Press "Enter" to skip to content

শিয়া বর্ষপঞ্জিকা (আরবী বর্ষে বিভিন্ন দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি) – ১১

প্রসঙ্গ: জিলকদ মাস

সংঙ্কলন ও অনুবাদএস, ,

১লা জিলকদ

হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.)এর জন্মদিবস

১৭৩ হিজরীর জিলক্বাদ মাসের ১ম তারিখে পবিত্র মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন হযরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.)। তার আসল নাম ছিল ফাতেমা। আর তার উপাধি ছিল  মাসুমা।

তিনি ছিলেন নবীজীর পবিত্র আহলে বাইতের (সা.) সপ্তম ইমাম হযরত মুসা কাজিমের (আ.) কন্যা এবং অষ্টম ইমাম হযরত ইমাম রেজা(আ.) এর বোন।তার মায়ের নাম ছিল নাজমা খাতুন।যাকে পুত পবিত্র ও সচ্চরিত্রার জন্য ‘তাহেরা’ বলা হত।

শৈশবে তিনি প্রাণপ্রিয় পিতাকে হারান। তার পিতা হযরত মুসা কাজিম (আ.) অত্যাচারী খলিফা হারুনুর রশিদের কারাগারে বন্দী অবস্থাতেই শাহাদত বরণ করেন। এরপর তিনি তার বড় ভাই হযরত আলী ইবনে মুসা আর-রেজা (আ.) এর নিকট লালিত পালিত হন।  (তাবাকাতে ইবনে সাআদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫১, নাসেখুত তাওয়ারিখ, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬৮, রিয়াহিনুশ শারিয়া, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৫, সাহিয়াতুর রেযা, পৃষ্ঠা ২৩৬, মোসতাদরাকুল ওসায়েল, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৩৬৮)

1.      আশআশ বিন কাইসের মৃত্যুদিবস

সন ৪০ হিজরীতে আশআশ বিন কাইস মারা যায়। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন যে, আশআশ বিন কাইস ইমাম আলী (আ.)কে শহীদ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল। তার মেয়ে জোওদা বিন আশআশ ইমাম হাসান (আ.)কে বিষ দানের মাধ্যমে শহীদ করে এবং তার ছেলে কারবালাতে ইমাম হুসাইন (আ.)এর বিরূদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

আশআশ ১০ হিজরীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং রাসুল (সা.) এর ওফাতের পরে মুরতাদ হয়ে যায়। পরে হজরত আবু বকর তাকে বন্দি করে এবং তার অন্ধ বোনের সাথে তার বিবাহ দেয়। অতঃপর জোওদা এবং মোহাম্মাদ নামের দুটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তারা উভয়ে বেহেস্তের দুই সর্দারকে শহীদ করে।  (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ২২৮, তাহযিবুল কামাল, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৯৪, আল এসাবা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪০, তারিখে দামেস্ক, খন্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৪৪, উসদুল গাবা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৮)

১১ই জিলকদ

ইমাম রেযা (আ.)এর জন্মদিবস

সন ১৪৮ হিজরী রোজ বৃহঃস্পতিবার ইমাম রেযা (আ.) মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইমাম কাযিম (আ.) এবং মাতার নাম নাজমা খাতুন। তিনি রেযা নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন এবং তাঁর উপনাম ছিল আবুল হাসান। (আলামুল ওয়ারা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪০, তাজুল মাওয়ালিদ, পৃষ্ঠা ৪৮, কাশফুল গুম্মা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯৭, মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৯৭, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ২১২)

১২ই জিলকদ

হজরত মুসলিম (আ.)এর পত্র

সন ৬০ হিজরী হজরত মুসলিম ইবনে আকিল (আ.)তাঁর মৃত্যুর ২৭ দিন পূর্বে ইমাম হুসাইন (আ.)কে পত্র প্রেরণ করেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রায় ১৮ হাজার কুফাবাসী আমার কাছে বাইয়াত করেছে। কিন্তু ইবনে যিয়াদের কুটিল ষড়যন্ত্রের কারণে কুফাবাসীরা তাঁকে একলা রেখে দূরে সরে যায়। আর এ সুযোগে ইবনে যিয়াদ তাঁকে মিথ্যা ওয়াদা প্রদানের মাধ্যমে তাঁকে আটক এবং হত্যা করে। (নাফসুল মাহমুম, পৃষ্ঠা ৮৪, মাকতালুল হুসাইন (আ.) পৃষ্ঠা ৭২, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭১, আশ শহীদ মুসলিম বিন আকিল (আ.), পৃষ্ঠা ৮৭, ওয়াকায়াউশ শুহুর, পৃষ্ঠা ২১৩)

