Press "Enter" to skip to content

আবু তালিব কি ঈমানদার অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন?

উত্তর: হযরত আবু তালিব ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের সন্তান, আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর পিতা এবং রাসূলুল্লাহ (স.)-এর চাচা। শিয়াদের দৃষ্টিতে তিনি রাসূলের রেসালাতে বিশ্বাসী ছিলেন এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগের বিভিন্ন সমস্যার মুখে ও বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে রাসূলের একনিষ্ঠ সাহায্যকারী ও পূর্ণ আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন।

আবু তালিবের পরিবার

তিনি এমন এক পরিবারে জন্মলাভ করেন যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন স্বয়ং রাসূল (স.)-এর পিতামহ ও হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর দ্বীনের অনুসারীদের বীর নেতা হযরত আবদুল মুত্তালিব (আ.)। আরব উপদ্বীপের ইতিহাস অনুসন্ধান করলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আব্দুল মুত্তালিব নিজের জীবনের কঠিনতম সংকট ও বিপদের সময়ও আল্লাহর উপাসনা ত্যাগ করেননি এবং তাওহিদি দ্বীনের সহায়তা করতে কুণ্ঠা বোধ করেননি। আবরাহার বিশাল হস্তি বাহিনী কা’বা গৃহ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় পথে আবদুল মুত্তালিবের কিছু উট তারা ধরে নিয়ে যায়। অতঃপর আবদুল মুত্তালিব উটগুলো ফিরিয়ে নিতে তার কাছে গেলে আবরাহা আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করল: ‘উট ফেরত না চেয়ে কেন আমার বাহিনীকে ফেরত নিতে ও কা’বা ঘর ধ্বংস না করার আবেদন জানালে না?’

তখন আবদুল মুত্তালিব (আ.) আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান ও তাঁর উপর ভরসা করে বললেন:

أنا ربّ الإبل و للبيت رب يمنعه [ يحميه ]».

‘আমি হলাম এই উটগুলোর মালিক আর এই কা’বা ঘরেরও প্রভু রয়েছেন, তিনি সেটা রক্ষা করবেন। (কামেলে ইবনে আসির (মিসর), ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬১, প্রকাশকাল ১৩৪৮)

অতঃপর তিনি মক্কার দিকে রওনা হলেন এবং কা’বা ঘরের কাছে এসে কা’বার দরজার কড়া ধরে বলেছিলেন:

يا رب منع منهم حماكا

يا رب لا أرجولهم سواكا

أمنعهم أن يخربوافناكا

ان عدو البيت من عداكا

‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি ছাড়া আমি কারো উপর ভরসা করি না। হে আমার প্রভু! (সকলের জন্য নির্ধারিত) নিজের এই নিরাপদ আশ্রয়স্থলকে রক্ষা কর। এই ঘরের শত্রুরা তোমার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তাদেরকে তোমার ঘর ধ্বংস করা হতে বিরত রাখ।

এই কথাগুলো হযরত আবদুল মুত্তালিবের আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হওয়ার স্পষ্ট দলিল। ইয়াকুবি নিজ ‘ইতিহাস’ গ্রন্থে আবদুল মুত্তালিব (আ.) সম্পর্কে লিখেছেন:

رفض عبادة الأصنام و وحد الله عز وجل».

‘আবদুল মুত্তালিব মূর্তিপূজা থেকে দূরে ছিলেন এবং মহিমান্বিত ও গৌরবময় এক আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করতেন না। (তারিখে ইয়াকুবি (নাজাফ), ২য় খণ্ড, পৃ. ৭)

এখন আমরা দেখব যে, আবু তালিবের আল্লাহর ইবাদতকারী মু’মিন পিতা নিজ সন্তান সম্পর্কে কী বলেন:

আবদুল মুত্তালিবের দৃষ্টিতে আবু তালিব

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের দলিল-প্রমাণের দিকে দৃষ্টি দিলে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, কোনো কোনো স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী ও ভবিষ্যদ্বক্তা আবদুল মুত্তালিবকে মহানবি (স.)-এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং তাঁর নবুওয়াত সম্পর্কে অবহিত করেছেন।

যখন সাইফ ইবনে যি ইয়াযান আবিসিনিয়ার শাসনভার গ্রহণ করেন তখন আবদুল মুত্তালিব এক প্রতিনিধি দলের প্রধান হয়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হন। বাদশাহ কিছু মনোজ্ঞ বা বাগ্মিতাপূর্ণ ভাষণের পর তাঁকে (আবদুল মুত্তালিবকে) সুসংবাদ দেন যে, তোমার বংশে এক সম্মানিত নবির আগমন ঘটবে। অতঃপর তিনি মহানবি (স.) এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন:

৩। বর্তমানে ইথিওপিয়া। অনুবাদক

اسمه محمد صلى الله عليه وآله وسلّم – يموت أبوه و أمه و يكفله جده و عمه».

‘তাঁর নাম হলো মুহাম্মাদ (স.)। (শৈশবেই) তাঁর বাবা-মা মৃত্যুবরণ করবেন এবং তাঁর দাদা ও চাচা তাঁর দেখাশুনার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। (সিরাতে হালাভি (মিসর), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩৬ ও ১৩৭; বৈরুত, পৃ. ১১৪ ও ১১৫)

অতঃপর তিনি এই পয়গম্বরের বৈশিষ্ট্যাবলির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন:

يعبد الرحمن و يدحض الشيطان و يخمد النيران و يكسر الأوثان قوله فصل و حكمه عدل و يأمر بالمعروف و يفعله وينهى عن المنكر و يبطله».

