Press "Enter" to skip to content

হাদীসে সাকালাইনে কোন শব্দটি সঠিক (عترتي) নাকি (سنتی)?

و عترتي তথা ‘এবং আমার বংশধর’ সঠিক নাকি وسنتی তথা ‘এবং আমার সুন্নাত’ সঠিক?

মুহাদ্দিসরা প্রসিদ্ধ হাদিসে সাকালাইনকে দু’ভাবে বর্ণনা করেছেন। আমাদেরকে দেখতে হবে যে, উক্ত দু’টি বর্ণনার মধ্যে কোন্টি সঠিক:

(ক) کتاب الله و عترتی

(খ) নাকি کتاب الله و سنتی সঠিক?

উত্তর: রাসূল (স.) হতে বর্ণিত وعترتی اهل بيتي শব্দযুক্ত হাদিসটিই সঠিক। আর যে রেওয়ায়েতে أهل بیتی-এর স্থলে و سنتی ব্যবহৃত হয়েছে তা দলিল বা সনদের দিক থেকে মিথ্যা বা বাতিল বলে প্রমাণিত এবং প্রত্যাখ্যাত। অন্য কথায়, হাদিসটি জাল ও বানোয়াট। পক্ষান্তরে, وأهل بيتى শব্দযুক্ত হাদিসটির সনদ স্বতঃসিদ্ধভাবে সঠিক।

হাদিসের সনদ و أهل بيتى

এই »و أهل بيتى« শব্দযুক্ত টেক্সট বা মাত্র দু’জন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন:

১। মুসলিম’ (সহিহ মুসলিম গ্রন্থের প্রণেতা। অনুবাদক) স্বীয় ‘সহিহ’ গ্রন্থে যায়েদ ইবনে আরকাম হতে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (স.) একদিন মদিনা ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থলে ‘খুম’ নামক একটি পুকুরের কাছে খোতবা দান করেন। উক্ত খোতবায় তিনি আল্লাহর প্রশংসার পর লোকদেরকে নসিহত করে বলেন:

«ألا أيها الناس، فانّما أنا بشر يوشك أن يأتى رسول ربي فأجيب، و أنا تاركت فيكم ثقلين: أولهما كتاب الله فيه الهدى و النور، فخذوا بكتاب الله و استمسكوا به فحث على كتاب الله و رغب فيه ثم قال : – و أهل بيتي، أذكركم الله في أهل بيتى، أذكركم الله في اهل بيتي، أذكركم الله في اهل بيتي

‘হে লোকসকল! আমি একজন মানুষ। খুব শিগগিরি আমার প্রভুর নিযুক্ত ব্যক্তি আমার কাছে আসবেন এবং আমিও তাঁর আহ্বানে সাড়া দেব। আমি তোমাদের মাঝে দু’টি অতি ভারী (মূল্যবান) জিনিস রেখে যাচ্ছি; যার একটি হলো আল্লাহরকিতাব; যাতে রয়েছে নূর এবং হেদায়েত। আল্লাহর কিতাবকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর।’ রাসূল (স.) আল্লাহর কিতাবের উপর আমল করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অতঃপর বলেন: ‘আর অপরটি হলো আমার আহলে বাইত। আমার আহলে বাইতের বিষয়ে তোমাদেরকে মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি (অর্থাৎ মহান আল্লাহকে ভয় করে তাদেরকে অনুসরণ কর)।’ এই বাক্যটিকে তিনি তিনবার উচ্চারণ করেন। (সহিহ মুসলিম, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৮০৩)

দারেমি এই মাত্ন তথা হাদিসের মূলপাঠটি নিজ ‘সুনান’গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, এই হাদিস দু’টি সনদগতভাবে দিবালোকের মতো স্পষ্ট ও নিখুঁত। (সুনানে দারেমি, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৩১-৪৩২)

২। তিরমিযি এই হাদিসটিতে وعترتى أهل بيتى « শব্দগুলো বর্ণনা করেছেন। মূল হাদিসটি হলো:

إني تاركت فيكم الثقلين ما ان تمسكتم بهما لن تضلوا بعدى؛ أحدهما أعظم من الآخر: كتاب الله حبل ممدود من السماء إلى الأرض و عترتي اهل بيتي لن يفترقا حتى يردا علي الحوض، فانظروا كيف تخلفوني فيها».

‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মাঝে দু’টি ভারী (মূল্যবান) জিনিস (আমানত হিসেবে) রেখে যাচ্ছি। যদি তা শক্তভাবে আঁকড়ে ধর তবে কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। সেগুলো

একটি অপরটির উপর প্রাধান্য রাখে। (সেগুলো হচ্ছে) আল্লাহর কিতাব- যা আসমান হতে জমিন পর্যন্ত প্রসারিত (রহমতের) ঝুলন্ত রশির ন্যায় এবং অপরটি হলো আমার বংশধর; আমার আহলে বাইত। এরা হাউজে কাওসারে আমার সঙ্গে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত কখনই একে অপর হতে আলাদা হবে না। অতএব, তোমরা লক্ষ্য রেখ যে, আমার (ছেড়ে যাওয়া) আমানতের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করো। (সুনানে তিরমিযি, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৬৬৩ )

মুসলিম ও তিরমিযি যাঁদের দু’জনই সহিহ হাদিস গ্রন্থ এবং (দুই পৃথক) ‘সুনান’-এর প্রণেতা, তাঁরা أهل بيتی শব্দের ওপর তাগিদ করেছেন; আমাদের উদ্দেশ্য প্রমাণের জন্য এটাই যথেষ্ট। আর (মুসলিম ও তিরমিযি কর্তৃক বর্ণিত) উক্ত হাদিস

দু’টি সনদগত দিক থেকে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য এবং কোনোরূপ আলোচনা পর্যালোচনার প্রয়োজন রাখে না।

و سنتی বর্ণিত হাদিসের সনদ

যে রেওয়ায়েতটিতে أهل بينى এর স্থলে و سنتی শব্দ বর্ণিত হয়েছে তা জাল ও বানোয়াট। এ হাদিসের সনদ দুর্বল হওয়া ছাড়াও আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, উমাইয়্যাদের বেতনভুকরা এ হাদিসটি তৈরি করেছে।

১। হাকেম নিশাবুরি স্বীয় ‘মুস্তাদরাক’ গ্রন্থে উল্লিখিত বিষয়টি নিম্নোক্ত সূত্রে বর্ণনা করেছেন:

আব্বাস ইবনে আবি উয়াইস্, আবি উয়াইস্ হতে, তিনি সুর ইবনে যাইদ আদ-দাইলামি হতে, তিনি আকরামা হতে, তিনি ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেন:

يا أيها الناس اني قد تركت فيكم ان اعتصمتم به فلن تضلوا ابدا كتاب الله وسنة نبيه

‘হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যদি তোমরা সেগুলো শক্তভাবে আঁকড়ে ধর তবে বিভ্রান্ত হবে না। (সেগুলো হচ্ছে) আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবির সুন্নাত (জীবন পদ্ধতি)। (মুস্তাদরাকে হাকেম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৩)

এ বর্ণনার রাবিদের মাঝে এমন পিতা ও পুত্র রয়েছে যারা হাদিসের সনদের (সূত্রের) আপদ হিসেবে খ্যাত। তারা হলো যথাক্রমে ইসমাইল ইবনে আবি উয়াইস্ ও আবু উয়াইস্। এরা দু’জন ‘সিকাহ’ (বিশ্বস্ত) তো নয়ই; বরং তারা মিথ্যাবাদী ও হাদিস জালকারী হিসেবে নিন্দিত হয়েছে।

