ইয়াসীর আরাফাত হিন্দি
ওয়াহাবিবাদের জন্মকথা
অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নজদের বুকে জন্ম নেয় ওয়াহাবি আন্দোলন। ওয়াহহাব শব্দটি আল্লাহ তাআলার একটি গুণবাচক নাম।
তবে ওয়াহাবি আন্দোলনের নামকরণ করা হয় মতাদর্শটির জনক মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদির পিতা আবদুল ওয়াহহাবের নামানুসারে। এ নামের উৎপত্তি কোথায়, কিভাবে হয়েছিল তা সম্পর্কে যথাযথভাবে কিছু জানা যায় না। ইতিহাস থেকে আন্দোলনটি ওয়াহাবি নামে নামকরণের হেতু সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ওয়াহাবি মতাদর্শীদের একটি দাবি হলো, মতাদর্শটির বিরোধী মত পোষণকারীরা এ আন্দোলনকে ওয়াহহাবি নামে নামকরণ করেছিল। কিন্তু এটা সঠিক তথ্য নয়। কারণ, আমরা ওয়াহাবি মতাদর্শ সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে গিয়ে দেখেছি, ওয়াহাবি মতাদর্শের প্রণিধানযোগ্য ব্যক্তিত্বরা নিজেদের ওয়াহাবি নামে নামকরণ করেছেন। যেমন, এককালে ওয়াহাবি মতাদর্শী ইমাম সুলায়মান ইবনে সাহমান তাঁর ওয়াহাবি থাকাকালে লেখা একটি গ্রন্থের নাম দিয়েছেন ‘আল-হাদিয়াতুস সুন্নিয়া ওয়াত তুহফাতুল ওয়াহহাবিয়াহ।’ গ্রন্থটি তিনি ওয়াহাবি মতাদর্শীদের জন্য গ্রন্থনা করেন। সেহেতু ওয়াহাবি নামটি বিরোধীদের দেওয়া কথাটি অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন। জন্মলাভের পর মতাদর্শটি নজদ থেকে ধীরে ধীরে পবিত্র হিজাজের নন্দনকানন পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে জাজিরাতুল আরবের কিছু অংশে।
নজদির নেতৃত্বে একদল ওয়াহাবি আরবের বুকে তথাকথিত তাওহিদ প্রতিষ্ঠার জিকির তুলে ঘোষণা দেয়, পবিত্র আরব ভূমিতে তাওহিদের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। আরব ভূমি পরিণত হয়েছে কুফুর ও শিরকের আঁতুড়ঘরে। সেখানকার মানুষজন জাহিলি যুগের আঁধারে নিমজ্জিত হয়ে পরিণত হয়েছে কাফির এবং মুশরিকে। তারা লিপ্ত হয়েছে পীর পূজা এবং মাজার পূজাতে। নজদির বইয়ে কিছু জায়গায় আরবের তদানীন্তন মুসলিম-যারা তাঁর সংজ্ঞায় মুশরিক ছিল- তাদের ইসলামপূর্ব জাহিলি যুগের মুশরিকদের থেকেও নিকৃষ্ট মুশরিক হিসেবে দেখিয়েছেন। ওয়াহাবিদের মতে, মতাদর্শ ও তাওহিদের সংজ্ঞা তারা যা নির্ধারণ করেছে তার বাইরে যারা যাবে, তারা হলো মুশরিক ও কাফির এবং তাদের উপর কুফফারদের ব্যপারে শরিয়তে আসা বিধান কার্যকর করতে হবে। কাজেই এসব পীর ও মাজারপূজারি মুশরিকের বিনাশ ঘটিয়ে আরবে নতুন করে ওয়াহাবি তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তাদের মতে, এতদিন মানুষ যে তাওহিদ জেনে এসেছে, যে তাওহিদের ওপর বড় বড় ইমাম গবেষণা, সত্যায়ন ও বিশ্বাস রেখে এসেছেন, সেই তাওহিদ ইনভ্যালিড। প্রকৃত তাওহিদ হলো, ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের সংজ্ঞায়িত তাওহিদ। সুতরাং যে এর বিরোধিতা করবে, সে কাফির হয়ে যাবে; তার ওপর কাফিরদের হুকুম কার্যকর হবে-যদিও সে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং কালিমার ওপর ঈমান রাখে। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের সমসাময়িক নজদের বিখ্যাত বিখ্যাত হাম্বলী ইমামগণ এ বিষয়টি তাঁদের গ্রন্থাবলী ও রসায়েল তথা পত্রাবলীতে সত্যায়িত করেছেন। এঁদের মধ্যে নজদের বিশিষ্ট হাম্বলী ইমাম আব্দুল্লাহ আয যুবাইরী আল হাম্বলী রাহিমাহুল্লাহ প্রণীধানযোগ্য। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আস সাওয়ায়িক ওয়ার রুয়ূদ’ গ্রন্থের ১১৯ পৃষ্ঠাতে উপরোক্ত বিষয়ে আলোকপাতপূর্বক উল্লেখ করেছেন যে, যারা ওয়াহাবিদের বিরুদ্ধাচরণ করত, ওয়াহাবিরা তাদেরকে নিকৃষ্টতম জাতি হিসেবে পরিগণিত করত।
তারা তাদের মতাদর্শের বিরোধীদের মুশরিক হিসেবে গণ্য করত। ওয়াহাবি মতাদর্শী ঐতিহাসিক ইবনে গন্নাম তাঁর ‘তারিখু নজদ’ গ্রন্থে নজদের বিশিষ্ট হাম্বলী আলিম হযরত সুলাইমান ইবনে সুহাইম এঁর একটি পত্র নকল করেছেন; যেখানে তিনি ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের বিষয়ে লেখেন, “যে ব্যক্তি সে (মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব) যা বলত তার সবটুকুর সাথে সহমত পোষণ না করত এবং তা সত্য বলে সাক্ষ্য না দিত, তাকে সে তাকফীর করত।” (তারীখু নজদ, পৃষ্ঠা: ২৭১)
তারা তদানীন্তন ওয়াহাবি নন এমন মুসলিমদিগকে তাকফির করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা তাদের সাথে মুশরিকীনদের অনুরূপ ব্যবহার করত, বরং তার থেকেও অধিক বর্বরতা প্রদর্শন করত। তাদের উন্মুক্ত তরবারি কচুকাটা করতো আবালবৃদ্ধবনিতা সবাইকে। এমনকি মুসলিম রণাঙ্গনে মুসলিম রমনীদের পেট চিরে গর্ভপাত করানো হত। ইমাম আব্দুল্লাহ আল হাম্বলী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা শিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল হত না আর না তারা বয়োঃজ্যেষ্ঠগণকে শ্রদ্ধা করত। ” (আস সাওয়াইকু ওয়ার রুযুদ, পৃষ্ঠা: ১১৯)
তিনি বলেন, “ওয়াহাবিরা গর্ভবতী রমনীদিগের পেট চিরে ফেলত এবং তার সন্তানকে বের করে ফেলত ও তাকে বর্শার ফলায় উঁচু করে ধরত।”১৯ ওয়াহাবিদের বর্বরতার বর্ণনে তদানীন্তন নজদের বিখ্যাত আলিম ও মুজাদ্দিদ ইমাম ইবনে ফাইরূয আল হাম্বলী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ওয়াহাবিরা মুসলিমদের সন্তান সন্ততিকে দাসে পরিণত করেছিল ও তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল।” (আর রদ্দু আলা মান কাফফারা আহলার রিয়াদ্ব ওয়া মান হাওলাহুম মিনাল মুসলিমীন, পৃষ্ঠা: ২৬)