২৩শে জিলকদ

1.  ইমাম রেযা (আ.)এর শাহাদত দিবস

আব্বাসীয় শাসকদের মধ্যে বাদশা হারুন এবং মামুনই ছিল সবচেয়ে’ পরাক্রমশালী এবং দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। তারা প্রকাশ্যে আহলে বাইতের ইমামদের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তির কথা বলে বেড়াতেন কিন্তু ভেতরে ভেতরে ইমামদের প্রতি ভীষণ বিদ্বেষী ছিলেন। ইমামদের প্রতি তাঁদের এ ধরণের আচরণের উদ্দেশ্য ছিল দুটো। এক, আলাভিদের আন্দোলনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া এবং দুই শিয়া মুসলমানদের মন জয় করা। ইমামদের সাথে সম্পর্ক থাকার প্রমাণ থাকলে তাদের শাসন সকল মুসলমানের কাছে বৈধ বলে গৃহীত হবে-এ ধরণের চিন্তাও ছিল তাদের মনে। কেননা; মুসলমানরা যদি দেখে যে , হযরত আলীর (আ) পরিবারবর্গের সাথে বাদশাহর সম্পর্ক বা যোগাযোগ রয়েছে , তাহলে তারা আব্বাসীয়দের শাসনকে বৈধ মনে করে খুশি হবে , ফলে তারা আর বিরোধিতা করবে না। এর ফলে তাদের শাসনকার্য পরিচালনা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হবে। ইমাম রেযা (আ) শাসকদের এই অভিসন্ধিমূলক রাজনীতি বুঝতে পেরে তাদের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব একটি কৌশল অবলম্বন করেন। তাঁর ঐ কৌশলটির ফলে একদিকে বাদশা মামুনের উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হয় , অপরদিকে মুসলিম বিশ্বের জনগণও প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে পারে। এ সময় নবীবংশের সমর্থকরা প্রচার করতে থাকেন যে , আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ইসলামী খেলাফতের প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবলমাত্র নবী পরিবারের পবিত্র ইমামগণের ওপর ন্যাস্ত থাকবে এবং তাঁরা ব্যতীত কেউ ঐ পদের যোগ্য নয়। জনগণের মাঝে এই সত্য প্রচারিত হলে স্বাভাবিকভাবেই তারা বাদশার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠবে-এই আশঙ্কায় মামুন ইমাম রেযাকে (আ) সবসময়ই জনগণের কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। শুধু ইমাম রেযা কেন প্রায় সকল ইমামকেই এভাবে গণবিচ্ছিন্ন করে রাখার জন্যে উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকরা তাঁদেরকে কঠোর প্রহরার মধ্যে রাখার ষড়যন্ত্র করে। তারপরও ইমামদের সুকৌশলের কারণে তাঁদের বার্তা জনগণের কাছে ঠিকই পৌঁছে যায়।

বিশেষ করে বাদশা মামুনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ইমাম রেযা যখন দাঁড়িয়ে গেলেন, তখন ইরাকের অধিকাংশ লোক মামুনের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল।