রিজালশাস্ত্রের আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি

হাফেয মিযায্য ‘তাহযিবুল কামাল’ গ্রন্থে রিজালশাস্ত্রের গবেষক ও পণ্ডিতদের হতে ইসমাইল ও তার পিতা সম্পর্কে এরূপ বর্ণনা করেছেন:

ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন (রিজালশাস্ত্রের একজন বিশেষজ্ঞ) বলেন: ‘আবু উয়াইস্ ও তার পুত্র (হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে) যায়িফ তথা দুর্বল রাবিদের অন্তর্ভুক্ত।’ তিনি ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন হতে আরো বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: ‘এরা দু’জন হাদিস চুরি করত।’ ইবনে মুঈন আবু উয়াইসের পুত্র সম্পর্কে আরো বলেন: ‘তার ওপর আস্থা রাখা যায় না (অর্থাৎ সে বিশ্বস্ত নয়)।’

উয়াইসের পুত্র (ইসমাইল) সম্পর্কে নাসাঈ বলেছেন: ‘সে যায়িফ এবং বিশ্বস্ত নয়।’

আবুল কাসেম লালকায়ি বলেন: ‘নাসাঈ তার বিরুদ্ধে অনেক উক্তি করেছেন। এমনকি এটাও বলেছেন যে, তার (ইসমাইলের) হাদিসগুলো পরিত্যাজ্য।’

ইবনে উদাই (রিজালশাস্ত্রের একজন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব) বলেন: ‘ইবনে আবি উয়াইস্ তার মামা (মালিক) হতে গারিব হাদিস (একক ব্যক্তি বা সম্প্রদায় হতে বর্ণিত অপ্রসিদ্ধ হাদিস) বর্ণনা করেছে, যেটাকে কেউই গ্রহণ করে না।’ (হাফেয মি্যি রচিত তাহযীবুল কামাল, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১২৭)

ইবনে হাজার আসকালানি ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, ইবনে আবি উয়াইস্ সম্পর্কে নাসাঈ যে নিন্দা করেছেন তারই ভিত্তিতে তার হাদিসকে নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি গ্রন্থের ভূমিকা, পৃ. ৩৯১, মুদ্রণে দারুল মায়ারেফ)

হাফেয সাইয়্যেদ আহমাদ ইবনে সিদ্দিক ‘ফাতহুল মুলকিল উলা’ গ্রন্থে সালামাহ ইবনে শুয়াইব হতে বর্ণনা করেছেন: তিনি ইসমাইল ইবনে আবি উয়াইস্ হতে শুনেছেন যে, সে বলত: ‘যখন মদিনার অধিবাসীরা কোনো বিষয়ে দু’টি দলে

ভাগ হয় তখন আমি হাদিস জাল (তৈরি) করি।’ (হাফেয সাইয়্যেদ আহমাদ, ফাতহুল মুলুকিল উলা, পৃ. ১৫)

অতএব, পুত্র (ইসমাইল ইবনে আবি উয়াইস্) হাদিস জালকারীদের অন্তর্ভুক্ত। ইবনে মুঈনও তাকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। তাছাড়া সহিহ মুসলিম এবং সহিহ তিরমিযি গ্রন্থ দু’টির একটিতেও এবং অন্যান্য সহিহ গ্রন্থেও তার হতে কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি।

আবু উয়াইস্ সম্পর্কে এটুকুই বলা যথেষ্ট যে, আবু হাতেম রাযি ‘জারহ্ ওয়া তা’দীল’ গ্রন্থে তার সম্পর্কে বলেছেন: ‘তার হাদিস লেখা হয়, কিন্তু দলিল বা

প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না এবং তার হাদিস শক্তিশালী ও মজবুত নয়।  (আবু হাতেম রাবি, আল জারহ্ ওয়াত তা’দীল, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৯২)

