ইসলাম ধর্মের নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ধর্মীয় উত্তরাধীকার হিসাবে তাঁর অনুসারীদের জন্য দু’টো মূল্যবান সম্পদ রেখে গিয়েছেন। তা হলো, আল-কোরআন ও তাঁর আহলে বাইত। তাঁদেরকে দৃঢ়ভাবে অনুসরন করার এবং তাদের থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন না হওয়ার জন্য তিনি লোকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন । (মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল, ৩/৪, ১৭২৯২৬ এবং ৫/১৮২, এবং সহীহ (মুহাম্মাদ ইবনে ঈসা) তিরমিজীর “মানাকিব” অধ্যায়)
মহানবী (সাঃ) তাঁর জীবদ্দশায় জনগনের কাছে কোরাআনী বিধানের সকল সত্য ব্যাখ্যা করেছেন, এবং ইসলামী শিক্ষার মৌলবিশ্বাস, তাত্বিক জ্ঞান ও মতবাদ সংক্রান্ত সকল বিষয় হাদিসের আকারে তাঁর অনুসারীদের মাঝে উপস্থাপন করেছেন। হাদিস প্রচার সম্পর্কে তিনি বলেছেনঃ “আল্লাহ ঐ ব্যাক্তির প্রতি রহমত নাজিল করুন যে আমার নিকট থেকে মনোযোগের সাথে হাদিস শ্রবন করবে, তা বিশদ্ভাবে গ্রহণ করবে এবং যিনি শুনেন নি ঐ ব্যক্তির নিকট পৌছে দেবে। জনসমষ্টির এরকম ১টি বড় অংশ থাকবে যারা তাদের চেয়ে জ্ঞানী এবং অধিকতর বিজ্ঞ লোকের নিকট হাদিসের বানী পৌছে দেবে” (সহি(মুঃ বিন ঈসা) তিরমিজির ১/১২৫ এবং খন্ড ১/১৪, অধ্যায়ঃ “ফজল আল ইলম” “তাবলিগ আল-হাদিসা’ন রাসুলুল্লাহ”মুঃ বাকির মাজলিসির বিহারুল আনোয়ার, ১/১০৯/১১২)
এখন আমরা দেখবো, ইসলামী রাষ্ট্রের শাসকবর্গ পবিত্র কোরআন ও নবীর আহলে বাইতের প্রতি কি আচরন করেছিল এবং কিভাবে হাদিস সংক্রান্ত নির্দেশ তারা প্রতিপালন করেছিল।
এইসব লোকেরা রাসূলের (সাঃ) আহলে বাইতের (আঃ) সদস্যবর্গকে সাধারন সমাজ থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং তাঁদেরকে নির্জনে বসবাসে বাধ্য করেছিল। তাঁদেরকে (আহলে বাইতের সদস্যবর্গকে) তারা অবর্ননী উৎপীড়নের সম্মুখীন করেছিল [ঐ সময় বিরাজিত পরিস্তিতি সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) এর মহান সাহাবী সালমান এবং আবুজর (রাঃ) তাঁদের বাগ্নিতাপূর্ণ বানীতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। হযরত সালমান বলেন, “তোমরা এখন তোমাদের খারাপ কাজের (খেলাফত জবর দখল) পরিনাম/ফলাফল দেখে অবাক হচ্ছ, এবং তোমরা হেদায়াতের মুল উৎস হতে বহু দুরবর্তী দথা স্থানে নিপতিত হয়েছো (ইবনে আবি আলা হাদিদ, শারহে নাহজ আল বালাগা, ২/১৩১, ১৩২ এবং ৬/১৭)। তিনি আরো বলেন, “তোমাদের পক্ষে এটা ছিল অত্যন্ত খারাপ কাজ(খেলাফত জবর দখল করে নেয়া)। তোমরা যদি ইমাম আলী (আঃ) এর বাইয়াত করতে, তোমরা নিশ্চিতভাবেই নিজেদেরকে বেহেশ্তী এবং দুনিয়াবী রহমতের সাথে অবগাহন করতে পারতে”। হযরত আবু জর (রাঃ) বলেন, “তোমরা যদি সেই বিষয়ে প্রাধান্য দিতে যে বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা প্রাধান্য দিয়েছিলেন এবং তোমরা যদি সেসব বিষয় বর্জন করতে যেসব বিষয় আল্লাহ বর্জন করতে বলেছিলেন এবং যদি তোমরা রাসূলের (সাঃ) আহলে বাইতের নেতৃ্ত্ব এবং উত্তরাধিকার মেনে নিতে, তোমরা নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে নিজেদেরকে অবগাহন করতে পারতে। কিন্তু তোমরা এমন খারাপ আচরন করেছিলে যে তা (বর্তমান সময়ের জন্য করছিলে), এখন তোমাদের সেই অন্যায় কাজের পরিনতি ভোগ করতে হবে এবং “যারা অন্যায় কাজ করে তারা অচিরেই জানবে কত বড় খারাপ পরিনাম তাদের জন্য অপেক্ষা করছে”]।
যখন তারা খেলাফত যবর দখল করে নিতে সফল হলো, তখন তারা তাদের উচ্চাভিলাষ অনুসারে কোরাআন ব্যাখ্যার একছত্র প্রভাব নিশ্চিত করনের জন্য কোরাআন ও হাদিসকে (যে সহি হাদিস কোরানের ব্যাখ্যা) পরস্পর হতে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করলো। এবং কোরাআনকে তারা নিজেদের মত করে ব্যাখ্যা করলো; বিরোধী পক্ষের উপর খলিফা ও তাদের পরাক্রমশালী অনুসারীদের হামলার কুটকৌশলের প্রধান বাধা ছিল মহানবী (সাঃ) এর সহি হাদিস এবং তাঁর জীবনাচরন যা সাধারনভাবে সুন্নাহ নামে পরিচিত ছিল। সুতরাং এই শক্তিশালি অস্ত্র হতে প্রতিপক্ষকে নিরস্ত্র করা ছাড়া খেলাফতের আর কোন বিকল্প ছিল না। ১ম দিকেই হযরত আবু বকর এই কৌশলকে একক করে নিজের নিরঙ্কুশ অধিকারে নিয়ে নেওয়ার সিদ্বান্ত নিলেন। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি রাসূলের (সাঃ) ৫০০ হাদিস সংগ্রহ করেন। কিন্তু অনতিবিলম্বে দেখতে পেলেন, এই হাদিসগুলো তার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সহায়ক নয়। তাই তিনি তার সংগৃহিত সকল হাদিস পুড়িয়ে ফেললেন । (শামস উদ্দিন আয যাহাবী “তাজকিরাতুল-হুফফাজ” ১/৫)
নিঃসন্দেহে ঐ সময়ে মানুষকে হাদিস বর্ণনা বা লিপিবদ্ধ করা হতে বিরত রাখা এবং কেবলমাত্র আবুবকরের সংগৃহিত হাদিস হতে লাভ নিতে বাধ্য করা কার্যত অসম্ভব ছিল। এই প্রেক্ষিতে হাদিসের এই শক্তিশালী অস্ত্রের কাছে মানুষের যাওয়ার সুযোগ যাতে না থাকে সেই উদ্দেশ্যে রাসূলের (সাঃ) হাদিসের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ছাড়া ১ম খলিফা আর কোন উপায় দেখলেন না। অতএব খলিফা রাসূলের (সাঃ) হাদিস উদ্ধৃতির ব্যাপারে মুসলমানদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন। এই কার্যপ্রেক্ষিতে তিনি একটি ঘোষনাপত্র জারী করলেন, যাতে বলা হলোঃ জনগন রাসূলের (সাঃ) হাদিস হতে কোন উদ্ধৃতি দিবে না এবং তারা শুধুমাত্র আল-কোরাআনকে অনুসরন করবে। (শামস উদ্দিন আয যাহাবী “তাজকিরাতুল-হুফফাজ”। নাহজ আল-বালাগা, খুতবা নং ৩, শাকশাকিইয়াহ)
অভিসন্ধি হলো, আল-কোরাআনকে হাদিস হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যাতে খলিফাগন নিজেদের ইচ্ছেমত আল-কোরাআনকে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
মৃত্যুর পূর্বে আবুবকর একটি অসিয়ত প্রস্তুত করেন, যার মাধ্যমে তিনি হযরত উমরকে খেলাফতের উত্তরাধিকার নিয়োগ করেন। কিন্তু সাধারন মুসলমানদের পক্ষ হতে এই খেলাফতের ব্যাপারে কোন প্রতিবাদ আসেনি। নিঃসন্দেহে এর কারন হলো – হাদিস হতে বঞ্চিত থেকে অধিকাংশ মুসলমান দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকীর্নতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল।
