‘নাজরান’ হচেছ একটি শহর যা মক্কা ও ইয়ামানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত৷ প্রায় ৭৩ টি গ্রাম এই শহরের অধীনে ছিল৷ ইসলামের প্রাথমীক পর্যায়ে এই শহরের প্রতিষ্ঠিত মাযহাব ছিল মাসীহী (খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী)৷ সে সময় মাসীহী ধর্মের বড় বড় আলেম বা পোপ এই শহরেই জীবন-যাপন করতো৷ সে দিনের সেই নাজরান শহরটি বর্তমানে ভ্যাটিক্যান দেশ হিসেবে পরিচিত৷
নাজরানের প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী ছিল আ’কাব নামে এক ব্যক্তি এবং আবু হারিছাহ্ ছিল সেখানকার মাযহাবী বা ধর্মীয় নেতা৷ আর জনসাধারণের কাছে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, সম্মানিয় ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিল আইহাম নামে এক ব্যক্তি৷
যখন ইসলামের বাণী সমগ্র বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল, আর তৌরাত ও ইঞ্জিলে নবী (সা.)সম্পর্কে বিভিন্ন সাক্ষ্য উল্লেখিত থাকার কারণে খৃষ্টান আলেমগণ এই বিষয়ের প্রতি বিশেষ উদগ্রীব ছিল -তাই এই খবরের ব্যাপারে গবেষণা শুরু করলো৷
নাজরানের খৃষ্টান সম্প্রদায় তিনবার, প্রতিবারে বিশেষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে দল তৈরী করে ঐ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে তাদেরকে নবীর (সা.)নিকট পাঠিয়েছিল৷ এ উদ্দেশ্যে দলগুলো প্রেরীত হয়েছিল যে, তারা যেন নিকট থেকে নবীর (সা.)নবুওয়াতের সত্যতা অনুধাবন করতে পারে৷ প্রথমবার তারা হিজরতের পূর্বে মক্কায় নবীর (সা.)কাছে আসে এবং মুনাযিরা করে৷ আর দুইবার হিজরতের পর মদীনাতে৷ আমরা এখানে সংক্ষেপে এই তিনবারের মুনাযিরাকে আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবো :
এক : নাজরানের প্রতিনিধিদের প্রথম মুনাযিরা :
নাজরানের খৃষ্টানদের পক্ষ থেকে এক দল প্রতিনিধি মক্কায় আসে এই উদ্দেশ্যে যে, নবীকে (সা.)কাছ থেকে দেখবে এবং তাঁর নবুওয়াতের ব্যাপারে যাচাই করবে৷ তারা কা’বা ঘরের কিনারায় নবীর (সা.)সাক্ষাতে উপস্থিত হল এবং মুনাযিরা করার প্রস্তাব রাখলো৷ তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তাদের কথা-বার্তাগুলো শুনলেন এবং তার উত্তরও দিলেন৷ সর্বশেষে তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৮৩নং আয়াতটি পাঠ করলেন :
وَ اذا سَمِعُوا ما اُنْزِلَ اِلَى الرَّسُولِ اَعْيُنَهُمْ تَفَيضُ مِنَ الدَّمْعِ مماَّ عَرَفُوا مِنَ الْحَقَّ يَقُولُونَ رَبَّنا آمَنَّا فاَكتُبْناَ مَعَ الشَّاهِدِينَ.
