Press "Enter" to skip to content

শিয়া বর্ষপঞ্জিকা (আরবী বর্ষে বিভিন্ন দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি) – ৮

প্রসঙ্গ: শাবান মাস

সংঙ্কলন ও অনুবাদ: এস, এ, এ

২য় শাবান

1.      রোজা ওয়াজিব হয়

সন ২য় হিজরীর ২য় শাবান তারিখের দিনে রমজান মাসের রোজা ওয়াজিব হওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়।  (মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ৩৭, তৌযিহুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ১৯, তাকভিমুল মোহসেনিন, পৃষ্ঠা ১৮, এখতিয়ারাত, পৃষ্ঠা ৩৭)

2.     আব্বাসীয় খলিফা মোতাযের মৃত্যু

সন ২৫৫ হিজরী ২য় শাবান আব্বাসীয় খলিফা মোতায-এর মৃত্যু হয়। সে তার চাচাতো ভাই মুসতাইনের পরে খেলাফতের পদ অর্জন করে। তার অপরাধ সমূহের মধ্যে অন্যতম অপরাধ হচ্ছে সে ইমাম হাদি (আ.)কে শহীদ করে। যখন সে ‍বুঝতে পারে যে, মোয়েদ তার বিরূদ্ধে উক্ত বিষয়টিকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করবে তখন সে তাকে বিষাক্ত লেপ দ্বারা আবৃত করে লেপের ‍দুই মাথাকে বেধে দেয় ফলে সে ২৩শে রজব শ্বাসরূদ্ধ অবস্থায় মারা যায়।  (তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ৩৪০, তৌযিহুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ১৯, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ৩৩৬, তারিখে বাগদাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১২৪, তারিখে তাবারী, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ৫২৫)

৩য় শাবান

1.      ইমাম হুসাইন (আ.)এর জন্মদিবস

সন ৪ হিজরীর ৩য় শাবান তারিখে ইমাম হুসাইন (আ.)এর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইমাম আলী (আ.) এর মাতার নাম হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)। তিনি ছয় বছর ও কয়েক মাস রাসুল (সা.)এর সান্নিধ্যে অর্জন করেন, সাত বছর কয়েক মাস মাতৃত্বের স্নেহ ভালবাসায় লালিত পালিত হন, ৩০ বছর বছর তার পিতা ইমাম আলী (আ.) এর পৃতিত্বের ছত্রছায়ায় ছিলেন এবং প্রায় নয় বছর কয়েক মাস ভাই ইমাম হাসান (আ.) এর নেতৃত্বের অনুসরণ করেন। সন ৬১ হিজরীতে কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনায় তিনি শাহাদত বরণ করেন।  (আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২০, তাহযিবুল আহকাম, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪১, তৌযিহুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ১০, আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২০, দালায়েলুল ইমামা, পৃষ্ঠা ২৩৫)

2.     ইমাম হুসাইন (আ.)এর মক্কায় আগমণ

সন ৬০ হিজরীর ৩য় শাবান তারিখের বৃহস্পতিবার রাতে ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কায় প্রবেশ করেন এবং জিলহজ্ব মাস পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন।  (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫, কালেমাতে ইমামুল হুসাইন (আ.), পৃষ্ঠা ৩০৫, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ৩৩৮, তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৮৬, মেসবাহুল মোতাহাজজেদ, পৃষ্ঠা ৭৫৮)

৪র্থ শাবান

হজরত আব্বাস (আ.)এর জন্মদিবস

সন ২৬ হিজরীর ৪র্থ শাবান তারিখের দিনে হজরত আব্বাস (আ.)এর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইমাম আলী (আ.) এবং মাতার নাম ফাতেমা বিনতে আসাদ। তাঁর প্রসিদ্ধ নাম হচ্ছে আব্বাস, এছাড়া তার অন্যান্য নাম সমূহ হচ্ছে আবুল ফাযল, আবুল কুরবা, কামারে বনি হাশিম, বাবুল হাওয়ায়েজ, আব্দে সালেহ এবং সাক্কা।

