মূল : আলী আসগার রেজওয়ানী
অনুবাদ : আবুল কাসেম
মুসলমানদের সাথে ওয়াহাবীদের বিরোধের অন্যতম বিষয় হলো কবরের উপর গম্বুজ ও সৌধ নির্মাণ সম্পর্কিত। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মুসলমানগণ এই রীতিটি অনুসরণ করে এসেছে এবং এ বিষয়টি জায়েয ও মুস্তাহাব হওয়ার সপক্ষে কোরআন ও হাদীস হতে দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। উপরন্তু এ কর্মটি যৌক্তিক এবং তা বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের অনুসৃত রীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল। কিন্তু ইবনে তাইমিয়ার সময় হতে এই রীতির বিরোধিতা শুরু হয়। তিনি কবরের উপর সৌধ ও গম্বুজ তৈরিকে শিরক বলে ঘোষণা করেন। হিজাযে আলে সউদের আধিপত্যের সময় এই বিশ্বাস তুঙ্গে পৌঁছায় ও সউদী শাসকগণ এই ফতোয়ার ব্যবহারিক বাস্তবায়নে রত হয়। ওয়াহাবী আলেমদের ফতোয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তারা সকল মাজার,কবরের উপরে নির্মিত সৌধ ও গম্বুজ ধ্বংসকার্যে রত হয়। মহানবীর কবর ব্যতীত সকল সৌধ তারা ধ্বংস করে। তাঁর পবিত্র রওজা ধ্বংসের ইচ্ছা থাকলেও মুসলমানদের প্রতিরোধের ভয়ে তারা তা করতে পারে নি। তারা তাদের এ ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে এ প্রবন্ধে আমরা এই বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করব।
ওয়াহাবীদের ফতোয়া
১। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন : ‘আল্লাহর নবিগণ তাঁদের আহলে বাইতের সদস্য ও অন্যান্য সৎকর্মশীল বান্দাদের কবরের উপর যে সকল সৌধ নির্মিত হয়েছে তা হারাম ও বিদআত। যা অন্য স্থান হতে ইসলামে প্রবেশ করেছে। (মিনহাজুস সুন্নাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৩৭, ৪৩৫)
২। তিনি অন্যত্র বলেছেন : ‘শিয়ারা কবরসমূহের উপর যে সৌধ নির্মাণ করে তার সামনে সম্মান প্রদর্শনের জন্য নত হয়ে থাকে তা মুশরিকদের মূর্তিপূজার ন্যায়। তারা কাবা ঘরের হজ্জ্বের ন্যায় ঐ সকল কবর ও সৌধের উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব করে থাকে। (মিনহাজুস সুন্নাহ,২য় খণ্ড,পৃ. ৪৭৪-৪৭৯)
৩। সেনআনী বলেছেন : ‘ওলীদের কবরের উপর নির্মিত সৌধ মূর্তির ন্যায় এবং তারা জাহেলী যুগের মুশরিকদের ন্যায় ওলীদের কবরের সামনে বিভিন্ন আচার পালন করে।’ (কাশফুল ইরতিয়াব, পৃ. ২৮৬, তাহরীরুল ইতিকাদে সানআনির উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত)
৪। ওয়াহাবীদের ফতোয়া প্রদানের স্থায়ী পরিষদ এক প্রশ্নের জবাবে বলেছে,‘কবরের উপর সৌধ নির্মাণ নিষিদ্ধ বিদআত যা কবরবাসীর প্রতি অতিমানবীয় বিশ্বাস ও তার প্রতি অতিরঞ্জিত সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে হয়ে থাকে এবং তা মানুষকে শিরকের দিকে পরিচালিত করে। তাই মুসলমানদের (দায়িত্বশীল) নেতা অথবা তার প্রতিনিধির কবরের উপর নির্মিত এরূপ সৌধসমূহ ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার নির্দেশ দান করা উচিত। এর মাধ্যমে কর্মগত বিদআতের মূলোৎপাটন করে শিরকের পথ চিরতরে রুদ্ধ করতে হবে।’ (আল লাজনাতুদ দায়িমাহ লিল বুহসেল ইলমিয়া ওয়াল ইফতা,ফতওয়া নং ৭২১০)
৫। নাসিরুদ্দীন আলবানী সউদ বংশের শাসকদের প্রস্তাব করেছে মহানবীর পবিত্র রওজার সবুজ গম্বুজটি ভেঙ্গে ফেলার। সে বলেছে,‘এটি আফসোসের বিষয় যে,দীর্ঘদিন হল রাসূলের কবরের উপর একটি গম্বুজ প্রস্তুত হয়েছে… আমার বিশ্বাস সউদী সরকারের একত্ববাদের দাবী যদি সত্য হয়ে থাকে তবে তাদের উচিত তা চূর্ণ করে মসজিদে নববীকে তার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা।’ (তাহযীরুল মাসাজিদি মিন ইত্তিখাযিল কুবুর মাসাজিদা,আলবানী,পৃ. ৬৮-৬৯)
কবরের উপর সৌধ নির্মাণ ও পবিত্র কোরআন
পবিত্র কোরআন কবরের উপর সৌধ নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট কিছু না বললেও কোরআনের আয়াত হতে এ সম্পর্কিত বিধান পাওয়া যায়। এ যুক্তিতে যে-
১। কবরের উপর সৌধ নির্মাণ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শামিল। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে তাঁর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে নির্দেশ দিয়েছেন,কারণ তা অন্তরের পরহেজগারীর (আত্মসংযম) প্রমাণ। যেমন বলা হয়েছে,
(وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ )
“যারা আল্লাহর (দ্বীনের)নিদর্শনসমূহের সম্মান করে তা অন্তরের পরহেজগারীর প্রমাণস্বরূপ।” (সূরা হাজ্জ্ব : ৩২)
‘شعائر’ শব্দটি ‘شعیره’ শব্দের বহুবচন যার অর্থ নিদর্শন ও প্রমাণ। ‘আল্লাহর নিদর্শন’(شعائر الله)হলো এমন কোন প্রতীক যা আল্লাহর দিক নির্দেশক। যদি কেউ আল্লাহর নিকট পৌঁছাতে চায় (নৈকট্য পেতে চায়) তবে ঐ প্রতীকের মাধ্যমে তাতে পৌঁছাতে পারে। অবশ্য ‘আল্লাহর নিদর্শন’ অর্থ যদি তাঁর দ্বীনের নিদর্শন বুঝায় তবে আয়াতটির অর্থ হবে যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায় তবে তাঁর দ্বীনের নিদর্শনসমূহের স্থান প্রদর্শনের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হবে।
