Press "Enter" to skip to content

কিবলা পরিবর্তন হওয়ার ব্যাপারে নবীর (সা.)সাথে ইয়াহুদীদের  মুনাযিরা

আমরা জানি যে, নবী (সা.)মক্কায় বাইতুল মুকাদ্দাসের (ইয়াহুদীদের কিবলা) দিকে ফিরে নামায আদায় করতেন৷ তদ্রূপ মদীনাতেও হিজরাতের পরে ষোল মাস ঐ দিকে ফিরেই নামায আদায় করেছিলেন৷

মুসলমানদের শত্রু ইয়াহুদীরা এই বিষয়কে একটি বাহানা হিসেবে ধরে ইসলামকে পরাস্ত করতে চাইলো এবং বলল : “মুহাম্মদ (সা.)দাবী করছে যে, সে আলাদা একটি শরীয়ত ও নিয়ম-কানুন এনেছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত তার কিবলা সেই ইয়াহুদীদের কিবলাই রয়েছে৷”

এই ধরনের আপত্তিমুলক কথা-বার্তা নবীর (সা.)অন্ত্যরে ব্যাথার উদ্রেক হল৷ তিনি রাতে বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসতেন এবং ওহীর অপেক্ষায় আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকতেন৷ এমতবস্থায় সূরা বাকারার ১৪৪ নং আয়াত নাজিল হল এবং তাতে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে কিবলা পরিবর্তন করে কা’বাকে কিবলা হিসেবে নির্দিষ্ট করার নির্দেশ আসলো৷

রজব মাসের মধ্যবর্তী সময়ের দিকে হিজরতের পরে ষোল মাস পূর্ণ হয়েছিল, নবী (সা.)’বনী সালামহ্’ (আহ্যাব মসজিদের এক কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত) নামক মসজিদে জামা’তের সাথে যোহরের নামায আদায় করছিলেন৷ এমন সময় দুই রাকা’ত  নামায আদায়  শেষে জিব্রাঈল (আ.)সূরা বাকারার ১৪৪ নং আয়াতটি নিয়ে নাজিল হলেন ৷ নবী (সা.)ঐ অবস্থাতেই কা’বার দিকে ঘুরে যান যারা তাঁর পিছনে নামায পড়ছিল তারাও ঘুরে গেল৷ আর এভাবেই যোহরের নামাজের পরবর্তী দুই রাকা’তকে কা’বার দিকে ফিরে আদায় করে শেষ করলেন৷ সে জন্যেই এই মসজিদ পরবর্তীতে ‘মসজিদে যু-কিবলাতাইন’ অর্থাৎ দুই কিবলা বিশিষ্ট মসজিদ নামে বিশেষ পরিচিত পায়৷

এই ঘটনার পরে ইয়াহুদীরা বিভিন্ন দিক দিয়ে উক্ত কিবলা পরিবর্তনের আইনের উপর অপত্তি ও অভিযোগ তুলতে শুরু করলো৷ সাথে সাথে ইসলাম বিরোধী তবলিগের কাজেও তৎপর হয়ে উঠলো৷

এই পরিস্থিতিতে নবী (সা.)ও ইয়াহুদীদের মধ্যে সিদ্ধান্ত  হল যে,  একটি  উম্মূক্ত

আলোচনায় উক্ত বিষয়ের ব্যাপারে বক্তব্য পেশ করা হবে৷

ইয়াহুদীরা এই সভায় অংশ গ্রহণ করলো এবং সভা শুরু হলে তারা সেখানে কথা বলতে আরম্ভ করলো৷ প্রশ্ন উত্থাপন করে তারা বলল :

“তুমি এক বছরের বেশী সময় মদীনায় এসেছো এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায পড়েছো৷ কিন্তু বর্তমানে তা থেকে দুরে সরে গেছ এবং কা’বার দিকে ফিরে নামায আদায় করছো৷ এখন দয়াকরে বল, যে নামাযগুলো বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে পড়েছো তা ঠিক ছিল না ভূল?