তারা এই আয়াত শুনে কোরআনের গভীরতার প্রতি অধিক পরিমানে আকর্ষিত হয়ে পড়ে৷ তাই যখন তারা কোনআনের ঐ আয়াত শুনছিল তখন অনিচছাকৃতভাবে তাদের চোখগুলো কান্নায় ভরে গিয়েছিল৷ ঐ আয়াতকে গবেষণা করলো এবং নিজেদের গৃহীত সিদ্ধান্তকে তৌওরাত ও ইঞ্জিলের বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে দেখলো যার মাধ্যমে ফলাফলে পৌছালো অবশেষে তারা মুসলমান হয়ে গেল৷
মুশরিকরা, বিশেষ করে আবু জাহ্ল এই মুনাযিহ্রার কারণে অনেক রাগান্বিত হল৷ নাজরানের প্রতিনিধিগণ মুনাযিরার শেষে যখন চলে যাচিছলো তখন আবু জেহেল কয়েকজনকে সাথে নিয়ে তাদের পথ রোধ করে দাড়ালো এবং তাদের নিয়ে অনেক অপমান সূচক ও কটুকথা উচচারণ করে তাদেরকে বলল : আমরা তোমাদের থেকে অধিক পাগল লোক আর কোথাও দেখিনি৷ কেননা তোমরা খৃষ্টান জাতির প্রতি খিয়ানত করেছো এবং নিজেদের দ্বীন থেকে বেরিয়ে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছো৷ তারা নরম সুরে প্রতি উত্তরে বলল : আমাদের নিয়ে তোমাদের মাথা ঘামানোর কোন দরকার নেই৷ যে দায়িত্ব আমরা ঘাড়ে তুলে নিয়েছি তা আমাদের উপরই ন্যস্ত ৷
দুই : খৃষ্টান প্রতিনিধিদের দ্বিতীয় মুনাযিরা :
নাজরানের খৃষ্টান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের দ্বিতীয় মুনাযিরাটি মদীনায় হিজরী ৯ম সালে অনুষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে ‘মুবাহিলাহ্’ নামক ঘটনার মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটে৷ মুনাযিরাটি নিম্নরূপ :
নবী (সা.) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তদ্রূপ নাজরানের পোপ আবু হারিছার উদ্দেশ্যেও পাঠিয়েছিলেন৷ উক্ত চিঠিতে তিনি তাকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত করেছিলেন৷ নবীর (সা.)চারজন সাহাবা মদীনা থেকে নাজরানে যায় এবং তাঁর চিঠিটি পোপের কাছে হস্তান্তর করে৷ পোপ চিঠিটি পড়ার পরে খুব রাগান্বিত হয়ে রাসূলের (সা.)প্রতি কোন প্রকার সম্মান প্রদর্শন না করেই ঐ চিঠিটি ছিড়ে ফেলে৷ সে সিদ্ধান্ত নিল যে, নাজরানের বড় বড় ব্যক্তিত্বদের সাথে ঐ চিঠির ব্যাপারে আলোচনা করবে৷ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে সে শারাহ্বিল, আব্দুল্লাহ্ ইবনে শারাহ্বিল, জাববার ইবনে ফাইযের সাথে আলোচনা করলে তারা বলল : যেহেতু এই বিষয়টি নবুওয়াত সংক্রান্ত সেহেতু আমরা এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তই দিতে পারবো না৷
সে এই বিষয়টিকে জনসাধারণের মধ্যে আলোচনা করলে সবাই এভাবে বলল : এটা উত্তম যে, আমাদের এখান থেকে একদল জ্ঞানী প্রতিনিধি মদীনায় মুহাম্মদের (সা.)কাছে পাঠানো হোক এবং তারা তাঁর সাথে সত্য উদঘাটন করার জন্য মুনাযিরা ও আলোচনা করুক৷
