়েত করবেন’, ‘তোমাদেরকে তোমাদের নেতার দিকে পরিচালিত করবেন’, ‘তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করা কোন মুসলমানের জন্য জায়েয হবে না এবং যে কেউ এ কাজ করবে সে জাহান্নামী হবে’; তবে ইরানীদের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী বিপ্লবের রেওয়ায়েতসমূহে এ বিপ্লবের নেতাদের চেয়ে এ বিপ্লবের সাধারণ কর্মীদের অধিক প্রশংসা করা হয়েছে, যেমন কালো পতাকাবাহীরা, প্রাচ্যবাসীরা এবং প্রাচ্যের একটি জাতি। তবে রেওয়ায়েতসমূহে ইরানী নেতৃবৃন্দের মধ্যে কালো পতাকাবাহীদের অন্য সকল ইরানী নেতার চেয়ে শুআইব ইবনে সালিহ্-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদার কথা উল্লিখিত হয়েছে। এরপর খোরাসানী সাইয়্যেদ এবং কোমের এক ব্যক্তির প্রশংসা করা হয়েছে।
রেওয়ায়েতসমূহ থেকে যে বিষয়টির সমর্থন মেলে তা হচ্ছে যে, ইরানীদের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী বিপ্লবের চেয়ে ইয়েমেনী বিপ্লব ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলনের অধিকতর নিকটবর্তী হবে। এমনকি যদি আমরা ধারণাও করি যে, সুফিয়ানীর আগে ইয়েমেনী বিপ্লব করবেন অথবা প্রতিশ্রুত ইয়েমেনীর ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী হবে আরেকজন ইয়েমেনী। অথচ কোমের এক ব্যক্তির হাতে ইরানীদের বিপ্লব- যা হবে হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিপ্লব ও আন্দোলনের শুভ সূচনাস্বরূপ (যার সূত্রপাত হবে পূর্ব দিক থেকে) এবং তাদের এ বিপ্লবের সূচনা এবং খোরাসানী ও শুআইব ইবনে সালিহের মাঝে বিশ অথবা পঞ্চাশ বছর অথবা মহান আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন কেবল ততখানি সময়গত ব্যবধান বিদ্যমান থাকবে। ফকীহ্-মুজতাহিদদের ইজতিহাদ এবং তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের দ্বারা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শুভ সূচনা হবে। তাই যেমনভাবে ইয়েমেনের ইসলামী বিপ্লব সরাসরি ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর পক্ষ থেকে দিক-নির্দেশনা প্রাপ্ত হবে ইরানের ইসলামী বিপ্লব ঠিক তদ্রূপ পবিত্র ও বিশুদ্ধ অবস্থান ও পরিস্থিতির অধিকারী হবে না।
এখানে আরেকটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। আর তা হলো যে, ইয়েমেনী একাধিক হতে পারেন এবং তাঁদের মধ্যকার দ্বিতীয় ইয়েমেনীরই প্রতিশ্রুত ও প্রতীক্ষিত ইয়েমেনী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্ববর্তী রেওয়ায়েতসমূহে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও অভ্যুত্থানের সমসাময়িক হবে প্রতিশ্রুত ইয়ামানীর আবির্ভাব ও বিপ্লব। অর্থাৎ হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের বছরেই তিনি বিপ্লব করবেন। এতদপ্রসঙ্গে ইমাম জাফর আস সাদিক (আ.) থেকে বিশুদ্ধ সনদ সহকারে বেশ কিছু সংখ্যক রেওয়ায়েত বিদ্যমান। যেমন তিনি বলেছেন: “সুফিয়ানীর আগেই মিশরী ও ইয়েমেনী বিপ্লব করবেন। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২১০, তূসী প্রণীত ‘গাইবাত’)
যেমনভাবে কোমের এক ব্যক্তি এবং অন্যান্য প্রাচ্যবাসী প্রতিশ্রুত খোরাসানী ও শুআইবের আবির্ভাব ও আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী হবেন এ ক্ষেত্রেও এ রেওয়ায়েত অনুযায়ী এ ব্যক্তিটি (যে ইয়েমেনী সুফিয়ানীর আগে বিপ্লব করবেন) অবশ্যই প্রথম ইয়েমেনী হবেন যিনি প্রতিশ্রুত ইয়েমেনীর (আবির্ভাব ও বিপ্লবের) ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী হবেন।
তবে কেবল এ রেওয়ায়েতের মাধ্যমেই প্রথম ইয়েমেনীর আবির্ভাব ও আন্দোলনের সময়কাল যে সুফিয়ানীর আবির্ভাবের আগে হবে তা নির্ধারিত হয়ে যায়। অবশ্য এ বিপ্লব সুফিয়ানীর কিছুকাল অথবা বহু বছর আগেও সংঘটিত হওয়া সম্ভব। আর মহান আল্লাহ্ই একমাত্র জ্ঞাত।
আরেকটি বিষয় আছে। আর তা হলো সানআস্থ কাসিরু আইনেহি (ঐ ব্যক্তি যে তার চক্ষু ভিতরে নিয়ে চোখের পাতা নিচের দিকে নামিয়ে আনে) (كاسر عينه) সম্পর্কিত হাদীস যা উবাইদ ইবনে যুরারাহ্ ইমাম জাফর আস সাদিক (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
“আবু আবদিল্লাহ্ (ইমাম সাদিক)-এর সামনে সুফিয়ানীর ব্যাপারে আলোচনা হলো। তিনি বলেছেন: সে কিভাবে বিপ্লব করবে অথচ তখনও সানআয় কাসিরু আইনেহি বিপ্লব করেনি? (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৪৫)
রেওয়ায়েতসমূহের মাঝে এ হাদীসটি বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। কারণ তা নূমানীর ‘গাইবাত’ গ্রন্থের মতো প্রথম সারির গ্রন্থ ও সূত্রসমূহে উল্লিখিত হয়েছে এবং সম্ভবত এ হাদীসের সনদ সহীহ। যে ব্যক্তি সুফিয়ানীর আগে ইয়েমেনে বিপ্লব করবেন তাঁর প্রথম ইয়েমেনী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এখানে প্রথম ইয়েমেনী হবেন প্রতিশ্রুত ইয়েমেনীর আবির্ভাব ও আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী। আমরা ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে আলোচনা করেছি। কাসিরু আইনেহি-এর সম্ভাব্য কয়েকটি ব্যাখ্যা ও অর্থ থাকতে পারে। এগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হচ্ছে ইমাম জাফর আস সাদিক (আ.)-এর পক্ষ থেকে একটি রূপক ব্যাখ্যা যার অর্থ যথাসময়ে পরিষ্কার হবে।
তথ্যসূত্র: ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশ
লেখক: আল্লামা আলী আল কুরানী
অনুবাদ: মোহাম্মদ মুনীর হোসেন খান




