ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলন ও বিপ্লবে সুফিয়ানী অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। সে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ভয়ঙ্কর শত্রু হবে, যদিও ইমাম প্রকৃতপ্রস্তাবে যে সব কাফির নাস্তিক্যবাদী শক্তি সুফিয়ানীকে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করবে তাদের মুখোমুখি দাঁড়াবেন এবং মোকাবিলা করবেন। সামনে আপনারা এ ব্যাপারে অধিক অবগত হবেন।
রেওয়ায়েতে স্পষ্ট উল্লেখিত হয়েছে যে, সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও আন্দোলন মহান আল্লাহর অন্যতম অবধারিত অঙ্গীকার। ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেন : “আল কায়েম আল মাহ্দীর আবির্ভাবের বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী। আর সুফিয়ানীর আবির্ভাবও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্যম্ভাবী। সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও আগমনের পরপরই কেবল মাহ্দী আত্মপ্রকাশ করবে। (বিহার, ৫৩তম খণ্ড, পৃ. ১৮২)
সুফিয়ানী সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ অর্থগতভাবে মুতাওয়াতির (تواتر اجمالي) এবং এগুলোর মধ্যে কয়েকটি রেওয়ায়েত শাব্দিকভাবে মুতাওয়াতির (ইসলামী শরীয়তের বিধানসমূহে শাব্দিকভাবে মুতাওয়াতির হাদীসের উদাহরণ প্রচুর রয়েছে, যেমন : ওয়াজিব নামায, এর রাকাত সংখ্যা, রোযা ও হজ্ব ইত্যাদি বিষয়ে)। এখন আমরা তার ব্যক্তিত্ব এবং আন্দোলনের প্রকৃতির একটি চিত্র তুলে ধরব। অতঃপর নিরবচ্ছিন্নভাবে আমরা এতদসংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহ যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবে এখানে উল্লেখ করব।
মুসলিম মনীষীরা ঐকমত্য পোষণ করেন যে, আবু সুফিয়ানের সাথে রক্তসম্পর্ক থাকার কারণে তার নাম হবে সুফিয়ানী। একদিকে সে যেমন আবু সুফিয়ানের একজন বংশধর, তেমনি অন্যদিকে সে কলিজা ভক্ষণকারিণী হিন্দেরও সন্তান (বংশধর)। উহুদের যুদ্ধে যখন সাইয়্যেদুশ শুহাদা (শহীদদের নেতা) হযরত হামযাহ্ (রা.) শাহাদাত বরণ করেন তখন এই হিন্দ চরম শত্রুতা ও ঘৃণাবশতঃ হযরত হামযার কলিজা চিবিয়েছিল। আর এ ধরনের নারীর সাথে তার রক্তসম্পর্ক থাকার কারণেই আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) বলেছেন : “কলিজা ভক্ষণকারিণী হিন্দের বংশধর ওয়াদী ইয়াবিস (শুষ্ক উপত্যকা) থেকে আবির্ভূত হবে ও বিদ্রোহ করবে। সে প্রশস্ত কাঁধবিশিষ্ট, কুৎসিত চেহারার অধিকারী এক প্রকাণ্ড মাথা বিশিষ্ট পুরুষ হবে। তার মুখমণ্ডলে বসন্তের দাগ থাকবে। যখন তুমি তাকে দেখবে তখন ভাববে যে, সে এক চোখ বিশিষ্ট। তার নাম হবে ওসমান এবং তার পিতার নাম হবে উয়াইনাহ্ (আরেকটি পাণ্ডুলিপিতে আম্বাসাহ্)। সে হবে আবু সুফিয়ানের বংশধর। শান্ত ও সুমিষ্ট পানির দেশে সে প্রবেশ করবে এবং সেখানকার মিম্বারে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২০৫)
আহলে বাইতের অনুসারীদের মধ্যে প্রসিদ্ধি আছে যে, সে আবু সুফিয়ানের পুত্র আম্বাসার বংশধর। আর এ কারণেই তাকে উয়াইনাহ্ বলে গণ্য করা হয়েছে। কারণ রেওয়ায়েতে ‘উয়াইনাহ্’ শব্দকে আম্বাসা শব্দের সাথে ভুল করা হয়েছে। শেখ তূসী (রহ.) থেকে বর্ণিত একটি রেওয়ায়েতে তাকে আবু সুফিয়ানের পুত্র উতবার বংশধর বলা হয়েছে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২১৩) উল্লেখ্য যে, আবু সুফিয়ানের পাঁচ পুত্র ছিল। যথা : উতবাহ্, মুয়াবিয়া, ইয়াযীদ, আম্বাসাহ্ ও হানযালাহ্।
মুয়াবিয়ার কাছে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর প্রেরিত পত্রে স্পষ্ট উল্লিখিত হয়েছে যে, সুফিয়ানী মুয়াবিয়ার একজন বংশধর।
“হে মুয়াবিয়া! তোমার একজন বংশধর বদমেজাজী, অভিশপ্ত, নির্বোধ, অত্যাচারী ও রগচটা স্বভাবের হবে। মহান আল্লাহ্ তার হৃদয় থেকে দয়া-মায়া দূর করে দেবেন। তার মামারা হবে রক্ত পিপাসু কুকুরের ন্যায়। যেন আমি এখনই তাকে দেখতে পাচ্ছি। আমি যদি চাইতাম তাহলে তার নাম বলে দিতাম এবং তার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলতাম যে, তার বয়স কত হবে। সে মদীনাভিমুখে একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করবে। তারা মদীনায় প্রবেশ করে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, রক্তপাত ও অন্যায় কাজে লিপ্ত হবে। ঐ সময় একজন পূতঃপবিত্র পরহেজগার ব্যক্তি সেখান থেকে পলায়ন করবে; আর সে-ই হবেন ঐ ব্যক্তি যে অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচারে পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর সমগ্র পৃথিবীকে ন্যায়বিচারে ভরে দেবে। আমি তার নাম জানি এবং এও জানি যে, ঐ দিন তার বয়স কত হবে এবং তার নিদর্শনটিও কী হবে।”
ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : “সে খালিদ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফিয়ানের বংশধর হবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৭৫)
সুফিয়ানীর পিতামহ আম্বাসাহ্ অথবা উতবাহ্ অথবা উয়াইনাহ্ অথবা ইয়াযীদ হতে পারে যে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের বংশধর, তাহলে সব ভুল দূর হয়ে যাবে।
আহলে সুন্নাহর আলেম ও পণ্ডিতদের প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে যে, সুফিয়ানীর নাম হবে আবদুল্লাহ্। আর ইবনে হাম্মাদের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির ৭৪ পৃষ্ঠায় তার নাম ‘আবদুল্লাহ্ ইবনে ইয়াযীদ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর আহলে বাইতের অনুসারীদের হাদীস সূত্রগুলোতে বর্ণিত একটি রেওয়ায়েতেও তার নাম ‘আবদুল্লাহ্’ বলা হয়েছে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২০৮) তবে আমরা যেমন ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি তদনুযায়ী প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে যে, তার নাম হবে ওসমান।
হাদীসের রাবীরা ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, সুফিয়ানী হবে মুনাফিক, চারিত্রিকভাবে ভ্রষ্ট এবং মহান আল্লাহ্, তাঁর রাসূল (সা.) ও হযরত মাহ্দী (আ.)-এর ভয়ঙ্কর শত্রু। তার স্বভাব-চরিত্র, ব্যক্তিত্ব এবং কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে শিয়া-সুন্নী হাদীস সূত্রসমূহে যে সব রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে সেগুলো একই ধরনের অথবা খুবই নিকটবর্তী ও সদৃশ। যেমন : এ ধরনের একটি রেওয়ায়েত নিম্নরূপ : “সুফিয়ানী সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসনকর্তা হবে। সে আলেম ও পণ্ডিত ব্যক্তিদেরকে হত্যা করবে। অসৎ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য সে তাদের কাছে সাহায্য চাইবে। আর যে তাকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবে তাকে সে হত্যা করবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৭৬)
অন্যত্র আরতাত থেকে বর্ণিত : “সুফিয়ানী ছয় মাসের মধ্যে যারা তার বিরোধিতা করবে তাদেরকে হত্যা করবে, করাত দিয়ে মাথা কর্তন করবে এবং সেগুলো পাতিলের মধ্যে সিদ্ধ করবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৮০)
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত : “সুফিয়ানীর আবির্ভাব হবে। সে বিদ্রোহ করবে, হত্যাযজ্ঞ ঘটাবে এবং রক্ত ঝরাবে। এমনকি গর্ভবতী মহিলাদের পেট চিড়ে গর্ভস্থ সন্তান বের করে এনে বড় বড় পাতিলের মধ্যে ফুটাবে। (দ্র ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৮৪)
ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : “যদি সুফিয়ানীকে দেখে থাক তাহলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোকটিকেই দেখে থাকবে। তার দেহের রং হবে লাল, নীল ও কালোর সংমিশ্রণ। সে কখনই আল্লাহ্ পাকের ইবাদতের জন্য মাথা নত করবে না। সে কখনই পবিত্র মক্কা ও মদীনা মুনাওয়ারাহ্ দেখবে না (অর্থাৎ হজ্ব ও যিয়ারত করার জন্য কখনই মক্কা-মদীনা সফর করবে না)। সে বলবে : হে প্রভু! আগুনের মাধ্যমে আমি প্রতিশোধ গ্রহণ করব। (দ্র বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ৩৫৪)
সুফিয়ানীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ
রেওয়ায়েতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সুফিয়ানী পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির ছায়ায় প্রতিপালিত ও তা দ্বারা প্রভাবিত হবে। হয়তোবা সে পাশ্চাত্যেই প্রতিপালিত ও বড় হবে। শেখ তূসীর ‘গাইবাত’ গ্রন্থে বাশার বিন গালিব থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে :
“সুফিয়ানী যখন একটি গোষ্ঠী বা দলের নেতৃত্ব দেবে তখন তার গলায় খ্রিস্টানদের মতো ক্রুশ থাকবে। সে পাশ্চাত্য (রোমানদের ভূমি) থেকে শামে আসবে।”
রেওয়ায়েতটিতে ‘মুনতাসির’ (مُنْتَصِرْ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তা অবশ্যই মূলে ‘মুতানাসসির’ (مُتَنَصِّر) ছিল যার অর্থ হচ্ছে ঐ মুসলমান যে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে। এ ধরনের রেওয়ায়েত বিহারের ৫২তম খণ্ডের ২১৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে। আর ‘সে রোমানদের ভূমি থেকে আসবে’- এ বাক্যের অর্থ হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে রোম (পাশ্চাত্য) থেকে শামে আসবে এবং বিদ্রোহ করবে। আর রেওয়ায়েতটি থেকে এও প্রতীয়মান হয় যে, সে পাশ্চাত্যপন্থী ও ইহুদীদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান করবে এবং রোম অর্থাৎ পাশ্চাত্যের শত্রু ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। সে তুর্কীদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। আর আমাদের দৃষ্টিতে তুর্কীরা হবে রুশ জাতি। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবকালীন ঘটনাবলী ঘটার সময় এবং ইমাম মাহ্দী (আ.) তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করার আগেই সুফিয়ানী দামেশক থেকে তার রাজধানী ফিলিস্তিনের রামাল্লায় (বর্তমানে ইসরাইলের দখলে) স্থানান্তর করবে। আর রেওয়ায়েত অনুসারে বিদ্রোহীরা ঐ স্থানেই অবতরণ করবে।
বরং রেওয়ায়েতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সুফিয়ানী ইহুদী ও রোমানদের স্বার্থে তাদের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যূহ হিসাবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। যে রেওয়ায়েত ও হাদীসসমূহ সম্পর্কে আপনারা জানতে পারবেন সেগুলোয় ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হাতে তার পরাজয় বরণের কথা বর্ণিত হয়েছে। আর তার পরাজয় মানেই ইহুদীদের পরাজয়।
ঠিক একইভাবে সুফিয়ানীর পাশ্চাত্যপন্থী হওয়ার আরেকটি দলিল হচ্ছে এই যে, তার পরাজয় ও নিহত হওয়ার পর তার সেনাবাহিনীর অবশিষ্টাংশ পাশ্চাত্যে পলায়ন করবে। অতঃপর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সঙ্গী-সাথীরা তাদেরকে পাশ্চাত্য থেকে ফিরিয়ে এনে হত্যা করবে।
ইবনে খলীল আয্দী বলেছেন : ‘যখন তারা আমাদের ক্রোধ ও শাস্তি অনুভব করল, তখন তারা সেখান থেকে পলায়ন করতে লাগল। তোমরা পলায়ন করো না; বরং তোমরা যেখানে বিলাসিতায় মত্ত ছিলে সেখানে এবং তোমাদের নিজ নিজ বাড়ি-ঘরে ফিরে এসো। আশা করা যায় যে, তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (সূরা আম্বিয়া ১২-১৩)- এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইমাম আবু জাফর আল বাকির (আ.)-কে বলতে শুনেছি : যখন আল কায়েম আল মাহ্দী আন্দোলন ও বিপ্লব শুরু করবে এবং বনি উমাইয়্যার বিরুদ্ধে একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করবে তখন তারা রোমের দিকে পালিয়ে যাবে। আর রোমানরা তাদেরকে বলবে : তোমরা যে পর্যন্ত খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে নিজেদের গলায় ক্রুশ না ঝুলাবে সে পর্যন্ত আমাদের দেশে তোমাদের ঢুকতে দেব না। তখন তারা গলায় ক্রুশ ঝুলাবে এবং রোমানরা তাদেরকে তাদের দেশে প্রবেশ করতে দেবে। যখন আল কায়েম আল মাহ্দীর সঙ্গী-সাথীরা রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সেখানে যাবে তখন রোমানরা তাদের কাছে সন্ধির আবেদন করবে। কিন্তু আল কায়েমের সঙ্গী-সাথীরা বলবে : যে পর্যন্ত তোমরা তোমাদের কাছে আমাদের দেশের যে সব ব্যক্তি আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে ফেরত না দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদেরকে নিরাপত্তা দেব না। অতঃপর রোমানরা তাদেরকে আল কায়েমের সঙ্গী-সাথীদের কাছে হস্তান্তর করবে। আর এটিই হচ্ছে ‘পলায়ন করো না এবং তোমরা যেখানে বিলাসিতায় মত্ত ছিলে সেখানে এবং নিজেদের বাড়ি-ঘরে ফিরে এসো। আশা করা যায় যে, তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে’- এ আয়াতের অর্থ। এরপর তিনি বলেছিলেন : সে তাদেরকে গুপ্তধনসমূহের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবে। অথচ সে অন্য সকলের চেয়ে এ ব্যাপারে অধিক অবগত। তারা বলবে : আমাদের জন্য দুর্ভোগ যে, আমরা অত্যন্ত জালিম ছিলাম। তাদেরকে হত্যা করা পর্যন্ত তাদের কণ্ঠে অনবরত এ হতাশাব্যাঞ্জক স্বীকারোক্তি ধ্বনিত হতে থাকবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ৩৭৭)
‘যখন আল কায়েম আল মাহ্দীর সঙ্গী-সাথীরা তাদের (পাশ্চাত্যের) মুখোমুখি হবে তখন তারা নিরাপত্তা চাইবে’- এ বাক্যের অর্থ হচ্ছে এই যে, ইমাম মাহ্দীর সঙ্গী-সাথীরা তাদের বিশাল সেনাবাহিনীকে রোমানদের বিরুদ্ধে প্রেরণ ও মোতায়েন করবে এবং তাদেরকে যুদ্ধের হুমকি দিতে থাকবে।
আর বনি উমাইয়্যার অর্থ সুফিয়ানীর সঙ্গী-সাথীরা। আর এ বিষয়টি অন্য একটি রেওয়ায়েতেও স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে। সম্ভবত তারা (পলাতক ব্যক্তিরা) হবে সুফিয়ানীর উপদেষ্টা ও সেনাবাহিনীর সেনাপতি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যারা প্রধান প্রধান রাজনৈতিক পদমর্যাদার অধিকারী হবে। এ কারণেই ঘটনাটি এতদূর গড়াবে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এ সব ব্যক্তিকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা না হলে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দেবেন।
সুফিয়ানী তার আন্দোলনকে ধর্মীয় রূপ দেয়ার চেষ্টা করবে
ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব পর্যন্ত ইসলাম ধর্মের প্রসার ও মর্যাদাকর অবস্থান লাভ এবং কালো পতাকাবাহী ইরানীদের উত্থানের বিপরীতে অর্থাৎ তা মোকাবিলা করার জন্য সুফিয়ানীর আন্দোলন যে একটি পাশ্চাত্য-ইহুদী পরিকল্পনা হবে- এ ব্যাপারে সুফিয়ানী সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ অধ্যয়ন করলে যে কোন গবেষক সুফিয়ানী যে তার আন্দোলনকে ধর্মীয় রূপ দেবার চেষ্টা করবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাবেন। এ সব রেওয়ায়েতের মধ্যে এ রেওয়ায়েত বিদ্যমান যা ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে (পৃ. ৭৫) বর্ণিত হয়েছে : “ইবাদতের কারণে সুফিয়ানীর বর্ণ হলুদাভ হয়ে যাবে বা সুফিয়ানীকে হলুদ দেখাবে।” এ রেওয়ায়েত থেকে মনে হচ্ছে সে নিজেকে বাহ্যত দীনদার দেখাতে চাইবে। তবে অন্য একটি রেওয়ায়েতের ভাষ্য অনুযায়ী তার এ অবস্থা কেবল তার আন্দোলন এবং প্রশাসনের শুরুতে দেখা যাবে।
সুফিয়ানীর ধার্মিক হওয়া এবং তার খ্রিস্টান হওয়া, গলায় ক্রুশ ঝুলানো ও পাশ্চাত্য থেকে শামে আগমন সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা কখনো কখনো দুঃসাধ্য ও জটিল হতে পারে। তবে আমরা পাশ্চাত্যের এজেন্ট-রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে যা জানি তা হয়তো রেওয়ায়েতসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার ক্ষেত্রে জটিলতা ও অসুবিধা দূর করতে পারে। এ সব রাজনৈতিক নেতা (পাশ্চাত্যের) খ্রিস্টানদের সাথে এমনভাবে ওঠা-বসা ও জীবন যাপন করে যে, তাদের ও খ্রিস্টানদের মাঝে আর কোন পার্থক্যই লক্ষ্য করা যায় না। এরা তাদের এতটা ঘনিষ্ট হয় যে, সোনালী ক্রুশ গলায় ঝুলায় বা ঘড়িতে বাঁধে, এমনকি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করার জন্য গীর্জায়ও উপস্থিত হয়।