পবিত্র কোরআনে সাফা ও মারওয়াকে আল্লাহর নিদর্শন ও চিহ্ন বলা হয়েছে:
(إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ)
“নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া (পর্বত দু’টি) আল্লাহর (দ্বীনের) নির্দশন।”( সূরা বাকারা : ১৫৮)
কোরবানীর উদ্দেশ্যে যে উটকে মিনায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকেও আল্লাহর নিদর্শন বলা হয়েছে,
(وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِنْ شَعَائِرِ)
“আমরা কোরবানীর হৃষ্টপুষ্ট উষ্ট্রকে তোমাদের জন্য আল্লাহর (দ্বীনের) নিদর্শন বানিয়েছি।” (সূরা হাজ্জ্ব : ৩৬)
এ বিষয়গুলো ইবরাহীমের ধর্মের (দ্বীনে হানিফের) নিদর্শনসমূহরে অন্তুর্ভুক্ত। মুজদালিফাকেمَشعَر বলা হয়,কারণ তা আল্লাহর দ্বীনের নিদর্শন ও প্রতীক স্বরূপ। হজ্জ্বের সকল আচারই আল্লাহর দ্বীনের নিদর্শন কারণ তা একত্ববাদী ও অবিকৃত ধর্মের প্রতীকস্বরূপ।
যেহেতু এই আচারসমূহ আল্লাহর দ্বীনের নিদর্শনস্বরূপ এবং মানবজাতিকে একত্ববাদী ও অবিকৃত ঐশী দ্বীনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়,সেহেতু নিঃসন্দেহে বলা যায়,আল্লাহর নবী ও ওলিগণ তাঁর দ্বীনের সর্বোচ্চ নিদর্শন। কারণ তারা হলেন নিষ্পাপ,কখনোই অন্যায়কর্ম করেন না এবং তাদের বাণী ও কর্ম সত্যের অনুরণন। তাঁরা এমন এক আদর্শ যাদের অনুসরণে একত্ববাদ ও মহাসত্যের পথ খুঁজে পাওয়া যায়।
যখন মহানবী (সা.),তাঁর স্থলাভিষিক্ত প্রতিনিধি (পবিত্র ইমামগণ) ও আল্লাহর অন্যান্য ওলিগণ এরূপ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তখন তাদের সকল স্মৃতি সংরক্ষন যেমন তাঁদের কবর,তা সংরক্ষনের নিমিত্তে তার উপর সৌধ ও গুম্বুজ নির্মাণ আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মানেরই নমুনা স্বরূপ। কারণ এরূপ কর্ম সেই ব্যক্তিবর্গের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে করা হয়,যাদের কর্ম,বাণী ও নির্দেশনা মানুষকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করে।
কুরতুবী তাঁর তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,‘আল্লাহর নিদর্শন হলো এমন কিছু যা তাঁর দ্বীনের চিহ্ন ও স্মৃতি বহন করে বিশেষত যে সকল বিষয় দ্বীনের আচারের পথে সংশ্লিষ্ট। (তাফসীরে কুরতুবী,১২তম খণ্ড,পৃ. ৫৬)
মিশরীয় লেখক প্রফেসর আব্বাস মাহমুদ আল আক্কাদ কারবালা ও ইমাম হুসাইনের মাজার সম্পর্কে বলেছেন: ‘কারাবালা এমন একস্থান যেখানে মুসলমানরা শিক্ষাগ্রহণ ও ইমাম হুসাইনের স্মরণের জন্য যায়। অমুসলমানরাও সেখানে দর্শনের জন্য যায়। কিন্তু যদি ঐ ভূমির প্রকৃত মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয় তবে অবশ্যই তা সেই সব ব্যক্তিদের জিয়ারতের স্থান হওয়া উচিত যারা স্বজাতির জন্য বিশেষ পবিত্রতা ও মর্যাদায় বিশ্বাসী। কারণ জিয়ারতের স্থানগুলোর মধ্যে ইমাম হুসাইনের মাজার হতে উত্তম কোন স্থানের কথা আমার জানা নেই।’
২। মহানবীর পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের কবরসমূহের উপর সৌধ নির্মাণ মহানবীর নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ স্বরূপ।
পবিত্র কোরআন সুস্পষ্টরূপে আল্লাহর নবীর রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালবাসা পোষণের নির্দেশ দিয়েছে-
(قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّة)
“তোমাদের হতে আমি আমার (রিসালাতের দায়িত্বের) কোন বিনিময় চাই না কেবল আমার অতিনিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া। (সূরা শুরা : ২৩)
নিঃসন্দেহে মহানবীর অতিনিকটাত্মীয়দের কবর সংরক্ষণের নিমিত্তে তার উপর সৌধ নির্মাণ করে জিয়ারতকারীদের জন্য তা চিহ্ন হিসেবে উপস্থাপন তাঁদের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ স্বরূপ। কারণ প্রতিটি ভালোবাসারই প্রকাশ আছে এবং শুধু তাঁদের আনুগত্য করা ও তাঁদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা পোষণ করাই ভালোবাসার নিদর্শন নয়,বরং সৌধ নির্মাণের মাধ্যমে তাঁদের কবর সংরক্ষণও তাঁদের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন,যেহেতু এরূপ কর্ম কোন সূত্রেই নিষিদ্ধ করা হয় নি। (আবুশ শুহাদা,পৃ. ৫৬)
৩। আল্লাহর ওলীদের কবরের উপর সৌধ নির্মাণ পবিত্র গৃহসমূহকে সমুন্নত রাখার নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত,মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে অনুমতি দিয়েছেন যেসকল গৃহে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয় তা সমুন্নত করার।
( فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَنْ تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ) (رِجَالٌ لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ)
“আল্লাহ যেসব গৃহকে (যাতে তাঁর নূর রয়েছে) মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এমন লোকেরা যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না।” (সূরা নূর: ৩৬-৩৭)
উপরিউক্ত আয়াত হতে আমাদের বক্তব্যের সপক্ষে দু’টি প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়।
প্রথমত উপরিউক্ত আয়াতে গৃহ বলতে শুধু মসজিদ বুঝানো হয়নি,বরং আয়াতের উদ্দেশ্য মসজিদসহ যে কোন স্থান যেখানে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়,যেমন নবিগণ ও তাঁদের স্থলাভিষিক্ত পবিত্র প্রতিনিধিদের গৃহ। এমনকি এ দাবীও সত্য যে,উপরিউক্ত আয়াতটিতে মসজিদ ভিন্ন অন্য গৃহের বা গৃহসমূহের কথা বলা হয়েছে। কারণ গৃহ বলতে যে কোন চার দেয়াল ও ছাদ বিশিষ্ট স্থানকে বুঝানো হয়। যেমন পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:
( وَلَوْلَا أَنْ يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَجَعَلْنَا لِمَنْ يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِنْ فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ)
“যদি সব মানুষের এক মতাবলম্বী (কাফের) হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত তবে যারা দয়াময়কে (আল্লাহকে) অস্বীকার করে তাদের গৃহসমূহের ছাদ ও সিঁড়িকে যা দ্বারা তারা উপরে যেত আমি রৌপ্য নির্মিত করে দিতাম।” (সূরা যুখরুফ : ৩৩)
উপরিউক্ত আয়াত হতে বোঝা যায় আরবী ভাষায় যে,কোন ছাদ বিশিষ্ট কক্ষকেই গৃহ ((بیت)) বলা হয়। তদুপরি হাদীসসমূহে বলা হয়েছে মসজিদ ছাদবিহীন হওয়া মুস্তাহাব। তাই উল্লিখিত আয়াতে গৃহ বলতে মসজিদ ভিন্ন অন্য গৃহের কথা বলা হয়েছে। উপরন্তু রাসূলের আহলে বাইতের সূত্রে ইমাম বাকির (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে,উপরিউক্ত আয়াতে গৃহ বলতে নবিগণ ও হযরত আলীর গৃহের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। (তাফসীরে আল বুরহান,বাহরানী,৩য় খণ্ড,পৃ. ১৩৭)
পবিত্র কাবাগৃহকে বাইতুল্লাহ্ বলা হয়,কারণ তার ছাদ রয়েছে।
দ্বিতীয়ত আয়াতে যে সমুন্নত করার কথা বলা হয়েছে তার দু’রকম অর্থ হতে পারে :
ক) গৃহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা দান যেমনটি আমরা এ আয়াতটিতে পড়ি
(وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا)
“আমরা তার মর্যাদাকে সমুন্নত করেছি।” (সূরা মারইয়াম : ৫৭)
খ) আয়াতের লক্ষ্য বাহ্যিক ও বস্তুগত উন্নয়ন অর্থাৎ ঐরূপ গৃহ বা স্থানের যেমন ওলীদের কবরের উপর সৌধ নির্মাণের মাধ্যমে গৃহ বা কবরকে উন্নীত করা।
জামাখশারী তাঁর তাফসীর গ্রন্থে বলেছেন : গৃহকে উন্নীত করার অর্থ গৃহের কাঠামোকে উচ্চ করা যেমনটি নিম্নোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে-
(وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ)
“(স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কাবাগৃহের ভিত্তিকে উন্নীত করেছিল।” অথবা কাবাগৃহের প্রতি মর্যাদা দেখানোও সম্মান প্রদর্শন।” (আল কাশশাফ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৯০)
তাফসীরে রুহুল বায়ানে বলা হয়েছে (أن ترفع) উন্নীত করার অর্থ উচ্চ করা অথবা সেগুলোর মর্যাদাকে বৃদ্ধি করা। (রুহুল বায়ান, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ১৫৮)
যদি আয়াতটিতে উন্নীত করার অর্থ বাহ্যিক ও কাঠামোগত উন্নয়নের কথা বলা হয়ে থাকে তবে তা সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর নবী ও ওলীদের কবরকে উন্নীত করণের দলিল হবে। বিশেষত যখন মহানবী (সা.) সহ তাঁর আহলে বাইতের কয়েকজন ইমাম তাঁদের গৃহেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন। আর যদি উন্নীত করণের অর্থ মর্যাদা দান ও অবস্তুগত উন্নয়ন হয়ে থাকে তবে তার অর্থ হবে নবী ও আল্লাহর ওলীদের গৃহ ও কবরসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্তে তা সংরক্ষন করা,সৌধ নির্মাণ ও তার মেরামত করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আল্লামা সুয়ূতী আনাস ইবনে মালিক ও কুরাইদা হতে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী (সা.) فی بیوت اذن أن ترفع আয়াতটি পাঠ করলে একব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল : ‘এখানে কোন গৃহসমূহের কথা বলা হয়েছে?’
রাসূল (সা.) বললেন : ‘নবিগণের গৃহসমূহ’। হযরত আবু বকর রাসূলকে তখন হযরত আলী ও ফাতিমার গৃহের দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করলেন : ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই গৃহটিও কি ঐসব গৃহের অন্তর্ভুক্ত,আল্লাহ ও আপনার দৃষ্টিতে যার প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করা উচিত।’তিনি বললেন: ‘এই গৃহটি ঐ গৃহসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।’ (দুররূল মানসূর,৫ খণ্ড,পৃ. ৫০)