এভাবে ওয়াহাবিরা তাওহিদ ও দীনের মধ্যে বিকৃতি সাধনের মাধ্যমে মক্কা-মদিনাসহ সমগ্র মুসলিমবিশ্বকে কাফির-মুশরিক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে, যেন তারা নজদের মরুসাগরে নতুন ধর্ম নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
ওয়াহাবিরা তাদের এ উগ্র ও বাতিল চিন্তা-চেতনা দ্বারা মূলত রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একটি সহিহ হাদিস মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিল, যে হাদিস ওয়াহাবিদের সকল ভ্রান্ত দাবির ঘাড়ে উন্মুক্ত তরবারিস্বরূপ। সহিহ মুসলিমে সহিহ সনদে একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إن الشيطان قد ينس أن يعبده المُصَلُّون في جزيرة العرب ولكن في التحريش بينهم
“নিঃসন্দেহে শয়তান এ ব্যপারে নিরাশ হয়েছে যে, আরব উপদ্বীপের মুসল্লিরা (মুসলিমরা) তার উপাসনা করবে; কিন্তু তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঝগড়া বিবাদ থাকবে (এ ব্যপারে নিরাশ হয়নি)।” (মিশকাতুল মাসাবিহ: ৬৫)
উক্ত হাদিস থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আরবের মুসলিমরা কখনো শয়তানের উপাসনা তথা শিরকে আকবরের দিকে ফিরে যাবে না। একজন মুসলিমের জন্য ওয়াহাবি মতাদর্শ বাতিল প্রমাণের ক্ষেত্রে এ হাদিসটি যথেষ্ট। কারণ, যদি হাদিসটি সত্য হিসেবে ধরা হয়, তবে ওয়াহাবিরা আরবদের শিরকে নিমজ্জিত হওয়ার সকল দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হবে, তাদের মতাদর্শ বাতিল প্রমাণিত হবে আর তাদের কর্তৃক আরবের মুসলিমদের আমভাবে তাকফির ও হত্যা করা জুলুম হিসেবে প্রমাণিত হবে। পক্ষান্তরে যদি ওয়াহাবিদের দাবিগুলো সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয় তাহলে -নাউজুবিল্লাহ- এটা বলতে হয় যে, রাসূলুল্লাহ মিথ্যা বলেছেন।
ওয়াহাবি বিপ্লব প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে মক্কার শাফিয়ি মাজহাবের তখনকার মক্কার গ্র্যান্ড মুফতি জাইনি দাহলান র. বলেছেন,
‘মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের দাবিসমূহের একটি হচ্ছে, তিনি একটি নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছেন, যেমনটা তাঁর কথাবার্তা, কাজকর্ম এবং সার্বিক অবস্থায় প্রকাশ পাচ্ছে। আর এ কারণে তিনি আমাদের নবী র দীন থেকে কুরআন ছাড়া অন্যকিছু গ্রহণ করছেন না। একই সঙ্গে তিনি কেবল কুরাআনের বাহ্যিক অংশগ্রহণ করে থাকেন, যাতে জনসমাজ তাঁর বিষয়টি জানতে না পারে।” (খুলাসাতুল কালাম ফি বায়ানি উমারায়িল বালাদিল হারাম মিন জামানি সাইয়িদিনান নবী সা. ইলা ওয়াকতিনা হাজা বিত তামাম: ৩০৪)
দীনের মধ্যে ওয়াহাবিদের বিকৃতি, তাওহিদের ভুল ব্যাখ্যা, শিরক ও বিদআতের ভুল সজ্ঞায়ন আর সেগুলো দিয়ে গোটা উম্মতে মুসলিমাকে তাকফির করাটা তদানীন্তন সময়ের আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বরেণ্য উলামা এবং ইমামরা সুনজরে দেখেননি। তারা ওয়াহাবিদের এমন কুকর্মের বিরুদ্ধে ব্যপকভাবে সোচ্চার হয়ে ওঠেন এবং তাদের তাকফিরি ও খাওয়ারিজ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদির সমসাময়িক বিখ্যাত হাম্বলি আলিম আবদুল্লাহ ইবনে দাউদ জুবায়রি নজদির প্রসঙ্গে লেখেন,
‘তিনি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ফিতনার তরবারি উন্মুক্ত করেছেন।
তাদের তাকফির ও হত্যা করেছেন। …তিনি ধারণা করতেন, কেবল তাঁর মাধ্যমেই ইসলাম শুদ্ধ হবে।” (আস-সাওয়ায়িকু ওয়ার রুযুদ: ৪৩-৪৪)
উপমহাদেশের বিখ্যাত আলিম হুসাইন আহমাদ মাদানি র. (১৩৭৭)-যিনি দীর্ঘদিন মদিনায় থাকার সুবাদে একদম কাছ থেকে ওয়াহাবিদের পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান-তাদের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে নজদি সম্পর্কে বলেছেন,
‘বন্ধুরা, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদি ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে নজদ থেকে আরবে আবির্ভূত হন। তিনি বাতিল চেতনা ও ভ্রষ্ট আকিদা রাখতেন বিধায় আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ চালান। তাদের হত্যা করাকে পুণ্যকাজ এবং সম্পদকে তিনি গণীমত জ্ঞান করতেন। ” (আশ-শিহাবুস সাকিব: ২২১)
এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাতের আরও অনেক আলিমের মন্তব্য আমরা পরবর্তী অধ্যায়সমূহে আলোচনা করব। এখানে দেখা যাচ্ছে, আহলুস সুন্নাতের শীর্ষস্থানীয় আলিমরা ওয়াহাবিদের ব্যাপারে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। অনেকে বলতে পারেন, তারা দূর-দেশের হওয়ায় প্রোপাগান্ডার স্বীকার হয়েছেন; কিন্তু এমনটা বলা নিতান্ত অযৌক্তিক।