যে পর্যন্ত পাশ্চাত্য সুফিয়ানীকে বাহ্যত নামাযী ও দীনদার প্রদর্শন করে সাধারণ মুসলমানকে ধোঁকা দেবার জন্য মুসলমানদের নেতা ও প্রশাসক নিযুক্ত না করবে সে পর্যন্ত তার এ অবস্থা (পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান রীতিনীতি মেনে চলা) অব্যাহত থাকবে। বরং ‘সে আলেম ও জ্ঞানী-পণ্ডিতদের হত্যা করবে এবং তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য তাদের কাছে সাহায্য চাইবে; আর যে তাকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবে তাকে সে হত্যা বা ধ্বংস করবে’- এ হাদীসটির মূল ভাষ্য থেকে এটিই প্রতিভাত হয় যে, সুফিয়ানী ভীষণভাবে তার আন্দোলন ও প্রশাসনের ওপর ইসলামী রং ও লেবেল এঁটে দিতে চাইবে। এ কারণেই সে আলেমদেরকে এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করবে। রেওয়ায়েতে ‘সে তাদেরকে পরীক্ষা করবে’- এ বাক্যের স্থলে ‘সে তাদেরকে ধ্বংস করবে’- এ বাক্যটি সম্ভবত ভুলক্রমে উল্লিখিত হয়ে থাকতে পারে।
আহলে বাইত ও তাঁদের অনুসারীদের প্রতি সুফিয়ানীর শত্রুতা ও বিদ্বেষ
সুফিয়ানীর অন্যতম প্রকট বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ- যা তার সাথে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহেও উল্লেখ করা হয়েছে। বরং ঐ সব রেওয়ায়েত থেকে এমনই প্রতীয়মান হয় যে, তার আসল কাজই হবে মুসলমানদের মধ্যে মাযহাবী (সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক) ফিতনা উস্কে দেয়া এবং আহলে সুন্নাতকে সাহায্য করার ধূঁয়ো তুলে শিয়াদের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষেপিয়ে তোলা। অথচ সে প্রকৃতপ্রস্তাবে ইহুদী ও পাশ্চাত্যের নাস্তিক্যবাদী-বস্তুবাদী নেতাদের বেতনভুক এজেন্ট ও সমর্থক হবে।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : “আমরা (মহানবীর আহলে বাইত) এবং আবু সুফিয়ানীর বংশধররা এমন দু’টি বংশ যারা মহান আল্লাহর কারণে একে অপরের শত্রু। আমরা বলি : মহান আল্লাহ্ সত্য বলেছেন এবং তারা বলে : মহান আল্লাহ্ মিথ্যা বলেছেন। আবু সুফিয়ান মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং আবু সুফিয়ানের পুত্র মুয়াবিয়া হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। আর মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াযীদ হুসাইন ইবনে আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। আর সুফিয়ানী আল কায়েম আল মাহ্দীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ১৯০)
ঠিক একইভাবে ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “আমি যেন সুফিয়ানীকে (অথবা তার বন্ধুকে) দেখতে পাচ্ছি যে, সে কুফায় তোমাদের সবুজ-শ্যামল জমিগুলোর ওপর অবস্থান নিয়েছে এবং তার পক্ষ থেকে আহবানকারী আহবান করছে : যে কেউ আলীর অনুসারীদের মধ্য থেকে কারো মাথা কেটে আনবে তাকে এক হাজার দিরহাম পুরস্কার দেয়া হবে। ঐ সময় প্রতিবেশী প্রতিবেশীর ওপর আক্রমণ চালাবে এবং বলবে যে, এ ব্যক্তি তাদেই একজন। তার মাথা কর্তন করে এক হাজার দিরহাম সে নিয়ে যাবে। তোমরা জেনে রাখ যে, ঐ দিন জারজদের হাতে তোমাদের শাসনকর্তৃত্ব ন্যস্ত থাকবে। আর আমি যেন একজন মুখোশ পরিহিত ব্যক্তিকে দেখতে পাচ্ছি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : ঐ নেকাব পরিহিত লোকটি কে? তিনি বললেন : সে তোমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি হবে যে তোমাদের অনুরোধেই বক্তৃতা দেবে। সে মুখোশ পরিহিত থাকবে, সে তোমাদেরকে জড়ো করবে এবং চিনবে; কিন্তু তোমরা তাকে চিনবে না। সে তোমাদের দোষ অন্বেষণ করে তোমাদের দুর্নাম করবে। তোমরা জেনে রাখ যে, সে জারজ ব্যতীত আর কেউ নয়। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২১৫)
আমরা অবশ্য লেবাননে এ সব মুখোশ পরিহিত ব্যক্তির কতিপয় নমুনা দেখেছি যারা ইহুদী, ফ্যালাঞ্জিস্ট এবং অন্যদের এজেন্ট। আমরা দেখেছি যে, তারা তাদের কুৎসিত চেহারাকে কালো বা অন্যান্য রঙের মুখোশে ঢেকে একত্রে মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাসমূহে প্রবেশ এবং মুমিনদেরকে চিহ্নিত করে তাদের সহযোগীদের কাছে তাদের পরিচিতি তুলে ধরে। তখন তারা বিপ্লবী মুসলমানদেরকে ঘিরে ফেলে এবং বন্দী করে কারাগারে নিয়ে যায় অথবা তাদেরকে হত্যা করে। সুফিয়ানী এ সব শত্রুর হাতে প্রশিক্ষিত হবে। আর তার মুখোশ পরিহিত চরেরা এ গোষ্ঠীরই মুখোশ পরিহিত সদস্যদের মধ্য থেকে বাছাইকৃত হবে।
অন্য একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে : “সুফিয়ানীর অশ্বারোহী সৈন্যরা খোরাসানবাসীদের খোঁজ করতে থাকবে এবং কুফায় মহানবীর আহলে বাইতের অনুসারীদেরকে হত্যা করবে। তখন খোরাসানবাসীরা হযরত মাহ্দী (আ.)-এর খোঁজে বের হবে।
শামে শিয়াদের ব্যাপারে সুফিয়ানীর গৃহীত নীতি সম্পর্কে ওয়াদী ইয়াবিস (শুষ্ক উপত্যকা) থেকে তার উত্থান ও আন্দোলনের সূত্রপাত সংক্রান্ত হাদীসসমূহে উল্লেখ করা হবে।
সুফিয়ানীর লাল পতাকা
কতিপয় রেওয়ায়েতে এ বিষয়টির উল্লেখ আছে। যেমন বিহারুল আনওয়ার গ্রন্থে আরেকটি দীর্ঘ রেওয়ায়েতের মাঝে বর্ণিত এই রেওয়ায়েতটি :
“এর বেশ কিছু নিদর্শন আছে। লাল পতাকাসহ সুফিয়ানী আবির্ভূত হবে এবং বনি কালব গোত্রের এক লোক তার সেনাপতি হবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৭৩)
আসলে এ লাল পতাকা সুফিয়ানীর শ্রেষ্ঠত্বকামী ও তার রক্তপিপাসু রাজনীতির প্রতীক হবে।
নিঃসন্দেহে শিয়া ও সুন্নী হাদীসসমূহে যে প্রতিশ্রুত সুফিয়ানীর কথা বর্ণিত হয়েছে আসলে সে হবে এক ব্যক্তি। তবে কতিপয় রেওয়ায়েতে, যেমন ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে দু’জন সুফিয়ানীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে : প্রথম সুফিয়ানী এবং দ্বিতীয় সুফিয়ানী। কিছু কিছু রেওয়ায়েত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সুফিয়ানীদের সংখ্যা হবে তিনজন। তবে যে সুফিয়ানী নিন্দিত ও ধিকৃত হয়েছে এবং ফিতনা ও এ ধরনের অন্যায় কাজ করবে সে হবে দ্বিতীয় সুফিয়ানী। কারণ প্রথম সুফিয়ানী শামের ওপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং কিরকীসীয়ার যুদ্ধের পর ইরাক যুদ্ধে ইরানী বাহিনী ও কালো পতাকাবাহীদের হাতে পরাজিত হবে এবং যুদ্ধে আহত হওয়ার কারণে শামে ফেরার পথে মৃত্যুবরণ করবে। তখন দ্বিতীয় সুফিয়ানী তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে তার মূল কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে।
যদি এ সব রেওয়ায়েত সহীহ হয় তাহলে যেমন ইয়েমেনী ও খোরাসানীরা (কালো পতাকাবাহীরা) ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী হবেন ঠিক তেমনি প্রথম সুফিয়ানী হবে একজন আনাড়ি শাসনকর্তা যে প্রকৃত প্রতিশ্রুত সুফিয়ানীর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী হবে। ইবনে হাম্মাদ বলেছেন : “ওয়ালীদ বলেন : সুফিয়ানী বনি হাশেমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। সে তিন পতাকাবাহী সেনাদল এবং যারা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তাদের বিরুদ্ধে সে যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং সকলের ওপর বিজয়ী হবে। তখন সে কুফার উদ্দেশে রওয়ানা হবে এবং বনি হাশেম ইরাকের দিকে হিজরত করবে। অতঃপর সুফিয়ানী কুফা থেকে ফেরার পথে শামের অদূরে নিহত হবে এবং মৃত্যুর আগে সে আবু সুফিয়ানের এক বংশধরকে তার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করবে যে সবার ওপর বিজয়ী হবে… এবং সে-ই হবে কাঙ্ক্ষিত সুফিয়ানী। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৭৮)
সুফিয়ানী একাধিক হওয়া সংক্রান্ত এ ধরনের হাদীস ইবনে হাম্মাদ তাঁর পাণ্ডুলিপির ৬০ ও ৭৪ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন।
রেওয়ায়েতসমূহে চিত্রিত অবস্থা ও পরিস্থিতিসমূহ থেকে বোঝা যায় যে, সুফিয়ানীর আন্দোলন ও উত্থান হবে অত্যন্ত দ্রুত ও বর্বরোচিত। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় তার উত্থান ও আন্দোলনকে ‘নাটকীয়’ ও ‘রক্তক্ষয়ী’ বলে অভিহিত করা যায়। কারণ, বিশ্ব-পরিস্থিতি ও পরাশক্তিসমূহের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এতটা তীব্র আকার ধারণ করবে যে, তা অবশেষে যুদ্ধের রূপ নেবে। শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) ফিলিস্তিনের ফিতনা দ্বারা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। মশকের মধ্যে পানি যেভাবে আন্দোলিত হয় তেমনিভাবে দুর্বল ও টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার কারণে এ দেশটি অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও অশান্তির শিকার হবে।… পাশ্চাত্য ও ইহুদীদের দৃষ্টিতে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে ফিলিস্তিন সীমান্তে ও আল কুদসের দ্বারপ্রান্তে ইসলামী ও ইরানী সেনাবাহিনীর উপস্থিতির বিষয়টি। তখন শামসহ মুসলিম বিশ্বে রুশদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এ কারণেই তারা ক্ষমতাবান এক শাসক নির্বাচনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এটি এ উদ্দেশ্যে করবে যে, একদিকে এর মাধ্যমে ইসরাইলের আশেপাশের অঞ্চলগুলোকে সম্পূর্ণরূপে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা যাবে, অন্যদিকে ইসরাইল ও আরবদের সাধারণ প্রতিরক্ষা সীমাটি দখলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে তারা ইরাক দখলের যুদ্ধে সুফিয়ানীকে সহযোগিতা করা ছাড়াও ইরানী ও কালো পতাকাধারীদের প্রতিহত করার লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করবে।
একইভাবে পাশ্চাত্য ও ইসরাইল হিজাযের দুর্বল প্রশাসনকে সাহায্য করতে এবং পবিত্র মক্কা নগরীতে সংঘটিত মৌলিক ও নতুন আন্দোলনকে দমন করতে সুফিয়ানীকে সুযোগ করে দেবে। অবশ্য ঐ আন্দোলন ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের অংশ নয়।
হাদীসসমূহে যে সব দিক স্পষ্টভাবে অথবা ইশারা-ইঙ্গিতে উল্লিখিত হয়েছে সেগুলো সুফিয়ানীর আন্দোলনের তীব্রতা ও দ্রুততার বৈশিষ্ট্যকে অনুধাবন করার ব্যাপারে আমাদেরকে সাহায্য করবে।
ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন : “সুফিয়ানী ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের অবশ্যম্ভাবী নিদর্শনসমূহের অন্যতম এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার আবির্ভাব ও আন্দোলন পনের মাস স্থায়ী হবে। সে ছয় মাস যুদ্ধ করবে। যখনই সে পাঁচটি শহরের ওপর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য কায়েম করবে তখন থেকে সে পুরো নয় মাস শাসন করবে। তার শাসন এর থেকে একদিনও বেশি হবে না। (বিহার ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৪৮)
পাঁচটি শহর হচ্ছে দামেশক, জর্ডান, হিমস, হালাব (আলেপ্পো) ও কিন্নাসরীন। এ শহরগুলো সিরিয়া, জর্দান ও লেবালনের প্রশাসনিক কেন্দ্র। রেওয়ায়েতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জর্দানও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে লেবানন যা বৃহত্তর শাম এবং ঐ পাঁচ শহরের অন্তর্গত সেটাও সুফিয়ানীর সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে কতিপয় রেওয়ায়েতে কয়েকটি গোষ্ঠী যে সুফিয়ানীর আধিপত্যের বাইরে থাকবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হবে সত্যপন্থী যাদেরকে মহান আল্লাহ্ সুফিয়ানীর আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করবেন। আর এতৎসংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনা পরে দেয়া হবে। উল্লেখ্য যে, লেবাননের জনগণ ঐ ব্যতিক্রমী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
রেওয়ায়েতসমূহে সুফিয়ানীর উত্থান ও আন্দোলনের সময় সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং তা রজব মাসে সংঘটিত হবে।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : “ইমাম মাহ্দীর আর্বিভাবের অন্যতম অবশ্যম্ভাবী নির্দশন হচ্ছে রজব মাসে সুফিযানীর উত্থান ও আন্দোলন। (বিহার ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৪৯)
সুফিয়ানীর উত্থান ও আন্দোলন ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ছয় মাস পূর্বে হবে। কারণ, ইমাম মাহ্দী ঐ বছরেরই মুহররম মাসের দশম রাতে (আশুরার রাতে) অথবা দশম দিনে (আশুরার দিনে) পবিত্র মক্কায় আবির্ভূত হবেন; আর শামের ওপর সুফিয়ানীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবার কারণে সে প্রথমে ইরাক দখল করে ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের পূর্বেই তাঁর সঙ্গী-সাথীদের বিজয় এবং তাঁর আন্দোলন ও বিপ্লব দমন করার জন্য হিজাযে সেনাবাহিনী প্রেরণ করবে।
সুফিয়ানীর উত্থান ও আন্দোলন তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হবে। যথা :
প্রথম পর্যায় : দৃঢ়ীকরণের পর্যায় অর্থাৎ প্রথম ছ’মাস হবে তার কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তারকাল;
দ্বিতীয় পর্যায় : ইরাক ও হিজায আক্রমণ ও যুদ্ধ পরিচালনা;
তৃতীয় পর্যায় : সুফিয়ানীর ইরাক ও হিজাযে আগ্রাসন থেকে হাত গুটিয়ে নেয়া এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রার মোকাবিলায় শাম, ইসরাইল ও কুদ্সসহ তার অধিকৃত অবশিষ্ট অঞ্চলসমূহ রক্ষা করার জন্য প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ।
এখানে একটি বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। আর তা হলো : সুফিয়ানীর সাথে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহ তার প্রথম ছ’মাসের যুদ্ধসমূহের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র অংকন করেছে। প্রথমে আসহাব ও আবকায়ের সাথে এবং এরপর তার বিরোধী সকল ইসলামী ও অনৈসলামিক শক্তির সাথে তার গৃহযুদ্ধসমূহ সংঘটিত হবে যার ফলে সম্পূর্ণ শামের ওপর তার আধিপত্য কায়েম হবে।
কিন্তু তার আন্দোলনের গতিবিধির দিকে দৃকপাত করলে আমরা স্বভাবতই বুঝতে পারব যে, পুরো এ ছয় মাসে বড় বড় সামরিক অভিযান পরিচালিত হবে; সে এমনভাবে নিজ আধিপত্য ও কর্তৃত্ব দৃঢ় করবে যে, এর ফলে সে পরবর্তী নয় মাসে ব্যাপক ও বৃহৎ যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানসমূহের জন্য বহু সেনা প্রস্তুত করতে সক্ষম হবে। প্রথম ছয় মাসের যুদ্ধগুলোর পাশাপাশি সুফিয়ানী আসহাব ও আবকা ছাড়াও জর্দান ও লেবাননের শাসকদের এবং অন্যান্য বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধেও যুদ্ধে লিপ্ত হবে।
একটি হাদীসে আবকা ও আসহাবের সাথে সুফিয়ানীর যুদ্ধসমূহের তীব্রতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর এ যুদ্ধগুলোই শাম ধ্বংসের কারণ হবে। ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন :
“ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের চিহ্ন ও নির্দশনসমূহের মধ্যে রয়েছে ‘জাবিয়া’ নামক শামের একটি গ্রাম ভূ-গর্ভে প্রোথিত হওয়া ও জাযীরায় তুর্কীদের (রুশদের) এবং রামাল্লায় রোমানদের (পাশ্চাত্য) আগমন। এ সময় সমগ্র বিশ্বে বহু যুদ্ধ সংঘটিত হবে যার ফলশ্রুতিতে শাম ধ্বংস হয়ে যাবে। অপর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, সর্বপ্রথম যে দেশ বা ভূ-খণ্ড ধবংস হবে তা হচ্ছে শাম। আর এ দেশটি ধবংস হবার কারণ হচ্ছে সেদেশে আবকা বাহিনী, আসহাবের সেনাবাহিনী এবং সুফিয়ানীর সেনাদল- এ তিন বাহিনীর সমাবেশ (ও তাদের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ)। (শেখ আল মুফীদ প্রণীত কিতাবুল ইরশাদ, পৃ. ৩৫৯)
দামেশকের ধবংস সংক্রান্ত ইমাম আলী (আ.)-এর হাদীস। তিনি বলেছেন : “আমি অবশ্যই দামেশক ধবংস করব… এ কাজ আমার বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তি করবে।” বাহ্যত এ ধ্বংস হচ্ছে ঐ ধবংসযজ্ঞ যা সুফিযানী, ইহুদী (ইসরাইল) ও রোমীয়দের (পাশ্চাত্য) বিরুদ্ধে ইমাম মাহ্দী (আ.) কর্তৃক পরিচালিত আল কুদ্স মুক্ত করার মহাযুদ্ধের সময় সংঘটিত হবে।