প্রাথমিক যুগের অনুসরণীয় মুসলমানদের কর্ম ধারায় কবরের উপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ
ইসলামের ইতিহাসের প্রতি লক্ষ্য করলে আমরা দেখি,ইসলামের আবির্ভাবের যুগ থেকেই মুসলমানদের মধ্যে কবরের উপর সৌধ নির্মাণের প্রচলন ছিল এবং এ বিষয়টি কখনোই সাহাবী ও তাবেয়ীদের প্রতিবাদের মুখোমুখি হয় নি। ইতিহাসের পরিক্রমায় প্রথমবারের মত ওয়াহাবীরা এ রীতির বিরুদ্ধে মৌখিক ও ব্যবহারিকভাবে প্রতিবাদ শুরু করে। মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত এ রীতির কিছু উদাহরণ এখানে উল্লেখ করছি:
১। মুসলমানগণ রাসূলের পবিত্র দেহ মোবারককে ছাদ বিশিষ্ট গৃহে দাফন করেন। তখন থেকেই তা সাহাবাদের সম্মানের স্থান হিসেবে পরিগণিত হতো।
হুসাইন ইবনে আহমান ইবনে মুহাম্মদ যিনি আবিল খাজ্জাজ বাগদাদী নামে প্রসিদ্ধ তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীর একজন কবি যিনি হযরত আলীর প্রশংসায় রচিত উচ্চমানের কাসীদা যা তিনি তাঁর পবিত্র রওজার সন্নিকটে রচনা করেছেন তাতে আমিরুল মুমিনিনের কবরের উপর নির্মিত সাদা গুম্বুজের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন :
يا صاحب القبة البيضاء على النجف
من زار قبرك واستشفى لديك شفى
زوروا ابا الحسن الهادى لعلكم
تحظون بالاجر و الاقبال و الزلف
‘হে নাজাফের সাদা গম্বুজের অধিকারী,
যে আপনাকে জিয়ারত করে শাফা (আরোগ্য) চায় সে শাফা লাভ করে,
তোমরা হেদায়েতকারী আবুল হাসানের (আলীর) কবর জিয়ারত কর,
যাতে পুরস্কার,সৌভাগ্য ও নৈকট্যের অধিকারী হতে পার।’ (ওয়াফিয়াতুল আইয়ান,১ম খণ্ড,পৃ. ১৭০;আল মুনতাজাম,৭ম খণ্ড,পৃ. ২১৬,রওজাতুল জান্নাত,৩য় খণ্ড,পৃ. ১৪৮)
৩। বুখারী তাঁর সহীহ্তে বর্ণনা করেছেন যে,হাসান ইবনে হাসান ইবনে আলী (আঃ) মৃত্যুবরণ করলে তাঁর স্ত্রী তাঁর কবরের উপর ছাউনী দিয়ে তাঁর নিকট বসে একবছর নিয়মিত ক্রন্দন করেছিল। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানাযিয়া, হাদীস নং ৬২)
মোল্লা আলী কারী উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন: ‘বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় কবরের উপর ছাউনী এ উদ্দেশ্যে দেয়া হয়েছিল যে,যাতে করে তার বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তার কবরের নিকট এসে কোরআন তেলাওয়াত,জিকির করতে পারে এবং তার সঙ্গীরা তার জন্য দোয়া ও মাগফেরাত কামনার জন্য সেখানে যায়।’
৪। সাইয়্যেদ বাকরী বলেছেন : ‘কবরের উপর সৌধ নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা হতে নবিগণ,শহীদ ও সৎকর্মশীল বান্দারা বহির্ভূত।’ (ইয়ানাতুত তালেবীন,২য় খণ্ড,পৃ. ১২০)
৫। ইবনে শাবাহ বর্ণনা করেছেন,‘আকীল ইবনে আবি তালিব তার নিজগৃহে কূপ খনন করার সময় একটি পাথরের সন্ধান পান যাতে লেখা ছিল : এই কবরটি সাখর ইবনে হারবের কন্যা হাবীবার। আকীল তখন কবরটি ঢেকে দিয়ে তার উপর একটি গৃহ নির্মাণ করলেন।’ (তারিখুল মাদিনাতুল মুনাওয়ারাহ,১ম খণ্ড,পৃ. ১২০)
৬। সামহুদী হযরত হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের কবরের বর্ণনা দিয়ে বলেন : ‘তার কবরের উপর সুন্দর,মজবুত ও উঁচু একটি গম্বুজ রয়েছে. আব্বাসীয় খলিফা নাসিরুদ্দীনের (৫৭৫-৬২২) শাসনামলে তা নির্মিত হয়েছে। (ওয়াফাউল ওয়াফা,২য় খণ্ড দ্রষ্টব্য)
৭। ইবনে সা’দ তার তাবাকাত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন,‘উসমান ইবনে মাজউনের মৃত্যুর পর জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফনের পর রাসূল (সা.) তার কবরের উপর স্থায়ী কিছু স্থাপন করলেন এবং বললেন : ‘এটি তার কবরের চিহ্ন।’ (তাবাকাতে ইবনে সা’দ,৩য় খণ্ড,পৃ. ২৯১)
আমর ইবনে হাজম বলেছেন : ‘উসমান ইবনে মাজউনের কবরের নিকট উঁচু কিছু স্থাপিত দেখলাম যা প্রতীকের মত ছিল।’ (তাবাকাতে ইবনে সাদ,৩য় খণ্ড,পৃ. ২৮৯)
মুতাল্লাব বর্ণনা করেছেন,‘উসমান ইবনে মাজউনের মৃত্যু ও দাফনের পর মহানবী (সা.) নির্দেশ দিলেন পাথর জাতীয় কিছু আনার। একব্যক্তি ভারী একটি পাথর আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে মহানবী (সা.) আস্তিন গুটিয়ে পাথরটি উঠালেন ও উসমান ইবনে মাজউনের কবরের নিকট স্থাপন করলেন এবং বললেন : ‘তার কবরের চিহ্ন রাখতে চাই।’ (সুনানে আবি দাউদ,৩য় খণ্ড,পৃ. ২১১;আস সিরাতুল হালাবীয়া,২য় খণ্ড,পৃ. ৯৫)
৮। ইবনে সা’দ ইমাম বাকির (আ.) হতে বর্ণনা করেছে,‘রাসূলের কন্যা ফাতিমা হযরত হামজার কবরের নিকট যেতেন ও তা পরিপাটি ও সংস্কার করতেন।’ (তাবাকাতে ইবনে সাদ,২য় খণ্ড,পৃ. ১১৯)
