প্রসঙ্গ: রবিউল আওয়াল মাস
সংঙ্কলন ও অনুবাদ: এস, এ, এ
১লা রবিউল আওয়াল
1. রাসুল (সা.)এর দাফন
১লা রবিউল আওয়ালের মধ্যে রাতে রাসুল (সা.)এর পবিত্র দেহকে হজরত আলী (আ.) দাফন করে দেন। কেননা অন্যান্য ব্যাক্তিরা রাসুল (সা.)এর পবিত্র দেহকে ফেলে রেখে খেলাফত নির্বাচনের জন্য বণি সাকিফায় একত্রিত হয়েছিল।
শেইখ মুফিদ (রহ.) বলেন: অনেকেই রাসুল (সা.) এর জানাযায় অংশগ্রহণ করেনি কারণ তখন তারা খলিফা নির্বাচনের জন্য বণি সাকিফাতে উপস্থিত ছিল। (তাবাকাত ইবনে সাআদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৮, তাকরিবুল মাআরেফ, পৃষ্ঠা ২৫১, ২৫৬, কাশফুল মোহাজ্জা, পৃষ্ঠা ১২৫, মোসতাদরাকুল ওসায়েল, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৮৬, এহতেজাজ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৯)
2. লাইলাতুল মাবিত
১ম রবিউল আওয়ালে রাতটি ইসলামের ইতিহাসে “লাইলাতুল মাবিত” নামে পরিচিত। রাসুল (সা.)এর বেসাতের ১৩ তম বর্ষে হিজরতের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি সংঘটিত হয়। রাসুল (সা.) এ রাতে মদীনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং পথিমধ্যে “সউর” নামক গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। অপর দিকে হজরত আলী (আ.) শত্রুদের ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করার লক্ষ্যে রাসুল (সা.)এর বিছানায় নিদ্রা যান। তখন তাঁর সম্পর্কে সুরা বাকারা’এর ২০৭ নং আয়াত নাযিল হয়। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১৯, পৃষ্ঠা ৩৯, হিল্লিয়াতুল আবরার, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৬, আস সহিহ মিন সিরাহ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৩, শাওয়াহেদুত তানযিল, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১২৩, জাওয়াহেরুল মাতালেব, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৭)
3. রাসুল (সা.)এর হিজরত
১লা রবিউল আওয়াল তারিখের রাতে বেসাতের ১৩ তম বর্ষে রাসুল (সা.) মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। (শাওয়াহেদুত তানযিল, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১২৩, আস সাহিহ মিন সিরাহ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৩, তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮, উসদুল গাবা, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৪, জাওয়াহেরুল মাতালেব, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৭)
4. হিজরী বর্ষের সূচনা
রাসুল (সা.) নিজেই ছিলেন হিজরী বর্ষের ভিত্তি স্থাপক। তবে হজরত উমরের যুগে হজরত আলী (আ.)এর মাধ্যমে এর গণনার ধারা সূচিত হয়। (আস সহিহ মিন সিরাহ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭৪- ২০৬, ইকবালুল আমাল, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২, সুবহুল আশি, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৪০, তারিখুল উলুম ইন্দাল আরাব, পৃষ্ঠা ৪৩২, তারিখে তাবারী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১১০, ১১২)
5. হজরত আলী (আ.) এর ঘরে আক্রমণ
সন ১১ হিজরীর ১ম রবিউল আওয়াল তারিখের রাতে রাসুল (সা.) দাফন কার্য সম্পাদন হওয়ার পরে যারা বণি সাকিফাতে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা দিনে হজরত আলী (আ.)এর কাছে জোরপূর্বক বাইয়াত নেয়ার জন্য তাঁর ঘরে হামলা করে। কিন্তু হজরত আলী (আ.) রাসুল (সা.) এর ওসিয়ত অনুযায়ি কোরআন সংঙ্কলনের কাজে নিমগ্ন ছিলেন। তিনি হামলাকারিদের বলেন: মহান আল্লাহর শপথ সম্পূর্ণ কোরআন একত্রিত করার পূর্বে আমি ঘর থেকে বাহির হব না। (এহতেজাজ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৮, ২৮১, আল গাদির, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৭২, আল ইমামা ওয়াল সিয়াসা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০, তৌহিদে সাদুক্ব, পৃষ্ঠা ৭৩, তাফসিরে ফুরাত, পৃষ্ঠা ৩৯৮)
