Press "Enter" to skip to content

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার কল্পকাহিনি ও ওহাবীদের ষড়যন্ত্র– ৬

মূল: আল্লামা সৈয়দ মুরতযা আসকারী

অনুবাদ নূর হোসেন মজিদী

প্রসঙ্গ: সর্বজনীন বাই’আত্

সকল মুসলমানের অংশগ্রহণ ছাড়াই সাক্বীফায় বিশেষ এক পরিস্থিতিতে খেলাফতের অন্য দাবিদারদের দাবি উপেক্ষা করে হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তখনো এ ব্যাপারে তাঁর বিজয় পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি; বরং এ জন্যে সর্বজনীন বাই’আত গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। তাই পরে এ ব্যাপারেও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে যারা বাই’আত হয় তারা হলো বনু আসলামের লোকজন।

বানু আসলামের বাই‘আত

এ ব্যাপারে তাবারী লিখেছেন বনু আসলামের লোকেরা এতই বিপুল সংখ্যায় মদিনায় এলো যেন মদিনার গলিগুলো তাদের জন্যে অপ্রশস্ত ছিল; তারা এল এবং হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হলো। এ ব্যাপারে হযরত ওমর বহুবার বলেন “বানু আসলামকে যখন দেখলাম তখন আমি নিশ্চিত হলাম যে, বিজয় আমাদেরই। যুবাইর বর্ণনা করেন “বানু আসলামের বাই’আতের ফলে আবুবকর শক্তি লাভ করেন। (ত্বাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৫৮; ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড/ ২২৪, শারহে নাহজুল বালাগাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ২৮৭)

কিন্তু শেখ মুফীদ তাঁর “আল-জামাল” গ্রন্থে বনু আসলামের মদিনায় আগমন সম্বন্ধে লিখেছেন তারা খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য পণ্য ক্রয়ের জন্যে মদিনায় এসেছিল। এমতাবস্থায় তাদেরকে বলা হয় “এসো, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর খলিফার অনুকূলে বাই’আত গ্রহণে আমাদেরকে সাহায্য করো; এরপর আমরা তোমাদেরকে খাদ্যদ্রব্য দেব।” এর ফলে তারা হযরত আবুবকরের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ হয়।

হযরত আবুবকর মিম্বারে বসে ছিলেন এবং রাত পর্যন্ত লোকেরা এসে তাঁর নিকট বাই’আত হতে থাকলেন; কেউই রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর দাফনের কথা চিন্তা করলেন না। এভাবে মঙ্গলবারের রাত (সোমবার দিবাগত রাত) এসে গেল। (রিয়াযুন নাফ্রাহ, ১ম খণ্ড/ ১৬৩; তারীখে খামীস্, ১ম খণ্ড/১৮৮)

সর্বসাধারণের বাই‘আত

পরদিন হযরত আবুবকর মসজিদে এলেন এবং সাধারণ জনগণের নিকট থেকে বাই’আত গ্রহণের জন্যে মিম্বারে বসলেন। হযরত আবুবকর তাঁর বক্তব্য রাখার আগেই হযরত ওমর উঠে দাঁড়ালেন এবং হাম্দ ও সানা’র পর বললেন-

“গতকালের কথা না কোরআনের কথা ছিল, না রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর হাদিস ছিল। কিন্তু আমি মনে করেছিলাম যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ই সামষ্টিক কার্যাবলি পরিচালনা করবেন এবং তিনি হবেন এ পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণকারী সর্বশেষ ব্যক্তি।” এরপর তিনি বলেন “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তোমাদের মধ্যে কোরআন রেখে গেছেন; এখন তোমরা যদি তার আশ্রয় গ্রহণ করো তাহলে তা তোমাদেরকে সেদিকেই পথপ্রদর্শন করবে যেদিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) পথপ্রদর্শন করতেন। এখন তোমাদের দায়িত্ব তোমাদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তির হাতে সোপর্দ করা হয়েছে যিনি গুহায় আশ্রয় গ্রহণকারী দুইজনের একজন। অতএব, তোমরা ওঠো; তাঁর নিকট বাই’আত হও।” এভাবে সর্বজনীন বাই’আতের ব্যবস্থা করা হয়।

বুখারী বলেন- “এর আগে কিছু লোক বনু সা’এদাহর সাকীফায় বাই’আত হয়েছিলেন, কিন্তু সর্বজনীন বাই’আত মিম্বারের ওপর অনুষ্ঠিত হয়। (১৪র্থ খ০/৬৫)

আনাস বিন্ মালেক রেওয়ায়েত করেন শুনেছি যে, সেদিন ওমর আবুবকরকে অনবরত বলেন “মিম্বারে উঠুন।” তিনি এতই এ কথার পুনরাবৃত্তি করেন ও পিড়াপিড়ি করেন যে, শেষ পর্যন্ত হযরত আবুবকর মিম্বারে উঠে বসেন এবং সকলে তাঁর নিকট বাই’আত হন।

এরপর হযরত আবুবকর আল্লাহ্ তা’আলার হাম্দ ও সানা’ করেন এবং বলেন “হে জনগণ! তোমাদের শাসন ক্ষমতা আমার হাতে সোপর্দ করা হয়েছে যদিও আমি তোমাদের মধ্যে যোগ্যতম ব্যক্তি নই। আমি যখন সদাচরণ করব তখন তোমরা আমাকে সাহায্য করো, আর যদি খারাপ কাজ করি এবং বক্র আচরণ করি তাহলে আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।

… আমি যতক্ষণ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের (সা.) আনুগত্য করব ততক্ষণ তোমরা আমার আনুগত্য করবে, আর যদি আল্লাহ্ ও রাসূলের নাফরমানি করি তাহলে তোমরা আমার অনুসরণ করো না। এবার নামাজের জন্যে ওঠো; আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। (ইবনে হিশাম, ৪র্থ খণ্ড/ ৩৪০ঃ তাবারী, ৩য় খণ্ড/ ২০৩। ইবনে কাসির, ৫ম খণ্ড/ ২৪৮ ও অন্যান্য)

রাসুলুল্লাহ্ (সা.)-এর নামাজে জানাযা

রাসূলে আকরাম (সা.) সোমবার সকালে ইন্তেকাল করেন। কিন্তু লোকেরা তাঁর লাশ দাফন করার পরিবর্তে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। (ত্বাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৪৩; ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড/২২০)

হ্যাঁ, সোমবার থেকে শুরু করে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত বনি হাশেম বাদে মদিনার বাকি লোকেরা তিনটি কাজ আঞ্জাম দেন। তা হচ্ছে প্রথমত সাকীফায় বিক্ষোভ ও বক্তৃতা, দ্বিতীয়ত সাকীফায় হযরত আবুবকরের সাথে প্রথম বারের মতো বাই’আত অনুষ্ঠান, তৃতীয়ত মসজিদুন্নবীতে (সা.) বাই’আত, হযরত ওমরের বক্তৃতা ও হযরত আবুবকরের ইমামতিতে নামায আদায়।

ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন মঙ্গলবার হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত সমাপ্ত হলে লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশের প্রতি মনোযোগী হলেন এবং তাঁর গৃহে প্রবেশ করলেন ও নামাজে জানাযা আদায় করলেন। কোনো ইমাম ছাড়াই রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নামাজে জানাযা আদায় করা হয়; মুসলমানরা দলে দলে আসেন ও নামায আদায় করেন। (ইবনে হিশাম, ৪র্থ খণ্ড/ ৩৪৩; তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৫। ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড/ ২২৫। ইবনে কাসির, ৫ম খণ্ড/ ২৪৮। সীরাতে হালাবীয়্যাহ্, ৩য় খণ্ড/ ৩৯২ ও ৩৯৪, ইবনে হিশাম, ৪র্থ খণ্ড, ৩৪৩, ত্ববাক্বাত, ক্বাফ ২/ ৭০। ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড/, একাদশ হিজরির ঘটনা প্রসঙ্গে। নিহাইয়্যাতুল আরাব, ১৮তম খ০/৩৯২-৩৯৩)

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর দাফন

রাসূলে আকরাম (সা.)-এর লাশ মোবারককে যারা গোসল করান, কাফন পরান ও দাফন করেন তাঁরা হলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর চাচা আব্বাস, চাচাতো ভাই ও জামাতা আলী, গোলাম ছালেহ্ এবং আব্বাসের পুত্র ফাল্। অন্য সাহাবিগণ তাঁর লাশকে তাঁর ঘরে রেখে খলিফা নির্বাচনের জন্যে সাক্বীফায় ছুটে যান। (ত্বাবাক্বাত, ২য় খণ্ড, ক্বাফ ২/৭০। বিদাইয়্যাহ ওয়া নিহাইয়্যাহ্)

অন্য রেওয়ায়েত অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশের দাফন কার্যে চারজন অংশ নেন’; (কানযুল ‘উম্মাল, ৪র্থ খ০/৫৪ ও ৬০)

তাঁরা হলেন হযরত আলী, হযরত আব্বাসের দুই পুত্র ফাল্ ও কুছাম্ এবং রাসূলুল্লাহর গোলাম শুকুরান। এদের মধ্যে শুকুরান্ কবরে নামেন। কোনো কোনো সূত্র অনুযায়ী ওসামাও ছিলেন। গোসল, কাফন পরানো ও অন্যান্য কাজও তাঁরাই সমাপন করেন।’ (‘ইকুদুল ফারীদ, ৩য় খণ্ড/ ৬১: যাহাবী, ১ম খণ্ড/ ৩২১, ৩২৪ ও ৩২৬)

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাফন ও দাফনের সময় আবুবকর ও ওমর উপস্থিত ছিলেন না। (কানযুল ‘উম্মাল, ৩য় খণ্ড/১৪০)

হযরত আয়েশা বলেন “বুধবার মধ্যরাতে (মঙ্গল বার দিবাগত রাতে) আমাদের কানে বেলচার শব্দ এসে পৌঁছার আগে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাফন সম্বন্ধে জানিনি। (ইবনে হিশাম, ৪র্থ খণ্ড/ ৩৪২; তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৫২ ও ৪৫৫; ইবনে কাসির, ৫ম খণ্ড/ ২৭০; মুসনাদে আহমাদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ৬২ ও অন্যান্য)

অন্য এক রেওয়ায়েত অনুযায়ী তিনি বলেন “বেলচার শব্দ শোনার আগে আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর দাফন সম্বন্ধে কিছু জানিনি। (মুসনাদে আহমাদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড/২৪২ ও ২৭৪)

আরো রেওয়ায়েত হয়েছে যে, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন ছাড়া রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশের কাছে কেউ ছিলেন না। অন্যতম আনসার গোত্র বন্ধু খানামের লোকেরা রাতের বেলা যখন তাঁদের গৃহে বিশ্রাম ও আরাম করছিলেন তখন তাঁরা বেলচার শব্দ শুনতে পান। বনু গ্রানামের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা পরে বলেন “আমরা শেষ রাত্রে বেলচার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম।”(ত্বাবাকাতে ইবনে সা’দ, ২য় খণ্ড, ক্বাফ ২/৭৮)

হযরত আবুবকরের খেলাফতের বিরোধীগণ

ইয়াকুবী লিখেছেন একদল মুহাজির ও আনসার হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হওয়া থেকে বিরত থাকেন। তাঁরা হযরত আলীকে খলিফা হিসেবে দেখতে চাচ্ছিলেন। এদের মধ্যে আব্বাস বিন্ আবদুল মুত্তালিব, ফাল্ বিন্ আব্বাস, যুবাইর বিন্ আল-‘আওয়াম, খালেদ বিন্ সা’ঈদ্, মিকদাদ বিন্ ‘আমর্, সালমান ফারসী, আবু যার গিফারী, ‘আম্মার বিন্ ইয়াসার, বারাআ বিন্ ‘আযেব্‌ ও উবাই বিন্ কা’ব ছিলেন অন্যতম। (তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড/১৪)

হযরত আবু বকর জাওহারী লিখেছেন তাঁরা রাতের বেলা বৈঠকে মিলিত হন এবং মুহাজির ও আনসার সকলের নিকট ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার পন্থা সম্পর্কে আলোচনা করেন। এ বৈঠকে উপরোল্লিখিত সাহাবিগণ এবং তদসহ ‘ইবাদাহ্ বিন্ ছামেত, আবুল হাইছাম্ বিন্ তীহান্ ও হুযাইফাহ্ ছিলেন। (শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/ ৪৪ ও ৬ষ্ঠ খ০/৫ (জাওহারীর “সাক্বীফাহ” থেকে উদ্ধৃত)

এদিকে হযরত ওমর, আবু ওবায়দাহ্ ও মুগীরাহ্ বিন্ শু’বাহকে ডেকে নিয়ে হযরত আবুবকর তাঁদের নিকট পরবর্তী করণীয় সম্বন্ধে মতামত চাইলেন। তাঁরা আব্বাসের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে ও তাঁর সন্তানদেরকে ক্ষমতায় অংশীদার করে (বা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে) পক্ষে আনার প্রস্তাব দেন এবং বলেন, তাহলে আপনি আলীর ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারবেন’ এবং আব্বাসের আনুগত্য আলীর বিরুদ্ধে একটি যুক্তি (হুজ্জাত) হিসেবে কাজ করবে। (জাওহারী তাঁর সাক্বীফাহ্ গ্রন্থে লিখেছেন যে, মুগীরাহ্ বিন্ শু’বাহ্ এ প্রস্তাব দেন এবং এটাই সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী)

এ প্রস্তাব হযরত আবুবকরের মনঃপূত হলো এবং তিনি হযরত ওমর, আবু ওবায়দাহ্ ও মুগীরাহ্ বিন্ শু’বাহকে নিয়ে রাতের বেলা হযরত আব্বাসের গৃহে গেলেন।

