হযরত আবু বকর ও হযরত উমর খলিফা হিসেবে হযরত আলীকে প্রথম অভিনন্দন জানান। ওহী নাজিল হওয়ার পর আল্লাহর রসূল (সা.) তাকবীর ধ্বনি দিয়ে বলেন: আল্লাহপাক দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ এবং নিয়ামত সম্পূর্ণ করেছেন। তিনি আমার রেসালাত ও আমার পরে আলী (রা.)—এর নেতৃত্বে সন্তুষ্ট। তারপর সবাই হযরত আলীকে অভিনন্দন জানান। প্রথমে অভিনন্দন জানান হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর (রা.), উসমান এবং পরে অন্যরা। হযরত আলীকে অভিনন্দন জানিয়ে তারা বলেছিলেন: ‘হে আবি তালিবের পুত্র, তোমাকে অভিনন্দন। আজ তোমার উপর দায়িত্ব এসেছে। তুমি আমাদের এমনকি সব নারী ও পুরুষের অভিভাবক।’ হযরত উমর এবং আবু বকর বলেন: ‘শাবাশ ইবনে আবি তালিব! আজ আপনি সকল মু’মিন পুরুষ ও নারীর নেতা (মাওলা) হয়ে গেছেন।’
It seemed clear enough at the time. Certainly Omar thought it was. He came up to Ali and congratulated him. `Now morning and evening you are the master of every believing man and woman,’ he said. Surely this meant that Omar had taken Muhammad’s declaration to mean that Ali was now formally his heir, and it is hard to imagine that Omar was the only one to understand Muhammad’s words this way.
অর্থাৎ তখন ব্যাপারটা যথেষ্ট স্পষ্ট মনে হচ্ছিল। অবশ্যই উমর তাই ভেবেছিলেন। তিনি আলীর কাছে এসে তাকে অভিনন্দন জানান: ‘এখন সকাল ও সন্ধ্যায় আপনি প্রতিটি মু’মিন নর—নারীর প্রভু।’ অবশ্যই তার অর্থ ছিল যে, উমর মুহাম্মদের ঘোষণাকে এভাবে ধরে নিয়েছিলেন যে, আলী এখন আনুষ্ঠানিকভাবে তার উত্তরাধিকারী এবং এটা কল্পনা করা কঠিন যে, উমরই একমাত্র ব্যক্তি যিনি মুহাম্মদের কথা এভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। (সূত্র: আফটার দ্য প্রোফেট, লেসলি হেজেলটন, পৃষ্ঠা—৪৯)
গাদিরে খুমে রাসূলুল্লাহ (সা.) তার ভাষণে হযরত আলীর নাম ৪০ বারের বেশি উচ্চারণ করেছেন এবং হযরত আলীকে বুঝাতে সর্বনাম ব্যবহার করেছেন অনেক বার। তিনি তার ভাষণে হযরত আলীর পদমর্যাদা বুঝাতে নিচের পরিভাষাগুলো ব্যবহার করেছেন:
———ওয়ালি ও মাওলা (অভিভাবক ) শব্দ দুটি ১৫ বার
————ইমাম (নেতা) শব্দটি ১২ বার
————আমির (অধিনায়ক বা শাসক) শব্দটি সাত বার
————আখ (ভাই) শব্দটি চার বার
———খলিফা (প্রতিনিধি) শব্দটি তিন বার
———হাদি (পথপ্রদর্শক) শব্দটি তিন বার।
ইসলামে উত্তরাধিকারী নিয়োগের ক্ষমতা একমাত্র ইমামের। ইমামের কর্তৃত্ব নির্বাচকমণ্ডলীর উপর নির্ভরশীল নয়। তার প্রতি সাধারণ মানুষের আনুগত্য স্বীকারের কোনো প্রয়োজন নেই। ইমামকে ‘মানসুস’ (মনোনীত) হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং উত্তরাধিকারী নিয়োগে তার ক্ষমতাকে ‘নাস আল—জালি’ বলা হয়। ‘নাস’ মানে ইমামের উত্তরাধিকারী নিয়োগ। রসূল (সা:) এ ক্ষমতা বলে হযরত আলীকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। উত্তরাধিকারী নিয়োগ বাতিল বা পরিবর্তন করা যায় না। ইমাম জাফর সাদিক