Press "Enter" to skip to content

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার কল্পকাহিনি ও ওহাবীদের ষড়যন্ত্র– ৪

মূল: আল্লামা সৈয়দ মুরতযা আসকারী

অনুবাদ নূর হোসেন মজিদী

প্রসঙ্গ: সাইফ ও সাক্বীফার ঘটনা

সাইফ সাক্বিফাহর’ (সাক্বিফাহ্ মানে ছাউনি। রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সাহাবিগণ বানু সায়েদাহর একটি ছাউনির নিচে সমবেত হয়ে খেলাফতের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হন ও পরে ফয়সালায় পৌঁছেন বিধায় ইতিহাসে এ ঘটনা সাক্বিফাহর ঘটনা হিসেবে সুপরিচিত হয়েছে। -অনুবাদক) ঘটনা সম্পর্কে সাতটি হাদিস বর্ণনা করেছে। আমরা এখানে তার বর্ণিত হাদিসগুলো উদ্ধৃত করব এবং এরপর একই ঘটনা সম্পর্কে অন্যান্য সূত্রের বর্ণনা উদ্ধৃত করব ও উভয়ের মধ্যে তুলনা করব-

সাইফের বর্ণিত হাদিসসমূহ

১) ইবনে হাজার ‘আসকালানী ক্বা’ক্বা’ বিন্ ‘আম্ সম্পর্কে সাইফ থেকে বর্ণনা করেন-ক্বা’ক্বা’ বলেন “আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাতের সময় উপস্থিত ছিলাম। আমি যখন যোহরের নামায আদায় করছিলাম তখন এক ব্যক্তি এসে বললেন- “আনসাররা সর্বসম্মতভাবে সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহকে খলিফা নির্বাচিত করতে এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে কৃত অঙ্গীকার পরিত্যাগ করতে চাচ্ছেন। মুহাজিররা এ খবর শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।” (তারীখে তাবারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১০)

২) তাবারী হিজরি একাদশ বর্ষের ঘটনাবলি প্রসঙ্গে সাইফ থেকে বর্ণনা করেন –

বর্ণনাকারী সা’ঈদ বিন যায়েদকে জিজ্ঞেস করলেন-“রাসূল্লাহর (সা.) ওফাতকালে আপনি উপস্থিত ছিলেন?”

তিনি বললেন- “হ্যাঁ।”

“কোন দিন আবুবকরের সাথে বাই’আত অনুষ্ঠিত হয়?”

“যেদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইন্তেকাল করেন সেদিনই, যেহেতু লোকেরা সামাজিক সংস্থা ব্যতীত অর্ধদিনও থাকতে চায়নি।”

“কেউ কি আবুবকরের সাথে বাই’আতের বিরোধিতা করেছিলেন?”

“না, আল্লাহ্ তাদেরকে আনসারদের হাত থেকে মুক্তি দেয়ার পর, একমাত্র যারা মুরতাদ হয়েছিল বা মুরতাদ হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল তারা ব্যতীত কেউই বিরোধিতা করেনি।”

“মুহাজিরদের মধ্য থেকে কেউ বাই’আত হওয়া থেকে বিরত ছিলেন?”

“না, কেউ বাই’আতের জন্যে তাঁদেরকে অনুপ্রাণিত না করা সত্ত্বেও তাঁদের সকলে একের পর এক এসে বাই’আত হন। ”

৩) আনসারদের সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহর নিকট বাই’আত হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ ও হযরত আবুবকরের প্রতি তাঁদের বিরোধিতা প্রসঙ্গে তাবারী বলেন, সাইফ্ স্বীয় সনদে সাহল্ ও আবি ওসমান থেকে এবং তাঁরা যাহহাক্ বিন্ খালীফাহ্ থেকে বর্ণনা করেন’- (আল্-ইছাবাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪০; আজ-জাহ্ ওয়াত্-তা’দীল (রাযী), ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৩৬)

হুবার্ বিন্ মুনযের দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তলোয়ার উন্মুক্ত করে বললেন- আমি উষ্ট্রশালায় রক্ষিত সেই কাষ্ঠ যা এ জন্য রাখা হয় যাতে উটেরা এর সাথে গা চুলকাতে পারে এবং সেই বিশাল বৃক্ষ বিপদে পড়ে যার ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করা চলে ঝড়ো হাওয়া যার ক্ষতি করতে পারে না; আমি সিংহের গুহায় সিংহ-পিতা।” তখন হযরত ওমর তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাঁর হাতের ওপর এতই আঘাত করেন যে, তাঁর (হুবাবের) হাত থেকে তলোয়ার পড়ে যায়। হযরত ওমর তলোয়ার তুলে নিলেন এবং সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তখন অন্যরাও সা’দ বিন ‘ইবাদাহর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং এর পর পরই আবুবকরের নিকট বাই’আত হলেন। আর আনসারদের এ কাজ ছিল জাহেলিয়‍্যাত যুগের দোষের মতো একটি দোষ যার বিরুদ্ধে হযরত হযরত আবুবকর রুখে দাঁড়ান। সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহ্ যখন নাস্তানাবুদ হলেন তখন এক ব্যক্তি বললেন-“আপনারা সা’দ্‌ বিন্ ‘ইবাদাহকে খতম করে দিলেন।” তখন হযরত ওমর বললেন-“আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন; সে একটা মুনাফিক।” এরপর হযরত ওমর হুবাবের তলোয়ার দিয়ে পাথরের ওপর আঘাত করে সেটিকে (তলোয়ারটি) ভেঙ্গে ফেললেন।