‘তিনি এক ও পরম করুণাময় আল্লাহর উপাসনা করবেন এবং শয়তানকে বর্জন করবেন। (অগ্নিপূজারিদের) আগুনকে নিভিয়ে দেবেন এবং মূর্তিগুলোকে ভেঙে ফেলবেন। তাঁর কথা হবে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী মানদণ্ড। তাঁর নির্দেশ হবে ন্যায়ভিত্তিক। তিনি মানুষকে সৎকাজের আহ্বান জানাবেন এবং নিজেও সৎকর্ম করবেন। তাদেরকে মন্দ ও অশালীন কাজে লিপ্ত হতে নিষেধ করবেন এবং সেগুলোকে দূরীভূত করবেন।

অতঃপর আবদুল মুত্তালিবকে বলেন:

انک لجده یا عبد المطلب غير كذب».

‘নিঃসন্দেহে তুমিই তাঁর পিতামহ, হে আবদুল মুত্তালিব।

আবদুল মুত্তালিব এ সুসংবাদ শোনার পর শুকরানার সিজদা আদায় করে উক্ত অনাগত পবিত্র শিশু সম্পর্কে বললেন:

أنه كان لي ابن و كنت به معجبا و عليه رقيقا و إنى زوجته – كريمة من كرائم قومى آمنة بنت وهب بن عبد مناف ابن زهرة فجاءت بغلام فسميته محمد مات أبوه و امه و كفلته أنا و عمه [ يعنى عبد المطلب]».

‘আমার অতি প্রিয় এক সন্তান ছিল। এক মহিমান্বিত নারীর সঙ্গে তার বিয়ে দিলাম যার নাম আমেনা বিনতে ওয়াহহাব ইবনে আব্দে মানাফ ইবনে যোহরাহ। সেই নারী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে যার নাম রেখেছি মুহাম্মাদ। কিছুকাল পর

তার পিতা-মাতা ইন্তেকাল করলে আমি ও তার চাচা (আবু তালিব) তার দেখাশুনার দায়িত্ব নিই। (সিরাতে হালাভি (মিসর), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩৭)

এ আলোচনা হতে স্পষ্ট হয় যে, আবদুল মুত্তালিব ওই এতিম শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন আর এ কারণেই তিনি নিজের পর ওই শিশুর প্রতিপালনের দায়িত্ব নিজের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান আবু তালিবের হাতে অর্পণের উদ্যোগ নেন এবং অন্যদেরকে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেন।

এ দ্বারা বোঝা যায় যে, আবু তালিব নিজের একত্ববাদী ও মু’মিন পিতার দৃষ্টিতে ঈমানের ওই উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাই সন্তানদের মধ্য হতে কেবল তিনিই রাসূল (স.)-এর লালন-পালনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হলেন। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: সিরাতে হালাভি (মিসর), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩৪; সিরাতে ইবনে হিশাম (বৈরুত), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৮৯; আবু তালিব মু’মিন কোরাইশ (বৈরুত), পৃ. ১০৯ ও তাবাকাতুল কোবরা (বৈরুত), ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৭)

হযরত আবু তালিব (আ.)-এর ঈমানের দলিল-প্রমাণ

১। আবু তালিবের সাহিত্য-কর্ম ও ইল্মি রচনা

ইসলামি ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিসরা আবু তালিবের কিছু সুললিত ও প্রাঞ্জল কাসিদা (বিশেষ ধরনের কবিতা বা গীতি) বর্ণনা করেছেন। উচ্চ মানের ওই কবিতাগুলোর অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন পঙ্ক্তির অর্থ হতে আমরা তাঁর ঈমান আনার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি। তাঁর বহু কবিতার মধ্য হতে কেবল কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি:

لعيلم خيار الناس أن محمداً نبي كموسى و المسيح ابن مریم أتانا بهدي مثل ما أتيا به فكل بأمر الله يهدى و يعصم

‘সম্মানিত লোকদের জানা উচিত যে, মুহাম্মাদ (স.) হযরত মূসা ও ঈসা ইবনে মারইয়ামের মতোই একজন নবি। আর যে হেদায়েত বা মুক্তির দিশা তাঁদের কাছে ছিল তাঁর কাছেও তা রয়েছে। সুতরাং, সব নবিই আল্লাহর নির্দেশে মানুষকে হেদায়েত করেন এবং গুনাহ হতে বিরত রাখেন।’

৩। আল-হুজ্জাহ, পৃ. ৫৭, এর সাদৃশ্য দেখুন: মুস্তাদরাকে হাকেম (বৈরুত) ২য় খণ্ড, পৃ. ৬২৩।

رسولا كموسى خط في أول الكتب

ألم تعلموا أنا وجدنا محمداً

و لا حيف فيمن خصه الله بالحب

و أن عليه في العباد محبة

‘তোমরা কি জানো না যে, আমরা মুহাম্মাদ (স.)-কে মূসা (আ.)-এর মতো একজন নবি হিসেবে পেয়েছি যার বর্ণনা আসমানি গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছে? লোকেরা তাঁকে ভালোবাসে, আর মহান আল্লাহ যাঁর ভালোবাসা মানুষের অন্তরে দিয়েছেন তাঁর প্রতি অন্যায় করা সমীচীন নয়। (তারিখে ইবনে কাসির, ১ম খণ্ড, পৃ ১৪২; শারহে নাহজিল বালাগাহ, ইবনে আবিল হাদীদ, ১৪ তম খণ্ড, পৃ. ৭২)

فأكرم خلق الله في الناس أحمد

لقد أكرم النبي محمداً

فذوا العرش محمود و هذا محمداً

وشق له من اسمه ليجله

‘মহান আল্লাহ নিজ নবি মুহাম্মাদকে সম্মানিত করেছেন। অতএব, সর্বোত্তম সৃষ্টি হলেন আহমাদ। মহান আল্লাহ পয়গম্বরকে সম্মানিত করতে তাঁর নামকে নিজের নামের শব্দমূল থেকেই নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং, আরশ অধিপতি হলেন ‘মাহমুদ’ (প্রশংসিত) এবং তাঁর নবি হলেন আহমাদ (অধিক প্রশংসাকারী)। (শারহে নাহজিল বালাগাহ, ইবনে আবিল হাদীদ, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ৭৮; তারিখে ইবনে আসাকির, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭৫; তারিখে ইবনে কাসীর, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬৬; তারিখুল খামীস, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৪)

