উত্তর: শিয়া মুসলমানরা পাঁচটি নামাযকে তিন ওয়াক্তে আদায় করে।
বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার জন্য প্রথমে বিভিন্ন মাযহাবের ফকীহদের মতামত জেনে নেওয়া জরুরি:
১। সকল ইসলামি ফিরকাই এ বিষয়টিতে একমত যে, আরাফায় যোহর ও আসরের দু’টি নামায যোহরের সময় একসঙ্গে এবং বিরতিহীনভাবে পড়া যায়। আর মুযদালিফায় মাগরিব ও ঈশার নামায ঈশার সময়ে একত্রে পড়া জায়েয।
২। হানাফিরা বলেন: যোহর ও আসরের নামায একসঙ্গে এবং মাগরিব ও ঈশার নামায একত্রে ও বিরতিহীনভাবে শুধু আরাফায় ও মুযদালিফায় পড়া জায়েয। এছাড়া, অন্য কোনো অবস্থায় পড়া যাবে না।
৩। হাম্বালি, মালিকি ও শাফেয়িরা বলেন: যোহর ও আসরের নামায একসঙ্গে পড়া অথবা মাগরিব ও ঈশার নামায একত্রে এবং বিরতিহীনভাবে উল্লিখিত দু’টি স্থান ছাড়াও ভ্রমণে পড়া জায়েয। তাঁদের মধ্য হতে কেউ কেউ জরুরি অবস্থায়, যেমন: প্রচণ্ড বৃষ্টির সময় বা যদি নামাযি অসুস্থ হন অথবা শত্রুর ভয় থাকে তাহলে দু’টি নামায একত্রে পড়া জায়েয তথা বৈধ বলে বিশ্বাস করেন।
৪। শিয়া মাযহাবের মত হলো: যোহর, আসর, মাগরিব ও ঈশার প্রতিটি নামাযের জন্য একটি বিশেষ সময় এবং একটি যৌথ সময় রয়েছে।
(ক) যোহরের নামাযের জন্য নির্দিষ্ট সময় তথা বিশেষ সময় হলো যোহরের শারয়ি সময় (যাওয়ালের সময় তথা সূর্য যখন মধ্য আকাশ থেকে পশ্চিম দিকে হেলে পড়া শুরু করে) থেকে ওই সময় পর্যন্ত যে সময়ের মধ্যে চার রাকাত নামায আদায় করা যায়; এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেবল যোহরের নামাযই পড়া যায়।
(খ) আসরের নামাযের বিশেষ সময় হলো সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত স্বল্প মেয়াদের একটি সময়, যে সময়ে কেবল আসরের ৪ রাকাত নামায পড়ার সময় হাতে থাকে। এ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেবল আসরের নামাযই পড়া যায়।
(গ) যোহর ও আসরের নামাযের যৌথ সময় হলো যোহরের নামাযের বিশেষ ‘সময় শেষ হওয়ার পর থেকে আসরের নামাযের বিশেষ সময় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত।
শিয়াদের কথা হলো: যৌথ সময়ের পুরো সময়েই যোহর ও আসরের নামায পর্যায়ক্রমে বিরতিহীনভাবে আদায় করা বৈধ। কিন্তু, আহলে সুন্নাত বিশ্বাস করে যে, যোহরের বিশেষ সময়টি এর শারয়ি সময় (যাওয়াল) হতে শুরু করে ততক্ষণ পর্যন্ত থাকে যখন প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার সমপরিমাণ হয়ে যায়; এটা হলো যোহরের জন্য নির্দিষ্ট সময় এবং এ সময়ে আসরের নামায পড়া যাবে না। আর এর পর থেকে মাগরিবের আগ পর্যন্ত আসরের নির্দিষ্ট তথা বিশেষ সময় এবং এ সময়ের মধ্যে যোহরের নামাযও পড়া বৈধ নয়।
(ঘ) শিয়া মাযহাবের ভিত্তিতে, মাগরিবের নামাযের বিশেষ সময় মাগরিবের শারয়ি সময় হতে তিন রাকাত নামায পড়তে যত সময় প্রয়োজন হয় কেবল সেই সময়ের মাঝেই সীমিত। আর এই নির্দিষ্ট সময়ে কেবল মাগরিবের নামায পড়া জায়েয।
(ঙ) শিয়া মাযহাবের ভিত্তিতে, ঈশার নামাযের নির্দিষ্ট সময় হলো শরীয়তের নির্ধারিত অর্ধরাত বা মধ্যরাত পর্যন্ত সময়-সীমার আগে শুধু চার রাকাত নামায পড়ার সময়টুকু তথা ওই সময়-সীমার আগে যে স্বল্প সময়ে কেবল ঈশার নামায পড়া সম্ভব।
(চ) শিয়া মাযহাবের মতে, মাগরিব ও ঈশার নামাযের যৌথ সময় হলো মাগরিবের নামাযের বিশেষ সময় শেষ হওয়ার পর হতে ঈশার নামাযের বিশেষ সময়ের আগ পর্যন্ত।
শিয়াদের বিশ্বাস, এই যৌথ সময়ের মাঝে মাগরিব ও ঈশার নামায কোনোরূপ বিরতি ছাড়াই বা দেরি না করে একসঙ্গে পড়া সম্ভব। কিন্তু আহলে সুন্নাতের মতে, সূর্যাস্তের শুরু থেকে নিয়ে শাফাকের (সূর্য অস্ত যাওয়ার পর বিদ্যমান লালিমা) নিশ্চিহ্ন হওয়া পর্যন্ত সময়ই মাগরিবের নির্দিষ্ট সময় এবং ঈশার নামায এ সময়ে পড়া উচিত নয়। আর শাফাকের নিশ্চিহ্ন হওয়া হতে শারয়ি অর্ধরাত পর্যন্ত ঈশার নামাযের নির্ধারিত সময় এবং মাগরিবের নামায এ সময়ে পড়া যাবে না।