যদি ঠিক থেকে থাকে তবে অবশ্যই তোমার দ্বিতীয় কাজটি হচেছ বাতিল এবং যদি বাতিল হয়ে থাকে তবে আমরা কিভাবে তোমার অন্যান্য আমলসমূহের প্রতি (যা কিনা সকল সময় পরিবর্তন হচেছ) নিশ্চয়তা অর্জন করবো, কেননা তোমার বর্তমান কিবলাও বাতিল হতে পারে?!

নবী (সা.): দুটি কিবলার প্রতিটিই নিজেদের স্থানে ঠিক ছিল৷ এই কয়েক মাস যে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে  ফিরে  নামায  পড়েছি তা ঠিক ছিল৷  আমরা  আল্লাহ্র  পক্ষ  থেকে  নির্দেশ  প্রাপ্ত হয়েছি যে, এখন

থেকে কা’বাকে নিজেদের কিবলা হিসেবে স্থান দিব৷

و لله المشرق و المغرب فاينما تولوا فثم وجه الله انَّ الله واسع عليم

“পূর্ব থেকে পশ্চিম এই বিস্তীর্ণ ভূমির সবই হচেছ আল্লাহ্ তা’য়ালার তাই যে দিকেই তাকাবে আল্লাহ্ সে দিকেই রয়েছেন, আল্লাহ্ তা’য়ালা হচেছন অমুখাপেক্ষী ও বিজ্ঞ (বাকারা/১১৫)৷”

তারা : হে মুহাম্মদ! আল্লাহ্ কি  ্থبداء্তু ‘বাদা’ অর্জন করেছেন (অর্থাৎ এমন কোন বিষয় যা আগে আল্লাহ্র কাছে পরিস্কার ছিল না বা গোপন ছিল বর্তমানে তা তাঁর কাছে পরিস্কার হয়েছে বা বুঝতে পেরেছেন, তাই পূর্বের নির্দেশের ব্যাপারে অনুতপ্ত হয়ে পূনরায় নতুন নির্দেশ দিয়েছেন)৷

এই কারণেই নতুন কিবলা নির্ধারণ করেছে? যদি এমন বল তবে আল্লাহ্কে একজন মূর্খ ও অনুশোচনাগ্রস্ত মানুষের ন্যায় মনে করলে?!

নবী (সা.): ‘বাদা’ তোমরা যে অর্থে বলছো তা আল্লাহ্র জন্য নয়৷ আল্লাহ্ সব কিছুর ব্যাপারে জ্ঞাত ও ক্ষমতাবান৷ তাঁর পক্ষ থেকে কোন ভূল হয় না যে, তার কারণে পরবর্তীতে অনুশোচনাগ্রস্ত হবে বা নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন৷ কোন কিছুই তাঁর পথে বাধা হয়ে দাড়াতে পারে না যে, তার কারণে সময়কে পরিবর্তন বা স্থানান্তরিত করবেন৷

তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করছি : “অসুস্থ ব্যক্তি কি সুস্থ হয় না? অথবা সুস্থ ব্যক্তি কি অসুস্থ হয় না? জীবিত ব্যক্তি কি মৃত্যুবরণ করে না? অথবা শীতকাল পেরিয়ে কি গরমকাল আসে না? এখন বল দেখি আল্লাহ্ তা’য়ালা যে এই সকল কিছুর পরিবর্তন ঘটান সেক্ষেত্রে কি তাঁর ‘বাদা’ অর্জন করতে হয়?!”

তারা : না, এ সকল বিষয়ে ‘বাদা’ নেই৷

নবী (সা.): কিবলা পরিবর্তনের বিষয়টিও এই প্রকৃতির৷ আল্লাহ্ তা’য়ালা সব সময় তাঁর বান্দার যা কিছুতে মঙ্গল সে সকল বিষয়ে বিশেষ নির্দেশ দেন, তবে শুধুমাত্র যারা তাকে মেনে চলবে তারাই পুরস্কৃত হবে৷ আর এ ব্যতীত  অন্যরা  সাজা  প্রাপ্ত  হবে৷  তাই  খোদায়ই পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রনের ব্যাপারে কোন আপত্তি ও অভিযোগ করা উচিৎ হবে না ৷

তোমাদের কাছে আমার অন্য আরেকটি প্রশ্ন হচেছ : “তোমরা কি শনিবারে তোমাদের সমস্ত প্রকার কাজকে বন্ধ কর না? তোমরা কি শনিবারের পরের দিনে পূনরায় কাজে লেগে যাও না? এখন বল এ দুটির মধ্যে কোনটি হক্ক? প্রথমটি হক্ক আর দ্বিতীয়টি বাতিল অথবা এর বিপরীত যে, প্রথমটি বাতিল আর দ্বিতীয়টি হক্ক অথবা এ দুটিই হক্ক অথবা এ দুটিই বাতিল?!”