৪) তাবারী বলেন:

সাইফ মুবাশশির থেকে ও তিনি জাবের থেকে বর্ণনা করেন-সেদিন সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহ্ হযরত আবুবকরকে বলেন-“হে মুহাজিরদের দল। তোমরা আমার শাসনকর্তৃত্বের ব্যাপারে ঈর্ষা করেছ। আর হে আবুবকর! তুমি আমার গোত্রের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে আমাকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাই’আতে বাধ্য করেছো।” জবাবে তাঁরা বললেন-“আমরা যদি তোমাকে তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য করতাম তাহলে এরপরও তুমি চাইলে জনগণের সাথে থাকতে পারতে; তোমার সে অধিকার থাকত। কিন্তু আমরা তোমাকে জনগণের সাথে থাকতে বাধ্য করেছি। অতএব, সুস্পষ্ট যে, এ পরিস্থিতিকে এলোমেলো করার সুযোগ দেয়া যায় না। সুতরাং, তুমি যদি কখনো আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নাও অথবা জনগণের মাঝে ফাটল সৃষ্টি কর তাহলে তোমার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলব।” (তারীখে তাবারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৮৬)

৫) তাবারী হযরত আবুবকরের অনুকূলে হযরত আলীর বাই’আত সম্পর্কে সাইফ থেকে রেওয়ায়েত করেন-

হযরত আলী তাঁর গৃহে ছিলেন। এ সময় লোকেরা খবর নিয়ে এল যে, হযরত আবুবকর বাই’আত গ্রহণের জন্যে বসেছেন। হযরত আলী এ খবর শোনার পর যেহেতু হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আতের ব্যাপারে দেরি করতে চাচ্ছিলেন না, সেহেতু তিনি ক্বাবা (ঢোলা বহিরাবরণ) ও পাজামা না পরেই কেবল একটিমাত্র জামা গায়ে তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে এলেন ও আবুবকরের নিকট ছুটে এলেন এবং তাঁর নিকট বাই’আত হয়ে তাঁর পাশে বসে পড়লেন। এরপর তিনি একজনকে তাঁর ক্বাবা নিয়ে আসার জন্যে পাঠালেন এবং (নিয়ে আসা হলে) তা পরিধান করে বসে পড়লেন।”

৬) তাবারী সাইফ থেকে রেওয়ায়েত করেন’-

রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ওফাতের পরদিন হযরত আবুবকর অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ দু’টি খুতবা প্রদান করেন। এ দু’টি খুতবায় তিনি অন্য সব কিছুর চাইতে মৃত্যু ও এ দুনিয়ার অবিনশ্বরতা এবং আখেরাতের কথা বেশি করে বললেন। (এ সম্পর্কে পরে পর্যালোচনা করা হবে। তবে এ দুই খুতবায় সর্বাধিক যা দৃষ্টিআকর্ষণ করে তা হচ্ছে একটি বিশেষ বাক্য। সাইফের রেওয়ায়েত অনুযায়ী,) হযরত আবুবকর বলেন “সাবধান! জেনে রাখো, অবশ্যই আমার একটি শয়তান আছে যা (অনেক সময়) আমাকে পরাভূত করে, অতএব, যখন তা আমার কাছে আসবে (ও আমাকে পরাভূত করবে) তখন তোমরা আমার কাছ থেকে দূরে থেকো যাতে আমি নিজের স্বার্থে তোমাদের ধন ও জনে হস্তক্ষেপ না করি।” (তারীখে তাবারী, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২১০)

৭) তাবারী’ মুবাশির বিন্ ফুযাইল থেকে, তিনি জুবাইর থেকে যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর এবং তিনি তাঁর পিতা ছাখার থেকে দেহরক্ষী বর্ণনা করেছেন-

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যখন ইন্তেকাল করেন তখন খালেদ বিন সা’ঈদ ‘আছী ইয়ামানে ছিলেন। তিনি এক মাস পর মদিনার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন এবং রেশমি ক্বাবা (বহিরাবরণ) গায়ে হযরত ওমর ও আলীর সামনে পড়ে গেলেন। হযরত ওমর তাঁকে রেশমি ক্বাবা গায়ে দেখামাত্রই আশপাশের লোকদের দিকে ফিরে চিৎকার দিয়ে উঠলেন “খালেদের ক্বাবাটি তার গায়ে থাকা অবস্থায়ই ছিঁড়ে ফেলো। সে রেশমি কাবা পরিধান করে আছে, অথচ এখন কোন যুদ্ধ নেই; বরং এখন শান্তির সময়।” (তারেীখে তাবারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৮৬)

হযরত ওমরের নির্দেশে তাঁর আশপাশের লোকেরা খালেদের রেশমি ক্বাবা তাঁর গায়ে থাকা অবস্থায়ই ছিঁড়ে ফেলল। এতে খালেদ ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন এবং হযরত আলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন-“হে আবুল হাসান, হে আব্দ মানাফের বংশধররা! তোমরা খেলাফতকে হাতছাড়া করেছ এবং পরাভূত হয়েছ!”