উপসংহারে বলা যায় যে, শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি মোতাবেক যোহরের শারয়ি সময় হওয়ার পর যোহরের নামায পড়া সম্ভব এবং এর পর পরই আসরের নামায পড়া যায়। অথবা যোহরের নামাযকে আসরের নামাযের বিশেষ সময়ের পূর্ব পর্যন্ত বিলম্বিত করা যায়, তবে এক্ষেত্রে আসরের নামাযের বিশেষ সময় পৌঁছানোর আগেই যোহরের নামায শেষ করতে হবে। অতঃপর আসরের নামায পড়তে হবে। আর এভাবেই যোহর ও আসরের নামায একসঙ্গে আদায় করা যায়। যদিও মুস্তাহাব বা উত্তম হলো যোহরের নামায যাওয়ালের (তথা সূর্য যখন মধ্য আকাশ থেকে পশ্চিম দিকে হেলে পড়া শুরু করে) পর এবং আসরের নামাযকে ওই সময় পড়া যখন প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার সমপরিমাণ আকার ধারণ করে।
ঠিক এভাবেই মাগরিবের শারয়ি সময় পৌঁছানোর পর মাগরিবের নামায আদায় করা যায়, আর মাগরিবের পর পরই ঈশার নামায পড়া সম্ভব। অথবা মাগরিবের নামাযকে ঈশার বিশেষ সময় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত দেরি করে আদায় করা যায়। এক্ষেত্রে মাগরিবের নামাযকে ঈশার নামাযের বিশেষ সময়ে পৌঁছায় পূর্বে শেষ করতে হবে, অতঃপর ঈশার নামায আদায় করতে হবে। আর এভাবেই মাগরিব ও ঈশার নামায একত্রে পড়া সম্ভব। যদিও মুস্তাহাব বা উত্তম হলো মাগরিবের নামায মাগরিবের তথা সূর্যাস্তের শারয়ি সময়ে পৌঁছানোর পর এবং ঈশার নামাযকে দিগন্তের লালিমা শেষ হওয়ার পর সম্পাদন, করা। এটাই হলো শিয়া মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি।
কিন্তু আহলে সুন্নাত এই যোহর ও আসরের নামাযকে অথবা মাগরিব ও ঈশা নামাযকে একসঙ্গে পড়া সর্বাবস্থায় ও সর্বক্ষেত্রে বৈধ ও জায়েয বলে মনে করে না। সুতরাং, আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হলো: দু’টি নামাযকে (অর্থাৎ যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ঈশা) সব অবস্থায় বা বছরের যে কোনো সময়ে এবং সব স্থানে এমনভাবে একত্রিত করা যে, ঐ দুই ওয়াক্ত নামাযের কোনো একটির সময়ে দুই নামাযই পরপর আদায় করা যায়। যেমন: মুযদালিফা ও আরাফায় দু’টি নামায একসঙ্গে পড়া হয়।
(ছ) সব মুসলমানই এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করে যে, মহানবি (স.) দু’টি নামাযকে (কোনো বিরতি ছাড়াই) একসঙ্গে আদায় করেছেন। কিন্তু এই রেওয়ায়েতের ব্যাখ্যায় দু’টি ভিন্নমত রয়েছে।
* শিয়া মযজহাব বলে: এর অর্থ হলো যে, যোহরের নামাযের নির্দিষ্ট বা প্রথম সময়ে যোহরের নামায, অতঃপর যোহরের নামায শেষ হওয়ার পর পরই আসরের নামায আদায় করা সম্ভব। ঠিক একইভাবে মাগরিবের নামাযের নির্দিষ্ট বা প্রথম সময়ে মাগরিবের নামায আদায়ের পর পরই ঈশার নামায আদায় করা সম্ভব। আর এ বিষয়টি কোনো বিশেষ স্থান বা সময়সাপেক্ষ নয়; বরং সর্বাবস্থায় সকল স্থানে জায়েয।
* অন্যারা বলে: এ রেওয়ায়েতের অর্থ হলো: যোহরের নামাযকে এ নামাযের জন্য নির্ধারিত সময়ের শেষ পর্যায়ে এবং আসরের নামাযকে এর ওয়াক্তের শুরুতেই আদায় করা উচিত। তদ্রূপ মাগরিবের নামাযকে এ নামাযের জন্য নির্ধারিত সময়ের শেষ পর্যায়ে এবং ঈশার নামাযকে প্রথম সময়ে আদায় করতে হবে।
এখন এ পর্যায়ে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার জন্য রেওয়ায়েতটি নিয়ে পর্যালোচনা করব এবং এ সংক্রান্ত হাদিসগুলো তুলে ধরব। আর এটা প্রমাণ করব যে, এই হাদিসে দুই নামায একত্রীকরণ অর্থ হচ্ছে সেটাই যা শিয়ারা বলে থাকে। অর্থাৎ দু’টি নামাযকে তাদের মধ্য হতে একটির সময়ে আদায় করা। (সুন্নি মাযহাব অনুযায়ী) এ হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা হিসেবে দুই নামাযের একটিকে প্রথম নামাযের জন্য নির্ধারিত সময়ের শেষভাগে আদায় করা এবং অন্যটিকে পরের নামাযের নির্ধারিত সময়ের শুরুতে আদায় করার যে দাবি করা হয় তা সঠিক নয়।
রেওয়ায়েত
১. আহমাদ ইবনে হাম্বাল নিজ ‘মুসনাদ’-এ জাবের ইবনে যায়েদ হতে বর্ণনা করেন:
أخبرني جابر بن زيد أنه سمع ابن عباس يقول : صليت مع رسول الله صلى الله عليه (وآله) و سلم ثمانياً جميعاً و سبعاً جميعاً. قال قلت له يا أبا الشعثاء اظنه أخر الظهر و عجل العصر و آخر المغرب وعجل العشاء، قال وأنا أظن ذلك».
