Press "Enter" to skip to content

মুসলিম মাগরিব ভূ-খণ্ড এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবকালীন ঘটনাবলী

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের যুগের বিভিন্ন রেওয়ায়েতে মাগরিবীদের উল্লেখ আছে (মাগরিবীদের কথা বর্ণিত হয়েছে)। তবে এ সব রেওয়ায়েত যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবে ফাতেমীয়দের আন্দোলন সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহের সাথে সেগুলো মিলে-মিশে গেছে। উল্লেখ্য যে, মুসলমানরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের আগেই ফাতেমীয়দের আন্দোলন ও বিপ্লব সংক্রান্ত রেওয়ায়েতগুলো বর্ণনা করেছেন। আর এ সব রেওয়ায়েত, আরো অন্যান্য ভবিষ্যৎ ঘটনা সংক্রান্ত রেওয়ায়েত এবং মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতের প্রমাণপঞ্জীর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য।

তবে কতিপয় রেওয়ায়েতে হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের যুগে মাগরিবীদের আন্দোলন ও তৎপরতা সম্পর্কে স্পষ্ট উক্তি বিদ্যমান এবং ফাতেমীয়দের আন্দোলন ও বিপ্লবের সাথে এ সব রেওয়ায়েতের কোন সম্পর্ক নেই। এমনকি এতৎসংক্রান্ত এবং এ ছাড়াও আরো সাক্ষ্য-প্রমাণ বিদ্যমান যেগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মাগরিবীদের এ আন্দোলন ও তৎপরতা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের যুগেই সংঘটিত হবে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট হচ্ছে সিরিয়া ও জর্দানে মাগরিবী বাহিনীর আগমন সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ। এখানে উল্লেখ্য যে, সুফিয়ানীর আন্দোলন ও বিপ্লবের একটু আগেই সিরিয়া ও জর্দানে মাগরিবী বাহিনী অনুপ্রবেশ করবে। আর ইতোমধ্যে আমরা যথাস্থানে এ বিষয়টি আলোচনা করেছি।

সমগ্র শাম, ইরাক-তুরস্ক সীমান্তে অবস্থিত কিরকীসীয়ার যুদ্ধ এবং ইরাকে মাগরিব হতে (আগত) অথবা মাগরিবী আরোহীরা (অর্থাৎ সাঁজোয়া বাহিনী) অথবা হলুদ পতাকাসমূহের ভূমিকার কথা রেওয়ায়েতসমূহে উল্লিখিত হয়েছে। যেমন ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতে উল্লিখিত নিম্নোক্ত রেওয়ায়েত: “যখন হলুদ ও কালো পতাকাসমূহ (পতাকাবাহী সেনাবাহিনীসমূহ) শামের অভ্যন্তরে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হবে তখন সেখানকার অধিবাসীদের জন্য আক্ষেপ যারা সামরিক বাহিনীর হাতে পর্যদূস্ত হবে। অতঃপর বিজয়ী সেনাবাহিনীর হাতে থেকে শামের জন্য আক্ষেপ এবং অভিশপ্ত কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট লোকটির থেকে তাদের জন্য আক্ষেপ। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৭৩)

অভিশপ্ত কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট হওয়া হচ্ছে সুফিয়ানীর বিশেষ বৈশিষ্ট্যেরই অন্তর্ভুক্ত। এ পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত হয়েছে : “কালো পতাকাবাহী এবং হলুদ পতাকার সমর্থকরা কুনাইতারা শহরে পরস্পরের মুখোমুখী হবে এবং ফিলিস্তিনে (ইসরাইলে) প্রবেশ করা পর্যন্ত একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হবে। এ সময় সুফিয়ানী প্রাচ্যবাসীদের (ইরানী সেনাবাহিনী) বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে। আর যখন মাগরিবী সেনাবহিনী জর্দানে অবতরণ করবে তখন তাদের অধিনায়ক মৃত্যুবরণ করবে এবং তারা তখন তিন দলে বিভক্ত হয়ে একে অপর থেকে আলাদা হয়ে যাবে। একটি দল যে স্থান থেকে এসেছিল সে স্থানেই প্রত্যাবর্তন করবে। আরেকটি দল সেখানে থেকে যাবে এবং সুফিয়ানী তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও তাদেরকে পরাস্ত করে নিজের অনুগত করবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৭০)