حتى أوسد في التراب دفينا

و ابشر بذلک و قرمنک عیونا

و لقد دعوت و كنت ثم أمينا

من خير أديان البرية دينا,

والله لين يضلوا إليك بجمعهم

فاصدع بأمرك ما عليك غضاضة

و دعوتنی و علمت أنك ناصحی

و لقد علمت بأن دين محمد (ص)

‘হে আল্লাহর রাসূল (স.), আমি মাটির বিছানায় না ঘুমানো পর্যন্ত (মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত) শত্রুর হাত কখনই তোমার পর্যন্ত পৌঁছবে না। অতএব, ভয় পেয়ো না, যেসব বিষয়ের জন্য তুমি নির্দেশিত হয়েছ সেগুলো (নির্ভিকচিত্তে) প্রকাশ কর ও সুসংবাদ দাও এবং চোখগুলোকে নূরান্বিত কর। তুমি আমাকে আল্লাহর দ্বীনের

প্রতি আহ্বান জানিয়েছ আর আমি এটাও জানি যে, তুমি আমার মঙ্গল কামনা কর এবং নিজের দাওয়াতের ক্ষেত্রে দৃঢ় ও সৎ। আমি স্পষ্টভাবে জানতাম যে, মুহাম্মাদের দ্বীন দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বীন।(খাযানাতুল আদাব বাগদাদী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬১; তারিখে ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪২, শারহে নাহজিল বালাগাহ, ইবনে আবিল হাদীদ, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ৫৫; ফাতহুল বারি, ৭ম খণ্ড, পৃ. ১৫৩-১৫৫; আল-ইসাবাহ (মিসর), ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১১৬, প্রকাশকাল, ১৩৫৮ হিজরি; দিওয়ানে আবু তালিব, পৃ. ১২)

أني على دين النبي أحمد

يا شاهد الله علي فاشهد

من ضل في الدين فإنّي مهتدى

‘হে আমার উপর আল্লাহর সাক্ষী, তুমি সাক্ষ্য দিও, আমি নবি আহমাদ (স.)-এর দ্বীনের প্রতি ঈমান আনলাম, যে ব্যক্তিই পথভ্রষ্ট হোক না কেন, আমি হেদায়েত পেয়ে গেলাম। (শারহে নাহজিল বালাগাহ, ইবনে আবিল হাদীদ, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ৭৮; দিওয়ানে আবু তালিব, পৃ. ৭৫)

আবু তালিব নিজের জীবনের শেষ দিগুলোতে রাসূল (স.)-এর সাহায্যার্থে কোরাইশ গোত্রপতিদের উদ্দেশে নিম্নোক্ত কবিতাটি রচনা করেন:

اوصى بنصر نبي الخير أربعة إبني علياً و شيخ القوم عباس و حمزة الأسد الحامى حقيقته و جعفراً أن تذودوا دونه الناسا كونوا فداء لكم امتى و ما ولدت في نصر احمد دون الناس أتراسا

‘চারজনকে কল্যাণের নবি (স.)-এর সহযোগিতা করার তাগিদ দিচ্ছি: আমার পুত্র আলী, আমাদের গোত্রের প্রধান আব্বাস, খোদার সিংহ হামযাহ- যে তার সত্য (ঈমানকে) রক্ষা করছে এবং আমার আরেক পুত্র জাফারকে যাতে তার সাথি ও সহযোগী হতে পারে। তোমরা-আমার মা ও তাঁর সন্তানরা তোমাদের জন্য উৎসর্গ হোক-সদা রাসূল (স.)-এর পক্ষে শত্রুর বিরুদ্ধে ঢালের ন্যায় থেক।

প্রত্যেক ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিই এসব সুললিত ও প্রাঞ্জল কবিতা-যার প্রত্যেকটিই এক আল্লাহ ও রাসূল (স.)-এর রেসালাতের প্রতি হযরত আবু তালিবের ঈমান ও গভীর শ্রদ্ধার প্রমাণস্বরূপ-অধ্যয়নের পর তাঁর (আবু তালিবের) সত্যিকারের ঈমানের বিষয়ে শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গির সত্যতা অনুধাবন করতে পারবেন। এর পাশাপাশি যেসব অপবাদ কিছু কিছু লেখক রাজনৈতিক অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে কোরাইশের খাঁটি মু’মিন, আল্লাহর রাসূল (স.)-এর চাচা ও ইসলামের প্রাথমিক যুগের কঠিন সংকটকালীন সময়ে এ ধর্মের রক্ষকের উপর আরোপ করেছেন সে জন্য মর্মপীড়া অনুভব করবেন।

২। রাসূল (স.)-এর সঙ্গে আবু তালিবের আচরণই তাঁর মজবুত ঈমানের অন্যতম দলিল

সব প্রসিদ্ধ মুসলিম ঐতিহাসিক রাসূল (স.)-এর সুরক্ষায় হযরত আবু তালিবের নজিরবিহীন আত্মত্যাগ ও কোরবানিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। আর এটাই তাঁর দৃঢ় ঈমানের একটি স্পষ্ট দলিল।

আবু তালিব ইসলামের সাহায্যে ও রাসূল (স.)-এর সুরক্ষায় নিজের জীবনের তিনটি বছর উদ্বাস্তুর ন্যায় রাসূলের পাশে শি’বে আবু তালিব-এ অবস্থান করাকে কোরাইশদের নেতৃত্ব দেওয়ার উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং মুসলমানদের উপর আরোপিত উক্ত অর্থনৈতিক (ও সামাজিক) বয়কটের শেষ দিন পর্যন্ত অসহনীয় কষ্ট সহ্য করেও তাদের পাশে অবস্থান করেন।১

এ ছাড়াও হযরত আবু তালিব নিজ পুত্র আলী (আ.)-এর প্রতি রাসূল (স.)-কে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার নির্দেশ দেন এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগের সব কঠিন সংকটে তাঁকে তাঁর পাশে অবস্থান করতে বলেন।