জাবের ইবনে যায়েদ বলেন: “ইবনে আব্বাস হতে শুনেছি যে, তিনি বললেন: ‘আল্লাহর রাসূল (স.)-এর সঙ্গে ৮ (আট) রাকাত (যোহর ও আসর) নামায একসঙ্গে আদায় করেছি এবং ৭ (সাত) রাকাত (মাগরিব ও ঈশা) নামায একত্রে আদায় করেছি।’ তিনি বললেন: আবু শা’সা’-কে বললাম: ‘আমার মনে হয় আল্লাহর রাসূল যোহরের নামায দেরিতে ও আসরের নামায তাড়াতাড়ি আদায় করেছিলেন এবং মাগরিবের নামায দেরিতে ও ঈশার নামায তাড়াতাড়ি আদায় করেছেন। (আবু শা’সা’) বললেন: ‘আমারও তাই মনে হয়। (মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল, ১ম খণ্ড, পৃ. ২২১)
এই রেওয়ায়েতটি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, আল্লাহর রাসূল (স.) যোহর ও আসর উভয় নামাযকে একসঙ্গে এবং মাগরিব ও ঈশার নামাযকে একত্রে ও বিলম্ব না করে আদায় করেছেন।
২. আহমাদ ইবনে হাম্বাল, আবদুল্লাহ ইবনে শাক্বিক হতে নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতটি বর্ণনা করেছেন:
خطبنا ابن عباس يوماً بعد العصر حتى غربت الشمس و بدت النجوم و علق الناس ينادونه الصلوة و في القوم رجل من بنى تميم فجعل يقول: الصلوة الصلوة. قال: فغضب قال أتعلمنى بالسنة؟ شهدت رسول الله صلى الله عليه [ وآله و سلم جمع بين الظهر والعصر والمغرب والعشاء قال عبد الله فوجدت في نفسي من ذلك شيئاً فلقيت أبا هريرة فسألته فوافقه».
“ইবনে আব্বাস আসরের নামাযের পর আমাদের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। এ অবস্থায় সূর্য অস্তমিত হলো এবং আকাশে নক্ষত্র দেখা দিল। লোকেরা নামাযের জন্য আহ্বান করতে লাগল। ওই সময় বনু তামিমের এক লোক ‘নামায’, ‘নাময’ বলে আহ্বান জানালো। তখন ইবনে আব্বাস রাগান্বিত হয়ে বললেন: ‘তুমি কি আমাকে রাসূল (স.)-এর সুন্নাত শিখাচ্ছ? আমি সাক্ষী (দেখেছি) যে, আল্লাহর রাসূল (স.) যোহর ও আসরের নামাযকে এবং মাগরিব ও ঈশাকে একত্রিত করেছেন।’ আবদুল্লাহ বলেন: ‘এই বিষয়টিতে আমার মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি হলো। তাই আবু হুরায়রাহর সঙ্গে এক সাক্ষাতে তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম এবং তিনিও ইবনে আব্বাসের কথাকে সমর্থন করেন। (মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫১)
এই হাদিসটিতে রাসূল (স.)-এর দু’জন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আবু হুরায়রাহ এই সত্য বিষয়ের সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, মহানবি (স.) যোহর ও আসরের নামায একত্রে এবং মাগরিব ও ঈশার নামায একত্রে আদায় করেছেন। আর ইবনে আব্বাসও রাসূল (স.)-এর অনুসরণ করেছেন।
৩. মালিক ইবনে আনাস (মালিকি মাযহাবের ইমাম) নিজ গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা’তে এভাবে লিখেছেন:
صلى رسول الله (ص) الظهر والعصر جميعاً، والمغرب والعشاء جميعاً في غير خوف ولا سفر».
‘আল্লাহর রাসূল (স.) ভ্রমণ অথবা শত্রুর ভয় ছাড়াই যোহর ও আসরের নামাযকে একসঙ্গে আদায় করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে মাগরিব ও ঈশার নামাযকে একত্রে আদায় করেছেন। (মুয়াত্তায়ে মালিক (বৈরুত), কিতাবুস সালাত, পৃ. ১২৫, হাদিস নং ১৭৮; সহিহ মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫১ (বৈরুত), বাবে জাম’ বাইনা সালাতাইন ফিল হাদ্বর)
৪. মালিক ইবনে আনাস, মায়ায ইবনে জাবাল হতে বর্ণনা করেছেন:
فكان رسول الله (ص) يجمع بين الظهر والعصر والمغرب والعشاء».
‘আল্লাহর রাসূল (স.) (কোনো বিরতি ছাড়াই) যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ঈশার নামায একসঙ্গে পড়তেন। (মুয়াত্তায়ে মালিক (বৈরুত), কিতাবুস সালাত, পৃ. ১৩৪, হাদিস নং ১৭৬, প্রকাশকাল: ১৪০৩; সহিহ মুসলিম (মিসর), ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫২)
৫. মালিক ইবনে আনাস নাফে হতে এবং তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উমর হতে বর্ণনা করেছেন:
كان رسول الله (ص) إذا عجل به السير يجمع بين المغرب والعشاء».