তবে সুফিয়ানী তার শাসনামলের শেষ নয় মাসে বেশ কয়েকটি বড় যুদ্ধ বাঁধাবে যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কিরকীসীয়ায় তুর্কী (রুশজাতি) এবং তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ, যা ‘কিরকীসীয়ার মহাসমর’ বলে রেওয়ায়েতে আখ্যায়িত হয়েছে। অতঃপর সে ইরাকে ইয়েমেনী ও ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের ক্ষেত্রপ্রস্তুতকারী ইরানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। উল্লেখ্য যে, কতিপয় রেওয়ায়েত অনুসারে ইয়েমেনী ইরানীদের সাথে থাকবেন।
পবিত্র মদীনা-ই মুনাওওয়ারায় সম্ভবত সুফিয়ানীর সেনাবাহিনীর কিছু সংখ্যক সৈন্য থাকবে যারা হিজায সরকারের সেনাবাহিনীর পক্ষে মদীনা মুক্ত করার জন্য ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে।
সুফিয়ানী হিজায ও ইরাকে পরাজয় বরণ করার পর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ অর্থাৎ পবিত্র আল কুদ্স বিজয়ের মহাযুদ্ধে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য শাম অথবা ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তন করবে।
ওয়াদী ইয়াবিস (শুষ্ক উপত্যকা ) থেকে দামেশক পর্যন্ত
সুফিয়ানী যে তার আন্দোলন দামেশকের বাইরে সিরিয়া-জর্দান সীমান্তে অবস্থিত হাওরান বা দিরআ অঞ্চল থেকে শুরু করবে এতৎসংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ প্রায় একই; অবশ্য রেওয়ায়েতসমূহে তার আর্বিভাব ও অভ্যুত্থানের স্থানের নাম ‘ওয়াদী ইয়াবিস ওয়া আসওয়াদ’ (শুষ্ক ও কালো উপত্যকা) বলা হয়েছে।
আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “কলিজা ভক্ষণকারিণী হিন্দ-তনয় (হিন্দের বংশধর) ওয়াদী ইয়াবিস থেকে বিদ্রোহ করবে এবং সে হবে প্রশস্ত কাঁধের অধিকারী পুরুষ; তার চেহারা হবে ভয়ঙ্কর এবং তার মাথা হবে প্রকাণ্ড। তার মুখমণ্ডলে বসন্তের দাগ থাকবে। তার মুখাবয়বের দিকে তাকালে মনে হবে যেন সে এক চক্ষুবিশিষ্ট। তার নাম হবে উসমান। তার পিতার নাম হবে আম্বাসাহ্ (উয়াইনাহ্))। আর সে হবে আবু সুফিয়ানের বংশধর।… সে অবশেষে নিরাপদ ও সুপেয় পানির দেশে পৌঁছে যাবে। অতঃপর সে ভাষণ দেয়ার জন্য সেখানকার মসজিদের মিম্বরে দণ্ডায়মান হবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২০৫)
পবিত্র কোরআনের কোন কোন তাফসীরে ‘নিরাপদ ও সুপেয় পানির অঞ্চল’ বলতে ‘দামেশক’ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে আলী থেকে বর্ণিত হয়েছে : “সুফিয়ানী আবু সুফিয়ানের পুত্র ইয়াযীদের পুত্র খালেদের বংশধর হবে। সুফিয়ানী এমন এক ব্যক্তি যার মাথা হবে বৃহদাকার এবং তার মুখমণ্ডলে বসন্তের দাগ থাকবে। তার চোখের মধ্যে একটি সাদা বিন্দু থাকবে এবং দামেশক নগরীর অন্তর্গত একটি অঞ্চল যার নাম হবে ‘ওয়াদী ইয়াবিস’ সেখান থেকে সাত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্রোহ করবে। এ সাত ব্যক্তির একজনের হাতে একটি পেঁচানো পতাকা থাকবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৭৫)
এ পাণ্ডুলিপির ৭৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে যে, শামের পশ্চিমে ‘আনাদারা’ নামক একটি গ্রাম থেকে সাত জন সহযোগীসহ সুফিয়ানী বিদ্রোহ করবে। আর এ গ্রন্থের ৭৯ পৃষ্ঠায় আরতাত বিন মুনযির থেকে বর্ণিত হয়েছে : “কুৎসিত চেহারার অধিকারী ও অভিশপ্ত এক ব্যক্তি বীসানের পূর্ব দিকে মান্দারুন থেকে একটি লাল রংয়ের উটের ওপর উপবিষ্ট অবস্থায় মাথায় একটি মুকুট পরে বিদ্রোহ করবে।”
ইবনে হাম্মাদ তাবেয়ীদের কাছ থেকে বেশ কিছু সংখ্যক রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যেগুলো মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের হতে বর্ণিত বলা হয় নি। এসব রেওয়ায়েতে সুফিয়ানী ও তার আন্দোলন ও বিদ্রোহের সূচনা বা সূত্রপাত হিসাবে যে সব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো আসলে কল্প-কাহিনী ও রূপকথার সাথেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। যেমন : তাকে স্বপ্নজগতে দেখা যাবে, তখন তাকে বলা হবে যে, ‘দাঁড়াও এবং সংগ্রাম কর’। তার হাতে কাঠের তৈরি তিনটি লাঠি থাকবে। যে ব্যক্তিকেই সে তা দিয়ে আঘাত করবে তার মৃত্যু হবে অনিবার্য। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৭৫)
তবে অতিরঞ্জিত ও অস্বাভাবিক বিষয়াদি বর্ণনাকারী রেওয়ায়েতসমূহ বাদ দিলেও আরো এমন কিছু রেওয়ায়েত আছে যেগুলোয় সুফিয়ানীর আন্দোলন প্রচণ্ড ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। তার আক্রমণের প্রচণ্ডতা শিয়া রাবীদের (হাদীস বর্ণনাকারীদের) নিকট একটি স্বীকৃত বিষয়। সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও উত্থানের সময় শিয়াদের করণীয় কি হবে- এতৎসংক্রান্ত বিষয়ে একজন রাবী ইমাম সাদিক (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
হুসাইন ইবনে আবিল আলা হাদরামী থেকে বর্ণিত : “আবু আবদিল্লাহকে (ইমাম সাদিক) আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম : যখন সুফিয়ানী আবির্ভূত হবে তখন আমরা শিয়ারা কী করব? তিনি বলেছিলেন : তখন শিয়া পুরুষরা তার কাছে নিজেদের মুখমণ্ডল ঢেকে রাখবে, সে শিয়া নারী ও শিশুদের কোন ক্ষতি করবে না। আর যখন সে পাঁচ শহর অর্থাৎ শাম দেশের নগরীসমূহের ওপর নিজ আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে তখন তোমরা তোমাদের নেতার (ইমাম মাহ্দীর) দিকে হিজরত করবে (মুখ ফিরাবে)। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৭২)
মনে হয় যে, সবচেয়ে পাষণ্ড সুফিয়ানী হবে আবকা ও তার সমর্থকরা; ইবনে হাম্মাদের বর্ণনায় উল্লিখিত বনি মারওয়ান বলতে এদেরকেই বুঝানো হয়েছে।
ইবনে হাম্মাদ বলেছেন : “সে মারওয়ানের ওপর বিজয়ী হয়ে তাকে হত্যা করবে; অতঃপর সে মারওয়ানের বংশধরদেরকে তিন মাস ধরে হত্যা করবে। এরপর সে প্রাচ্যবাসীর (ইরানীদের) মোকাবিলা করার লক্ষ্যে কুফায় প্রবেশ করবে।”
কতিপয় রেওয়ায়েত হতে জানা যায় যে, সুফিয়ানীর আবির্ভাবকালের প্রথম দিকে শিয়ারা তার প্রধান শত্রু বলে গণ্য হবে না; বরং আবকা ও আসহাবের সমর্থকরা সুফিয়ানী ও শিয়া উভয়েরই শত্রু বলে গণ্য হবে।
ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “তোমাদের শত্রুদের থেকে তোমাদের পক্ষে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সুফিয়ানীই যথেষ্ট হবে। সে তোমাদের জন্য অন্যতম নিদর্শন হবে। ঐ ফাসেক আবির্ভূত হওয়ার দু’ মাসের মধ্যে অন্যদের মধ্য থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা পর্যন্ত তোমাদের কোন ক্ষতি করবে না।”
ইমাম বাকির (আ.)-এর কতিপয় সাহাবী তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন : “ঐ সময় আমাদের নারী ও সন্তানদের ব্যাপারে আমাদে দায়িত্ব কী হবে?” ইমাম বললেন : “তোমাদের পুরুষরা আত্মগোপন করবে। কারণ, আমাদের অনুসারী শিয়ারা তাদের ওপর আক্রমণের আশংকা করবে। তবে তাদের নারীরা ইনশাল্লাহ্ তার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ থাকবে।” তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো : “শিয়া পুরুষরা তার থেকে বাঁচতে কোথায় পলায়ন করবে?” ইমাম বললেন : “যে কেউ তাদের অনিষ্টতা থেকে বাঁচতে চাইবে সে যেন মদীনা, মক্কা বা অন্য কোন শহরের দিকে পালিয়ে যায়… তোমরা বিশেষভাবে মক্কা অভিমুখে যাবে যা হবে তোমাদের একত্রিত হবার স্থান। আর এ ফিতনা নয় মাস অর্থাৎ নারীদের গর্ভধারণ কাল পরিমাণ স্থায়ী হবে এবং মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তা এর চেয়ে অধিক কাল স্থায়ী হবে না। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ১৪১)
এ রেওয়ায়েত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রমযান মাসে শামে শিয়াদের ওপর সুফিয়ানীর আক্রমণ সংঘটিত হবে। একইভাবে রেওয়ায়েতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ অঞ্চলের ওপর তার কর্তৃত্ব এতটা শক্তিশালী ও নিরঙ্কুশ হবে যে, সে সব অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সংকটের মোকাবিলায় সক্ষম হবে।
“কেবল সত্যান্বেষীরা ব্যতীত শামের জনগণ তার আনুগত্য করবে…। মহান আল্লাহ্ সত্যপন্থীদেরকে সুফিয়ানীর সাথে যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করবেন। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৫২)
কতিপয় রাবী এ রেওয়ায়েত থেকে এটিই বুঝেছেন যে, লেবানন ও শামের শিয়ারা সুফিয়ানীর শাসনাধীন থাকবে না এবং তার আনুগত্যও করবে না। অবশ্য এটি সম্ভব হতে পারে এবং এতৎসংক্রান্ত ন্যূনতম দলিল হচ্ছে সুফিয়ানীর আদেশ মান্য করা থেকে শামের বেশ কিছু দল বা গোষ্ঠীর মুক্ত থাকা। কারণ, শিয়া ও অশিয়া জনগোষ্ঠীসমূহ যারা মহান আল্লাহ্ কর্তৃক সংরক্ষিত থাকবে তারা ইরাক ও হিজাযে সুফিয়ানী কর্তৃক পরিচালিত সামরিক অভিযান ও আন্দোলনে যোগদান করা থেকে বিরত থাকবে। সম্ভাবনা রয়েছে বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থা ও পরিবেশের মধ্যে থাকার কারণেই সুফিয়ানীর শাসনাধীন অন্যান্য জনতার সাথে তাদের পার্থক্য থাকবে। বর্তমানে সিরিয়ার সাথে লেবাননের সম্পর্ক যেরূপ তদ্রূপ অবস্থার কারণে তারা এতটা স্বাধীন ও সার্বভৌম থাকতে পারে।
যা হোক সুফিয়ানী এ এলাকার ওপর তার আধিপত্য ও কর্তৃত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পরপরই সীমান্তের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানসমূহ পরিচালনা করবে। যেমন ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ইরানীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সুফিয়ানী এক বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করবে।
“সুফিয়ানী তার সার্বিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা এবং সেনাশক্তি কেবল ইরাকের দিকেই নিয়োজিত করবে এবং তার সেনাবাহিনী কিরকীসীয়ার রণাঙ্গনে প্রবেশ করে সেখানে ভয়ানক যুদ্ধে লিপ্ত হবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৩৭)
সুফিয়ানী সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহে সিরিয়া-ইরাক-তুরস্ক সীমান্তে অবস্থিত কিরকীসীয়ার প্রান্তরে যে যুদ্ধ সংঘটিত হবে তা সুফিয়ানীর আন্দোলনের মূল ধারার বহির্ভূত অর্থাৎ আবির্ভাবের যুগের ঘটনাবলীর বাইরের একটি ঘটনা বলেই মনে হয়। এ কারণেই যদিও সুফিয়ানীর ইরাক যুদ্ধের মূল লক্ষ্য হলো সিরিয়া ও কুদ্স অভিমুখে ইরাকের ওপর দিয়ে অগ্রসরমান ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ইরানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি এবং ইরাকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু ইরাক যাওয়ার পথে এক অদ্ভুত ঘটনার কারণে কিরকীসীয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হবে এবং সে ঘটনাটি হচ্ছে ফোরাত নদীর গতিপথে অথবা এর নিকট একটি গুপ্তধন (বা খনি) আবিষ্কৃত হওয়া। একদল লোক এ গুপ্তধন কুক্ষিগত করার জন্য চেষ্টা করবে এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত হবে। তাদের মধ্য থেকে এক লক্ষ লোক নিহত হবে। তবে যুদ্ধরত কোন পক্ষই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হবে না এবং ঐ গুপ্তধন বা খনির ওপর একক কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না; বরং সকল পক্ষই এ থেকে হতাশ হয়ে অন্যান্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।
মুজামুল বুলদান গ্রন্থের বর্ণনানুসারে কিরকীসীয়া অঞ্চল হচ্ছে একটি ক্ষুদ্র নগরী যা ফোরাত ও খাবূর নদীর সঙ্গমস্থলের অদূরে অবস্থিত এবং এ শহরের ধ্বংসাবশেষ সিরিয়ার ‘দাইর যূর’ শহরের কাছে অবস্থিত। এ শহরটি সিরিয়া-ইরাক সীমান্তের কাছে এবং সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তের কাছাকাছি স্থানে অবস্থিত।
কিরকীসীয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য, সুফিয়ানী ছাড়াও এ যুদ্ধের বিবদমান পক্ষসমূহ কে হবে এবং এ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি কীভাবে ঘটবে এরূপ কতিপয় দিক অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য হওয়া সত্ত্বেও রেওয়ায়েতসমূহে এ যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বর্ণিত হয়েছে।
সমুদয় বৈশিষ্ট্যসমেত এ যুদ্ধের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা সংক্রান্ত বিবরণও ঐ সব রেওয়ায়েতে এসেছে। যেমন নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতটি যা ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন : “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ কিরকীসীয়ায় (মাংসভুক পশু ও পাখিদের জন্য) খাদ্যে পরিপূর্ণ একটি দস্তরখান পাতবেন যার ঘোষণা আসমানী ফেরেশতা প্রদান করবেন এবং তিনি এ বলে আহবান জানাবেন : হে আকাশের পক্ষীকূল এবং পৃথিবীর জীবজন্তুকূল! অত্যাচারীদের মাংস ভক্ষণ করে পরিতৃপ্ত হওয়ার জন্য দ্রুত ছুটে এসো।”
কিরকীসীয়ার যুদ্ধক্ষেত্রকে মহান আল্লাহর দস্তরখান বলে অভিহিত করার কারণ হচ্ছে এই যে, অত্যাচারীদের পারস্পরিক সংঘর্ষ এবং পরস্পর কর্তৃক দুর্বল হওয়ার বিষয়টি মহান আল্লাহর অন্যতম নির্ধারিত বিষয় যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হাতে তাদের পরাজয়কে ত্বরান্বিত করবে। আর এ কারণেই সে ইরাকে প্রবেশ করার আগেই কিরকীসীয়ার যুদ্ধে তার অনেক সৈন্যকে হারাবে। ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ইরানীরা তাকে পরাজিত করবে। অতঃপর কিরকীসীয়ার যুদ্ধে সুফিয়ানীর পরাজয় বরণের পর ইমাম মাহ্দী (আ.) ঐ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তুর্কীদের (রুশজাতি) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন।
রেওয়ায়েতের ভাষ্য অনুযায়ী কিরকীসীয়ার যুদ্ধক্ষেত্র হবে পানি, উদ্ভিদ ও বৃক্ষবিহীন শুষ্ক মরুপ্রান্তর এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সৈন্যদের লাশ দাফন করা হবে না অথবা লাশ দাফন করা সম্ভব হবে না। এ কারণেই আকাশের পাখি এবং ভূ-পৃষ্ঠের হিংস্র জীব-জন্তু উদরপূর্তি করে নিহত সৈন্যদের লাশ ভক্ষণ করবে। আর নিহত সৈন্যরাও হবে অত্যাচারী। কারণ তারা হবে অত্যাচারীদের অনুগত সৈন্য। অথবা তাদের মধ্যে উভয় পক্ষের অনেক অত্যাচারী সামরিক কর্মকর্তা এবং সমরনায়ক থাকবে।
ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : “অতঃপর সুফিয়ানী আবকার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। সুফিয়ানী তাকে, তার সঙ্গী-সাথীদের এবং আসহাবকে হত্যা করবে। তখন ইরাকে আক্রমণ করা ব্যতীত তার অন্য কোন লক্ষ্য থাকবে না। সে তার সেনাবাহিনীকে কিরকীসীয়ায় মোতায়েন করবে এবং সেখানে তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। এ যুদ্ধে এক লক্ষ লোক প্রাণ হারাবে এবং সুফিয়ানী প্রায় সত্তর হাজার সৈন্য কুফায় প্রেরণ করবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৩৭)
কতিপয় রেওয়ায়েতে নিহতদের সংখ্যা এক লক্ষ ষাট হাজার এবং আরো কতিপয় রেওয়ায়েতে নিহতদের সংখ্যা এর চেয়েও বেশি উল্লিখিত হয়েছে। কারণ নিহতদের এক লক্ষ হবে অত্যাচারী সৈনিক আর এ বিষয়টি উপরিউক্ত হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে। তবে অবশিষ্ট লাশ হবে সাধারণ সৈনিক, এজেন্ট ও বঞ্চিত লোকদের।
তবে বিতর্কিত গুপ্তধন সংক্রান্ত রেওয়ায়েতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট হচ্ছে ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত রেওয়ায়েতটি। মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “ফোরাত নদী থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের পর্বত নির্গত হবে এবং একে কেন্দ্র করে এত ভয়ঙ্কর যুদ্ধ বেঁধে যাবে যে, প্রতি নয় ব্যক্তির মধ্যে সাত জনই নিহত হবে। অতঃপর যখন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে তখন এর নিকটবর্তী হয়ো না। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯২)