(মো’তাযেলি মতবাদে বিশ্বাসী) সুন্নি মনীষী ইবনে আবিল হাদীদ মো’তাযেলি ‘নাহজুল বালাগাহ’র ব্যাখ্যায় হযরত আবু তালিব (আ.) হতে বর্ণনা করেন যে,

১। বিস্তারিত জানতে দেখুন: (ক) সিরাতে হালাভি (মিসর), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩৪; (খ) তারিখুল খামিস (বৈরুত), ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৩-২৫৪; (গ) সিরাতে ইবনে হিশাম (বৈরুত), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৮৯; (ঘ) শারহে নাহজিল বালাগাহ, ইবনে আবিল হাদীদ, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ৫২; (ঙ) তারিখে ইয়াকুবি (নাজাফ), ২য় খণ্ড; (চ) আল-ইসাবাহ (মিসর), ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১১৫; (ছ) তাবাকাতে কোবরা (বৈরুত), ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৯, প্রকাশকাল, ১৩৮০ হিজরি।

তিনি নিজ পুত্র আলী (আ.)-কে বলেন: ‘আল্লাহর রাসূল (স.) তোমাকে সত্য ছাড়া অন্য কিছুর দিকে আহ্বান জানাননি। অতএব, তুমি সর্বদা তাঁর সঙ্গে থেক। (শারহে নাহজিল বালাগাহ, ইবনে আবিল হাদীদ, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ৫৩)

এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহর রাসূল (স.)-কে রক্ষা এবং ইসলামের পবিত্র অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হযরত আবু তালিবের এমন যথাযোগ্য খেদমত, আন্তরিক ত্যাগ এবং কষ্ট স্বীকার তাঁর ঈমানের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ।

এ কারণেই মুসলিম মনীষী ইবনে আবিল হাদীদ রাসূল (স.)-এর রক্ষণাবেক্ষণ ও তাঁর পবিত্র ধর্মের রক্ষায় হযরত আবু তালিবের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন:

لما مثل الدين شخصاً فقاما

ولو لا ابو طالب و ابنه

و هذا بيثرب جس الحماما

فذاك بمكة أوى و حامي

جهول لغى أو بصير تعامى

و ما ضر مجد ابي طالب

‘যদি আবু তালিব ও তাঁর সন্তান না থাকতেন, তবে কখনই দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতো না।

তিনি মক্কায় আল্লাহর রাসূলকে আশ্রয় দিয়েছিলেন ও সাহায্য করেছিলেন এবং তাঁর পুত্র মদিনাতে রাসূল (স.)-এর সাহায্যার্থে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।

কেউই আবু তালিবের সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না। না অর্থহীন কথা বলতে অভ্যস্ত মূর্খরা, আর না ওই জ্ঞান-পাপী ব্যক্তিরা যারা সত্যকে দেখেও তা স্বীকার করে না।’

৩। আবু তালিবের ওসিয়ত তাঁর ঈমানের সপক্ষে অপর এক দলিল

প্রখ্যাত ইসলামি ঐতিহাসিকরা, যেমন: হালাভি শাফেয়ি নিজ ‘সিরাহ’তে, মুহাম্মাদ দিয়ার বাকরি ‘তারিখুল খামীস’ গ্রন্থে আবু তালিবের শেষ ওসিয়ত বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজ গোত্রকে রাসূল (স.)-এর সাহায্যের জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন:

یا معشر قريش كونوا له ولاة و لحزبه حماة، والله لا يسلك أحد منكم سبيله إلا رشد و لا يأخذ أحد يهديه إلا سعد، ولو كان لنفسى مدة و لأجلي تأخر لكففت عنه الهزائر و لدفعت عنه الدواهي. ثم هلك».

‘হে আমার আত্মীয়-স্বজনরা। মুহাম্মাদকে ভালোবাস, তাঁকে অনুসরণ কর এবং তাঁর দলকে (ইসলাম) সাহায্য কর। আল্লাহর কসম যে-ই তার হেদায়েতের নূরের অনুসরণ করবে সে সফলকাম হবে। যদি আমি আরো বেশি দিন বেঁচে থাকতাম এবং মৃত্যু আমাকে সময় দিত, তবে নিঃসন্দেহে আমি তাঁর সব কষ্ট ও বাধা দূর করে দিতাম।’ এই বলেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।(তারিখুল খামীস (বৈরুত), ১ম খণ্ড, পৃ. ৩০০ ৩০১)

৪। আবু তালিবের প্রতি রাসূল (স.)-এর ভালোবাসা তাঁর ঈমানেরই সাক্ষ্যস্বরূপ

আল্লাহর রাসূল (স.) বিভিন্ন সময়ে ও অবস্থায় নিজ চাচার প্রশংসা করে তাঁর প্রতি সম্মান দেখাতেন এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতেন। সেই দৃষ্টান্তগুলোর মধ্য হতে শুধু দু’টির প্রতি ইশারা করছি:

ক. কোনো কোনো ঐতিহাসিক নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতটি বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মহানবি (স.) আকীল ইবনে আবি তালিবকে বলেন:

«إني أحبك حبين لقرابتك مني لما كنت أعلم من حب عمى إياك».

‘আমি তোমাকে দু’টি কারণে ভালোবাসি; (প্রথমত) আমার সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে এবং (দ্বিতীয়ত) আমি জানি যে, আমার চাচা (আবু তালিব) তোমাকে খুব ভালোবাসতেন। (তারিখুল খামীস (বৈরুত), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৬৩। আল-ইডিয়াব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫০৯)

খ. হালাভিও নিজ ‘সিরাহ’তে আল্লাহর রাসূল (স.) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর প্রিয় চাচা সম্পর্কে বলেন:

ما نالت قريش مني شيئا أكرهه أى اشدّ الكراهة حتى مات أبو طالب».