জবাবে হযরত আলী বললেন-“তুমি কি একে পরাভূতকারী ও পরাভূত হিসেবে দেখছ, নাকি খেলাফত হিসেবে?”

তখন হযরত ওমর খালেদের দিকে ফিরে বললেন-“আল্লাহ্ তোমার মুখকে চুরমার করে দিন। আল্লাহর শপথ! তুমি এমন কথা বলেছ যা সব সময়ই মিথ্যাবাদীদের নিকট বাহানা হয়ে থাকবে। আর যে এ কথা বলবে সে কেবল নিজের ক্ষতিই করবে।”

হযরত ওমর এরপর খালেদের কথা সম্পর্কে হযরত আবুবকরকে জানালেন।

এর কিছুদিন পর হযরত আবুবকর যখন মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করলেন তখন খালেদের জন্যেও একটি পতাকার ব্যবস্থা করলেন। হযরত ওমর তাঁকে এ কাজে বাধা দিলেন এবং বললেন – “খালেদ একজন কাপুরুষ ও দুর্বল লোক এবং সে এমন একটি মিথ্যা উচ্চারণ করেছে যে, যতদিন ধরণীর বুকে কথা বলার মতো কেউ থাকবে ততদিন তা নিয়ে আলোচনা করবে ও এর চারদিকে আবর্তন করবে। এমন কারো কাছ থেকে সাহায্য নেয়া ঠিক নয়। তখন হযরত আবুবকর তাঁকে (খালেদকে) মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিবর্তে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত করলেন এবং সেনাপতিত্ব দিয়ে তীমা’ পাঠালেন। এভাবে তিনি (হযরত আবু বকর) হযরত ওমরের কথার একাংশ মেনে নিলেন এবং অপর অংশ মানলেন না।

সাইফের হাদিসের সনদ পরীক্ষা

হাদিসশাস্ত্র বিশারদগণ কোনো হাদিস বা রেওয়ায়েতের যথার্থতা পরীক্ষা করার জন্যে দু’টি বিষয়কে বিবেচনা করেন। প্রথমত সনদ বিচার করা হয় অর্থাৎ প্রতিটি স্তরের বর্ণনাকারী কী ধরনের লোক ছিলেন তা দেখা হয়। দ্বিতীয়ত এর মূল পাঠ পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ এর বক্তব্যকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যালোচনা করা হয়। অতএব, সাকিফাহ- এর ঘটনা সম্পর্কে সাইফের বর্ণিত হাদিসসমূহও এ দুই দিক থেকেই পরীক্ষা করতে হবে।

প্রথমেই সনদের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। সাইফ থেকে এখানে প্রথম যে হাদিসটি উদ্ধৃত করেছি সেটি আল্-ইসাবাহ্ গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। সাইফ তা ক্বা’ক্বা’ ইবনে ‘আম্ তামীমী থেকে বর্ণনা করেছে। কিন্তু ক্বা’ক্বা’ হচ্ছে সাইফ বর্ণিত কল্পকাহিনিসমূহের অন্যতম কাল্পনিক সূত্র বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সাইফ তাকে সাহাবি হিসেবে দাবি করেছে এবং তার বিস্তারিত পরিচয় দিয়েছে। ক্বা’ক্বা’র রচিত কবিতা, তার বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও বীরত্বের কাহিনি এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড শত শত গ্রন্থে স্থান লাভ করেছে। কিন্তু এসব কল্পকাহিনির একমাত্র উৎস হচ্ছে সাইফের রেওয়ায়েত।'(গ্রন্থকারের রচিত “এক শত পঞ্চাশ জন কল্পিত সাহাবী” গ্রন্থে কাল্পনিক ব্যক্তিত্ব ক্বা’ক্বা’ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে)

সাইফ থেকে উদ্ধৃত তৃতীয় রেওয়ায়েতটি সে সাহল্ থেকে বর্ণনা করেছে। কিন্তু সাহও একটি কাল্পনিক ব্যক্তিত্ব যাকে কেবল সাইফের রেওয়ায়েতেই পাওয়া যায়। (গ্রন্থকারের “রাওয়াতুন মুখতালিফুন” গ্রন্থে তার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে)

সাইফ তার চতুর্থ রেওয়ায়েত মুবাশির্ থেকে গ্রহণ করেছে। এ-ও একটি কাল্পনিক চরিত্র। কেবল সাইফের রেওয়ায়েতেই তার উল্লেখ পাওয়া যায়। হাদিস শাস্ত্র বিশেষজ্ঞগণ মন্তব্য করেছেন “সাইফ তার নিকট থেকে উদ্ধৃত করেছে, কিন্তু কেউ তাকে চিহ্নিত করতে পারেনি। (লিসানুল মীযান, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৩)