এই একই পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত হয়েছে : “চতুর্থ ফিতনা আঠার বছর স্থায়ী হবে; অতঃপর তা শেষ হবে এবং ঐ সময় ফোরাত নদী থেকে স্বর্ণের পর্বত নির্গত হবে এবং জনগণ তা দখল করার জন্য পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হবে। এ যুদ্ধে প্রতি নয় জনের মধ্যে সাত জনই নিহত হবে।”
এ রেওয়ায়েতে বর্ণিত চতুর্থ ফিতনার অর্থ যদি মুসলমানদের ওপর পাশ্চাত্য ও অন্যান্য জাতির কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার করা হয়, তাহলে ঐ ফিতনা দীর্ঘস্থায়ী হবে। আর আজ প্রায় এক শতাব্দী গত হতে চলেছে। আর যদি এর লক্ষ্য শামের অভ্যন্তরীণ ফিতনা ও গোলযোগ হয়ে থাকে যা ফিলিস্তিনের ফিতনা থেকে উৎপত্তি লাভ করবে, তাহলে এ দিক থেকে লেবাননের গৃহযুদ্ধ এ ১৮ বছরব্যাপী ফিতনার সূচনা হতে পারে।
আর উল্লিখিত গুপ্তধন স্বর্ণ ও রৌপ্যের খনি হতে পারে যা সেখানে আবিষ্কৃত হবে এবং তিন রাষ্ট্র ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে মতবিরোধ ও গোলযোগের কারণ হবে। অথবা ঐ গুপ্তধন বা সম্পদ তেল বা অন্যান্য খনিজ দ্রব্যও হতে পারে। আমি শুনেছি যে, কিরকীসীয়া অঞ্চল তেল ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ, এমনকি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ অঞ্চল হতে পারে। বর্তমানে কূপ খনন ও আনুষাঙ্গিক সন্ধান কার্য চালানো হচ্ছে এবং বেশ কিছু ইতিবাচক ফলাফলও পাওয়া গেছে।… ঐ আল্লাহ্ই হচ্ছেন পবিত্র যাঁর হাতে আছে সকল বস্তুনিচয়ের সূক্ষ্ম পরিমাপ ও মালিকানা।
তবে অধিকাংশ রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে এ যুদ্ধে সুফিয়ানীর প্রতিপক্ষ হবে তুর্কীরা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তুর্কীরা বলতে কাদেরকে বোঝানো হয়েছে? এ ক্ষেত্রে যা স্বাভাবিক এবং বাস্তবতার অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয় তা হচ্ছে এই যে, যারা কিরকীসীয়ার যুদ্ধে সুফিয়ানীর প্রতিপক্ষ হবে তারা হবে তুর্কী ভাষাভাষী সেনাবাহিনী। কারণ এমন সম্পদকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ হবে যা সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে অবস্থিত। তবে তৃতীয় পক্ষ যারা ইরাকে থাকবে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এবং তাদের মধ্যে দু’দলের উদ্ভব হবে; এ দু’দলের একটি হবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ইয়েমেনী ও ইরানীদের সমর্থক এবং অপর দলটি হবে সুফিয়ানীর সমর্থক। তবে এ ক্ষেত্রে এত বেশি দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান যেগুলো এ ক্ষেত্রে তুর্কী অর্থ রুশজাতি হওয়ার সম্ভাবনাকেই বেশি সমর্থন করে। বিশেষ করে ঐ সব রেওয়ায়েত যেগুলো স্পষ্ট স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও উত্থানের আগে কিরকীসীয়ার কাছে রবীয়াহ্ দ্বীপ অথবা দিয়ার বাকরে রুশজাতির আগমন হবে। আর ঐ সব রেওয়ায়েত যেগুলোয় উল্লিখিত হয়েছে যে, সুফিয়ানী তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং এরপর হযরত মাহ্দী (আ.)-এর হাতে তারা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) প্রথম যে সেনাবাহিনীটি তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণ করবেন তাদের হাতেই তুর্কীদের ধ্বংস সাধিত হবে। আর বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত ‘জাযীরাহ্’ বলতে বাহ্যত ঐ অঞ্চলকেই বোঝায় যা এ নামেই অভিহিত। উল্লেখ্য যে, এ জাযীরায় সুফিয়ানীর আগেই তুর্কী ভাষাভাষী সেনাবাহিনীর আগমন হবে। আর ‘জাযীরাহ্’ শব্দটি অন্য কোন শব্দের সাথে যুক্ত না হয়েই রেওয়ায়েতসমূহে উল্লিখিত হয়েছে (যেমন তা জাযীরাতুল আরব ‘আরব উপদ্বীপ’ নামে উল্লিখিত হয়নি)। ঠিক একইভাবে রেওয়ায়েতসমূহের বিবরণ অনুসারে রামাল্লায় রোমান বাহিনীর আগমন বলতে ফিলিস্তিনের রামাল্লাকেই বোঝানো হয়েছে।
হ্যাঁ, খনি বা গুপ্তধনের সাথে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহ যাতে মহানবী (সা.) মুসলমানদেরকে উক্ত সম্পদকে কেন্দ্র করে যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত হবে তাতে জড়াতে নিষেধ করেছিলেন এবং বলেছিলেন তা করতলগত করার জন্য আগতরা একে অপরকে হত্যা করবে, তা থেকে বোঝা যায় যে, গুপ্তধনকে কেন্দ্র করে বিবদমান পক্ষগুলো হবে মুসলমান; তবে এ বিষয়টি যুদ্ধে তুরস্ক-সরকারের জড়িত থাকার বিষয়টি নাকচ করে না এবং রুশীয় তুর্কী অথবা তুর্কীদের সমর্থক কর্তৃক উক্ত সরকারকে সাহায্য করার সম্ভাবনাকেও বাতিল করে না। কারণ, তুর্কীদের ক্ষেত্রে এ জাতীয় ভাষ্য জাযীরায় তাদের সেনাবাহিনীর আগমন সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহে উল্লিখিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন রেওয়ায়েতে যে সব রোমান ও মাগরিবীর (পাশ্চাত্য বা পশ্চিমাঞ্চলীয় অধিবাসীদের) কথা উল্লিখিত হয়েছে তারা কিরকীসীয়া যুদ্ধের অন্যতম বিবদমান পক্ষ হবে। আর ঐ সব নিদর্শনও হবে খুব অল্প ও দুর্বল। তবে অন্যদের বিরুদ্ধে সুফিয়ানীকে সাহায্য করার জন্য সম্ভবত রোমান ও মাগরিবীরা সেখানে উপস্থিত হবে।
তবে সুফিয়ানীর বিরোধী প্রকৃত শক্তিগুলো যারা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সমর্থক (ইয়েমেনী ও ইরানীরা) তারা কিরকীসীয়ার যুদ্ধে মোটেও অংশগ্রহণ করবে না। কারণ, এ যুদ্ধ তাদের শত্রুদের মধ্যে সংঘটিত হবে। তবে রেওয়ায়েত হতে বাহ্যত বোঝা যায়, তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হবে হিজাযে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সেনাদের সাথে সম্পর্ক, যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধনের জন্য চেষ্টা চালানো। উল্লেখ্য যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের আন্দোলনের শুভ সূত্রপাত পবিত্র মক্কা নগরীতে হবে। তবে তাদের অংশগ্রহণ না করার কারণ সম্ভবত বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাওয়াও হতে পারে। আমাদের দৃষ্টিতে এ পর্যায়ে (কিরকীসীয়ার যুদ্ধে) এ বিশ্বযুদ্ধের একটি অংশ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনাই খুব বেশি। (আমরা এ ব্যাপারে পরে বিস্তারিত আলোচনা করব)।
হযরত আলী (আ.) থেকে ইবনে হাম্মাদ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন : “যখন সুফিয়ানীর সাঁজোয়া বাহিনী কুফার দিকে অগ্রসর হবে তখন সে একদল সৈন্যকে খোরাসানী বাহিনীর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করবে এবং তখন খোরাসানীরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সন্ধানে বের হবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৭৮)
রেওয়ায়েতসমূহের বক্তব্য অনুসারে সুফিয়ানীর জন্য ইরাক দখল একটি কৌশলগত ও তাৎক্ষণিক লক্ষ্য বলে বিবেচিত হবে। তবে সে কিরকীসীয়ার যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হবে। এ যুদ্ধের পর সে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখবে। ইরাক আক্রমণ করার ক্ষেত্রে তার কোন প্রতিপক্ষ থাকবে না, এমনকি এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোও তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না, যেহেতু যে তুর্কীদের বিরুদ্ধে কিরকীসীয়ায় সুফিয়ানী যুদ্ধ করবে তাদের মূল লক্ষ্যই হবে কিরকীসীয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ করায়ত্ত করা সেহেতু ইরাকে তাদের তেমন কোন প্রয়োজনই থাকবে না।
সুফিয়ানীর একমাত্র বিরোধী শক্তি হবে ইয়েমেনী ও খোরাসানীরা অর্থাৎ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সঙ্গী-সাথীরা। এ বিষয়টি থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইরাকে সুফিয়ানীর যুদ্ধ মূলত ইমাম মাহ্দী (আ.) এবং তাঁর সমর্থকদের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হবে।
রেওয়ায়েতসমূহ অনুসারে ইরাকের জনগণ দু’ অথবা তিন দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারীদের সমর্থক, সুফিয়ানীর সমর্থক এবং তৃতীয় গোষ্ঠী হবে শাইসাবানীর নেতৃত্বাধীন। জাবির ইবনে জুফী থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন : “আমি ইমাম বাকির (আ.)-কে সুফিয়ানীর ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিলাম। তখন তিনি বলেছিলেন : ইরাকে শাইসাবানীর আবির্ভাবের আগে সুফিয়ানী আবির্ভূত হবে না। মাটি থেকে ঝরনার পানি যেভাবে ফেটে বের হয় ঠিক সেভাবেই সে আবির্ভূত হবে এবং তোমাদের দূতদেরকে হত্যা করবে। এর পরই তোমরা সুফিয়ানীর উত্থান এবং আল কায়েম আল মাহ্দীর আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় থাকবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৫০)
শাইসাবানী বলতে আব্বাসীয় বংশোদ্ভূত কোন ব্যক্তি অথবা আহলে বাইতের কোন শত্রুকে বোঝানো হয়েছে। কারণ ইমামরা আব্বাসীয়দেরকে ‘বনী শাইসাবান’ বলেছেন।
শাইসাবানী একজন অপরাধী বা অজ্ঞাত ব্যক্তির নাম হবে যা আহলে বাইতের ইমামরা তাঁদের শত্রুকে ইশারা-ইঙ্গিতে বুঝানোর জন্য উল্লেখ করতেন। তবে অভিধানে ‘শাইসাবান’ হচ্ছে ইবলীসের অন্যতম নাম। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী খোরাসানী এবং তাদের সমর্থকদের হাতে ইরাকের শাসনকর্তৃত্ব চলে যাবার পর শাইসাবানী ইরাকে বিদ্রোহ করবে। এখানে স্মর্তব্য যে, পূর্ববর্তী কোন এক পর্যায়ে ইরাকে খোরাসানীদের প্রবেশের বিষয়টি রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত হয়েছে।
যাহোক, ইরাকে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এমনই হবে যে, তা সেদেশে সুফিয়ানী বাহিনীর প্রবেশের উপযোগী ও অনুকূল হবে এবং সে ইরাকে কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধের মুখোমুখি হবে না। আর তখন ইয়ামানী ও খোরাসানীরা হিজাযে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর শুভ আবির্ভাবের ঘটনাবলী নিয়ে মশগুল থাকবে। আর তাদের সেনাবাহিনী ও সেনাশক্তিসমূহের (প্রবেশের) অল্প আগেই সুফিয়ানী বাহিনী ইরাকে প্রবেশ করবে।
ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “নিঃসন্দেহে অমুক রাজবংশ রাজত্ব করতে থাকবে এবং যখন তারা শাসনক্ষমতা লাভ করবে তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক মতবিরোধ দেখা দেবে এবং তাদের রাজত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তাদের ক্ষমতা লোপ পাবে। অবশেষে তাদের বিরুদ্ধে খোরাসানী ও সুফিয়ানী যুদ্ধ করবে- একজন পূর্ব থেকে এবং আরেকজন পশ্চিম থেকে। তারা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দ্রুতগামী অশ্বের ন্যায় কুফা অভিমুখে অগ্রসর হবে। এ দু’জনের হাতে অমুক রাজবংশ ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। আর তারা তাদের কাউকেই জীবিত রাখবে না। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৩১- ২৩২)
‘অমুকের বংশধররা’ বলতে এখানে সম্ভবত ইরাকের ওপর কর্তৃত্বশীল শাইসাবানীর বংশ অথবা অন্য কোন শাইসাবানের বংশধরও বুঝানো হতে পারে।
ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত : “আমি যেন সুফিয়ানীকে (অথবা তার বন্ধুকে) দেখতে পাচ্ছি যে, সে কুফায় তোমাদের শ্যামল সবুজ জমিগুলোয় অবস্থান নিয়েছে এবং তার পক্ষ থেকে এক আহবানকারী উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করছে যে, যে কেউ আলীর অনুসারীদের মাথা এনে উপস্থিত করবে তাকেই এক হাজার দিরহাম পুরস্কার দেয়া হবে। এ সময় প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে আক্রমণ করবে এবং বলবে যে, এ ব্যক্তি তাদেরই একজন। এভাবে মস্তক বিচ্ছিন্ন করা শুরু হবে এবং হাজার দিরহামের পুরস্কার দেযা হবে। কিন্তু সেসময়ে কেবল জারজরা ব্যতীত আর কেউ তোমাদের ওপর শাসন করবে না।… আমি যেন একজন নিকাব পরিহিত ব্যক্তিকে দেখতে পাচ্ছি।” আমি তখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম : “ঐ নিকাব পরিহিত লোকটি কে?” ইমাম বলেছিলেন : “সে তোমাদের মধ্যকারই এক ব্যক্তি হবে যে তোমাদের মতোই কথা বলবে। সে তার মুখমণ্ডল নিকাব দিয়ে ঢেকে রাখবে এবং তোমাদের যাবতীয় বিষয় ও তথ্য তার নখদর্পনে থাকবে এবং সে তোমাদের ভালোভাবে চিনবে অথচ তোমরা তাকে চিনবে না। সে তোমাদের প্রত্যেকের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করে তোমাদের দুর্নাম করবে। তবে সে হবে জারজ। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২১৫)
ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতেও বর্ণিত আছে :
কুফায় প্রবেশ করে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র বংশধরদের অনুসারীদের হত্যা করা পর্যন্ত সুফিয়ানীর সাঁজোয়া বাহিনী আঁধার রাত এবং প্রলয়ঙ্কারী প্লাবনের মতো যা কিছু পাবে তা ধ্বংস করে ফেলবে। অতঃপর তারা চতুর্দিকে খোরাসানীদেরকে খুঁজতে থাকবে অথচ খোরাসানীরা তখন ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সন্ধান করতে থাকবে, তাঁকে ডাকতে থাকবে এবং তাঁর সাহায্যার্থে দ্রুত অগ্রসর হবে। (ইবনে হাম্মাদের পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৮৩)
সুফিয়ানী বাহিনী ইরাক যুদ্ধে বিশেষ করে শিয়াদের ওপর যে সব জঘন্য অপরাধ করবে সেগুলো বিস্তারিত বিবরণ এ সব রেওয়ায়েতে এসেছে। ইবনে মাসউদ থেকে ইবনে হাম্মাদ বর্ণনা করেছেন : “সুফিয়ানী যখন ফোরাত নদী অতিক্রম করে হাকার কুফা নামক একটি স্থানে এসে পৌঁছবে তখন মহান আল্লাহ্ তার ঈমান পুরোপুরি বিলুপ্ত করে দেবেন। তখন সে অস্ত্রধারী সত্তর হাজার সৈন্যসমেত ‘দুজাইল’ (ছোট দজলা) নামক একটি নদী অভিমুখে যাত্রা করবে। এদের চেয়েও অধিক সংখ্যক ব্যক্তি থাকবে যারা সোনালী প্রাসাদ পদানত করবে। তারা প্রতিরোধকারীদেরকে হত্যা করবে এবং গর্ভে পুত্রসন্তান থাকতে পারে- এ ধারণার বশবর্তী হয়ে গর্ভবতী নারীদের পেট চিড়ে ফেলবে। একদল কুরাইশ বংশীয়া রমণী দজলা নদীর তীরে জাহাজের যাত্রী ও পথিকদের কাছে আবেদন করবে যাতে করে তারা তাদেরকে তাদের সাথে সওয়ারী পশুগুলোর ওপর বসিয়ে নিয়ে যায় এবং আত্মীয়-স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেয়। তবে বনি হাশিমের সাথে তাদের শত্রুতা থাকার কারণে তারা তাদেরকে নিজেদের সাথে নেবে না। (ইবনে হাম্মাদের পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৮৩)
‘অস্ত্রধারী সত্তর হাজার সৈন্যসমেত’- এ বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে এই যে, তাদের অস্ত্র ও হাতিয়ারসমূহের ধরণ অন্যান্য সেনাবাহিনীর অস্ত্র ও হাতিয়ার থেকে ভিন্ন হবে এবং যে সোনালী প্রাসাদের ওপর তারা কর্তৃত্ব স্থাপন করবে মনে হচ্ছে যে, তা হবে গুপ্তধন বা খনির স্থান অথবা এমন কোন প্রাসাদ যা দজলা বা দুজাইল নদীর পাশে অবস্থিত হবে। আর কুরাইশ রমণীরা বলতে আহলে বাইতের বংশধর নারীরা হবে।
আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) বলেছেন : “সুফিয়ানীর সেনাবাহিনী কুফায় প্রবেশ করে কাউকে জীবিত রাখবে না বরং হত্যা করবে; তাদের মধ্যে হত্যা করার প্রবণতা এতটা বিদ্যমান থাকবে যে, যখন তাদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি অতি মূল্যবান ও বিশাল ধনরত্ন খুঁজে পাবে তখনও সে সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপই করবে না। অথচ কোন শিশু দেখলেও তাকে হত্যা করবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২১৯)
যে সব স্থানের কথা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে সেগুলো ছাড়াও রেওয়ায়েতসমূহে আরো কিছু স্থানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে সুফিয়ানী বাহিনী বিপুল সংখ্যায় সমবেত হবে। যেমন যাওরা (বাগদাদ), আনবার, সারাত, ফারুক ও রাওহা। ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “সে এক লক্ষ ত্রিশ হাজার সৈন্যকে কুফা অভিমুখে প্রেরণ করবে এবং তারা রাওহা এবং ফারুক নামক স্থানে আগমন করবে। সেখান থেকে ষাট হাজার সৈন্য কুফা অভিমুখে রওয়ানা হবে এবং নুখাইলাস্থ হযরত হুদ (আ.)-এর সমাধিস্থলে এসে উপস্থিত হবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৭৩)