এতে আরো উল্লিখিত হয়েছে : “নিশ্চয়ই মাগরিবীদের সেনাপতি, বনি মারওয়ান ও বনি কুযাআহ্ শামের রাজধানীতে (দামেশকে) কালো পতাকাবাহীদের (ইরানী সেনাবাহিনী) সাথে যুদ্ধ করার জন্য পরস্পর ঐক্যবদ্ধ হবে। (ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৭০)

আবির্ভাবের যুগে মাগরিবী সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানসমূহ সংক্রান্ত সমুদয় রেওয়ায়েত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তাদের অভিযান আরব অথবা আন্তর্জাতিক বাঁধাদানকারী বাহিনীসমূহের সাথেই বেশি সদৃশ হবে। এ বাহিনী ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী বিপ্লব ও আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। তারা শামে প্রাচ্যবাসীদের পতাকাবাহী সেনাদল অর্থাৎ আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ইরানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং তাদের হাতে পরাজিত হবে। পরাজয় বরণ করার পর তারা জর্দানের দিকে পশ্চাদপসরণ করবে। আমরা শামের ঘটনাবলী সংক্রান্ত অধ্যায়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আরো কিছু রেওয়ায়েত অনুসারে বোঝা যায় যে, ইরাকেও তাদের ভূমিকা থাকবে।

তবে কিরকীসীয়ার যুদ্ধে মাগরিবী সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ খুব সংক্ষিপ্ত হওয়ায় ইসলামের স্বার্থে তাদের ভূমিকার কথা নির্দেশ করে না। চাই তাদেরকে সুফিয়ানীর বিপরীতে তুর্কীদের সমর্থনকারী বা সুফিয়ানীর মিত্রপক্ষ বলে গণ্য করি না কেন। কারণ, রেওয়ায়েতসমূহে কিরকীসীয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল পক্ষকেই নিন্দা এবং তাদেরকে অত্যাচারী বলে গণ্য করা হয়েছে।

রেওয়াযেতসমূহ সঠিক হওয়ার ভিত্তিতে কেবল বাকী থাকে মিশরে মাগরিবী বাহিনীর ভূমিকা। আর তাদের ভূমিকা ইসলাম ও মিশরবাসীদের অনুকূলে থাকবে কি- এ ব্যাপারে কোন দলিল আমাদের হাতে নেই। বরং আমাদের এ কথা বলাই উত্তম হবে যে, ঐ সময় তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হবে ইসরাইল-সীমান্ত রক্ষা করা যখন মিশর সরকার ইহুদীদের বিরুদ্ধে সে দেশের জনগণ ও সেনাবাহিনীর প্রাণোৎসর্গকারী অভিযানসমূহ প্রতিহত ও বাধাদান করতে অপারগ হবে। অথবা তাদের প্রধান ভূমিকা মিশরে কিবতী সম্প্রদায়ের উল্লিখিত অপকর্ম ও অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে সে দেশের মুসলমানদের তীব্র প্রতিক্রিয়া থেকে এ সম্প্রদায়কে (কিবতী) রক্ষা করা হবে। অথবা ঐ সময় মাগরিবী বাহিনী আরব প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসাবে গণ্য হবে যখন মিশর সরকার দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে মিশরে হযরত মাহ্দী (আ.)-এর সমর্থনকারী ইসলামী আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মিশরের সরকারী বাহিনী উদ্বিগ্ন ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়বে। তখন মিশর সরকার মাগরিবী বাহিনীকে সে দেশে অনুপ্রবেশ ও সামরিক হস্তক্ষেপ করার আহবান জানাবে। আর মহান আল্লাহ্ই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানেন।

তথ্যসূত্র: ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশ

লেখক: আল্লামা আলী আল কুরানী

অনুবাদ: মোহাম্মদ মুনীর হোসেন খান