6. ইমাম হাসান আসকারী (আ.)কে বিষ প্রদান
রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ি ইমাম হাসান আসকারী (আ.) সন ২৬০ হিজরীর ১লা রবিউল আওয়াল তারিখে বিষাক্ত খাবারের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এছাড়াও ইতিহাসে অন্যান্য তারিখের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যেমন: ৪ঠা রবিউল আওয়াল, ৮ই রবিউল আওয়াল। (মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৩৩, কাশফুল গুম্মা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪১৫, কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউল আওয়াল, পৃষ্ঠা ২, এখতিয়ারাত, পৃষ্ঠা ৩৪, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫০, পৃষ্ঠা ৩৩৫)
৩য় রবিউল আওয়াল
1. হজরত সালমান (রা.) এর কূটবক্তব্য
রাসুল (সা.)কে দাফনের তৃতীয় দিন হজরত সালমান (রা.) জনসম্মুখে এস বলেন: হে লোকেরা! তোমরা আমার কথা মনযোগ সহকারে শোন অতৎপর চিন্তা করো। এটা তোমরা এ বিষয় সম্পর্কে ভালভাবে অবগত আছ যে, আমাকে রাসুল (সা.) কর্তৃক বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়েছে। আমি যদি আলী (আ.) এর ফযিলত বর্ণনা শুরু করি তাহলে হয়তো তোমাদের অনেকেই আমাকে পাগল বলে অভিহিত করবে অথবা বলবে যে, হে আল্লাহ! তুমি সালমানের উক্ত কথার জন্য তাঁকে ক্ষমা করে দাও। অতঃপর তিনি হজরত আলী (আ.) এর ফযিলত বর্ণনা করা শুরু করেন এবং তাদেরকে উদ্দেশ্যে করে বলেন: যারা তাঁর প্রাপ্য খেলাফতকে কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। বক্তব্যর পরিসমাপ্তিতে বলেন: তোমরা জেনে রাখ আমি আমার বিশ্বাসের কথাকে তোমার সামনে উপস্থাপন করলাম। আমি আমার জন্য রাসুল (সা.) এর পরে হজরত আলী (আ.) কে ইমাম স্বরূপ মেনে নিয়েছি। (গায়াতুল মারাম, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১২০, এহতেজাজ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫১, মাওয়াকেফুশ শিয়া, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৫২, গায়াতুল মারাম, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১২০, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ২৯, পৃষ্ঠা ৭৯)
2. এজিদের নির্দেশে কাবা গৃহকে ভাঙ্গার চেষ্টা
সন ৬৪ হিজরীর ৩য় রবিউল আওয়ালে দিনে এজিদের নির্দেশে কাবা গৃহকে মিনজানিক (দালান ভাঙ্গার গুলতি) দ্বারা ভাঙ্গা হয়। উক্ত ঘটনার ১১ দিন পরে এজিদ মারা যায়। (তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ৬৩, মুসাতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১৫, তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৮৩, তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫২, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ২০৩)
৫ই রবিউল আওয়াল
হজরত সকিনা (সা.)এর মৃত্যুদিবস
ইমাম হুসাইন (আ.)এর কন্যা হজরত সকিনা (সা.আ.) কারবালার ঘটনার ৫৬ বছর পরে সন ১১৭ হিজরীর ৫ই রবিউল আওয়াল তারিখে মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মাতার নাম ছিল রোবাব তিনি তাঁর মায়ের সাথেই বন্দি অবস্থায় কুফা ও শামে যান। তাঁর স্বামীর নাম ছিল হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান (আ.)যিনি কারবালাতে শাহাদত বরণ করেন। যেহেতু ইমাম হাসান (আ.)এর আব্দুল্লাহ নামে কয়েকজন সন্তান ছিল। যখন তিনি মৃত্যুবরণ করেন তখন মদীনার শাষক আব্দুল মালেক বলে: তোমরা অপেক্ষা কর তাঁর জানাযার নামাজ আমি পড়াব। কিন্তু সে ওয়াদা করে আর জানাযার নামাজ পড়াতে আসেনি। অবশেষে মোহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ ওরফে নাফসে যাকিয়া রাতে তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান এবং তাঁর দেহকে মদীনায় দাফন করে দেন। (দালায়েলুল ইমামা, পৃষ্ঠা ৪২৪, মাআলীউস সিবতাইন, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৭, মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬৭, তাহযিবুল আসমা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৭, উফিয়াতুল আয়ান, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৯৬)