সাফায়েরীনী হাম্বলী প্রণীত ‘লাওয়ায়েহুল আনওয়ার আল বাহীআহ্’ নামক গ্রন্থে সুফিয়ানীর ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে : “সে তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং তাদের ওপর জয়ী হবে। তখন সে পৃথিবীতে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে এবং বাগদাদে প্রবেশ করে সেখানকার একদল অধিবাসীকে হত্যা করবে।”
সুফিয়ানীর ইরাক আক্রমণ হবে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক এবং সে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অনুসারীদের হত্যা করার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সফল হবে। সে ইরাক সরকারের পক্ষ থেকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে না, এমনকি শিয়াদের পক্ষ থেকেও কোন প্রতিরোধ পরিলক্ষিত হবে না। তবে হাদীসে একজন অনারব ব্যক্তির ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, সে ক্ষুদ্র ও নিরস্ত্র একদল লোক নিয়ে সুফিয়ানী বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে এবং সুফিয়ানী বাহিনী তাকে হত্যা করবে :
“তখন কুফার অধিবাসী অনারব এক ব্যক্তি একটি দুর্বল দল সাথে নিয়ে সুফিয়ানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং সুফিয়ানী বাহিনীর সেনাপতি তাকে হীরা ও কুফার মাঝখানে হত্যা করবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৩৮)
আমরা শীঘ্রই ইবনে হাম্মাদের যে রেওয়ায়েতে স্পষ্ট উল্লিখিত হয়েছে যে, ‘তারা নিরস্ত্র মুষ্টিমেয় লোক হবে’ সে রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করব। তবে সুফিয়ানীর ইরাক আক্রমণ তার দ্বিতীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্থাৎ ইরাকে তার পূর্ণ কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে বাস্তবায়ন করতে পারবে না। বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরাক অভিমুখে দ্রুত অগ্রসরমান খোরাসানী ও ইয়ামেনী (ইমাম মাহ্দীর আগমনের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী) সেনাবাহিনীদ্বয়ের অগ্রসর হওয়ার সংবাদ সুফিয়ানী বাহিনীর কাছে এসে পৌঁছবে। এ সংবাদ পাওয়ার পর তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে এবং খোরাসানী ও ইয়েমেনী বাহিনীদ্বয়ের মোকাবিলায় পশ্চাদপসরণ করবে এবং তাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকবে। তবে ইরাকের গুটিকতক স্থানে খোরাসানী ও ইয়ামানী বাহিনীদ্বয়ের সাথে তাদের সংঘর্ষ হবে এবং তারা সেগুলোয় পরাজিত হবে।
অধিকতর শক্তিশালী সম্ভাবনার ভিত্তিতে বলা যায় যে, সুফিয়ানী তার এ সেনাশক্তি ইরাক থেকে প্রত্যাহার করবে এবং সে তার ধারণা মোতাবেক পবিত্র মক্কা নগরীতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর উত্থান ও আন্দোলনের অবসান ঘটাতে তার সেনাবাহিনীর পুরোটিকেই অথবা একটি বড় অংশকে হিজাযে মোতায়েন করবে। কারণ, কতিপয় রেওয়ায়েতে নিশ্চিত করে বলা হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলনকে স্তিমিত করে দেবার জন্য সুফিয়ানী হিজাযে যে সেনাবাহিনী প্রেরণ করবে তা হবে ইরাক থেকে প্রত্যাহারকৃত তার সেনাবাহিনী। আরো কিছু রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, সে ঐ সেনাবাহিনী শাম থেকে হিজাযে প্রেরণ করবে। তবে উক্ত সেনাবাহিনীর এক অংশ শাম থেকে এবং আরেক অংশ ইরাক থেকেও প্রেরণ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত : “সুফিয়ানী সত্তর হাজার সৈন্য কুফায় প্রেরণ করে সেখানকার অধিবাসীদেরকে হত্যা করে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে বা বন্দী করে অশেষ দুঃখ-কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন করবে। আর তখনই খোরাসান থেকে কালো পতাকাধারী সেনাদল ইরাক অভিমুখে রওয়ানা হবে এবং দ্রুতগতিতে একের পর এক গন্তব্যসমূহ অতিক্রম করবে এবং তাদের সাথে আল কায়েম আল মাহ্দীর বেশ কিছু সংখ্যক বিশেষ সঙ্গীও থাকবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৩৮)
ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত হয়েছে : “সুফিয়ানী কুফায় প্রবেশ করবে এবং তিন দিন সেখানে লুটতরাজ চালাবে। সে সেখানকার ষাট হাজার অধিবাসীকে হত্যা করবে। অতঃপর সে সেখানে আঠার রাত অবস্থান করবে।… তখন কালো পতাকাবাহীরা কুফা অভিমুখে যাত্রা করবে এবং পানির পাশে অবস্থান গ্রহণ করবে। তাদের আগমনের সংবাদ শোনামাত্রই সুফিয়ানীর সঙ্গী-সাথীরা পলায়ন করবে। তাদের একটি দল কুফার খেজুর বাগানসমূহের মধ্য দিয়ে বের হয়ে যাবে অথচ তাদের মধ্য থেকে গুটিকতক ব্যক্তি ব্যতীত সকলেই সশস্ত্র থাকবে এবং তাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি বসরার অধিবাসী হবে।.কালো পতাকাবাহীরা সুফিয়ানীর সঙ্গী-সাথীদের নাগাল পাবে এবং কুফার বন্দী অধিবাসীদেরকে তাদের হাত থেকে মুক্ত করবে। এরপর কালো পতাকাবাহীরা বাইআত করার জন্য গুটিকতক ব্যক্তিকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে প্রেরণ করবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৮৪)
পরবর্তী রেওয়ায়েত যা আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) থেকে বর্ণিত তাতে সুফিয়ানী বাহিনী কর্তৃক ইরাক জবরদখল এবং খোরাসানী ও ইয়েমেনী ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী সেনাবাহিনীদ্বয়ের সেদেশে আগমনের একটি অংশ বর্ণিত হয়েছে : “সে (সুফিয়ানী) এক লক্ষ ত্রিশ হাজার সৈন্য কুফায় প্রেরণ করবে এবং তারা রাওহা ও ফারুকে অবতরণ করবে। সেখান থেকে ষাট হাজার সৈন্য কুফার উদ্দেশে প্রেরণ করা হবে এবং তারা নুখাইলায় হযরত হুদ (আ.)-এর সমাধিস্থলে অবস্থান নেবে এবং ঈদের দিন কুফাবাসীদের ওপর আক্রমণ চালাবে। ইরাকের জনগণের শাসনকর্তা হবে একজন অত্যাচারী ও শত্রুতা পোষণকারী ব্যক্তি যাকে ‘ভবিষ্যদ্বক্তা ও যাদুকর’ বলে অভিহিত করা হবে। এক ব্যক্তি সেনা কমান্ডার হিসাবে পাঁচ হাজার জ্যোতিষীকে সাথে নিয়ে বাগদাদ থেকে তাদের দিকে গমন করবে। ঐ শহরের সেতুর ওপর সত্তর হাজার লোককে এমনভাবে হত্যা করবে যে, জনগণ রক্ত ও লাশের দুর্গন্ধে তিন দিন পর্যন্ত ফোরাত নদীর তীরে যাওয়া থেকে বিরত থাকবে। সে ঐ সব সত্তর হাজার কুমারী মেয়েকে বন্দী করবে যাদের চেহারা কখনই দেখা যায়নি এবং তাদেরকে হাওদায় বসিয়ে নাজাফের একটি অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হবে। আর তখন কুফা থেকে দশ হাজার মুশরিক ও মুনাফিক বের হয়ে আসবে এবং তারা দামেশকে প্রবেশ করবে। কোন প্রতিন্ধকতাই তাদেরকে বিরত রাখতে পারবে না। আর ঐ শহরটি হবে উঁচু ভবন বিশিষ্ট।
তুলা ও রেশম নির্মিত নয় এমন চিহ্ণবিহীন পতাকাসমূহ পূর্ব দিক থেকে আবির্ভূত হবে যেগুলোর লাঠির ওপরে একটি চিহ্ন বিদ্যমান থাকবে। ইমাম আলী (আ.)-এর বংশধর এক ব্যক্তি ঐ পতাকাগুলোকে চালনা করবেন। তিনি পূর্ব দিক থেকে আবির্ভূত হবেন এবং এর সুবাস মেশকে আম্বরের মতো পাশ্চাত্যেও অনুভূত হবে। তাদের পৌঁছানোর এক মাস আগেই শত্রুদের অন্তরে ভয়-ভীতি ঢুকে যাবে। অবশেষে তিনি তার পিতৃপুরুষদের রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য কুফায় প্রবেশ করবেন।
এই সময় ইয়েমেনী ও খোরাসানী অশ্বারোহীরা, এলোকেশে ধূলা ধূসরিত দ্রুতগতিসম্পন্ন মাঝারি পাতলা গড়নের অশ্বসমূহের ন্যায় কুফা অভিমুখে দ্রুত ছুটে আসতে থাকবে। আর যখন তাদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি তার পায়ের নিচে তাকাবে তখন বলবে : আজ থেকে আমাদের জন্য বসে থাকার মধ্যে কোন কল্যাণ ও সৌভাগ্য নেই। হে আল্লাহ্! আমরা অনুশোচনা করছি, অথচ ঐ অবস্থায় তারা হবে সর্বোত্তম ধার্মিক। আর মহান আল্লাহ্ তাঁর পবিত্র গ্রন্থে তাদের এবং মহানবী (সা.)-এর বংশধরদের হতে যারা তাদের সদৃশ হবে তাদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন : “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ তওবাকারী ও সচ্চরিত্রের অধিকারীদেরকে ভালোবাসেন।” একজন নজরানবাসী বের হয়ে এসে ইমামের আহবানে সাড়া দেবে। সে হবে প্রথম খ্রিস্টান যে ইমামের দাওয়াত কবুল করবে এবং নিজ উপাসনালয় ধ্বংস করবে, ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবে, দাস ও দুর্বল লোকদের সাথে বের হবে এবং হেদায়েতের পতাকাসমূহের সাথে নুখাইলার উদ্দেশে রওয়ানা হবে।… পৃথিবীর সকল অধিবাসীর সমবেত হবার স্থল হবে ফারুক। সেদিন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ (তিন মিলিয়ন) লোক নিহত হবে। যারা সেদিন নিহত হবে তারা পরস্পরকে হত্যা করবে। আর তখনই নিম্নোক্ত আয়াতের প্রকৃত অর্থ সবার কাছে উন্মোচিত হবে। আয়াতটি হলো : “যে পর্যন্ত আমরা তাদেরকে কর্তিত ফসলের মতো ও নিশ্চুপ করে না দেব সে পর্যন্ত সর্বদা তাদের ঐ আহবান ও দাবিটি অব্যাহত ছিল। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৭৩-২৭৪)
এ রেওয়ায়েত প্রসঙ্গে পাণ্ডুলিপিসমূহে ভ্রম বিদ্যমান। আরেকটি রেওয়ায়েত যা এ রেওয়ায়েত অপেক্ষা অধিক সূক্ষ্ম তা বিহার গ্রন্থে হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন : “হে জনতা! ফিতনা-ফ্যাসাদ তোমাদের দেশকে এর জীবন-মৃত্যুর পরে লণ্ড-ভণ্ড ও ধ্বংস ও এর অশুভ ছায়া তোমাদের দেশ ও জনপদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা অথবা পশ্চিম দিক থেকে আগুন শুষ্ক ও বিশাল জ্বালানি কাঠে লেগে যাওয়া ও এর লেলিহান শিখার তীব্র গর্জন শ্রুত হবার আগেই (যা জিজ্ঞাসা করে জানা দরকার সে ব্যাপারে) আমাকে তোমরা প্রশ্ন কর। তখন তার জন্য আক্ষেপ প্রতিশোধ ও রক্তের বদলা ইত্যাদি নেয়ার জন্য যখন সময় ও কালের চাকার আবর্তন দীর্ঘ হবে (ইমাম মাহ্দীর আগমন বিলম্বিত ও দীর্ঘ হবে) এবং তোমরা বলবে যে, সে মরে গেছে অথবা ধ্বংস হয়ে গেছে (যদি সে জীবিত থাকে তাহলে সে কোথায় আছে বা বসবাস করছে?)। এ সময় ‘অতঃপর তোমাদের বিজয়ের চাকা আমরা ঘুরিয়ে দেব, তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করব এবং তোমাদের জনসংখ্যাকে তাদের চেয়ে বেশি করে দেব’- এ আয়াতের অর্থ বাস্তবায়িত হবে। তার আবির্ভাবের বেশ কিছু নিদর্শন আছে। এগুলো হলো : ওঁৎ পেতে থেকে ও পাথর নিক্ষেপ করে কুফার প্রাচীরের বিভিন্ন কোণে ফাটল ধরিয়ে ঐ নগরী অবরোধ করা, চল্লিশ রাত মসজিদসমূহ বন্ধ থাকা, মন্দির আবিষ্কার, বড় মসজিদের আশেপাশে বেশ কিছু সংখ্যক পতাকা পতপত করে উড়া যেগুলো হেদায়েতের পতাকাসদৃশ হবে, হত্যাকারী ও নিহত উভয়ই দোযখের আগুনে থাকবে, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ত্বরিত মৃত্যু, সত্তর জন সৎ মানুষের সাথে একজন পবিত্র আত্মার অধিকারী ব্যক্তিকে (নাফসে যাকিয়াহ্) হত্যা করা। উল্লেখ্য যে, তাকে রুকন ও মাকামের মাঝখানে জবাই করা হবে। শয়তানী চরিত্রের অধিকারী প্রচুর সংখ্যক ব্যক্তিসমেত প্রতিমালয়ে আসবাগ্ মুযাফ্ফারকে হত্যা, সবুজ (অথবা হলুদ) রংয়ের পতাকা এবং সোনালী ক্রুশসমেত সুফিয়ানীর অভ্যুত্থান ও বিপ্লব। এ বাহিনীর সেনাপতি হবে কালব গোত্রের এক ব্যক্তি এবং বারো হাজার আরোহী সৈন্য সুফিয়ানীর সাথে পবিত্র মক্কা ও মদীনা অভিমুখে যাত্রা করবে এবং এ সেনাবাহিনীর সেনাপতি হবে বনি উমাইয়্যার এক ব্যক্তি যার নাম হবে খুযাইমাহ্ এবং বলা হবে যে, তার বাম চোখ কানা এবং তার ডান চোখে এক বিন্দু রক্ত আছে। সে হবে দুনিয়াপূজারী। মদীনা পৌঁছানোর আগে তার থেকে কোন পতাকাবাহীই ফিরে যাবে না। সে (মদীনায় প্রবেশ করেই) হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশের বেশ কিছু সংখ্যক পুরুষ ও মহিলাকে জড়ো করে আবুল হাসান উমাভীর গৃহে বন্দী করবে। সে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একজন বংশধরের সন্ধানে কতিপয় অশ্বারোহী সৈন্যকে পবিত্র মক্কায় প্রেরণ করবে যে ব্যক্তির চারপাশে গাতফান গোত্রীয় এক ব্যক্তির নেতৃত্বে বেশ কিছু সংখ্যক নির্যাতিত লোক সমবেত হবে। ঐ সেনাদল মরুভূমিতে বিস্তৃত ও শ্বেত-শুভ্র পাথর খণ্ডসমূহের মাঝে (ঐ ব্যক্তিকে খুঁজতে খুঁজতে) চলে আসবে এবং ভূ-গর্ভে প্রোথিত হবে। এক ব্যক্তি ব্যতীত তাদের মধ্য থেকে আর কেউ বাঁচবে না। মহান আল্লাহ্ ঐ ব্যক্তির মুখমণ্ডলকে পিছনের দিকে ঘুরিয়ে দেবেন যাতে করে তিনি তাদেরকে ভয় দেখাতে পারেন এবং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্তে পরিণত হয়। ঐ দিন “আর যদি আপনি ঐ মুহূর্তে দেখতেন যে, তারা ভয় পেয়েছে এবং নিকটবর্তী একটি অবস্থান থেকে ধৃত হয়েছে…- এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রকাশ পাবে। সুফিয়ানী কুফায় এক লক্ষ ত্রিশ হাজার সৈন্য প্রেরণ করবে। তারা রাওহা, ফারুক এবং কাদিসিয়ায় হযরত মরিয়ম (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.)-এর স্থানে অবতরণ করবে এবং তাদের মধ্য থেকে আশি হাজার সৈন্য কুফার পথে রওয়ানা হবে এবং নুখাইলাস্থ হযরত হুদ (আ.)-এর সমাধিস্থলে পৌঁছবে। তারা ঈদ ও আলোকসজ্জার দিবসে তার ওপর আক্রমণ চালাবে। আর জনগণের নেতা হবে একজন অত্যাচারী প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তি যাকে যাদুকর ও জ্যোতিষী বলা হবে। সে যাওরাহ্ অর্থাৎ বাগদাদ থেকে পাঁচ হাজার জ্যোতিষী সহ বের হবে এবং ঐ শহরের সেতুর ওপর সত্তর হাজার লোককে হত্যা করবে যে, এর ফলে জনগণ ঐ সব রক্ত ও নিহতের পচা গলিত লাশের দুর্গন্ধে ফোরাত নদীর ধারে যাওয়া থেকে বিরত থাকবে। যে সব কুমারী মেয়ের হাত ও মুখ অনাবৃত দেখা যেত না তাদেরকে বন্দী করে হাওদার ওপর বসিয়ে নাজাফের একটি (অজ্ঞাত) স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে।
তখন কুফা থেকে এক লক্ষ মুশরিক ও মুনাফিক বের হবে এবং বিনা বাঁধায় তারা দামেশকে প্রবেশ করবে। আর তা হবে উঁচু ইমারত ও ভবনবিশিষ্ট পার্থিব স্বর্গস্বরূপ।
প্রাচ্য (ইরান) থেকে বেশ কিছু সংখ্যক পতাকা যেগুলো তূলা ও রেশম দ্বারা নির্মিত হবে না সেগুলো এমতাবস্থায় প্রকাশ পাবে। এগুলোর দণ্ডসমূহের ওপর বেশ কিছু চিহ্ন উৎকীর্ণ থাকবে। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এক বংশধর সেগুলো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। যেদিন তিনি প্রাচ্যে প্রকাশিত হবেন সেদিন তাঁর সুঘ্রাণ মেশকে আম্বরের মতো পশ্চিমে অনুভূত হবে। তাদের আবির্ভাবের এক মাস আগেই শত্রুদের অন্তরে ভয়-ভীতি ঢুকে পড়বে।
বনি সা’দ কুফায় তাদের নিজ নিজ পিতার মৃত্যুর বদলা নেয়ার জন্য রুখে দাঁড়াবে এবং তারা সবাই হবে ফাসেকদের (ভ্রষ্টদের) সন্তান। ঐ সময় পর্যন্ত তাদের ফিতনা চলতে থাকবে যখন পর্যন্ত না হুসাইনের অশ্বারোহীরা এলোমেলো ও ধূলিধূসরিত কেশর ও শ্বেত-শুভ্র কপালবিশিষ্ট অশ্বসমূহের ন্যায় অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। তখন হঠাৎ তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি অশ্রু বিসর্জনরত অবস্থায় যমীনের ওপর পদাঘাত করে বলতে থাকবে : ‘আজকের পর থেকে বসে থাকার মধ্যে কোন কল্যাণ ও বরকত নেই। হে আমাদের প্রভু! আমরা অনুশোচনা করছি এবং ভগ্ন হৃদয়ে আপনার সামনে আমাদের মাথা অবনত করছি এবং আমাদের কপাল মাটির ওপর রাখছি’। তাঁরা হবেন ঐ সব মহান পুণ্যাত্মা যাঁদের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে : “মহান আল্লাহ্ অনুশোচনাকারী এবং পবিত্র ব্যক্তিদেরকে ভালোবাসেন।” তাঁদের মধ্যে এমন কতিপয় ব্যক্তিও থাকবেন যাঁরা হবেন মহানবী (সা.)-এর চরিত্রবান, নিষ্কলঙ্ক ও পুতঃপবিত্র স্বভাবের অধিকারী বংশধর।
নাজরান থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে ইমামের আহবানে সাড়া দেবে। সেই হবে প্রথম খ্রিস্টান যে ইতিবাচক সাড়া দেবে। সে তার উপাসনালয় ধ্বংস করবে এবং নিজের ক্রুশটি ভেঙে ফেলবে। সে দাস ও দুর্বল ব্যক্তি এবং অশ্বারোহীদের নিয়ে বের হবে এবং হিদায়েতের পতাকাসমূহের সাথে নুখাইলার দিকে অগ্রসর হবে।
ফারুক হবে পৃথিবীর সকল মানুষের সমবেত হওয়ার স্থান। আর এটিই হচ্ছে আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর হজ্বযাত্রার পথ। এরপর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে তিন মিলিয়ন ইহুদী ও খ্রিস্টান নিহত হবে। তারা পরস্পরকে হত্যা করবে। নিম্নোক্ত আয়াতটির অর্থের বাস্তব নমুনা ও ব্যাখ্যা সেদিন প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হবে। আয়াতটি হচ্ছে : যে পর্যন্ত আমরা তাদেরকে তরবারির মাধ্যমে এবং তরবারির ছত্রছায়ায় কর্তিত শস্য ও খড়-কুটার ন্যায় ছিন্নভিন্ন ও নিশ্চুপ করিয়ে দিয়েছি সে পর্যন্ত এটিই ছিল তাদের সার্বক্ষণিক দাবি।”