এমন কি হযরত উমর তার শাসন আমলে হাদিসের উপর নিষেধাজ্ঞার এই নীতি কঠোরভাবে অনুসরন করেছেন। যাহোক, একদা তিনি জনগনের মতামত জানার অভিপ্রায়ে তাদের সামনে রাসূলের (সাঃ) হাদিস বর্ণনা এবং লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। হাদিসের উদ্ধৃতি এবং লিপিবদ্ধকরন রীতির পুনপ্রচলন করা জরুরী বলে এর অনুকুলে জনগন সার্বজনীন মতামত প্রদান করে। সামান্যের জন্য হযরত উমর যে ঝামেলায় পড়েছিলেন, সমস্যার ব্যাপারে ১মাস ধরে বিচার-বিবেচনা করার পর তা থেকে নিষ্কৃতির একটি রাস্তা অত্যন্ত চতুরতার সাথে বের করতে সক্ষম হলেন। তিনি জনসম্মুখে উপস্থিত হয়ে নিম্নের বক্তব্য ঘোষনা করলেনঃ
“আমি রাসূলের (সাঃ) সুন্নাহ লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে খুব আগ্রহী, কিন্তু আমি স্মরন করছি আমার পূর্ববর্তি লোকদেরকে যারা কিছু গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেছিল এবং এর প্রতি অত্যধিক মনোযগ প্রদান করে ঐশী গ্রন্থকে অবহেলা করেছিল; সুতরাং আমি সিদ্বান্ত নিয়েছি যে, আল-কোরানের সাথে অন্য কোন কিছুকেই মিশিয়ে ফেলবো না” (মুঃবিন সাদ, আল- ওয়াকিনির অনুলেখক “আল তাবাকাতুল-কুবরা” ৩/২৮৭, ইবনে আব্দ আল-বার “জামিউল বাইয়ান আল ইলম ওয়া ফাজলিহি” ১/৬৪-৬৫)
(প্রিয় পাঠক, হযরত হযরত উমর একটি মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছেন। কারন আমরা কোরাআন থেকে জেনেছি যে এটি লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত এবং এটি হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে গ্রহণ করেছেন। আর একারনেই আল-কোরাআন আজো পর্যন্ত অবিকৃ্ত আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে-সম্পাদক)।
রাসূলের (সাঃ) কোন সাহাবীকে তিনি (হযরত উমর) যখন কোথাও অফিসিয়াল কাজে পাঠাতেন তিনি তাদেরকে কোন ধরনের হাদিস বর্ণনা না করার জন্য বিশেষ নির্দেশ দিতেন। তার আশংকা ছিল উহা মানুষকে আল-কোরানের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করতে পারে। উপরন্তু, তিনি যদি জানতে পারতেন যে তাদের কেউ তার নির্দেশ অমান্য করেছে, তাহলে তিনি তাকে তার সামনে হাজির হওয়ার আদেশ জারী করতেন এবং তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করতেন। এছাড়া জনগনের কারো কাছে কোন লিখিত হাদিসের খোজ পেলে তিনি সেগুলো নিয়ে যেতেন এবং পুড়িয়ে দিতেন।
এভাবেই উমরের খেলাফতকাল শেষ হলো এবং এসময় একটি সঙ্গঘবদ্ধ দলের অভ্যূদয় ঘটলো যাদের সহায়তায় হযরত হযরত উসমান খেলাফতে অধিষ্টিত হলেন। (ইমাম আলী ইবনে আবিতালিব, নাহজ উল বালাগা, খুতবা ৩; বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন “আব্দুল্লাহ বিন সাবা”, পৃঃ১/১৪২-১৫১, ২য় প্রকাশ)
উসমানের শাসন আমলে হাদিস বর্ণনার বিরুদ্বে খেলাফতের শাসকবর্গ এক কঠিন যুদ্বে অবতীর্ণ হলো। হযরত উমর(রাঃ) যখন মহানবীর সাহাবীদেরকে (হাদিস বর্ণনার কারনে) নিপীড়ন করতেন ও মদীনায় কারাদন্ড দিতেন এবং তাদের লিপিবদ্ধ হাদিস পুড়িয়ে দিতেন, হযরত উসমান তখন রাসূলের (সাঃ) বক্তব্য ও তাঁর জীবনাচরনের বর্ণনা বন্ধ করার কতিপয় প্রথিতযশা সাহাবিকে নির্যাতনে জর্জরিত করেছেন বা নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। উসাহরনস্বরূপ বলা যায়, হযরত আবুজর (রাঃ) কে মদীনা হতে বিতারন করে রাবজাহ মরুভুমিতে নির্বাসন দেন; (‘মিন তারিখ আল হাদিস’, লেখকঃ আল্লামা মুরতাযা আশকারী রঃ)।রাসূলের (সাঃ) এই সুপরিচিত সাহাবী উত্তপ্ত বালুকাময় নির্জন মরুভুমি এলাকায় মৃত্যু পর্যন্ত থাকতে বাধ্য হন। রাসূলের (সাঃ) অন্য একজন সাহাবী আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে তিনি এমনভাবে বেত্রাঘাত করেন যে তিনি চৈতন্য হারিয়ে মাটিতে পতিত হন। (আহমদ বিন বালাজুরী, ”আনসাব আল-আশরাফ”৫/৪৯)
প্রথম ৩ খলিফার ২৫ বছর সময়ের শাসনকালে, গনঅভ্যুথ্যানের ফলে উসমানের ক্ষমতাচ্যুতি ও হত্যাকান্ডের পুর্ব পর্যন্ত, মহানবী (সাঃ) এর সাহাবীগন ও ইসলামের অন্যান্য প্রজন্ম চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনপাত করছিল। অতঃপর জনগন ইমাম আলী (আঃ) এর প্রতি ফিরে আসে এবং তাঁকে তাদের পরবর্তি খলিফা নিযুক্ত করে। (আল-হাদিছ-ই-উম্মুল মু’মেনিন আয়শা” অধ্যায়-আলা আহদ আল সাহরাইন/১১৫)
ইমাম আলী (আঃ) এমন সময়ে খেলাফতে অধিষ্টিত হলেন যখন মুসলমানেরা পূর্ববর্তী খলিফাদের আমলের ২৫ বছরে তাদের নিজেদের স্টাইলে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ঐ সময়ে বিরাজিত পরিবেশ সম্পর্কে ইমাম আলী (আঃ) নিজে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা হলো নিম্নরূপ। (মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াকুব কুলাইনীর গ্রন্থ “রাওজাতুল কাফী”৮/৬১-৬৩তে বিস্তারিত দেখা যেতে পারে)
“আমার পূর্ববর্তী খলিফাগন এমন কাজ করেছিলেন যাতে তারা সচেতনভাবেই রাসুলুল্লাহর (সাঃ) নির্দেশের বিপরীতে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রতি করা আনুগত্যের শপথ তারা ভঙ্গ করেছিল এবং তাঁর সুন্নতের পরিবর্তন করেছিল। এখন আমি যদি ঐ সকল বিষয়গুলোকে পরিত্যাগ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করি এবং রাসূল (সাঃ) এর সময় যা ছিল সেইভাবে ঐ বিষয়গুলোকে পুর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনি, তাহলে আমার বাহিনীর লোকেরা আমাকে নিঃসঙ্গ অসহায় অবস্থায় ফেলে আমা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। খুব বেশী হলে এক ক্ষুদ্র সংখ্যক অনুসারী আমার পক্ষে থাকবে; যারা আল-কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে আমার ইমামতকে স্বীকার করে”।
“আমি যদি নিম্ন বর্ণিত ব্যাবস্থাগুলো গ্রহণ করি তার ফলাফল কি হবে তা কি তোমরা ভাবতে পারো?:
১/রাসূল (সাঃ) যেখানে মাকামে ইব্রাহিমকে স্থাপন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন যদি আমি তা সেখানে পুনঃস্থাপন করি।
২/নবী কন্যা ফাতেমা (আঃ) এর সন্তানদেরকে আমি আমি যদি ফিদাকের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেই।
৩/মহানবী (সাঃ) এর সময় ওজন ও পরিমাপ যেমন প্রতিষ্ঠিত ছিল, যদি সেই অবস্থায় তা প্রতিষ্ঠিত করি।
৪/যেসব ভুমি মহানবী (সাঃ) যাদেরকে দিয়ে গিয়েছিলেন যদি সেগুলো তাদের কাছে ফিরিয়ে দেই।
৫/যদি খলিফাদের জারীকৃ্ত নিষ্ঠুর আইন বাতিল করি।
৬/যদি যাকাত ব্যাবস্থাকে তার প্রকৃ্ত ভিত্তির উপর পুনর্বিন্যাস্ত করি।
৭/যদি অজু গোসল ও নামাযের নিয়ম-নীতি সংশোধন করি।
৮/যে সকল মহিলাদের অন্যায়ভাবে তাদের স্বামীদের থেকে পৃ্থক করে অন্যদের নিকট দেওয়া হয়েছে, যদি তাদেরকে তাদের আসল স্বামীদের নিকট ফিরিয়ে দেই।
৯/বায়তুলমালের অর্থ যেভাবে ধনিকদের প্রদান করতঃশুধুমাত্র তাদের হাতে উহা পুঞ্জিভুত না করে মহানবী (সাঃ) এর সময়কালে যেমন ছিল তেমনিভাবে উহা পাওয়ার উপযুক্ত ব্যাক্তিদের মাঝে সমভাবে বন্টন করি (হযরত হযরত উমর রাষ্ট্রিয় কোষাগার হতে অর্থ বন্টনের ক্ষেত্রে সমাজে শ্রেনী বিভাজন চালু করেছিল। সেই সময়ে একটি তালিকা করা হয়েছিল এবং এই অনুযায়ি একদল পাচ্ছিল প্রতি বছর ৫০০০ দিরহাম, অন্য একদল ৪০০০ দিরহাম এবং অন্যান্যরা ৩০০০, ২০০০, ১০০০ এবং ৫০০ শত থেকে ২০০শত দিরহাম। এইভাবে সমাজে ধনী ও দরিদ্র শ্রেনী সৃষ্টি করা হয়)।
১০/যদি ভুমি কর বাতিল করি (হযরত হযরত উমর ইরাকের ভুমি কর আরোপ করেছিল ইরানের সাসানিদ রাজন্যদের ভুমি রাজস্ব আইন অনুসারে এবং মিশরে রোমান রাজন্যদের ভুমি রাজস্ব আইন অনুসারে)।
১১/যদি দাম্পত্য সম্পর্ক সংক্রান্ত ব্যাপারে সকল মুসলমানকে সমান ঘোষনা করি (হযরত হযরত উমর আরবীয় কন্যাদের সাথে অনারবদের বিবাহ নিষিদ্ব করেছিলেন)।
১২/যদি আল্লাহর আইন অনুসারে খুমস (সম্পদের এক পঞ্চমাংশ) আদায় করি (সুরা আনফাল-৪১) প্রথম ৩ খলিফা মহানবী (সাঃ) ওফাতের পর খুমস হতে আহলে বায়াতের প্রাপ্য অংশ বাদ দিয়ে দিয়েছিল)।
১৩/যদি মসজিদে নববীকে এর সুচনালগ্নের কাঠামোতে, যে কাঠামোতে রাসূল (সা.) এর সময়কালে প্রতিষ্টিত ছিল, পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করি। মহানবী (সাঃ) ওফাতের পর মসজিদের যে প্রবেশ পথ গুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল তা আবার খুলে দেই, এবং তাঁর ওফাতের পর যে প্রবেশ পথগুলো খোলা হয়েছিল তা আবার বন্ধ করে দেই।
১৪/যদি ওজুতে চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করা নিষিদ্ধ করি(‘খুফ’ হচ্ছে পশুর চামড়ার তৈরী মোজা। সুন্নী মুসলমানগন, তাদের পুর্ববর্তীদের মত, ওজুর জন্য নগ্ন পা ধোয়া বাধ্যতামুলক মনে করে, কিন্তু ‘খুফ’ দ্বারা পা আবৃত থাকলে উহা মাসেহ করা যথেষ্ট মনে করে)।
১৫/ “নাবিয” এবং খেজুরের মদপানের উপর দন্ড এবং বিশেষ শাস্তির বিধান চালু করি (নাবিয হচ্ছে একধরনের হাল্কা মদ, যা সাধারনত বিয়ার জাতীয় যব/বার্লি হতে তৈ্রি করা হয়)।
১৬/যদি নারী এবং হজ্বের ক্ষেত্রে মহানবী (সাঃ) এর সময়কালে যেমন ছিল, সেই মোতাবেক মু’তার বিধান আইনসিদ্ব করি (খলিফা হযরত উমর ২ ধরনের মুতাকে অবৈ্ধ ঘোষনা করেন। হজ্বের মুতা (হজ্বে তামাত্তু) ও নারীর মুতা। একইভাবে নির্দিষ্ট কন্যাদের বিবাহ, কোরআনের ঘোষনা ও সুন্নী পন্ডিতগনের বর্ণনা অনুযায়ী যা সুস্পষ্টভাবেই ইসলামি বিধানের অন্তর্ভুক্ত)।
১৭/যদি মৃত ব্যাক্তির জানাযার নামাযে ৫বার তাকবির বলি (আবু হোরায়রার সুত্রে সুন্নীগন মৃতের জানাজা নামাযে ৪ বার তাকবির পড়ে থাকে, সুত্রঃইবনে রুশদ আন্দালুসীর “বিদায়া ওয়াল মুজতাহিদ”১//২৪০)।
১৮/যদি নামাযের শুরুর সময় শব্দ করে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ তেলাওয়াত করা বাধ্যতামুলক করি (সুন্নিদের একটি গ্রুপ তেলাওয়াতের সময় সুরা ফাতিহা ও অন্য সুরা হতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বাদ দেয়। স্পষ্টতই তারা এই ব্যাপারে মুয়াবিয়াকে অনুসরন করে থাকে, সুত্রঃ আল-ফাতিহার তাফসীর, ‘তাফদীরে আল-কাশশাফ’১/২৪-২৫)।
১৯/যদি মহানবী (সাঃ) এর সময়কালে তালাকের যে রীতি প্রচলিত ছিল, সেই রীতি কঠোরভাবে অনুসরনের নির্দেশ দেই (তালাক ২ বার……..সুরা বাকারাহঃ২২৯, সুন্নিদের মতে তালাক দেওয়ার জন্য এক বৈঠকে ৩ তালাক উচ্চারন করলে তা বৈ্ধ, এবং এর যথাযথ সাক্ষী না থাকলে তা দ্রুত অনুসমর্থন করাতে হবে, সুত্রঃ’বিদায়াহ ওয়াল মুজতাহিদ ১/৮০-৮৪)।
২০/যদি বিভিন্ন জাতির যুদ্ধবন্দীদের প্রতি আচরনের ব্যাপারে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরনের নির্দেশ দেই।
“এক কথায় আমি যদি লোকদেরকে আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশ অনুসরন করানোর জন্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করি, তাহলে তারা আমায় ত্যাগ করবে এবং এদিক-সেদিক চলে যাবে”।
“আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, যখন রমযানের মাসে ওয়াযিব (ফরয) নামায ছাড়া অন্য কোন নামায জামাতের সাথে না আদায় করার জন্য আমি লোকদেরকে নির্দেশ দিলাম এবং বুঝিয়ে বললাম যে মুস্তাহাব নামায জামাতের সাথে আদায় করা বিদায়াত, আমার সেনাবাহিনীর একটি দল, যারা আমার পক্ষে একদা যুদ্ধ করেছিল, হৈচৈ শুরু করে দিল, বলেঃ’আহ!উমরের সুন্নাত’। ‘হে মুসলমানেরা। আলী উমরের সুন্নাত পালটে দিতে চায় ও রমযান মাসে মুস্তাহাব নামায বন্ধ করে দেওয়ার বাসনা করে। তারা এমন গোলমাল শুরু করে দিল যে আমি ভীত হলাম-তারা কিনা বিদ্রোহ করে বসে”।
“হায়!”, ইমাম আলী (আঃ) বলতে থাকেন, “আহ এমন যন্ত্রনা আমি এই লোকদের হাতে ভোগ করলাম, যারা অত্যন্ত প্রবল ভাবে আমার বিরোধিতা করে; যারা তাদেরকে কেবলমাত্র জাহান্নামের দিকেই চালিত করেছিল তারা তাদের সেই ভ্রান্ত নেতাদের আনুগত্য করে”।