সাইফ তার শেষ রেওয়ায়েতটি ছাখার থেকে উদ্ধৃত করেছে। সাইফ তাকে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর দেহরক্ষী হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু ‘ইল্মে রেজালের গ্রন্থাবলিতে এবং রাসূলে আকরাম (সা.)-এর জীবনী ও তাঁর সাহাবিগণের পরিচিতিসংক্রান্ত মৌলিক গ্রন্থাবলিতে এমন কোনো ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায় না।

সাইফ বর্ণিত হাদিসসমূহের বর্ণনা ধারাক্রমে আরো অনেক অজ্ঞাতপরিচয় বর্ণনাকারীর নাম রয়েছে। সংক্ষেপণের স্বার্থে তাদের সম্পর্কে আলোচনা থেকে বিরত থাকলাম।

এই হলো সাইফ বর্ণিত হাদিসের সনদের অবস্থা।

সাইফের হাদিসের মূল পাঠ পরীক্ষা

সাইফের বর্ণিত হাদিসে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, সে মিথ্যা হাদিস রচনার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষতার অধিকারী ছিল। কারণ সে কোনো ঘটনার একটি অংশ বিকৃত করে এবং অপরাপর অংশ এমনভাবে বর্ণনা করে যে, পাঠকের নিকট পুরো ঘটনাটা সঠিক বলে মনে হবে। মিথ্যা হাদিস রচনায় তার দক্ষতার একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি-

আমাদের উদ্ধৃত সাইফ বর্ণিত হাদিসসমূহের অন্যতম হচ্ছে এই যে, রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ওফাতের দিনে যোহরের নামাজের পরে মসজিদুন্নাবী (সা.)-এ খবর পৌঁছল যে, আনসাররা সা’দের অনুকূলে বাই’আত হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে চাচ্ছে।

… পাঠকগণের মনে এ থেকে এ ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক যে, খেলাফতের ব্যাপারে জনগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছিল আনসাররা যা ভঙ্গ করতে চাচ্ছিল।’ (বলা বাহুল্য যে, রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সাথে জনগণের এ ধরনের কোনো অঙ্গীকারের ঘটনা ঘটে থাকলে তা বিপুলসংখ্যক সূত্রে বর্ণিত হাদিসে মুতাওয়াতির হতো, অথচ এ ধরনের কোনো অঙ্গীকারের কথা অন্য কোনো সূত্রেই বর্ণনা করা হয়নি)

অন্যদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ওসামার বাহিনী সংক্রান্ত হাদিসে সাইফ বলছে “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। এমতাবস্থায় ওসামাহ্ তাঁর সেনাবাহিনীর যাত্রা বন্ধ করে দিলেন এবং হযরত ওমরকে বললেন- আপনি রাসূলুল্লাহ্র খলিফার নিকট ফিরে যান এবং তাঁর নিকট থেকে অব্যাহতি (যুদ্ধে গমন না করার অনুমতি) নিয়ে আসুন যাতে লোকদেরকে ফিরিয়ে আনতে পারি।” এ রেওয়ায়েতের মাধ্যমে এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, রাসূলে আকরাম (সা.) তাঁর জীবদ্দশায়ই খেলাফত সম্পর্কে জনগণের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং সে অঙ্গীকার হযরত আবুবকরের অনুকূলে ছিল। সাইফ সাক্বীফাহসংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহে এ ধরনের অনেক কুশলী ধোঁকাবাযীর আশ্রয় নিয়েছে।

সাক্বীফাহর ঘটনা হচ্ছে ঐসব ঘটনার অন্যতম যাতে সত্যকে তার মূল অক্ষ থেকে পুরোপুরি বিচ্যুত করা হয়েছে। কিন্তু সাইফ এ আমানতকে (প্রকৃত ঘটনার বর্ণনাকে) খেয়ানত ছাড়াই লোকদের নিকট পৌঁছতে দিতে চায়নি। সে সাক্বীফাহর ঘটনা এবং হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত সম্পর্কে যেসব রেওয়ায়েত উপস্থাপন করেছে তার সবগুলোই বাস্তবতা ও প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সংগতিহীন।

অন্যান্য ঐতিহাসিকের বর্ণনায় সাকীফাহ্-এর ঘটনা

এবার আমরা সাক্বীফাহর ঘটনার ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের ওলামায়ে কেরাম ও মনীষীদের দৃষ্টিতে নির্ভরযোগ্যগ্রন্থাবলি থেকে সাক্বীফাহর দিনের ঘটনাবলি থেকে শুরু করে মু’আবিয়ার সময়কার ঘটনাবলি উদ্ধৃত করবো এবং এ ব্যাপারে সাইফের রেওয়ায়েতসমূহ উদ্ধৃত করে বিস্তারিত পর্যালোচনা করব যা থেকে সাইফের মিথ্যাচার আরো বেশি সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।

