Press "Enter" to skip to content

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার কল্পকাহিনি ও ওহাবীদের ষড়যন্ত্র– ৩

মূল: আল্লামা সৈয়দ মুরতযা আসকারী

অনুবাদ নূর হোসেন মজিদী

প্রসঙ্গ: ওসামাহ এর বাহিনী

তাবারী তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে’ (৩য় খণ্ড, পৃ. ২১২) একাদশ হিজরির ঘটনাবলির বর্ণনায় এবং ইবনে ‘আসাকের তাঁর গ্রন্থে’ (১ম খণ্ড, পৃ. ৪২৭) ওসামার বাহিনী প্রসঙ্গে সাইফের রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন। আমরা এখানে রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করব এবং এরপর অন্য বর্ণনাকারীদের রেওয়ায়েতের সাথে তার তুলনা করব।

সাইফের রেওয়ায়েত

“রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁর ওফাতের পূর্বে মদীনাবাসীদের ও তার আশপাশের লোকদের নিয়ে একটি সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেন যে বাহিনীর সৈন্যদের মধ্যে ওমর বিন খাত্তাবও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আর তিনি [রাসূলুল্লাহ (সা.)] ওসামা বিন যায়েদকে এ বাহিনীর সেনাপতি নিয়োগ করেন। তখনো এ বাহিনীর শেষ ভাগ খন্দক অতিক্রম করতে পারেনি, এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। ওসামা সেনাবাহিনীর যাত্রা বন্ধ করে দিলেন এবং হযরত ওমরকে বললেন-“আপনি রাসূলুল্লাহর খলিফার নিকট ফিরে যান এবং তাঁর নিকট থেকে অব্যাহতি (যুদ্ধে গমন না করার অনুমতি) নিয়ে আসুন যাতে লোকদেরকে ফিরিয়ে আনতে পারি।…”

সাইফ আরো বলে”ঐ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত আনসারগণ হযরত ওমরের মাধ্যমে হযরত আবুবকরের নিকট এ মর্মে বাণী পাঠালেন যে, ওসামার পরিবর্তে অন্য কাউকে এ বাহিনীর সেনাপতি নিয়োগ করুন। হযরত ওমর আনসারদের এ বাণী পৌঁছালে হযরত আবুবকর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং হযরত ওমরের দাড়ি ধরে ধরে ফেলেন এবং বলেন-“এই খাত্তাবের বেটা। তোমার মা তোমার জন্যে শোক পালন করতে বসুক আর তোমার মৃত্যুর জন্যে বিলাপ করুক! রাসূলুল্লাহ্ ওসামাকে সেনাপতি নিয়োগ করে গেছেন; তুমি আমাকে তার কাছ থেকে এ পদ ফিরিয়ে নিতে ও তার পরিবর্তে অন্য কাউকে সেনাপতি করতে বলছ!?”

এরপর সাইফ বলে-হযরত আবু বকর ওসামাহ্ ও তাঁর সেনাবাহিনীকে দশটি নির্দেশ দেন এবং তাঁদেরকে রওয়ানা করিয়ে দেন ও বিদায় জানান। তাদেরকে বিদায় জানানোর সময় তিনি বলেন – “আল্লাহর দোহাই তোমরা রওয়ানা হয়ে যাও। আল্লাহ্ তোমাদেরকে হত্যা ও প্লেগের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিন।”

সাইফ ব্যতীত অন্যান্যের রেওয়ায়েত

এ ঘটনা সম্পর্কে অন্যান্য বর্ণনাকারীদের বর্ণনা নিম্নরূপ-

হিজরি ১১ সালের সফর মাসের চার দিন অবশিষ্ট থাকতে সোমবার রাসূলে আকরাম (সা.) রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। এর পরদিন তিনি ওসামাহ্ বিন যায়েদকে ডাকিয়ে আনেন এবং বলেন -“তোমার পিতা যেখানে শহীদ হয়েছিল সেনাবাহিনীর সেনাপতি হিসেবে সে জায়গার দিকে রওয়ানা হও এবং তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়।”