৯। বুখারী বর্ণনা করেছেন যে,আবদুর রহমান ইবনে আবি বাকরের মৃত্যুর পর হযরত আয়েশা নির্দেশ দিয়েছিলেন তার কবরের উপর তাঁবু স্থাপনের এবং একজনের উপর তা দেখাশোনার দায়িত্ব আরোপ করেন। (সহীহ বুখারী,২য় খণ্ড,পৃ. ১১৯)
১০। হযরত উমর রাসূলের স্ত্রী জয়নাব বিনতে জাহাশের কবরের উপর তাঁবু নির্মাণের নির্দেশ দেন এবং কেউ তার এ কাজে বাধা দেয় নি। (তাবাকাতে ইবনে সাদ,৮ম খণ্ড,পৃ. ৮০)
ওয়াহাবীদের দলিল সমূহের পর্যালোচনা
ওয়াহাবিগণ কবরের উপর সৌধ নির্মাণ হারাম হওয়ার সপক্ষে যে দলিল উপস্থাপন করেছে আমরা এখানে তার উত্তর দান করব।
১। কবরের উপর সৌধ নির্মাণ শিরকের অন্যতম দৃষ্টান্ত অথবা শিরকের দিকে মানুষকে ধাবিত করে।
আমরা তাদের এ কথার জবাবে বলব : প্রথমত আমরা অন্যত্র তাওহীদ ও শিরকের আলোচনায় উল্লেখ করেছি শিরকের দু’টি দিক রয়েছে-মানুষ এমন কোন কাজ করবে যা কারো প্রতি অবনত হওয়ার পরিচায়ক এবং যার প্রতি অবনত হয় তার উপাস্য ও প্রতিপালক হওয়ার বিশ্বাস রাখে। শিরকের এই দু’টি স্তম্ভ ও দিক শিরক সম্পর্কিত আয়াত ও তার সংজ্ঞা হতে জানা যায়। এই দু’টি দিকের উপস্থিতি কবরের উপর সৌধ নির্মাণের মধ্যে নেই। কারণ যে ব্যক্তি নবী ও আল্লাহর ওলীদের মাজার ও সৌধকে সম্মান প্রদর্শন করে সে তাঁদের উপাস্য ও প্রতিপালক হওয়ার বিশ্বাস রাখে না।
দ্বিতীয়ত আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি যে কোন হারামের সকল প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কর্ম হারাম নয়,বরং যে প্রস্তুতি তাকে নিশ্চিত ভাবে হারামে ফেলে তাই শুধু হারাম। অর্থাৎ যদি কেউ শিরক করার উদ্দেশ্যেই কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করে তবেই তা হারাম হবে। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করে তবে তা হারাম তো হবেই না,বরং মুস্তাহাব বলে পরিগণিত হবে।
২। কবরের উপর সৌধ নির্মাণ মুশরিকদের কাজ! (মিনহাজুস সুন্নাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪)
উত্তর : প্রথমত মূর্তিপূজকরা (মুশরিকরা) তাদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করত এ বিশ্বাসে যে তারা তাদের প্রভু ও প্রতিপালক। (আমরা অন্যত্র এ বিষয়ে আলোচনা করেছি) এ কারণেই ইসলাম তাদের সমালোচনা করেছে কিন্তু মুসলমানরা এরূপ বিশ্বাস নিয়ে তাদের মৃতদের কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করে না। (আবি মালিকী,মাকালাতুল কাউসারী,পৃ. ১৪৬,শারহে সহীহ মুসলিম সূত্রে বর্ণিত ২য় খণ্ড,পৃ. ২৩৪)
দ্বিতীয়ত কাফের বা মুশরিকদের সাথে যে কোন প্রকার মিল থাকলেই তা হারাম হতে পারে না। যদি তা এমন কোন বিষয় হয় যা কেবলমাত্র তাদের মধ্যেই প্রচলিত এবং তাদের ধর্ম ও আচারসমূহকে পুনর্জীবন দানের লক্ষ্যে করা হয় তবেই তা হারাম বলে বিবেচিত। আমরা ‘উৎসব পালন’ সম্পর্কিত পরবর্তী আলোচনায় এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
৩। কবরের উপর সৌধ নির্মাণ নিষিদ্ধ বিদআতী কাজ?
উত্তর : আমরা অন্যত্র সুন্নাত ও বিদআতের মধ্যকার পার্থক্যের আলোচনায় উল্লেখ করেছি বিদআতের দু’টি মৌলিক দিক রয়েছে তা হলো ধর্মের মধ্যে কম বা বেশি করা এবং সে বিষয়টি নতুন কিছু হওয়া যার সপক্ষে সাধারণ বা বিশেষ কোন শারয়ী দলিল নেই। কিন্তু কবরের উপর সৌধ নির্মাণের বৈধতার বিষয়ে একদিকে বিশেষ দলিল রয়েছে যেমন সুন্নাত ও মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত রীতি অন্যদিকে সর্বজনীন বৈধতার দলিলও রয়েছে।
৪। কবরের উপর সৌধ নির্মাণের নিষিদ্ধতার বিষয়ে আলেমদের মধ্যে সর্বজনীন ঐকমত্য রয়েছে:
জান্নাতুল বাকীতে বিদ্যমান সৌধসমূহের ব্যাপারে সৌদী রাজদরবারের প্রশ্নের জবাবে মদীনা শরীফের ওয়াহাবী আলেমগণ বলেছেন : ‘আলেমদের সর্বসম্মত মত হচ্ছে কবরের উপর সৌধ নির্মাণ নিষিদ্ধ। কারণ তার নিষিদ্ধতার বিষয়ে সহীহ্ হাদীসসমূহ রয়েছে.।’ (জারীদাতু উম্মুল কোরা,তারিখ ১৭ই শাওয়াল,১৩৪৪ হিজরী। (উম্মুল কোরা পত্রিকা)
উত্তর : প্রথমত দাবীকৃত ইজমা বা আলেমদের ঐকমত্যের বিষয়টি হাদীস নির্ভর। আমরা পরবর্তীতে এ সম্পর্কিত হাদীসগুলো নিয়ে আলোচনা করব। হাদীস নির্ভর ইজমার ক্ষেত্রে যদি উপস্থাপিত হাদীস দুর্বল হয় তবে সেই ইজমার কোন মূল্য থাকে না।
দ্বিতীয়ত দাবীকৃত ইজমাকে আমরা সম্ভাব্য তিন ভাগে ভাগ করতে পারি:
ক) ইজমায়ে তাকদীরি (বিষয়বস্তু ভিত্তিক ইজমা) : এরূপ ইজমায় কয়েকটি হাদীসের বিষয়বস্তু হতে ধারণার ভিত্তিতে ফতোয়া দেওয়া হয়। এরূপ ইজমা অগ্রহণযোগ্য। কারণ যে সকল হাদীসের ভিত্তিতে ফতোয়া দেওয়া হবে তার সনদ ও দালালাতের (সূত্র ও বিষয়বস্তু) বিশুদ্ধতার উপরও ফতোয়া নির্ভরশীল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে উভয় দৃষ্টিতেই তা অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত।