তারা এ ব্যাপারে অনেক আলোচনা করলো ৷ অবশেষে এভাবে বিষয়টি আঞ্জাম দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিল যে, নাজরানের ৬০ জন ব্যক্তি যাদের মধ্যে আ’কাবা, আব্দুল মাসীহ্, আবু হারিছাহ্ ও আইহাম সহ ১৪ জন আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তি থাকবে৷ এরা মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হল নবীর (সা.)সাথে মুনাযিরা করার জন্য৷
উম্মুক্ত আলোচনা কখনোই ফলাফল বিহীন নয়৷ আর তা হচেছ যুক্তিসঙ্গত এবং উত্তম পন্থা৷ তবে যদি কেউ চায় যে, তা অশুভ ফন্দি-ফিকিরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ধোকা দিতে অবশ্যই তার পথ রোধ করা আবশ্যক৷
নাজরানের প্রতিনিধিরা ইচছকৃতভাবে অত্যন্ত সুন্দর ও চাকচিক্য পোশাক এবং অলংকারও পরে এসেছিল যাতে করে মদীনায় প্রবেশের সময় সেখানকার সাধারণ মানুষ তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়৷ আর এ পদ্ধতিতে মানুষের অন্তরে তাদের প্রতি ভালবাসার সৃষ্টি হয় ৷
নবী (সা.)এই গোপন চক্রান্তকে ধবংস করার জন্য সব দিকেই বিশেষ দৃষ্টি রেখেছিলেন এবং হুসিয়ার ছিলেন (যা উম্মুক্ত আলোচনাতেও তা পরিলক্ষিত হয়)৷ মোকাবিলা করতে চক্রান্তের আশ্রয় নেয়ার প্রক্রিয়াকে এভাবে পথ রোধ করলেন যখন : নাজরানের প্রতিনিধিরা ঝলমলে উচচ মূল্যের পোশাক-আশাক পরে তাঁর কাছে পৌছালো, তিনি তখন তাদের প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপই করলেন না এবং তাদের সাথে কথা পর্যন্তও বললেন না৷ তারা তিন দিন মদীনায় ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়িয়ে অবশেষে যেহেতু উসমান ও আব্দুর রহমানের সাথে তাদের আগেই পরিচয় ছিল, তাই তারা তাদের কাছে গিয়ে তাদের সাথে এরূপ আচরণের কারণ জানতে চাইলে উসমান তাদেরকে আলীর (আ.)কাছে নিয়ে গিয়ে ঘটনার বর্ণনা দেয়৷ আলী (আ.)তাদের প্রতি বললেন :
“তোমরা তোমাদের এই ঝলমলে ও উচচ মূল্যের পোশাককে শরীর থেকে খুলে ফেল এবং সাধারণ মানুষের মত নবীর (সা.) কাছে উপস্থিত হও৷ অবশ্যই তোমরা তাতে সফল হবে”৷ তারা আলীর (আ.)পরামর্শ মতই আঞ্জাম দিল এবং সফলও হল৷
এই মুনাযিরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচেছ স্বাধীন আলোচনা করার ব্যবস্থা এবং চাপের মধ্যে না রাখা৷ নবী (সা.)পাঁচ ওয়াক্তের নামাযই মসজিদে জামায়া’তের সাথে পড়তেন এবং মুসলিম জনগণ ঐ জামায়া’তে অংশগ্রহণ করতেন৷ খৃষ্টান প্রতিনিধিরা মুসলমানগণের এই জামায়া’ত দেখে অতিশয় আশ্চার্য হয়েছিল৷ কিন্তু তারা নিজেদের আক্বীদা বিশ্বাস মোতাবেক মসজিদের এক কোণে বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রতি ফিরে নামায পড়লো৷ কোন কোন মুসলমান তাদের এই কাজের বিরোধীতা করতে চেয়েছিল, কিন্তু নবী (সা.)তাদেরকে এ কাজ করতে নিষেধ করলেন৷ এই কারণেই ইতিহাসে বলা হয়ে থাকে যে, তারা মদীনায় বিশেষ স্বাধীনতায় ছিল এবং কোন প্রকার চাপের মধ্যে ছিল না৷