‘যখনই মহানবি (স.) কোনো পথ দ্রুততার সঙ্গে অতিক্রম করতে চাইতেন তখন তিনি মাগরিব ও ঈশার নামাযকে (কোনো বিরতি ছাড়াই) পর পর একত্রে আদায় করতেন। (মুয়াত্তায়ে মালিক (বৈরুত), কিতাবুস সালাত, পৃ. ১২৫, হাদিস নং ১৭৭)
৬. মালিক ইবনে আনাস আবু হুরায়রাহ হতে বর্ণনা করেন:
إن رسول الله – صلى الله عليه وآله] و سلم كان يجمع بين الظهر والعصر في سفره إلى تبوك.
‘আল্লাহর রাসূল (স.) তাবুকের পথে যোহর ও আসরের নামায একত্রে আদায় করেছেন। (মুয়াত্তায়ে মালিক (বৈরুত), কিতাবুস সালাত, পৃ. ১২৪, হাদিস নং ১৭৫)
৭. মালিক নিজ গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা’তে নাফে হতে বর্ণনা করেন:
إن عبد الله بن عمر كان إذا جمع الامراء بين المغرب والعشاء في المطر جمع معهم .
‘আমীররা যখন বৃষ্টির সময় মাগরিব ও ঈশার নামায একসঙ্গে আদায় করতেন, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উমরও উভয় নামাযকে একত্রে আদায় করতেন। (মুয়াত্তায়ে মালিক (বৈরুত), কিতাবুস সালাত, পৃ. ১২৪, হাদিস নং ১৭৫)
৮. মালিক ইবনে আনাস আলী ইবনে হুসাইন (আ.)-এর বাণী হতে উদ্ধৃত করেন:
كان رسول الله – صلى الله عليه [ وآله وسلم – إذا أراد أن يسير يومه جمع بين الظهر و العصر و إذا أراد أين يسير ليله جمع بين المغرب والعشاء».
‘মহানবি (স.) যখনই দিনে ভ্রমণ করতে চাইতেন তখন যোহর ও আসরের নামাযকে একসঙ্গে আদায় করতেন এবং যখন রাতে ভ্রমণ করতে চাইতেন তখন মাগরিব ও ঈশার নামাযকে একসঙ্গে আদায় করতেন। (মুয়াত্তায়ে মালিক (বৈরুত), কিতাবুস সালাত, পৃ. ১২৫, হাদিস নং ১৮১)
৯. মুহাম্মাদ ইবনে যারকানি ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থের ব্যাখ্যায় আবি শা’সা’ হতে বর্ণনা করেন:
إن بن عباس صلى بالبصرة الظهر والعصر ليس بينهما شيء والمغرب والعشاء ليس بينهما شيء».
‘আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বসরা নগরীতে যোহর ও আসরের নামায কোনোরূপ দেরি না করেই (কোনো বিরতি ছাড়াই) একসঙ্গে আদায় করেছেন। আর মাগরিব ও ঈশার নামাযও কোনো রকম দেরি না করে একসঙ্গে আদায় করেছেন। (শারহে যারকানি আলাল মুয়াত্তা (মিসর), ১ম খণ্ড, বাবে আল-জামউ বাইনাস সালাতাইন ফিল হাদ্বরি ওয়াস সাফার, পৃ. ২৯৪)
১০. যারকানি, তাবারানি হতে এবং তিনি ইবনে মাসউদ হতে বর্ণনা করেন:
جمع النبي صلى الله عليه وآله] و سلم بين الظهر والعصر و بين المغرب والعشاء. فقيل له في ذلك فقال صنعت هذا لئلا تحرج أمتى».
“মহানবি (স.) যোহর ও আসরের নামায একসঙ্গে এবং মাগরিব ও ঈশার নামায একসঙ্গে আদায় করেছেন। এ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: ‘এ জন্য যে, আমার উম্মত যেন (অযথা) কষ্টের শিকার না হয়।’ “১
১১. মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ, আবু যুবাইর মারফত সাঈদ ইবনে জুবাইর হতে এবং তিনি ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করেন:
صلى رسول الله – صلى الله عليه وآله] و سلم – الظهر والعصر جميعاً بالمدينة في غیر خوف و ال سفر».
‘মহানবি (স.) মদিনাতে কোনোরূপ শত্রুর ভয় এবং ভ্রমণ ছাড়াই যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ঈশার নামায পর পর একসঙ্গে আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম (মিসর), ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫১, বাবুল জাম’ বাইনাস সালাতাইন ফিল হাদ্বর)
অতঃপর ইবনে আব্বাস রাসূল (স.)-এর এহেন কাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন: ‘এটা এ জন্য যে, তাঁর উম্মতের কেউ যেন কষ্টের মধ্যে না পড়ে।’
১২. মুসলিম নিজ ‘সহিহ’ গ্রন্থে সাঈদ ইবনে জুবাইর হতে এবং তিনি ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করেন:
جمع رسول الله – صلى الله عليه وآله وسلم – بين الظهر والعصر، المغرب والعشاء في المدينة، من غير خوف و لا مطر».