কারণ, তখন নজদ, হিজাজসহ আরবের আহলুস সুন্নাতের যেসব আলিম কাছ থেকে ওয়াহাবিদের কার্যক্রম অবলোকন করেছেন, তাঁরা সে অভিজ্ঞতা মলাটবন্দি করে গেছেন এবং সবাই ওই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছেন। অতএব, কেবল প্রোপাগান্ডার শিকার হয়ে তারা ওয়াহাবি মতাদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, এটা বলা হবে ভিত্তিহীন এবং অযৌক্তিক প্রলাপ; বরং প্রকৃত বিষয় হলো, নজদির সময়কার আহলুস সুন্নাতের যে আলিমদের কাছে ওয়াহাবিদের প্রকৃত চিত্র পৌঁছেছে, তারা সবাই ওয়াহাবিয়াতের বিরোধিতা করেছেন। নীতিগত কারণে হকপন্থি কোনো জামাআতের বিরুদ্ধে যেখানে আহলুস সুন্নাতের অধিকাংশ আলিম কখনো একমত হতে পারেন না, সেখানে ওয়াহাবিদের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অধিকাংশ আলিমের বিরোধিতার কারণ কী ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের আগে আমরা ওয়াহাবি মতাদর্শের জনক মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদির জীবনের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করব।
নজদির জন্ম ও বংশ পরিচয়
অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নজদে মুসায়লামার দেশ ইয়ামামার আইনিয়া জনপদের সম্ভ্রান্ত দীনি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদি। তাঁর পূর্ণ নাম হলো, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব ইবনে সুলায়মান আত-তামিমি আন-নজদি। নজদির জন্মসন নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতভেদ রয়েছে। তবে প্রণিধানযোগ্য মত হলো,
১১১৫ হিজরি-১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বনু তামিমের দিকে সম্পর্কিত করে তাঁকে তামিমিও বলা হয়। তবে তাঁর তামিমি হওয়া নিয়েও বেশ মতভেদ রয়েছে। কতিপয় ইতিহাসবিদের মতে, বনু তামিমের দিকে সম্পৃক্ত করে তাঁকে তামিমি বলা হয়। আবার কারও কারও মতে, তাঁর বংশধররা তুরস্কের বুরসা থেকে নজদে আসেন।
বুরসার এক ইয়াহুদি বংশোদ্ভূত তামিমের দিকে সম্পৃক্ত করে তাঁকে তামিমি বলা হয়ে থাকে। বিশিষ্ট তুর্কি ইতিহাসবিদ ডক্টর মুসতাফা তুরান এ মত উল্লেখ করেন। (Jews of Al Dunmah: 14)
তিনি তামিমকে দোনমে ইয়াহুদি হিসেবে উল্লেখ করেন। দোনমে হলো, ইয়াহুদিদের একটি দল, যারা উসমানি খিলাফতের যুগে মুসলিম-ছদ্মবেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। শায়খ রাফআত সালিম কাবার প্রণীত “the Jews of Al-Dunmah and the Origin of the Saudi Wahabis” গ্রন্থেও মুসতাফা তুরানের মতটির সমর্থন পাওয়া যায়। আবার নজদির সমসাময়িক নজদের বিখ্যাত নাবাতি কবি হুমায়দান শুয়াইয়ির তাঁর ওয়াহাবি বিরোধী
বিখ্যাত হিজা কাব্যের দুটি চরণে দাবি করেন, নজদির পূর্বপুরুষ তুরস্কের বুরসা থেকে এসেছে। চরণ দুটি হলো, أظنه بمحمد يعني محمد الوهابية يقول أصله من تميم (برصة) التركية
আমি মুহাম্মাদ বলতে ওয়াহাবি মুহাম্মাদের কথা বলছি। বলা হয়, তাঁর বংশ তুরস্কের বুরসা থেকে আগত তামিম থেকে।
বিশিষ্ট সৌদি ঐতিহাসিক ও বিপ্লবী নাসির সায়িদ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তারিখু আলে সৌদ’ এর মধ্যে নানান দলিলের ভিত্তিতে দাবি করেছেন, ‘মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদির বংশধররা তুর্কির ইয়াহুদিদের থেকে আগত।’ নজদের কতিপয় উলামায়ে কিরামও এই মত পোষণ করেছেন।
মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদির পিতা শায়খ আবদুল ওয়াহহাব নজদি র. ছিলেন তদানীন্তন হাম্বলি মাজহাবের প্রসিদ্ধ আলিম ও নজদের আইনিয়া অঞ্চলের প্রধান কাজি। তাঁর পুত্র অর্থাৎ, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদির ভাই শায়খ সুলায়মান ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদিও তাঁর পিতার মতো একজন বিদগ্ধ হাম্বলি আলিম ও কাজি ছিলেন।
শায়খ আবদুল ওয়াহহাব র.-এর প্রসঙ্গে তাঁর সমসাময়িক নজদের প্রসিদ্ধ হাম্বলি পণ্ডিত ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আবদুহ র. লিখেছেন, ‘তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে ফিকহের দারস ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। আবদুল ওয়াহহাব ফিকহের পাঠদানের পাশাপাশি বেশকিছু মাসআলার ওপর সুন্দর কিছু গ্রন্থও রচনা করেন। ১১৫৩ হিজরিতে তিনি ইনতিকাল করেন। ” (আস-সুহবুল ওয়াবিলা। ২৭৫)
তখনকার হিজাজ ও নজদের প্রায় সব আলিম আবদুল ওয়াহহাবের সততা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি দেন। শায়খ আবদুল ওয়াহহাব র. তাঁর সন্তান মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের প্রতি শৈশব থেকে সন্তুষ্ট ছিলেন না। নিজে একজন দূরদর্শী পণ্ডিত হওয়ার কারণে তাঁর পুত্রের মধ্যে পথভ্রষ্টতা পরিলক্ষ করে, শৈশবকাল থেকেই তার ব্যপারে মানুষকে সতর্ক করতে শুরু করেন। হিজাজের বিশিষ্ট আলিম সাইয়িদ হাবিব আলাবি র. নজদির বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘তাঁর পিতা সজ্জনব্যক্তি ছিলেন। তিনি মুহাম্মাদের বাল্যকাল থেকেই তাঁর এ দুর্ভাগ্যের ভবিষ্যদ্বাণী করে আসছিলেন। বিপরীতে মুহাম্মাদ তাঁকে ব্যথিত ও রাগন্বিত করছিল। আবদুল ওয়াহহাব বলতেন, অচিরেই তাঁর থেকে বড় ধরনের ফাসাদ প্রকাশ পাবে।” (মিসবাহুল আনাম: ৭)
মক্কার তখনকার গ্র্যান্ড মুফতি জাইনি দাহলান র. একই কথা লিখেছেন, ‘নজদির পিতা সৎ এবং একজন আলিম ছিলেন।” (ফিতনাতুল ওয়াহহাবিয়া: ৪)