৮ই রবিউল আওয়াল
ইমাম হাসান আসকারী (আ.)এর শাহাদত
রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ি ২৬০ হিজরী ৮ই রবিউল আওয়াল তারিখে ইমাম হাসান আসকারী (আ.) ২৮ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেন। মৃত্যুর পূর্ব রাতে তিনি মদনিাবাসীদের নামে একাধিক পত্র লিখেন। যখন শামেরাবাসীরা তাঁর শাহাদতের খবর সম্পর্কে অবগত হয় তখন তারা বাজারের সকল দোকান বন্ধ করে ইমাম (আ.)এর ঘরের সম্মুখে একত্রিত হয় এবং শামে ক্রন্দন এবং আহাজারির কারণে পরিবেশ শোকাবহ হয়ে উঠে। ইমাম মাহদী (আ.) তাঁকে গোসল, কাফন দেন, জানাযার নামাজ পড়ান এবং তাঁকে ইমাম হাদি (আ.) এর পাশে দাফন করে দেন। (কামাল উদ্দিন, পৃষ্ঠা ৪৭৫, তাহযিবুল মাকাল, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৩২, খাতেমাতুল মুসতাদরাক, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২২২, মোজামে রেজালুল হাদিস, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩৯, কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৫১৩)
৯ই রবিউল আওয়াল
ইমাম মাহদী (আ.)এর ইমামতের প্রথম দিন
সন ২৬০ হিজরী ইমাম হাসান আসকারী (আ.)এর শাহাদতের পরে ৯ই রবিউল আওয়াল দিনটি ছিল ইমাম মাহদী (আ.) এর ইমামতের প্রথম দিন এবং সেদিন থেকেই ইমাম মাহদী (আ.) এর ইমামতের স্বল্পকালীন অন্তর্ধান শুরু হয়। (মুতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬৭, শারহে নাহজুল বালাগা, খন্ড ১৬, পৃষ্ঠা ২৩৫, মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৯৬, উরওয়া তুল উসকা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৬১, যাদুল মাআদ, পৃষ্ঠা ৩৪৪)
1. হজরত উমর ইবনে খাত্তাবের মৃত্যুদিবস
রেওয়ায়েতের একটি মত অনুযায়ি সন ২৩ অথবা ২৪ হিজরীর ৯ই রবিউল আওয়াল তারিখে রাতের শেষ অংশে হজরত উমর ইবনে খাত্তাব মৃত্যু বরণ করেন। কিন্তু আহলে সুন্নাতের মত অনুযায়ি তিনি রোজ বুধবার ২৬শে জিলহজ্ব তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। ইতিহাসে তার মৃত্যুর ঘটনা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মুগাইরা বিন শোয়বার দাশ যার নাম ছিল ‘আবু লুলু’ সে হজরত উমরকে কয়েকবার চাকু দ্বারা মারাত্মকভাবে আঘাত করে এবং উক্ত কারণে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। (তাবাকাতে কুবরা, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৫, মাদিনাতুল মাআজেয, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৯৭, ইকবাল, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১১৪, মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬৮, কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউল আওয়াল, পৃষ্ঠা ৫৯)
2. উমর ইবনে সাআদের মৃত্যুদিবস
উমর ইবনে সাআদ ছিল এজিদের সেনাপতি। ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদতের ক্ষেত্রে সে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। মোখতারে সাকাফির নেতৃত্বে উমরে সাআদকে হত্যা করা হয়। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৩৬, যাদুল মাআদ, পৃষ্ঠা ৩৪৪, রিয়াযুল ওলামা, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫০৭)
১০ই রবিউল আওয়াল
1. রাসুল (সা.) এর বিবাহ