এ রেওয়ায়েতের প্রথম ও শেষাংশ একটি বিশ্বযুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যার ধ্বংসাত্মক প্রভাব সমগ্র পাশ্চাত্য বিশ্বের ওপর পড়বে। আর এ যুদ্ধে তিন মিলিয়ন লোক নিহত হবে এবং আমরা যথাস্থানে এতৎসংক্রান্ত আলোচনার অবতারণা করব।
কুফার অলি-গলির কোণায় কোণায় ফাটল সৃষ্টি করার’ অর্থ সম্ভবত সুফিয়ানীর আক্রমণের মোকাবিলায় সড়ক যুদ্ধের বাংকার ও আশ্রয়স্থল নির্মাণও হতে পারে। আর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের একটু আগে ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হবে সে দিকে লক্ষ্য রেখে পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারাম এবং হিজাযের চারপাশে সমবেত তিন পতাকাবাহী দল ও গোষ্ঠী সংক্রান্ত বিবরণ শীঘ্রই পেশ করা হবে।
সম্ভবত সত্তর জন এবং আরেকটি রেওয়ায়েতে সত্তর জন সৎ ও পুণ্যবান ব্যক্তি সমেত নাজাফে এক পবিত্র আত্মার অধিকারী ব্যক্তির নিহত হওয়ার বিষয়টি মহান শহীদ আয়াতুল্লাহ্ আল উযমা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকির আস সাদর-এর শাহাদাতের ঘটনার সাথে মিলে যায়। কারণ তিনি সত্তর জন সৎ ও পুণ্যবান ব্যক্তির সাথে শাহাদাত বরণ করেছেন। আর কুফার পেছনের অংশ হচ্ছে বর্তমান কালের পবিত্র নাজাফ নগরী।
ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের একটু আগে যে পবিত্র পুণ্যাত্মা ব্যক্তি পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদুল হারামের রুকন ও মাকাম-ই ইবরাহীমের মাঝখানে শাহাদাত বরণ করবেন তিনি মক্কাবাসীদের কাছে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রেরিত দূত হবেন।
এ রেওয়ায়েতে কতিপয় নাম এবং শব্দ বর্ণিত হয়েছে যেগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট নয়, যেমন আসবাগ মুযাফ্ফার যে শয়তানী চরিত্র ও স্বভাবের অধিকারী বহু ব্যক্তির সাথে প্রতিমালয়ে নিহত হবে এবং সা’দের পুত্ররা প্রমুখ।
কতিপয় রেওয়ায়েতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, হযরত মরিয়ম (আ.) এবং হযরত ঈসা (আ.) যখন ইরাক ভ্রমণ করেছিলেন তখন তাঁরা কাদেসিয়ায় যাত্রাবিরতি করেছিলেন এবং বাগদাদের কাছে বারাসা মসজিদে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। আর এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ্ই উত্তমরূপে জ্ঞাত আছেন।
তবে নুখাইলায় হযরত হুদ (আ.)-এর সমাধিস্থলটি বেশ প্রসিদ্ধ যা পবিত্র নাজাফ নগরীর অদূরে ওয়াদিউস্ সালামে অবস্থিত। জনগণের নেতা হবে এক যাদুকর ও জ্যোতিষী। সম্ভবত সে রেওয়ায়েতে বর্ণিত শাইসাবানীই হবে এবং সুফিয়ানীর আবির্ভাবের আগে ইরাকে বিদ্রোহ করবে। ‘প্রাচ্য দেশের পতাকাসমূহ’ বলতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী খোরাসানী পতাকাবাহীদেরকেই বোঝানো হয়েছে এবং পতাকাসমূহে উৎকীর্ণ মোহর ও চিহ্নের অর্থ الله বা আল্লাহ্ খচিত মনোগ্রামও হতে পারে যা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতীক- যা ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) কর্তৃক মনোনীত। দ্বিতীয় রেওয়ায়েতে উল্লিখিত ফারুক অবশ্য কোন রাবী কর্তৃক একটি ব্যাখ্যা ও পাদটীকাই হবে যা রেওয়ায়েতের মূল ভাষ্যে ঢুকে গেছে এবং তা আমীরুল মুমিনীন (আ.) কর্তৃক উচ্চারিত শব্দ হওয়া অসম্ভব। তবে ফারুক শব্দটি সম্ভবত এতদর্থে উক্ত স্থানে জনগণের সমবেত হওয়ার স্থল হতে পারে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সৈন্যরা সেখানে একত্রিত হবে এবং তখনই মুসলমান ও বিধর্মীদের মধ্যে বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাবে যা রেওয়ায়েতে উল্লিখিত হয়েছে।
অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর এ সব রেওয়ায়েত ও এতদসদৃশ অন্যান্য রেওয়ায়েতের সনদ এবং মূল ভাষ্য ও শব্দসমূহ নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব ও আন্দোলনের নিদর্শনসমূহ সংক্রান্ত অনেক ভাষণ ও রেওয়ায়েত বাহ্যত কিছু সংখ্যক রাবী (বর্ণনাকারী) ও আলেমের ভাষণ ও প্রবন্ধাবলীর অন্তর্গত যা তাঁরা আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) এবং ইমামদের থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েত হতে গ্রহণ ও সংকলন করেছেন এবং তা ইমামদের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। অতএব, এগুলোর তাত্ত্বিক ও জ্ঞানগত মূল্য এতটা যে, তা হচ্ছে ঐ সব রাবী ও আলেমের বক্তব্য, হাদীসসমূহের ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে যাঁদের জ্ঞান ও পরিচিতি অনেক বেশি এবং তাঁরা আমাদের চেয়ে ইমামদের নিকট থেকে হাদীসসমূহ যে যুগে বর্ণিত হয়েছে সে যুগের অধিক নিকটবর্তী।… আর এখানে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনারও অবকাশ নেই।
হিজাযের দিকে সুফিয়ানী বাহিনীর অগ্রসরমান যে দলটি ভূ-গর্ভে প্রোথিত হবে
ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর পবিত্র আবির্ভাব ও আন্দোলনের ব্যাপারে (মহান আল্লাহর ইচ্ছায়) শীঘ্রই আমরা আলোচনা করব এবং আমরা হিজাযের রাজনৈতিক টানাপড়েন পর্যালোচনা করব যে রেওয়ায়েতসমূহের ভাষ্য অনুযায়ী হিজাযের শাসক আবদুল্লাহ্ নিহত হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁর পরবর্তী শাসনকর্তা কে হবে এ ব্যাপারে মতপার্থক্য সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে হিজাযের গোত্রসমূহের মধ্যকার অন্তঃদ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের উদ্ভব হবে।… আর এ সংঘর্ষ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতসমূহ হিজায সরকারকে এতটা দুর্বল করবে যে, এর ফলে ইমাম মাহ্দী (আ.) পবিত্র মক্কায় সহজে তার আন্দোলন শুরু করবেন এবং পবিত্র মক্কা নগরীকে অত্যাচারীদের হাত থেকে মুক্ত করে সেখানে তাঁর শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ় করবেন।
এ যুগসন্ধিক্ষণে হিজায-সরকার নিজেদেরকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলনকে পরাস্ত ও ধ্বংস করার ব্যাপারে অক্ষম ও দুর্বল দেখতে পাবে; তাই এ সরকার ও অন্যান্য বড় বড় রাষ্ট্র সুফিয়ানীকে গুরুত্বপূর্ণ এ কাজে হাত দেয়ার জন্য প্ররোচিত করবে। সুফিয়ানী প্রথমে তার সেনাবাহিনীকে মদীনা মুনাওওয়ারায় এবং এরপর পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রেরণ করবে। এ সময় ইমাম মাহ্দী (আ.) সমগ্র মুসলমান ও বিশ্ববাসীর কাছে ঘোষণা করবেন যে, তিনি এমন এক মুজিযা সংঘটিত হওয়ার অপেক্ষায় আছেন যার প্রতিশ্রুতি মহানবী (সা.) দিয়েছিলেন। আর ঐ মুজিযাটি হবে মক্কার অদূরে একটি মরুপ্রান্তরে সুফিয়ানী বাহিনীর ভূ-গর্ভে প্রোথিত হওয়া। এ মুজিযা সংঘটিত হবার পর হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.) তাঁর আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন।
বরং এ বিষয়টি যা কতিপয় রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে তাকে অগ্রাধিকার দেয়া সম্ভব। আর তা হলো ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই মদীনায় সুফিয়ানী বাহিনীকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। সুফিয়ানী বাহিনী ইমাম মাহ্দী (আ.) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের খোঁজে মদীনায় প্রবেশ করবে এবং সেখানে বেশ কিছু জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করবে। এ সময় ইমাম মাহ্দী (আ.) মদীনায় বসবাস করতে থাকবেন এবং সুফিয়ানী কর্তৃক পরিচালিত অনুসন্ধানী অভিযানের সময় তিনি হযরত মূসা (আ.)-এর মতো অস্থিরতা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সহকারে মদীনা থেকে বের হয়ে পবিত্র মক্কার দিকে চলে যাবেন। এর পরপরই মহান আল্লাহ্ তাঁকে আবির্ভূত হবার অনুমতি দেবেন।
শিয়া ও সুন্নী হাদীসসমূহে পবিত্র মদীনা নগরীতে ইরাক ও শামদেশের দিক থেকে সুফিয়ানী বাহিনীর প্রবেশ অত্যন্ত কঠিন ও ধ্বংসকারী অভিযান বলে গণ্য করা হয়েছে যে, তা কোন প্রতিরোধেরই সম্মুখীন হবে না। সে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সঙ্গী-সাথী এবং আহলে বাইতের অনুসারীদের সাথে নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতাকে হত্যা ও ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ঐ একই আচরণ করবে যেরূপ সে ইরাকে করেছিল; বরং রেওয়ায়েতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মদীনায় সুফিয়ানীর আক্রমণ হবে অপেক্ষাকৃত কঠোর।
ইবনে শিহাব থেকে ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত হয়েছে : “অশ্বারোহীদের সাথে যে সেনাপতি কুফায় প্রবেশ করবে ঐ শহর ধ্বংস করার পর সুফিয়ানী তাকে সম্বোধন করে লিখবে এবং তাকে হিজায অভিমুখে রওয়ানা হবার নির্দেশ দেবে। আদিষ্ট হবার পর সে ঐ দেশ অর্থাৎ হিজায অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যাবে এবং কুরাইশদেরকে হত্যা করবে। সে তাদের এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সঙ্গী-সাথীদের মধ্য থেকে চারশ’ ব্যক্তিকে হত্যা করবে। সে গর্ভবতী নারীদের পেট চিড়ে গর্ভস্থ সন্তানদেরকে বের করে এনে হত্যা করবে। সে কুরাইশ বংশীয় দু’ভাইকে হত্যা করবে এবং মুহাম্মদ নামের এক ব্যক্তিকে ফাতিমা নামের তার বোনসহ মদীনার মসজিদের নববীর প্রবেশ পথের ওপর ফাঁসীতে ঝুলাবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৮৮)
আরো কতিপয় রেওয়ায়েতে উল্লিখিত হয়েছে : “ঐ ব্যক্তি ও তার বোন নাফসে যাকীয়ার (পবিত্র আত্মার অধিকারী) পিতৃব্যপুত্র ও কন্যাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। উল্লেখ্য যে, এই নাফসে যাকীয়াকেই ইমাম মাহ্দী (আ.) পবিত্র মক্কায় প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করবেন। তাঁকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের পনর দিন পূর্বে মসজিদুল হারামে হত্যা করা হবে। আর উক্ত ভাই-বোন (যাঁরা নাফসে যাকীয়ার চাচাতো ভাই-বোন এবং যাঁদেরকে মসজিদে নববীর প্রবেশ পথে ফাঁসীতে ঝুলানো হবে) ইরাকে সুফিয়ানী বাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে মদীনায় চলে আসবেন এবং ইরাক থেকে যে গুপ্তচর তাঁদের পিছে পিছে আসবে সে-ই শত্রুদের কাছে তাঁদের পরিচিতি তুলে ধরবে।
নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, সুফিয়ানী মদীনায় বনি হাশিম এবং তাদের অনুসারীদেরকে গণহত্যা করার বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করবে যে, ইরাকে খোরাসানীদের হাতে তার সৈন্যদের নিহত হওয়ার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সে এ ধরনের কাজে হাত দিয়েছে।
ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে আবু কুবাইল থেকে বর্ণিত হয়েছে : “সুফিয়ানী তার সেনাবাহিনীকে মদীনায় প্রেরণ করবে এবং তাদেরকে নির্দেশ দেবে যে, তারা বনি হাশিমের যে কেউ সেখানে থাকবে তাকে, এমনকি গর্ভবতী মহিলাদেরকেও যেন হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ড একজন হাশিমীর তৎপরতার জবাবে সংঘটিত হবে যিনি প্রাচ্য (ইরান) থেকে নিজ সঙ্গী-সাথীদেরকে নিয়ে অভ্যুত্থান করবেন। সুফিয়ানী বলবে : এ সব বিপদাপদ ও আমার সঙ্গী-সাথীদের নিহত হওয়ার জন্য বনি হাশিম-ই দায়ী। অতঃপর সে তাদেরকে এমনভাবে হত্যা করার আদেশ দেবে যে, এর ফলে তাদের কাউকেই আর মদীনায় খুঁজে পাওয়া যাবে না, এমনকি তাদের নারীরাও মরুভূমি ও পাহাড়-পর্বতে আশ্রয় নেবে এবং পবিত্র মক্কার দিকে পালিয়ে যাবে। অতঃপর তারা হত্যাকাণ্ড বন্ধ করবে। পবিত্র মক্কায় হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আন্দোলন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তাদের মধ্য থেকে যে কাউকে পাওয়া যাবে সে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে। আর যারাই সেখানে (মক্কায়) আসবে তারাই তার চারপাশে জড়ো হবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৮৯)
ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত : “সুফিয়ানী ও তার সঙ্গী-সাথীরা আবির্ভূত হবে এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আহলে বাইত এবং তাঁর অনুসারীদের ওপর বিজয়ী হওয়া ব্যতীত তার আর কোন চিন্তা থাকবে না। এ কারণেই সে একদল সৈন্যকে কুফায় প্রেরণ করবে এবং তারা সেখানে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একদল অনুসারীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে যে, হয় তাদেরকে হত্যা করবে অথবা ফাঁসীতে ঝুলাবে। আর তখন খোরাসান থেকে একটি সেনাবাহিনী বের হবে এবং দজলা অববাহিকায় প্রবেশ করা পর্যন্ত তারা অব্যাহতভাবে অগ্রসর হতে থাকবে। স্বীয় সঙ্গী-সাথী সমেত এক দুর্বল অনারব ব্যক্তি বের হয়ে নাজাফে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। সুফিয়ানী আরেকটি সেনাদলকে মদীনা অভিমুখে প্রেরণ করবে। আর তারা সেখানে এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে এবং মাহ্দী (আ.) ও মানসূর সেখান থেকে পালিয়ে যাবেন; সুফিয়ানী বাহিনী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধরদের ছোট-বড় সবাইকে বন্দী করবে। তাদের মধ্য থেকে এমন কোন ব্যক্তি বিদ্যমান থাকবে না যাকে বন্দী করা হবে না। সুফিয়ানী বাহিনী ইমাম মাহ্দী ও তাঁর সঙ্গীর সন্ধানে তল্লাশী চালাতে থাকবে। আর ইমাম মাহ্দী (আ.) হযরত মূসা (আ.)-এর মতো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সাথে মদীনার বাইরে চলে আসবেন এবং মক্কায় এসে আশ্রয় নেবেন। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২২২)
বিহারুল আনওয়ার গ্রন্থের ২৫২ পৃষ্ঠায় সুফিয়ানীর ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, সুফিয়ানী এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মদীনায় প্রবেশ করবে এবং হাকিম সংকলিত আল মুস্তাদরাক গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডের ৪৪২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে যে, সুফিয়ানীর আক্রমণের আগেই মদীনার অধিবাসীরা শহর থেকে বের হয়ে যাবে।
সম্ভবত রেওয়ায়েতে বর্ণিত মানসূর যিনি হযরত মাহ্দী (আ.)-এর সাথে মদীনা থেকে বের হবেন তিনি হবেন ‘নাফসে যাকীয়াহ্’। হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.) তাঁকে মসজিদুল হারামে পাঠাবেন যাতে তিনি তাঁর বাণী বিশ্ববাসীর কানে পৌঁছে দেন; তবে তাঁকে হত্যা করা হবে। তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর একজন সঙ্গী নাফসে যাকীয়াহ্ ছাড়াও ভিন্ন এক ব্যক্তি হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
এগুলো হচ্ছে মদীনায় সুফিয়ানীর যুদ্ধ এবং সেখানে তার ধ্বংসযজ্ঞ সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহের কতিপয় নমুনা। মদীনা ব্যতীত হিজাযের অন্যান্য স্থানে সুফিয়ানী বাহিনীর প্রবেশ এবং এরপর মক্কায় প্রবেশের জন্য তাদের চেষ্টা সংক্রান্ত কোন কথা রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত হয়নি।… আর এগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পবিত্র মক্কা নগরীতে তার সকল সৈন্য অথবা সেনাবাহিনীর অংশবিশেষ প্রেরণ করা পর্যন্ত মদীনা নগরী জবরদখল করার সময়কাল বেশি স্থায়ী হবে না। আর তখনই প্রতিশ্রুত মোজেযা দেখা দেবে এবং মক্কা নগরীর অদূরে তাদের সবাই ভূমিতে প্রোথিত হবে। কতিপয় রেওয়ায়েতে মদীনায় সুফিয়ানী বাহিনী ও সৈন্যদের বিদ্যমান থাকাটা কেবল গুটিকতক দিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাহ্যত এর অর্থ হচ্ছে মদীনায় সুফিয়ানী বাহিনীর প্রবেশ এবং সেখানে তার অপকর্মসমূহের সময়কাল- মদীনা বা এর অদূরে সুফিয়ানী বাহিনীর অবস্থানকাল নয়।
সুফিয়ানীর সেনাবাহিনীর ভূ-গর্ভে প্রোথিত হওয়ার ব্যাপারে রেওয়ায়েতসমূহ মুসলমানদের সূত্রসমূহে অনেক ও মুতাওয়াতির এবং আহলে সুন্নাতের সূত্রসমূহে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েত সম্ভবত উম্মে সালামাহ্ থেকে বর্ণিত হয়েছে।