প্রসিদ্ধির উচ্চ শিখরে পৌঁছুলেও শায়খ আবদুল ওয়াহহাব ইলমি নহরের সাঁতারে তাঁর পিতা সুলায়মানকে অতিক্রম করতে পারেননি। প্রসিদ্ধ ওয়াহাবি ইতিহাসবিদ আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান বলেছেন, ‘আবদুল ওয়াহহাব ফকিহ হলেও তাঁর পিতার তুল্য ছিলেন না। ” (উলামাউ নজদ: ৪১)
শায়খ আবদুল ওয়াহহাব র.-এর মুহাম্মাদ ছাড়া আরও একজন সন্তান ছিলেন যেমনটা ইতিপূর্বে জেনেছি। তাঁর নাম ছিল সুলায়মান। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনিও সে যুগের একটি রত্নে পরিণত হয়েছিলেন।
সুলায়মানের ভাই মুহাম্মাদ যখন নজদের বুকে ওয়াহাবি বিপ্লব শুরু করেন এবং তাঁর থেকে নানাবিধ শরিয়ত বিরোধী কার্যকলাপ প্রকাশ পেতে থাকে, তখন সুলায়মান তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদির বিরুদ্ধে কলম ধরেন। তিনি ওয়াহাবি মতাদর্শের বিরুদ্ধে লিখে ফেলেন তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘আস-সাওয়ায়িকুল ইলাহিয়া ফির রাদ্দি আলাল ওয়াহহাবিয়া’। মসিযুদ্ধ ছাড়াও তিনি ওয়াহাবি মতাদর্শের বিরুদ্ধে অসি যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন এবং ওয়াহাবিদের বিরুদ্ধে ব্যপক জনমত গড়ে তোলেন। মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদি যখন দীনের বিকৃতির মাধ্যমে মানুষকে বিকৃত তথাকথিত তাওহিদের পথে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সুলায়মান ওয়াহাবিদের ভুলগুলো তুলে ধরে তাদের আহ্বান করছিলেন প্রকৃত তাওহিদের দিকে।
নজদির শৈশব ও কৈশোর
শৈশব থেকেই মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব ছিলেন অত্যন্ত ধীশক্তির অধিকারী। দীন-সংক্রান্ত গ্রন্থপাঠে ছিল তার অদম্য আগ্রহ। পিতার কাছ থেকে তিনি ফিকহ, তাফসির, হাদিসসহ দীন শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ লাভ করেন। তবে শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে বড় বড় বিচ্যুতি দেখা দিতে শুরু করে। তিনি হাম্বলি মাজহাবের সুবিখ্যাত আলিম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও তাঁর শিষ্যদের মত-পথ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও তাঁর শিষ্য ইবনে কাইয়িম শরিয়তের বিষয়ে দুইজন মহাপণ্ডিত ছিলেন; তবে শরিয়তের কিছু মৌলিক ও শাখাগত বিষয়ে কিছু গুরুতর বিচ্যুতি রয়ে যায়। বিধায় আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের কাছে তাঁরা সমালোচিত হন। বিশেষত তাকফির ও তাবদির ক্ষেত্রে তাদের বাড়াবাড়ি ইমামরা ভালো নজরে দেখেননি। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও তাঁর শিষ্য ইবনে কাইয়িম তাকফিরের ক্ষেত্রে এতটাই বাড়াবাড়ি করেন যে, বিশিষ্ট ভারতীয় আলিম আশরাফ আলি থানবি র. (১৩৬২ হি) তাদের সুলতানুল কলম বলে অভিহিত করেন। শায়খ মাহমুদ হাসান দেওবন্দি র. তাঁর মালফুজাতের মধ্যে এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,
“থানবি র. (১৩৬২ হি) তাঁকে ও (তাঁর ছাত্র) ইবনে কাইয়্যিমকে সুলতানুল কলম (কলমের প্রভু) উপাধি দেন, যেহেতু তারা কার মাথা কাটল আর কার বিরোধিতা করল সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই কলম চালিয়ে যেতেন।” (Malfoozat of Faqeeh ul Ummat by Mufti Mahmood Hasan Gangohi, Volume 1, Pg. 385)
যাইহোক, ইসলামি শরিয়তের যথাযথ তাফাক্কুহ না অর্জন করা এবং তাকফিরপ্রবণ মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের মধ্যে বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হতে শুরু করে। দীনের বিষয়ে আহলুস সুন্নাতের স্বতঃসিদ্ধ মতামত ছেড়ে তিনি কল্পনাপ্রসূত ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করেন। আহলুস সুন্নাতের কাছে ফিকহের ইলম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইলম হিসেবে পরিগণিত; কিন্তু নজদি ফিকহ ছেড়ে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে মনগড়া ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করেন। ফলে তাঁর পিতা আবদুল ওয়াহহাব তাঁর প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি সচরাচর বলতেন, ভবিষ্যতে তাঁর এ ছেলের থেকে ফাসাদ প্রকাশ পাবে। (আস-সুহুবুল ওয়াবিলা: ২৭৫)
নজদি আলিম মুহাম্মাদ ইবনে আবদুহ এ বিষয়ে লিখেছেন,
‘যারা শায়খ আবদুল ওয়াহহাবের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ আমাকে বলেছেন, তিনি তাঁর ছেলে মুহাম্মাদের ওপর তাঁর পূর্ববর্তীদের এবং তাঁর সমকালীনগণের মতো ফিকহশাস্ত্র চর্চায় আত্মনিয়োগ না করায় ক্রুদ্ধ ছিলেন এবং তাঁর বিষয়ে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করতেন, “অচিরেই তাঁর থেকে অকল্যাণকর বিষয় প্রকাশ পাবে।”
ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের সমসাময়িক হিজাজের বিখ্যাত হাম্বলি ইমাম ও মুজাদ্দিদ ইবনে দাউদ আল হাম্বলি র. বলেন, “এ দাম্ভিকের (অর্থাৎ, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের) মধ্যে যখন প্রথম বিদআতি বিশ্বাস প্রকাশ পেল, তখন তাঁর পিতা বিরোধিতা করেন, তাঁর বিরুদ্ধে বদদুআ দেন এবং চরম ক্রুদ্ধ হন।”
শায়খ জাইনি দাহলান তাঁর ‘ফিতনাতুল ওয়াহহাবিয়া’, শায়খ জামিল সিদকি তাঁর ‘ফাজরুস সাদিক’, শায়খ মিকদাদি তাঁর ‘কাশফুল খাফা’-সহ আহলুস সুন্নাতের অনেক আলিম এবং ইতিহাসবিদ তাদের স্ব স্ব গ্রন্থে শায়খ আবদুল ওয়াহহাব র. কর্তৃক তাঁর পুত্রের পথভ্রষ্টতার বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণীটির কথা উল্লেখ করেছেন।