‘মহানবি (স.) মদিনাতে কোনোরূপ ভয় ও বৃষ্টি ছাড়াই যোহর ও আসরের নামায একসঙ্গে এবং মাগরিব ও ঈশার নামায একত্রে আদায় করেছেন। ((সহিহ মুসলিম (মিসর), ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫২, বাবুল জাম’ বাইনাস সালাতাইন ফিল হাদ্বর)
সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন: “আমি ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলাম: ‘কেন আল্লাহর রাসূল (স.) এমনটি করলেন?’ ইবনে আব্বাস উত্তরে বললেন: ‘এ জন্য যে, তিনি চাইতেন না তাঁর উম্মত কষ্টের শিকার হোক। (সহিহ মুসলিম (মিসর), ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫১, বাবুল জাম’ বাইনাস সালাতাইন ফিল হাদ্বর, প্রাগুক্ত, উল্লিখিত হাদিসের নিম্নে বর্ণিত হয়েছে)
১৩. আবু আবদুল্লাহ বুখারি নিজ হাদিস গ্রন্থে ‘বাবু তা’খীরিয যোহরি ইলাল আস্ত্র’ বা ‘যোহরের নামায আসরের নামাযের সময় পর্যন্ত বিলম্বে আদায় করা শীর্ষক অধ্যায়ে এ বিষয় সম্পর্কে লিখেছেন। আর এই অধ্যায়টির শিরোনামই এ বিষয়ের প্রমাণ বহন করে যে, যোহরের নামায দেরিতে পড়া সম্ভব এবং আসরের নামাযের সময় উভয় নামাযই একসঙ্গে আদায় করা যায়। বুখারি ওই অধ্যায়ে নিম্নলিখিত রেওয়ায়েতটি বর্ণনা করেন:
إن النبي – صلى الله عليه وآله] و سلم – صلّى بالمدينة سبعاً و ثمناً، الظهر والعصر، و المغرب والعشاء».
‘নবি করিম (স.) মদিনাতে যোহর ও আসরের আট রাকাত নামায একত্রে এবং মাগরিব ও ঈশার সাত রাকাত নামায একত্রে আদায় করেছেন।
রেওয়ায়েতটি হতে সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় যে, যোহরের নামায দেরি করে আসরের সময় পড়াতে তো কোনো অসুবিধা নেইই, উপরন্তু দু’টি নামাযকে (আসরের নামাযের সময়ের মধ্যে) একসঙ্গে আদায় করাও সম্ভব। আর রেওয়ায়েতের বাচনরীতির ইঙ্গিতে এটা অনুধাবন করা যায় যে, রাসূল (স.)-এর অনুসরণে মাগরিবের নামায দেরি করে ঈশার সময়ে আদায় করা যায়।
১৪. এ কারণেই বুখারি অন্য একটি স্থানে বলেন:
قال ابن عمر و أبو أيوب و ابن عباس رضى الله عنهم: صلى النبي صلى الله عليه وآله و سلم المغرب والعشاء».
‘আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.), আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন: ‘মহানবি (স.) মাগরিব ও ঈশার নামায একসঙ্গে আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি (মিসর), ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৩, কিতাবুস সালাত, বাবু যিকরুল ঈশা, প্রকাশকাল ১৩১৪ হিজরি)
১৫. মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ স্বীয় ‘সহিহ’ গ্রন্থে এভাবে লিখেছেন:
قال رجل لابن عباس الصلوة فسكت ثم قال الصلوة فسكت ثم قال الصلوة فسكت ثم قال: لا ام لك أتعلمنا بالصلوة و كنا نجمع بين الصلاتين على عهد رسول الله -صلى الله عليه وآله] و سلم».
“এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাসকে বলল: ‘নামায!’ ইবনে আব্বাস কিছু বললেন না। লোকটি আবার বলল: ‘নামায!’ এবারও ইবনে আব্বাস নীরব রইলেন। লোকটি তৃতীয়বারও বলল: ‘নামায।’ কিন্তু তখনও ইবনে আব্বাস কথা বললেন না। লোকটি যখন চতুর্থবার বলল, ‘নামায।’ তখন তিনি বললেন: ملکly (তুমি মাতৃহীন হও!) তুমি কি আমাদেরকে নামাযের শিক্ষা দিচ্ছ? আমরা রাসূল (স.)-এর যুগে দু’টি নামাযকে একসঙ্গে আদায় করতাম। (সহিহ মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫৩, বাবুল জাম’ বাইনা সালাতাইন ফিল হাম্বর)
১৬. মুসলিম বর্ণনা করেন:
إن رسول الله – صلى الله عليه وآله وسلم – جمع بين الصلاة في سفرة سافرها في غزوة تبوك فجمع بين الظهر والعصر والمغرب والعشاء. قال سعيد: فقلت لإبن عباس: ما حمله على ذلك؟ قال: أراد أن لا يحرج امته».
“আল্লাহর রাসূল (স.) তাবুক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য সেখানে যাওয়ার পথে দু’টি নামায একসঙ্গে আদায় করেছেন এবং যোহর ও আসরের নামায একত্রে আদায় করেছেন। সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন: ‘আমি ইবনে আব্বাসকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম।’ তিনি বললেন: ‘রাসূল (স.) চাইতেন তাঁর উম্মত যেন কষ্টের শিকার না হয়। (সহিহ মুসলিম (মিসর), ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫৩)
১৭. মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ, মুয়াজ ইবনে জাবাল হতে বর্ণনা করেন:
خرجنا مع رسول الله – صلى الله عليه وآله و سلم – في غزوة تبوك فكان يصلى الظهر والعصر جميعاً والمغرب والعشاء جميعاً».
