Press "Enter" to skip to content

ঐতিহাসিক গাদীরের ঘটনা

ঈদ

আভিধানিকগণ ঈদ” কে “আওদ” মূলধাতু হতে গৃহীত হয়েছে বলে মনে করেন। আর “আওদ” এর অর্থ হচ্ছে প্রত্যাবর্তন। সুতরাং প্রত্যেক ঈদকে তার প্রত্যাবর্তনের কারণেই উৎযাপন করা হয়ে থাকে ।

প্রতিটি ঘূর্ণায়মান গতিশীল বস্তুই প্রত্যাবর্তনের পথে নিম্ন পরিক্রমা শেষ করে ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং তখন তার ঊর্ধ্বযাত্রা শুরু হয়। প্রকৃতিতেও আমরা তা প্রত্যক্ষ করি এবং নববর্ষকে প্রকৃতির শীতল দেহে নতুন প্রাণ সঞ্চারণের কারণে স্বাগত জানাই। প্রকৃতির সেই শীতল দেহ যা হেমন্তের আগমনে সুপ্ত ও শীতের তীব্রতায় এতটা নিশ্চিহ্ন হওয়ার দ্বার প্রান্তে পৌছে ছিল যেন অস্তিত্বে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল তা বসন্তের মৃদু মন্দ বাতাসের পদচারণায় নতুনভাবে জেগে উঠে ও ঊর্ধ্বগমন শুরু করে। এই প্রত্যাবর্তনকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হবে। তবে তা শুধুমাত্র সেই মতাদর্শের জন্য চুড়ান্ত লক্ষ্য বলে পরিগণিত হয় যা প্রকৃতি জগতের বস্তুগত দিকটিকেই সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে থাকে ।

এখন যদি এই আদর্শকে এমন একটি মতাদর্শের উপর প্রয়োগ করতে চাই যা সমগ্র বিশ্বকে মানুষের অস্তিত্বের ভূমিকা এবং তার সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে আল্লাহর ইবাদত বলে মনে করে তাহলে অবশ্যই তার ঈদকে মানুষের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিত জীবনের মহা প্রত্যাবর্তন হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। এ ধরনের মতাদর্শে মানুষের নববর্ষ এমনই এক দিন যেদিন সে তার নিজের দিকেই প্রত্যাবর্তন করে ও তার হারানো জিনিসকে সে ফিরে পায়; এটা এমনই দিন, যে দিনে বস্তু জগতের নীচতা থেকে মুক্ত হয়ে (বস্তু আসক্তির পর্দা ভেদ করে) অবস্তু ঐশী জগতের দিকে ঊর্ধ্বযাত্রা শুরু করে। এ দিন মানুষ তার অভ্যন্তরীণ পবিত্র সত্তার উপর পড়া ধুলার আবরণকে সরিয়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ লাভ করে।

পবিত্র রমজান মাস এমনই এক সময়, যে সময়ে সাধক রোজাদার রিপুর তাড়নার বিরুদ্ধে পতিরোধ গড়ে তোলার তৌফিক অর্জন করে ও আল্লাহর প্রতি ভালবাসার যে আগুন পার্থিবতার (বস্তুগত কামনার) বরফের মাঝে নির্বাপিত হয়েছিল পুনরায় তাকে জ্বলন্ত করে তোলে। সতর্ক হয়ে যায় যেন এ ভালবাসায় তার সমস্ত অস্তিত্বই উত্তপ্ত হয় ও তার অস্তিত্ব থেকে সকল প্রকার কুলষতা দূর হয়ে যায় তার হৃদয় থেকে নিখাদ নির্ভেজাল ইবাদতের দ্যুতি ছড়ায় এবং এর মাধ্যমে সৃষ্টির উদ্দেশ্য সাধিত হয়। আর তখনই হয় তার জন্য ঈদুল ফিতর।

হজ্জও তেমনি একটি সুযোগ, হাজীগণ বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করার পর সফল হয় জবেহ’র স্থানে তার বন্ধু নয় এমন কারো গলায় ছুরি চালাতে ও তার বন্দী আত্মাকে মুক্ত করে মনুষ্যত্বের পথে ঊর্ধ্বালোকের দিকে অগ্রসর হয়ে ইবাদতের উচ্চতর স্তরে পৌছার। আর তখনই তার জন্য ঈদুল আযহা।

এখানেই ঈদ এবং অন্যান্য উৎসবের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যকে লক্ষ্য করা যায়।

উৎসব পালন আনন্দের জন্য একটি অজুহাত মাত্র। কিন্তু ঈদ হচ্ছে মানুষের পূনঃর্জীবনকে স্বাগত জানানো। এটাও একটা প্রমাণ যে, আনন্দ উৎসবের বিপরীত ঈদ হচ্ছে ধর্মীয় বিষয় এবং ইসলামী ঈদসমূহ দ্বীনের একটি অংশ।