পিতার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদি হজ পালন ও উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য রওনা হন পবিত্রতম শহর মক্কার উদ্দেশে। সেখানে যে সকল শায়খের থেকে বিদ্যার্জন করেন তাদের মধ্যে দুইজন ছিলেন, হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত আলিম ইমাম হায়াত সিন্ধি র. ও শাফিয়ি মাজহাবের জ্ঞানবীর ইমাম সুলায়মান কুর্দি র.। এ ছাড়া তিনি মদি… আছে, শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আবদির রহমান র. নজদিকে যেসব প্রশ্ন করেছিলেন, তার কোনোটারই জবাব তিনি দিতে পারেননি। সুলায়মান কুর্দিকে নজদির উদ্ভাবিত কিছু মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে শক্তভাবে তাঁর খণ্ডন করেন। শায়খ সুলায়মান প্রদত্ত জবাবখানি আমরা এ গ্রন্থের শেষ দিকে সংযোজিত করেছি। নজদির মতাদর্শের খণ্ডনে صيف ১১। নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন তাঁর আরেক শায়খ আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল লতিফ। এভাবে ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের ছাত্রজীবন ও পরবর্তী সময়ে পিতা ও ভাইয়ের মতো তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন শিক্ষকরাও।
ইরাক যাত্রা উসমানি যুগে ইরাক ছিল ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। আব্বাসিদের যুগে বাগদাদ ছিল ইসলামি সাম্রাজ্যের রাজধানী। এ যুগে বাগদাদ উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে যায়। শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয় এ ঐতিহ্যবাহী শহর। ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মোঙ্গল-আক্রমণের পর বাগদাদ তার জৌলুস হারিয়ে ফেলে। ১৫০৮ খ্রিষ্টাব্দে শিয়া সাফাবিরা আক-কুয়ুনলুদের হাত থেকে বাগদাদ দখল করে সেখানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সাফাবি শাসক শাহ ইসমাইল বাগদাদস্থ ইমাম আজম আবু হানিফার মাজারটি ধ্বংসের নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে সাফাবিদের বিরুদ্ধে উসমানিরা যুদ্ধ পরিচালনা করে ইরাকসহ ইরানের একটা অংশ দখল করে নেয়। উসমানি ও সাফাবিদের মধ্যকার যুদ্ধসমূহের উল্লেখযোগ্য একটি ছিল চ্যালদিরানের যুদ্ধ। ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান সেলিম ইয়াবুজের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধে পারসিক সাফাবিরা চরমভাবে পর্যদুস্ত হয়।
ইরাক হলো, আহলে বায়ত ও ইমাম আবু হানিফাসহ আহলুস সুন্নাতের বড় বড় ইমাম, আলিম ও অলির পুণ্যভূমি। তাই ইরাকের প্রতি উসমানিদের স্বাভাবিক একটি তীব্র আকর্ষণ ছিল। ফলে তারা ইরাক দখলের পর এর উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেয়। শাসনকার্যের সুবিধার্থে ইরাককে তারা চারটি ওলায়াত বা প্রদেশে ভাগ করে-ওলায়াতে আছে, শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে আবদির রহমান র. নজদিকে যেসব প্রশ্ন করেছিলেন, তার কোনোটারই জবাব তিনি দিতে পারেননি। সুলায়মান কুর্দিকে নজদির উদ্ভাবিত কিছু মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে শক্তভাবে তাঁর খণ্ডন করেন। শায়খ সুলায়মান প্রদত্ত জবাবখানি আমরা এ গ্রন্থের শেষ দিকে সংযোজিত করেছি। নজদির মতাদর্শের খণ্ডনে صيف ১১। নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন তাঁর আরেক শায়খ আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল লতিফ। এভাবে ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের ছাত্রজীবন ও পরবর্তী সময়ে পিতা ও ভাইয়ের মতো তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন শিক্ষকরাও।
ইরাক যাত্রা
উসমানি যুগে ইরাক ছিল ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। আব্বাসিদের যুগে বাগদাদ ছিল ইসলামি সাম্রাজ্যের রাজধানী। এ যুগে বাগদাদ উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে যায়। শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয় এ ঐতিহ্যবাহী শহর। ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মোঙ্গল-আক্রমণের পর বাগদাদ তার জৌলুস হারিয়ে ফেলে। ১৫০৮ খ্রিষ্টাব্দে শিয়া সাফাবিরা আক-কুয়ুনলুদের হাত থেকে বাগদাদ দখল করে সেখানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সাফাবি শাসক শাহ ইসমাইল বাগদাদস্থ ইমাম আজম আবু হানিফার মাজারটি ধ্বংসের নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে সাফাবিদের বিরুদ্ধে উসমানিরা যুদ্ধ পরিচালনা করে ইরাকসহ ইরানের একটা অংশ দখল করে নেয়। উসমানি ও সাফাবিদের মধ্যকার যুদ্ধসমূহের উল্লেখযোগ্য একটি ছিল চ্যালদিরানের যুদ্ধ। ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান সেলিম ইয়াবুজের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধে পারসিক সাফাবিরা চরমভাবে পর্যদুস্ত হয়।