তিনি ছিলেন একজন সুদর্শন পুরুষ আর এ কারণে তাঁকে কামারে বণি হাশিম বলা হতো (বণি হাশিমের চাঁদ)। তিনি ছিলেন লম্বা, তাঁর পেশিগুলো ছিল শক্তিশালি। যখন তিনি ঘোড়ার উপরে আরোহন করতেন তখন তাঁর হাটু ঘোড়ার গলা পর্যন্ত পৌছে যেত। ইমাম আলী (আ.) এর সাহসি সন্তানদের মধ্যে ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ.) এর পরে তার স্থান ছিল। কারবালাতে তিনি ইমাম হুসাইন (আ.) এর সেনা প্রধানের দ্বায়িত্ব ছিলেন এবং বীরত্বের সাথে শাহাদত বরণ করেন। (ওয়াকায়েউল আইয়াম, পৃষ্ঠা ৪২২, খাসায়েসুল আব্বাসিয়া, পৃষ্ঠা ৬৬, আল ওয়াকায়া ওয়াল হাওয়াদেস, খন্ড মহরম, পৃষ্ঠা ৪০০, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ৩৯, মাকতেলুত তালেবিন, পৃষ্ঠা ৫৬)

৫ই শাবান

ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)এর জন্মদিবস

ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) সন ৩৮ হিজরীর রোজ শনিবার হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) এর ঘরে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তিনজন ইমাম (আ.)কে ‍উপলদ্ধি করেন। তাঁর পিতা ছিলেন শহীদদের সর্দার ইমাম হুসাইন (আ.) এবং মাতার নাম ছিল শহর বানু। ইতিহাসে তার জন্মগ্রহণ সম্পর্কে একাধিক মত বর্ণিত হয়েছে যেমন: ১৯ রবিউল আওয়াল, ১৫ই জামাদিউল আওয়াল, ১৫ই জামাদিউস সানী, ৫ই রজব, ১১ই রজব, ৭ই শাবান, ৮ই শাবান, ৯ই শাবান, ১৫ শাবান, ৫ই রমজান। অনুরূপভাবে কোন বারে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন এ সম্পর্কেও বিভিন্ন মতামত ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে যেমন: রবিবার, মঙ্গলবার, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার।  (মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ৩৪, শারহে এহকাকুল হাক, খন্ড ১৯, পৃষ্ঠা ৪৩৯, কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬৭, উয়ুনে আখবারুর রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৮, তাজুল মাওয়ালিদ, পৃষ্ঠা ৩৬)

৯ই শাবান

ইমাম হুসাইন (আ.)এর আক্বিক্বা

রাসুল (সা.) উক্ত দিনে ইমাম হুসাইন (আ.)এর আকিকা দেন এবং মাথার চুলকে মুন্ডন করেন এবং উক্ত চুলের সমপরিমাণ রূপা সাদকা দান করেন। [1]

১০ই শাবান

শিয়াদের উদ্দেশ্যে ইমাম মাহদী (আ.)এর পত্র

১০ই শাবান তারিখে আহলে বাইত (আ.)এর অনুসরিদের উদ্দেশ্যে ইমাম মাহদী (আ.) এর পত্র প্রেরণ করেন। আবু জাফর সামুরী তাঁর মৃত্যুর পূর্বে আহলে বাইত (আ.) এর অনুসারীদেরকে ইমাম মাহদী (আ.) তাঁর প্রেরিত স্বিকৃতিনামা প্রদর্শন করেন।  (ওকায়েউশ শুহুর, পৃষ্ঠা ১৪০, কামাল উদ্দিন, পৃষ্ঠা ৫১৬, কালায়েদুন নুহুর, খন্ড শাবান, পৃষ্ঠা ৩৯২, ওয়াকায়েউশ শুহুর, পৃষ্ঠা ১৪০, আল গিবা (শেইখ তুসী), পৃষ্ঠা ৩৯৫)

১১ই শাবান

হজরত আলী আকবর (আ.)এর জন্মদিবস

হজরত আলী আকবর (আ.) তিনি সন ৩৩ হিজরী ১১ই শাবান তারিখে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার ইমাম হুসাইন (আ.) এবং মাতা উম্মে লাইলা বিনতে মাররা সাকাফি।  কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর। বাযান্তির বর্ণনা অনুযায়ি তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর দুটি সন্তানও ছিল।  (কমেলুয ‍যিয়ারত, পৃষ্ঠা ২৪০, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৯৮, পৃষ্ঠা ১৮৬, আলী আকবর (আ.), পৃষ্ঠা ১৬- ২০)

তাঁকে ইমাম হুসাইন খুব ভালবাসতেন। নিন্মে হজরত আলী আকবর (আ.)এর কিছু গুণাবলি নিন্মরূপ:

এক: তিনি ছিলেন হজরত মোহাম্মাদ (সা.) এর সদৃশ। সকলেই তাঁর চরিত্র, আচরণ

এবং পরিপূর্ণতার প্রশংসা করতো। যেহেতু ‍তিনি ছিলেন রাসুল (সা.) এর সদৃশ, সেহেতু ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেনঃ হে খোদা! তুমি সাক্ষ্য থাক যে, আমার এ সন্তান যে তোমার রাসুল (সা.) এর সদৃশ সে আজ যুদ্ধের জন্য যাচ্ছে। আমি যখনই রাসুল (সা.) কে দেখতে চাইতাম তখন আমি আলী আকবরকে দেখতাম।

দুই: রাসুল (সা.) এর উম্মতের মধ্যে কেউ ১২জন ইমামের ন্যায় পবিত্র বা মাসুম হতে পারবে না। কিন্তু হজরত আলী আকবর সম্পর্কে যিয়ারতে (طیّب) এবং (زكیّ)বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন: হজরত আলী আকবর (আ.) মহিমা এবং বিভিন্ন গুণাবলিতে ছিলেন পরিপূর্ণ। শেইখ মুফিদ এবং সৈয়দ ইবনে তাউস (রহ.) এর একটি বাক্য দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন হজরত আলী আকবর (আ.) আধ্যাত্মিকতার কত উর্দ্ধে ছিলেন কারবালাতে ৯ই মহরম হজরত আলী আকবর (আ.) ইমাম হুাইন (আ.) কে জিজ্ঞাসা করেন হে বাবা! আমরা কি হক্ব পথে নাই। উত্তরে ইমাম (আ.) বলেনঃ হ্যাঁ তখন তিনি বলেনঃ তাহলে আমি আর মৃত্যুকে ভয় করি না।

চার: হজরত আলী আকবর (আ.) এর সাহসীকতা তাঁর দাদা হজরত আলী (আ.) এর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। আল্লামা মাজলিসি বলেনঃ কারবালাতে তিনি যেদিকেই হামলা করছিলেন শত্রুদের জন্য আজরাইল রূপে যাচ্ছিলেন এবং এজিদি সৈন্যদের মাঝে ভয় পরিলক্ষিত হয়। ইতিহাসে বলা হয়েছে যে, যদিও তিনি তৃষ্ঞার্ত ছিলেন কিন্তু তারপরেও তিনি প্রথম হামলায় ১২০ জনকে হত্যা করেন এবং যখন পুণরায় তার বাবার কাছে বিদায় নিয়ে আসেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি প্রায় ২০০ জন এজিদি সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন।

পাঁচ: হজরত আলী আকবর (আ.) তাঁর চাচা ইমাম হাসান এবং তাঁর বাবা ইমাম হুসাইন (আ.) এর আদর্শে লালিত পালিত হন। ইমাম সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণিত এক যিয়ারতে বলা হয়েছে যে, যখন ইমাম হুসাইন (আ.) এর কবরের পায়ের অংশে অবস্থান করবে তখন হজরত আলী আকবর (আ.) এর যিয়ারত পাঠ করবে। সে যিয়ারতে বলা হয়েছেঃ সালাম হোক আপনার প্রতি হে আমিরুর মুমিনিন (আ.) এর সন্তান, হোক আপনার প্রতি হে হাসান ও হুসাইন (আ.) এর সন্তান।

শেইখ সাদুক্ব (রহ.) উক্ত যিয়ারতটি বর্ণনা করে বলেছেনঃ হজরত আলী আকবর (আ.) কে ইমাম হাসান (আ.) এর সন্তান বলা হয়েছে কেননা তিনি ছিলেন হজরত আলী আকবর (আ.) এর শিক্ষক। কেননা হাদীস শরীফে বলা হয়েছে তোমাদের বাবা তিনজনঃ তোমার পিতা, তোমার শিক্ষক এবং তোমার স্ত্রীর বাবা।

ইমাম আলী (আ.) হজরত আলী আকবর (আ.) কে অত্যান্ত ভালবাসতেন এমনকি তাঁর অনেক প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর ফযিলতে কবিতাও বর্ণনা করেছেন। মাবিয়াও তাঁকে উত্তম চরিত্রের, সাহসী এবং দানী ব্যাক্তিত্ব বলে মনে করতো।