‘রাসূল (স.)-এর সঙ্গে তাবুকের যুদ্ধে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। রাসূল (স.) যোহর ও আসরের নামায একত্রে এবং মাগরিব এবং ঈশার নামায একত্রে আদায় করেন। (সহিহ মুসলিম (মিসর), ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫২)
১৮. মালিক ইবনে আনাস নিজ গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা’য় লিখেছেন:
عن ابن شهاب انه سأل سالم بن عبد الله هل يجمع بين الظهر والعصر في السفر ؟ فقال: نعم لا بأس بذلك. ألم تر إلى صلاة الناس بعرفة؟».
“ইবনে শাহাব, সালিম ইবনে আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘যোহর ও আসরের নামায কি ভ্রমণে একসঙ্গে পড়া যায়?’ তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ, এরূপ করাতে কোনো অসুবিধা নেই, তুমি কি আরাফা’র দিন (আরাফাতের ময়দানে) মানুষের নামায দেখনি? (মুয়াত্তায়ে মালিক (বৈরুত), পৃ. ১২৫, হাদিস নং ১৮০)
উল্লেখ্য, সব মুসলমানই বিশ্বাস করে যে, আরাফা’র দিন (জিলহজ মাসের নয় তারিখে) আরাফাতের ময়দানে যোহর ও আসরের নামায একসঙ্গে আদায় করা জায়েয তথা বৈধ। আর মুসলমানরা উভয় নামাযকে যোহরের সময় এবং কোনোরূপ বিরতি ছাড়াই আদায় করে থাকে। এখানে সালিম ইবনে আবদুল্লাহ বলেছেন: ‘যেভাবে মুসলমানরা আরাফা’য় দু’টি নামায একসঙ্গে আদায় করে, আরাফাহ ছাড়াও অন্য স্থানে দু’টি নামাযকে একইভাবে একত্রে আদায় করা যায়।’
১৯. মুত্তাকি হিন্দি নিজ গ্রন্থ ‘কানযুল উম্মাল’-এ উল্লেখ করেছেন:
قال عبد الله: جمع لنا رسول الله (ص) مقيماً غير مسافر بين الظهر والعصر، و المغرب والعشاء. فقال رجل لإبن عمر : لم ترى النبي (ص) فعل ذلك؟ قال: لأن لا يحرج امته إن جمع رجل».
“আব্দুল্লাহ ইবনে উমর বলেন: ‘মহানবি (স.) শহরে অবস্থান করছিলেন এবং সফরে ছিলেন না; এতদসত্ত্বেও যোহর-আসর একত্রে ও মাগরিব-ঈশা একসঙ্গে আদায় করেছেন। অতঃপর এক ব্যক্তি ইবনে উমরকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘কেন আল্লাহর রাসূল (স.) এমনটি করলেন?’ তিনি বললেন: ‘এ কারণে যে, যদি কেউ চায় দু’টি নামাযকে একত্রে পড়তে তবে সে যেন অসুবিধায় না পড়ে। (কানযুল উম্মাল (হালাব), কিতাবুস সালাত, আল বাবুর রাবে’ ফি সালাতিল মুসাফির, ৮ম খন্ড, পৃ. ২৪৬, প্রকাশকাল ১৩৯১ হিজরি)
২০. ‘কানযুল উম্মাল’-এ আরো উল্লেখ করা হয়েছে:
عن جابر، أن النبي – صلى الله عليه وآله] و سلم – جمع بين الظهر والعصر بأذان و إقامتين».
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল (স.) যোহর ও আসরের নামায একটি আযান ও দু’টি আকামতের মাধ্যমে একত্রিত করেছেন। (কানযুল উম্মাল (হালাব), কিতাবুস সালাত, আল বাবুর রাবে’ ফি সালাতিল মুসাফির, ৮ম খণ্ড, পৃ. ২৪৭, প্রকাশকাল ১৩৯১ হিজরি)
২১. ‘কানযুল উম্মাল’-এ নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতটি উল্লেখ করা হয়েছে:
عن جابر أن رسول الله صلى الله عليه وآله] و سلم – غربت له الشمس بمكة فجمع بينهما بسرف».
“জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলেন: ‘আল্লাহর রাসূল (স.) যখন মক্কাতে ছিলেন তখন সূর্য অস্তমিত হলো। তিনি সারফ (সারফ, মক্কা হতে ৯ মাইল দুরত্বে অবস্থিত একটি এলাকার নাম। (কানযুল উম্মাল গ্রন্থে উক্ত হাদিসের নিম্নে বর্ণিত হয়েছে) নামক স্থানে মাগরিব ও ঈশার নামায একসঙ্গে আদায় করলেন।
২২. ‘কানযুল উম্মাল’ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত হয়েছে:
جمع رسول الله – صلى الله عليه وآله و سلم – بين الظهر والعصر، و المغرب و العشاء بالمدينة في غير سفر و لا مطر، قال: قلتُ لابن عباس: لم تراه فعل ذلك؟ قال: أراد التوسعة على أمته.