হযরত আবু বকর আল্লাহ্ তা’আলার হাম্দ ও সানা’র পর বললেন নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা’আলা মুহাম্মাদ (সা.)-কে এজন্য উত্থিত করেছেন যাতে তিনি আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছে দেন, মু’মিনদের ওপর অভিভাবকত্ব করেন, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন ও তাদের মধ্যে জীবনযাপন করেন, অতঃপর তিনি (আল্লাহ্) তাঁকে নিজের নিকট ডেকে নেন ও তাঁর জন্যে যা সঞ্চিত রেখেছেন তা তাঁকে প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার সময় লোকদের (সামষ্টিক) দায়িত্ব তাদের নিজেদের ওপর সোপর্দ করে যান যাতে তারা নিজেদের জন্যে যা ভালো মনে করে পরিপূর্ণ আন্তরিকতার সাথে তা সম্পাদন করতে পারে। আর তারা আমাকে তাদের ওপর শাসক ও তাদের সামষ্টিক ব্যাপারে রক্ষক নিয়োগ করেছে। আমিও তা কবুল করেছি এবং আল্লাহ্র সহায়তায় তার রক্ষণাবেক্ষণে কোনোরূপ শৈথিল্য ও উদ্বেগের বা আমার ভয় পাবার আশঙ্কা করছি না। আমি সাফল্যকে আল্লাহর হাতে বলে মনে করি এবং তাঁর নিকট আশ্রয় চাই ও তাঁর দিকে প্রত্যার্তনরত। আমার নিকট অনবরত খবর আসছে যে, কিছু লোক জনসাধারণের মতামতের বরখেলাফে মতামত ব্যক্ত করছে ও সমালোচনা করছে এবং তোমার ওপর নির্ভর করে আমার ত্রুটি নির্দেশ করছে। কেবল তোমার জনপ্রিয়তা ও সামাজিক মর্যাদার আশ্রয়ে থেকেই তারা এ নব উদ্ভাবিত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অতএব, তুমি লোকদের সাথে যোগাযোগ করো এবং তাদেরকে তাদের এ অপরিপক্ব চিন্তা থেকে ফিরিয়ে রাখো। তাই এখন আমরা তোমার কাছে এসেছি এবং তোমাকে ও তোমার সন্তানদেরকে এ কাজে (ক্ষমতায়) শরীক করতে চাই। যদিও তুমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা এবং লোকেরা তোমার ও তোমার বন্ধুদের অবস্থান সম্পর্কে অবগত ছিল, তা সত্ত্বেও তারা এ দায়িত্বকে তোমাদের নিকট থেকে ফিরিয়ে নিয়েছে। হে হাশেমের বংশধরগণ! তোমরা শান্ত হও। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আমাদের ও তোমাদের সকলের, কেবল এককভাবে তোমাদের নন।”

হযরত ওমর বিন খাত্তাব এই সাথে যোগ করেন “তোমার কাছে আমাদের আগমন থেকে এরূপ ধারণা না হয় যে, আমরা তোমাদের সাহায্যের ও তোমাদের সাথে খাপ খাইয়ে চলার মুখাপেক্ষী। না; বরং আমরা চাননি যে, মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধভাবে যে কাজ করেছে তার বিরুদ্ধে তোমাদের কাছ থেকে বিরোধিতার আওয়ায শোনা যাক। কারণ, এ কাজের দ্বারা তোমাদের ও তাদের ক্ষতি হবে। অতএব, নিজের কল্যাণের কথা চিন্তা করো।”

হযরত আব্বাস আল্লাহ্ হাম্দ ও সানা’র পর বললেন “তুমি যেরূপ বললে আল্লাহ্ তা’আলা মুহাম্মাদকে নবী হওয়ার জন্যে এবং স্বীয় অনুসারী ও মু’মিনদের জন্যে সহায়ক ও পৃষ্ঠপোষক হওয়ার জন্যে উত্থিত করেন, আর তিনি (আল্লাহ্) তাঁর (রাসূলের) সত্তার নেয়ামতের দ্বারা তাঁর উম্মাতের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন এবং অতঃপর তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নেন ও তাঁর জন্যে যা রেখেছিলেন তা তাঁকে প্রদান করেন, আর মুসলমানদের (সামষ্টিক) বিষয় তাদের ওপর ছেড়ে দেন’ (হযরত আব্বাস হযরত আবুবকরের দাবিকে যুক্তির খাতিরে মেনে নেন তাঁর খলিফার পদ গ্রহণকে অযথার্থ প্রমাণ করার জন্যে, নচেৎ হযরত আব্বাস খেলাফতকে হযরত আলীর অধিকার বলেই জানতেন) যাতে তারা সত্যকে লাভ করে ও নিজেদের জন্যে বেছে নেয়, এজন্য নয় যে, তারা সত্যের দিক থেকে গোমরাহীর দিকে যাবে। তুমি যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নামে এ অধিকার নিয়ে থাকো যা আসলে আমাদের হক- তাহলে তুমি এ অধিকার জবর দখল ও আত্মসাৎ করেছ। আর যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর অনুসারীদের নামে এ অধিকারের অধিকারী হয়ে থাকো তাহলে আমরাও তাঁর অনুসারী -আমরা যারা তোমার কাজে কোনো ভূমিকাই পালন করিনি এবং নিজেদের জায়গা থেকে নড়িনি ও সামনে আসিনি। তুমি জেনে রেখো যে, আমরা এতে অসন্তুষ্ট। মু’মিনদের মাধ্যমে যদি এ দায়িত্ব তোমার জন্যে অপরিহার্য হয়ে থাকে তাহলে তুমি অবশ্যই এর উপযুক্ত হয়েছ, কিন্তু যেহেতু আমরা এতে সম্মতি দেইনি সেহেতু তা (আমাদের ক্ষেত্রে) অপরিহার্য ও প্রযোজ্য হবে না। তুমি এ কেমন স্ববিরোধী কথা বলছ! একদিকে বলছ তোমার বিরুদ্ধে আপত্তি জানাচ্ছে, অন্যদিকে দাবি করছ যে, লোকেরা তোমাকে নির্বাচিত করেছে ও তোমার পক্ষে রায় দিয়েছে! তুমি একদিকে নিজেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর খলিফা বলে দাবি করছো, অন্যদিকে বলছ যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) লোকদের (সামষ্টিক) বিষয়াদিকে তাদের ওপরই ছেড়ে দিয়ে গেছেন যাতে তারা নিজেদের জন্যে কাউকে বেছে নেয় এবং তারা তোমাকে বেছে নিয়েছে। কিন্তু এই যে বললে আমাকে অংশ দেবে, তা যদি মু’মিনদের হয়ে থাকে এবং তুমি তা আমার ওপর অর্পণ করতে চাচ্ছ তাহলে তোমার এরূপ করার অধিকার নেই,’ আর যদি তা আমাদের অধিকার হয়ে থাকে (সাকীফাহ্ ও আল-ইমামাহ্ ওয়াস্-সিয়াসাহ গ্রন্থন্বয়ে এ বাক্যাংশটি এরূপ “এ অধিকার যদি তোমার হয়ে থাকে তাহলে আমাদের জন্যে তার প্রয়োজন নেই) তাহলে আমাদের পুরো অধিকার দিয়ে দাও; আমরা আমাদের অধিকারের অংশবিশেষ গ্রহণ ও অংশবিশেষ ছেড়ে দিতে রাজি নই। অতএব, এবার তুমি শান্ত হও, কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) হচ্ছেন এমন একটি বৃক্ষ আমরা যার শাখা এবং তোমরা তার ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণকারী।”