অবশেষে তিন দিন পরে জামায়া’তের নামায শেষে মসজিদে মুনাযিরার অনুষ্ঠান শুরু হয়৷ নাজরানের ৬০ জন ব্যক্তি নবীর (সা.)পাশে বসলো, মুসলমানরাও একটু দুরে বসলেন৷ অনেকেই এই আলোচনা বা মুনাযিরা শোনার জন্য বসলো৷ আশ্চর্যের বিষয় হচেছ মুসলমান ও খৃষ্টানদের মুনাযিরা শোনার জন্য ইয়াহুদীদের কিছু সংখ্যকও সেখানে উপস্থিত হলো৷
আলোচনার প্রারম্ভে নবী (সা.) কথা শুরু করলেন৷ ভালবাসাপূর্ণ আলাপের মাধ্যমে নাজরানের প্রতিনিধিদেরকে শুভ আগমণ জানালেন এবং তাদেরকে ইসলাম ও একত্ববাদের প্রতি দাওয়াত করে বললেন :
এসো আমরা সবাই এক আল্লাহ্র আনুগত্য করে সবাই এক সারিতে অবস্থান করি এবং তাঁর নির্দেশের ছত্র ছায়ায় একত্রিত হই৷ তারপর পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত তেলওয়াত করলেন৷
পোপ : যদি ইসলামের উদ্দেশ্য, খোদার উপর ঈমান আনায়ন ও তাঁর নির্দেশসমূহের প্রতি আমল করা হয়ে থাকে তবে আমরা তোমাদের থেকে অনেক আগেই মুসলমান ছিলাম৷
নবী (সা.): প্রকৃত ইসলামের কিছু চিহ্ন বা নিদর্শন রয়েছে৷ তিনটি দলিল রয়েছে যা তোমাদেরকে অইসলামী প্রমাণ করে৷ প্রথমটি হচেছ তোমরা সালিবকে (ক্রুশ) পুজা-অর্চণা কর৷ দ্বিতীয়টি হচেছ শুকরের মাংস খাওয়াকে হালাল মনে কর৷ তৃতীয়টি হচেছ আল্লাহ্র সন্তান আছে এটার উপর বিশ্বাস রাখ৷
নাজরানের প্রতিনিধিরা : আমাদের আক্বীদা ও বিশ্বাস এটাই যে, হযরত মাসীহ্ই (আ.)হচেছন আল্লাহ্৷ কেননা তিনি মৃত মানুষকে জীবিত করতেন এবং অসুস্থ মানুষ যাদের কোন চিকিৎসা ছিল না তাদেরকে সুস্থ করে দিতেন৷ আর মাটি দিয়ে পাখি বানিয়ে তাতে জীবন দিতেন এবং তা উঠে যেত ………………. এ সকল কাজই হচেছ তাঁর খোদা হওয়ার নিদর্শন৷
নবী (সা.): না, এ সকল কাজ কোন ক্রমেই খোদা হওয়ার দলিল হতে পারে না৷ বরং তিনি আল্লাহ্র এক নেক বান্দা বৈ অন্য কিছুই নয়৷ আল্লাহ্ তাকে হযরত মারিয়ামের (সালাঃ) গর্ভে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে এ ধরণে মু’জিযাসমূহ আঞ্জাম দেয়ার ক্ষমতা দান করেছিলেন৷ তিনি চামড়া, মাংস, শিরা-উপশিরা এবং স্নায়ু ………. সমন্বয়ে গঠিত এক মানুষ ছিলেন৷ খাদ্য খেতেন এবং পানি পান করতেন৷ এমন কেউ অবশ্যই আল্লাহ্ হতে পারে না৷ কেননা আল্লাহ্র কোন শরিক নেই৷
ঐ প্রতিনিধিদের মধ্যে থেকে একজন বলল : হযরত মাসীহ্ (আ.)হচেছন আল্লাহ্র সন্তান এ দলিলের ভিত্তিতে যে, কেউ হযরত মারিয়ামের (সালাঃ) সাথে বিয়ে করেনি কিন্তু মারিয়াম তাকে দুনিয়ায় এনেছেন৷ আর এটাই হচেছ প্রকৃত দলিল যে আল্লাহ্ তাঁর পিতা আর তিনি আল্লাহ্র সন্তান৷