বুধবার দিন রাসূলুল্লাহর (সা.) জ্বর ও মাথাব্যথা বৃদ্ধি পেল। বৃহস্পতিবার তিনি নিজের হাতে ওসামার নিকট যুদ্ধের পতাকা তুলে দিলেন। ওসামা পতাকা হাতে নিলেন এবং মদীনা থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি মদীনা থেকে এক ফারসাখ’ (ছয় কিলোমিটার) দূরবর্তী জুর নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলেন।

আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে সাধারণভাবে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যে আহ্বান জানানো হয়। হযরত আবুবকর, ওমর, আবু ওবায়দাহ্ বিন্ জারাহ্, সা’দ বিন্ ওয়াক্কাছ, সা’ঈদ বিন যায়েদ এবং আরো কয়েকজন ছিলেন এদের অন্যতম। কিছু লোক আপত্তি জানিয়ে বললেন-“কেন এ ছেলেটিকে সেনাপতি করা হলো অথচ এর সৈন্যদের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের মুহাজিরগণ রয়েছেন?” রাসূলুল্লাহ্ (সা.) একথা শোনার পর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং মাথায় রুমাল ও কাঁধে চাদর অবস্থায় (তৎকালীন আরবের প্রচলন অনুযায়ী কঠিন অসুস্থ লোকেরা জামা গায়ে না দিয়ে এভাবে মাথায রুমাল বাঁধতেন ও কাঁধের ওপর চাদর দিয়ে ঢেকে রাখতেন) বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং মিম্বারে উঠে বসলেন। তিনি বললেন -“এটা কী ধরনের কথাবার্তা যা ওসামাহর সেনাপতিত্ব সম্বন্ধে বলা হচ্ছে বলে আমাকে জানানো হয়েছে? নিঃসন্দেহে তোমরা এই লোকেরাই এর আগে তার পিতা যায়দের সেনাপতিত্ব সম্বন্ধে আপত্তি করেছিলে। অথচ, আল্লাহর শপথ, তার পিতা সেনাপতিত্বের উপযুক্ত ছিল, আর তার পুত্রও একই রকম যোগ্যতার অধিকারী।” এরপর তিনি মিম্বার থেকে নেমে আসেন। যেসব মুসলমান ওসামার সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলেন তাঁরা এলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নিকট থেকে বিদায় নিয়ে সৈন্য সমাবেশস্থল জুফের দিকে রওয়ানা হয়ে যান।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর রোগ বেড়ে গেল। রোগের তীব্রতার কারণে তিনি বেহুঁশ হয়ে গেলেন। ওসামাহ্ তাঁর নিকট এলেন এবং মাথা নিচু করে তাঁকে চুম্বন করলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কথা বলার শক্তি ছিল না। ওসামাহ্ ফিরে গেলেন এবং পুনরায় সোমবার তাঁর নিকট এলেন। এদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল। তিনি ওসামাহকে বললেন-“রওয়ানা হও, সৌভাগ্যবান হও।” ওসামাহ্ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নিকট থেকে বিদায় নিয়ে সৈন্যসমাবেশস্থলে চলে এলেন এবং সেনাবাহিনীকে রওয়ানা হবার নির্দেশ দিলেন। তিনি নিজে যখন ঘোড়ায় সওয়ার হতে যাচ্ছিলেন এমন সময় তাঁর মাতা উম্মে আইমানের নিকট থেকে একজন বার্তাবাহক এলেন এবং তাঁকে জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সময় শেষ হয়ে এসেছে। তখন তিনি হযরত ওমর, আবু ওবায়দাহ্ ও অন্যান্যকে নিয়ে ফিরে এলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) সেদিন দুপুরেই ইন্তেকাল করেন।’ (ত্বাবাকাতে ইবনে সা’দ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯০; বালায়ূরী আনুছাবুল আশ্রাফ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪; তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭৪; ইবনে বাদরান। তাহযীব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭৪; তারীখে ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ১২০; ত্বাবাকাতে ইবনে সা’দ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৬ এবং অন্যান্য)