হযরত ফাতেমার গৃহে আশ্রয়গ্রহণ

ইতঃপূর্বে যেমন উল্লিখিত হয়েছে, একদল সাহাবি হযরত আলীকে খলিফা হিসেবে দেখতে চাচ্ছিলেন এবং এ কারণে তাঁরা হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হওয়া থেকে বিরত থাকেন। তাঁদের মধ্য থেকে কয়েকজন হযরত ফাতেমার গৃহে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং হযরত আবুবকরের খলিফা হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ সেখানে নিজেদেরকে আবদ্ধ করে রাখেন।

এ প্রসঙ্গে হযরত ওমর বলেন “আল্লাহ্ যখন তাঁর রাসূলকে দুনিয়া থেকে নিয়ে গেলেন তখন আমাদের নিকট খবর এল যে, আলী, যুবায়র ও অন্য কয়েকজন আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ও ফাতেমার গৃহে সমবেত হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ, ১ম খণ্ড/৫৫; তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৬৬; ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড/ ২২১। ইবনে কাসির, ৫ম খণ্ড/ ২৪৬ এবং আরো অনেক সূত্র যার তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ)

ঐতিহাসিকগণ তাঁদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন; তাঁদেরমধ্যে আলী ছাড়াও ছিলেন আব্বাস, ‘উতাইবাহ্ বিন্ আবি লাহাব, সালমান ফারসী, আবু যার গিফারী, ‘আম্মার বিন্ ইয়াসির, মিকদাদ বিন্ আওয়াদ, বারাআ বিন্ ‘আযেব, উবাই বিন্ কা’ব, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাছ ও তালহা বিন্ ওবায়দুল্লাহ্। এছাড়া ছিলেন বনি হাশেমের আরো কয়েকজন লোক এবং অপর কতক মুহাজির ও আনসার।

“ফুছুলুল্ মুহিম্মাহ্” গ্রন্থে উক্ত দশজন ছাড়াও আরো কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

হযরত আলী ও তাঁর সঙ্গী-সাথিদের হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত না হওয়া এবং হযরত ফাতেমার গৃহে আশ্রয় গ্রহণের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল ঘটনাটি ইতিহাস, সীরাত (রাসূলে আকরাম (সা.)-এর জীবনেতিহাস বিষয়ক প্রামাণ্য গ্রন্থ। -অনুবাদক) সহীহ্ হাদিস, মুস্লাদ হাদিস, সাহিত্য, ‘ইল্মে কালাম ও ‘ইল্মে রিজালের গ্রন্থাবলিতে এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে যা তাওয়াতুর (কোন ঘটনার বর্ণনা প্রথম বর্ণনাকারী থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে এত বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি কর্তৃক বর্ণিত হওয়া যত লোকের পক্ষে মিথ্যা রচনার জন্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়া বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে অসম্ভব। -অনুবাদক) পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। তবে অনেক লেখকই যেহেতু হযরত আবুবকরের বিজয়ী দল ও হযরত ফাতেমার গৃহে অবস্থান গ্রহণকারীদের মধ্যে কী ঘটেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে চাননি সেহেতু তাঁরা কেবল যতটুকুর উল্লেখ ছাড়া গত্যন্তর ছিল না ততটুকুই উল্লেখ করেছেন।

বালাযুরী লিখেছেন যেহেতু হযরত আলী হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত থেকে বিরত থাকেন সেহেতু হযরত আবুবকর হযরত ওমরকে নির্দেশ দেন যে, যেভাবেই হোক যেন আলীকে নিয়ে আসেন। হযরত ওমর হযরত আলীর কাছে এলে উভয়ের মধ্যে কথোপকথন হয়। হযরত আলী হযরত ওমরকে বলেন “তুমি খেলাফতের স্তন থেকে দুগ্ধ দোহন করছ যার অর্ধেক তোমার নিজের জন্য। আল্লাহ্র শপথ, আজ তুমি আবুবকরের খেলাফতের জন্যে যে উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছে তা কেবল এ জন্য যে, আগামী দিনে যাতে তিনি অন্যদের ওপর তোমাকে অগ্রাধিকার দেন।”

হযরত আবুবকর যে অসুখে মারা যান তাতে শয্যাশায়ী থাকাকালে বলেন- “এ দুনিয়ায় যত কাজ করেছি তার কোনোটির জন্যেই আমি দুঃখিত নই কেবল তিনটি কাজ ব্যতীত। হায়। এ কাজগুলো যদি না করতাম!… সে তিনটি কাজ হায়! ফাতেমার গৃহের দরজা যদি না খুলতাম এবং তাকে সে অবস্থায়ই থাকতে দিতাম যদিও সে দরজা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে বন্ধ করা হয়েছিল!  (তাবারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৯; শুজুরুয যাহাব, ১ম খণ্ড/ ৪১৪; আল-‘ইকুদুল্ ফারীদ, ৩য় খণ্ড/ ৬৯: কানযুল ‘উম্মাল, ৩য় খণ্ড/ ৩৫ ও অন্যান্য সূত্র)

তারীখে ইয়াকুবীতে হযরত আবুবকরের শেষোক্ত বক্তব্যটি এরূপ উদ্ধৃত হয়েছে “হায়! রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমার গৃহের দরজা যদি না খুলতাম এবং লোকদেরকে তাঁর ঘরে ঝাঁপিয়ে না পড়তাম, যদিও তা বন্ধ থাকার ফলে যুদ্ধ সংঘটিত হতো! (তাবারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা)

ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন যে, নিম্নলিখিত ব্যক্তিদেরকে হযরত ফাতেমার গৃহে প্রবেশের জন্যে পাঠানো হয়েছিল-

১) ওমর বিন খাত্তাব, ২) খালেদ বিন্ ওয়ালীদ, ৩) আবদুর রহমান বিন্ ‘আওফ্, ৪) ছাবেত্ বিন্ শাম্মাস্, ৫) যিয়াদ্ বিন্ রাবীদ, ৬) মুহাম্মাদ্ বিন্ মাস্লামাহ্, ৭) সালামাহ্ বিন্ সালেম্ বিন্ ওয়াক্বাস্, ৮) সালামাহ্ বিন্ আস্লাম্, ৯) হুযাই, ১০) যায়েদ বিন্ ছাবেত্।

অন্যদিকে হযরত ফাতেমার গৃহে হামলার ধরন এবং সেখানে অবস্থান গ্রহণকারীদের মধ্যে যা কিছু ঘটেছে সে সম্পর্কে লেখা হয়েছে যে, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব ও যুবাইরসহ একদল মুহাজির হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন এবং তলোয়ার হাতে হযরত ফাতেমার গৃহে গমন করেন। (আর-রিয়াযুন নাযূরাহ, ১ম খণ্ড/ ১৬৭; শারহে নাহজুল বালাঘাহ্, ১ম খ০/ ১৩২ ও ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ২৯৩ (সাক্বীফাহ্ থেকে উদ্ধৃত); তারীখে খামীস্, ১ম খণ্ড/ ১৮৮)