‘যতদিন আবু তালিব জীবিত ছিলেন কোরাইশের কাফেররা ততদিন আমার কোনো মারাত্মক ক্ষতি সাধন করতে পারেনি।’

এটা স্পষ্ট যে, হযরত আবু তালিবের প্রতি মহানবি (স.)-এর ভালোবাসা এবং তাঁর সুউচ্চ ব্যক্তিত্বের প্রতি মহানবির গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন হযরত আবু তালিবের ঈমানেরই প্রমাণস্বরূপ। কেননা, আল্লাহর রাসূল (স.) কোরআন ও হাদিসের সাক্ষ্য অনুযায়ী কেবল মু’মিনদেরকেই ভালোবাসেন এবং কাফের ও মুশরিকদের ব্যাপারে কঠোর। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হচ্ছে:

مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ….

‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সহচররা কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল…।(সূরা ফাত্হ: ২৯)

অন্য এক স্থানে বলা হচ্ছে:

لَّا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، وَلَوْ كَانُوا ءَابَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُوْلَبِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ .

‘যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন…।(সূরা মুজাদালাহ: ২২)

উক্ত আয়াতগুলোর আলোকে এবং আবু তালিবের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স.)-এর গভীর ভালোবাসাসহ বিভিন্ন সময়ে চাচার প্রতি তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী প্রশংসা বা সম্মান প্রদর্শনের আলোকে বলা যায়, মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স.)-এর উপর আবু তালিব (আ.)-এর ঈমান আনার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে সত্য।

৫। রাসূল (স.)-এর সাহাবিদের সাক্ষ্য

রাসূল (স.)-এর সাহাবিদের একটি দল আবু তালিবের দৃঢ় ঈমানের সত্যতার বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন- যার কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা হলো:

ক. একদিন এক অজ্ঞ ব্যক্তি আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর সামনে আবু তালিবের উপর মিথ্যা আরোপ করল। তখন আলী (আ.)-এর চেহারায় ক্রোধ ফুটে ওঠে এবং তিনি বলেন:

دمه، فض الله فاك، والذي بعث محمداً بالحق نبياً لو شفع أبي في كل مذنب على وجه الارض لشفعه الله».

‘চুপ কর! আল্লাহ তোমার মুখ ভেঙে দিন। কসম ঐ আল্লাহর, যিনি হযরত মুহাম্মাদ (স.)-কে নবি হিসেবে মনোনীত করেছেন, যদি আমার পিতা (আবু তালিব) চান সব পাপীর শাফায়াত করতে তবে আল্লাহ পাক তাঁকে শাফায়াতকারী হিসেবে মনোনীত করবেন (তাঁর শাফায়াত ও সুপারিশ গ্রহণ করবেন)। (আল-হুজ্জাহ, ২৪)

অপর এক স্থানে বর্ণিত হয়েছে: كأن والله ابو طالب عبد مناف بن عبد المطلب مؤمناً مسلماً يكتم إيمانه مخافة على بني هاشم أن تنابذها قريش».

‘আল্লাহর কসম! আবু তালিব, আব্দে মানাফ ইবনে আবদুল মুত্তালিব খাঁটি মু’মিন ও মুসলমান ছিলেন। তিনি নিজের ঈমানকে কোরাইশদের সম্মুখে গোপন করতেন যাতে কোরাইশরা হাশিম গোত্রের সঙ্গে শত্রুতা না করে। (আল-হুজ্জাহ, ২৪)

হযরত আলীর এমন কথা শুধু আবু তালিবের ঈমানের সত্যতারই প্রমাণ বহন করে না; বরং তাঁকে আল্লাহর অলিদের অন্তর্ভুক্ত করে, যাঁরা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে অন্যদের শাফায়াত করতে সক্ষম হবেন।

খ. আবু যার গিফারি আবু তালিবের ঈমান সম্পর্কে বলেন:

والله الذي لا إله إلا هو ما مات ابو طالب رضى الله عنه حتى أسلم».

‘ওই প্রভুর কসম, যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, আবু তালিব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করা ব্যতীত ইন্তেকাল করেননি (অর্থাৎ তিনি ঈমান নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছিলেন)। (শারহে নাহজিল বালাগাহ, ইবনে আবিল হাদীদ, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ৭১)

গ. আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও আবু বকর ইবনে আবি কুহাফা হতে বহু সনদের মাধ্যমে নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতটি বর্ণিত হয়েছে,

إن أبا طالب ما مات حتى قال: لا إله إلا الله محمد رسول الله».

“আবু তালিব ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বলা ছাড়া ইন্তেকাল করেননি। (আল-গাদির (বৈরুত), ৭ম খণ্ড, পৃ. ৩৯৮, তাফসীরে ওয়াকি’র উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, প্রকাশকাল ১৩৭৮ হিজরি)

৬। আহলে বাইত (আ.)-এর দৃষ্টিতে আবু তালিব

আহলে বাইতের সব ইমামই আবু তালিবের দৃঢ় ঈমানের বিষয়টি যে সত্য তা জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে ও উপলক্ষ্যে রাসূল (স.)-এর এই আত্মোৎসর্গী সাথির পক্ষে কথা বলেছেন। এর দৃষ্টান্ত অসংখ্য; সেগুলোর মধ্য থেকে কেবল দু’টির প্রতি এখানে ইশারা করা হলো:

ক. ইমাম বাকির (আ.) বলেন:

لو وضع ايمان أبي طالب في كفه ميزان و ايمان هذا الخلق في الكفة الأخرى لرجحایمانه».

‘যদি আবু তালিবের ঈমান একটি পাল্লায় রাখা হয় এবং সমস্ত সৃষ্টির ঈমান অপর একটি পাল্লায়, তবে আবু তালিবের ঈমানের পাল্লাই ভারী হবে। (শারহে নাহজিল বালাগাহ, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ৬৭; আল-হুজ্জাহ, পৃ. ১৮)

খ. ইমাম সাদিক (আ.) আল্লাহর রাসূল (স.) হতে বর্ণনা করেন যে,

إن أصحاب الكهف أسروا الإيمان وأظهرو الكفر فأتاهم الله أجرهم مرتين، و إن أبا طالب أسر الإيمان و اظهر الشرك فآتاه الله أجره مرتين».