১৫ই শাবান

1.      ইমাম মাহদী (আ.)এর জন্মদিবস

সন ২৫৫ হিজরী রোজ শুক্রবার ১৫ ই শাবান হল মানবজাতির শেষ ত্রাণকর্তা হযরত ইমাম মাহদী (আ.)’র পবিত্র জন্মদিন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের ১১ তম সদস্য ইমাম হযরত ইমাম হাসান আসকারী (আ.)’র পুত্র হিসেবে তাঁর জন্ম হয়েছিল ২৫৫ হিজরিতে ইরাকের (বর্তমান রাজধানী বাগদাদের উত্তরে) পবিত্র সামেরা শহরে। তাঁর মায়ের নাম ছিল নার্গিস। এবং তিনি আল্লাহর আদেশে এক পর্যায়ে অদৃশ্য হয়ে যান। তাঁর অদৃশ্য থাকার সময়ও দুই ভাগে বিভক্ত। স্বল্পকালীন সময়ের জন্য অদৃশ্য হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে অদৃশ্য থাকা। দীর্ঘ মেয়াদে অদৃশ্য থাকার পর উপযুক্ত সময়ে তিনি আবার আবির্ভূত হবেন এবং সব ধরনের জুলুম ও বৈষম্যের অবসান ঘাটিয়ে বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন।

উক্ত তারিখে রাত্রি জাগরণ এবং ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে তাক্বিদ করা হয়েছে। রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে জমজম কুপের পানি উক্ত রাতে বৃদ্ধি পায় যদিও বর্তমানে তা ঢেকে রাখা হয়েছে।  (আলামুল ওয়ারা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৩১, কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৫১৪, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৩৯, আলামুল ওয়ারা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৪, মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৯৮)

2.     আলী বিন মোহাম্মাদ সামুরীর মৃত্যুদিবস

সন ৩২৯ হিজরীর উক্ত তারিখে ইমাম মাহদী (আ.)এর নায়েব আলী বিন মোহাম্মাদ সামুরি মৃত্যু বরণ করেন। ইমাম মাহদী (আ.) আলী বিন মোহাম্মাদ সামুরির মৃত্যুর পূর্বে তাকে বলেন: তোমার পরে আর কাউকে আমার নায়েব নির্বাচনের প্রয়োজন নেই। তাঁর মৃত্যুবরণের পরপরেই দির্ঘকালিন অর্ন্তধান শুরু হয়ে যায়।  (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫১, পৃষ্ঠা ৩৪৯, আল গিবা (শেইখ তুসী), পৃষ্ঠা ৩৯৪, কামাল উদ্দিন, পৃষ্ঠা ৫০৩, হাক্কুল ইয়াকিন, পৃষ্ঠা ৩০১, মারাকেদুল মাআরেফ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭৫)

১৮ই শাবান

হুসাইন বিন রূহ নৌবাখতির মৃত্যুদিবস

হুসাইন বিন রূহ ছিলেন ইমাম মাহদী (আ.)’এর তৃতীয় নায়েব। যার মাধ্যেমে জনগণ ইমাম মাহদী (আ.)’এর কাছে চিঠি সহ বিভিন্ন বিভিন্ন বিষয়াবলির ক্ষেত্রে সম্পর্ক স্থাপন করতেন। হুসাইন বিন রূহ’এর জন্মের বছরটি ইতিহাসে সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে মনে করা হয় যে, তিনি ছিলেন সাভেবাসী। কেননা সাভেবাসীদের সাথে তার যথেষ্ট মিল ছিল। অনেকে আবার মনে করেন তিনি ছিলেন কুমবাসী। তবে অধিকাংশ এবং বিশ্বস্ত রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি ছিলেন নৌবাখত এলাকার বাসিন্দা।

বংশগত দিক থেকে তিনি ছিলেন নৌবখত বংশের এবং ধারণা করা হয় যে, তিনি তাঁর মায়ের দিক থেকে নৌবখত বংশের লোক বলে নৌবাখতি’এর খ্যাতি অর্জন করেন।