আবু হাতেম, ইবনে মুঈন হতে আরো বর্ণনা করেন যে, আবু উয়াইস্ বিশ্বস্ত নয়।

যেসব রেওয়ায়েত এ দু’জনের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে তা কখনই সহিহ নয়। এ ছাড়া, তাদের রেওয়ায়েতের অবস্থান সহিহ এবং দৃঢ় রেওয়ায়েতগুলোর বিপরীতে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আবু উয়াইসের নিকট থেকে যিনি এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন স্বয়ং তিনিই অর্থাৎ হাকেম নিশাবুরিও তার রেওয়ায়েত দুর্বল হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। সুতরাং তিনি উক্ত সনদ বা সূত্রকে সঠিক বলে প্রমাণের চেষ্টা না করে হাদিসটির বিষয়বস্তুর সত্যতার সপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। তবে সেটাও নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে মূল্যহীন। কেননা, সেটা হাদিসকে শক্তিশালী করার বদলে এর দুর্বলতাকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি ওই হাদিসের সমর্থনে যে হাদিস উল্লেখ করেছেন তা এখানে বিশ্লেষণ করব:

و سنتی -এর দ্বিতীয় সনদ

হাকেম নিশাবুরি, আবু হুরায়রাহ হতে মারফু’ সূত্রে বর্ণনা করেছেন:

إني قد تركت فيكم شيئين لن تضلوا بعدهما كتاب الله و سنتی و لن يفترقا حتى يردا علي الحوض».

এই বর্ণনাটি হাকেম নিম্নোক্ত সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন:

আদ্ব-দ্বাবি, সালেহ ইবনে মুসা আত-তালহি হতে, তিনি আবদুল আযীয ইবনে রাফি’ হতে, তিনি আবু সালেহ হতে, তিনি আবু হুরায়রাহ হতে।

এ হাদিসটিও আগের হাদিসের ন্যায় বানোয়াট। এ পর্যায়ে সালেহ ইবনে মুসা আত-তালহি সম্পর্কে রিজালশাস্ত্রের মনীষীদের উক্তি উল্লেখ করা হলো:

ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন বলেন: ‘সালেহ ইবনে মূসা বিশ্বস্ত নয়।’ আবু হাতেম রাযি বলেন: ‘তার বর্ণিত হাদিস দুর্বল ও মুনকার (যে হাদিসের বিষয়বস্তু অজ্ঞাত ও অগ্রহণযোগ্য)। সে অনেক মুনকার হাদিসকে সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নামে বর্ণনা করেছে।’ নাসাঈ বলেন: ‘তার হাদিস লিপিবদ্ধ করা হয় না।’ অপর একটি স্থানে বলেন: ‘তার হাদিস পরিত্যক্ত। ( হাফেয মি্যি, তাহযিবুল কামাল, ১৩ তম খণ্ড, পৃ. ৯৬)

ইবনে হাজার ‘তাহযিবুত তাহযিব’ গ্রন্থে লিখেছেন: ইবনে হিব্বান বলেন: ‘সালেহ ইবনে মূসা সিকাহ (বিশ্বস্ত) রাবিদের সঙ্গে এমন কিছু বিষয় সম্পৃক্ত করে যা তাদের বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ পরিশেষে বলেন: ‘তার হাদিস হুজ্জাত (প্রামাণ্য) নয়।’ আবু নাঈম বলেন: ‘তার হাদিস পরিত্যক্ত। সে সবসময় মুনকার হাদিস বর্ণনা করে। (ইবনে হাজার, তাহযিবুত তাহযিব, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৫৫)

ইবনে হাজার ‘তাকরীব’ গ্রন্থে বলেন: ‘তার হাদিস পরিত্যক্ত’ এবং যাহাবি ‘কাশেফ’ গ্রন্থে তার সম্পর্কে বলেন: ‘তার হাদিস দুর্বল।’ এমনকি যাহাবি ‘মীযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে তার হতে আলোচ্য হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন যে, তার বর্ণিত এ হাদিসটি মুনকার হাদিসগুলোর অন্তর্ভুক্ত। ( ইবনে হাজার, তাকরীব-এর অনুবাদ, সংখ্যা ২৮৯১, যাহাবি, আল-কাশেফ-এর অনুবাদ, সংখ্যা ২৪১২, যাহাবি, মিযানুল ই’তিদাল, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩০২)