‘আসহাবে কাহাফ (কিছু কল্যাণকর বিষয়ের জন্য) নিজেদের ঈমান গোপন করে কুফর প্রকাশ করতেন’। এই কারণে মহান আল্লাহ তাদেরকে দু’বার পুরস্কৃত করেন। আবু তালিবও নিজের ইসলামকে গোপন করেছিলেন (কোনো কল্যাণকর

৩। এই অর্থে যে, তাঁদের অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল, কিন্তু লোক দেখানোর জন্য তাঁরা কুফরকে প্রকাশ করতেন যাতে মানুষের অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকতে পারেন।- অনুবাদক

বিষয়ের জন্য) এবং শির্ক প্রকাশ করেছিলেন’। তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁকেও দু’বার পুরস্কৃত করেন।

যেসব দলিল পাঠকদের জ্ঞাতার্থে পেশ করা হলো তা হতে প্রমাণিত হয় যে, আবু তালিব নিম্নোক্ত মর্যাদার অধিকারী ছিলেন:

(১) মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স.)-এর প্রতি দৃঢ় ঈমানের অধিকারী।

(২) আল্লাহর রাসূলকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য ও তাঁকে রক্ষা এবং ইসলামের পথে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছেন।

(৩) তাঁর প্রতি রাসূল (স.)-এর অসাধারণ ভালোবাসা।

(৪) আল্লাহর কাছে শাফায়াতের মহান মর্যাদার অধিকারী।

আর এভাবে আবু তালিবের উপর আরোপিত অন্যায় অপবাদ দানকারীদের কথার ভিত্তিহীনতা প্রমাণিত হয়।

উক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দু’টি সত্য বিষয় আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। আর তা হলো:

(১) আল্লাহর রাসূল (স.), তাঁর সাহাবিবর্গ এবং আমিরুল মু’মিনীন ও আহলে বাইতের দৃষ্টিতে আবু তালিব ঈমানদার ছিলেন।

(২) যেসব অন্যায় ও অবৈধ অপবাদ আবু তালিবের উপর আরোপ করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। শুধু রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বনু উমাইয়্যা ও বনু আব্বাসের কিছু শাসকের উস্কানিতে এসব অপবাদ প্রচার করা হয়েছে। বনু উমাইয়‍্যা ও বনু আব্বাসের শাসকরা সর্বদা আহলে বাইত (আ.) এবং আবু তালিবের সন্তানদের সঙ্গে শত্রুতা করেছে।

এ পর্যায়ে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি মনে করছি, আর তা হলো: রাসূল (স.)-এর একনিষ্ঠ সাথি আবু তালিব (রা.)-এর ব্যক্তিত্ব খর্ব করার যে অপচেষ্টা শত্রুরা করেছিল সেটা হাদিসে ‘দ্বাহদ্বাহ’ নামে পরিচিত। আর তাই এই হাদিসটি

১। এই অর্থে যে, আবু তালিব মক্কার মুশরিকদের অনিষ্ট হতে রাসূলকে রক্ষায় তাদের সম্মুখে নিজের ঈমান প্রকাশ করতেন না। অনুবাদক

২। শারহে নাহজিল বালাগাহ, ইবনে আবিল হাদীদ, ১৪তম খণ্ড, পৃ. ৭০; আল-হুজ্জাহ, পৃ. ১৭ও ১১৫।

পর্যালোচনা করব এবং কোরআনের পবিত্র আয়াত ও রাসূল (স.)-এর তর্কাতীত সুন্নাত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলাদির মাধ্যমে উক্ত হাদিসের ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করব।

‘হাদিসে দ্বাহদ্বাহ’র পর্যালোচনা

কিছু কিছু লেখক, যেমন: বুখারি ও মুসলিম তাঁদের গ্রন্থে সুফিয়ান ইবনে সাঈদ সাওরি, আবদুল মালিক ইবনে উমাইর, আবদুল আযিয ইবনে মুহাম্মাদ দুরাওয়ারদি এবং লাইস ইবনে সাঈদ হতে নিম্নোক্ত দু’টি কথা রাসূল (স.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন; (দ্বাহদ্বাহ, এমন একটি গর্তকে বোঝায় যার গভীরতা একজন মানুষের দৈর্ঘ্যের চেয়ে কম। ২। সহিহ বুখারি (মিসর), ৫ম খণ্ড, আবওয়াবে মানাকেব, বাবে কিসসায়ে আবু তালিব, পৃ. ৫২; ৮ম খণ্ড, কিতাবুল আদাব, বাবে কুনিয়াতুল মুশরিক, পৃ. ৪৬)

الف: «وجدته في غمرات من النار فأخرجته إلى ضحضاح».

ক. “তাঁকে (আবু তালিবকে) আগুনের মধ্যে পেলাম। অতঃপর তাঁকে ‘দ্বাহদ্বাহ’তে’ স্থানান্তরিত করলাম। (আমার খাতিরেই তাঁকে আগুনের অগভীর অংশে আনা হয়েছে, তা না হলে তাঁকে আগুনের সবচেয়ে গভীর অংশে রাখা হতো!)”

ب لعل تنفعه شفاعتي يوم القيامة فيجعل في ضحضاح من النار يبلغ كعبيه يغلي منه دماغه».