তিনি বলেছেন : “মহান আল্লাহর নবী (সা.) বলেছেন : মহান আল্লাহর ঘরে একজন আশ্রয়গ্রহণকারী আশ্রয় গ্রহণ করবে। তখন একটি সেনাদল তার কাছে প্রেরণ করা হবে; যখন ঐ সেনাদল মদীনার মরুপ্রান্তরে পৌঁছবে তখন সেখানে তারা ভূ-গর্ভে প্রোথিত হবে। (আল হাকিম প্রণীত মুস্তাদরাক, ৪র্থ খণ্ড এবং বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ১৮৬)
আল কাশশাফ তাফসীর প্রণেতা জামাখশারী ‘আর যদি আপনি ঐ মুহূর্তে দেখতেন যে, তারা ভীত হয়ে গেছে এবং নিকটবর্তী একটি স্থান হতে তাদেরকে পাকড়াও করা হয়েছে’-এ আয়াতের তাফসীরে বলেছেন যে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, উপরিউক্ত আয়াতটি বাইদা নামক মরুভূমির মাটিতে প্রোথিত হওয়ার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
আল্লামা তাবারসী তাঁর মাজমাউল বায়ান গ্রন্থে বলেন : “আবু হামযাহ্ সুমালী বলেছেন : আলী ইবনুল হুসাইন এবং হুসাইন ইবনে আলী (আ.) থেকে শুনেছি যে, ঐ দু’জন মহাত্মা ইমাম বলতেন : উপরিউক্ত আয়াতটির কাঙ্ক্ষিত অর্থ মরুভূমির সেনাবাহিনী যারা পায়ের নিচ থেকে মহান আল্লাহর শাস্তি কবলিত হবে অর্থাৎ যমীন তাদেরকে গ্রাস করবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ১৮৬)
আল হুযাইফা ইয়েমেনী থেকে বর্ণিত হয়েছে : “মহানবী (সা.) প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাঝে যে ফিতনার উদ্ভব হবে তা স্মরণ করে বললেন : তারা যখন এ ধরনের ফিতনা কবলিত হবে তখন সুফিয়ানী ওয়াদি-ই ইয়াবিস থেকে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এবং সে দামেশকে প্রবেশ করবে। তখন সে দু’সেনাদলের একটি পূর্ব (ইরান) দিকে এবং অন্যটিকে মদীনার দিকে প্রেরণ করবে। প্রথম সেনাদলটি বাবেল ভূ-খণ্ড এবং অভিশপ্ত নগরীতে (বাগদাদে) অবতরণ করবে এবং তিন হাজারেরও অধিক লোক হত্যা করবে এবং একশ’র বেশি মহিলাকে জোর করে অপহরণ করবে। অতঃপর সে সেখান থেকে বের হয়ে সিরিয়ায় প্রত্যাবর্তন করবে। আর ঠিক এ সময়ই হেদায়েতের সেনাদল বের হবে এবং সুফিয়ানী কর্তৃক প্রেরিত সেনাদলের কাছে পৌঁছবে এবং তাদেরকে এমনভাবে হত্যা করবে যে, তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিও জীবিত থাকবে না যে সবার মৃত্যুসংবাদ পৌঁছাতে পারে। তাদের হাতে যারা বন্দী ছিল তাদেরকে মুক্ত করা হবে এবং যে সব ধন-সম্পদ তারা গনীমত হিসাবে নিয়েছিল সেগুলো নিয়ে নেয়া হবে।
তবে দ্বিতীয় দলটি মদীনায় প্রবেশ করে সেখানে তিন দিন ও তিন রাত লুটতরাজে লিপ্ত হবে। এরপর তারা সেখান থেকে বের হয়ে এসে পবিত্র মক্কার দিকে রওয়ানা হবে। যখন তারা মরু-প্রান্তরে পৌঁছবে তখন মহান আল্লাহ্ জিব্রাইল (আ.)-কে আদেশ দিয়ে বলবেন : জিব্রাইল যাও এবং এদেরকে ধ্বংস করে দাও। অতঃপর জিব্রাইল (আ.) তাঁর পা দিয়ে ঐ ভূ-খণ্ডের ওপর আঘাত করবেন এবং ভূ-পৃষ্ঠ তাদেরকে গ্রাস করবে। জুহাইনা গোত্রের দু’ব্যক্তি ব্যতীত তাদের মধ্য থেকে আর কেউ মুক্তি পাবে না। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ১৮৬)
“কোঁকড়ানো চুল ও গালে তিল বিশিষ্ট মাহ্দী (আ.) অগ্রসর হবেন। পূর্বদিক থেকে তাঁর আন্দোলন শুরু হবে। আর যখন এ বিষয়টি বাস্তবায়িত হবে তখন সুফিয়ানীর অভ্যুত্থান হবে এবং সে দিগ্বিজয়ে বের হবে এবং নারীর গর্ভধারণ কাল পরিমাণ সময় অর্থাৎ নয় মাস সে রাজত্ব করবে। সে শামে বিদ্রোহ করবে। সেখানকার সত্যপন্থী গোত্রসমূহ ব্যতীত শামবাসীরা তাদের আনুগত্য করবে। মহান আল্লাহ্ যে সব সত্যপন্থী গোত্র সুফিয়ানীর আনুগত্য করবে না তাদেরকে সুফিয়ানীর সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখবেন। সে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মদীনা নগরীতে প্রবেশ করবে। অবশেষে যখন তার বাহিনী মদীনার মরুপ্রান্তরে গিয়ে পৌঁছবে তখন মহান আল্লাহ্ তাকে (তার সেনাবাহিনীকে) ভূ-গর্ভে প্রোথিত করবেন। আর এটিই হচ্ছে মহান আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীর অর্থ : “আর আপনি যদি ঐ মুহূর্তে দেখতেন যে, তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং নিকটবর্তী একটি স্থান হতে তারা ধৃত হয়েছে (অর্থাৎ তারা ভূ-গর্ভে প্রোথিত হওয়ার মতো আযাবে পতিত হয়েছে)। (গাইবাতে নু’মানী, পৃ. ১৬৩ এবং বাহরানী প্রণীত মাহাজ্জাহ্, পৃ. ১৭৭)
হযরত আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর বাণী, ‘অগ্রসরমান অর্থাৎ যখন হাঁটবে’-এর অর্থ যেন তিনি সমগ্র দেহ ও অস্তিত্ব নিয়ে অগ্রসর হবেন। আর পূর্ব দিক থেকে তার আন্দোলনের সূত্রপাত হবে’- এ কথার অর্থ এই যে, তাঁর বিপ্লব তাঁর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ইরানীদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও সরকার দ্বারা শুরু হবে। ‘আর যখন এ বিষয়টি বাস্তবায়িত হবে’- এ বাক্যটির অর্থ যখন তাঁর আন্দোলন শুরু অথবা প্রকাশিত হবে এবং তাদের (ইরানীদের) সরকার ও রাষ্ট্র কায়েম হবে তখনই সুফিয়ানীর অভ্যুত্থান হবে এবং সে সামরিক অভিযানে বের হবে। এ রেওয়ায়েতে সুফিয়ানীর অভ্যুত্থান ও তৎকর্তৃক পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময়কাল নির্দিষ্ট করা হয়নি যে, তা কি হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারীদের রাষ্ট্র ও প্রশাসন কায়েম হবার পরপরই হবে অথবা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু বছর পরে হবে… তবে রেওয়ায়েতটির বর্ণনারীতি ও প্রকাশভঙ্গি ইরানীদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও প্রশাসন এবং সুফিয়ানীর অভ্যুত্থান ও সামরিক অভিযানের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্কের অস্তিত্বকে নির্দেশ করে। আর তার সামরিক তৎপরতা ও অভিযান আসলে ইরানীদের বিরুদ্ধে তার একটি পদক্ষেপ বলেই গণ্য হয় যা আমরা এ অধ্যায়ের প্রথমদিকে তার আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহে আলোচনা করেছি।
হান্নান ইবনে সুদাইর থেকে বর্ণিত : “আবু আবদিল্লাহ্ (ইমাম সাদিক)-কে মরুভূমিতে ভূমিগ্রাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন : এটি আমাসেহরার ডাকবাহকের রাস্তার ওপর যা ‘যাতুল জাইশ’ হতে বারো মাইল দূরে অবস্থিত।”
‘যাতুল জাইশ’ হচ্ছে পবিত্র মক্কা ও মদীনার মাঝখানে অবস্থিত একটি এলাকা। আর আমাসেহরা ঐ এলাকায় অবস্থিত।
ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “শীঘ্রই একজন আশ্রয়গ্রহণকারী পবিত্র মক্কায় আসবে। তখন কাইস গোত্রীয় এক ব্যক্তির নেতৃত্বে সত্তর হাজার সৈন্য সেখানে প্রেরিত হবে। যখনই তারা সানীয়াহ্ এলাকায় পৌঁছবে তখন তাদের সর্বশেষ ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রথম প্রবেশকারী ব্যক্তি সেখান থেকে বের হবে না। তখন হযরত জিবরাইল (আ.) উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দেবেন যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে পৌঁছে যাবে : হে মরুভূমি! হে মরুভূমি! এদেরকে গ্রাস কর। এদের মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। একমাত্র ঐ রাখাল যে পার্বত্য ভূমি থেকে তাদেরকে ধ্বংস হয়ে যাবার সময় প্রত্যক্ষ করবে কেবল সে ব্যতীত আর কেউই তাদের ধ্বংস সম্পর্কে অবগত হবে না এবং তাদের পরিণতি সম্পর্কে সে-ই খবর দেবে। অতঃপর যখন পবিত্র কাবায় আশ্রয়গ্রহণকারী তাদের ধ্বংস প্রাপ্তির ঘটনা শুনবেন তখন তিনি বাইরে বের হবেন। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯০)
এই একই গ্রন্থে আবু কুবাইল থেকে বর্ণিত : “একজন সুসংবাদ প্রদানকারী ও একজন ভয়প্রদর্শনকারী ব্যতীত তাদের মধ্যে আর কেউ জীবিত থাকবে না; তবে সুসংবাদ প্রদানকারী ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের কাছে আসবে এবং যা যা ঘটেছে সে ব্যাপারে খবর দেবে। ঘটনার সাক্ষী যে হবে সে যে সত্য কথা বলছে তা তার মুখাবয়বের মধ্যে প্রকাশিত হবে। অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ তার মুখমণ্ডলকে তার মাথার পিছনের দিকে ঘুরিয়ে দেবেন এবং এভাবে তার মুখমণ্ডলকে মাথার পিছনের দিকে ঘুরানো দেখতে পেয়ে সবাই তার কথা বিশ্বাস করবে এবং জানতে পারবে যে, সুফিয়ানীর প্রেরিত সেনাদলটি ভূমিগ্রাসের মাধ্যমে ধ্বংস হয়েছে। আর বেঁচে যাওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তির মুখমণ্ডলও প্রথম ব্যক্তির মতো মহান আল্লাহ্ পিছনের দিকে ঘুরিয়ে দেবেন। সে সুফিয়ানীর কাছে এসে তার সঙ্গী-সাথীদের ভাগ্যে যা ঘটেছে তা বর্ণনা করবে। সুফিয়ানীও ঐ ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে তার কথা বিশ্বাস করবে। আর এ দু’ব্যক্তি কালব গোত্রীয় হবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯১)
এই একই গ্রন্থে হাফ্সা থেকে বর্ণিত হয়েছে : “আমি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, মাগরিব (পশ্চিম দিক) থেকে একটি সেনাবাহিনী প্রেরিত হবে এবং তারা কাবা গৃহকে ধ্বংস করতে চাইবে। কিন্তু যখনই তারা মরুপ্রান্তরে পৌঁছবে এবং ভূমি তাদেরকে গ্রাস করবে তখন যে সব ব্যক্তি তাদের সামনে থাকবে তারা ঐ সেনাদলের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা প্রত্যক্ষ করার জন্য ভূমিধ্বসের স্থলে ফিরে যাবে; আর তারাও ঠিক ঐ একই বিপদের সম্মুখীন হবে। তখনই মহান আল্লাহ্ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অন্তরের নিয়ত অনুসারে পরকালে পুনরুত্থিত করবেন। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯০)
তাই যে ব্যক্তি সুফিয়ানীর সেনাদলে যোগদান করতে বাধ্য হয়েছিল যদিও সে আখেরাতে সুফিয়ানী বাহিনীতে স্বেচ্ছায় যোগদানকারী ব্যক্তির মতো গণ্য হবে না তবুও সেও ভূমিধ্বসের মাধ্যমে ধ্বংস হবে।
মহানবী (সা.) বলেছেন : “ঐ কওমের ব্যাপারে আমি আশ্চর্যান্বিত হচ্ছি যে, তারা একত্রে এক জায়গায় মৃত্যুবরণ করবে অথবা নিহত হবে। তবে তাদের অবস্থা ও স্থান বিভিন্ন ধরনের হবে।” তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো : “হে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)! এটি কিভাবে সম্ভব? তখন তিনি বলেছিলেন : “এটি এ কারণে হবে যে, তাদের মধ্যে অনেক ব্যক্তি অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যোগদান করতে বাধ্য হবে অর্থাৎ যে সব ব্যক্তি একত্রে একই স্থানে মৃত্যুবরণ করবে তাদের নিয়্যত অনুসারে কিয়ামত দিবসে তাদের বিচার ও প্রতিদান দেয়া হবে। কারণ তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ত্রী-সন্তানদের জন্য ভীত হয়ে সুফিয়ানীর সেনাদলে যোগদান করবে। আবার কিছু সংখ্যক ব্যক্তিকে যোগদান করতে বাধ্য করা হবে। আবার আরো কিছু সংখ্যক ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ঐ সেনাদলে যোগদান করবে।
আরেকটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, সুফিয়ানী বাহিনীর যে সব সৈন্য ভূমিধ্বসের মাধ্যমে ভূ-গর্ভে প্রোথিত হবে ও প্রাণ হারাবে তাদের সংখ্যা বারো হাজার হবে। তাদের সংখ্যা সত্তর হাজার হবে না। আরেকটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, সুফিয়ানী বাহিনীর এক-তৃতীয়াংশ ভূমিধ্বসের মাধ্যমে নিহত হবে, এক-তৃতীয়াংশের মুখমণ্ডল পিঠের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হবে এবং অবশিষ্টাংশ অক্ষত থাকবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯০- ৯১)
মক্কা যাওয়ার পথে সুফিয়ানী বাহিনী ভূ-গর্ভে প্রোথিত হবার মুজিযা সংঘটিত হবার পর মাধ্যমে সুফিয়ানীর ভাগ্য-তারকা অস্তমিত হওয়া শুরু হবে। অপরদিকে ঐ সময় হযরত মাহ্দী (আ.)-এর ভাগ্য-তারকা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর এবং সৌভাগ্যের শীর্ষে উন্নীত হতে থাকবে।
সুফিয়ানী বাহিনীর ভূমিধ্বসে ধ্বংস হওয়ার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর হিজাযে তার আর কোন সামরিক তৎপরতার কথা রেওয়ায়েতসমূহে উল্লিখিত হয়নি। এ ঘটনা হিজাযে সুফিয়ানীর তৎপরতার অবসান ঘটাবে। তবে তখনও মদীনায় তার সেনাদল বিদ্যমান থাকার সম্ভাবনা থেকে যায়। যারা (অমুক বংশের) সরকারী সৈন্যদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকবে এবং রেওয়ায়েতসমূহ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, শত্রু সেনাদলের ভূমিধ্বসে ধ্বংস হয়ে যাবার মুজিযা সংঘটিত হবার পর হযরত মাহ্দী (আ.) মদীনা মুক্ত করার জন্য কয়েক হাজার যোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত সেনাবাহিনী নিয়ে মদীনার উদ্দেশে যাত্রা করবেন এবং সেখানে তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন।
যাহোক, ইমাম মাহ্দী (আ.) মদীনা বিজয় ও হিজায মুক্ত এবং তাঁর শত্রুদেরকে দমন করবেন। হিজায থেকে ইরাক ও শাম পর্যন্ত যেখানেই সুফিয়ানী বাহিনী তাঁর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে সেখানেই তারা পরাজিত হবে। রেওয়ায়েতসমূহে এক বা একাধিক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, ইরাকে সুফিয়ানী বাহিনী ও ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সৈন্য ও তাঁর খোরাসানী সঙ্গী-সাথীদের মাঝে ঐ সব যুদ্ধ সংঘটিত হবে।
ইরানী ও ইয়েমেনী ক্ষেত্র প্রস্তুতকারীদের হাতে সুফিয়ানী বাহিনীর পরাজিত হবার পর ইরাক ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের প্রতিষ্ঠিত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে আসাই হবে স্বাভাবিক। আর হিজাযে সুফিয়ানীর অলৌকিকভাবে উত্তরোত্তর পরাজয় বরণ ইরাকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সঙ্গী-সাথী ও সমর্থকদের শক্তি দৃঢ়ীকরণে সহায়তা করবে। রেওয়ায়েতসমূহ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী শক্তিসমূহ সুফিয়ানী বাহিনীর পরাজয় বরণ করার পর ইরাকে অবস্থান গ্রহণ করবে এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হাতে বাইআত করার জন্য হিজাযে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করবে। ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন :
“খোরাসান থেকে কালো পতাকাবাহীরা যারা কুফায় আগমন করবে তারা সেখানে অবতরণ এবং অবস্থান গ্রহণ করবে। আর মাহ্দী আবির্ভূত হবে তখন তারা একটি প্রতিনিধি দলকে বাইআত করার জন্য তার কাছে পাঠাবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২১৭)
কিন্তু ইরাকে সুফিয়ানী পূর্ণ পরাজয় বরণ করার কারণসমূহ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু রেওয়ায়েতে ইরাকে সুফিয়ানী বাহিনীর সঙ্গে স্বতন্ত্র যুদ্ধ ও সংঘর্ষের কথাও বর্ণিত হয়েছে। আর তাতে সুফিয়ানী কেবল ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সেনাবাহিনীর সাথেই সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। এ সময় ইমাম মাহ্দী (আ.) ইরানী সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক শুআইব ইবনে সালিহকে তাঁর নিজ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করবেন। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সেনাবাহিনীর এক বিরাট অংশ ইরানী, ইয়েমেনী এবং অন্যান্য ইসলামী দেশের অধিবাসী হবে।
কতিপয় রেওয়ায়েতে কেবল ইস্তাখরের ফটকের যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ যুদ্ধটি সুফিয়ানী বাহিনী ও ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে হবে যা ভয়াবহ হবে বলে বর্ণিত হয়েছে।
আর ইস্তাখর দক্ষিণ ইরানের একটি প্রাচীন নগরী এবং আহ্ওয়ায অঞ্চলে অবস্থিত যা ইসলামের প্রথম যুগে উন্নত বসতি ছিল। আর এ শহরের ধ্বংসাবশেষ তেলসমৃদ্ধ নগরী মসজিদে সুলাইমানের অদূরে আজও বিদ্যমান। বর্ণিত আছে যে, ইস্তাখর নগরী হযরত সুলাইমান (আ.) কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল এবং তিনি শীতকালে সেখান থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন অর্থাৎ এ নগরী ছিল তাঁর শীতকালীন রাজধানী। আর মসজিদে সুলাইমান ছিল একটি মসজিদ যা হযরত সুলাইমান (আ.) কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল।