যে আদেশ পালিত হয়নি

প্রকৃত পক্ষে সাকিফাহ- এর ঘটনা হচ্ছে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ওফাতের অব্যবহিত পূর্ববর্তী ঘটনাবলিরই ধারাবাহিকতা মাত্র। ইতঃপূর্বে যেমন উল্লিখিত হয়েছে, রাসূলে আকরাম (সা.) তাঁর ওফাতের পূর্বে ওসামাহ্ বিন যায়েদের সেনাপতিত্বে রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযানের এবং তাতে অংশগ্রহণের জন্যে একমাত্র হযরত আলী ব্যতীত সকল শীর্ষস্থানীয় সাহাবির প্রতি নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর এ আদেশ পালন করেননি এবং যুদ্ধযাত্রার বিষয়টি পিছিয়ে দেন। আর এ অবস্থায়ই রাসূলে আকরাম (সা.) ইন্তেকাল করেন। এর ফলে এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয় যা ইসলামের ইতিহাসের গতিধারা পরিবর্তিত করে দেয়।

যে ওয়াসিয়্যাত লেখা হয়নি

রাসূলে আকরাম (সা.)-এর জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে আসছিল। ফলে সারা মদিনায় শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়েছিল। সকলেই বুঝতে পারছিল যে, মানবজাতি তার অতীত ও ভবিষ্যতের তথা সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম নেতাকে হারাতে যাচ্ছে।

রাসূলে আকরাম (সা.) তাঁর ওফাতের পূর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু যারা তাঁর নির্দেশের বরখেলাফে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে গমনে বিলম্ব করছিলেন তাঁরাই তাঁর এ সিদ্ধান্তে বাধা দিলেন। ফলে অন্তিম শয্যায় তিনি উম্মাতের জন্যে পথনির্দেশবাচক যে লিখিত দলিল রেখে যেতে চাচ্ছিলেন মুসলিম উম্মাহ্ তার অধিকারী হওয়া থেকে বঞ্চিত হলো।

হযরত ওমর বিন খাত্তাব স্বয়ং বলেন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নিকট ছিলাম এবং মহিলারা পর্দার আড়ালে বসে ছিলেন। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন – “আমাকে সাত মশক পানি দিয়ে গোসল করাবে। আর আমার জন্যে এক পাতা কাগজ ও দোয়াত নিয়ে এসো; আমি তোমাদের জন্যে এমন লেখা লিখে রেখে যাব যার ফলে আমার পরে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না।” মহিলারা বললেন “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যে জিনিসের কথা বললেন তা নিয়ে এসো।” (ত্বাবাক্বাতে ইবনে সা’দ, ২য় খণ্ড, ২-ক্বাফ্, পৃ. ৩৭; নিহাইয়াতুল্ আরাব, ১৮তম খণ্ড, পৃ. ৩৭৫; কানযুল ‘উম্মাল, ৩য় খণ্ড, ১৩৮ ও ৪র্থ খণ্ড, ৩৭৫)

মাকুরীযী লিখেছেন –

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্ত্রী যায়নাব বিনতে জাহ্হাশ্ ও তাঁর সাথে অবস্থানরত মহিলারা একথা বললেন। তখন হযরত ওমর বললেন আমি বলছি আপনারা চুপ করুন। আপনারা তো সেই নারীরাই যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) অসুস্থ হলে চোখ মুছেন আর কান্না করেন, আর তিনি সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁর টুটি টিপে ধরেন এবং নাফাক্বাহ্ দাবি করেন!”

উত্তম।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন “এই নারীরা তোমাদের তুলনায়

ইবনে সা’দ জাবের থেকে বর্ণনা করেন’ – রাসূলুল্লাহ্ (সা.) অন্তিমশয্যায় উম্মতের জন্যে কিছু লিখে রাখার উদ্দেশ্যে কাগজ চাইলেন যাতে উম্মাত না নিজে গোমরাহ্ হয়, না অন্যরা তাদেরকে গোমরাহ্ করতে পারে। কিন্তু উপস্থিত লোকেরা এমনই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলেন যে, তিনি এ কাজ থেকে বিরত থাকলেন। (ত্বাবাকাতে ইবনে সা’দ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪২)

মুসনাদে আহমাদে (উল্লেখ্য, সে যুগে কাগজ স্বল্পতার কারণে চামড়া, হাড্ডি, কাঠ ইত্যাদির ওপরেও লেখা হতো) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর মৃত্যু সন্নিকটবর্তী হলে তিনি বললেন “আমার জন্যে দুম্বার কাঁধ” নিয়ে এসো; আমি তোমাদের জন্যে এমন একটি লেখা লিখে রেখে যাব যাতে আমার পরে তোমাদের মধ্যে কোনো দুই ব্যক্তি পরস্পর বিবাদে লিপ্ত না হয়।” ইবনে আব্বাস বলেন এতে উপস্থিত লোকেরা হইচই ও ডাক-চিৎকার শুরু করে দিলেন। তখন মহিলাদের মধ্য থেকে একজন তাঁদের উদ্দেশে বললেন “তোমাদের জন্যে পরিতাপ! রাসূলুল্লাহ (সা.) ওয়াসিয়্যাত্ করতে চাচ্ছেন। (কেন তোমরা তাঁকে সে সুযোগ দিচ্ছ না?)” (ত্বাবাকাতে ইবনে সা’দ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪৪)