তাঁকে ১৮ই শাবান ৩২৬ হিজরীতে বাগদাদের নৌবাখত এলাকায় দাফন করা হয়।

যখন হুসাইন বিন  রূহ ইমাম মাহদী (আ.) এর নায়েবের পদ অর্জন করেন তখন তিনি বাধ্যে হন নিজেকে লুকিয়ে রাখতে আর তাই হঠাৎ করেই ইতিহাসে তার সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে সময়টি ৩০৬ হিজরী, ৯১৮ সৌর বর্ষ এবং ৯২৩ খৃষ্টাব্দে হামেদ বিন আব্বাসের যুগে ছিল বলে ধারণা করা হয়। শেইখ তূসী এ সম্পর্কে বলেন যে, তার অবর্তমানে সালমাগানী ইমাম মাহদী (আ.)’এর নায়েবের দ্বায়িত্বটি পালন করেন।

কিন্তু কিছুদিন পরে সালমাগানী’এর বিশ্বাস ও আচরণে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় এবং সে ধিরে ধিরে ‘হুলুল’ এবং ‘গুলু’এর মতো ভ্রান্ত চিন্তাধারার শিকার হয়। আর এ কারণে হুসাইন বিন  রূহ তাকে উক্ত পদ থেকে বরখাস্ত করে এবং এভাবে তিনি সালমাগানী’এর ফেতনাকে নস্যাৎ করেন। আর উক্ত ফেতনাটি ছিল হুসাইন বিন রূহ’এর যুগে সবচেয়ে বড় ফেতনা যা আবু জাফর বিন আলী সালমাগানী’এর মাধ্যেমে সৃষ্টি হয়েছিল।

হজরত হুসাইন বিন রূহ যে ৫ বছর জনগণের মাঝে উপস্থিত ছিলেন না সে সময়ে তিনি সালমাগানীকে নিজের উক্ত দ্বায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আর সালমাগানীও উক্ত পদের অসৎ ব্যাবহার করে এবং প্রথমে নিজেকে “বাব” বা নায়েব পরে নবী এবং অবশেষে নিজেকে খোদা বলে দাবী করে। যখন হুসাইন বিন রূহ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হন তখন তিনি শিয়াদেরকে তার অনুসরণ করতে নিষেধ করেন এবং ৩১২ হিজরীতে ইমাম মাহদী (আ.) তার প্রেরিত বার্তায় সালমাগানী’এর প্রতি অভিসম্পাত প্রেরণ করেন।

আর ইমাম (আ.)’এর উক্ত বার্তাটি ৩১৭ হিজরীতে প্রকাশ পায়। অবশেষে সে যুগের তখাকথিত খলিফার নির্দেশে সালমাগানীকে ফাঁসি দেয়া হয়।

প্রকৃতপক্ষে নৌবাখতিরা ছিল ইরানী বংশভূত এবং আব্বাসীয় খলিফাদের সাথে তাদের যথেষ্ট সুসম্পর্ক ছিল। আর উক্ত বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত এবং সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। আর এভাবেই তারা সে যুগের শিয়াদের বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতো।

মোক্তাদের’এর শাষণকালে হুসাইন বিন রূহ ইমাম মাহদী (আ.)’এর নায়েবের পদ অর্জন করেননি। আর উক্ত সময়ে তিনি খেলাফতের লোকজনদের কাছে খুব ভাল বলে বিবেচিত ছিলেন। আর এভাবে তিনি চেয়েছিলেন খেলাফতের রোষনল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। কেননা সে যুগে ভ্রান্ত চিন্তাধারী “কেরামাতে”দের বিদ্রোহের কারণে পরিবেশটি বেশ স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের যুগ থেকে নৌবাখত বংশের একটি সুসম্পর্ক বজায় ছিল আর উক্ত সম্পর্কটি মোক্তাদের’এর যুগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

ঐতিহাসিকদের মতে আবুল হাসান আলী বিন মোহাম্মাদ ছিলেন ফুরাত বংশের। তিনি ছিলেন সে যুগের শিয়াদের মধ্যে খুবই সুপ্রিয় একজন ব্যাক্তিত্ব। যেহেতু নৌবাখত বংশের লোকদের সাথে খেলাফতের নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক ছিল সেহেতু ধারণা করা হয় যে, আবুল হাসান আলী বিন মোহাম্মাদ’এর মন্ত্রি হওয়ার ক্ষেত্রে হুসাইন বিন রূহের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। কেননা হুসাইন বিন রূহ’এর সাথে আবুল হাসান আলী বিন মোহাম্মাদ’এর ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। অনুরূপভাবে ইমাম মাহদী (আ.)’এর দ্বিতীয় নায়েব মোহাম্মাদ বিন উসমান’এর কন্যা বলেন যে, আবুল হাসান আলী বিন মোহাম্মাদ মন্ত্রি পদে থাকাকলিন সময়ে আলে ফুরাতের লোকজন হুসাইন বিন রূহ’কে যথেষ্ট সম্পদ দান করতেন।