আরো দু’টি রেওয়ায়েত আছে যেগুলোয় ইরানী সেনাবাহিনীর সমবেত হওয়ার স্থান ‘বাইযা-ই ইস্তাখর’ অঞ্চল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাইযা-ই ইস্তাখর হচ্ছে ইস্তাখর নগরীস্থ একটি শ্বেতাঞ্চল এবং সম্ভবত তা মসজিদে সুলাইমানের নিকটবর্তী উচ্চ চূড়াসমূহ যা ‘কূহে সেফীদ’ (শ্বেতপর্বত) বলে প্রসিদ্ধ। একইভাবে দু’টি অথবা তিনটি রেওয়ায়েত থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, যখন ইমাম মাহ্দী (আ.) পবিত্র মদীনা থেকে ইরাকের উদ্দেশে রওয়ানা হবেন তখন তিনি সর্বপ্রথম বাইযা-ই ইস্তাখর এলাকায় অবতরণ করবেন এবং সেখানে ইরানীরা তাঁর হাতে বাইআত করবে এবং তাঁর নেতৃত্বে সেখানে তারা সুফিয়ানী বাহিনীর বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং সুফিয়ানীকে পরাজিত করবে। এ যুদ্ধের পর ইমাম মাহ্দী (আ.) আলোর সাত হাওদা সহকারে ইরাকে প্রবেশ করবেন। জনগণ বুঝতে পারবে না যে, তিনি কোন্ হাওদার মধ্যে আছেন। আমরা এতৎসংক্রান্ত বিশদ বিবরণ হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব ও তাঁর আন্দোলনের অধ্যায়ে প্রদান করব।
ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন :
“যখন সুফিয়ানীর অশ্বারোহী সৈন্যরা কুফার দিকে যাবে তখন সে তার একদল সৈন্যকে খোরাসানীদের সন্ধানে প্রেরণ করবে। আর ঐ সময় খোরাসানবাসীরা ইমাম মাহ্দীর সন্ধানে বের হবে। তখন কালো পতাকাসমেত হাশেমী মাহ্দীর সাথে সাক্ষাৎ করবেন। আর তখন ইরানী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক শুআইব ইবনে সালিহ্ ইমাম বাহিনীর সম্মুখভাগে থাকবে। আর এভাবেই মাহ্দী ইস্তাখর নগরীর ফটকের কাছে সুফিয়ানীর সঙ্গী-সাথীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং তাদের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ সংঘটিত হবে। এ সময় কালো পতাকাসমূহ স্পষ্ট দেখা যাবে এবং সুফিয়ানীর অশ্বারোহীরা পলায়ন করা শুরু করবে। [এ সময় জনগণ ইমাম মাহ্দীর সাথে সাক্ষাৎ করার আকাঙ্ক্ষা করবে এবং তাঁকে সন্ধান করতে থাকবে।] (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৮৬)
‘হাশেমী তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে’- এ বাক্যটির অর্থ হলো হযরত মাহ্দী (আ.) ও হাশেমী খোরাসানী (ইরানী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক) একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করবেন। আর পরবর্তী রেওয়ায়েতে স্পষ্ট ভাষায় এ বিষয়টি বর্ণিতও হয়েছে। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সন্ধানে ইরানী দলগুলো তার হাতে বাইআত করে তাঁর পাশে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। এ কারণেই তিনি বসরার পাশ দিয়ে হিজাযের স্থল সীমান্তের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে দক্ষিণ ইরানের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। এ সময়ই ইরানী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হাশেমী খোরাসানী ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করবেন এভাবে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) হিজায মুক্ত করে দক্ষিণ ইরান অভিমুখে যাত্রা করবেন এবং তাদের (ইরানী সেনাবাহিনী) সাথে সাক্ষাৎ করবেন। তখন সুফিয়ানী বাহিনীর সাথে উল্লিখিত যুদ্ধ সংঘটিত হবে। আর রেওয়ায়েতেও উল্লিখিত হয়েছে যে, সুফিয়ানীর সৈন্যরা যখন দক্ষিণ ইরান ও ইরাকে প্রবেশ করবে তখন এ যুদ্ধ সংঘটিত হবে। আর সম্ভবত এবারে সুফিয়ানী বাহিনী পারস্য উপসাগর ও বসরা হয়ে পাশ্চাত্য বাহিনীর সাথে যুদ্ধে যোগদান করবে যা রেওয়ায়েতেও উল্লিখিত হয়েছে।
“সুফিয়ানী ইরাকে যুদ্ধ করার সময় তার সেনাবাহিনীকে বিশ্বের সর্বত্র প্রেরণ করবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৮৬)
এ বিষয়টি ইরাক এবং ইরান-ইরাক সীমান্তসমূহে সুফিয়ানী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি ও অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। আর পারস্যোপসাগরে সুফিয়ানীর নৌবাহিনী ও তার পাশ্চাত্য মিত্র শক্তিসমূহের উপস্থিতির বিষয়টি রেওয়ায়েত কর্তৃকও সমর্থিত হয়েছে।
নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতে দক্ষিণ ইরানে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রবেশ এবং ইস্তাখর নগরীর ফটক অথবা শ্বেতপর্বতের যুদ্ধের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে রেওয়ায়েতের মূল ভাষ্যে এক ধরনের বিভ্রাট বিদ্যমান।
“কুফা ও বাগদাদে প্রবেশ করার পর সুফিয়ানী তার সেনাবাহিনীকে বিশ্বের সর্বত্র মোতায়েন করবে। মধ্য এশিয়ার দিক থেকে খোরাসানবাসীদের পক্ষ থেকে সুফিয়ানী ভয়-ভীতি ও হুমকির সম্মুখীন হবে। তখন প্রাচ্যের সেনাদল সুফিয়ানী বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাবে এবং তাদেরকে হত্যা করবে। যখন এ সংবাদ তার কাছে পৌঁছবে তখন সে এক বিশাল সেনাবাহিনী ইস্তাখরে প্রেরণ করবে। আর এ সময় সুফিয়ানী ও তার সৈন্যরা এবং হযরত মাহ্দী (আ.) ও হাশেমী শ্বেতপর্বতে পরস্পর যুদ্ধ ও সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। আর সেখানেই তাদের মধ্যে এতটা ভয়ঙ্কর যুদ্ধ বাঁধবে এবং অশ্বারোহী সৈন্যরা এতটা হত্যাযজ্ঞ চালাবে যে, অশ্বসমূহের পায়ের নলা (গোছা) পর্যন্ত রক্তে রঞ্জিত হবে।
প্রথম রেওয়ায়েতে আহ্ওয়ায যুদ্ধে সুফিয়ানী বাহিনীর পরাজয় বরণের ফলে যে আশ্চর্যজনক প্রভাব সৃষ্টি হবে তা বর্ণিত হয়েছে। এর ফলে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে যোগ দেয়া ও তাঁর হাতে বাইআত করার জন্য তখন মুসলিম জাতিসমূহের মাঝে এক গণজোয়ারের সৃষ্টি হবে।
“এ সময় জনগণ (বিশ্ববাসী) ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবে এবং তাঁকে সন্ধান করতে থাকবে।”
যাহোক, হিজায অঞ্চলে ভূমিধ্বসে সুফিয়ানী বাহিনীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর ইরাকে সুফিয়ানীর সংঘটিতব্য যুদ্ধসমূহ সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ যেমনই হোক না কেন যতটুকু ক্ষেত্রে কোন সন্দেহ নেই তা হচ্ছে এই যে, এ ঘটনার পর সুফিয়ানী পশ্চাদপসরণ করবে ও তার পরাজয়ের পর্যায় শুরু হয়ে যাবে। এরপর থেকে তার সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা তার শাসনাধীন অঞ্চল অর্থাৎ শামদেশ রক্ষা, ফিলিস্তিন ও বাইতুল মাকাদ্দাসের সর্বশেষ প্রতিরক্ষা ব্যূহ শক্তিশালীকরণ এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সেনাবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সার্বিকভাবে নিয়োজিত করবে।
ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের বিরুদ্ধে সুফিয়ানীর যুদ্ধসমূহ সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহে মহান বিজয় ও সাফল্যের যুদ্ধ অর্থাৎ কুদ্স্ বিজয় ও ফিলিস্তিন মুক্ত করার যুদ্ধের কথাই কেবল উল্লিখিত হয়েছে। আর এ যুদ্ধই হবে সুফিয়ানীর সর্বশেষ যুদ্ধ। আর এ যুদ্ধে তার মিত্রদের অর্থাৎ ইহুদীদের এবং পাশ্চাত্যেরও পরাজয় হবে।
এ মহাসমর সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সৌভাগ্যবশত সুফিয়ানী অনেক সংকটের মুখোমুখি হতে থাকবে। প্রথম সংকট : শামদেশে তার জনসমর্থন ও গণভিত্তি দুর্বল হওয়া। কারণ তার শাসন, ক্ষমতা ও অবস্থান যতই তার অনুকূলে থাকুক না কেন শামের জনগণ তো মুসলিম এবং তারা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মুজিযা ও কারামতসমূহ এবং তাদের যুগের অত্যাচারী সুফিয়ানীর পরাজয় বরণ ও মুসলমানদের শত্রুদের স্বার্থানুকূলে তার ভূমিকা ও কর্মতৎপরতা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে। এ কারণেই শামবাসীদের মধ্যে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও ঝোঁক প্রবলভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং সুফিয়ানী ও তার রাজনীতির ব্যাপারে তাদের বিতৃষ্ণা ও অসন্তুষ্টি বাড়তে থাকবে। তাই তারা তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। বরং আমার বিশ্বাস মতে সিরিয়া, লোবানন, জর্দান ও ফিলিস্তিনে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সমর্থকদের ব্যাপক ও জনপ্রিয় আন্দোলন পরিচালিত হতে থাকবে। কারণ রেওয়ায়েতসমূহ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) শামে সেনা অভিযান পরিচালনা করবেন এবং দামেশক থেকে ৩০ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত ‘মারজ আযরা’ নামক অঞ্চলে সেনাছাউনী স্থাপন করবেন। এ থেকে ন্যূনপক্ষে প্রতীয়মান হয় যে, সুফিয়ানী তার রাজত্বের সীমান্ত রক্ষা এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না। এমনকি রেওয়ায়েতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুফিয়ানী নিজ রাজধানী দামেশক ত্যাগ করে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরে গমন করবে এবং রামাল্লা অঞ্চলে তার রাজধানী ও সেনাসদর দপ্তর স্থাপন করবে। উল্লেখ্য যে, এই রামাল্লা শহরেই রোমীয় বিদ্রোহীরা অবতরণ করবে।
একইভাবে রেওয়ায়েতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) যুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে দেরী করবেন এবং বেশ কিছুকাল দামেশকের শহরতলীতে অবস্থান করতে থাকবেন যাতে করে শামের মুমিন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা যারা তখনও ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে যোগদান করেননি তারা তাঁর সাথে যোগ দিতে পারে। অতঃপর তিনি সুফিয়ানীর কাছে প্রস্তাব দেবেন যাতে করে সে আলোচনা করার জন্য সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে। সে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মহান ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়বে এবং তাঁর হাতে বাইআত করবে। সে তখন যুদ্ধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেবে এবং অত্র এলাকাটির নিয়ন্ত্রণভার ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে অর্পণ করবে। কিন্তু সুফিয়ানীর ঘনিষ্ট ব্যক্তিরা ও পৃষ্ঠপোষকরা এ কারণে তাকে ভর্ৎসনা করবে এবং তাকে তার গৃহীত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য করবে।
এ সব ঘটনা কুদ্স বিজয় ও ফিলিস্তিন মুক্ত করার কিছু পূর্বে সংঘটিত হবে এবং আমরা এটি মাহ্দী (আ.) সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহে অধ্যয়ন করব। শামে সুফিয়ানীর গণভিত্তি ও জনসমর্থন দুর্বল হয়ে পড়া এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সমর্থনে গণজোয়ার সৃষ্টি হওয়া ব্যতীত প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক মাপকাঠিসমূহের আলোকে এ সব ঘটনা ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং কতিপয় রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে যে, সুফিয়ানীর বাহিনীর একটি অংশ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হাতে বাইআত এবং তাঁর সেনাদলে যোগদান করবে।
ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : “তখন সে (ইমাম মাহ্দী) কুফায় আসবে এবং আবির্ভূত হওয়া পর্যন্ত যতদিন আল্লাহ্ চাইবেন ততদিন সেখানেই থাকবে। এরপর সে ও তার সঙ্গী-সাথীরা মারজ আযরায় যাবে এবং অধিকাংশ জনগণই তার সাথে যোগ দেবে।… আর তারা পরস্পর সাক্ষাৎ করা ও যুদ্ধে লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সুফিয়ানী রামাল্লা নগরীতে অবস্থান করতে থাকবে। আর ঐ দিবসটি হবে প্রকৃত মুমিনকে শনাক্ত করার দিবস। যে সব লোক সুফিয়ানীর সাথে থাকবে তারা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধরদের অনুসরণ করবে না এবং জনগণের একটি অংশ যারা মহানবী (সা.)-এর বংশধরদের সাথে থাকবে তাদের অনেকেই সুফিয়ানীপন্থী হয়ে যাবে। ঐ দিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ পতাকার দিকে দ্রুত ধাবিত হবে। আর ঐ দিন হবে প্রকৃত মুমিনদেরকে চেনার দিবস। (বিহারুল আনওয়ার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২২৪)
ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “যখন সুফিয়ানী মাহ্দীর দিকে একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করবে তখন তারা বাইদার মরুপ্রান্তরে ধ্বংস হবে। আর এ সংবাদ শামবাসীদের কাছে পৌঁছবে। তারা তাদের খলীফাকে বলবে : মাহ্দী আবির্ভূত হয়েছে। তাঁর হাতে বাইআত করুন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য করুন। আর যদি তা না করেন তাহলে আমরা আপনাকে হত্যা করব। সে বাইআত করার জন্য কতিপয় ব্যক্তিকে মাহ্দীর কাছে প্রেরণ করবে। আবার অন্যদিকে মাহ্দীও তাঁর সেনাদল নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯৬)
নিম্নোক্ত এ রেওয়ায়েতে ব্যাপক গণজাগরণ, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বন্ধু এবং সুফিয়ানীবিরোধীদের ব্যাপকভিত্তিক আন্দোলন ও কর্মকাণ্ডের কথা উল্লিখিত হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে যে, “হযরত মাহ্দী (আ.) বলবেন : আমার পিতৃব্যপুত্রকে আমার কাছে নিয়ে এসো যাতে করে আমি তার সাথে কথা বলতে পারি। অতঃপর সে (সুফিয়ানী) তাঁর কাছে আসবে এবং তাঁর সাথে আলোচনা করবে। সে তার সকল কর্তৃত্ব ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে অর্পণ করবে এবং তাঁর হাতে বাইআত করবে। এরপর যখন সুফিয়ানী তার বন্ধুদের কাছে ফিরে যাবে তখন বনি কালব গোত্র তাকে অনুতাপ করাবে। এ কারণেই সে ইমামের কাছে ফিরে গিয়ে চুক্তি বাতিল করার অনুরোধ করবে এবং ইমামও তার বাইআত বাতিল করে দেবেন। তখন সুফিয়ানী তার বাহিনীকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মোতায়েন করবে। কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আ.) তাকে পরাজিত করবেন এবং মহান আল্লাহ্ তাঁর হাতে রোমীয়দেরকে ধ্বংস করবেন। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯৬)
বনি কালব গোত্র তাকে অনুতাপ করাবে- এ বাক্যটির অর্থ হচ্ছে তাকে হযরত মাহ্দী (আ.)-এর হাতে বাইআত করার জন্য অনুতাপ করাবে। কালব সুফিয়ানীর মাতুলদের গোত্রের নাম।
আসলে যারা সুফিয়ানীর পৃষ্ঠপোষকতা দান করবে এবং তার হুকুমতকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সমর্থনকারী গণআন্দোলন ও বিপ্লবের বরাবরে পতনের হাত থেকে রক্ষা করবে তারা হবে তার ইহুদী ও রোমীয় পৃষ্ঠপোষক। যেমন পূর্বোক্ত রেওয়ায়েত ও অন্যান্য রেওয়ায়েত থেকেও এ অর্থটি স্পষ্ট হয়ে যায় এবং আমরা আল কুদ্স বিজয়ের মহাসমর সংক্রান্ত অধ্যায়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করব।
যাহোক, সুফিয়ানী এ গণজোয়ারে একটি পক্ষকেও তার দিকে টানতে এবং ইমাম মাহ্দী (আ.) তাকে যে সুযোগ দেবেন তার সদ্ব্যবহার করতে সক্ষম হবে না। আর শামের মুসলমানরাও সুফিয়ানী সরকার ও তার সেনাশক্তির পতন ঘটাতে সক্ষম হবে না। এ কারণেই সুফিয়ানী এবং তার মিত্ররা নিজেদেরকে এ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে থাকবে যা রেওয়ায়েতসমূহের ভাষ্য অনুসারে আক্কা থেকে সূর, সেখান থেকে সমুদ্র সৈকতস্থ আনতাকিয়া এবং দামেশক থেকে তাবারীয়াহ্ ও আল কুদসের অভ্যন্তরভাগ পর্যন্ত প্রসার লাভ করবে।
এ সময় মহান আল্লাহর অভিশাপ এবং ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তাঁর সেনাবাহিনীর ক্রোধ সুফিয়ানী ও তার মিত্রদের ওপর আপতিত হবে। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হাতে ঐশ্বরিক মুজিযা ও নিদর্শনাদি বাস্তবায়িত হবে। সুফিয়ানী এবং তার ইহুদী ও পাশ্চাত্য মিত্র ও পৃষ্ঠপোষকদের ওপর দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভাগ্য আপতিত হবে এবং তারা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করবে। আর পরিণামে সুফিয়ানী ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর একজন সৈনিকের হাতে বন্দী হবে এবং রেওয়ায়েতসমূহ অনুযায়ী তাকে তাবারীয়াহ্ হ্রদের পাশে অথবা আল কুদসে প্রবেশ অঞ্চলের কাছে হত্যা করা হবে। আর এভাবেই সেই খোদাদ্রোহী নাস্তিক যে পনর মাসব্যাপী এমন সব জঘন্য অপরাধ করেছে যা অন্য কারো পক্ষে এর থেকে দীর্ঘ সময়েও করা সম্ভব নয়, তার পাপপূর্ণ কালো জীবনের চির অবসান হবে।
তথ্যসূত্র: ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশ
লেখক: আল্লামা আলী আল কুরানী
অনুবাদ: মোহাম্মদ মুনীর হোসেন খান