নবী (সা.)(সূরা আলে ইমরানের ৬১ নং এলাহী ওহী থেকে) বললেন : হযরত ঈসার (আ.)দৃষ্টান্ত অনুরূপ হযরত আদমের (আ.)মতই৷ কেননা আল্লাহ্ তা’য়ালা তাকে পিতা-মাতা ব্যতীত মাটি থেকে সৃষ্টি করেন৷ যদি পিতা না থাকার কারণে ঈসা (আ.)আল্লাহ্র সন্তান হয়ে থাকে তবে আদমের (আ.)তো পিতা-মাতা কেউই ছিল না সুতরাং তাকে তো অবশ্যই বলতে হয় যে, সে আল্লাহ্র সন্তান৷
নাজরানের প্রতিনিধিরা দেখলো যতই জিজ্ঞাসা করছে তিনি ততই বলছেন৷ এত সব শুনতে শুনতে তারা যেন মুসলমান না হয়ে যায় তাই তারা মুনাযিরা বন্ধ করে বলল : এ সকল কিছু আমাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না৷ তাই আমরা মুবাহিলাহ্ করতে প্রস্তুত৷ অর্থাৎ একটি স্থানে একত্রিত হয়ে আল্লাহ্র ইবাদত করতে শুরু করবো এবং মিথ্যাবাদীদের প্রতি ততক্ষণ পর্যন্ত ধিক্কার দিব যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ তাদেরকে ধবংস না করছেন৷
নবীর (সা.)প্রতি সূরা আলে ইমরানের ৬১ নং আয়াত নাজিল হওয়ার কারণে তিনি মুবাহিলার প্রস্তাবকে স্বাদরে গ্রহণ করলেন৷ সকল মুসলমান এই বিষয়ের প্রতি অবগত হলেন৷ তাই তারা একে অপরের সাথে বলতে শুরু করলো এই মুবাহিলায় কি ঘটবে?!
সকলেই অধির আগ্রহে মুবাহিলার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো৷ নির্দিষ্ট দিন পৌছালো (৯ম হিজরীর ২৪শে যিলহাজ্জ)৷ নাজরানের প্রতিনিধিরা তাদের নিজস্ব সভায় একটি মনোবিজ্ঞানীক বিষয় ব্যবহার করেছিল৷ তারা তাদের সকলকে এই বলে নির্দেশ দিয়েছিল যে, যদি মুহাম্মদ (সা.)অনেক লোকজনসহ হৈ চৈ করে মুবাহিলা করতে আসেন তাহলে তাঁর সাথে মুবাহিলা করবে এবং ভয় পাবে না৷ কেননা তাঁর কাজে কোন সত্যতা নেই, কারণ তিনি হৈ চৈ করে জিততে চান৷ আর যদি তিনি নিজের বিশেষ সন্তান-সন্তোতি ও আত্মীয়-স্বজনদের অল্প কয়েকজনকে নিয়ে মুবাহিলায় অংশ গ্রহণ করেন তবে তাঁর সাথে মুবাহিলা করবে না৷ কেননা তা হবে আমাদের জন্য ক্ষতিকর ও ভয়ানক৷
নাজরানের প্রতিনিধিরা মুবাহিলার নির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত হয়ে তৌওরাত ও ইঞ্জিল পড়ে খোদা তা’য়ালার ইবাদত করার জন্য প্রস্তুত হল এবং সেখানে নবীর (সা.)আসার অপেক্ষায় থাকলো৷ হটাৎ তারা দেখলো যে, নবী (সা.)চারজনকে সাথে নিয়ে আসছেন৷ যার একজন হচেছন নিজের কন্যা হযরত ফাতিমা (সালাঃ), অপরজন হচেছন তাঁর জামাই হযরত আলী (আ.)এবং অন্যরা হচেছন হযরত ফাতিমা ও হযরত আলীর (আ.)দুটি শিশু সন্তান ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আঃ)৷