হুসাইন বিন রূহ’এর সামাজিক অবস্থান:

আবু জাফর’এর কন্য উম্মে কুলসুম বর্ণনা করেন যে, আমার বাবার যুগে জনগণ এবং শিয়াদের মাঝে হুসাইন বিন রূহ’এর খুব জনপ্রিয়তা ছিল।

কিন্তু যখন হামেদ বিন আব্বাসী খেলাফতের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়, তখন সে শিয়া বিরোধিদের বিভিন্ন বিষয়ে সহায়তা করার কারণে হুসাইন বিন রূহ’এর জন্য  পরিবেশ পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। ৩১১ হিজরীতে হামেদ বিন আব্বাসী ক্ষমতায় আসার পরে হুসাইন বিন রূহ কে কারাগারে বন্দি করা হয় এবং ৩১৭ সালে তাঁকে মুক্ত করা হয়।

কিন্তু তারপর থেকে ৩২৬ হিজরীরর শাবান মাস পর্যন্ত খেলাফতে নৌবাখত বংশের প্রভাবের কারণে আর কেউ তাকে কষ্ট দেয়ার সাহস করেনি। আর তিনি ছিলেন সে যুগের সাধারণ মানুষদের মধ্যে বুদ্ধিমান, জ্ঞানী এবং বিচক্ষণ একজন ব্যাক্তিত্ব।

মোক্তদের’এর ২৫ বছর খেলাফতকালে প্রায় ১২জন উজির নিযুক্ত হয়। তাদের মধ্যে এমনও ব্যাক্তি ছিলেন যারা দুই থেকে তিনবার পর্যন্তও উজির পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে আবুল হাসান বনি ফুরাত ছিলেন অন্যতম যিনি তিনবার উজির পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

হুসাইন বিন রূহ’এর আটক হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে ইমাম মাহদী (আ.)’এর উদ্দেশ্যে শিয়াদের দানকৃত সম্পদ তার কাছে রক্ষিত ছিল এবং তিনি উক্ত সম্পদ খেলাফতের উজিরের কাছে জমা দিতে অস্বীকৃতি জানান। আর এ কারণে তাকে ৫ বছর কারাবাস ভোগ করতে হয়।

হুসাইন বিন রূহ’এর কবর:

হুসাইন বিন রূহ নৌবাখতি ১৮ই শাবান ৩২৬ হিজরীতে ইহলোক ত্যাগ করেন। বর্তমানে তার কবর বাগদাদের নৌবাখত নামক এলাকার সুরজে নামক স্থানে রয়েছে।  (কালায়েদুন নাহুর, খন্ড শাবান, পৃষ্ঠা ৪৬৩)

১৯শে শাবান

বণি মুস্তালিকের যুদ্ধ

সন ৬ হিজরীতে বণি মুস্তালিকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা ১০০০ ও ১৩টি ঘোড়া ছিল এবং কাফেরদের সংখ্যা ছিল ৭০০ জন। উক্ত যুদ্ধে শুধুমাত্র একজন মুসলমান মারা যায় এবং ১০জন কাফের মারা যায়। মুস্তালাক হচ্ছে মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তি একটি স্থান। মুস্তালাক ছিলেন এমন এক ব্যাক্তি যে হজরত ইসমাইল (আ.) এর দ্বিনকে পরিবর্তন করে এবং সে তার গোত্রবাসীদেরকে হোবাল মূর্তির পুজা করার নির্দেশ দেয় এবং উক্ত মূর্তিটি কাবা গৃহে প্রতিস্থাপন করে।  (তৌযিহুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ২১, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ৩৪৯, ওয়াকায়েউশ শুহুর, পৃষ্ঠা ১৪৭, আস সহীহ মিন সিরাহ, খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৮১, তাবাকাতুল কুবরা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬৩)