ইরাক হলো, আহলে বায়ত ও ইমাম আবু হানিফাসহ আহলুস সুন্নাতের বড় বড় ইমাম, আলিম ও অলির পুণ্যভূমি। তাই ইরাকের প্রতি উসমানিদের স্বাভাবিক একটি তীব্র আকর্ষণ ছিল। ফলে তারা ইরাক দখলের পর এর উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেয়। শাসনকার্যের সুবিধার্থে ইরাককে তারা চারটি ওলায়াত বা প্রদেশে ভাগ করে-ওলায়াতে বাগদাদ, ওলায়াতে মাওসিল, ওলায়াতে শাহরজুর (উত্তরাঞ্চলীয় অংশ) এবং ওলায়াতে বসরা।
উসমানি যুগে অন্যান্য প্রদেশের মতো বসরাও ছিল জ্ঞানের উদ্যান। বিজ্ঞ আলিম, ফকিহ, অলি আর জ্ঞানান্বেষীদের সমারোহ বসরাকে পরিণত করে জ্ঞানবিজ্ঞানের মিলনক্ষেত্রে। দেশ-বিদেশের জ্ঞানপিপাসুরা এসে জড়ো হতেন সেখানে। তাই ইবনে আবদুল ওয়াহহাবও জ্ঞানান্বেষণের জন্য সুদূর মক্কা থেকে বসরাতে পাড়ি জমান। কিছুকাল এখানে আলিমদের সান্নিধ্যে কাটান। বসরার গভর্নর শায়খ হাসান ইসতাম্বুলিসহ বিভিন্ন আলিমের থেকে জ্ঞানার্জন করেন।
কথায় আছে, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।’ কিশোর নজদির ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটল। বসরায় গিয়ে তিনি দীনের মনগড়া ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন। তাওহিদ, বিদআত ও শিরকের সংজ্ঞায় বিকৃতি এনে তিনি সেখানকার আহলুস সুন্নাতের অনুসারী মুসলিমদের কুফুর ও শিরকের দায়ে অভিযুক্ত করতে লাগলেন, তাদের অবৈধ পন্থায় কাফির ও মুশরিক ফাতওয়া দিতে শুরু করলেন। ফলে সেখানকার উলামাসমাজ ও মুসলিমরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। ফিতনার আশঙ্কায় তাঁকে বসরার পবিত্র ধাম থেকে বিতাড়িত করা হয়। নাসির সায়িদ লেখেন, ‘তাঁকে নজদ থেকে বিতাড়িত করা হয়। এরপর তিনি যথাক্রমে ইরাক, মিসর ও সিরিয়াতে যান এবং সব জায়গা থেকেই বিতাড়িত হন। অবশেষে সিরিয়া থেকে নজদের আইনিয়াতে ফিরে আসেন। (তারিখু আলে সৌদ: ২০)
বসরা থেকে বিতাড়িত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে ওয়াহাবি মতাদর্শী ইতিহাসবিদ ইবনে বিশরের লেখায়, ‘এরপর শায়খের বিরুদ্ধে বসরার কিছু মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়, যাদের মধ্যে তাদের নেতারাও ছিল। তারা তাঁকে অত্যন্ত কষ্ট দিয়ে সেখান থেকে বহিষ্কার করে…।” (উনওয়ানুল মাজদ: ৩৬)
ইবনে বিশরের বয়ান থেকে বোঝা যায়, নজদিকে বিতাড়িত করায় বসরাবাসীকে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান; কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা তো এমন ছিল না; ছিল ভিন্ন। তাঁকে বিতাড়নের কারণ ছিল, তিনি বসরাতে গিয়ে আহলুস সুন্নাত থেকে বিচ্ছিন্ন মতামত প্রদান এবং অন্যায়ভাবে শিরক ও বিদআতের অভিযোগে মুসলিমদের অভিযুক্ত করতে শুরু করেন। ফলে সেখানকার মুসলিমসমাজ ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে বিতাড়িত করে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের ফিতনার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল, ইরাকের বসরা নগরীতে। বসরা নগরী উচ্চ নজদের সীমান্তে অবস্থিত। বিশিষ্ট নজদি আলিম শায়খ আবদুল ওয়াহহাব ইবনে তুর্কি লিখেছেন, ‘মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদি প্রথম ইরাকের বসরা শহরে তাঁর সালাফি দাওয়াতের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।’ (ওয়াহহাবিয়া ওয়া আহওয়ালুন নজদ: ৮০)
এখানে লক্ষণীয়, নজদি জন্মগতভাবে নজদের ইয়ামামার হলেও তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রম ইরাকের বসরা থেকে শুরু হয়। নজদ-সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যেসব ইমাম নজদির প্রসঙ্গ এনেছেন, তাদের ভুল প্রমাণিত করতে কেউ কেউ এ যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, হাদিসে নজদ বলতে ইরাক বোঝানো হয়েছে। হাদিসে নজদ থেকে কারনুশ শয়তান বা শয়তানের শিং ও ফিতনা ফাসাদ উদ্ভূত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো কোনো হাদিসে নজদের স্থলে মাশরিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, আরবি অভিধান অনুসারে যার অর্থ হলো পূবদিক। যেহেতু হাদিসে নজদের নির্দিষ্ট জায়গার কথা উল্লেখ করা হয়নি, সেহেতু আইম্মায়ে কিরামদের মধ্যে নজদ নিয়ে মতভেদ তৈরি হয়েছে। কিছু ইমাম বলেন, নজদ বলতে মূলত ইরাক তথা উচ্চ নজদকে উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে। আবার কিছু ইমামের মতে, নজদ হলো ইয়ামামা বা নিম্ন নজদ। তবে কিছু বর্ণনা অনুযায়ী নজদ বলতে ইয়ামামা হওয়ার বিষয়টিকে অধিক বিশুদ্ধ হিসেবে প্রতীয়মান করে। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া এ মতের সমর্থন করেছেন। তিনি মাশরিক-এর ব্যাখ্যায় বলেন,
ومنها خرج مسيلمة الكذاب، الذي ادعى النبوة
“আর সেখান থেকে মুসায়লামাতুল কাজজাব উদ্ভূত হয়েছিল, যে নবুওয়াতের দাবি করেছিল।” (আল-জাওয়াবুস সহিহ, খণ্ড ৬, পৃষ্টা: ১২৭-১২৮)
মুসায়লামার দেশ বলতে ইয়ামামা বোঝায়, যেখান থেকে একাধিক খাওয়ারিজ দল পরবর্তীতে বেরিয়েছিল। মুসায়লামার ইয়ামামার নজদ ও ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের জন্মভূমি নজদ স্থানগতভাবে একই।
তবে নজদের ব্যাখ্যা যা-ই হোক, উক্ত হাদিস দিয়ে ওয়াহাবি মতাদর্শের ব্যপারে ইসতিদলাল করার মধ্যে কোনো ভুলের অবকাশ নেই। যদি বলা হয়, হাদিসে নজদ বলতে ইরাক বোঝানো হয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমাদের জবাব হলো, ওয়াহাবি মতাদর্শ প্রথম ইরাক থেকে উদ্ভূত হয়েছিল, যেমনটা আমরা উপরে দেখলাম। আবার যদি বলা হয়, নজদ বলতে ইয়ামামার নজদ বোঝানো হয়েছে, সেক্ষেত্রে আমাদের জবাব হলো, ওয়াহাবি মতাদর্শ প্রকৃতভাবে উদ্ভূত হয়েছিল ইয়ামামার নজদ থেকে। অতএব, নজদ নিয়ে সংশয়ের আর কোনো অবকাশ থাকল না।
