ড. এইচ এম শহীদুল ইসলাম মোল্লা
পবিত্র কুরআনের সূরা মুহাম্মদের ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক কঠোর ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন— “তোমরা যদি দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক জাতিকে নিয়ে আসবেন, যারা তোমাদের মতো (অলস বা অবাধ্য) হবে না।”
এই আয়াতের তাফসিরে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী, যখন সাহাবিরা এই ‘অন্য জাতি’ সম্পর্কে জানতে চাইলেন, তখন নবীজি (সা.) পাশে থাকা সালমান ফারসি (রা.)-এর কাঁধে হাত রেখে ঘোষণা করেছিলেন যে, তারা হবে এই পারস্যের সন্তান। অর্থাৎ, আরবরা যদি বিলাসিতা আর রাজতন্ত্রের মোহে পড়ে ইসলামের সেই আদি চেতনা হারিয়ে ফেলে, তবে পারস্যবাসীরাই হবে সেই শূন্যস্থান পূরণকারী, যারা ত্যাগের আদর্শে কোনো আপস করবে না।
এই মেধা ও ঈমানের গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে সহিহ বুখারি ও মুসলিমের সেই বিখ্যাত হাদিসে, যেখানে নবীজি (সা.) বলেছিলেন— “যদি ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্রের (মহাকাশের দূরতম নক্ষত্রপুঞ্জ) কাছেও থাকে, তবে পারস্যের কিছু লোক সেখান থেকেও তা খুঁজে নিয়ে আসবে।”
এর বাস্তব প্রমাণ আমরা দেখি ইতিহাসের সেই সোনালী যুগে, যখন আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়েছিলেন ইবনে সিনা, আল-বিরুনি বা জাবির ইবনে হাইয়্যানদের মতো পারস্যের বিজ্ঞানীরা। সেই একই মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি আজ ২০২৬ সালের রণক্ষেত্রে ‘মিসাইল টেকনোলজি’ এবং ড্রোন প্রযুক্তির এক বিস্ময়কর চূড়ায় গিয়ে ঠেকেছে। পশ্চিমা বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর স্যাটেলাইট দিয়ে পুরো অঞ্চল শাসন করতে চেয়েছে, তখন পারস্যের বিজ্ঞানীরা নিজেদের জ্ঞান দিয়ে এমন এক অভেদ্য প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছেন, যা আমেরিকা ও ইসরাইলের সম্মিলিত সামরিক দম্ভকে চূর্ণ করে দিচ্ছে।
এটি কেবল বারুদের লড়াই নয়, এটি হলো কয়েক শতাব্দী ধরে অর্জিত সেই বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্ব, যা আজ সত্যের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিদায় হজ্জের ভাষণের সেই অমোঘ নির্দেশকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করা। নবীজি (সা.) তাঁর শেষ ভাষণে এবং গাদীর-এ খুমের ময়দানে উম্মতকে ‘সাকলাইন’ বা দুটি ভারী বস্তু আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছিলেন—একটি আল্লাহর কিতাব এবং অন্যটি তাঁর পবিত্র আহলে বাইত।
আরবের অনেক শাসক যখন ক্ষমতার মোহে আহলে বাইতের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, তখন পারস্যের এই জাতিটিই কারবালার সেই মহান ত্যাগের চেতনাকে নিজেদের অস্তিত্বে মিশিয়ে নিয়েছিল। ইমাম হোসেন (রা.)-এর সেই আদর্শিক লড়াই আজ তাদের মিসাইল ইউনিটের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, আহলে বাইতের প্রতি এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত বিজয় এনে দেবে, যার প্রতিশ্রুতি ১৪০০ বছর আগেই দেওয়া হয়েছিল।
ভৌগোলিকভাবে খোরাসান ও পারস্যের এই অঞ্চলটিই হবে শেষ জামানায় ইমাম মাহদীর প্রধান সহযোগী শক্তির সূতিকাগার। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, কালো পতাকাবাহী যে বাহিনীটি বায়তুল মাকদিস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ধেয়ে আসবে, তাদের মূল ভিত্তি হবে এই অঞ্চলের লড়াকু যোদ্ধারা। আজ সিরিয়া, লেবানন এবং ইয়েমেনজুড়ে যে প্রতিরোধের ফ্রন্ট গড়ে উঠেছে, তা মূলত ইমাম মাহদীর আগমনের সেই পথকেই প্রশস্ত করছে।
পবিত্র আল-আকসা মসজিদকে যায়নবাদী দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করার যে শপথ তারা নিয়েছে, তা পূরণে তারা আজ আধুনিক প্রযুক্তি আর আহলে বাইতের প্রতি নিখাদ প্রেমকে একীভূত করেছে। ইতিহাস আজ আবারও সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের পতন নিশ্চিত হচ্ছে সেই বিজ্ঞানমনস্ক ও বীর জাতির হাতে, যারা রাসূলের শেষ নির্দেশ মেনে সত্যের ঝাণ্ডা সমুন্নত রেখেছে।
বিজয় কেবল তাদের জন্যই নির্ধারিত, যারা ত্যাগের রক্ত দিয়ে নতুন ভোরের ইতিহাস লেখে।