বলেছেন, আল্লাহ ইমাম পরিবর্তন করা ছাড়া সব কিছুতে পরিবর্তন আনতে পারেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক ইমাম জানেন তার পরে কে ইমাম হবেন এবং তিনি তাকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নিয়োগ করেন। (সূত্র: বিহারুল আনোয়ার ২৩:৭৩)। পরবর্তী ইমাম কে হবেন তা আল্লাহ অবহিত করা নাগাদ পূর্ববর্তী ইমামের মৃত্যু হবে না। নূর এবং ইলমের অধিকারী ইমাম হবেন মাসুম ও নির্ভুল।
রসূল আল্লাহর হুকুমে উত্তরাধিকারী হিসেবে হযরত আলী (রা.)—কে নিয়োগ দানে বিশ্বজনীন রীতি অনুসরণ করেছেন। ইবনে মাজাহর প্রথম খণ্ডের ৪৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়, হজ্জের সময় মুয়াবিয়া হযরত আলী (রা.)—এর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করলে সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস রেগে গিয়ে বলেছিলেন: ‘আপনি এই লোকটির প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করছেন! আমি আল্লাহর রসূলকে গাদির দিবসে ঘোষণা করতে শুনেছি: আমি যার প্রভু ছিলাম, আমার পরে আলী (রা.) হবেন তার প্রভু। আমি তাকে আরও বলতে শুনেছি: আমার কাছে আলীর (রা.) মযার্দা হলো মূসার কাছে হারুনের মর্যাদার মতো। ব্যতিক্রম হচ্ছে যে, আমার পরে আর কোনো নবী আসবেন না। আমি খায়বর যুুদ্ধে তাকে ঘোষণা করতে শুনেছি: আজ আমি সত্যি এমন একজনের কাছে পতাকা হস্তান্তর করতে যাচ্ছি যিনি আল্লাহ ও তার রসূলকে ভালোবাসেন এবং আল্লাহ ও তার রসূল তাকে ভালোবাসেন।’
বুখারীর ৩৭০৬ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, হারুন মুসার কাছে যা ছিলেন হযরত আলী (রা.) রসূল (সা.)—এর কাছে ছিলেন ঠিক তাই। হারুন মুসার কাছে কি ছিলেন, শুধু ভাই নাকি উত্তরাধিকারী? হযরত হারুন মুসার উত্তরধিকারী হয়ে থাকলে নিঃসন্দেহে হযরত আলী রসূলের উত্তরাধিকারী।
অসৎ উদ্দেশ্যে গাদিরে খুমের হাদিসকে আড়াল করা হচ্ছে। গাদিরে খুমের হাদিসকে অস্বীকার করার জন্য হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়। এ হাদিসে বলা হয়েছে, রসূল হযরত আয়েশার কোলে মাথা রেখে ইন্তেকাল করেছেন। এ ব্যাপারে আয়েশা বলেন, রসূল তার কোলে মাথা রেখে ইন্তেকাল করেছেন। অতএব রসূল কাউকে তার উত্তরাধিকারী নিয়োগ করে থাকলে তিনি তার কাছে বলে যেতেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে যে, রসূল হযরত আয়েশার নয়, হযরত আলীর কোলে মাথা রেখে ইন্তেকাল করেছেন।
‘আব্বাসীয়রা ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম ও ইমাম মালেককে সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দিতো। এ তিনজন ইমাম হযরত আলীর মর্যাদা বিনষ্টকারী হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন। শুধু তাই নয়, এসব হাদিস গ্রন্থে স্পষ্ট করে লেখা হয়েছে যে, হযরত আলীর কোনো মর্যাদা বা ফজিলত নেই। যেমন—বুখারী তার সহীহ মানাকিব উসমান অধ্যায়ে ইবনে উমরের এ কথা বর্ণনা করেছেন যে, আমরা রসূলের যুগে আবু বকরকে, তারপর উমরকে, তারপর উসমানকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ গণ্য করতাম। অতঃপর রসূলের বাদবাকি সাহাবীদের সমান চোখে দেখা হতো। কারো মর্যাদা কারো চেয়ে কম—বেশি ছিল না। বুখারী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা—১৯১ ও ২০১।’ (সূত্র: আমিও সত্যবাদীদের সঙ্গী হয়ে গেলাম: ড. মুহাম্মদ তিজানী আল—সামাভী)