হযরত আবুবকরকে খবর দেয়া হলো যে, একদল মুহাজির ও আনসার রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমার গৃহে আলী ইবনে আবি তালিবের সাথে একত্র হয়েছেন এবং আরো জানানো হয় যে, আলীর অনুকূলে বাই’আত হওয়াই তাঁদের একত্র হওয়ার উদ্দেশ্য। (ইবনে শাহ্নাহ্। “কামেল”-এর পার্শ্বটাকা; শারহে নাহজুল বালাগাহ, ১ম খণ্ড/১৫৬, ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড, পৃ ১০৫)

হযরত আবুবকর হযরত ওমরকে হযরত ফাতেমার গৃহে যাওয়ার ও সেখানে অবস্থান গ্রহণকারীদের বের করে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেন এবং বলেন “তারা প্রতিরোধ করলে ও বের হয়ে আসতে না চাইলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।” হযরত ওমর হযরত ফাতেমার গৃহে আগুন দেয়ার জন্যে মশাল সাথে নিয়ে যান। হযরত ফাতেমা তা দেখে বলেন- “হে খাত্তাবের পুত্র! আমার ঘরে আগুন দিতে এসেছ?” হযরত ওমর বললেন “হ্যাঁ, যদি না উম্মতের সাথে অভিন্ন মতে এসো এবং বাই’আত হও। (আল-‘ইকুদুল্ ফারীদ্‌, ৩য় খণ্ড/ ৬৪; আবুল ফিদা’, ১ম খণ্ড/১৫৬)

“আল্-ইমামাহ্ ওয়াস্-সিয়াসাহ্” গ্রন্থে’ উদ্ধৃত এক রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে তাঁরা যখন হযরত আলীর গৃহে জমায়েত হলেন তখন হযরত ওমর এলেন এবং তাঁদেরকে ডাকলেন। কিন্তু তাঁরা গুরুত্ব দিলেন না ও বেরিয়ে এলেন না। তখন হযরত ওমর (তাঁর সঙ্গের লোকদেরকে) লাকড়ি আনতে বললেন এবং (গৃহে অবস্থান গ্রহণকারীদের উদ্দেশে) বললেন-“সেই আল্লাহ্র শপথ ওমরের প্রাণ যার হাতে, অবশ্যই তোমাদের বেরিয়ে আসতে হবে, অন্যথায় ঘরের মধ্যে যারা আছে তাদেরসহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলব।” হযরত ওমরকে বলা হলো “হে আবু হাস্! ফাতেমা এ ঘরে আছেন।” হযরত ওমর জবাব দিলেন “থাকুক না কেন। (আবুল ফিদা’, ১ম খণ্ড/১২, রিয়াযুন্ নাফ্রাহ্, ১ম খণ্ড/ ১৬৭; শারহে নাহজুল বালাগাহ্, ২য় খণ্ড/ ১৩২ ও ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২ (সাক্বীফাহ্ থেকে উদ্ধৃত); তারীখে খামীস্, ১ম খণ্ড/১৭৮)

“আল্-আন্‌দাবুল আশরাফ্” গ্রন্থে এ ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়েছে-হযরত আবুবকর হযরত আলীর নিকট থেকে বাই’আত গ্রহণের জন্যে তাঁর কাছে লোক পাঠালেন। কিন্তু তিনি বাই’আত হলেন না। তখন হযরত ওমর আগুনের মশাল নিয়ে তাঁর গৃহের পানে রওয়ানা হলেন। হযরত ফাতেমা ঘরের দরযায় তাঁর সাথে মুখোমুখি হলেন এবং তাঁকে বললেন খাত্তাবের পুত্র! তুমি আমার ঘরে আগুন দিতে চাচ্ছ?” হযরত ওমর জবাব দিলেন- “হ্যাঁ, তোমার পিতা যা এনেছেন এর ফলে তা সুদৃঢ়তর হবে।

জাওহারী তাঁর “আস্-সাক্বীফাহ্” গ্রন্থে লিখেছেন- “আলীর গৃহে গৃহবাসীদেরসহ অগ্নিসংযোগ করার জন্যে ওমর অপর কয়েকজন মুসলমানসহ সে গৃহের পানে রওয়ানা হন। (শারহে নাহজুল বালাগাহ্, ২য় খণ্ড/ ১৩৪)

বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে শাহনাহ্ লিখেছেন “ঘরে যারাই থাকুন না কেন তাঁদের সকলকেসহ আগুন দেয়ার জন্যে…। (তারীখে কামেল-এর পার্শ্বটীকা, পৃৎ ১১২)

“যদিও কানযুল ‘উম্মাল্-এ’ বলা হয়েছে, হযরত ওমর বলেন জানি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তোমার মতো আর কাউকেই ভালোবাসতেন না, কিন্তু এ সত্য কখনো আমাকে আমার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারবে না, আর তা হচ্ছে এই যে, এই কয়েক ব্যক্তি যদি তোমার গৃহে জমায়েত করে তাহলে তোমাকেসহ এ ঘরে আগুন দেয়ার জন্যে নির্দেশ দেব। (কানযুল উম্মাল, ৩য় খণ্ড/১৪০)

আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর যখন বনি হাশেমের সাথে যুদ্ধ করছিলেন এবং তাঁদেরকে একটি গিরিবর্ত অবরুদ্ধ করে ফেলেন তখন তিনি তাঁদেরকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার জন্যে লাকড়ি আনার জন্যে আদেশ দেন। তাঁর ভাই ‘উওয়াহ্ ইবনে যুবাইর-এর এরূপ আদেশ দানের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে বলেন- “আমার ভাই হুমকি প্রদান ও তাদেরকে ভয় দেখানোর জন্যে এ আদেশ দিয়েছিলেন, ঠিক যেরূপ অতীতেও এরূপ কাজ হয়েছে এবং বনি হাশেম বাই’আত না হলে তাঁদেরকে পুড়িয়ে ফেলার জন্যে লাকড়ি আনা হয়েছিল।”” তিনি অতীত বলতে হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত না করার ঘটনা বুঝিয়েছেন। (মুরুজুয যাহার্, ২য় খণ্ড/ ১০০; শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/৪৮১)

মিসরের বিখ্যাত কবি হাফেয ইবরাহীম এ ঘটনা সম্পর্কে তাঁর “আলীর জন্যে উক্তি যা বলেছেন ওমর কবিতায় লিখেন –

সম্মানিত তার শ্রোতা আর মহান তার বক্তা

তোমার গৃহে আগুন লাগাব বাঁচবে না তব কেহ

যদি না বাই’আত হও আর মুস্তাফার কন্যা সেথা

আবু হাচ্ছ ছাড়া আনেনি কেহ তা মুখে

বীর গৃহবাসী ও তার পৃষ্ঠপোষকের সামনে।”

ইয়াকুবী বলেন (ওমরের সঙ্গীদের মধ্য থেকে) কয়েকজন এগিয়ে এলেন এবং গৃহে হামলা চালালেন। আলীর তলোয়ার ভেঙে গেল এবং তারপরে তাঁরা গৃহে প্রবেশ করলেন। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃ. ১০৫)

ত্বাবারী লিখেছেন ওমর বিন খাত্তাব আলীর গৃহে এলেন। তখন তালহা ও যুবাইর ছাড়াও মুহাজিরদের মধ্যকার আরো কয়েক ব্যক্তি সে গৃহে ছিলেন। যুবাইর নাঙ্গা তলোয়ার হাতে নিয়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং ওমরের ওপর হামলা করেন। এ সময় তাঁর পা পিছলে যায়, ফলে তাঁর হাত থেকে তলোয়ার পড়ে যায়। তখন ওমরের সঙ্গীরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন ও তাঁকে আটক করে ফেলেন। (তাবারী, ৩য় খণ্ড/ ১৯৮ ও ১৯৯; তারীখে খামীস্, ১ম খণ্ড/ ১৮৮; কানযুল ‘উম্মাল্, ৩য় খণ্ড/১২৮)

তারপর তাঁরা আলীকে বন্দি করেন এবং আবুবকরের সামনে নিয়ে আসেন। তাঁকে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বলছিলেন- “হে লোক সকল। আমি আল্লাহর বান্দা এবং রাসূলের ভ্রাতা।” কিন্তু সরকার পক্ষের লোকেরা তাঁর কথায় কান দেননি।

হযরত আবুবকরের বিচারালয়ে হযরত আলীর বক্তব্য

হযরত আলীকে হযরত আবুবকরের নিকট আনা হল এবং বলা হল – “বাই’আত হও।”

হযরত আলী এর জবাবে হযরত আবুবকরকে সম্বোধন করে বললেন “এ দায়িত্বের ব্যাপারে আমি আপনার তুলনায় যোগ্যতর। তাই কিছুতেই আমি আপনার অনুকূলে বাই’আত হব না। সঠিক কাজ হলো আপনি আমার অনুকূলে বাই’আত হোন। আপনি আনসারদের নিকট থেকে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং সেক্ষেত্রে আপনার যুক্তি ছিল এই যে, আপনারা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্বজন। আর তাই তারাও রাষ্ট্রক্ষমতা আপনার হাতে অর্পণ করেছে। আমিও আপনার সামনে সেই একই যুক্তি উপস্থাপন করছি। যদি আল্লাহকে ভয় করেন ও ইনসাফের পথে চলেন তাহলে আনসাররা যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্বজন হওয়ার যুক্তির কারণে আপনাকে অধিকার প্রদান করেছে ঠিক সেভাবেই আপনিও আমাকে অধিকার প্রদান করুন। নচেৎ জেনে রাখুন যে, আপনি জালেমে পরিণত হবেন।”

তখন হযরত ওমর বললেন “তুমি বাই’আত না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে ছাড়ব না।”

জবাবে হযরত আলী বললেন “ওমর! যেটা লাভজনক সেটাই দোহন করো যাতে এর অর্ধেক তোমার হয়। আজ তাঁর স্বার্থে কাজের ভিত্তি মজবুত করো, যাতে আগামী দিনে তিনি তা তোমাকে অর্পণ করেন। আল্লাহর শপথ, আমি কখনোই তোমার কথা মানব না এবং তাঁর (আবুবকরের) অনুসরণ করব না।”

তখন হযরত আবুবকর বললেন “তুমি যদি সন্তুষ্টি ও আগ্রহের সাথে বাই’আত না হও তাহলে আমি জোর করে তোমার কাছ থেকে বাই’আত আদায় করব না।

আবু ওবায়দাহ্ হযরত আলীকে সম্বোধন করে বললেন- “আবুল হাসান! তুমি নবীন যুবক, আর এরা হচ্ছেন কুরাইশ গোত্রের বয়স্ক লোক। এরা (সামষ্টিক) কাজকর্মে তোমার তুলনায় অধিকতর পাকা ও অভিজ্ঞ। আমার মনে হয় আবুবকর এ কাজে তোমার চেয়ে অধিকতর সক্ষম এবং অধিকতর উত্তমরূপে এ বোঝা বহন করতে পারবেন; তিনি এ কাজেরই লোক। অতএব, তাঁকেই দায়িত্ব দাও এবং আপাতত তাঁর ব্যাপারে সম্মতি দাও। অতঃপর যদি বেঁচে থাকো এবং বয়স্ক হও তখন অবশ্যই তোমার মর্যাদা, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে আত্মীয়তা, ইসলাম গ্রহণে অগ্রগণ্যতা ও আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদের বিবেচনায় তুমি এ দায়িত্বের উপযুক্ত বলে গণ্য হবে।”

জবাবে হযরত আলী বললেন “হে মুহাজিরগণ! তাকওয়া অবলম্বন করো এবং আল্লাহকে ভয় করো। শাসন ক্ষমতার দায়িত্ব রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর গৃহ ও আহলে বাইত থেকে বাইরে বের করে নিয়ো না এবং নিজেদের গৃহকে সে ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত করো না। রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আহলে বাইতের অধিকার ও সামাজিক অবস্থান তাঁদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ো না। আল্লাহ্র শপথ, হে মুহাজিরগণ! আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আহলে বাইত; যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মাঝে কোরআন তেলাওয়াতকারী, আল্লাহ্র দ্বীনের ফকিহ্, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সুন্নাতের আলেম ও সাধারণ জনগণের প্রতি রহম-দিল ব্যক্তি আছেন ততক্ষণ আমরা এ দায়িত্বের জন্যে তোমাদের তুলনায় যোগ্যতর। আল্লাহর শপথ, তোমরা যা-ই চাইবে তা-ই আমাদের আহলে বাইতের কাছে রয়েছে। অতএব, তোমরা স্বীয় প্রবৃত্তির লালসার অনুসরণ করো না। কেননা, তাহলে সঠিক পথ থেকে পূর্বাপেক্ষাও দূরে সরে যাবে।”

তখন বাশীর বিন সা’দ বললেন “হে আলী! আনসাররা যদি আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হওয়ার আগেই তোমার এ বক্তব্য শুনত তাহলে তোমার ব্যাপারে দু’জন লোকও বিরোধিতা করত না। কিন্তু এখন আর কী করার আছে! কাজ তো হয়ে গেছে; লোকেরা বাই’আত হয়ে গেছে।”

কিন্তু হযরত আলী বাই’আত না হয়ে তাঁর ঘরে ফিরে এলেন।

হযরত ফাতেমার সংগ্রাম

ইবনে আবিল্ হাদীদ তাঁর “শারহে নাহজুল বালাগাহ্” গ্রন্থে’ ঐ দুই ব্যক্তির (আলী ও আবুবকর জাওহারী থেকে রেওয়ায়েত করেন যুবাইর) সাথে যে আচরণ করা হল হযরত ফাতেমা তা দেখলেন এবং স্বীয় “হে আবুবকর! কত তাড়াতাড়ি রাসূলুল্লাহ হুজরায় দাঁড়িয়ে (স্মর্তব্য, তাঁর হুজরা ছিল মসজিদুন্নবী (সা.) সংলগ্ন) বললেন (সা.)-এর আহলে বাইতের সাথে প্রতারণা করলে! আল্লাহর শপথ, আমি আমার মৃত্যু পর্যন্ত কখনোই আর ওমরের সাথে কথা বলব না। (শারহে নাহজুল বালাগাহ্, ২য় খণ্ড/১৩৪, ৬ষ্ঠ খণ্ড/২৮৬)