তারা : এ দুটির প্রতিটিই হক্ক!

নবী (সা.): আমিও বলছি যে, এ দুটির প্রতিটিই হক্ক৷ সুতরাং আগের বছর, মাস ও দিনগুলোতে বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা নির্ধারণ করা হক্ক ছিল আর এখন কা’বাকে কিবলা নির্ধারণ করাটাও হচেছ হক্ক৷

তোমরা অনুরূপ অসুস্থ মানুষের মত৷ আল্লাহ্ তা’য়ালা হচেছন দক্ষ চিকিৎসক৷ আর একজন অসুস্থ ব্যক্তির এটাই উচিৎ যে, দক্ষ চিকিৎসকের অনুসরণ করা, তার নির্দেশগুলোকে নফ্সের চাওয়া-পাওয়ার উর্দ্ধে স্থান দেয়া৷

(উল্লেখ্য যে, এক  ব্যক্তি ইমাম হাসান আসকারীর (আ.)কাছে এই মুনাযিরা সম্পর্কে জানতে চাইলো : কেন প্রথম থেকেই মুসলমানদের কিবলা কা’বা হয়নি?)

ইমাম এই প্রশ্নের জবাবে বললেন : আল্লাহ্ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারার ১৪৩ নং আয়াতে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন যার ব্যাখ্যা হচেছ নিম্নরূপ :

উদ্দেশ্য এটাই যে, মু’মিনগণকে মুশরিকদের থেকে আলাদা করা এবং তাদের অবস্থানকে একে অপর থেকে পৃথক করা৷ কেননা কা’বা তখনও পর্যন্ত মুশরিকদের মূর্তিতে পূর্ণ ছিল৷ আর সেগুলোর সম্মূখে তারা সিজদা দিত৷ সুতরাং নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, মুসলমানগণ সাময়িকভাবে বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা হিসেবে নামায আদায় করবে৷ যাতে করে নিজেদের অবস্থানকে মুশরিকদের থেকে আলাদা করবে ৷ কিন্তু যখন মদীনায় হিজরত করলেন এবং একটি স্বতন্ত্র জাতি ও সরকার গঠিত হল ও অন্যদের থেকে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হল৷ তখন এ অবস্থাকে অব্যাহত দেয়ার প্রয়োজন থাকলো না৷ সুতরাং মুসলমানগণ কা’বার দিকে ফিরে নামায আদায় করতে লাগলো৷ এটা সত্য যে, সেদিন যারা নব মুসলামন হয়েছিল, যাদের মধ্যে তখনো র্শিক করার প্রবণতা সম্পূর্ণভাবে ধবংস হয়ে যায়নি, তাদের পক্ষে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করাটা খুব সহজ কাজ ছিল না৷ এই নির্দেশের মাধ্যমে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া ও পরীক্ষা নেয়া হচিছল, যাতে করে অভ্যাসের  পরিবর্তন ও  জাহেলিয়াতের  সাথে সর্ম্পকের বিচিছন্নতা ঘটায়৷ আর এটা তো পরিস্কার যে, যারা বাতিল অভ্যাসের পরিবর্তন করতে পারে না তারা কখনোই পরিপূর্ণভাবে হকের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারবে না৷ প্রকৃতপক্ষে প্রাথমিক পর্যায়ে বাইতুল মুকাদ্দাসকে কিবলা হিসেবে গ্রহণ করাটা এইটি আধ্যাত্মিক ও চিন্তাগত দিক ছিল৷ আর ইসলাম এর মাধ্যমে বাতিল সামাজিক প্রথাকে ধবংস করেছিল (কিন্তু মদীনায় এরূপ অবস্থা ছিল না অথবা কা’বার প্রতি দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন বেশী ছিল) ৷