খ) ইজমায়ে মুহাক্কাক (প্রতিষ্ঠিত ইজমা) : প্রতিষ্ঠিত ইজমা হলো সকল আলেম ঐ বিষয়ে একমত যে,তা হারাম ও নিষিদ্ধ। কবরের উপর সৌধ নির্মাণ যেমন হারাম তা বিদ্যমান রাখাও হারাম এ উভয় ক্ষেত্রে তারা একমত। প্রতিষ্ঠিত ইজমার সম্ভাবনাও এক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য। কারণ অধিকাংশ আলেম সর্বজনীনভাবে কবরের উপর সৌধ নির্মাণের বিষয়ে কথা বলেছেন অথবা আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু আল্লাহর ওলীদের কবর নিয়ে।
আমরাও আল্লাহর ওলী ভিন্ন সাধারণ মুমিনদের কবরের উপর সৌধ নির্মাণের বিষয়টি মাকরূহ হওয়ায় বিশ্বাসী। দ্বিতীয়ত অধিকাংশ আলেম সৌধ নির্মাণের বিষয়টিকে নিষিদ্ধ বলেন না,বরং তারা মাকরূহ বলে মনে করেন এমনকি কেউ কেউ মাকরূহ হওয়ার বিষয়টি সমর্থন করেন না।
যারা হারাম হওয়ার বিষয়টি সমর্থন করেন না :-
১। আবদুর রহমান জাযিরী বলেছেন : ‘কবরের উপর গম্বুজ বা সৌধ নির্মাণ মাকরূহ।’ (আলফিকহ আলা মাজাহিবিল আরবায়া,১ম খণ্ড,পৃ. ৪২১)
২। নাভাভী শারহে সহীহ মুসলিম গ্রন্থে বলেছেন,‘যদি কোন কবর ঐ ব্যক্তির মালিকানাধীন স্থানে হয় তবে তার উপর সৌধ নির্মান মাকরূহ। যদি জনসাধারণের চলার পথে অবস্থিত হয় তবে তা নির্মাণ হারাম।’ (নাভাভী,শারহে সহীহ মুসলিম,৭ম খণ্ড,পৃ. ২৭,কিতাবুল জানায়িয)
৩। মালিকী মাজহাবের প্রধান জনাব মালিক ইবনে আনাস হতে বর্ণিত হয়েছে,‘কবরের উপর সৌধ নির্মাণ ও চুনকাম করা আমার মতে মাকরূহ।’ (মাকালাতুল কাউসারী,পৃ. ২৪৭;(আল মুদাভভিনাতুল কুবরা,১ ম খণ্ড,পৃ. ৯০ উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত)
৪। শাফেয়ী বলেছেন,‘আমি পছন্দ করি কবরের উপর সৌধ নির্মিত ও তাতে চুনকাম করা না হোক। কারণ এটি কবরের সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্দেশ্যে করা হয় অথচ কবর সৌন্দর্য ও অলংকৃত করার স্থান নয়।’
৫। ইবনে হাজাম বলেছেন,‘যদি কোন কবরের উপর সৌধ বা স্তম্ভ নির্মাণ করা হয় তাতে কোন অসুবিধা নেই।’ (আল মুহাল্লা,৫ম খণ্ড,পৃ. ১৩৩)
৬। জনাব নাভাভী কবরের উপর সৌধ নির্মাণ মাকরূহ বলেছেন কিন্তু তিনি বলেছেন,আবু হানিফার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে,তিনি মাকরূহ মনে করেন না। (আল মাজমু,৫ম খণ্ড,পৃ. ২৯৮)
কবরের উপর সৌধ নির্মাণের বিষয়ে যে মাকরূহ ফতোয়া দেয়া হয়েছে তা মূলত সাধারণ মুমিনদের কবরের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে কিন্তু আল্লাহর ওলিগণের কবর এ সাধারণ নীতির ব্যতিক্রম।
আবদুল গণি নাবলসী তাঁর ‘আল হাদীকাতুন্নাদীয়া’ গ্রন্থে বলেছেন,‘কবরের নিকট মোমবাতি জ্বালানো ও তা আলোকিত করা মাকরূহ এজন্য যে,তা নিরর্থক তবে তা যদি কোন ভাল উদ্দেশ্যে যেমন… কোন আল্লাহর ওলী বা সম্মানিত বিশেষ আলেমের রুহের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের লক্ষ্যে করা হয় তবে তাতে অসুবিধা নেই।’(আল হাকিকাতুন নাদীয়া,২য় খণ্ড,পৃ. ৬৩০)
গ) ইজমার অর্থ এখানে মুসলমানদের অনুসৃত সর্বজনীন রীতি যা রাসূলের ইন্তেকালের সময় হতে বর্তমান পর্যন্ত প্রচলিত রয়েছে। আমরা পূর্বেই প্রমাণ করেছি মুসলমানদের সর্বজনীন অনুসৃত রীতি এর বিপরীত বিষয়কে প্রমাণ করে। কারণ মুসলমানদের ইতিহাসের উপর চোখ বুলালে আমরা দেখি কবরের উপর সৌধ নির্মাণ তাদের সর্বকালীন অনুসৃত রীতি।
৫। কবরের উপর সৌধ নির্মাণের নিষিদ্ধতার পক্ষে উপস্থাপিত হাদীসসমূহ :
কবরের উপর সৌধ নির্মাণের নিষিদ্ধতার বিষয়ে আহলে সুন্নাতের সূত্রে উদ্ধৃত ওয়াহাবীদের হাদীসভিত্তিক দলিলগুলো নিয়ে এখানে আমরা আলোচনা করব।
১। আবিল হায়াজের হাদীস : সহীহ্ মুসলিম ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া,আবু বকর ইবনে আবি শাবি এবং জুহাইর ইবনে হারব ওয়াকী হতে,তিনি সুফিয়ান হতে,তিনি হাবীব ইবনে আবি সাবিত হতে,তিনি আবি ওয়ায়িল হতে তিনি আবিল হায়াজ আসাদী হতে বর্ণনা করেছেন,হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) তাকে বলেছেন : ‘তোমাকে এমন কাজে পাঠাবো যা করতে মহানবী (সা.) পাঠিয়েছিলেন এবং তা হলো যে কোন মূর্তিই (ভাস্কর্যই) পাও না কেন তা ধ্বংস করবে এবং যে কোন অসমতল এবং উচ্চ কবর পাবে তা সমতল করবে।’(সহীহ মুসলিম,৩য় খণ্ড,পৃ. ১,কিতাবুল জানায়িয)
হাদীসটি সনদ ও দালালাতের দিক থেকে দুর্বল ও জায়িফ হিসেবে পরিগণিত।
ক) সনদের মূল্যায়ন : বর্ণনাকারী কয়েকজন রাবী দুর্বল বলে ঘোষিত হয়েছেন। যেমন,ওয়াকী ইবনে জাবরা,ইবনে মালিহ্ রাওয়াসী কুফীকে অনেকেই দুর্বল বর্ণনাকারী বলেছেন। (তাহজীবুত তাহজীব,১১তম খণ্ড,পৃ. ১২৩)
সুফিয়ান ইবনে সাঈদ ইবনে মাসরুফ সাওবী কুফী যাকে ইবনে হাজার ও যাহাবী হাদীসের সনদ জালকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন অর্থাৎ যে বর্ণনাকারীকে সে দেখে নি তার নামে হাদীস বর্ণনার দাবী সে করত। (তাহজীবুত তাহজীব,৪র্থ খণ্ড,পৃ. ১১৫)
হাবীব ইবনে আবি সাবিত কাইস ইবনে দিনার সম্পর্কেও একই অভিযোগ রয়েছে। (তাহজীবুত তাহজীব,৪র্থ খণ্ড,পৃ. ১৭৯)