এই হলো প্রায় সর্বসম্মতভাবে বর্ণিত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর জীবদ্দশায় ওসামাহ্র বাহিনীসংক্রান্ত ঘটনা। তাঁর ওফাতের পরবর্তীকালের ঘটনাবলি প্রসঙ্গে ইবনে ‘আসাকের বর্ণনা করেছেন’, হযরত আবুবকরের হাতে খেলাফতের বাই’আত হওয়ার বিষয়টি সমাপ্ত হওয়ার পর লোকেরা নিশ্চিন্ত হলো। অতঃপর হযরত আবুবকর ওসামাহকে বললেন- “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যেদিকে রওয়ানা হওয়ার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন সেদিকে রওয়ানা হও।” তখন একদল মুহাজির ও আনসার এ বাহিনীকে পাঠানোর বিষয়টি পিছিয়ে দেয়ার জন্যে আবুবকরের নিকট প্রস্তাব দেন। কিন্তু হযরত আবু বকর সে প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।… (ইবনে ‘আসাকের, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৩৩)

তাঁর উদ্ধৃত অপর এক রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে হযরত আবু বকর বাহিনীকে পাঠালেন ও তাদেরকে বিদায় জানালেন এবং ওসামাহকে বললেন-“আমি নিজে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে তোমার প্রতি প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে শুনেছি। তুমি সে নির্দেশ অনুযায়ীই কাজ করবে; আমি তোমাকে কোনো নির্দেশ দেব না।”

সাইফ ও অন্যান্যের রেওয়ায়েতের তুলনা:

সাইফের রেওয়ায়েতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে-

১) সাইফ বলেছে-“তখনো এ বাহিনীর শেষ ভাগ খন্দক অতিক্রম করতে পারেনি, এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন।” সাইফ বিশেষ এক উদ্দেশ্যে এ কথাটি বলেছে। সে দেখাতে চেয়েছে যে, রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সাহাবিগণ তাঁর যেকোনো আদেশ পালনের জন্যে এতখানি প্রস্তুত ছিলেন যে, আদেশ দেয়ার সাথে সাথে তাঁরা মোটেই বিলম্ব না করে সাথে সাথে রওয়ানা হন, কিন্তু এ বাহিনীর শেষ ভাগ খন্দক অতিক্রম করার আগেই রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইন্তেকাল করেন। সে এর মাধ্যমে এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ঘটনাবলি অস্বীকৃতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। অথচ অন্যান্য রেওয়ায়েতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রকৃত ঘটনা অন্য রকম অর্থাৎ ওসামার বাহিনী মদীনা থেকে এক ফারসাঙ্গ দূরবর্তী জুর নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেছিল এবং তাঁরা কয়েক দিন যাবৎ মদিনায় আসা-যাওয়া করেছেন।

রাসূলে আকরাম (সা.)-এর অবস্থা যখনই কিছুটা ভালো হতো তখনই তিনি ওসামার বাহিনীর খোঁজ-খবর নিতেন। আর যখনই তিনি বুঝতে পারেন যে, কিছু লোক ঢিলেমি করছে এবং তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়িত হতে দিচ্ছে না তখন তিনি অসন্তুষ্ট হন। তাই তিনি বার বার বলতেন, “ওসামাহর বাহিনীকে রওয়ানা হয়ে যেতে দাও।” এ সত্যটি চাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে সাইফ উক্ত বাক্যটি যোগ করেছে।