সুতরাং ইসলামী ঈদের হাকিকাত বা বাস্তবতা হচ্ছে- দ্বিতীয় বার জীবন লাভ করা ও তা নির্ধারণের দায়িত্ব পবিত্র শরীয়াত বা ধর্মের উপর।

আমরা বিশ্বাসী যে, গাদীর দিবসটি প্রকৃত ইসলামী ঈদসমূহের বৈশিষ্ট্যের সাথে যেমন সামঞ্জস্যপূর্ণ তেমনি ইসলামী আইন প্রণেতা মহান রাসূলও (সা.) এটাকে ঈদ হিসেবে মুসলিম উম্মতের নিকট তুলে ধরেছেন।

অত্র গ্রন্থটি উপরিউক্ত দু’দিক থেকে গাদীরের ঈদকে প্রমাণের পাশাপাশি এই ঈদের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানকে বর্ণনা করেছে।

এই বিবরণগুলির বিভিন্ন অধ্যায় পাঠ করে এই বিশ্বাসে উপনীত হয়েছি যে, ঈদে গাদীর দিবসটি ইসলামের মহান ঈদসমূহের একটি, যেটাকে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ঈদ বলা যেতে পারে এবং যদি পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে দেখি তাহলে উপলদ্ধি করতে পারবো যে, এটা মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ঈদ।

গাদীর

আভিধানিক অর্থে গাদীর বলতে: ক্ষুদ্র জলাশয়, পুকুর বা ডোবাকে বুঝানো হয়। ঐ সকল গর্ত যেগুলি মরুভূমিতে অপেক্ষায় থাকে যে, কখন বৃষ্টি হবে আর নিজেকে সেই বৃষ্টির পানিতে পূর্ণ করবে এবং তাকে পরিস্কার ও স্বচ্ছ করে দিবে যাতে মরুভূমির তৃষ্ণার্ত পথিকদেরকে এই সর্বদা বিস্তৃত দস্তরখান হতে পরিমাণ মত মহা মূল্যবান নেয়ামত বা অনুগ্রহ দ্বারা আপ্যায়ণ করতে পারে ও তাদের শুষ্ক মশককে পূর্ণ করে দিতে পারে, এমন ধরনের গর্তকে গাদীর বলা হয়।

গাদীরে খুম

যে সকল পথিক মদীনা হতে মক্কার দিকে যাত্রা করে, তাদের পথটির দূরত্ব হল পাচশ’ কিলোমিটারের চেয়ে একটু বেশী। এই পথিকগণ ২৭০ কিলোমিটার পথ অতিক্রান্ত করার পর যে স্থানে উপস্থিত হয়, সে স্থানটির নাম হচ্ছে “রাগেব”। “রাগেব” জোহফা’র নিকটবর্তী একটি ছোট শহর (আসারুল বাকিয়্যাহঃ লেখকঃ আবু রাইহান বিরুনী, অনুবাদকঃ আকবার দানা সেরেশত, ইবনে সিনা প্রকাশনী, প্রকাশকালঃ ১৩৫২ সাল ফারসী)

আর জোহফা হচ্ছে- হজ্জের পাচটি মিকাত বা ইহরাম বাধার স্থানসমূহের মধ্যে একটি; যেখানে শামের (সিরিয়ার) হাজীগণ ও যারা জেদ্দা থেকে মক্কায় যায়, তারা উক্ত স্থানে মোহরিম হয় বা ইহরাম বাধে। জোহফা হতে মক্কার দূরত্ব হচ্ছে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার ও “রাগেব পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার। (ইসবাতুল অসিয়্যাহ লিল ইমাম আলী ইবনে আবী তালিব (আঃ)ঃ লেখকঃ আবুল হাসান আলী ইবনে হুসাঈন ইবনে আলী মাসউদী (মৃত্যুঃ ৩৫৪ হিজরী), বাসীরাতী প্রকাশনী, কোম নগরী, পঞ্চম প্রকাশ)

সেখানে একটি জলাশয় ছিল যার পানি দুর্গন্ধ, বিষাক্ত ও পথিকদের জন্য ব্যবহার অনোপযোগী এবং কাফেলা বা পথিকরা সেখানে দাড়াতো না।বলা হয়ে থাকে সে কারণেই “খুম” নামকরণ করা হয়েছে। কারণ, “খুম” ঐ সমস্ত নষ্ট জিনিসকে বলা হয়ে থাকে যা দুর্গন্ধযুক্ত। তাই পাখির খাচাকেও এ কারণেই খুম বলা হয়ে থাকে । (আল-ইসতিয়াব ফি মা’রেফাতিল আসহাবঃ লেখকঃ আবু উমার ইফসুফ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল বার, নাহজাতুল মিসর লিত তাবাআহ ওয়ান নাশর ওয়াত তাওজিয়েন কাহিরাহ কর্তৃক প্রকাশিত)

তথ্যসূত্র: আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে গাদীর

মূল: মুহাম্মদ রেজা জাব্বারান।

ভাষান্তর: মুহাদ্দিস এম, এ, রহমান (কামিল)