খ. ‘হয়তো বা কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত তাঁর (আবু তালিবের) কাজে আসবে। তাই তাঁকে জাহান্নামের আগুনের একটি অগভীর গর্তে রাখা হবে, যে আগুনের উচ্চতা তাঁর পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পৌঁছবে। কিন্তু এতেই তাঁর মগজ (টগবগ করে) ফুটতে থাকবে।’২

আবু তালিবের ঈমানের পক্ষে বহু সংখ্যক রেওয়ায়েত ও স্পষ্ট দলিলাদির মাধ্যমে (হাদিসে দ্বাহদ্বাহসহ) তাঁর উপর আরোপিত সকল অন্যায় অপবাদের ভিত্তিহীনতা প্রকাশ পায়। এতদসত্ত্বেও বিষয়টি অধিক স্পষ্ট করার লক্ষ্যে দু’টি দৃষ্টিকোণ থেকে ‘হাদিসে দ্বাহদ্বাহ’র পর্যালোচনা করব।

১। সনদগত ভিত্তিহীনতা।

২। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাতের সঙ্গে এই (মিথ্যা) হাদিসের বৈপরীত্য।

‘হাদিসে দ্বাহদ্বাহ’র সনদগত ভিত্তিহীনতা

যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, হাদিসে দ্বাহদ্বাহ-এর বর্ণনাকারীরা হলেন যথাক্রমে: সুফিয়ান ইবনে সাঈদ সাওরি, আবদুল মালিক ইবনে উমাইর, আবদুল আযিয ইবনে মুহাম্মাদ দেরাওয়ারদি এবং লাইস ইবনে সাঈদ।

এখন আহলে সুন্নাতের রিজালশাস্ত্রের’ পণ্ডিত ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টিকোণ থেকে-যাঁরা মুহাদ্দিসদের সম্পর্কে আলোচনা করে থাকেন-উক্ত রাবিদের অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা ও পর্যালোচনা করব।(রাবিদের জীবনী, তাঁদের পরিচয়, সৎ ও অসৎ, সত্যবাদী অথবা মিথ্যাবাদী হওয়া ইত্যাদি বিষয় যে শাস্ত্রে আলোচিত, তাকে ইল্মে রিজাল বলা হয়। অনুবাদক)

ক. সুফিয়ান ইবনে সাঈদ সাওরি

আহলে সুন্নাতের রিজালশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ মনীষী আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান যাহাবি উক্ত রাবি সম্পর্কে বলেন:

كان يدلس عن الضعفاء».

‘সুফিয়ান ইবনে সাওরি জাল হাদিসগুলোকে দুর্বল রাবি হতে বর্ণনা করতেন। (মিযানুল ই’তিদাল (বৈরুত), যাহাবি, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৬৯, প্রকাশকাল ১৩৮২ হিজরি)

উক্ত বাক্য হতে স্পষ্ট যে, সুফিয়ান সাওরির বর্ণনাগুলো প্রতারণামূলক। আর দুর্বল রাবি এবং অপরিচিত ব্যক্তি হতে হাদিস বর্ণনা করার কারণেই তাঁর বর্ণনা করা সব রেওয়ায়েতই মূল্যহীন।

খ. আবদুল মালিক ইবনে উমাইর

যাহাবি তাঁর সম্পর্কে বলেন:

طال عمره و ساء حفظه قال ابو حاتم ليس بحافظ، تغير حفظه. و قال أحمد: ضعيف يخلط، و قال بن معین که مخلط و قال ابن خراش كان شعبة لا يرضاه و ذكر لكوسج عن احمد انه ضعفه جداً».

‘অতি বৃদ্ধ হওয়াতে তার স্মৃতিশক্তি কমে গিয়েছিল।’

আবু হাতেম বলেন: স্মৃতি-বিভ্রাটের কারণে সে হাদিস সংরক্ষণের শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল এবং তার মুখস্থশক্তিও লোপ পেয়েছিল। আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন: আবদুল মালিক ইবনে উমাইর হলো দুর্বল (রাবিদের অন্যতম) এবং বহু ভুল করত (অর্থাৎ ভিত্তিহীন ও জাল রেওয়ায়েত বর্ণনা করত)। ইবনে মুঈন বলেন: সে সঠিক এবং ভুল হাদিসের মিশ্রণ ঘটাত। ইবনে খারাশ বলেন: শো’বাহও তার উপর সন্তুষ্ট ছিল না। কুসাজ, আহমাদ ইবনে হাম্বালের ব্যাপারে বর্ণনা করেন, তিনি (আহমাদ ইবনে হাম্বাল) আবদুল মালিক ইবনে উমাইরকে (রেওয়ায়েত বর্ণনায়) দুর্বল ও যায়িফ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। (মিযানুল ই’তিদাল (বৈরুত), ২য় খণ্ড, পৃ. ৬৬০)

উপরিউক্ত আলোচনা হতে স্পষ্ট হয় যে, আবদুল মালিক ইবনে উমাইর নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যাবলির অধিকারী:

(১) দুর্বল স্মৃতিশক্তি ও ভুলো মনের অধিকারী।

(২) দুর্বল (রিজালশাস্ত্রের দৃষ্টিতে) অর্থাৎ যে ব্যক্তির রেওয়ায়েতে বিশ্বাস স্থাপন করা যায় না।

(৩) (তার রেওয়ায়েত) ভুলে পরিপূর্ণ।

(৪) মিশ্রণকারী (যে ব্যক্তি সঠিক রেওয়ায়েতের সঙ্গে মিথ্যা রেওয়ায়েতের মিশ্রণ ঘটায়)।

এটা স্পষ্ট, আবদুল মালিক ইবনে উমাইর সম্পর্কে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রত্যেকটিই তার হাদিসগুলোর ভিত্তিহীনতা প্রমাণে যথেষ্ট। আর ঐ সব ত্রুটি সম্মিলিতভাবে তার মাঝে বিদ্যমান ছিল।

গ. আবদুল আযিয ইবনে মুহাম্মাদ দুরাওয়ারদি

রিজালশাস্ত্রে আহলে সুন্নাতের পণ্ডিতরা তাকে দুর্বল স্মৃতিশক্তি ও ভুলো মনের অধিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন, দুরাওয়ারদির স্মৃতিশক্তি এত দুর্বল যে, তার রেওয়ায়েতের উপর নির্ভর করা যায় না বা সেসবের সহায়তায় কোনো যুক্তি প্রদর্শন করা সম্ভব নয়।

আহমাদ ইবনে হাম্বাল দুরাওয়ারদি সম্পর্কে বলেন: إذا حدث من حفظه جاء ببواطيل».