ইমাম আলী (আঃ) খলিফাদের রীতি-পদ্ধতির বিপরীতে বিশেষ করে হাদিস সংক্রান্ত বিষয়ে মহানবী (সাঃ) এর পথ অনুসরন করে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য একটি কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ১ম ৩ খলিফা কত্বৃক চালুকৃ্ত বিদয়াত ( নতুন রীতি পদ্ধতি)ধ্বংশ করার জন্য
এক বিরামহীন যুদ্ব শুরু করেছিলেন (তিনি সকল কাহিনী কথকদের উপর, যারা হযরত উমর ও উসমানের নির্দেশ মোতাবেক জুময়ার দিনে মসজিদসমুহে খোতবা দিত, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন। তিনি নবীজীর হাদিস মুক্তভাবে কোন লুকানো ছাড়াই বর্ণনার রীতি চালু করলেন। তাঁর পক্ষে যতটুকু সম্ভব তিনি খলিফাদের আবিস্কারসমুহের মুলোতপাটন করলেন। বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুনঃ “ মিন তারিখ আল-হাদিস । )
যারা ইমাম আলীর (আঃ) ভুমিকা তাদের দুনিয়াবী স্বার্থের প্রতিকুল বিবেচনা করছিল কুরাইশদের সেইসব লোক তাঁর বিরুদ্বে দাঁড়িয়ে গেল। তারা “জামাল” এবং “সিফফিন” যুদ্বে প্রচুর রক্তপাতের পরিস্থিতি তৈ্রী করলো। তাঁর বিরুদ্বে তাদের শত্রুতা এমন পর্যায়ে উপনীত হলো যে প্রায় ৪ বছরের মধ্যেই তারা তাঁকে নামাজরত অবস্থায় শহীদ করে দিল।
আল্লাহ এবং রাসূলের (সাঃ) শত্রু মুয়াবিয়া তার ধুর্ত পরিকল্পিত চক্রান্তের ফলাফল হিসাবে হযরত ইমাম আলী (আঃ) এর ইন্তেকালের কিছু সময়ের মধ্যেই খেলাফতের সিংহাসনে নিজেকে আসীন করতে সক্ষম হলো। মুগীরা ইবনে শোবা’র সাথে বাক্যালাপকালে তিনি তার রাজনৈ্তিক উচ্চাভিলাসের গোপন তথ্য ফাঁস করে দেন। মুগিরা প্রশ্ন করলোঃ “হে আমিরুল মু’মিনিন, আপনার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আপনি সফল হয়েছেন। আজ কোন ধরনের ক্ষতির আশংকা নেই যদি আপনি আপনার এই বৃ্দ্ব বয়সে লোকদের জন্য সুবিচারের ব্যাবস্থা করেন এবং সৎ্কাজ করেন যাতে আপনার পশ্চাতে সুনাম রেখে যেতে পারেন। আল্লাহর শপথ হাশেমীদের আজ এমন কিছুই নেই যাতে ভীত হতে হবে; সুতরাং আপনার পক্ষে এটাই উত্তম হবে যদি আপনি তাদের সাথে সদয় ব্যবহার করেন এবং সম্পর্কের বাধনকে মজবুত করেন”।
মুয়াবিয়া প্রশ্নোত্তরে বললেনঃ “অসম্ভব। আবুবকর শাসক হল এবং সুবিচার প্রতিষ্টা করলো এবং সকল ধরনের দুর্ভোগ পোহালো, কিন্তু মৃত্যুর অব্যবহিত পর পরই তার আর কিছুই আবশিষ্ট রইলো না, তার নাম আজ কেবল কদাচিত উচ্চারিত হয়। তারপর এলো হযরত উমর। তার শাসনকার্যকে সফল করার জন্য তিনি সর্বোত্তমভাবে সচেষ্ট ছিলেন, এবং তার ১০ বছরের শাসনকালে তিনি অনেক সমস্যা মোকাবেলা করলেন, কিন্তু তার মৃত্যুর সাথে সাথে তার নামও মৃত্যু বরন করলো। তারপর হযরত উসমান , যে অত্যন্ত উচ্চ বংশের সন্তান, শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো এবং উল্লেখযোগ্য বেশকিছু কাজ সম্পাদন করলো। অন্যরা করলো তার প্রতি অন্যায় আচরন এবং তিনিও মৃত্যবরন করলেন। তার মৃত্যুর সাথে সাথে নামটিও মাটির নীচে চলে গেল। লোকেরা তার মহৎ কাজগুলো সম্পুর্নরুপে বিস্মৃত হলো। কিন্তু ঐ হাশেমীর (আল্লাহর নবীর) নাম এখনও এই দুনিয়ায় রোজ ৫বার উচ্চস্বরে উচ্চারিত হচ্ছে। এই নামের অস্ত্বিত্ব থাকাকালে কে জীবিত থাকতে পারে ? হে মাতৃহীন সাথী! না, আল্লাহর শপথ, যতক্ষন না এই পৃ্থিবীর ভুমি হতে তাঁর নাম মুছে ফেলতে পারবো ততক্ষন পর্যন্ত আমার কোন শান্তি নেই”। (মাসুদী, ”মুরুজ আল-জাহাব”৩/২৫২, দার আল-আন্দালিস প্রেস। ২১২ হিজরি)
এইভাবে মহানবী (সাঃ) এবং তাঁর আহলে বাইতের নাম নিশানা নিশ্চিহ্ন করার জন্য মুয়াবিয়া তার সকল ক্ষমতা, উপায়-উপকরন ব্যবহার করেছিল এবং হাদিস জাল করার নানা উপায়/কারখানা স্থাপন করেছিল। মুয়াবিয়া তার এই কাজে এতটা সফল হয়েছিল যে, আবু হোরায়রা যিনি ৫০৩০ টি হাদিস জাল করে মহানবীর নামে বর্ণনা করেছে । (মুরতাজা আল-আসকারী, “আহাদিস-ই-উম্মুল মু’মেনিন আয়শা”পৃঃ-২৮৯ এবং, তেহরান ১৩৮০ হিজরী”)
আব্দুল্লাহ ইবনে হযরত উমর এই ধরনের ২০০০ হাজারেরও বেশী জাল হাদিস বর্ণনা করেছেন। উম্মুল মু’মিনিন আয়েশা ও আনাস বিন মালিক দু’জনের প্রত্যেকে ২০০০ হাজারের বেশী জাল হাদিস বর্ণনা করেছেন। এই ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের মত অন্যরা স্বার্থান্বেষী শাসকগোষ্টীর আনুকুল্য পাওয়ার জন্য হাদিস জাল করার জন্য পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। আল্লাহই ভাল জানেন। এই প্রচারাভিযানকালে হাদিসের নামে কত অসংখ্য কাহিনী উদ্ভাবন করা হয়েছিল। এর ফলে ইসলামী নীতিমালা-বিধান এবং আমলের বিকৃ্তি সাধিত হয়েছিল এবং সব উলট-পালট করে দিয়েছিল। এই ধারাবাহিকতায় প্রকৃ্ত ইসলাম সম্পুর্নভাবে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল।
শাসকগোষ্টী কেবলমাত্র এই রুপান্তরিত ইসলামকে অফিসিয়াল স্বীকৃতি প্রদান করতো। এই ইসলামের বহিরাবরন ও মানদন্ড তৈ্রী হয়েছে মুয়াবিয়ার আমলে এবং এই ধারাবাহিকতার পথ ধরে ইহাই সত্য ইসলাম বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। ঐ বিষয়গুলো এখন এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, মহানবী (সাঃ) এর সত্য ইসলামকে যদি এই সকল দরবারী ইসলামে অভ্যস্ত লোকদের কাছে উপস্থাপন করা হয়, তবে প্রকৃ্ত সত্য হিসাবে তা বিশ্বাস করা কঠিন হয়া দাড়ায়। কারন তারা তাদের ইসলামকে জেনেছে সেইসব গ্রন্থ থেকে যেগুলো মিথ্যা এবং জাল হাদিস সমৃদ্ব। উদাহরন স্বরুপ আবু হোরায়রার কারখানায় উদ্ভাবিত একটি জাল হাদিস আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারিঃ
“একদল লোক রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলো, হে আল্লাহর নবী, হাশরের দিন আমরা কি আল্লাহকে দেখতে সক্ষম হবো? তিনি জবাব দিলেন, “পুর্নিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে তোমরা কি আনন্দ পাওনা?””আমরা পাই” তারা উত্তর দিল। আবার তিনি বললেন, “মেঘমুক্ত আকাশে সুর্য দেখার ক্ষেত্রে তোমরা কোন অসুবিধা অনুভব কর কি?”তারা উত্তরে বললো, “না, হে আল্লাহর নবী, করিনা। “তারপর তিনি বললেন, তোমরা আল্লাহকে দেখতে পাবে ঠিক একই রকমভাবে”। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ সকল মানুষকে একত্রিত করবেন এবং দুনিয়াতে তারা যার ইবাদাত করতো তাকে অনুসরন করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দিবেন। যারা সুর্য পুজা করতো তারা সুর্যকে অনুসরন করবে এবং যারা চন্দ্রকে পুজা করতো তারা চন্দ্রকে অনুসরন করবে; এবং যারা প্রেত(অশুভ আত্নার)পুজা করতো তারা তাদের দেবতার পশ্চাতে চলতে থাকবে। কেবলমাত্র মুসলমান ও মুনাফিকেরা অবশিষ্ট থাকবে। অতপর লোকেরা পুর্বে যেরুপ আল্লাহর চিনতো তিনি তাদের সামনে ভিন্নরুপে আবির্ভুত হবেন, এবং বলবেন, “আমিই তোমাদের আল্লাহ”। তারা বলবেঃ আমরা তোমা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই”। আমরা এখানে অপেক্ষা করবো যতক্ষন না আল্লাহ আমাদের সামনে উপস্থিত হন এবং আমরা তাকে চিনবো। তারপর আল্লাহ আবার তাদের সামনে সেইরুপে উপস্থিত হবেন যেরুপে লোকেরা আগে তাঁকে চিনতো। তখন লোকেরা চিৎকার করে বলবে, “নিশ্চয়ই তুমি আমাদের প্রভু” এবং তারা তাঁকে অনুসরন করবে”। (সহী বুখারী, ১ম খন্ড, বিষয়ঃ”ফজল আল-সুজুদ”, অধ্যায় ৯ “আল-সিরাতজসর জাহান্নাম”। মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ নিশাপুরি, সহীহ খণ্ড ১, বিষয়ঃ”মারিফাহ তারিখ আল-রুইয়াহ”)
এই হাদিসটি স্পষ্টতই আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানের ভিত্তি এবং পরকাল সম্পর্কে ইসলামের মুল বিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয়।
অন্য ১টি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, শেষবিচারের দিনে মহানবী (সাঃ) আল্লাহর নিকট এইভাবে মুনাজাত করবেনঃ “হে আমার আল্লাহ আমি মুসলমানদের প্রতি রাগবশে যে বদদোয়া করেছি এর পরিবর্তে তুমি তাদের প্রতি রহম কর এবং তাদের পরিশুদ্ব করে দাও”। (সহি মুসলিম, বিষয়ঃমানলা আনাহু আল-নবী বা “জায়ালাল্লাহ লাহু জাকাতান ওয়া তহুরান&rdquo)
একইভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, মহানবী (সা.) একদা লোকদেরকে বললেনঃ “খেজুর গাছের পরাগিত হওয়ার প্রয়োজন নেই” অথবা, তিনি বলেছিলেন, “খেজুর গাছকে পরাগিত কর না, ইহাই তার জন্য ভাল হবে ।” সেই অনুসারে লোকজন খেজুরের চাষে পরাগিত করলোনা, ফলশ্রুতিতে ঐ বছর খেজুরের আশানুরূপ ফলন হল না। এবং মহানবী (সা.) যখন এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারলেন, তিনি বললেনঃ “আমি ঐ পর্যন্তই জানতাম । আমাকে আর কখনও জিজ্ঞেস করো না” বা তিনি বলেছিলেন দুনিয়াবী বিষয়ে তোমরাই ভাল জান” । (তার মানে দাড়াচ্ছে দুনিয়াবী বিষয়ে রাসূলের নির্দেশ অমান্য করার অনুমোদন আছে ।)
আরো বর্ণিত হয়েছে যে, একদিন মহানবী (সাঃ) মক্কায় নামাজ আদায়কালে সুরা নাজম-এর এই আয়াত “ তোমরা ভাবিয়া দেখিয়াছ “লাত” ও “উজ্জা” সম্বন্ধে এবং ৩য় আরেকটি “মানাত” সম্বরন্ধ? পর্যন্ত তেলাওয়াত করতেছিলেন। যখন তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করতেছিলেন, শয়তান মহানবীর (সাঃ) মুখে এই শব্দাবলী জুড়ে দিলঃ “এরা হলো বিশিষ্ট দেবতা যারা শ্বেতশুভ্র পাখির মত এবং তাদের অনুগ্রহ আকাংখিত”। মুর্তিপুজারীরা যখন এই শব্দগুলো শুনলো, তারা খুশী হয়ে গেল এই ভেবে যে, অবশেষে মহানবী (সাঃ) তাদের দেবতাদের সম্পর্কে ভাল বক্তব্য পেশ করলো, এবং একই সাথে সকল মুসলমান এবং কাফিররা সেজদায় চলে গেল। তারপর জীব্রাঈল আমিন (আঃ) অবতরন করলেন এবং রাসূলকে (সাঃ) তাঁর এই ভ্রান্তি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষন করলেন। রাসূল (সাঃ) বললেন যে, শয়তান তার মুখে এই শব্দগুলো জুড়ে দিয়েছিল।
অন্য একটি বর্ণনা অনুসারে, জীব্রাঈল (আঃ) মহানবী (সাঃ) কে সেই আয়াত পুনরায় তেলাওয়াত করতে বললেন, এই “এরা হলো বিশিষ্ট দেবতা” শব্দগুলো যোগ কর, রাসূল (সাঃ) তা করলেন। জীব্রাঈল তাকে বললেনঃ যে তিনি ঐ শব্দগুলো তাঁর কাছে নিয়ে আসেননি, এটা শয়তান যে তাঁকে (মহানবী) দিয়ে ঐ শব্দগুলো উচ্চারন করিয়েছে ।(“আমি তোমার পুর্বে যে সমস্ত রাসূল (সাঃ) কিংবা নবী প্রেরন করেছি তাদের কেহ যখনি কিছু আকাঙ্ক্ষা করেছে, তখনই শয়তান তার আকাঙ্ক্ষার কিছু প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহ তা বিদুরিত করেন”(সুরা হজ্জঃ৫২) এই মহিমান্বিত আয়াতের তাফসীরে সয়ুতি তার “দুররে মনসুর” নামক তাফসীর গ্রন্থে(৪/৩৬৬-৩৬৮) এই বিষয়বস্তুর সমর্থনে বিখ্যাত সাহাবাদের সুত্রে ১৪টি হাদিস বর্ণনা করেছেন)।
এই বর্ণনাগুলো প্রখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য সুন্নী পন্ডিত যেমন, তাবারী, ইবনে কাসীর, সুয়্যুতি এবং আল্লামা সাইয়েদ কুতুবের ভাষ্যে উল্লেখিত হয়েছে।
এই সকল ব্যক্তিবর্গ মহানবী (সাঃ) এর নামে এত বিশাল সংখ্যক জাল হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, তারা মহানবীর (সাঃ) সঠিক রূপ মিথ্যা ও অসত্য বক্তব্যের পর্দার আড়ালে ঢেকে দিয়েছেন।
কুরাইশ শাসকবর্গ ও তাদের কর্মকর্তাদের প্রতিকৃ্তি চিত্রিত হলো মেকি রঙে। অতিপ্রাকৃত গুনাবলি তাদের জন্য আবিস্কৃত হল, এবং তাদের বিরোধী পক্ষের ব্যক্তিবর্গ নিন্দার লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত হল। উহা এমন পর্যায়ে উপনীত হলো যে আবুযর গিফারী, মালিক আশতার, আম্মার ইবনে ইয়াসির এবং তাদের মত ব্যক্তিবর্গ আত্নাভিমানী এবং ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ হিসাবে ঘোষিত হলো। (আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা”, লেখক-সাইয়েদ মুরতাজা আশকারী রঃ, ১ম অধ্যায়)
এছাড়া, তারা আল্লাহর গুনাবলী, পুরুথথান ও শেষ বিচার, পুরস্কার ও শাস্তি, জান্নাত ও জাহান্নাম, পুর্ববতী নবীগনের কাহিনী, সৃষ্টির সুচনা, ইসলামী আকিদা-বিশ্বাস এবং বিধিবিধান সম্পর্কিত বহু হাদিস তারা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু প্রকৃ্তপক্ষে এসম্পর্কিত তথ্যের উৎস ছিল তাদের নিজস্ব মস্তিস্কের উদ্ভাবন।