শারজীল, (যে ছিল নাজরান প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি) তার সঙ্গী-সাথীদেরকে বলল : আল্লাহ্র কসম! আমি এমন কয়েকজনকে দেখছি যে, তারা যদি আল্লাহ্র কাছে পাহাড়ের নিজের স্থান পরিবর্তন করার আবেদন করে তবে অবশ্যই তাই ঘটবে৷ তাদেরকে ভয় পাও এবং মুবাহিলাহ্ করো না৷
যদি মুহাম্মদের (সা.)মুবাহিলাহ্ কর তবে আমাদের একজনও অবশিষ্ট থাকবে না৷ আমার কথা বিশ্বাস কর৷ অন্ত্যতপক্ষে এবারের জন্য হলেও আমার কথা শোন৷
শারজীলের পীড়াপীড়ি নাজরানের প্রতিনিধিদের উপর প্রভাব বিস্তার করলো৷ বিশেষ ধরনের অস্থিরতা তাদেরকে ঘিরে ধরলো৷ দ্রুত তাদের একজনকে নবীর (সা.)সাক্ষাতে প্রেরণ করলো এবং মুবাহিলাহ্ বন্ধ করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানালো এবং শান্তি চুক্তির পরামর্শ দিল৷
নবী (সা.)তাদের উপর অনুগ্রহ করলেন এবং সহজ শর্তস্বাপেক্ষে তাদের সাথে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন৷ এই শান্তি চুক্তি চারটি ধারায় সম্পাদিত হয় যা নিম্নরূপ :
১- নাজরানের জনগণ (ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অধীনে নিরাপত্তা সংরক্ষণের সাথে সাথে) প্রতি বছরে দুই হাজার আলখেল্লা পোশাক দুই কিস্তিতে দিতে বাধ্য থাকবে৷
২- নবীর (সা.)প্রেরীত ব্যক্তি নাজরান শহরে একমাস ও তার অধীক সময় সেখানে থাকার অধিকার প্রাপ্ত হবেন৷
৩- যখনই ইয়ামানে ইসলামের বিরুদ্ধে শোরগোল হবে তখনই নাজরানের জনগণ ত্রিশটি যুদ্ধের পোশাক (যেরেহ্) ও ত্রিশটি উট ফেরত যোগ্য ঋন হিসেবে ইসলামী সরকারকে দিতে বাধ্য থাকবে৷
৪- এই শান্তি চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে সুদ খাওয়ার পদ্ধতি নাজরানের জনগণের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হল৷
হ্যাঁ নাজরানের প্রতিনিধিরা এরূপ বাধ্য-বাদকতাসহ আত্মসমর্পীত হল৷ যেহেতু তারা উম্মুক্ত আলোচনায় হেরে গিয়েছিল তাই নাজরানের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে রওনা হল ৷
আর এই আয়াতটি (সূরা আল্ েইমরানের ৬১ নং আয়াতটি) নবীর (সা.)আহ্লে বাইতের (আ.)পবিত্রতা এবং বিশিষ্টতার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ৷
তিন : নাজরান প্রতিনিধিদের তৃতীয় দলের সাথে নবীর (সা.)মুনাযিরা :
নাজরান খৃষ্টানদের তৃতীয় দল যারা ছিল বনী হারিছ কাবিলার, তারাও সেখানে থেকেই গবেষণা করে মুসলমান হয়ে যায় এবং তাদের কিছু সংখ্যক খালিদ ইবনে ওয়ালিদের সাথে মদীনায় আসে৷ নবীর (সা.)সম্মুখে ইসলামকে স্বীকার করে বলেন : ‘আমরা খোদাকে কৃতজ্ঞতা জানাই যিনি আপনার মাধম্যে আমাদেরকে হিদায়েত দান করেছেন’৷
নবী (সা.)তাদেকে জিজ্ঞাসা করলেন : “তোমরা কোন দলিলের ভিত্তিতে তোমাদের শত্রুদের উপর কর্তৃত্ব অর্জন করেছো?”