و سنتی -এর তৃতীয় সনদ

ইবনে আবদুল বার ‘তামহীদ’ গ্রন্থে আলোচ্য হাদিসটি নিম্নোক্ত সনদে বর্ণনা করেছেন: (আত-তামহীদ, ২৪তম খণ্ড, পৃ. ৩৩১)

আবদুর রহমান ইবনে ইয়াহইয়া, আহমাদ ইবনে সাঈদ হতে, তিনি মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আদ দুবাইলি (দাবিলি) হতে, তিনি আলী ইবনে যাইদ আল ফারায়েছি হতে, তিনি হুনাইনি হতে, তিনি কাসীর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আম্র ইবনে আওফ হতে, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর পিতামহ হতে।

কাসীর ইবনে আবদুল্লাহ্ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ি বলেন: ‘সে মিথ্যাবাদী রাবিদের অন্যতম অথবা সে মিথ্যার ভিত্তিগুলোর অন্যতম। ( ইবনে হাজার, তাহযিবুত তাহযিব, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৩৭৭; তাহযিবুল কামাল, ২৪তম খণ্ড, পৃ. ১৩৮)

আবু দাউদ বলেন: ‘সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।” ইবনে হিব্বান বলেন: ‘আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর তার পিতা ও পিতামহ হতে একটি হাদিস গ্রন্থের বর্ণনা দিয়েছে যা পুরোপুরি বানোয়াট। সেই হাদিস গ্রন্থ হতে হাদিস বর্ণনা করা এবং আবদুল্লাহ হতে রেওয়ায়েত করা হারাম, তবে সমালোচনা ও পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে উল্লেখ করাতে কোনো অসুবিধা নেই। (ইবনে হিব্বান, আল-মাজরুহীন, ২য় খণ্ড, পৃ. ২২১)

নাসাঈ ও দারা কুতনি বলেন: ‘তার বর্ণিত হাদিস পরিত্যক্ত।’ ইমাম আহমাদ বলেন: ‘সে মুনকার হাদিস বর্ণনাকারী এবং বিশ্বস্ত নয়।’ আর ইবনে মুঈনও তার সম্পর্কে একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইবনে হাজার নিজ গ্রন্থ ‘আত-তাকরীবে’ তার ক্ষেত্রে শুধু ‘জায়িফ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং রিজালশাস্ত্রের বড় বড় মনীষী তাকে মিথ্যাবাদী ও হাদিস জালকারী হিসেবে উল্লেখ করা সত্ত্বেও যাঁরা তাকে মিথ্যাবাদী বলেছেন তাঁদেরকে তিনি উগ্র বলেছেন। এমনকি যাহাবিও তার সম্পর্কে বলেছেন: ‘সে একজন দুর্বল (রাবি)।’

সনদবিহীন বর্ণনা

মালিক আলোচ্য হাদিসটিকে নিজ গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা’য় সনদবিহীন ও মুরসাল (বিচ্ছিন্ন সূত্রে) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর আমরা সবাই অবগত যে, এমন ধরনের হাদিস মূল্যহীন। (