২) সাইফ বলেছে-“রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। (এ খবর শোনার সাথে সাথে) ওসামাহ্ সেনাবাহিনীর যাত্রা বন্ধ করে দিলেন এবং হযরত ওমরকে বললেন -আপনি রাসূলুল্লাহ্র খলিফার নিকট ফিরে যান এবং তাঁর নিকট থেকে অব্যাহতি (যুদ্ধে গমন না করার অনুমতি) নিয়ে আসুন যাতে লোকদেরকে ফিরিয়ে আনতে পারি।” সহীহ রেওয়ায়েতসমূহের বরখেলাফে সে এ কথাটিও বিশেষ উদ্দেশ্যে তৈরি করেছে। অথচ অন্যান্য রেওয়ায়েত অনুযায়ী প্রকৃত ঘটনা হলো এই যে, সেনাবাহিনীকে রওয়ানা হবার নির্দেশ দেয়ার পর ওসামাহ্ যখন রওয়ানা হবার জন্যে ঘোড়ায় সওয়ার হতে যাচ্ছিলেন তখন তাঁর নিকট সংবাদ আসে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সময় শেষ হয়ে এসেছে। তখন তিনি হযরত ওমর, আবু ওবায়দাহ্ ও অন্যান্যকে সাথে নিয়ে (কোনো কোনো রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত আবুবকরকেও সাথে নিয়ে) মদিনায় ফিরে আসেন এবং তাঁদের ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) সেদিন দুপুরেই ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর সাকিফায় ও মসজিদুন্নবী (সা.) তে খলিফা হিসেবে হযরত আবুবকরের অনুকূলে শপথ গ্রহণ করা হয় এবং কেবল এর পরেই তিনি ওসামার বাহিনীকে রওয়ানা হবার নির্দেশ দেন। কিন্তু সাইফ অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে সুকৌশলে এ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই হযরত আবুবকরকে খলিফা নির্বাচিত করা হয়েছিল তথা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ই তাঁকে খলিফা মনোনীত করে যান।

৩) সাইফ বলেছে-“ঐ বাহিনীর আনসারগণ হযরত ওমরের মাধ্যমে হযরত আবুবকরের নিকট এ মর্মে বাণী পাঠালেন যে, ওসামার পরিবর্তে অন্য কাউকে এ বাহিনীর সেনাপতি নিয়োগ করুন।” অথচ অন্যান্য রেওয়ায়েতে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, এ আবেদন আবুবকরের নিকট নয়; বরং স্বয়ং রাসূলে আকরামের (সা.) নিকট করা হয়েছিল এবং আবেদনকারীরা আনসার ছিলেন না; বরং ছিলেন প্রথম যুগের মুহাজির। কিন্তু যেহেতু সাইফের যুগে মুহাজিররাই রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, সেহেতু সে মুহাজিরদের সাথে সংশ্লিষ্ট এ ঘটনাকে আনসারদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

৪) সাইফ বলেছে যে, হযরত আবুবকর ওসামাহ্ ও তাঁর সেনাবাহিনীকে দশটি নির্দেশ দেন। অথচ অন্যান্য রেওয়ায়েতে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, রাসূলে আকরাম (সা.) ই ওসামাত্র বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করেছিলেন এবং খলিফা হওয়ার পর হযরত আবুবকর তাঁকে বলেন-“আমি নিজে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে তোমার প্রতি প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে শুনেছি। তুমি সে নির্দেশ অনুযায়ীই কাজ করবে; আমি তোমাকে কোনো নির্দেশ দেব না।”

সাইফ তার রেওয়ায়েতের শেষে বলেছে যে, হযরত ওমর আনসারদের বাণী হযরত আবুবকরকে পৌঁছালে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং হযরত ওমরের দাড়ি ধরে ফেলেন এবং তাঁকে অভিশাপ দেন। অথচ, (তার দাবি অনুযায়ীই) হযরত ওমর এখানে বাণীবাহক ছাড়া কিছু ছিলেন না।’ (বলা বাহুল্য যে, বাণীবাহকের সাথে দুর্ব্যবহার করা ইসলামি নীতি ও আদবের খেলাফ; শুধু তা-ই নয়, তা আরব রীতিরও খেলাফ ছিল। কিন্তু সাইফ হযরত আবুবকরের প্রতি তা-ই আরোপ করেছে। -অনুবাদক)

সাইফ শেষে বলেছে যে, খলিফা হযরত আবুবকর ইসলামি বাহিনীকে এই বলে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, “আল্লাহ্ তোমাদেরকে হত্যা ও প্লেগের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিন।” বাস্তবিকই এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে, মুসলমানদের খলিফা ইসলামি বাহিনীকে দোয়ার পরিবর্তে এভাবে ধ্বংসের অভিশাপ দেবেন!