প্রতীয়মান হয় যে, এই ধরনের অসংখ্য জাল করা হাদিস রয়েছে। এই জাল হাদিসগুলোর বর্ণনা ক্ষেত্র এত বিস্তৃত ছিল যে, ধর্ম সম্পর্কীয় সকল সত্য যেন ছায়ায় পরিনত হল, এবং এর পরিবর্তে উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকবর্গের উদ্ভাবিত নতুন ইসলামের আবির্ভাব ঘটলো; তুর্কী উসমানী খেলাফতের শেষ পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা কার্যকরভাবে চালু ছিল।
ইসলামের ইতিহাসের সমগ্র অধ্যায় জুড়ে আর একদল লোকের অস্তিত্ব পাওয়া যায় যারা জাল হাদিস প্রস্তুতকারকদের বিরোধিতা করতো। এই দলের সদস্যবর্গ তাদের সাধ্যমত, এমনকি নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও, রাসূলের (সাঃ) সঠিক সুন্নাহকে সংরক্ষন করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। রাসূলের (সাঃ) একজন বিশ্বস্ত সাহাবী আবুযর এই ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অন্যতম অগ্রনী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একদিন তিনি একদল লোক পরিবেষ্টিত হয়ে মিনায় “২য় শয়তান”-এর নিকট বসে ছিলেন। লোকেরা তার নিকট ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্নাবলী জিজ্ঞেস করছিল। হঠাৎ উমাইয়া সরকারের শয়তান-প্রকৃ্তির একজন কর্মকর্তা তার নিকট এলো এবং জিজ্ঞেস করলো, “লোকদের প্রশ্নের জবাব দান না করার জন্য তোমাকে কি সতর্ক করা হয়নি?” আবুযর জবাব দিলেন, “আমার উপর নজরদারী করার জন্য তুমিই কি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি”? এই কথা বলে তিনি তার ঘাড়ের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে বললেন, “যদি তুমি এইখানে তরবারি ধর এবং শরীর হতে মস্তক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পুর্বে মহানবী (সাঃ) এর নিকট হতে যা আমি জানতে পেরেছি তার সামান্য কয়েকটি শব্দও উদ্ধৃতি দেওয়ার সুযোগ পাবো বলে আমি বুঝতে পারি, তবে অবশ্যই তা আমি করবো”। (সুনানে দারামি ১/১৩২, মুঃ ইবনে সা’দের “তাবাকার আল-কুব্রা”২/৩৫৪)
রাশিদ হিজরী নামে অন্য একজন মহান ব্যাক্তি এই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এটা সেই সময়ের কথা যখন কুফার গভর্নর জিয়াদ তার হাত এবং পা কেটে বিচ্ছিন্ন করে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। বিপুল সংখ্যক লোক সে সময় তাকে দেখতে এসেছিল এবং শোক প্রকাশ করছিল। রাশিদ তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ”কান্না বন্ধ কর, কিছু একটা নিয়ে আস যার দ্বারা লিখতে পারা যায়, কারন আমি তোমাদের সেই নির্দেশগুলো জানাতে চাই যা আমি আমার মাওলার কাছ থেকে জেনেছি”। লোকেরা একমত হলো। কিন্তু এই খবর জিয়াদের কাছে পৌছার পর জিয়াদ তার(রাশিদের) জিহবা কেটে দিল । (মুঃ ইবনে আল-হাসান তুসীর “ইখতিয়ার মারফা আল-রিজাল” যা “রিজাল কাশী” নামে পরিচিত এবং আল্লামা বাকির মাজালিশীর “বিহারুল আনোয়ার”৯/৬৩২)
মিসাম-এ-তাম্মার এই দলের একজন সাহসী কর্মী ছিলেন। যখন ইবনে জিয়াদ তার হাত এবং পা কেটে বিচ্ছিন্ন করে দিল এবং তাহে যখন ফাঁসিকাষ্টে ঝুলাতে যাচ্ছিল তখন তিনি মঞ্চে অতিকষ্টে একজন বক্তার মত দাড়ালেন এবং চিৎকার করে বললেন, “হে লোকেরা শুন, আমি ইমাম আলীর (আঃ) নিকট থেকে যে হাদিস টি শুনেছি তা শুনতে যার ইচ্ছা করে সে আমার কাছে আস”। লোকজন ফাঁসিকাষ্টের নিকট জমায়েত হলো মিসাম-এ-তাম্মার তখন বলতে শুরু করলেন। ইবনে জিয়াদ যখন এটা জানতে পারলো, সে তার (মিসাম) জিহবা কেটে দেবার নির্দেশ দিল। জহবা কেটে দেবার পর পরই মিসাম-এ-তাম্মার ১ ঘন্টার বেশী তীব্র যন্ত্রনা ভোগ করেন নি; ফাঁসিকাষ্টে রক্তের ঝর্ণার মাঝে শাহাদাত বরন করলেন। (মুঃ ইবনে আল-হাসান তুসীর “ইখতিয়ার মারফা আল-রিজাল” যা “রিজাল কাশী” নামে পরিচিত এবং আল্লামা বাকির মাজালিশীর “বিহারুল আনোয়ার”, ৭৬-৭৭)
আমরা দেখতে পাই যে, রাজ্যে খেলাফতের প্রভাব ক্রমান্বয়ে বিশালাকারে বেড়ে যাচ্ছিল। পর্যায়টা এমন দাড়ি্যেছিল যে, তারা হালাল-হারাম সংক্রান্ত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সাঃ) বিধান পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম ছিল। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি এমন দুর্ভাগ্যজনক অবস্থায় পৌছাল যে, খলিফাদের জারীকৃ্ত আদেশ আল্লাহর বিধান হিসাবে কার্যকর হতে থাকলো।
যা হোক উসমানের খেলাফতের পর বেশীদিন এই পরিস্থিতি টিকতে পারেনি। গনঅভ্যূথান এই স্বেচ্ছাচারী শাসনের অবসান ঘটায়। তবে জাল হাদিস প্রস্তুতকারক ও প্রচারনাকারী একদল শক্তিশালী লোকের সহায়তায় স্রোতধারা মুয়াবিয়ার দিকে ঘুরে গিয়েছিল। মুয়াবিয়া পুরনো রীতি-নীতি পুনঃপ্রচলনের জন্য একটি কার্যপরিকল্পনা নির্ধারন করলো। (উম্মুল মু’মেনিন আয়েশা, আবু হোরায়রা, আনাস ইবনে মালেক, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ বিন আমর, মুগিরা বিন শোবাহ এবং সামরাহ বিন জুন্দুর-এর মত লোকেরা ছিল এর বর্ণনাকারী। আরো তথ্যের জন্য জানুন “আল হাদিসুন উম্মুল মু’মিনিন আয়েশা” এবং “মিন তারিখ আল-হাদিস”। সাইয়েদ আবুল হোসাইন শারফুদ্দিনের “আবু হোরায়রা”, শেখ মাহমুদ আবু রাইয়াহ-র “আজওয়া আলা সুন্নাহ আল-মুহাম্মাদিয়া” এবং শেখ আল-মুজিরাহ)
অতীতের সেই তথাকথিত গৌ্রবোজ্জ্বল রীতি পুনঃপ্রতিষ্টা করলো। তবে ইমাম হোসাইনের (আঃ) শাহাদাত এই সকল নীল-নকশা চিরতরে ব্যার্থ করে ছিল এবং তৎপরবর্তী খলিফাদের পক্ষে অতীত রীতি-নীতির পুনঃপ্রচলন আর কখনোই সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। এই কারনে সঠিক ইসলামের বিপরীতে দরবারী ইসলামের উদ্ভাবন ও সংযোজন কার্যক্রমের আর কোন উন্নতি দেখা যায়নি।
পরবতী খলিফারা নতুন কোন উদ্ভাবন চালু করতে পারেনি। (আব্দুল মালিকের অনেকগুলো কার্যক্রমের একটি হলো হজ্জ করার জন্য লোকজন কাবা ঘরের পরিবর্তে জেরুজালেম যাবে এবং তৈ্রীকৃ্ত ঘর তাওয়াফ করবে, কিন্তু এই উদ্ভাবন ধোপে টেকেনি। দেখুনঃ “তারিখ আল ইয়াকুবী”৩/৭-৮, নাজাফে প্রকাশিত)