হুরায়মালা থেকে বিতাড়ন
মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব সিরিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে পিতৃভূমি নজদের আইনিয়াতে ফিরে আসেন। পরে সেখান থেকে আহসা হয়ে পৌঁছে যান হুরায়মালাতে। এদিকে ওই সময় আইনিয়াতে মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ফলে ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের পিতা আইনিয়া পরিত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী হুরায়মালা নামক স্থানে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব হুরায়মালাতে পৌঁছার পর সেখানে ওয়াহাবি মতাদর্শ প্রচারে লিপ্ত হন। দীনের অপব্যাখ্যা এবং মুসলিমদের অন্যায়ভাবে তাকফির করার ফলে হুরায়মালাবাসী তাঁর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পুত্রের কর্মকাণ্ড দেখে পিতা শায়খ আব্দুল ওয়াহাব তাঁর ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। নজদির শৈশবে তাঁর পথভ্রষ্টতার বিষয়ে তিনি যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা নিজের চোখের সামনে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হতে দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। ফলে পিতা ও পুত্রের মধ্যে শুরু হয় বাকযুদ্ধ ও কথা কাটাকাটি। ওয়াহাবি ইতিহাসবিদ ইবনে বিশর তাঁর গ্রন্থে বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘এমনকি পিতা-পুত্রের মধ্যে বাকযুদ্ধ হয়। (উনওয়ান: ১/৩৭) এরপর পিতার ভয় এবং মুসলিমদের বিরোধিতায় কিছুকাল তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রম স্তিমিত থাকে।
হুরায়মালা অঞ্চলে ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু হয় ১১৪৩ হিজরি সনে। এ সালটি ওয়াহাবি মতাদর্শের উত্থানের সাল হিসেবে ধরা হয়। যদিও ইবনে আবদুল ওয়াহহাব পিতা থেকে ধমক খেয়ে বেশ কিছু বছর তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রম স্তিমিত রেখেছিলেন। ১১৫৩ খৃষ্টাব্দে অর্থাৎ, নজদের বুকে ওয়াহাবিয়াতের উত্থানের প্রায় দশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর হুরায়মালা অঞ্চলে তাঁর পিতা ইনতিকাল করেন। পিতার ইনতিকালে ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের একটি প্রধান বাধা দূর হয়ে যায়। ফলে কোমর বেঁধে তাঁর তাকফিরি মতাদর্শ প্রচারে নেমে পড়েন। একপর্যায়ে তাকফিরি দাওয়াতের কারণে অতিষ্ঠ হুরায়মালাবাসী ইবনে আবদুল ওয়াহাবকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। পরে তিনি হুরায়মালা ছেড়ে আপন জন্মভূমি আইনিয়াতে পালিয়ে আসেন।
উসমান ইবনে মুআম্মার (১১৬৩ হি.) এর সান্নিধ্যে নজদি যখন হুরায়মালা ছেড়ে আইনিয়াতে আসেন, তখন এর শাসনভার ছিল উসমান ইবনে মুআম্মারের হাতে। আইনিয়াতে আসার পর উসমানের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে নজদের রাজা হওয়ার প্রলোভন দেখান। বিনিময়ে তাঁর তথাকথিত দাওয়াতের সমর্থন ভিক্ষা চান। দ্যা বার্থ অব দা ওয়াহাবি মুভমেন্ট গ্রন্থে এসেছে, ‘ইবনে আবদুল ওয়াহহাব হুরায়মালা থেকে উসমান ইবনে মুআম্মার শাসিত আইনিয়াতে চলে যান।
তারপর উসমানকে নজদের রাজা হতে প্রলুব্ধ করলে তিনি তাঁকে সহায়তা করেন।’ (The Birth of Al- Wahabi Movement by Intel. Col. Sa’id Mahmud Najm Al Amiri, pg. 184)
নজদির এ প্রস্তাবের কথাটি ইবনে বিশর তাঁর ‘উনওয়ানুল মাজদ’ এ ভিন্নভাবে নিয়ে এসেছেন। নজদির প্রলোভনে ইবনে মুআম্মারকে রাজা হওয়ার লিন্সা গ্রাস করে ফেলে। তিনি ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে তাঁকে সমর্থনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। এমনকি তাঁর মেয়ে জাওহারাকে নজদির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন। ইতিমধ্যে আইনিয়াতে নজদির কিছু অনুসারী ও ভক্তের আবির্ভাব ঘটে। ফলে আইনিয়া তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রমের জন্য কিছুটা প্রশন্ত হয়ে ওঠে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সেখানে তিনি তাঁর তাণ্ডব শুরু করেন। তথাকথিত তাওহিদ প্রতিষ্ঠার নামে ইসলামের অপব্যাখ্যা, মুসলিমদের তাকফির-তাবদি (তাকফির শব্দটির অর্থ হলো কাউকে কাফির প্রতিপন্ন করা এবং তাবদি শব্দটির অর্থ কাউকে বিদআতি প্রতিপন্ন করা। এখানে অন্যায়ভাবে কোনো মুসলিমকে কাফির বা বেদআতি বলা বোঝানো হয়েছে) করার মাধ্যমে অস্থির করে তোলেন পুরো আইনিয়া। ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ সত্ত্বেও ক্ষমতালোভী মুআম্মার তাঁকে সমর্থন করতে থাকেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সমগ্র নজদে আধিপত্য কায়েম করা।
জায়িদ ইবনে খাত্তাব (১২ হি.) রা. এর মাজার ধ্বংস