হজরত মোহাম্মাদ (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির ১৫ বছর পূর্বে ১০ই রবিউল আওয়াল তারিখে উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (সা.আ.) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হজরত খাদিজা (সা.আ.) এর সম্পদ এতই বেশি ছিল যে ৮০ হাজার উট শুধুমাত্র তাঁর ব্যাবসার মালামাল বহণ করতো। আরবের বিভিন্ন ব্যাক্তিত্বগণ তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন কিন্তু তিনি তাদের বিবাহের প্রস্তাবে রাজি হন নি। কিন্তু তিনি রাসুল (সা.) এর সততা এবং সত্যবাদিতা দেখ মুগ্ধ হন এবং তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। অতঃপর তাঁদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। (ইকবালুল আমাল, পৃষ্ঠা ৫৯৯, মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, পৃষ্ঠা ২০, এখতিয়ারাত, পৃষ্ঠা ৩৪, মাসারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ২৯, তাকভিমুল মোহসেনিন, পৃষ্ঠা ১৬)
2. দাউদ বিন আলীর মৃত্যু
সাফফাহ-এর চাচা দাউদ বিন আলী সন ১৩৩ হিজরী ১০ই রবিউল আওয়াল তারিখে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এর দোয়ার কারণে মৃত্যু বরণ করে। (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউল আওয়াল, পৃষ্ঠা ৬৭, যাদুল মাআদ, পৃষ্ঠা ৩৪৪)
3. মালেক বিন আনাসের মৃত্যুদিবস
সন ১৭৯ হিজরীতে মালেক বিন আনাস আসবাহা তিনি ছিলেন মালেকি মাযহাবের কর্ণধারক। তিনি ১০ই রবিউল আওয়াল তারিখে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। এছাড়াও ইতিহাসে তার মুত্য সম্পর্কে একাধিক মতামত বর্ণিত হয়েছে যেমন: ১১, ১৩ এবং ১৪ই রবিউল আওয়াল। (রওযাতুল জান্নাত, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ২২৪, ওয়াকায়েউল আইয়াম, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৯০, তাহযিবুল কামাল, খন্ড ২৭, পৃষ্ঠা ১১৯, মুরুজুয যাহাব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৫০, তাহযিবুল আসমা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮৬)
4. মাবিয়ার খেলাফত অর্জন
সন ৪১ হিজরীর ১০ই রবিউল আওয়াল তারিখে মাবিয়া কপটতার মাধ্যমে খেলাফত অর্জন করেছিল। হজরত উসমানের পরে সে ছিল বণি উমাইয়ার খেলাফতের আরেকজন খলিফা। যার জন্য মুসলমানদের কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। তবে ইতিহাসে মাবিয়ার খেলাফত অর্জনের বিষয় সম্পর্কে বিভিন্ন তারিখ বর্ণিত হয়েছে যেমন: ৫ই রবিউল আওয়াল, প্রথম অথবা ১৫ই জামাদিউল আওয়াল বর্ণিত হয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ হচ্ছে ২৫শে রবিউল আওয়াল। (মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, পৃষ্ঠা ৬, ৪৪৮, বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ২০, উসদুল গাবা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৪, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ২০, তোহফাতুল আহওয়াযি, খন্ড ১০ পৃষ্ঠা ১৮৯)
১২ই রবিউল আওয়াল
1. রাসুল (সা.) মদীনায় প্রবেশ করেন
১২ই রবিউল আওয়াল তারিখের অস্তবেলায় রাসুল (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় পৌছায় এবং কুবা নাক স্থানে হজরত আলী (আ.)এর জন্য অপেক্ষা করেন। যখন হজরত আলী (আ.) সেখানে এসে পৌছান তখন রাসুল (সা.) তাঁদেরকে নিয়ে মদীনায় প্রবেশ করেন। (মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ২৮, তারিখে তাবারী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১১৪, তাবাকাতুল কুবরা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬, কাফি, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৩৯, মাসারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ২৯)
2. মোতাসিম আব্বাসির মৃত্যু