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সাইফ তার সমকালীন সরকার ও সরকার পক্ষের লোকদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্যে এ মিথ্যা কাহিনি রচনা করেছিল। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই শেষের কথাগুলো তৈরির পিছনে তার উদ্দেশ্য কী ছিল? ‘ইলমে রেজালের মনীষীগণ সাইফকে যিন্দিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সে মুসলমান ছিল না, নাস্তিক ছিল। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ইসলামের ইতিহাসকে বিদ্রূপের পাত্রে পরিণত করার লক্ষ্যেই সে এসব মিথ্যা রচনা করেছে।

সে এমন সব রেওয়ায়েত তৈরি করেছে যার আদৌ কোন ভিত্তি নেই। শুধু তা-ই নয়, সে বহু কাল্পনিক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছে যাদের কোনো দিন জন্মই হয়নি, কিন্তু সাইফের রেওয়ায়েতের বদৌলতে তারা ইসলামের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে। আমরা পরে এসব কাল্পনিক চরিত্রের কতক সম্বন্ধে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করব।

ওসামাহ্ বাহিনীর কয়েকজন বিখ্যাত সাহাবি

এ অধ্যায়ের আলোচনার শেষ পর্যায়ে আমরা রাসূলে আকরাম (সা.)-এর নির্দেশে ওসামাহ্ বিন যায়েদের সেনাপতিত্বে মদীনা থেকে বের হয়ে জুবুফে শিবির স্থাপন করে অবস্থানকারী বাহিনীর কয়েকজন বিখ্যাত সাহাবির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরব –

১ম ও ২য় হযরত আবুবকর ও হযরত ওমর:

প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফা। তাঁদের পরিচয় সর্বজনজ্ঞাত।

৩য়- হযরত আবু ওবায়দাহ্ বিন্ জাররাহ্:

তাঁর নাম ‘আমের, ডাকনাম আবু ওবায়দাহ্। পিতার নাম আব্দুল্লাহ বিন্ জাররাহ্ ক্বাব্‌শী; মাতার নাম উমাইমাহ্ বিনতে গ্রানাম বিন্ জাবের। তিনি প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারীদের ও দুই বার হিজরতকারীদের অন্যতম। খলিফা হযরত আবুবকর তাঁকে ইসলামি বাহিনীর সেনাপতি নিয়োগ করে সিরিয়া অভিযানে পাঠান। তিনি প্লেগে আক্রান্ত হয়ে হিজরি ১৮ সালে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে জর্দানে দাফন করা হয়।

৪র্থ- হযরত সাদ্‌ বিন্ ওয়াক্কাছ:

তাঁর ডাকনাম আবু ইসহাক। তাঁর পিতার নাম মালেক। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের যুহরা গোত্রের লোক। বলা হয় যে, তিনি ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী সপ্তম ব্যক্তি। বদর যুদ্ধে ও পরবর্তী যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ইসলামের দুশমনদের প্রতি তির নিক্ষেপকারী প্রথম ব্যক্তি।

সা’দ বিন্ ওয়াক্কাছ ইরাক বিজয়ের সেনাপতি ছিলেন এবং তিনি খলিফা ওমর কর্তৃক কৃষ্ণার আমীর নিযুক্ত হন। খলিফা ওমর আবু লুলূর আঘাতে আহত হওয়ার পর তাঁর উত্তরাধিকারী নির্বাচনের জন্যে যে ছয় সদস্যের পরিষদ গঠন করেন সা’দকে তার অন্যতম সদস্য মনোনীত করেন।