শাবান মাসের শেষ তারিখ

1.      হজরত হাফসার মৃত্যু

সন ৪৫ হিজরীতে হজরত হাফসা বিনতে উমর বিন খাত্তাব মৃত্যু বরণ করেন। তিনি ছিলেন হজরত উমরের কন্যা। রাসুল (সা.) এর সাথে বিবাহ হওয়ার পূর্বে তিনি “খানিস বিন আব্দুল্লাহ”কে বিবাহ করেছিলেন। রাসুল (সা.) তার সাথে বিবাহ করার পর তাঁর আচরণের কারণে তাকে তালাক দেন কিন্তু বিভিন্ন লোকদের অনুরোধের কারণে আবার তিনি (সা.) রুজু করেন। তার মৃত্যুর পরে মারওয়ান তার জানাযার নামাজ পড়ায়। হজরত হাফসা জামালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চান। কিন্তু তার ভাই আব্দুল্লাহ বিন উমর তাকে বাধা দেয় এবং তিনি যুদ্ধে যাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখেন।  (মুসনাদে আহমাদ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৩- ৩৪, আল মুসতাদরাক আলা সাহিহাইন, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৫, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৩, তাবাকাতুল কুবরা, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৮৬, তারিখে দামেস্ক, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২০৫)

2.     রাসুল (সা.)এর সাথে বণি আসাদের যুদ্ধ

সন ৬ হিজরীতে রাসুল (সা.) হজরত আলী (আ.)কে ১০০জন লোকের সাথে প্রেরণ করেন যেন তিনি বণি সাআদ গোত্রের সাথে চুক্তি করেন। বণি সাআদের লোকজন খবরটি শোনার পরে পলায়ণ করে। মুসলমানরা ১০০টি উট, ১০০০ ছাগল গণিমত স্বরূপ অর্জন করে এবং রাসুল (সা.)এর খেদমতে উপস্থিত করেন। রাসুল (সা.) তা মুসলমানদের মাঝে বন্টন করেন এবং মদীনার উদ্দেশ্যে ফিরে যান। (বিহারুল আনওয়ারুল, খন্ড ২০, পৃষ্ঠা ৩৭৬, আত তাম্বিহ ওয়াল ইশরাফ, পৃষ্ঠা ২২০, মৌসুআতুত তারিখিল ইসলামি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৭৩)

3.     সাঈদ বিন জাবিরের শাহাদত

তিনি ছিলেন ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) এর ছাত্র। আহলে বাইত (আ.) এর প্রতি নিগুঢ় ভালবাসা থাকার কারণে খলিফা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাকে শহীদ করে। ইমাম উক্ত ঘটনার পরে দোয়া করে হে আল্লাহ! সে যেন আর কাউকে হত্যা করতে না পারে। ইমাম (আ.)এর দোয়া কবুল হয় এবং সাঈদ বিন জাবিরের শাহাদতের ১৫ – ২০ দিন পরেই সে মারা যায়।  (মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, পৃষ্ঠা ৪২৩, মারাকেদুল মাআরেফ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫০, জালাউল উয়ুন, পৃষ্ঠা ৫০২, তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ১০৬)

4.      মুগাইরা বিন সোয়বার মৃত্যু

মুগাইরা বিন সোয়বা ছিল আসহাবে মালউনা (যারা রাসুল (সা.)কে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল) এবং বনি সাকিফার সদস্য, হজরত ফাতেমা (সা.আ.)এর দরজায় আগুন জালানোর ঘটনায় সে ও অংশগ্রহণ করেছিল।

সে শাবান মাসের উক্ত তারিখে সন ৫০ হিজরীতে ৭০ বছর বয়সে কুফাতে মৃত্যুবরণ করে। সে মাবিয়ার নির্দেশে খতিবদেরকে গুরুত্বারোপ করতো তারা যেন নামাজের খুতবাতে মুসলিম জাহানের চতূর্থ খলিফা ইমাম আলী ইবনে আবি তালিবের উপরে অভিসম্পাত করে এবং সে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত উক্ত কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখেনি। ইবনে আবিল হাদীদ (রহ.)এর বর্ণনামতে জাহেলিয়াতের যুগে ব্যাভিচারকারি হিসেবে সে সবার কাছে পরিচিত ছিল। (কাশফুল হাওয়িয়া, পৃষ্ঠা ২৮৬-২৮৮, বাইতুল আহযান, পৃষ্ঠা ১৪৪, কাশফুল হাওয়িয়া, পৃষ্ঠা ২৮৮, তাবাকাতুল কুবরা, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ২০, তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭৪)

More from ঐতিহাসিক ঘটনাবলিMore posts in ঐতিহাসিক ঘটনাবলি »
More from বর্ষ পঞ্জিকাMore posts in বর্ষ পঞ্জিকা »