অন্য এক রেওয়ায়েতে ইবনে আব্বাস বলেন’ রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যে রোগের কারণে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেন সে রোগে আক্রান্ত থাকাকালে বলেন- “আমার জন্যে কাগজ ও দোয়াত নিয়ে এসো; আমি তোমাদের জন্যে এমন একটা লেখা লিখে রেখে যাবো যার ফলে এরপর তোমরা কখনোই গোমরাহ্ হবে না।”

তখন হযরত ওমর বললেন “রোমানদের শহরগুলোর মধ্য থেকে অমুক শহর ও অমুক শহর এখনো অবশিষ্ট আছে; এসব শহর বিজয় না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মারা যাবেন না। আর যদি তিনি মারাই যান তাহলে আমরা তাঁর জন্যে প্রতীক্ষায় থাকব ঠিক যেভাবে বনি ইসরাঈল মূসার জন্যে প্রতীক্ষায় রয়েছে।” জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্ত্রী হযরত যায়নাব “আপনারা কি শুনতে পাচ্ছেন না, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আপনাদের উদ্দেশে ওয়াসিয়‍্যাত করতে চাচ্ছেন?” বললেন

এরপর হইচই শুরু হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁদের উদ্দেশে বললেন- “তোমরা ওঠো (চলে যাও)।” তাঁরা যখন বেরিয়ে গেলেন সে মুহূর্তেই রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইন্তেকাল করলেন।

এসব হাদিস থেকে এবং পরে এ ঘটনা সংশ্লিষ্ট আরো যেসব হাদিস উদ্ধৃত করা হবে তা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, রাসূলে আকরাম (সা.) অন্তিম শয্যায় থাকা অবস্থায় একাধিক বার কাগজ ও দোয়াত আনার জন্যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু তখন যারা তাঁর নিকটে বসে ছিলেন তাঁরা হইচই সৃষ্টি করে তাঁকে একাজ সম্পাদন থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেন। পরবর্তী সময়ে এ সংক্রান্ত আরো যেসব রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করা হবে তা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সামনে তাঁর সম্পর্কে কী ধরনের অযথার্থ কথাবার্তা বলা হয়েছিল যার ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁর ওয়াসিয়্যাতনামা লেখা থেকে বিরত থাকা ছাড়া গত্যন্তর দেখেননি।

সহীহ বুখারী’ ও অন্যান্য গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, ইবনে আব্বাস বলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর রোগ বৃদ্ধি পেলে তিনি বললেন- “আমার জন্যে কাগজ নিয়ে এসো; আমি তোমাদের জন্যে একটা লেখা লিখে দেব যার ফলে তোমরা কখনোই গোমরাহ্ হবে না।” তখন উপস্থিত লোকদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে গেল, অথচ কোনো নবীর সামনেই ঝগড়া-বিবাদ করা জায়েয নেই। কতক লোক বলল “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) প্রলাপ বকছেন।” রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন তোমরা আমাকে আমার নিজের অবস্থায় ছেড়ে দাও। তোমরা আমার সম্পর্কে যা বলছ তার চেয়ে আমার অবস্থা অনেক ভালো।” (কিতাবুল জিহাদ, বাবে জাওয়ায়িযু ওয়াদ, ২য় খণ্ড/ ১২০ এবং ২য় খণ্ড, ১১২; সহীহ মুসলিম, ৫ম খণ্ড/ ৭৫ ও ৭৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৯৩৫; ত্বাবাক্বাত্, ২য় খণ্ড, ২৪২ ও ২৪৪; তাবারী, ৪র্থ খণ্ড, ১৯৩। (মূলে তথ্যসূত্র বিস্তারিত; এখানে কিছুটা সংক্ষেপ করা হলো। -অনুবাদক)

ঐ কথাটি কে বলেছিলেন অন্য এক হাদিসে ইবনে আব্বাস তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন’ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে একদল লোক যাদের মধ্যে হযরত ওমর বিন খাত্তাবও ছিলেন রাসূলুল্লাহর গৃহে সমবেত হলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন “তাড়াতাড়ি করো; আমি তোমাদের জন্যে একটা লেখা লিখে রেখে যাব যার ফলে অতঃপর আর তোমরা কখনোই গোমরাহ্ হবে না।” তখন ওমর বললেন “নিঃসন্দেহে রোগ রাসূলল্লাহ্ (সা.)-এর স্বাভাবিক চেতনাকে পরাভূত করেছে; তোমাদের কাছে কোরআন আছে এবং আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।” (সহীহ বুখারী, ১ম খণ্ড/ ২২, বাবে কিতাবাতুল্ ‘ইল; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৯৯২: ত্ববাক্বাত্, ২য় খণ্ড/ ২৪৪, মূলে আছে مشاعر যার মানে অনুভূতিসমূহ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়নিচয়ের স্বভাবিক কার্যক্ষমতা ও বিচারবুদ্ধি। -অনুবাদক)