হযরত আলীর (আ) খান্দানের কেউ বাদশাহর বিরুদ্ধে গেলে বাদশাহী যে হারাতে হবে-এই আশঙ্কা মামুনের মধ্যে ছিল। যার ফলে মামুন একটা আপোষনীতির কৌশল গ্রহণ করে। বাদশাহ মামুন ইমামকে খোরাসানে আসার আমন্ত্রণ জানায়। ইমাম প্রথমত রাজি হন নি, কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁকে আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি বসরা অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি তাঁর গতিপথ পরিবর্তন করে ইরানের দিকে পাড়ি দেন। যাত্রাপথে তিনি যেখানেই গেছেন জনগণ তাঁকে সাদরে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে। ইমামও নবীজীর সুন্নত , তাঁর আহলে বাইতের ইমামদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য এবং ইসলামের সঠিক বিধি-বিধান সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন। সেইসাথে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য অর্থাৎ বাদশাহর আমন্ত্রণের কথাও তাদেরকে জানান। চতুর বাদশাহ মামুন ইমামের আগমনে তার সকল সভাসদ এবং অন্যান্য লোকজনকে সমবেত করে বলেন, হে লোকেরা ! আমি আব্বাস এবং আলীর বংশধরদের মধ্যে অনুসন্ধান করে দেখেছি, আলী বিন মূসা আর রেযা (আ.)এর মতো উত্তম লোক দ্বিতীয় কেউ নেই। তাই আমি চাচ্ছি যে , খেলাফতের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করবো এবং এই দায়িত্ব তাঁকে অর্পণ করবো ইমাম, মামুনের রাজনৈতিক এই দুরভিসন্ধি সম্পর্কে জানতেন। তাই তিনি জবাবে বললেন, মহান আল্লাহ যদি খিলাফত তোমার জন্যে নির্ধারিত করে থাকেন, তাহলে তা অন্যকে দান করা উচিত হবে না। আর যদি তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে খেলাফতের অধিকারী না হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর খেলাফতের দায়িত্ব কারো উপর ন্যস্ত করার কোনো অধিকার তোমার নেই।

ইমাম শেষ পর্যন্ত মামুনের কথায় খেলাফতের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করায় মামুন ইমামকে তার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার হতে বাধ্য করে। ইমাম রেযা (আ) শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে কিছু শর্তসাপেক্ষে তা গ্রহণ করেন। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত ছিল তিনি প্রশাসনিক কোনো দায়িত্ব পালন করবেন না। তিনি কেন এ ধরণের শর্তারোপ করেছিলেন , তার কারণ দায়িত্ব গ্রহণকালে প্রদত্ত তাঁর মুনাজাত থেকেই সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি মুনাজাতে বলেছিলেন , হে খোদা ! তুমি ভালো করেই জানো , আমি বাধ্য হয়ে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। সুতরাং আমাকে এজন্যে পাকড়াও করো না। যেমনিভাবে তুমি ইউসূফ ও দানিয়েল ( আ) কে পাকড়াও করো নি। হে আল্লাহ ! তোমার পক্ষ থেকে কোনো দায়িত্ব ও কর্তব্য ব্যতিত আর কোনো কর্তৃত্ব হতে পারে না। আমি যেন তোমার দ্বীনকে সমুন্নত রাখতে পারি , তোমার নবীর সুন্নতকে যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি।

ইমাম রেযার এই দায়িত্ব গ্রহণের খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে আব্বাসীয়রা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তারা ভেবেছিল , খেলাফত বুঝি চিরদিনের জন্যে আব্বাসীয়দের হাত থেকে আলীর (আ) বংশধরদের হাতে চলে গেল। তাদের দুশ্চিন্তার জবাবে বাদশা মামুন তার মূল অভিপ্রায়ের কথা তাদেরকে খুলে বলেন। ফলে মামুনের দুরভিসন্ধি প্রকাশ পেয়ে যায়। মামুনের এই অভিসন্ধির কথা জানার পর আব্বাসীয়রা ইমামকে বিভিন্নভাবে হেয় ও মর্যাদাহীন করে তোলার চেষ্টা চালায়। কিন্তু জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ ইমামকে তারা কিছুতেই অপদস্থ করতে পারে নি। বাদশা মামুন একবার তার সাপ্তাহিক প্রশ্নোত্তরের আসরে ইমামকে আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে ইমাম কোনো এক প্রোপটে মামুনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিমত দেন। এতে বাদশা ভীষণ ক্ষেপে যান এবং ইমামের বিরুদ্ধে অন্তরে ভীষণ বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকেন। ঐ ঘটনা ছাড়াও ইমামত , জনপ্রিয়তা , খেলাফত , আলীর বংশধর প্রভৃতি বিচিত্র কারণে বাদশাহ ইমামের বিরুদ্ধে শত্র”তা করতে থাকে। পক্ষান্তরে জনগণ উপলব্ধি করতে পারে যে , খেলাফতের জন্যে মামুনের চেয়ে ইমামই বেশি উপযুক্ত। ইমামের বিরুদ্ধে মামুনের ক্রোধ এবং হিংসা যতো বাড়তে থাকে , ইমামও মামুনের বিরুদ্ধে অকপট সত্য বলার ক্ষেত্রে নির্ভীক হয়ে ওঠেন। কোনোভাবেই যখন ইমামকে পরাস্ত করা গেল না , তখন মার্ভ থেকে বাগদাদে ফেরার পথে ইরানের বর্তমান মাশহাদ প্রদেশের তূস নামক অঞ্চলে মামুন ইমামকে আঙ্গুরের সাথে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করে হৃদয়জ্বালা মেটাবার চেষ্টা করে। ২০৩ হিজরীর ২৯শে সফরে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। তখন ইমামের বয়স ছিল পঞ্চান্ন বছর।