সন ২২৭ হিজরীর ১২ রবিউল আওয়াল তারিখ রোজ বৃহঃস্পতিবারে রাতের প্রথমভাগে মোতাসেম আব্বাসি সামেরায় মারা যায়। তার মৃত্যুর কারণ হচ্ছে “হেজামত” (এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় শরিরে বদ রক্ত বাহির করা হয়) করার পরে তার জ্বর আসে এবং উক্ত জ্বরের কারণে সে ৪৯ বছর বয়সে মারা যায়। (তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ২৯৭- ৩১০, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ২১৩, সিরেহ আলামুন নোবালা, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৩০৬, আল বেদায়অ ওয়ান নেহায়া, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৩২৪, আত তাম্বি ওয়াল এশরাফ, পৃষ্ঠা ৩০৭)
3. আহমাদ বিন হাম্বালের মৃত্যুদিবস
সন ২৪১ হিজরীর ১২ই রবিউল আওয়াল তারিখে হাম্বালি মাযহাবের কর্ণধারক আহমাদ বিন হাম্বাল বাগদাদে মৃত্যুবরণ করে এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। ইতিহাসের অন্য এক বর্ণনা অনুযায়ি তিনি রবিউস সানী মাসে মৃত্যুবরণ করেন। (মারাকেদুল মাআরেফ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১২৩)
১৪ই রবিউল আওয়াল
1. এজিদ বিন মাবিয়ার মৃত্যু
সন ৬৪ হিজরীর ১৪ই রবিউল আওয়াল তারিখে এজিদ ইবনে মাবিয়া বিন আবু সুফিয়ান ৩৫ অথবা ৩৭ বছর বয়সে অতিরিক্ত মদ পানের কারণে দামেস্কে মারা যায় এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। এজিদের রাজত্বকাল ছিল তিন বছর আট মাস। এছাড়াও ইতিহাসে এজিদের মৃত্যু তরিখ সম্পর্কে অন্য মতামতও বর্ণিত হয়েছে যমন: ১৫ই রবিউল আওয়াল। (ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ২১৬, তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৮৯, তারিখে দামেস্ক, খন্ড ৫৯, পৃষ্ঠা ৩০৫, উসদুল গাবা, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৬৩, মুরুজুয যাহাব, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭২)
2. আব্বাসীয় খলিফা মুসা হাদীর মৃত্যু
ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ি সন ১৭০ হিজরীর ১৪ই রবিউল আওয়াল তারিখে আব্বাসীয় খলিফা মাহদী আব্বাসির পুত্র মুসা হাদি ২৫ অথবা ২৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে। ইতিহাসের অন্য বর্ণনা অনুযায়ি ১৫, ১৮ তারিখটিও তার মৃত্যুর দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসে তার পাষন্ডতা, ক্রোধ এবং বিদ্বেষ ছিল প্রসিদ্ধ। (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউল আওয়াল, পৃষ্ঠা ৮৯, তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ২২৪, ২২২, মিনহাজুদ দাওয়াত, পৃষ্ঠা ২১৯, আল কুনিয়া ওয়াল আলকাব, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৯২, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৮, পৃষ্ঠা ১৫০)
১৭ই রবিউল আওয়াল
1. হজরত মোহাম্মাদ (সা.)এর জন্মদিবস
হজরত মোহাম্মাদ (সা.) বর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। প্রচলিত ধারনা মতে, তিনি ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগষ্ট বা আরবি রবিউল আওয়াল মাসের ১৭ তারিখ জন্মগ্রহণ করেন। সকল আলেমদের মতে রাসুল (সা.) শুক্রবার প্রভাতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের সময় বিশ্বে অবিস্মরণিয় কিছু ঘটনা ঘটে যা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ মাতার নাম ছিল আমিনা। (আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৩, তাজুল মাওয়ালিদ, পৃষ্ঠা ৫, কাশফুল গুম্মা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪, আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২, তাহযিবুল আহকাম, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ২)
2. ইমাম জাফর সাদিক (আ.)এর জন্মদিবস