তারা বলল : ‘আমরা আমাদের মধ্যে কখনই বিভক্ত ছিলাম না এবং প্রথম থেকেই আমরা কারো উপর জুলুম করিনি’৷
নবী (সা.)বললেন : صَدَقْتُمْ (সত্য বলেছো) ৷
ফলাফল :
যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, প্রথম ও তৃতীয় দলটি ইসলামের সত্যতাকে উপলব্ধি করে ইসলাম গ্রহণ করে৷ কিন্তু দ্বিতীয় দলটি যারা মুবাহিলাহ্ করতে চেয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা বন্ধের অনুরোধও জানিয়েছিল, তারাও ইসলামের সত্যতাকে অনুধাবণ করতে পেরেছিল কিন্তু কয়েকটি দলিলের ভিত্তিতে ইসলামকে বাহ্যিকভাবে গ্রহণ করেনি যা নিম্নরূপ :
১- পোপ নবীর (সা.)দেয়া চিঠিকে ছিড়ে ফেলেছিল৷ এই ক্ষমতার লোভ ও গোড়ামীতাই সত্যকে মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল৷
২- তারা মুবাহিলাহ্ করতে প্রস্তুত হয়নি৷ যদি তারা ইসলাম ও নবীর (সা.)সত্যতাকে অনুধাবন নাই করতে পারতো তাহলে কেন মুবাহিলাহ্ বন্ধের অনুরোধ করেছিল? আর এটাই হচেছ উপযুক্ত দলিল যে, তারা নবী (সা.)ও ইসলামের সত্যতাকে বুঝতে পেরেছিল৷
৩- ইতিহাসে এসেছে যে, নাজরানের প্রতিনিধিরা সেখানে ফিরে যাওয়ার সময় রাস্তায় তাদের মধ্যে একজন নবীর (সা.)ব্যাপারে বাজে মন্তব্য করলে পোপ (আবু হারিছাহ্) ঐ ব্যক্তির উপর ভীষণ রেগে গেল এবং বলল কেন মুহাম্মদের সম্বন্ধে খারাপ কথা বলছো? তার এই উক্তির কারণে ঐ ব্যক্তি মদীনায় ফিরে আসে এবং নবীর (সা.)সাক্ষাতে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে৷
(ইতিহাসের এ ঘটনাটিও এই কথারই বহিঃপ্রকাশ যে, নাজরানের প্রতিনিধিরা নবীর (সা.) নবুওয়াতের সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছিল)৷
৪- যখন নাজারানের প্রতিনিধিরা সেখানে ফিরে গেল এবং নিজেদের ঘটনাকে মানুষের সামনে বর্ণনা করলো তখন সেখানকার একজন সন্ন্যাসী এ সকল শুনে দারুণভাবে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে চিৎকার দিয়ে বলে : “হে মানব সকল! আমাকে এই আশ্রমের উপর থেকে নামিয়ে নিয়ে যাও, তা না হলে আমি নিজেই লাফিয়ে পড়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিব”৷
জনগণ তাকে আশ্রমের উপর থেকে নামিয়ে নিয়ে এলো৷ তারপর সে সরাসরি মদীনায় চলে আসে এবং কিছু দিন নবীর (সা.)সংস্পর্শে থাকে৷ তাঁর সাথে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত নিয়ে জ্ঞানগত আলোচনা করে তা সম্পর্কে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় নাজরানে ফিরে যায়৷ নবীর (সা.)কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় সে তাকে কথা দেয় যে, মদীনায় ফিরে আসবে এবং মুসলমান হবে, কিন্তু তাতে সে সফল হয়নি…।