এক বর্ণনা অনুযায়ি ইমাম রেযা (আ.) ২০৩ হিজরীর উক্ত দিনে শাহাদত বরণ করেন। (মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ১৬, আল আদাদুল কাভিয়া, পৃষ্ঠা ২৭৫, মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ১৬, ইকবাল, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৩, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ৯৭)

2.  বণি কুরাইযার যু্দ্ধ

সন ৪ হিজরী বণি কুরাইযার যু্দ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে মুসলমান সৈন্যদের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার। উক্ত যুদ্ধে শুধুমাত্র খাল্লাদ বিন সাওয়িদ শাহাদত বরণ করেন। অপরপক্ষে কাফেরদের সংখ্যা ছিল ৯০০ জন এবং তারা সকলেই মারা যায়। অন্য এক মত অনুযায়ি উক্ত যুদ্ধটি শাওয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয়। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১৯, পৃষ্ঠা ১৭০, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৯৬, আত তাম্বিহ ওয়াল ইশরাফ, পৃষ্ঠা ২১৭, তাবাকাতুল কুবরা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৪, আল মাউসুআতুল কুবরা ফি গাযাওয়াতিন নাবিইল আযাম, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৯২)

২৫শে জিলক্দ

1.      মার্ভ অভিমুখে ইমাম রেযা (আ.) এর যাত্রা

সন ২০০ হিজরীর উক্ত দিনে ইমাম রেযা (আ.) মদীনা থেকে মার্ভ অভিমুখে যাত্রা করেন। মামুন ‘রাজা বিন আবি যাহহাক’কে আহওয়াযের পথ দিয়ে ইমাম রেযা (আ.)কে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়। ইমাম রেযা (আ.) যাত্রার পূর্বে তাঁর পরিবার পরিজনদেরকে একত্রিত করেন এবং তাদেরকে বলেন: তোমরা আমার জন্য ক্রন্দন কর কেননা আমি আর মদীনায় ফিরে আসবো না এবং পরবাসে আমাকে শহীদ করা হবে।

মামুনের নির্দেশের কারণে কারণে ইমাম রেযা (আ.)কে পরিকল্পিতভাবে নিদৃষ্ট পথ দ্বারা মদিনা থেকে মার্ভে নিয়ে আসা হয়। ইমাম রেযা (আ.)কে মদিনা থেকে বাসরা, বাসরা থেকে সুকুল আহওয়ায’এর পথ দ্বারা ইরানের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে দিয়ে খোরাসান এবং তারপরে মার্ভে প্রবেশ করানো হয়। মদিনা থেকে মার্ভে আসার জন্য অন্য রাস্তাও সে যুগে ছিল যেমন: মদিনা থেকে কুফা, কুফা থেকে বাগদাদ, বাগদাদ থেকে রেই, রেই থেকে কুম, কুম থেকে খোরাসান এবং খোরাসান থেকে মার্ভ।

দ্বিতিয় উল্লেখিত রাস্তা থেকে এজন্য ইমাম রেযা (আ.)কে আনা হয়নি  কেননা কুফা এবং কুম হচ্ছে আহলে বাইত (আ.) অনুসারিদের ঘাটি এবং বাগদাদ হচ্ছে আব্বাসিয়দের ঘাটি যারা ছিল ইমাম আলি (আ.)’এর বংশদরদের চরম শত্রু। এমন যেন না হয় যে, তারা হজরত আলি (আ.)’এর সন্তানদের সাথে শত্রুতা থাকার কারণে ইমাম রেযা (আ.)কে হত্যা করে দেয়। আর এ কারণে মামুন প্রথম পথটিকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বলে মনে করে এবং উক্ত পথ দিয়ে ইমাম রেযা (আ.)কে মার্ভে নিয়ে আসে। ইমাম রেযা (আ.)’এর উক্ত সফরকে আমরা ৫ ভাগে ভাগ করতে পারি:

১- মদিনা থেকে বাসরা।

২- বাসরা থেকে ফার্স

৩- ফার্স থেকে ইয়াযদ।

৪- ইয়াদ থেকে খোরাসান।

৫- ইমাম রেযা (আ.) ও খোরাসান।

2.     খোরাসানে ইমাম রেযা (আ.)’এর অবস্থান

ইমাম রেযা (আ.)’এর নিশাপুরে অবস্থানের কথা বিভিন্ন রেওয়ায়েত ও ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। আর “হাদিসে সিলসিলাতুল যাহাব” হচ্ছে উক্ত ঘটনার প্রমাণ স্বরূপ।

ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম রেয়া (আ.) যখন নিশাপুরে পৌছান তখন তিনি এক লোকের মালিকানায় তার অনুমতিক্রমে অবস্থান করেন। সেখানে একটি একটি ঝর্ণাধারার সৃষ্টি হয় ইমাম (আ.) উক্ত পানি দ্বারা গোসল করেন এবং নামাজ আদায় করেন।

নিশাপুর থেকে রওনা হওয়ার পরে ইমাম আরেকটি ঝর্ণাধারার নিকটে পৌছান সেখানে একটি পাথর কাঠের তক্তার ন্যায় ছিল। ইমাম (আ.) সেখানে দাড়িয়ে নামাজ আদায় করেন আর নামাজ আদায়কালে তাঁর পায়ের ছাপ উক্ত পাথরের উপরে থেকে যায় যা আজও পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে।

নিশাপুরের পরে ইমাম রেযা (আ.) তুস শহরের দিকে অগ্রসর হন। তিনি যোহরের সময় দাহ সুরখ নামক গ্রামের একটি পাহাড়ের নিকটে পৌছান। তিনি ওযুর জন্য সামান্য পরিমাণ মাটিকে খনন করলে সেখান থেকেও একটি ঝর্ণার উৎস হয় যা আজও পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে।

যখন তিনি তুস শহরে প্রবেশ করেন। তখন সেখানে তিনি একটি বাগান দেখতে পান যেখানে খলিফা হারুনর রশিদের কবর ছিল। যেখানে ইমাম রেযা (আ.)কে দাফন করা হবে তিনি সেখানে নামাজ আদায় করেন।

যখন ইমাম রেযা (আ.) তুস নগরির পরে সারখাস নামক স্থানে প্রবেশ করেন তখন তাকে বন্দি করা হয়। মামুন দুইটি কারণে ইমাম (আ.)কে বন্দি করার নির্দেশ দেয়।

১- হাদীসে সিলসিলাতুল যাহাব বর্ণনা করার কারণে।

২- নিশাপুরের জনগণের উষ্ণ সম্বোর্ধনা জানানোর কারণে।

কেননা মামুন এমনভাবে ইমাম (আ.)কে মদিনা থেকে মার্ভে নিয়ে আসে যেন কোন শিয়া বা আহলে বাইত (আ.)’এর অনুসারিরা তার সানিধ্যে অর্জন করতে না পারে। কিন্তু সে যা চিন্তা করেছিল তার বিপরিতটিই ঘটে আর এ কারণে সে ইমাম (আ.)কে সারখাস নামক এলাকা থেকে বন্দি করার নির্দেশ দান করে। আর নিজের ষড়যন্ত্রকে গোপন করার জন্য সে প্রচার করে যে ইমাম রেযা (আ.) উলুহিয়াত’এর (নিজেকে খোদা বলে দাবি করা) দাবি করেছেন আর এ কারণেই তাঁকে বন্দি করা হয়েছে। আর সে চেয়েছিল এভাবেই মুসলমানদেরকে ইমাম (আ.)’এর কাছ থেকে দূরে রাখেতে।  (উয়ুনে আখবারে রেযা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩৫, মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৫৫৬, ওয়াকায়েউশ শুহুর, পৃষ্ঠা ২১৭)

3.    দাহুল আরদ

“দাহুল আরদ” হচ্ছে জিলকদ মাসের ২৫ তারিখ। আল্লাহ পৃথিবিকে সৃষ্টির পরে এই দিনেই প্রথম মাটি পরিলক্ষিত হয় এবং তা ধিরে ধিরে বর্তমান বিশ্বের এক চতূর্থাংশে রূপলাভ করে।

