Press "Enter" to skip to content

ওয়াহাবীদের সৃষ্ট সংশয়ের অপনোদন- ৭

মূল : আলী আসগার রেজওয়ানী

অনুবাদ : আবুল কাসেম

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর জিয়ারতের ফজিলত

আহলে বাইতের ইমামগণের হাদীসসমূহে ইমাম হুসাইনের কবর জিয়ারতের বিষয়ে বিশেষ তাগিদ দেয়া হয়েছে। যেমন :

১। ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : ‘আমাদের অনুসারীদের অবশ্যই ইমাম হুসাইনের কবর জিয়ারত করতে বল। কারণ ইমাম হুসাইনের ইমামতে বিশ্বাসী যে কোন ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তাঁর কবর জিয়ারত ওয়াজিব করেছেন।’ (কামিলুজ জিয়ারাত,পৃ: ১৩১)

২। ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : ‘আমাদের অনুসারীদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইমাম হুসাইনের কবর জিয়ারত করবে ফিরে আসার পূর্বেই তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ (কামিলুজ জিয়ারাত,পৃ: ১৪৫)

৩। ইমাম রেজা (আ.) তাঁর পিতা মূসা কাজিমের সূত্রে ইমাম সাদিক (আ.) হতে বর্ণনা করেছেন : ‘ইমাম হুসাইনের জিয়ারতকারীর জিয়ারতের সময় তার জীবনকাল হিসেবে পরিগণিত হবে না।’ (কামিলুজ জিয়ারাত,পৃ: ১৪৭)

৪। ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি মহানবী (সা.),হযরত আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা জাহরার (আ.) প্রতিবেশী হিসেবে বেহেশতে থাকতে চায়,সে ইমাম হুসাইনের জিয়ারত ত্যাগ করতে পারে না।’

৫। ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : ‘যে কেউ ইমাম হুসাইনের জিয়ারতে যাবে এমতাবস্থায় সে ইমাম হুসাইনের সত্যিকার অবস্থান ও মর্যাদাকে অনুধাবন করেছে তবে তার সকল গুনাহ (পূর্বের ও পরের) ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ (কামিলুজ জিয়ারাত,পৃ. ১৫১)

৬। আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবি নাসর বলেছেন : ‘আমাদের কিছু নির্ভরযোগ্য রাবী ইমাম রেজাকে (আ.) ইমাম হুসাইনের কবর জিয়ারতের সওয়াব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি জবাবে বলেন,‘এর সওয়াব এক উমরাহর সমান। (কামিলুজ জিয়ারাত,পৃ. ১৬৭)

৭। মুহাম্মদ ইবনে সিনান বলেছেন : ‘আমি ইমাম রেজাকে বলতে শুনেছি যে,তিনি বলেছেন,‘যে কেউ ইমাম হুসাইনের কবর জিয়ারত করবে আল্লাহ তার আমলনামায় মকবুল হজ্জ্বের সওয়াব লিখে দিবেন।

৮। ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : ‘ইমাম হুসাইনের কবর জিয়ারতের সওয়াব বিশটি হজ্জ্বের সমান অথবা তার হতেও উত্তম।’ (কামিলুজ জিয়ারাত,পৃ. ১৭৫)

কেন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর জিয়ারত করা উত্তম?

কোন কোন ওয়াহাবী আলেম উপরিউক্ত হাদীসসমূহ দেখে ইমামীয়া শীয়াদের উপর ক্রোধান্বিত হয়েছে এবং তাদের উপর প্রচণ্ড হামলা করেছে। তারা দাবী করেছেন যে,এ ধরনের হাদীসসমূহ মুসলমানদের হজ্জ্ব করা হতে বিরত রাখে এবং হজ্জ্বের প্রতি তাদের বিশ্বাসকে দুর্বল করে। শুধু তাই নয় (নাউজুবিল্লাহ্) ইমাম হুসাইনকে আল্লাহর উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তাই এরূপ চিন্তা বিশ্বাসের প্রচারকে প্রতিহত করতে হবে। কারণ তা একরূপ অতিরঞ্জন। এই আপত্তির জবাবে আমরা কয়েকটি বিষয় ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন মনে করছি:

১। সম্ভাবনা রয়েছে এই হাদীসসমূহ বিশেষ দৃষ্টিকোণ হতে বর্ণিত হয়েছে অর্থাৎ যখনই ইসলাম হুমকির সম্মুখীন এবং মুসলমানরা নামায,রোজা,হজ্জ্ব প্রভৃতির মত ইবাদতগুলোর বাহ্যিকতার প্রতিই কেবল লক্ষ্য করবে কিন্তু ইবাদত তার প্রকৃত মর্ম ও অর্থ হারিয়ে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়বে তখন অবশ্যই শাহাদাতের রক্তিম পথে অগ্রসর হতে হবে। কারণ প্রথমে ইসলামী সমাজ ও শরীয়তের দেহে প্রকৃত প্রাণের সঞ্চার করতে হবে তারপর শরীয়তের বাহ্যিকতার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। (৬০ হিজরীর জিলহজ্জ্ব মাসের ৮ তারিখে ইমাম হুসাইন (আ.) হজ্জ্বের জন্য আরাফার দিকে যাত্রা না করে কুফার দিকে যাত্রা করেন। তাঁর এ কর্মের উদ্দেশ্য ছিল সবাইকে বলা যে,ইসলামের প্রাণের অস্তিত্ব না থাকলে,তা শুধুই সামাজিক আচারে পরিণত হলে ও সমাজে তার শিরক,কুফর,ও বিদআত প্রতিরোধকারী ভূমিকা না থাকলে জিহাদ ও শাহাদাতের পথ বেছে নিতে হবে-সেক্ষেত্রে নিছক আচারভিত্তিক ইবাদত মূল্যহীন। যদি কোন মুসলিম দেশে ইসলামের শুধু নাম থাকে,কিন্তু তার শরীয়তের কোন প্রাণ না থাকে তখন উচিত হবে ইমাম হুসাইনের পথ অবলম্বন করে জাতিকে প্রকৃত ইসলামের সাথে পরিচিত করানো। অতঃপর শরীয়তের বাহ্যিকতার প্রতি দৃষ্টি দেয়া,যেমনটি ইমাম হুসাইন করেছেন। যখন সবাই হজ্জ্ব করার জন্য মক্কায় আসছিল তখন তিনি হজ্জ্বের অনুষ্ঠান অসমাপ্ত রেখে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধে’ রত হন। মুসলিম উম্মতকে জাগরিত করতে ও শরীয়তকে পুনর্জীবন দানের লক্ষ্যে স্বীয় জীবন বিলিয়ে দেন।

২। কাবার সম্মান এ কারণেই যে,তা আল্লাহর নির্দেশে তাঁর প্রেরিত এক রাসূলের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছে। কোন কোন হাদীসের বর্ণনামতে কাবা আল্লাহর প্রতিপালক ও মাবুদ হওয়ার বৈশিষ্ট্যের প্রতিপালক,কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ইমামগণ আল্লাহর সকল গুণের প্রতিচ্ছায়া ও প্রকাশ। এ কারণেই আমরা জিয়ারতে জামেয়ে কাবিরাতে পড়ে থাকি

من أراد الله بدأ بکم و من وحّدهُ قبل عنکم و من قصده توجَّهُ

অর্থাৎ যারা আল্লাহকে চায়,তারা আপনাদের থেকে শুরু করে,যে কেউ আল্লাহকে এক জানে,সে আপনাদের থেকে গ্রহণ করে,যে কেউ আল্লাহর প্রতি যাত্রা করে,আপনাদের প্রতি দৃষ্টি দেয়। দোয়া নুদবাতেও আমরা পড়ি

أین وجهُ الله الّذی إلیه یتوجَّهُ الاولیاء

কোথায় আল্লাহ বিরাজমান যার প্রতি তাঁর ওলীরা মুখ ফেরায়।

৩। প্রতি মুসলমানের জন্য ওয়াজিব হলো শরীয়তের বিধি-বিধান শিক্ষা করা,তারপর তা পালন করা,যেমন হজ্জ্ব ও হজ্জ্ব সম্পর্কিত মাসলা-মাসায়েল শিক্ষা করা অপরিহার্য। অতঃপর হজ্জ্বে গমনের পর তা আদায় করতে হবে। যেহেতু ইমামগণ মহানবী (সা.)-এর শরীয়তের ব্যাখ্যা দানকারী সেহেতু প্রথমে তাঁদের শরণাপন্ন হয়ে তাঁদের ঐশী ও শরীয়তগত বেলায়েতকে (অভিভাবকত্ব) মেনে নিয়ে তাঁদের নির্দেশানুযায়ী হজ্জ্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে ইমামদের বেলায়েত শরীয়তের বিধান,যেমন হজ্জ্বের উপর প্রাধান্য রাখে।

৪। সম্ভবত ইমামের মর্যাদা ও সঠিক পরিচয়সহ জিয়ারত করলে তবেই তা মুস্তাহাব হজ্জ্বের উপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখবে এবং এ হাদীসের উদ্দেশ্য ওয়াজিব হজ্জ্ব নয়। কারণ জিয়ারতের মতো মুস্তাহাব কর্ম কখনোই হজ্জ্বের মতো ওয়াজিব কর্মের উপর প্রাধান্য রাখতে পারে না। কিন্তু মুস্তাহাব জিয়ারত ও মুস্তাহাব হজ্জ্বের মধ্যে মুস্তাহাব জিয়ারতের প্রাধান্য রয়েছে।