এ পর্যালোচনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, وسنتی শব্দযুক্ত হাদিসটি বানোয়াট এবং মিথ্যাবাদী ও উমাইয়্যা দরবারের বেতনভোগী ব্যক্তিদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। এ বর্ণনা বা কথিত হাদিসটিকে و عترتی শব্দযুক্ত সহিহ হাদিসটির বিপরীতে জাল করা হয়েছে। অতএব, মসজিদের খতীব, মুসলিম বক্তা এবং (মসজিদের) ইমামদের উচিত হলো, যে হাদিসটি আল্লাহর রাসূল (স.) হতে বর্ণিত হয়নি সে হাদিসকে পরিত্যাগ করা। আর তার স্থলে মানুষকে সঠিক ও সহিহ হাদিস সম্পর্কে পরিচিত করানো। অর্থাৎ যে হাদিসটি মুসলিম নিজের ‘সহিহ’ গ্রন্থে ل بنی এবং তিরমিযি নিজ গ্রন্থে عترتی و اهل بیتی অংশসহ বর্ণনা করেছেন সেটাই তুলে ধরা। জ্ঞান অন্বেষণকারীদের উচিত হবে হাদিসশাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করে সহিহ হাদিসগুলোকে দুর্বল হাদিস হতে আলাদা করা।

পরিশেষে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, মহানবি (স.( و اهل بیتی বলতে তাঁর পবিত্র বংশধরকে বুঝাতে চেয়েছেন। যেমন- হযরত ফাতিমা (সা আ), ইমাম হাসান ও হুসাইন (সালামুল্লাহি আলাইহিম)। কেননা, মুসলিম স্বীয় ‘সহিহ’ গ্রন্থে’ এবং তিরমিযি স্বীয় ‘সুনানে’২ আয়েশা হতে বর্ণনা করেছেন যে, (মুসলিম, সহিহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৮৮৩, তিরমিযি, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৬৬৩)

نزلت هذه الآية على النبي (صلى الله عليه وآله وسلّم) إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا في بيت ام سلمة، فدعا النبي – صلى الله عليه [ وآله] وسلم – فاطمة و حسناً و حسيناً فجللهم بكساء و على خلف ظهره فجلله بكساء ثم قال: اللهم هولاء أهل بيتي فاذهب عنهم الرجس وطهرهم تطهيراً. قلت أم سلمة و انا معهم يا نبي الله؟ قال: أنت على مكانك و أنت إلى الخير».

‘হে নবি পরিবারের সদস্যগণ! আল্লাহ তো শুধু তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পবিত্র ও বিশুদ্ধ করতে চান’। (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)

এই আয়াতটি মহানবি (স.)-এর উপর উম্মুল মুমিনিন হযরত উম্মে সালমাহ (রা.)-এর ঘরে অবতীর্ণ হয়। মহানবি (স.), ফাতিমা (সা.), হাসান (আ.) ও হুসাইন (আ.)-কে নিজের আবা’র মধ্যে নিলেন, এমতাবস্থায় আলী (আ.) তাঁর পেছনে অবস্থান করছিলেন। তাঁদেরকে একটি চাদর দ্বারা আবৃত করে এরূপ দোয়া করলেন: ‘হে আমার প্রতিপালক! এরাই আমার আহলে বাইত। অপবিত্রতাকে এদের হতে দূর করে এদেরকে পবিত্র কর।’ উম্মে সালমাহ বললেন: ‘হে আল্লাহর নবি! আমিও কি তাঁদের অন্তর্ভুক্ত (আমিও কি উক্ত আয়াতে বর্ণিত আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত)?’ তিনি বললেন: ‘তুমি নিজের স্থানেই থাকো। তুমি সত্য ও কল্যাণের পথেই রয়েছ। (হাসান ইবনে আলী আস-সাক্কাফ রচিত সাহিহে সিফাতে সালাতুন নাবি (স.) গ্রন্থের ২৮৯-২৯৪ পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত হয়েছে)

হাদিসে সাকালাইনের ভাবার্থ

যেহেতু মহানবি (স.) নিজ বংশধরকে পবিত্র কোরআনের পাশে স্থান দিয়েছেন এবং উভয়কে উম্মতের মাঝে আল্লাহর হুজ্জাত (চূড়ান্ত দলিল) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তাই এ দু’টির প্রতি দৃষ্টি রেখে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে পৌছানো যায়:

১। মহানবি (স.)-এর বংশধরদের বাণী কোরআনের মতোই হুজ্জাত (চূড়ান্ত দলিল)। আর দ্বীনি বিষয়ে- চাই তা বিশ্বাসগত (আকিদাগত) দিক হোক বা ফিকাহগত দিক, অবশ্যই তাঁদের বাণীকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে এবং কোনো বিষয়ে তাঁদের পক্ষ থেকে বর্ণিত কোনো যুক্তি বিদ্যমান থাকলে অন্যের শরণাপন্ন হওয়া বৈধ নয়।

মহানবি (স.)-এর ওফাতের পর মুসলমানরা যদিও খেলাফত এবং উম্মতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়টিতে দু’টি দলে বিভক্ত হয়েছেন এবং প্রত্যেকেই নিজেদের দাবির সপক্ষে যুক্তি পেশ করেছেন এবং এসব বিষয়ে মতানৈক্য রয়েছে, তারপরও আহলে বাইত (আ.) যে ধর্মীয় জ্ঞানের নির্ভুল উৎস সে বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা উচিত নয়। কেননা, সবাই ‘হাদিসে সাকালাইন’ সহিহ হওয়ার পক্ষে ঐকমত্য পোষণ করেন। আর এই হাদিসে তিনি (স.) পবিত্র কোরআন ও আহলে বাইত (আ.)-কে আকাঈদ ও আহকামের বিষয়ে মারজা বা একমাত্র ফয়সালাকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদি উম্মতে মুহাম্মাদি (স.) এই হাদিসটির উপর আমল করে তাহলে তাদের মতানৈক্য কমে আসবে এবং তাদের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

২। পবিত্র কোরআন যেহেতু মহান আল্লাহরই বাণী, তাই এ মহাগ্রন্থ সব ধরনের ভুল-ত্রুটি হতে মুক্ত; সুতরাং কিভাবে তার মাঝে ভুল-ত্রুটির সম্ভাবনা থাকবে যখন স্বয়ং মহান আল্লাহই এই মহাগ্রন্থ সম্পর্কে বলেন:

لَّا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ، تَنزِيلٌ مِّنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ

‘তাতে তার আগে ও পিছে কোনো দিক থেকেই বাতিল বা মিথ্যা প্রবেশ করতে পারে না। তা তো প্রজ্ঞাময় ও প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে। (সূরা ফুসসিলাত: ৪২)

যদি পবিত্র কোরআন সব ধরনের ভুল ও বাতিল হতে মুক্ত হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে এর সমকক্ষও সব ভুল-ত্রুটি থেকে মুক্ত। কেননা, নিষ্পাপ নয় এমন ব্যক্তি অর্থাৎ কোনো গুনাহগার ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা পবিত্র কোরআনের জুটি হতে পারে না।

হাদিসে সাকালাইন ও এই আয়াত আহলে বাইতের সদস্যগণের সব ধরনের ভুল-ত্রুটি হতে মুক্ত হওয়ার সাক্ষীস্বরূপ। অবশ্য মনে রাখতে হবে যে, নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ নবি হওয়া নয় বা নিষ্পাপ হওয়ার জন্য নবি হওয়া জরুরি নয়। কেননা, এমন হতে পারে যে, কোনো এক ব্যক্তি নিষ্পাপ বা গুনাহ হতে মুক্ত, কিন্তু নবি নন।

যেমন- হযরত মারইয়াম (আ.) নিম্নোক্ত আয়াতের ভিত্তিতে গুনাহ হতে মুক্ত, কিন্তু নবি নন:

وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَمَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَى نِسَاءِ الْعَالَمِينَ

‘…আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন এবং তোমাকে পবিত্র করেছেন। আর তোমাকে বিশ্বের নারীদের উপর মনোনীত করেছেন। (সূরা আল ইমরান: ৪২)