সন ৮৩ হিজরীর ১৭ রবিউল আওয়াল তারিখে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম জাফর, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ, উপাধি সাদিক। তাঁর পিতার নাম ইমাম বাকের (আ.) এবং মাতার নাম ছিল উম্মে ফারওয়া। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৯, মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৮০, আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৫১৪, তৌযিহুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ৯, রওযাতুল ওয়ায়েযিন, পৃষ্ঠা ২১২)
২২শে রবিউল আওয়াল
বণি নাযিরের যুদ্ধ
সন ৪র্থ হিজরী ২২শে রবিউল আওয়াল বণি নাযির নামক যুদ্ধটি সংঘটিত হয় এবং ইয়াহুদিদেরকে মদীনা থেকে বহিস্কার করা হয়। (আস সহীহ মিনাস সিরাহ, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৬, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ২২৩)
২৩শে রবিউল আওয়াল
কুম নগরিতে হজরত মাসুমা (সা.আ.) এর আগমণ
ফাতেমা-এ সানী, হজরত ইমাম মুসা ইবনে জাফার (আ.) এর কন্যা। তিনি শিয়াদের মাঝে কারিমায়ে আহলে বাইত (আ.) নামে সুপ্রসিদ্ধ। এছাড়া তিনি তাহেরাহ, হামিদাহ, বিররাহ, রাশিদাহ, তাক্বিয়াহ, নাক্বিয়াহ, সাইয়্যিদাহ, রাদ্বিয়াহ, উখতুর রেদ্বা, সিদ্দিকাহ, শাফিয়াহ ইত্যাদি উপাধীর অধিকারী। তার মায়ের নাম ‘নাজমা’। তিনি ১৭৩ হিজরী’র ১লা যিলক্বদ মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। হজরত ফাতেমা (সা. আ.) যখন ১০ বছরের ছিলেন, তখন তাঁর সম্মানিত পিতা ইমাম মুসা ইবনে জাফার (আ.) শহীদ হন। এর পর হতে পিতার ওসিয়ত অনুযায়ী এ মহিয়সী এবং ইমামের অপর সন্তানাদির অবিভাবকত্ব ইমাম রেজা (আ.) এর উপর অর্পিত হয়। হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা. আ.) ছাড়াও ইমাম মুসা ইবনে জাফার (আ.) এর আরো কন্যা ছিলেন। তাদের মধ্যে শুধুমাত্র তিনিই ছিলেন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।
সন ২০১ হিজরীর ২৩শে রবিউল আওয়াল তারিখে ইমাম রেযা (আ.)এর বোন হজরত ফাতেমা মাসুমা (সা.আ.) পবিত্র কুম নগরিতে আগমণ করেন এবং দিন পরে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫৭, পৃষ্ঠা ২১৯)
২৫শে রবিউল আওয়াল
1. দুমাতুল জুন্দাল-এর যুদ্ধ
সন ৫ হিজরীরে ২৫শে রবিউল আওয়াল তারিখে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। উক্ত এলাকায় কিছু লোকজন একত্রিত হয়ে বিভিন্ন কাফেলাদেরকে লুট করতো। রাসুল (সা.) উক্ত ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হলে তিনি মদীনাতে নিজের স্থলে সাবা বিন আরফাতা গাফফারিকে রেখে নিজেই ২৫শে রবিউল আওয়াল এক হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনা থেকে বাহিরে আসেন। যখন রাহজানরা রাসুল (সা.) এর আগমণ সম্পর্কে অবগত হয় তখন তারা পালিয়ে যায়। তখন মুসলমানরা তাদের সকল মালামালকে নিয়ে ২০শে রবিউস সানী মদীনায় ফিরে আসে। (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড রবিউল আওয়াল, পৃষ্ঠা ১৫০, আস সহীহ মনি সিরাহ, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৮৯, তাবাকাতুল কুবরা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬২, উয়ুনুল আসার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩২)
2. ইমাম হাসান (আ.) ও মাবিয়ার মাঝে সন্ধি
৪১ হিজরি ২৬ শে রবিউল আউয়াল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র প্রিয় বড় নাতি হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) উমাইয়া বিদ্রোহী মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের সঙ্গে সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষর করে শর্ত-সাপেক্ষে ততকালীন মুসলিম রাষ্ট্রের খেলাফত (বা রাজনৈতিক শাসন) সাময়িকভাবে ত্যাগ করেন।
আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)’র শাহাদতের পর ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। পিতার অসমাপ্ত কাজ তথা মুয়াবিয়ার বিদ্রোহ দমনের জন্য তিনিও জিহাদ করতে প্রস্তুত ছিলেন এবং তিনি মুয়াবিয়ার কাছে লেখা এক চিঠিতে লিখেছিলেন যে, মুসলমানরা তাঁর পিতার পর তাঁকে খেলাফতের জন্য বেছে নিয়েছে, আর তাই জনগণের মত মুয়াবিয়াও যেন তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। মুয়াবিয়া যদি এখনও ভুল করেন (অর্থাত বিদ্রোহ অব্যাহত রাখেন) তাহলে তিনি মুসলমানদেরকে নিয়ে তাকে শাস্তি দেবেন বলেও সতর্ক করে দিয়েছিলেন ওই চিঠিতে। তিনি তাকে এও লিখেছিলেন যে, “আল্লাহকে ভয় কর, জুলুম ও মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধ কর। অনুগত ও শান্তিকামী হও। আর এমন লোকদের সঙ্গে কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ করো না যারা তোমার চেয়ে এ কাজে বেশি যোগ্য।”
বিদ্রোহী মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে উতসাহিত করার জন্য হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) খেলাফতের দায়িত্ব নেয়ার পর পরই যোদ্ধাদের বেতন শতকরা ১০০ ভাগ বৃদ্ধি করেছিলেন। তাই এ ধারণা ঠিক নয় যে ইমাম হাসান (আ.) সাহসী ও জিহাদপন্থী ছিলেন না। মিথ্যা প্রচারে অভ্যস্ত উমাইয়ারাই ইমামকে ভীরু ও বিলাসী হিসেবে ইতিহাসে তুলে ধরতে চেয়েছে।
দুঃখজনকভাবে হযরত ইমাম হাসান (আ.) তার সমর্থকদের মধ্যে জিহাদের কোনো আগ্রহই দেখতে পাননি। বরং তাঁর প্রধান সেনা কর্মকর্তারাই মুয়াবিয়ার গুপ্তচরদের লোভনীয় প্রস্তাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এমনকি তাদের কেউ কেউ ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র করে ইমাম হাসান (আ.)-কে মুয়াবিয়ার হাতে তুলেও দিতে চেয়েছিল।
এ ছাড়াও হাসান (আ.) জানতেন যে মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এই সুযোগে বাইজান্টাইন সম্রাট ‘চতুর্থ কনস্টানটিন’ মুসলমানদের প্রথম কিবলা অধ্যুষিত বায়তুল মোকাদ্দাস শহরটি দখলের পদক্ষেপ নেবে। তাই ইমাম শান্তি ও কূটনৈতিক পন্থার মাধ্যমে প্রিয় নানার ধর্মের বার্তা তথা খাঁটি মুহাম্মদী ইসলামকে রক্ষার জন্য ও ইসলামকে দূষণমুক্ত করার যে কাজ পিতা হযরত আলী (আ.) শুরু করেছিলেন সেই মিশনকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে মুয়াবিয়ার সঙ্গে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত সমর্থকদের নিস্ক্রিয়তা ও আদর্শিক বিচ্যুতির কারণেই ইমাম হাসান (আ.)-কে যুদ্ধ-বিরতির পথ বেছে নিতে হয়েছিল।
ইমাম (আ.) এও জানতেন যে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা বা শাসন-ক্ষমতা হাতে না পেলেও মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত ইমামই থেকে যাবেন। তাই মুয়াবিয়ার স্বরূপ বা আসল চেহারা জনগণের কাছে তুলে ধরার জন্য তাকে কিছু (নোংরা কাজের সুযোগ) অবকাশ দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে এ সন্ধির ফলে মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল।
অবশ্য ইমাম হাসান (আ.) ছোট ভাই ইমাম হুসাইন (আ.)’র মতই জালেম শাসকের বিরুদ্ধে জিহাদের পথই ধরতেন যদি তিনি দেখতেন যে, অল্প কিছু সংখ্যক হলেও তাঁর কিছু একনিষ্ঠ ও নিবেদিত-প্রাণ সমর্থক রয়েছেন যারা ইসলামের জন্য যুদ্ধ করতে ও শহীদ হতে প্রস্তুত। ইতিহাসে দেখা যায় শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন (বা কিছু কম/বেশি) শাহাদত-পাগল ও আহলে-বাইত প্রেমিক মুসলমান ইমাম হুসাইন (আ.)’র সঙ্গে স্বেচ্ছায় থেকে গেছেন এবং মহাবীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছেন। ইমাম হুসাইন (আ.) কুফার প্রায় সব মানুষের সমর্থন পেয়েছিলেন প্রথম দিকে। তারা পরবর্তীতে এই ইমামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। অন্যদিকে ইমাম হাসান (আ.)’র সঙ্গীরা প্রথম দিকেই তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং এমনকি গোপনে শত্রু শিবিরে যোগ দেয়। তাই ইমাম হাসান (আ.)’র নিবেদিত প্রাণ সমর্থকের সংখ্যা ছিল ইমাম হুসাইন (আ.)’র নিবেদিত-প্রাণ সঙ্গীদের সংখ্যার চেয়েও অনেক কম বা হাতে গোনা যে কয়জন সঙ্গী ছিল তাদের ওপর ভরসা করতে পারেননি বড় ভাই ইমাম হাসান (আ.)। কারণ, আদর্শিক দৃঢ়তা তাদের মধ্যে ছিল না।