আইনিয়াতে দিনদিন বাড়তে থাকে নজদির প্রলয়ংকরী ধ্বংসযজ্ঞ। চারিদিকে মুসলিমদের মধ্যে পুঞ্জীভূত হতে থাকে ক্রোধের রোষানল। এরই মধ্যে তিনি মনে মনে বিখ্যাত সাহাবি জায়িদ ইবনে খাত্তাব রা.-এর মাজার ধ্বংসের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। মাজারটি ছিল আইনিয়ার জুবায়লা এলাকায়। নজদি জুবায়লার মুসলিমদের ভয়ে ভীত ছিলেন। কারণ, তাঁর তথাকথিত তাওহিদের সংজ্ঞায় মাজার মাত্রই শিরকের আখড়া এবং তা ধ্বংস করা আবশ্যক বলে মনে করা হলেও আহলুস সুন্নাতের কাছে ক্ষেত্রবিশেষে যেমন ‘গায়রে মুসাব্বালা’ তথা জনগণের জন্য ব্যবহৃত নয় এমন স্থানে মাজার স্থাপন করা বৈধ। যেমন: হাম্বলি মাজহাবের সুবিখ্যাত ফিকহগ্রন্থ الفروع في فقه الحنابلة-এর মধ্যে বর্ণিত وذكر صاحب المستوعب و المحرر لا بأس بقبة و بيت و حظيرة في ملكه : SICE
“আল-মুসতাওয়িব ও আল-মুহাররার প্রণেতা বর্ণনা করেন, আপন মালিকানাধীন জায়গায় (কবরের ওপর) কোনো গম্বুজ বা ঘর অথবা বেষ্টনী নির্মাণে কোনো দোষ নেই।”
আহলুস সুন্নাতের কোনো ইমাম কবরের ওপর মাজার নির্মাণ হারাম বলে ফাতওয়া দেননি। বড়জোর সেটা ক্ষেত্রবিশেষে মাকরুহ হতে পারে। ইমাম ইবনে দাউদ আল-হাম্বলি র. তাঁর বইয়ে এ বিষয়ে বলেন,
ولم يقل أحد من العلماء أنه من الكبائر
“উলামাদের কেউই বলেননি, সেটা (কবরের উপর মাজার ইত্যাদি নির্মাণ করাটা) কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।” (আস-সাওয়ায়িক: ৪৪৬)
তা ছাড়া সাহাবায়ে কিরামের মাজার ধ্বংস করাটা আহলুস সুন্নাতের চার মাজহাবের কাছে অত্যন্ত গর্হিত কাজ হিসেবে মনে করা হয়ে থাকে। ফলে নজদি অন্য ফন্দি আঁটেন। ইবনে মুআম্মারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মাজারটি ধ্বংসের জন্য তাঁর সহায়তা চান। ক্ষমতালোভী ইবনে মুআম্মার তখনই ৬০০ সেনাবাহিনী নিয়ে নজদির সমর্থনে বেরিয়ে পড়েন। এভাবে মুআম্মারের সহায়তায় ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদি প্রিয়নবী-এর উক্ত সাহাবির মাজারটি ভেঙে ফেলেন। খবরটি যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন সেখানকার মুসলিমরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। কারণ, অলি ও নবীদের মাজার হলো মানাজিলুর রহমত। এগুলো জিয়ারত, তাবাররুক ও তাওয়াসসুলের স্থান।
এদিকে সংবাদটি আল-আহসার শাসক সুলায়মানের কানে গেলে তিনি ইবনে মুআম্মারকে পত্রমারফত নজদিকে হত্যার আদেশ দেন; কিন্তু নজদের রাজা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ইবনে মুআম্মার তাঁর আদেশের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেননি। ফলে সুলায়মান মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাবকে নজদ পরিত্যাগের আদেশ দেন। নজদি তখন তাঁর প্রলোভনের মোক্ষম অস্ত্রটি পুনরায় ব্যবহার করেন এবং সুলায়মানকে নজদের রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখান; কিন্তু এবার আর সফল হতে পারেননি। সুলায়মান তাঁর প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। ফলে নজদি বাধ্য হয়ে আইনিয়া ছেড়ে নজদের দিরিয়াতে চলে আসেন।
ওয়াহাবিবাদের নামকরণ
ওয়াহাবিদের ‘ওয়াহাবি’ নামে নামকরণ করা হয় মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের নাম হতে। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবকে সংক্ষিপ্তাকারে ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবও বলা হতো। এই নামে থাকা ‘ওয়াহাব’ শব্দ হতে ওয়াহাবিদের নামকরণ করা হয়। আব্দুল ওয়াহাব ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের পিতা। তবে যেহেতু মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবকে সংক্ষিপ্তাকারে ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব বলা হত, সেহতু সম্ভবতঃ তাঁর অনুসারীদের ওয়াহহাবী নামে নামাঙ্কিত করা হয়।
ওয়াহাবিদের নামকরণ নিয়ে কতিপয় মানুষ ভ্রম বশতঃ বলে থাকেন যে, নজদে যখন ওয়াহাবিদের আন্দোলনের সূচনা ঘটে তখন তাদের প্রতিপক্ষ উসমানীয় শাসকগণ ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদেরকে ওয়াহাবি নামে নামকরণ করে। এটি একটি ঐতিহাসিকভাবে ভিত্তিহীন রটনা। আমরা যদি ইতিহাসের পাতা ওলটাই এবং একটু গভীরভাবে গবেষণা করি, তাহলে দেখবো যে, ওয়াহাবি নামটি নজদী আন্দোলনের সমসাময়িক এবং তৎপরবর্তী ওয়াহাবি মতাদর্শীগণ সগর্বে ব্যবহার করতেন। উদাহরণস্বরূপ, ১৩৪৪ হিজরী সনে আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা এবং ওয়াহাবিদের ইমাম আব্দুল আযীয ইবনে সৌদের নির্দেশে ওয়াহাবিদের পাঁচ ইমামের পত্রাবলীর একটি সংকলন পুস্তক প্রকাশিত হয় যার শিরোনাম ছিল ‘আল হাদিয়্যাতুস সুন্নিয়্যাহ ওয়াত তুহফাতুল ওয়াহহাবিয়্যাতুন নাজদিয়্যাহ’, এছাড়া ওয়াহাবিদের ফতোয়া সংকলন ‘আদ দুরারুস সানিয়্যাহ’ এর ষোড়শ খণ্ডের ৪৫২ পৃষ্ঠায় ওয়াহাবিদের জনৈক ইমামের কাব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে তিনি সগর্বে কাব্যচ্ছলে বলছেন, نعم نحن وهابية حنفية অর্থাৎ ‘হ্যাঁ আমরা হলাম ওয়াহাবি ও হানাফিয়া (বন্ হানীফা গোত্রের মানুষদের হানাফিয়া বলা হয়)।” এছাড়াও ওয়াহাবিদের লেখা নানান গ্রন্থাবলীতে তাদের নিজেদেরকে ওয়াহাবী হিসেবে ঘোষণা করতে দেখা যায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ওয়াহাবিদের নামটি ‘উসমানীয় প্রদত্ত’ এধরনের প্রচলিত কথাগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।