(তখন রাসূলুল্লাহ্) ঘরে যেসব লোক উপস্থিত ছিল তাদের মধ্যে মতবিরোধ ও কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল এবং কতক লোক হযরত ওমরের সাথে অভিন্ন মত পোষণ করল। যেহেতু অনেক বাজে কথাবার্তা হলো এবং মতবিরোধ তীব্রতর হয়ে উঠল সেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (সা.) খুবই অস্থির হয়ে উঠলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন “তোমরা আমার সামনে থেকে চলে যাও; তোমাদের জন্য আমার সামনে ঝগড়া ও মতবিরোধ করা জায়েয নেই।”

আর মুসনাদে আহমাদ ও ত্বাবাক্বাতের রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে-যেহেতু অনেক বাজে কথাবার্তা হলো, সেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুঃখভারাক্রান্ত হলেন; রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন “তোমরা আমার সামনে থেকে উঠে যাও।”

বর্ণনাকারী বলেন ইবনে আব্বাস এরপর বারবার বলেছেন-“দুর্ভাগ্য ও মুসিবত ছিল সেই সময়টা যখন মতভেদ ও বাযে কথাবার্তা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে সেই লেখাটি লেখার সুযোগ দেয়নি।”‘(বুখারী, ৩য় খণ্ড/ ৬২, ৪র্থ খণ্ড/ ৫ ও ১৮০; মুসলিম, ৫ম খণ্ড/ ৭৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৩১১১; তারীখে ইবনে কাসির, ৫ম খণ্ড/ ২২৭-২২৮; তাইসীরুল উচ্ছ্বল, ৪র্থ খণ্ড/ ১৯৪; তারীখে যাহাবী, ১ম খণ্ড/ ৩১১; তারীখে কামেল, পৃ. ১০৮ প্রভৃতি। (তথ্যসূত্র সংক্ষেপিত। অনুবাদক)

উপরিউক্ত রেওয়ায়েতসমূহে দেখা যায় রাসূলে আকরাম (সা.) কর্তৃক ওয়াসিয়্যাতনামা লিখে দিতে চাওয়ার বিরুদ্ধে হযরত ওমর কথা বলেছিলেন বলে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত হয়েছে; আর কারো নাম সরাসরি উল্লিখিত হয়নি। এছাড়া হযরত ওমর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্ত্রীদের উদ্দেশে অপমানজনক ভাষায় কথা বলেন। আবার তিনিই বলেন “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইন্তেকাল করলে কে রোমানদের শহরগুলো জয় করবে?” কিন্তু তাঁর এসব কথা সত্ত্বেও তিনি যখন দেখলেন যে, লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নিকট থেকে অন্তিম ওয়াসিয়্যাতনামা পেতে আগ্রহী এবং এ ওয়াসিয়‍্যাতনামা লেখা হলে হযরত ওমর ও তাঁর বন্ধুদের পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যাবে, এমতাবস্থায় হযরত ওমর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে ওয়াসিয়্যাতনামা লেখা থেকে বিরত রাখার জন্যে বললেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) রোগের প্রকোপের কারণে প্রলাপ বকছেন (না’উযু বিল্লাহি মিন্ ক্বাওলি যালিক)।

এ প্রসঙ্গে কেউ হয়তো বলতে পারেন যে, হযরত ওমরের বিরোধিতা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁর ওয়াসিয়্যাতনামা লিখে রেখে যেতে পারতেন; কেন তিনি তা লিখলেন না? এ প্রশ্নের জবাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, এমতাবস্থায় তা লেখা না-লেখা সমান হতো। কারণ, সেক্ষেত্রে এ ওয়াসিয়্যাতনামা যাদের পছন্দ হতো না তারা বলত যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) রোগের ঘোরে এটি রিখিয়েছিলেন যখন তাঁর অনুভূতি শক্তি ও বিচারবুদ্ধি সঠিকভাবে কাজ করছিল না, অতএব, এটির কোনো কার্যকরিতা নেই।

ইবনে আব্বাসের একটি রেওয়ায়েত থেকেও এরই আভাস পাওয়া যায়। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নিকটে বসা এক ব্যক্তি (বিস্ময় প্রকাশ করে) বললেন- “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) প্রলাপ বকছেন!!” এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নিকট আবেদন করলেন “আপনি যা চাচ্ছিলেন আমরা কী তা আপনার জন্যে নিয়ে আসব না?” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন-“এখন আর কী জন্য!” অর্থাৎ যে কথা বলা হয়েছে তারপর আর এতে কী ফায়দা হবে। (তাবাকাতে ইবনে সা’দ, ২য় খণ্ড/ ২৪৪)

এ প্রসঙ্গে হযরত ওমরের নিকট প্রশ্ন করা যেত যে, তিনি অসুস্থ অবস্থায় রাসূলে আকরাম (সা.)-কে ওয়াসিয়‍্যাতনামা লিখতে বাধা দিলেন এ যুক্তিতে যে, তিনি প্রলাপ বকছেন, কিন্তু তিনি একই যুক্তিতে খলিফা আবুবকরকে অন্তিম ওয়াসিয়‍্যাতনামা লিখতে বাধা দিলেন না কেন? (অথচ হযরত আবুবকর তাঁর ওয়াসিয়্যাতনামা লেখানোর মাঝখানে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন।)