‘যখনই সে তার স্মৃতিশক্তির সহায়তায় রেওয়ায়েত বর্ণনা করত তখন অসংলগ্ন বা অপ্রাসঙ্গিক এবং বাতিল বা ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলত।

আবু হাতেম তার সম্পর্কে বলেন:

لا يحتج به».

‘তার কথার উপর নির্ভর করা যায় না বা তার কথার সপক্ষে কোনোরূপ যুক্তি প্রদর্শন করা সম্ভব নয়।

আবু যারাআহ-ও তাকে سنيء الحفظ ‘দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী’ বলে উল্লেখ করেছেন।

ঘ. লাইস ইবনে সাঈদ

আহলে সুন্নাতের রিজালশাস্ত্রের গ্রন্থাবলি অধ্যয়নে এই বিষয়টি স্পষ্ট জানা যায় যে, ‘লাইস’ নামের সকল রাবিই অপরিচিত ও দুর্বল (যায়িফ) এবং তাদের হাদিসে আস্থা রাখা যায় না।”

আর লাইস ইবনে সাঈদও যায়িফ, বেপরোয়া ও অমনোযোগী রাবিদের (বর্ণনাকারী) একজন এবং হাদিস শোনার ক্ষেত্রে সে ছিল অসাবধান (অর্থাৎ কী শুনতে হবে এবং কী বর্ণনা করতে হবে সে বিষয়ে সে সুস্থির ছিল না)। আর যারা তার হতে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছে ত…

নাবাতি তাকে দুর্বল রাবিদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজ গ্রন্থ ‘আত্-তাযলীল আলাল কামেল’-এ তার (লাইস ইবনে সাঈদ) নাম উল্লেখ করেছেন। গ্রন্থটি তিনি শুধু দুর্বল রাবিদের পরিচয় তুলে ধরার জন্যই লিখেছেন। (শাইখুল আবতাহ, পৃ. ৭৫; মিযানুল ই’তিদাল, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪২৩)

এ পর্যন্ত যা কিছু বলা হয়েছে তা হতে স্পষ্ট হয় যে, হাদিসে দ্বাহদ্বাহ-এর প্রধান বা মূল রাবিরাই ছিল যায়িফ তথা দুর্বল। আর এ কারণেই তাদের হাদিসে বিশ্বাস করা যায় না।

হাদিসে দ্বাহদ্বাহ কোরআন ও সুন্নাতের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ

উল্লিখিত হাদিসটিকে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে এভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে যে, তিনি হযরত আবু তালিবকে দোযখের বৃহৎ অগ্নিকুণ্ড বা ব্যাপক আগুনের স্তর হতে বের করে কম আগুনের একটি গর্তে স্থানান্তরিত করলেন। আর এভাবে তাঁর আযাবে হ্রাস ঘটানো হলো। অথবা কিয়ামতের দিন তাঁকে শাফায়াত করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। অথচ কোরআন ও রাসূলের সুন্নাত একমাত্র মু’মিন ও মুসলমানদের জন্যই শাস্তি হ্রাস ও শাফায়াতের বিষয়টিকে সমর্থন করে। অতএব, যদি আবু তালিব কাফের হয়ে থাকেন তবে আল্লাহর রাসূল (স.) কখনই তাঁর আযাব কমাতে অথবা তাঁকে শাফায়াত করতে সক্ষম নন।

এভাবেই ‘হাদিসে দ্বাহদ্বাহ’-এর বক্তব্য বা বিষয়বস্তুর ভিত্তিহীনতা এবং যারাই আবু তালিবকে কাফের জ্ঞান করে তাদের দাবির অসারতা প্রমাণিত হয়।

এ পর্যায়ে কোরআন ও রাসূল (স.)-এর হাদিসের আলোকে উল্লিখিত বিষয়ের উপর আরো কিছু সুস্পষ্ট দলিল পেশ করব:

ক. এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হচ্ছে:

وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُم مِّنْ عَذَابِهَا كَذَلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ

‘আর যারা কাফের হয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদেরকে মৃত্যুর আদেশও দেওয়া হবে না যে, তারা মরে যাবে এবং তাদের থেকে তার

শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমি প্রত্যেক কাফেরকে (অকৃতজ্ঞকে) এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকি।”

খ. রাসূল (স.)-এর সুন্নাতও কাফেরদের শাফায়াতের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে। আবু যার গিফারি আল্লাহর রাসূল (স.) হতে বর্ণনা করেন:

أُعطيت الشفاعة و هي نائلة من أمتى من لا يشرك بالله شيئاً».

‘আমার উম্মতের মধ্যে সেই ব্যক্তি আমার শাফায়াত পাবে যে আল্লাহকে কোনো কিছুর সঙ্গে শরিক করেনি। (সূরা ফাতির: ৩৬)

অতএব, আবু তালিবকে কাফের হিসেবে তুলে ধরা সংক্রান্ত ‘হাদিসে দ্বাহদ্বাহ’ ভিত্তিহীন এবং কথিত এ হাদিস আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (স.)-এর সুন্নাতের বিপরীত।

উপসংহার

আলোচ্য বিষয়ের আলোকে স্পষ্ট হয় যে, ‘হাদিসে দ্বাহদ্বাহ’ সনদ ও বিষয়বস্তু উভয় দিক থেকেই মূল্যহীন এবং এর সপক্ষে কোনোরূপ যুক্তি প্রদর্শন করাও সম্ভব নয়।

এভাবেই সবচেয়ে দৃঢ় ও শক্তিশালী যে দুর্গের আশ্রয় নিয়ে আবু তালিবের দৃঢ় ঈমানকে ত্রুটিপূর্ণ বা সন্দেহযুক্ত বলে দেখানোর চেষ্টা করা হয় তা ধসে পড়ে এবং ওই কোরাইশ মু’মিন ও রাসূল (স.)-এর পুরনো ও অবিচল বন্ধুর নূরানি ব্যক্তিত্বের দ্যুতি চিরকালই প্রজ্জোল হয়ে থাকবে।