ইমাম হোসাইন (আঃ) এর শাহাদাত আরও একটি সুফল বয়ে এনেছিল। ইসলামের সঠিক রুপের অনুসারী এবং মহানবীর (সাঃ) হাদিস পুরুজ্জীবনের প্রচেষ্টাকারীদের প্রতি প্রতিশোধ্মুলক কার্যাবলী, যেমন জেল-জুলুম, নির্দয় আচরন, অত্যাচার-নির্যাতন এবং হত্যাকান্ড হ্রাস পেয়েছিল, কারন পরবর্তী রাজন্যবর্গ এই ধরনের যন্ত্রনাদায়ক ও অমানবিক ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে সমর্থ হয়নি। অতঃপর তারা পুববর্তী খলিফাদের নিয়োজিত কর্মীদের সৃষ্ট হাজার হাজার জাল হাদিস হতে সঠিক হাদিস বাছাই করার জন্য তাদের সকল প্রচেষ্টা নিয়োজিত করার সিদ্বান্ত নিল, এবং এইগুলো মুসলমানদের নিকট সহজলভ্য করে দিল।
হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজের খেলাফতে আরোহনের মাধ্যমে শতবর্ষ ধরে হাদিসের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটলো। হিজরী ২য় শতকের আগমনের সাথে সাথে দরবারী ইসলামের অনুসারীরা তাদের রাজন্যবর্গের নিকট হতে মহানবীর (সাঃ) হাদিস লিপিবদ্ধ করার অনুমতি পেয়ে গেল। এই সুত্র ধরে মহানবীর এবং তাঁর সাহাবীদের জীবনী ভিত্তিক বিশাল সংখ্যক গ্রন্থ সংকলিত হলো। কিন্তু তাদের হাজার হাজার সংখ্যকের মধ্যে সঠিক ইসলামের প্রকৃত অনুসারীদের সুত্রে পাওয়া গেল মাত্র অল্প কয়েকটি হাদিস। তবে যারা রাজন্যবর্গের নিকট তাদের বিবেক বিক্রয় করে দিয়েছিল সেইসব তথাকথিত বুদ্বিজীবীদের কাছে ঐ হাদিসগুলো স্বল্প সংখ্যক হয়েও মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাড়িয়েছিল। এর থেকে উত্তরনের জন্য তারা দুটো পন্থা অবলম্বন করেছিলঃ
প্রথমতঃ বুদ্বিবৃত্তিকভাবে হাদিস বর্ণনাকারী (রা’বী)-দের সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান এবং হাদিস বাছাইকরন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই সিদ্বান্ত গৃহীত হয় যে, যদি কোন রা’বী ইমাম আলী (আঃ) এর কোন সুহ্রদ বা সহযোগী হতো, তবে তার বর্ণনাকে দুর্বল বা মূল্যহীন ভাবা হতো ।
দ্বিতীয়তঃ ইমাম আলীর (আঃ) বর্ণনা বাদ দিয়ে তারা হাদিসের বই সংকলিত করেছিল।
এইভাবে সংকলিত হাদিস বইগুলোকে “সহীহ” হিসাবে তারা পরিচিত করালো এবং সেহুলো সংখ্যায় নির্দ্ধারিত হলো ছয়টি। তন্মধ্যে বোখারীকে সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য বিবেচনা করা হল, কারন তিনি ঐ পন্থা দু’টোর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন সবচেয়ে বেশী। তিনি এমনকি খারেজী যেমন-হযরত উমর ইবনে খাত্তানের নিকট থেকেও হাদিস গ্রহণ করেছেন, কিন্তু আবু আব্দুল্লাহ জাফর সাদিকের (আঃ) নিকট হতে কোন হাদিস তার সহীহতে অন্তর্ভুক্ত করেননি। একইভাবে তিনি খলিফাদের বর্ণিত এই ধরনের সকল হাদিস, সেগুলো অসম্পুর্ন এবং টুকরা টুকরা হওয়া সত্বেও, তার সহীহতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই কারনেই দরবারী ইসলামের অনুসারীরা আল-কোরানের পর বোখারীর হাদিস গ্রন্থকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করে।
একই ভিত্তিতে আত্নজীবনী এবং ইতিহাসের গ্রন্থসমুহের মধ্যে তারিখে তাবারী-কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থ হিসাবে গন্য করা হয়। কেননা তিনিও এই ক্ষেত্রে বোখারীর পদাংক অনুসরন করেছিলেন। তিনি নব-ইসলামের কর্মকর্তাদের নিকট সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের স্বার্থের সাথে ন্যুনতমভাবেও সাংঘর্ষিক হয় এমন কোন হাদিস তার গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত না করার ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। অন্যদিকে তিনি সেই সকল হাদিসও তার গ্রন্থে উদ্ধৃতি হিসাবে এনেছেন যেগুলো খলিফাদের নিষ্টুর কার্যসমুহকে ন্যায়ানুগ প্রতিপন্ন করেছিল। এজন্য দেখা যায়, তাবারী তার গ্রন্থে ইসলামের শত্রুদের বানানো শত শত মনগড়া হাদিস বর্ণনা করেছেন, এবং এইভাবে মহানবী (সা) ও খলিফাদের সময়কালের ঐতিহাসিক সকল ঘটনাকে বিকৃ্ত করেছেন। (আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ”, ২য় খন্ড, লেখক-সাইয়েদ মুরতাজা আশকারী রঃ)
এই কারনে সেই লেখক (তাবারী) খলিফা ও তাদের সহযোগিদের প্রতি তার একনিষ্ঠ আনুগত্যের কারনে এত বিখ্যাত হয়েছিলেন যে, তিনি (তাবারী) ঐতিহাসিকগনের পুরোধা (নেতা) হিসাবে অভিহিত হন। তার পরবর্তী সময়ে ইবনে আসির, ইবনে কাসীর এবং ইবনে খালদুনের মত অন্যান্য ঐতিহাসিকগন মহানবী (সাঃ) এর সাহাবীদের ইতিহাসের ক্ষেত্রে তার লেখনীর উপর নির্ভর করেছেন। (দেখুনঃ “আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ”, ২য় খন্ড, লেখক-সাইয়েদ মুরতাজা আশকারী রঃ)
৪র্থ হিজরী শতকের পরের সময়ে দরবারী ইসলামের অনুসারীরা ঐ ৬টি হাদিস গ্রন্থ ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করে এবং সেগুলোর ভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ পরিচালনার ঘোষনা জারী করে।
ইতিহাস লেখকের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র তাবারী ও তার অনুসারীদেরকে প্রধান উৎস হিসাবে গন্য করার পরিনামে লেখকগনের সংকলিত শত শত ইতিহাস, হাদিস এবং তাফসীরগ্রন্থ বিভ্রান্তির অতল তলে নিমজ্জিত হয়েছে। (বালাজুরীর বিশালাকার ইতিহাস গ্রন্থ “আন্সাব আল-আশরাফ” এবং মাসুদীর মধ্যমাকার ইতিহাস গ্রন্থ “আখবার আল-জামান” এবং “আওসাত” হতে সংক্ষিপ্ত আকারে উদ্ধৃত)
এই পথ ধরে সঠিক ইসলামের মহানবীর (সাঃ) যা মানবজাতির জন্য অনুগ্রহ হিসাবে এনেছিলেন তার অনুসন্ধান এবং গবেষনা সকলের জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
৪র্থ হিজরী শতকের পর হতে আজ পর্যন্ত মানবগোষ্টির প্রজন্মসমুহ সেই গ্রন্থকারগনকে অন্ধভাবে অনুসরন করেছিল। এর পরিনামে এখন, মহানবীর (সাঃ) আহলে বাইতের ধারার অনুসারীগনকে ব্যাতিক্রম হিসাবে বাদ দিলে, সকল মানুষ জানে যে, “হাদিস উদ্ভাবনকারীদের” মাধ্যমে বাস্তবরূপ প্রাপ্ত দরবারী ইসলামই হচ্ছে সর্বজনস্বীকৃত ইসলাম। অতপর আমরা দেখতে পাই যে, ইসলামের সঠিকরুপ, এর বিধিবিধান, আদেশ-নিষেধ, নীতিমালা ও আমল, ইতিহাস এবং অতীতের প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের জীবনীর সঠিক চিত্র জানার পর সর্বপ্রধান বাধা হচ্ছে জাল হাদিসের অস্ত্বিত্ব।