উল্লেখ্য, মুয়াবিয়ার বাবা আবু সুফিয়ান ছিল ইসলামের ও বিশ্বনবী (সা.)’র কঠোরতম শত্রু । মক্কা বিজয়ের পর (অষ্টম হিজরিতে) অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুয়াবিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইত (আ.)-এর সঙ্গে তার শত্রুতা অব্যাহত থাকে। হযরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে এক মিথ্যা অজুহাতে সে সিরিয়া থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সিফফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এই বিদ্রোহের কারণে। এই যুদ্ধে মুয়াবিয়ার পক্ষে ৪৫ হাজার নিহত এবং হযরত আলী (আ.)’র পক্ষে শহীদ হন পঁচিশ হাজার মুজাহিদ।
হযরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু করার পেছনে মুয়াবিয়ার অজুহাত ছিল তৃতীয় খলিফার হত্যাকাণ্ডের বিচার। এটা যে নিছক অজুহাতই ছিল তার প্রমাণ হল হযরত আলী (আ.)’র শাহাদতের পর মুসলিম বিশ্বের সব অঞ্চল ছলে বলে কৌশলে করায়ত্ত করা সত্ত্বেও মুয়াবিয়া আর কখনও তৃতীয় খলিফার হত্যাকারীদের বিচারের কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি। দ্বিতীয় খলিফার শাসনামল থেকেই সিরিয়ায় প্রায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রধানের মত চালচলনে অভ্যস্ত মুয়াবিয়া জানত যে হযরত আলী (আ.)’র মত কঠোর ন্যায়বিচারক শাসক তাকে কখনও ছোট বা বড় কোন পদ দেবেন না। তাই আলী (আ.) খলিফা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মত মুয়াবিয়াকেও পদচ্যুত করলে ইসলামের ইতিহাসে রাজতন্ত্র প্রবর্তনকারী মুয়াবিয়া সিরিয়ায় বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে।
ইমাম হাসান (আ.)এর সাথে মাবিয়ার সন্ধি সংঘটিত হয়। মুয়াবিয়ার সঙ্গে ইমাম হাসান (আ.)’র সন্ধির কিছু শর্ত:
আহলে বাইতের অনুসারীদের রক্ত সম্মানিত ও হেফাজত থাকবে এবং তাদের অধিকার পদদলিত করা যাবে না।
মুয়াবিয়াকে হজরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, গালি-গালাজ, অপবাদ ও প্রচারণা বন্ধ করতে হবে।
জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন ইরানি প্রদেশগুলোর সরকারি আয় থেকে তাদের পরিবারগুলোকে এক মিলিয়ন দেরহাম অর্থ সাহায্য দিতে হবে
ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়াকে আমিরুল মু’মিনিন বলে উল্লেখ করবেন না।
মুয়াবিয়াকে অনৈসলামী আচার-আচরণ পরিহার করতে হবে এবং আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাত অনুযায়ী আমল করতে হবে।
মুয়াবিয়া কোনো ব্যক্তিকেই (খেলাফতের জন্য) নিজের উত্তরসূরি মনোনীত করতে পারবে না। মুয়াবিয়া মারা গেলে খেলাফত ফেরত দিতে হবে ইমাম হাসান (আ.)’র কাছে।
ইমাম হাসান (আ.) যদি মারা যান, তাহলে মুসলিম জাহানের খেলাফত হস্তান্তর করতে হবে রাসুল(সা.)’র ছোট নাতি হজরত ইমাম হুসাইন(আ.)’র কাছে।
কিন্তু মুয়াবিয়া প্রকাশ্যেই নির্লজ্জভাবে সন্ধির শর্তগুলো লঙ্ঘন করেছিল। মুয়াবিয়া ৫০ হিজরীতে গোপনে বিষ প্রয়োগ করে ইমাম হাসান(আ.)-কে শহীদ করে। ৬০ হিজরীতে মৃত্যুর কিছু দিন আগে মুয়াবিয়া তার মদ্যপ ও লম্পট ছেলে ইয়াজিদকে মুসলমানদের খলিফা বলে ঘোষণা করে।
মুয়াবিয়া বলত যেখানে টাকা দিয়ে কাজ হয় সেখানে আমি টাকা বা ঘুষ ব্যবহার করি, যেখানে চাবুক দিয়ে কাজ হয় সেখানে আমি তরবারি ব্যবহার করি না, আর যেখানে তরবারি দরকার হয় সেখানে তরবারি ব্যবহার করি। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৬৫, তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ৪০ ৪১, তারিখে দামেস্ক, খন্ড ৫৯, পৃষ্ঠা ১৪৯, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৪, মাকাতেলুত তালেবিন, পৃষ্ঠা ২৬)