তাবারী লিখেছেন’ হযরত আবুবকর হযরত ওসমানকে মজলিস থেকে একান্তে ডেকে নিলেন এবং বললেন, “লিখো বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এ হচ্ছে আবুবকর বিন্ আবি কুহাফাহ্ পক্ষ থেকে মুসলমানদের উদ্দেশে ওয়াসিয়্যাত। অতঃপর…।” বর্ণনাকারী বলেন এরপর তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন এবং আর কথা বলতে পারছিলেন না। কিন্তু হযরত আবুবকর বেহুশ থাকা অবস্থায়ই হযরত ওসমান লিখলেন- “আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তদনুযায়ী আমি ওমর বিন্ আল-খাত্তাবকে আমার স্থলাভিষিক্ত ও তোমাদের ওপর খলিফা নিয়োগ করেছি এবং তোমাদের কল্যাণ কামনার ব্যাপারে কোনই ত্রুটি করিনি।” হযরত ওসমান লেখা শেষ করার পর হযরত আবুবকর পুনরায় সংজ্ঞা ফিরে পেলেন এবং হযরত ওসমানকে জিজ্ঞেস করেন “পড়ো, দেখি কী লিখেছ।” হযরত ওসমান যা লিখেছিলেন তা হযরত আবুবকরকে পড়ে শোনালেন। হযরত আবুবকর বললেন “আল্লাহ আকবার! আমার মনে হয় তুমি ভয় পাচ্ছিলে যে, বেহুঁশ অবস্থায় আমার এ দেহকাঠামো শূন্য হয়ে গেলে জনগণের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হতে পারে।” হযরত ওসমান বললেন “জ্বী।” হযরত আবুবকর বললেন- “আল্লাহ্ তোমাকে ইসলাম থেকে ও আহলে ইসলাম থেকে কল্যাণ দান করুন।” হযরত আবুবকর হযরত ওসমানের লেখা গ্রহণ করলেন। (তারীখে তাবারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৫২)

হযরত আবু বকরের এ ওয়াসিয়্যাতনামা সম্পর্কে স্বয়ং হযরত ওমরের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

ত্বাবারী লিখেছেন হযরত ওমর বসে ছিলেন এবং জনগণ তাঁর পাশে ছিলেন। হযরত ওমরের হাতে ছিল খেজুর গাছের একটি শাখা। হযরত আবুবকরের আজাদকৃত ক্রীতদাস শাদীদ হযরত ওমরকে স্বীয় স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করে লেখা হযরত আবুবকরের পত্র নিয়ে এল। হযরত ওমর জনগণকে সম্বোধন করে বললেন হে লোকসকল! তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর খলিফার ফরমানের আনুগত্য করো। খলিফা তোমাদের উদ্দেশে বলছেন – “আমি তোমাদের কল্যাণ কামনার ব্যাপারে কোনই ত্রুটি করিনি।” (তারীখে তাবারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৫১)

বিস্ময়কর যে হযরত ওমর মৃত্যুশয্যায় রাসূলে আকরাম (সা.) কর্তৃক ওয়াসিয়্যাতনামা লেখার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি এবং বলেছিলেন “আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট।” কিন্তু সেই হযরত ওমরই হযরত আবুবকর এরূপ অবস্থায় ওয়াসিয়্যাতনামা লিখে রেখে গেলে তা মেনে নিলেন! দু’টি ক্ষেত্রে আচরণের মধ্যে কতই না পার্থক্য! এ কারণে যথার্থভাবেই ইবনে আব্বাস এতই অশ্রুপাত করেছিলেন যে, তা গড়িয়ে পড়ে নুড়ি পাথর ভিজে গিয়েছিল। (সহীহ আল বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১ম খণ্ড, অধ্যায়-৩ (ইলম বা জ্ঞান), হাদীস নং-১১৫; অধ্যায়-৫১ (মাগাযী/যুদ্ধাভিযান), হাদীস নং-৪০৮৯; অধ্যায়-৬২ (রোগীদের বর্ণনা), হাদীস নং-৫২৬৭; অধ্যায়-৮৫ (কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ), হাদীস নং-৬৮৬৫; অধ্যায়-৪৮ (জিহাদ), হাদীস নং-২৮৩৮ ও ২৯৪৪; ৭ম খণ্ড, হাদীস নং-৪০৭৬, ৪০৮৫ থেকে ৪০৮৬; ৯ম খণ্ড, হাদীস নং-৫১৫৪; সহীহ আল বুখারী, তাওহিদ পাবলিকেশন্স, ৪র্থ খণ্ড, হাদীস নং-৪৪৩১ থেকে ৪৪৩২; সহীহ আল মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অধ্যায়-২৬ (ওসিয়াত), হাদীস নং-৪০৮৬ থেকে ৪০৮৮; আর রাহীকুল মাখতুম, রসুলুল্লাহ (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ জীবনী গ্রন্থ, আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরি, অনুবাদ-খাদিজা আখতার রেজায়ী, আল-কোরআন একাডেমি পাবলিকেশন, বিদায় হজ্জ অধ্যায়, ইন্তেকালের ৪ দিন আগে)

চলবে …..