আবু ওয়ায়িল আসাদী হযরত আলীর বিরোধী ছিল। (তাহজীবুত তাহজীব,৪র্থ খণ্ড,পৃ. ৩৬২) সে কুফায় আবদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের সহযোগী ছিল এবং তার অত্যাচার ও লুটপাটের ইতিহাস কারো নিকট অজানা নয়।
আবুল হায়াজ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ নন। এ কারণে আল্লামা সুয়ূতী সুনানে নাসায়ীর ব্যাখ্যাগ্রন্থেও টীকায় বলেছেন,‘হাদীস গ্রন্থসমূহে এ হাদীসটি ছাড়া অন্য কোন হাদীস তার হতে বর্ণিত হয় নি এবং ইবনে হাব্বান ব্যতীত অন্য কেউই তাকে বিশ্বস্ত বলেন নি। ইবনে হাব্বান সাধারণত অজ্ঞাত রাবীদের বিশ্বস্ত বলার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ।
হাদীসবিদ আজলীও তাকে বিশ্বস্ত বলেছেন যিনি তাবেয়ীদের গড়পড়তা হারে বিশ্বস্ত বলেছেন এ কারণে যে,তাদের প্রতি তার বিশেষ ভাল ধারণা ও সুদৃষ্টি ছিল। (আল্লামা বাছরুদ্দীন হাওসী রচিত জিয়ারাতুর কুবুর গ্রন্থ দ্রষ্টব্য)
খ) দলিলের নির্ভরযোগ্যতা : উল্লিখিত হাদীসটিতে দলিলের দৃষ্টিতেও অনেকগুলো সমস্যা রয়েছে।
১। হাদীসের সনদ বর্ণনার বিষয়বস্তুতে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন একটি হাদীসে আবিল হায়াজ বলেছে,‘হযরত আলী আমাকে বলেছেন’,অন্য হাদীসে আবি ওয়ায়িল বর্ণনা করেছে,‘আলী আবিল হায়াজকে বলেন’,অন্যত্র বলেছে,‘আলী আবিল হায়াজকে বলেন,আমি অবশ্যই তোমাকে প্রেরণ করব। আমরা জানি হাদীসের সনদ ও বিষয়বস্তু বর্ণনার ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলে তা হাদীসের নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে।
২। হাদীসটিতে পৃথিবীর সকল পাকা কবর ভাঙ্গার ও ধ্বংস করার কথা বলা হয় নি,বিশেষ বিষয়ে তাকে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সম্ভবত কবরগুলো মুশরিকদের (মূর্তিপূজক) ছিল এবং তারা সেখানে উপাসনার জন্য যেত এ কারণে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। যদি ধরেও নেই তা মুসলমানদের কবর ছিল তদুপরি তার সঙ্গে আল্লাহর ওলীদের কবরের কোন সম্পর্ক নেই;কারণ তাঁদের কবর আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁদের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে অধিক মনোযোগী হওয়ার লক্ষ্যে নির্মিত হয়ে থাকে যার মধ্যে শিরক ও অংশীদারিত্বের কোন সম্পর্ক নেই।
৩। আভিধানিকগণ (تسویه) শব্দটি যদি কোন সহযোগী শব্দ ছাড়া একাকী উল্লিখিত হয় তবে তার অর্থ শুধুই সমতল করা। এই হাদীসটিতে শব্দটি এভাবেই এসেছে,ফলে অনুরূপ অর্থই শুধু প্রকাশ করে না। কারণ হাদীসটিতে বলা হয় নি ভূমি সমতল কর। তাই হাদীসটির অর্থ হবে বক,মাছের বা উটের পিঠের ন্যায় কবরসমূহকে সমতল করে দাও। কারণ কোন কোন হাদীসে এসেছে শহীদদের কবরসমূহ সে সময় উটের পিঠের ন্যায় উঁচু ছিল। (কানজুল উম্মাল,১৫তম খণ্ড,পৃ. ৭৩৬,হাদীস নং ৪২৯৩২)
৪। হাদীসটিতে কবরের উপর নির্মিত ছাদ,দেয়াল ইত্যাদি ধ্বংস করার কোন কথাই আসে নি।
৫। উপরন্তু উপরিউক্ত হাদীসটি ইসলামের ইতিহাসের সকল পর্যায়ে মুসলিম মনীষী ও আলেমদের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য ছিল এবং তারা এর উপর আমল করেন নি। এ কারণে হাদীসটি পালনীয় নয়।
২। জাবির হতে বর্ণিত হাদীস : মুসলিম আবু বাকর ইবনে শাইবা হতে,তিনি হাফস ইবনে গিয়াম হতে,তিনি জাবির হতে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী (সা.) কবরের উপর চুনকাম করা,কিছু লেখা ও সৌধ নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ মুসলিম,৩য় খণ্ড,পৃ. ৬২) একই ভাবার্থে কয়েকটি হাদীস বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এ হাদীসগুলোতে বেশ কিছু দুর্বলতা রয়েছে যে কারণে নির্ভরযোগ্যতা হারিয়েছে।
প্রথমত এ সম্পর্কিত হাদীসগুলোর মধ্যে সবকটিতেই উপরিউক্ত তিন রাবী অর্থাৎ জাবির,আবুজ জুবাইর ও ইবনে জুরাইহ একত্রে অথবা এককভাবে রয়েছেন অর্থাৎ কেবল তারাই এককভাবে অথবা এককসূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার বলেছেন,ইয়াহিয়া ইবনে মুঈনকে ইবনে জুরাইহের হাদীসটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে বলেন যে,তার বর্ণিত সকল হাদীস জায়িফ (দুর্বল)।’ (তাহজীবুত তাহজীব,৬ষ্ঠ খণ্ড,পৃ. ৪০৬)
আহমাদ ইবনে হাম্বাল হতে ইবনে জুরাইহ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে,সে মুনকার (মশহুর (প্রসিদ্ধ) হাদীসের বিপরীতে অবিশ্বস্ত রাবীদের হতে বর্ণিত বিরল হাদীস) হাদীস বর্ণনা করে। (তাহজীবুত তাহজীব,৩য় খণ্ড,পৃ. ৪০৬)
মালিক ইবনে আনাস তার সম্পর্কে বলেছেন,‘ইবনে জুরাইহ ঐ ব্যক্তির সাথে তুলনীয় যে রাত্রে জ্বালানী কাঠ সংগ্রহে লিপ্ত অর্থাৎ সে সবধরনের (সহীহ্ ও দুর্বল) হাদীস বর্ণনা করে।’ (তাহজীবুত তাহজীব,৩য় খণ্ড,পৃ. ৪০৬)
আবুজ জুবাইর সম্পর্কেও বর্ণিত হয়েছে সে দুর্বল হাদীস বর্ণনাকারী। আহমাদ ইবনে হাম্বাল আইয়ুব হতে বর্ণনা করেছেন যে,আবুজ জুবাইর দুর্বল বর্ণনাকারী।