খলীফা ওসমানের নিহত হওয়ার ঘটনার পর সা’দ্‌ বাইরের জগৎ থেকে দূরে সরে যান ও মদিনার বাইরে ‘আক্বীক্ব নামক স্থানে বসবাস করতে থাকেন। তিনি সেখানেই ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর লাশ মদিনায় নিয়ে আসা হয় ও জান্নাতুল বাকি গোরস্থানে দাফন করা হয়।

৫ম- হযরত সাঈদ বিন যায়েদ:

তিনি কুরাইশ বংশের ‘আদী উপগোত্রের লোক এবং হযরত ওমর বিন্ খাত্তাবের ভাতিজা। হযরত ওমর সা’ঈদের বোন ‘আতিকাকে এবং সা’ঈদ হযরত ওমরের বোন ফাতেমাকে বিবাহ করেন।

ফাতেমা ও সা’ঈদ হযরত ওমরের আগে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত ওমর তাঁদের ইসলাম গ্রহণের কথা শোনার পর তাঁদের ঘরে যান এবং বোনের চেহারায় আঘাত করেন যার ফলে রক্ত প্রবাহিত হয়। এর ফলে ওমরের অন্তরে বোনের প্রতি স্নেহ-মমতা জেগে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

সা’ঈদ হিজরি ৫০ বা ৫১ সালে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে মদিনায় দাফন করা হয়।

৬ষ্ঠ – হযরত ওসামাহ্ বিন যায়েদ:

তাঁর পিতা যায়েদ বিন্ হারেসাহ্ ছিলেন রাসূলে আকরাম (সা.) কর্তৃক আজাদকৃত ক্রীতদাস। তাঁর মাতা উম্মে আয়মান ছিলেন রালুল্লাহ্ (সা.)-এর আজাদকৃত ক্রীতদাসী ও খাদেমাহ্। ওসামাহ্ ইসলামের প্রথম যুগে জন্মগ্রহণ করেন এবং মু’আবিয়ার শাসনামলে ইন্তেকাল করেন।’ (এসব সাহাবি সংক্রান্ত তথ্যাদি আল-ইস্তি’আব্, উদ্‌দুল খাবাহ্ ও আল-ইছাবাহ্ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। মূল গ্রন্থে বিস্তারিত তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়েছে। সংক্ষেপণের স্বার্থে অনুবাদে তা এড়িয়ে যাওয়া হলো। -অনুবাদ)

মৃত্যুশয্যায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

রাসূলে আকরাম (সা.) তাঁর জীবনের শেষের দিনগুলোতে যে সিদ্ধান্ত নেন তা অনেকের মনে বিস্ময় সৃষ্টি করে। তিনি এ সময় ওসামাহ্ বিন্ যায়েদের (যার পিতা ও মাতা উভয়ই ছিলেন আজাদকৃত ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসী) সেনাপতিত্বে সিরিয়ায় অভিযানের জন্যে সিদ্ধান্ত দেন এবং একমাত্র হযরত আলী ব্যতীত সকল শীর্ষস্থানীয় সাহাবিকে তাতে শামিল হবার জন্যে নির্দেশ দেন। দৃশ্যত মনে হয় যে, রাসূলে আকরাম (সা.) তাঁর এসব শীর্ষস্থানীয় সাহাবিকে ইসলামি হুকুমতের কেন্দ্র থেকে দূরে পাঠাতে চাচ্ছিলেন।

প্রশ্ন জাগে রাসূলে আকরাম (সা.) কেন তাঁর মৃত্যুশয্যায় থাকার-মতো সংবেদনশীল সময়ে সকল শীর্ষস্থানীয় সাহাবিকে মদীনা থেকে দূরে পাঠাতে চাচ্ছিলেন কিন্তু হযরত আলীকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন? (এ ব্যাপারে পরে আলোচনা করা হচ্ছে।)

চলবে …..