অন্য এক রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত ফাতেমা ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলেন ও এ অবস্থায় বেরিয়ে এলেন এবং লোকদেরকে পাশে সরে যেতে বললেন।

ইয়াকুবী বলেন- হযরত ফাতেমা বেরিয়ে এলেন এবং বললেন-“আল্লাহ্ দোহাই দিচ্ছি, আমার ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে যাও, নইলে আমি আমার মাথা অনাবৃত করে ফেলব এবং এলোকেশে আমার রবের দরবারে বিলাপ করব।” তখন লোকেরা, এমনকি যারা সেখানে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন তাঁরাও বেরিয়ে গেলেন। (তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড/১০৫)

নিযাম বলেন হযরত ওমর বাই’আতের দিন হযরত ফাতেমার পেটে ও পাঁজরে এমনভাবে আঘাত করেন যে, এর ফলে তাঁর গর্ভস্থ সন্তান মুহসিন গর্ভপাত হয়ে মারা যায় এবং হযরত ওমর তখনো চিৎকার দিচ্ছিলেন “ঘরের লোকদেরসহ এ ঘরে আগুন দাও। (শাহরিস্তানী: মিলাল্ ওয়া নিহাল, ১ম খণ্ড/ তেহরান সংস্করণ, পৃ. ২৬, লিডেন সংস্করণ, পৃ. ৪০)

মাস’উদী লিখেছেন হযরত আবুবকরের সাথে যখন সাক্বীফায় বাই’আত গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়ে যায় এবং (পরদিন) সোমবারও নতুন করে [মসজিদুন্নবী (সা.)-এ] বাই’আত গৃহীত হয় তখন হযরত আলী বেরিয়ে আসেন এবং হযরত আবুবকরকে বলেন “আপনি আমাদের বিষয়গুলোকে (অধিকারকে) ধ্বংস করে দিয়েছেন। আমাদের সাথে পরামর্শ করেননি এবং আমাদের কোন অধিকারই রক্ষা করেননি।” জবাবে হযরত আবুবকর বললেন – “হ্যাঁ, কিন্তু আমি ফিতনাহ্ ও বিশৃঙ্খলার ভয় করছিলাম। (মুরূজুয যাহার, ১ম খণ্ড/ ৪১৪; আল্-ইমামাহ্ ওয়াস্-সিয়াসাহ, ১ম খণ্ড, ১২-১৪)

ইয়াকুবী আরো বলেন একদল লোক আলী ইবনে আবি তালিবের নিকট আসেন এবং তাঁর নিকট বাই’আত হতে চান। তখন হযরত আলী “তোমরা সবাই মাথা মুণ্ডন করে আগামী কাল সকালে আমার কাছে এসো।” কিন্তু পরদিন মাত্র ছয়জন আসেন।’ (‘তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড/ ১০৫; শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/৪)

এরপর হযরত আলী ফাতেমাকে সাথে নিয়ে রাতের বেলা আনসারদের গৃহদ্বারে করাঘাত করেন এবং তাঁদের কাছ থেকে সাহায্য চান। হযরত ফাতেমার তাঁদের নিকট সাহায্য চান। জবাবে তাঁরা বলেন “হে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কন্যা! ঐ ব্যক্তির সাথে আমাদের বাই’আত হয়ে গেছে। আপনার চাচার ছেলে’ (উল্লেখ্য, আরবদের রীতি অনুযায়ী আপন চাচা, পিতার চাচা, দাদার চাচা ইত্যাদি সবাইকে ‘চাচা’ ও তাঁদের পুত্রদেরকে ‘চাচার ছেলে’ বলা হয়। -অনুবাদক)

যদি আবুবকরের আগে আমাদের কাছ থেকে বাই’আত চাইতেন তাহলে অবশ্যই আমরা কাউকেই তাঁর সমান গণ্য করতাম না এবং তাঁকে ব্যতীত কাউকে গ্রহণ করতাম না।” জবাবে হযরত আলী বললেন- “আশ্চর্য! তোমরা কি আশা করছিলে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশ কাফন-দাফন ছাড়া ঘরে ফেলে রেখে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর রেখে যাওয়া রাষ্ট্র ক্ষমতা হস্তগত করার উদ্দেশ্যে ঝগড়া-বিরোধে লিপ্ত হবার জন্যে যাবো?” হযরত ফাতেমার বললেন “যা করা উচিত ছিল আবুল হাসান (আলী) তা-ই করেছেন এবং স্বীয় দায়িত্ব পালন করেছেন, আর তারাও এমন কাজ করেছে আল্লাহ্ যে কাজের জন্যে তাদের নিকট থেকে জবাবদিহি আদায় করবেন। শারহে নাহজুল বালাগাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ২৮ (আস্-সাক্বীফাহ্ থেকে উদ্ধৃত); আল্-ইমামাহ্ ওয়াস্ সিয়াসাহ্, ১ম খণ্ড/১২)

মু’আবিয়াও হযরত আলীকে লেখা পত্রে এ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন “যেন এই কালকের ঘটনা; আবুবকরের সাথে বাই’আতের দিনে তুমি তোমার গৃহের পর্দান্তরালবাসিনীকে গাধার পিঠে সওয়ার করে এক এক করে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ও ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তীদের গৃহদ্বারে গেলে এবং তোমার দুই পুত্র হাসান ও হোসেনের মাথায় হাত রেখে তাঁদের (সাহাবিদের) প্রতি বাই’আতের জন্যে আহ্বান জানালে। তুমি তোমার স্ত্রীকে ও দুই সন্তানকে সাথে নিয়ে গেলে এবং তাঁদের নিকট অনুরোধ জানালে ও তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাহাবির (আবুবকরের) দিক থেকে হাত গুটিয়ে নেয়ার জন্যে আহ্বান জানালে। কিন্তু চার-পাঁচ জন ব্যতীত কেউ তোমার আহ্বানে সাড়া দিল না। আমার প্রাণের শপথ, সত্য যদি তোমার পক্ষে হতো তাহলে তারা তোমার ডাকে সাড়া দিত। কিন্তু তুমি মিথ্যা দাবি করছিলে এবং নজিরবিহীন কথা বলছিলে এবং এমন কিছু চাচ্ছিলে যাতে তুমি উপনীত হতে পারোনি। আমি যতই ভুলো মনের লোক হই না কেন, তুমি আবু সুফিয়ানকে যা বলেছিলে আমি তা ভুলব না। তোমাকে যখন তিনি উস্কানি দিচ্ছিলেন তখন তুমি বলেছিলে – যদি দৃঢ়চেতা চল্লিশ জন লোকও সাথে থাকত তাহলে আমি অভ্যুত্থান করতাম এবং এই লোকদের কাছ থেকে স্বীয় অধিকার আদায় করে নিতাম। (ইবনে আবিল হাদীদ: শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/ ৬৭ এবং কিতাবে সিফফীন, পৃ. ১৮২)