আমরা উপরে যা উল্লেখ করেছি তার আলোকে ইহা সময়ের অতিজরুরী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে যে, ইসলামী বিশ্বের সকল প্রজ্ঞাবান এবং জ্ঞানবান পন্ডিত সঠিক ইসলাম সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য বিস্তারিত তথ্যানুসন্ধান করতে অগ্রসর হবেন। ইহা খুজে পাবার একমাত্র উৎস হচ্ছে রাসূলের (সাঃ) আহলে বাইতের (আঃ) ধারা। ।
ইহা সময়ের সবচাইতে বড় প্রয়োজন এবং ইসলামী বিশ্বের তথাঃ ইরাক, মিশর, সিরিয়া, লেবানন, ইরান এবং অন্য দেশসসমূহের সকল প্রজ্ঞাবান এবং জ্ঞানবান পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের সম্মুখে আমি ইহা উপস্থাপন করেছি। আমি আশা করি যে, আমাদের ধর্মীয় আলেম সমাজ ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিবর্গ, যারা মহানবীর ধর্মীয় উত্তরাধিকারের অভিভাবক তারা, আমার অবদানের প্রতি যথাযথ মনযোগ দিবেন এবং একটি অনুকূল সাড়া প্রদান করবেন
An Inquiry into the History of Hadith নামক গ্রন্থটিতে যারা হাদীস উদ্ভাবন এবং জালকরণে প্রত্যক্ষ সাহায্য দিয়েছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগের সেই খলিফাদের ভূমিকা সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্র সহকারে আলোচিত হয়েছে । তারা তাদের বেতনভুক্ত আস্থাভাজন ব্যক্তিবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় এই ধরণের হাদীস সংযোজন ও সংকলন করতে এবং সেগুলোকে সহীহ হিসেবে পরিচিত বা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে এর একটি প্রতিষ্ঠানিক বিকাশ সংঘটিত করেছিলেন । এই ক্ষেত্রে মহানবীর আহলে বাইতের বা তাদের অনুসারীদের উৎস হতে প্রাপ্ত হাদীসগুলো অবশ্যভাবে নিষিদ্ধ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে গোপন রাখা হয়েছিল । বনি উমাইয়া এবং বনি আব্বাসীয় শাসকরা এই সময় মহানবীর আহলে বাইতের মর্যাদা বা অসাধারণ অবস্থা জ্ঞাপক হাদীসগুলোকে প্রতিনিধিত্ব মূলক সংগ্রহ হিসেবে কদাচিৎ তাদের “অফিসিয়াল ইসলাম”-এর স্বীকৃতির আওতায় এনেছে । যাহোক, এই ধরণের সুসংগঠিত পরিমণ্ডল এবং এই কেম পরিস্থিতিতে মহানবীর আহলে বাইতের সদস্য বর্গের বিশেষ সমর্থন অথবা তাদের বিশেষ মর্যাদা জ্ঞাপক কোন হাদীস যদি সুন্নী হাদীস বেত্তাগণ্যরর উৎস হতে বর্ণিত হয়, তবে সেই হাদীসগুরোর সত্যতা স্বাভাবিকভাবেই কোনরূপ সন্দেহ ব্যতিরেকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় । পূর্ব পৃষ্ঠাগুলোতে বর্ণিত এই ধরণের নিপীড়নমূলক পরিস্থিতির মধ্যে শ্রদ্ধেয় সুন্নী হাদীস বেত্তাগণ্যরর “সিহাহ” গুলোতে এইরূপ হাদীসগুলো কিভাবে রক্ষিত হলো তা কার্যতঃ সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর এক ধরণের বিশেষ রহমত, এবং তা কোন মো’জেযার চেয়ে কোন অংশে কম নয় । এইরূপ হাদীসগুলোর একটি হলো “হাদীস আল-কিসা” (চাদরের হাদীস)। আমাদের শ্রদ্ধেয় সুন্নী হাদীস বেত্তাগণ্যরর সকল নির্ভর যোগ্য উৎসের সূত্রে আল্লামা মুরতাজা আল-আসকারী এই হাদীসটি (হাদীস আল-কিসা) এখানে উপস্থাপন করেছেন। ইহা এই হাদীসটির সঠিকতার সপক্ষে একটি জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করে, যেমনটি শিয়া হাদীস বেত্ত্বাগণ নিজেরা একে সঠিক হিসেবে গণ্য করে।
হাদীসের আকারে ইহা একতোড়া সুবাসিত ফুল, যা মহানবী (সাঃ) এবং আহলে বাইতের শানে নাজিল হওয়া তাতঞরি (পবিত্রতা)-এর আয়াতের সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে দয়। এই হাদীসগুলো সুন্নী লেখকদের লিখিত সহীহ্ হাদীস, মুসনাদ এবং তাফসীর গ্রন্থ সমূহ হতে সংগৃহীত হয়েছে।
এই হাদীসটিকে হাদীস আল-কিসা” (চাদরের হাদীস) বলা হয়, কারণ আয়াতে তাতহীর যখন নাজিল হচ্ছিল তখন মহানবী (সাঃ) এবং তার আহলে বাইতের সদস্যবর্গ একটি চাদর –দ্বারা নিজেদের আবৃত করে রেখেছিলেন; এর মাধ্যমে তারা অন্য লোকদের হতে নিজেদেরকে পৃথক করে চিহ্নিত করেছিলেন। আরবী ভাষায় ঐ ধরণের চাদরকে ‘আবা’ বা ‘কিসা’ বলা হয় এবং অধিকাংশ হাদীসেই ‘কিসা’ শব্দ –দ্বারা ঐ অর্থ বুঝানো হয়েছে। এই কারণে তাদেরকে আসহাব আল-কিসা” এবং পাঞ্জাতন আলে আবা” হিসেবেও ভূষিত করা হয়”।
হাকিম তার “মুসতাদরাকে সাহিহাই” শীর্ষক গ্রন্থে ইবনে আবু জাফর ইবনে আবু তালেব৩৪ হতে উদ্ধৃত করেছেনঃ “যখন মহানবী (সাঃ) উপলদ্ধি করলেন যে আল্লাহর পক্ষ হতে আয়াত নাজিল হওয়ার সময় আসন্ন, তখন তিনি বললেন, ‘আমার কাছে ডাক! আমার কাছে ডাক!’ সাফিয়া বললেন, হে আল্লাহর নবী, আপনার কাছে কাকে ডাকবো ?”
তিনি বললেনঃ আমার আহলে বাইতের সদস্যদের ডাক” তারা হলঃ আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইন’ (আল্লাহ তাদের উপর শা বর্ষণ করুন)। অতঃপর তাদেরকে রাসূল (সাঃ) – এর নিকটে ডাকা হল এবং তারা সকলে সেখানে সমবেত হলে মহানবী (সাঃ) তাদেরকে একটি চাদর –দ্বারা আবৃত করলেন। অতঃপর দোয়ার জন্য তিনি তার হাত উদ্ধে তুলে ধরলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ ! এরাই আমার আহলে বাইত (পরিবারের লোক)। আমার এবং আমার বংশধরদের উপর তোমার রহমত নাজিল কর”। এই সময়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তার আয়াত নাজিল করলেনঃ হে আহলে বাইত (নবী পরিবার)!আল্লাহ তো কেবল চাহেন তোমাদিগ হতে অপবিত্রতা দুর করতে এবং তোমাদিগকে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র করতে” (সূরাঃ আহযাব: আয়াত নং ৩৩)।
এই হাদীসটি উদ্ধৃত করে হাকিম বলেন, বর্ণনার উৎস/সূত্র অনুসারে এই হাদীসটি সত্য এবং সঠিক”।
তথ্যসূত্র: হাদিসের ইতিহাস অনুসন্ধান
মুলঃ আল্লামা সাইয়েদ মুরতাজা আসকারী
অনুবাদঃ মুহাম্মদ মতিউর রহমান