“মহানবি (স.) মদিনাতে কোনোরূপ বৃষ্টি ও ভ্রমণে থাকা ছাড়াই যোহর-আসর একসঙ্গে ও মাগরিব-ঈশা একসঙ্গে আদায় করেছেন। রাবি বলেন: ‘আমি ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলাম: কেন আল্লাহর রাসূল (স.) এমনটি করলেন?’ উত্তরে ইবনে আব্বাস বললেন: ‘উম্মতের কাজকর্মে সুবিধা দান করার জন্য। (কানযুল উম্মাল, কিতাবুস সালাত, ৮ম খণ্ড)
উপসংহার
এ পর্যায়ে উল্লিখিত রেওয়ায়েতগুলোর আলোকে স্পষ্ট দলিলাদির সার সংক্ষেপ পেশ করব যেগুলো নামায একসঙ্গে আদায় করার ক্ষেত্রে শিয়াদের কথার সত্যতার প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
১। কাজকর্মে সুবিধা এবং অধিক কষ্ট হতে পরিত্রাণ দানের লক্ষ্যে এক নামাযের সময় দু’টি নামায একত্রে আদায় করা:
বহু হাদিস এ বিষয়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, যদি যোহর-আসরের নামাজ একত্রে ও মাগরিব-ঈশার নামায একসঙ্গে আদায় না করা হয় তবে মুসলমানরা তাদের কাজকর্মে কষ্টের সম্মুখীন হবে। তাই আল্লাহর রাসূল (স.) মুসলমানদের এই কষ্ট লাঘব করার জন্য যোহর-আসরের নামায একত্রে ও মাগরিব-ঈশার নামায একসঙ্গে আদায় করাকে জায়েয করেছেন। এ ক্ষেত্রে ১০ম, ১৬তম, ১৯তম, ২২তম হাদিস দ্রষ্টব্য।
যদি উল্লিখিত রেওয়ায়েতগুলোর উদ্দেশ্য এই হয় যে, যোহর ও আসরের নামায আসরের শেষ সময়ে আদায় করা যায় (ঐ সময়ের সন্নিকটে যখন প্রতিটি জিনিসের ছায়া সেই জিনিসের সমপরিমাণ হয়), আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে যোহরের নামাজে দেরি করে আসরের নামাযের সময় শুরুর আগে আদায় করা যায় এমনভাবে যে, দুই নামাযকে একসঙ্গে এবং উভয়ের নির্দিষ্ট সময়ে পড়া সম্ভব; এমন কাজ সহজ তো নয়ই উপরন্তু আরো বেশি কষ্টসাধ্য, অথচ দু’টি নামাযকে একত্রীকরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে কষ্ট লাঘব করা।
উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, রেওয়ায়েতগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো এটা বোঝানো যে, দু’টি নামাযকে পর পর কোনো বিরতি ছাড়াই তাদের যৌথ সময়ের মধ্যে যেকোন সময়ে আদায় করা যায়। যেমন: ঐ দুটি নামাযের সময়ের প্রথমদিকে অথবা ওই দুটি নামাযের সময়ের শেষের দিকে; বিষয়টি এমন নয় যে, একটি নামাযকে তার শেষ সময়ে এবং অপরটিকে তার প্রথম সময়ে আদায় করা। (আগেও যেমনটি বলা হয়েছে, শিয়া নিয়মে জোহরের ও আসরের এবং মাগরিব ও ঈশার নামাযের রয়েছে অভিন্ন বা যৌথ সময় এবং প্রত্যেকটিরই রয়েছে আলাদা বা বিশেষ সময়, ফলে কোনো বিরতি ছাড়াই পর পর দুটি নামায এসব অভিন্ন সময়ের প্রথম বা শেষের দিকে আদায় করা যায়, আর কাজ-কর্মের সুবিধাসহ অন্য সব দিক বিবেচনায় এ পদ্ধতিই সবচয়ে সহজ ও কষ্টহীন পদ্ধতি।)
২। আরাফায় দু’টি নামায একসঙ্গে আদায় করা ও নামাযদ্বয়কে একত্রিত করার পদ্ধতি উপস্থাপিত হয়েছে
সব ইসলামি মাযহাবই আরাফাতের ময়দানে যোহর ও আসরের নামায দু’টিকে একই সময় আদায় করাকে জায়েয বলে মনে করে। (আল ফিক্হ আলাল মাযাহেবিল আরবা’, কিতাবুস সালাত, আল-জাম’ বাইনাস সালাতাইন তাক্বদীমান ওয়া তা’খীরান)
অন্যদিকে, উল্লিখিত রেওয়ায়েতের কিছু কিছু এই বিষয়েরই সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, এভাবে দু’টি নামায অন্য স্থানেও একত্রীকরণ করা যায় এবং তা করা নামায দু’টিকে ঠিক আরাফায় একসঙ্গে দুই নামায আদায় করার মতোই (এ দু’টির মাঝে কোনো পার্থক্যই নেই)। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আরফার দিন অন্য দিনের সঙ্গে এবং আরাফাতের ময়দান অন্য কোনো স্থানের সঙ্গে কোনোরূপ পার্থক্য রাখে না। এ ক্ষেত্রে ১৮ নং হাদিসটি দ্রষ্টব্য।
অতএব, যেভাবে আরাফার ময়দানে যোহর ও আসরের নামাযকে যোহরের নামাযের সময় আদায় করার বিষয়ে সব মুসলমানই ঐকমত্য পোষণ করে সেভাবেই আরাফাহ ছাড়া অন্য সব স্থানেও একসঙ্গে আদায় করাও জায়েয।
৩। সফরে দু’টি নামায একসঙ্গে আদায় করা, কিভাবে দু’টি নামায একসঙ্গে আদায় করতে হয় তার দৃষ্টান্ত