সিফফিনের যুদ্ধকালে মু’আবিয়ার বাহিনী যখন হযরত আলীর বাহিনীকে পানি নিতে বাধা দেয় তখন ‘আম্ বিন্ ‘আছ মু’আবিয়াকে এ ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন “আমি ও আপনি উভয়ই আলীকে বলতে শুনেছিলাম “হায়! যদি চল্লিশ জন লোকও আমার সাথে থাকত।” এরপর তিনি বলছিলেন…।”

‘আম্মু বিন্ ‘আছ এরপর হযরত আলীর সাহাবিদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাঁর সাথে আসার আহ্বানের কথা উল্লেখ করেন।

বাই‘আতের মাধ্যমে সংগ্রামের সমাপ্তি

উসদুল্ গাবাহ্ গ্রন্থে’ বলা হয়েছে অধিকতর সঠিক তথ্য হলো এই যে, বাই’আত থেকে বিরত থাকা লোকেরা ছয় মাস পরে বাই’আত হন। ইয়াকুবীও বলেন হযরত আলী ছয় মাস অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত বাই’আত হননি। আল ইস্তি’আব ও তাম্বিয়াতুল্ আশরাফ গ্রন্থদ্বয়ে বলা হয়েছে- ফাতেমার ইন্তেকালের পূর্বে আলী আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হননি। (উসদুল্ গাবাহ্, ৩য় খণ্ড/২২২, তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড/১০৫, আল ইস্তি’আব, ২য় খণ্ড/১৪৪, পৃ. ২৫০।

আল-ইমামাহ্ ওয়াস্-সিয়াসাহ্ গ্রন্থে বলা হয়েছে- হযরত আলীর বাই’আত হযরত ফাতেমার ইন্তেকালের পরে সংঘটিত হয় এবং তা ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাতের পঁচাত্তর দিন পরের ঘটনা। যুহরী এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর মীরাছ প্রশ্নে হযরত আবুবকর ও হযরত ফাতেমার মধ্যকার ঘটনা সম্বন্ধে উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। হযরত আয়েশা বলেন ফাতেমা তাঁর (আবুবকরের) দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং তার মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর সাথে কথা বলেননি।

বর্ণনাকারী বলেন- এক ব্যক্তি যুহীকে জিজ্ঞেস করেন – “তাহলে আলী কি এ ছয় মাস বাই’আত হননি?” যুহরী বলেন “না তিনি, না বনি হাশেমের অন্য কোনো লোক বাই’আত হয়েছেন যতক্ষণ না আলী বাই’আত হন।”

তায়সীরুল্ উসূল-এ’ যুহরী বলেন “না, আল্লাহর শপথ, আলী বাই’আত না হওয়া পর্যন্ত বনি হাশেমের এক ব্যক্তিও বাই’আত হননি। আলী যখন লক্ষ করলেন যে, লোকেরা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তখন তিনি আবুবকরের সাথে সমঝোতায় আসেন। (২য় খণ্ড/৪৬, তাবারী, ৩য় খণ্ড/ ২০২; বুখারী, ৩য় খণ্ড/ ৩৮ (বাবে গাযওয়ায়ে খাইবার); মুসলিম, ১ম খণ্ড/ ৭৪ ও ৩য় খণ্ড/ ১৫৩; ইবনে কাসির, ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ২৮৫-২৮৬, ‘ইকুদুল্ ফারীদ্‌, ৩য় খণ্ড/ ৬৪; ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড/ ২২৪; মাস্’উদী, ২য় খণ্ড/ ৪১৪ ও অন্যান্য)

বালাযুরী লিখেছেন- যেহেতু আরবরা (তাদের একাংশ) দ্বীন থেকে ফিরে গেল (মুরতাদ হলো) তখন ওসমান আলীর কাছে গেলেন এবং বললেন : “হে চাচাতো ভাই! তুমি যদি বাই’আত না হও তাহলে কেউ দুশমনদের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে যাবে না।…” তিনি বার বার তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন ও কথা বলেন; অবশেষে তাঁকে হযরত আবুবকরের কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। … হযরত আলী তাঁর অনুকূলে বাই’আত হন এবং মুসলমানরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে; লোকেরা যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয় এবং দলে দলে সৈন্যদেরকে পাঠানো হতে থাকে। (বালাযুরী, ১ম খণ্ড/৮৭)

হ্যাঁ, হযরত আলী একদিকে হযরত ফাতেমা জাহরাকে হারালেন, অন্যদিকে লোকদের মধ্যে উদাসীনতা দেখতে পেলেন। তেমনি তিনি মুসলমানদের উদ্বেগজনক অবস্থাও লক্ষ্য করেন। তাই তিনি হযরত আবুবকরের সাথে সমঝোতায় আসেন। কিন্তু তিনি ঐ দিনগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা কোনো দিনই, এমনকি তাঁর নিজের খেলাফতকালেও ভোলেননি। তিনি সব সময়ই ঐ দিনগুলোর ব্যাপারে অভিযোগ করতেন। তিনি “খুতবায়ে শাকৃশাক্বিয়াহ্” নামে বিখ্যাত তাঁর খোৎবায় বলেন- ” আমার নিকট সুস্পষ্ট ছিল যে, বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী এবং আমার কাঁধে যে দায়িত্ব ছিল সে দায়িত্ববোধের দাবি অনুযায়ী ধৈর্যধারণ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তাই সহ্য করলাম। কিন্তু অবস্থা এমন ছিল যে, যেন চোখের ভিতর মাটি ও আগাছার কণা প্রবেশ করেছে এবং গলায় হাড্ডি আটকে গেছে। আমি স্বচক্ষে দেখছিলাম যে, আমার নিকট রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর উত্তরাধিকারের যে অকাট্য অধিকার পৌঁছেছে তা লুষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। অতঃপর প্রথম জনের (আবুবকরের) জীবন শেষ হয়ে গেল, তাঁর জীবনের প্রদীপ নিভে গেল, আর তিনি খেলাফতের কানকে খাত্তাবের পুত্রের কোলে সোপর্দ করে গেলেন। আর তিনি উপমাস্বরূপ হাম্দানের’ (তৎকালীন ইয়েমেনের অন্যতম আরব গোত্র) কবির এ কবিতা পড়লেন “কতই না পার্থক্য আমার আজকের এ দিন যখন আমি উটের কুঁজে ও জিনের ওপরে আছি, ও সেদিনের মধ্যে যেদিন আমি জাবেরের ভ্রাতা হাইয়ানের পার্শ্বচর ছিলাম।”

বিস্ময়কর যে, হযরত আবুবকর জীবিত থাকাকালে লোকদেরকে বলছিলেন তারা যেন তাঁর অনুকূলে কৃত বাই’আত প্রত্যাহার করে নেয়, কিন্তু জীবনের শেষ কয়েক দিন বাকি থাকতে হযরত ওমরের জন্যে খেলাফতের চুক্তিকে সুদৃঢ় করে যান। হায়। এই দুই লুটেরা খেলাফতকে দুগ্ধবতী উটের স্তনের দুই পালানের মতো নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিয়েছিলেন। (শারহে নাহজুল বালামাহ্, ২য় খণ্ড/ ৫০: ইবনে জাওযী তাযকিরাহ, ষষ্ঠ অধ্যায়: শাহরিস্তানী: মা হুয়া নাহজুল বালাঘাহ, খোতবাহর সনদে)