রেওয়ায়েতের বর্ণনামতে পৃথিবির প্রথম যে মাটির অংশটি পরিলক্ষিত হয় তা হচ্ছে বর্তমানে অবস্থিত পবিত্র কাবা শরিফের মাটি।

“دَحو” এর অর্থ হচ্ছে বিস্তৃত হওয়া। আর “دحوالارض” এর অর্থ পৃথিবির বিস্তৃতি লাভ করাকে বুঝায়। (মেসবাহুল মোতহাজজেদ, পৃষ্ঠা ৬১১, তৌযিহুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ২৮, ওসায়েলুশ শিয়া, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৪৪৯, ইকবাল, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২২- ৩০, মান লা ইয়াহ যারুহুল ফাকিহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৮৯)

২৬শে জিলকদ

বিদায় হজের উদ্দেশ্যে রাসুল (সা.)এর শেষ যাত্রা

সন ১০ হিজরী বিদায় হজের উদ্দেশ্যে রাসুল (সা.)এর শেষ যাত্রা করেন। রাসুল (সা.) এর উক্ত যাত্রা সম্পর্কে এছাড়াও ২৬শে জিলকদ সহ অন্যান্য মতামতও বর্ণিত হয়েছে। উক্ত সফরে হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) উম্মুল মুমিনিন হজরত উম্মে সালামা, আসমা, হাফসা এবং আয়েশা প্রমূখ অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া শুধুমাত্র মদীনা থেকে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার লোকজন উক্ত সফরে অংশগ্রহণ করেছিল।  (আল গাদির, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৯, কাফি, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৪৫- ২৪৮তাফসিরে আইয়াসি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৮৯, ওসায়েলুশ শিয়া, খন্ড ১৩, পৃষ্ঠা ১৯৯, এলালুশ শারায়ে, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪১২)

জিলকদ মাসের শেষ তারিখ

1.      ইমাম মোহাম্মাদ তাক্বি (আ.)এর শাহাদত

মুমিনদের ৯ম ইমাম মোহাম্মাদ তাক্বি (আ.) ২২০ হিজরীতে আব্বাসীয় খলিফা মোতাসিমের বিষ দানের কারণে শাহাদত বরণ করেন। শাহাদতকালে তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর ৩ মাস ও ১২ দিন। এছাড়াও তার শাহাদত সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত বর্ণিত হয়েছে যেমন: ৫ই জিলকদ, ১১ই জিলকদ, ২১৯ হিজরী ৫ই জিলহজ্ব, ৬ই জিলহজ্ব, ২৫ জিলহজ্ব উল্লেখযোগ্য।  (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯৫, কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৯২, তাহযিবুল আহকাম, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৯০, কাশফুল গুম্মা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭০, রওযাতুল ওয়ায়েযিন, পৃষ্ঠা ২৪৩)

2.     হুদাইবিয়ার সন্ধি

সন ৬ হিজরীতে হুদাইবিয়ার সন্ধি সংঘটিত হয়। রাসুল (সা.) উমরা হজের জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাসুল (সা.) এর সাথে প্রায় এক হাজার দুই শত বিশ জন উক্ত সফরে অংশগ্রহণ করেন এবং কুরবানির জন্য ৭০টি উট সাথে নেন। তারা সাজারা নামক মসজিদে এহরাম বাঁধেন এবং মক্কার হুদাইবিয়া নামক স্থানে একত্রিত হন। সেখানে একটি কূপ ছিল যার পানি ছিল না কিন্তু যখন রাসুল (সা.) এর সেখানে অবস্থানের কারণে কুপের পানি এতই বেশে হয়ে যায় যে পানি উপচে পড়তে থাকে। কিন্তু সে বছর মক্কার মুশরিকরা হজ করতে বাধা দেয় এবং একটি সন্ধির রূপ লাভ করে যার নাম রাখা হয় হুদাইবিয়ার সন্ধি। (আল ইস্তিয়াব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৯১৭, কাফি, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৫২, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৮৮, আত তাম্বিহ ওয়াল ইশরাফ, পৃষ্ঠা ২২১, মোওয়াকেফুশ শিয়া, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৮)

 

 

More from ঐতিহাসিক ঘটনাবলিMore posts in ঐতিহাসিক ঘটনাবলি »
More from বর্ষ পঞ্জিকাMore posts in বর্ষ পঞ্জিকা »