শোবা বলেছেন,‘আবুজ জুবাইর ঠিক মতো নামাজ পড়তো না এবং সে অন্যদের উপর অপবাদ আরোপ করে থাকে।’
আবু হাতেম রাজী বলেছেন,‘তার বর্ণিত হাদীস লিখতে অসুবিধা নেই তবে তা প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করা যাবে না।’ (তাহজীবুত তাহজীব,আবুজ জুবাইর অনূদিত)
দ্বিতীয়ত জাবির বর্ণিত হাদীসটির বিভিন্ন বর্ণনায় চরম অমিল রয়েছে। কারণ জাবির হতে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় কবরে চুনকাম করা ও তার উপর ভর দেয়া হতে নিষেধ করা হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় কবরে চুনকাম করা,লেখা,সৌধ নির্মাণ,হাঁটা-চলা করা হারাম বলা হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় এগুলো ছাড়াও কবর জিয়ারত হারাম বলা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এত ব্যাপক ভিন্নতা হাদীসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে শূণ্যের কোঠায় নিয়ে আসে।
তৃতীয়ত যদি ধরে নেই হাদীসের সনদের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা নেই এবং বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রেও কোন ভিন্নতা নেই ও হাদীসে কেবলমাত্র কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করতে নিষেধ করেছে কিন্তু হাদীসে হারাম হওয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা নেই। কারণ নিষেধ দু’প্রকারের (১) কোন কাজ অপছন্দনীয় (মাকরূহ) হওয়ার কারণে নিষেধ করা হয়েছে যা ইসলামের অনেক বিধানের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। (২) হারামের নিষেধাজ্ঞা,যদিও সাধারণত নিষেধাজ্ঞা হারামের প্রতিই ইঙ্গিত করে কিন্তু উপরিউক্ত হাদীসটি হতে ফকীহ ও আলেমগণ হারাম নয়,বরং মাকরূহ হওয়ার সম্ভাবনাকেই গ্রহণ করেছেন। এ কারণেই আমরা দেখি তিরমিযী তাঁর সহীহ্ গ্রন্থে উপরিউক্ত হাদীসটিকে ‘কবরের উপর সৌধ নির্মাণ মাকরূহ’ শিরোনামের অধীনে এনেছেন। সহীহ্ ইবনে মাজার একজন ব্যাখ্যাকারী হাকিম নিশাবুরী হতে বর্ণনা করেছেন যে,এ কারণেই মুসলমানদের মধ্যে কেউই এ হাদীসটির উপর আমল করেন নি।
যদি ধরেও নিই এ হাদীস হতে বাহ্যিকভাবে বিষয়টি মাকরূহ হওয়া প্রমাণিত হয় তদুপরি যখন বিষয়টি আল্লাহর ওলীদের ক্ষেত্রে হবে তখন তাঁর নিদর্শনকে পুনর্জ্জীবিতকরণ ও সম্মান প্রদর্শনের আওতায় তা মাকরূহ থাকবে না,বরং মুস্তাহাব হয়ে যাবে।
এমতাবস্থায় কি করে ওয়াহাবীরা এ সকল হাদীসের ভিত্তিতে এ বিষয়টিকে হারাম ঘোষণা করে কবরের উপর সৌধ নির্মাণকারীকে মুশরিক বলে অভিহিত করার সাহস পাচ্ছে?
৩। আবু সাঈদ খুদরী ও উম্মে সালামার হাদীস : ওয়াহাবীরা অপর যে দু’টি হাদীসকে তাদের ফতোয়ার সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে তার একটি হলো আবু সাঈদ খুদরী বলেছেন,‘মহানবী (সা.) কবরের উপর সৌধ র্নিমাণ করতে নিষেধ করেছেন।’ (সুনানে ইবনে মাজা,১ম খণ্ড,পৃ. ৪৭৪) অপর হাদীসটি হলো উম্মে সালামা বলেছেন,‘রাসূল (সা.) কবরের উপর সৌধ নির্মাণ চুনকাম করতে নিষেধ করেছেন।’
প্রথম হাদীসটিতে একজন অপরিচিত রাবীর উপস্থিতির (যার বিশ্বস্ততার বিষয়ে কোন প্রমাণ নেই) কারণে তার নির্ভরযোগ্যতা থাকে না।
দ্বিতীয় হাদীসটিতে আবদুল্লাহ্ ইবনে লাহিয়া রয়েছে যার সম্পর্কে যাহাবী ইবনে মুঈন হতে বলেছেন যে,সে দুর্বল এবং তার বর্ণিত হাদীসের উপর নির্ভর করা যায় না। তাছাড়া ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ হতেও বর্ণিত হয়েছে যে,তিনি ইবনে লাহিয়াকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।
৬। জান্নাতুল বাকীর কবরস্থানটি ওয়াক্ফ সম্পত্তি:
ওয়াহাবীরা জান্নাতুল বাকীতে অবস্থিত আহলে বাইতের ইমামদের কবরের চিহ্নসমূহকে ধ্বংস করার সপক্ষে এ যুক্তি উপস্থাপন করে যে,জান্নাতুল বাকীর কবরস্থান ওয়াক্ফ সম্পত্তি এবং ইমামদের কবরের উপর নির্মিত গম্বুজসমূহ ওয়াকফের নীতির পরিপন্থি। তাই মুসলমানদের নেতার (কতৃত্বশীল ব্যক্তির) উচিত তা ধ্বংস করা।
তাদের এ যুক্তির বিরুদ্ধে আমাদের বক্তব্য হলো : প্রথমত কোন হাদীস ও ইতিহাসের গ্রন্থেই উল্লিখিত হয় নি যে,বাকীর কবরস্থান ওয়াক্ফ সম্পত্তি। কারণ এ সময় মদীনা ও হিজাযের অন্যান্য স্থানের ভূমির এত মূল্য ছিল না যে কেউ তা ওয়াক্ফ করবে।
দ্বিতীয়ত সামহুদী হতে বর্ণিত হয়েছে বাকীতে যে স্থানে ইমামদের কবর রয়েছে তা হযরত আলীর ভ্রাতা আকীল ইবনে আবি তালিবের নিজস্ব ঘর ছিল। সামহুদী বলেছেন,‘আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের কবর ফাতিমা বিনতে আসাদ ইবনে হাশেমের কবরের পাশে অবস্থিত এবং তিনি আকীলের গৃহে কবরস্থ হয়েছিলেন।’২২৮ এতদসত্বেও ওয়াহাবীরা সম্পত্তিটি ওয়াক্ফ হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে আহলে বাইতের পবিত্র ইমামদের কবরের গম্বুজগুলোকে ধ্বংস করেছে।