রসূল (সা.)—এর ওফাতের দুমাসের মধ্যে লোকেরা গাদিরে খুমে হযরত আলীকে রসূলের খিলাফত দানের স্মৃতি ভুলে যায়। অনেকেই অস্বীকার করে যে, গাদিরে খুমে তারা কিছুই শোনেনি। তাদের একজন ছিলেন সাহাবী আনাস বিন মালিক। হযরত আলী তাকে সাক্ষ্য দিতে বললে তিনি অস্বীকার করেন। মালিকের অসততায় ক্ষুদ্ধ হয়ে হযরত আলী তাকে অভিশাপ দেন। অভিশাপে সাহাবী আনাস বিন মালিক কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। ইমাম হোসেনের অন্যতম খুনি সিনান বিন মালিক ছিলেন সাহাবী আনাস বিন মালিকের পুত্র।
বলা হচ্ছে, রসূল বলে গেছেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। একটি হলো আল্লাহর কুরআন এবং আরেকটি হলো আমার সুন্নাহ।’ এখানে আহলে বাইত শব্দটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সন্দেহ নেই, রসূল ‘সুন্নাহ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। আবার ‘আহলে বাইত’ (আমার রক্তসম্পর্কীয় বংশধর) শব্দটিও উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু বাংলায় প্রকাশিত বুখারী শরীফের সর্বশেষ সংস্করণে আহলে বাইত বাদ দিয়ে সুন্নাহ শব্দটি সংযোজন করা হয়েছে। অথচ বুখারী শরীফের পঞ্চম খণ্ডে শব্দটি ছিল। সেখানে এক পৃষ্ঠায় লেখা ছিল: ‘আহলে বাইত’ এবং অন্য পৃষ্ঠায় লেখা ছিল ‘কুরআন ও পরিজন।
হযরত আলী (রা.) খোলা ময়দানে দাঁড়িয়ে জনগণকে উদ্দেশ করে বললেন: যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গাদিরে খুমের ভাষণ শুনেছেন তিনি যেন উঠে দাঁড়ান। এ কথা শুনে সাঈদের পক্ষ থেকে ছয়জন এবং জায়েদের পক্ষ থেকে ছয়জন উঠে দাঁড়ান। তারা সাক্ষ্য দেন যে, তারা গাদিরে খুমে হযরত আলী (রা.)—কে উদ্দেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন: হে আল্লাহ, আমি যার মাওলা, এই আলীও তার মাওলা। হে আল্লাহ, যে তাকে বন্ধু বানাবে তুমি তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো এবং যে তার সঙ্গে শত্রুতা করবে, তুমি তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করো।
সুন্নি তথ্যসূত্র:
মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা—২৮১
তাফসীর আল—কবির, ফখর আল—রাজি, দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা—৪৯—৫০
মিশকাত আল—মাসাবিহ, আল—খতিব আল—তাবরিজী, পৃষ্ঠা —৫৫৭
হাবিব আল—সিয়ার, মীর খন্দ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা—১৪৪
কিতাবুল উইলায়াহ, ইবনে জারির আল—তাবারী
আল—মুসান্নাফ, ইবনে আবি শায়বা
আল—মুসনাদ, আবু ইয়া’আলা
হাদিস আল—উইলায়াহ, আহমদ ইবনে উকদাহ
তারিখ, খতীব আল—বাগদাদী, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা—২৯০