একদিকে হাম্বালি, শাফেয়ি ও মালিকি মাযহাবের ফকীহরা ভ্রমণ অবস্থায় দু’টি নামাযকে একসঙ্গে পড়া জায়েয বলে জানেন অন্যদিকে উল্লিখিত রেওয়ায়েতগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করছে যে, এ ক্ষেত্রে ভ্রমণ বা শহরে অবস্থানের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। আর স্বয়ং মহানবিও ভ্রমণে এবং শহরে অবস্থানরত দুই অবস্থাতেই দু’টি নামাযকে একত্রে আদায় করেছেন।
এ ক্ষেত্রে ৩য়, ১১তম, ১৩তম, ১৯তম ও ২২তম হাদিস দ্রষ্টব্য। এরই ভিত্তিতে (যেভাবে শিয়ারা বলে) ভ্রমণে দু’টি নামায এক সময়ে (একত্রে) আদায় করা জায়েয, তদ্রূপভাবে শহরে অবস্থানকালীন বা ভ্রমণে না থাকা অবস্থায়ও জায়েয।
৪। জরুরি অবস্থায় দু’টি নামায একত্রে আদায় করার পদ্ধতি সাধারণ অবস্থায়ও একইভাবে তা আদায়ের পদ্ধতি উপস্থাপন করছে
সহিহ ও মুসনাদগ্রন্থগুলোর বিরাট একটি অংশ এই সত্য বিষয়ের প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহর রাসূল (স.) ও তাঁর সাহাবিরাবিভিন্ন জরুরি অবস্থায়, যেমন: বৃষ্টির সময়, শত্রুর ভয়ে অথবা অসুস্থতার কারণে দু’টি নামাযকে একত্রে এবং একই সময়ে (যাতে শিয়ারা বিশ্বাসী) আদায় করতেন। তাই অনেক মাযহাবের ফকীহরা কিছু কিছু জরুরি অবস্থায়ও এর বৈধতার ফতোয়া দিয়েছেন। অথচ উল্লিখিত রেওয়ায়েতগুলোতে স্পষ্ট হয়েছে যে, এ ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা ও সাধারণ অবস্থার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই এবং আল্লাহর রাসূল (স.) বৃষ্টি ও শত্রুর ভয় ছাড়াই দু’টি নামাযকে একত্রে আদায় করেছেন। ৩য়, ১১তম, ১২তম ও ২২তম হাদিস দ্রষ্টব্য।
৫। নামায দু’টিকে একত্রীকরণ রাসূল (স.)-এর সাহাবিদের সুন্নত
উল্লিখিত রেওয়ায়েতগুলোর মাঝে এ বিষয়টির মুখোমুখি হই যে, রাসূল (স.)-এর অনেক সাহাবিই দু’টি নামাযকে একই সময় একসঙ্গে আদায় করতেন। যেমন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) মাগরিবের নামাজে এতটাই বিলম্ব করলেন যে, চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল এবং নক্ষত্ররাজি দেখা দিল; এমনকি অন্যরা ‘নামায! নামায!’ বলে চিৎকার করা সত্ত্বেও তিনি তাদের কথায় কোনো তোয়াক্কা করেননি। অবশেষে রাতের কিছু অংশ পার হওয়ার পর মাগরিব ও ঈশার নামায একসঙ্গে আদায় করেন। আর অভিযোগকারীর উত্তরে তিনি বলেন: ‘আমি সাক্ষি যে, আল্লাহর রাসূল (স.) এভাবে নামায আদায় করেছেন এবং আবু হুরায়রাহও ইবনে আব্বাসের কথা সমর্থন করেছন। ২য়, ৭ম, ৯ম ও ১৫তম রেওয়ায়েত দ্রষ্টব্য।
উল্লিখিত রেওয়ায়েতগুলোর আলোকে আর কোনো সন্দেহ অবশিষ্ট থাকে না যে, শিয়ারা যেভাবে নামায আদায় করে থাকে সেভাবে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) নিজেও দু’টি নামাযকে একটি নামাযের সময়ে আদায় করেছেন।
৬। দুই নামায একত্রীকরণ রাসূল (স.)-এর সুন্নাত
২১ নং হাদিস হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, আল্লাহর রাসূল (স.) মাগরিবের সময় মক্কাতে থাকা সত্ত্বেও মাগরিবের নামাজে দেরি করেন এবং ‘সারফ’ নামক স্থানে, যা মক্কা হতে ৯ মাইল দূরে অবস্থিত, সেখানে পৌঁছে মাগরিব ও ঈশার নামায (কোনো বিরতি ছাড়াই) একসঙ্গে আদায় করেন। আর এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, মহানবি (স.) যদি মাগরিবের প্রথম সময়ে মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করে থাকেন তাহলেও ‘সারফ’ পর্যন্ত পৌছতে রাতের একটি অংশ পার হয়ে যাওয়ার কথা, এর কারণ হলো তৎকালীন যুগের পরিবহন ছিল ধীর গতি-সম্পন্ন ও যাতায়াত-ব্যবস্থাও ছিল প্রাচীন পদ্ধতির। আর তাই এটা স্পষ্ট, আল্লাহর রাসূল (স.) মাগরিব ও ঈশার নামাযকে ঈশার নামাযের সময়ে একত্রে আদায় করেছিলেন।
উল্লিখিত হাদিসগুলোর সবই আহলে সুন্নাতের সহিহ ও মুসনাদ গ্রন্থগুলো থেকে সংগৃহীত হয়েছে। এসব হাদিসের ভিত্তিতে যোহর ও আসরের নামায একত্রে অভিন্ন সময়ে এবং মাগরিব ও ঈশার নামায একত্রে ও একই সময়ে আদায় করা সম্পর্কিত শিয়া মতটি যে জায়েয তা প্রমাণিত হয়। একইসাথে এসব নামায যে কোনো অবস্থাতেই বা যে কোনো স্থানেই একত্রে কোনো বিরতি ছাড়াই আদায় করা যে বৈধ তাও প্রমাণিত হয়।




