ইজমালীভাবে মুতাওয়াতির (ইজমালীভাবে মুতাওয়াতির: ঐ রেওয়ায়েত ও হাদীস যা বিভিন্ন সূত্রে বেশ কিছু সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত হওয়ার কারণে তা যে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বাস অর্জিত হয়) অগণিত হাদীস ও রেওয়ায়েতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের নিকটবর্তী সময় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে এ যুদ্ধ আমাদের বর্তমান শতাব্দীর (বিগত বিংশ শতাব্দী) ঘটে যাওয়া প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর আরোপ করা সম্ভব নয়। কারণ, এ সব রেওয়ায়েতে উক্ত যুদ্ধের যে সব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো বিংশ শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যাবলী থেকে ভিন্ন। বিশেষ করে, এ ভিন্নতা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের নিকটবর্তী সময় সংঘটিতব্য বিশ্বযুদ্ধের নিহতদের সংখ্যা এবং এর সময়কালের ক্ষেত্রে প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়; বরং কতিপয় রেওয়ায়েত থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, এ যুদ্ধ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের বছরে অথবা তাঁর পবিত্র আবির্ভাবকামী আন্দোলন শুরু হবার পর সংঘটিত হবে।এখানে এ রেওয়ায়েতসমূহের গুটিকতক নমুনা পেশ করা হলো:
হযরত আলী (আ.) বলেছেন: “আল কায়েম আল মাহ্দীর আবির্ভাব ও আন্দোলনের নিকটবর্তী সময় দু’ধরনের মৃত্যু- লাল মৃত্যু ও শ্বেত মৃত্যু হবে। হঠাৎ হঠাৎ লাল ও রক্তবর্ণ বিশিষ্ট পঙ্গপালের প্রাদুর্ভাব হবে। তবে ‘লাল মৃত্যু’র অর্থ তরবারি দ্বারা মৃত্যু এবং ‘শ্বেত মৃত্যু’র অর্থ প্লেগ বা মহামারি। (শেখ মুফীদ প্রণীত কিতাবুল ইরশাদ, পৃ. ৪০৫ এবং শেখ তূসী প্রণীত গাইবাত, পৃ. ২৭৭)
‘আল কায়েম আল মাহ্দীর আবির্ভাব ও আন্দোলনের নিকটবর্তী সময়’- এ বাক্যাংশটি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ যুদ্ধ ও লাল মৃত্যু (রক্তপাত) ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের নিকটবর্তী সময় সংঘটিত হবে। তবে রেওয়ায়েতে এ যুদ্ধ সংঘটিত হবার স্থান নির্দিষ্ট করা হয় নি।
ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন: “ভয়-ভীতি, ভূমিকম্প, ফিতনা এবং যে সব বিপদে মানব জাতি জড়িয়ে যাবে সেগুলোর পরপরই কেবল আল কায়েম আল মাহ্দী আবির্ভূত হবে ও কিয়াম করবে। এর আগে তারা (মানব জাতি) প্লেগ বা মহামারিতে আক্রান্ত হবে। অতঃপর আরবদের মধ্যে যুদ্ধ ও রক্তপাত হবে, বিশ্ববাসীর মাঝে মতবিরোধের উদ্ভব হবে, ধর্মে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দেবে এবং তাদের সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন এতটাই হবে যে, একে অপরকে হত্যা করতে দেখে সবাই সকাল-সন্ধ্যায় কেবল নিজের মৃত্যু কামনা করবে। (শেখ সাদুক প্রণীত কামালুদ্দীন, পৃ. ৪৩৪)
এ রেওয়ায়েত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তীব্র ভয়-ভীতি ও আতংকের আগেই প্লেগ বা মহামারির প্রাদুর্ভাব হবে। উল্লেখ্য যে, এ ভয়-ভীতি ও আতংক আসলে সাধারণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও ব্যাপক যুদ্ধকেই বুঝিয়েছে। তবে যদি আমরা নিশ্চিতও হই যে, রাবী (হাদীস বর্ণনাকারী) হাদীসটির মূল ভাষ্যে কোন ধরনের আগে-পরে করেন নি তাহলেও এ সব ঘটনা যে একের পর এক শিকলের বলয়ের মতো ঘটতে থাকবে এ রকম চিন্তা করা আমাদের জন্য দুরূহ হবে। কারণ, ‘আরবদের মধ্যে যুদ্ধ ও রক্তপাত’- এ বাক্য যা ثمّ (অতঃপর) অব্যয় দ্বারা সংযোজিত হয়েছে তা যদি ‘এর আগে তারা প্লেগ বা মহামারিতে আক্রান্ত হবে’- এ ParentheticalSentence (বাক্যের মধ্যে প্রবিষ্ট কিন্তু ব্যাকরণগত সম্পর্কহীন পদসমষ্টি বা বাক্য) -এর সাথে সংযোজিত হয়েছে ধরি তাহলেও তা সঠিক বলে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে আরবদের মধ্যকার বিরোধ, যুদ্ধ ও রক্তপাতের ঘটনা প্লেগ বা মহামারির পরে হবে; আবার অন্যদিকে ‘এবং যে সব বিপদে মানব জাতি জড়িয়ে যাবে’- এ বাক্যটির সাথে ‘আরবদের মধ্যে যুদ্ধ ও রক্তপাত…’ বাক্যটি সংযোজন করাও সঠিক। সে ক্ষেত্রে আরবদের মধ্যকার যুদ্ধ ও রক্তপাত প্লেগ বা মহামারির প্রাদুর্ভাবের আগেই সংঘটিত হবে। অধিকন্তু (এ রেওয়ায়েতে) এ সব ঘটনার বিবরণ খুব সংক্ষেপে দেয়া হয়েছে। তবে এ থেকে রোঝা যায় যে, আরব ও আপামর মুসলিম উম্মাহর জন্য নিরাপত্তামূলক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ সময়টা হবে অত্যন্ত কঠিন সময় বা ক্রান্তিকাল। ক্ষুধা এবং দুর্ভিক্ষ যা ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত পূর্ববর্তী রেওয়ায়েতে উল্লিখিত হয়েছে তা ঐ বছরেই দেখা দেবে।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: হযরত কায়েম আল মাহ্দীর আবির্ভাব ও বিপ্লবের আগে এমন এক বছর অবশ্যই আসবে যখন মানুষ তীব্র খাদ্যাভাবে কষ্ট পেতে থাকবে এবং তাদেরকে হত্যা করার দরুণ আতংক তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২২৯)
পরবর্তী রেওয়ায়েত থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, যে আসমানী আওয়াজ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের নিকটবর্তী রমযান মাসে শোনা যাবে তখন পর্যন্ত ঐ বিশ্বযুদ্ধের তীব্রতা অব্যাহত থাকবে।
ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন: “প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাসী পরস্পর মতভেদ করবে। কিবলাপন্থীরা (মুসলমানরা) এবং বিশ্ববাসীও অসহনীয় ভয়-ভীতি ও আতংকের সম্মুখীন হবে। আর আকাশ থেকে আহবানকারীর আহবান করা পর্যন্ত তারা এ অবস্থার মধ্যেই থাকবে। যখন আকাশ থেকে গায়েবী আহবানধ্বনি শোনা যাবে তখন তোমরা হিজরত করবে।… (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২৩৫)
এ রেওয়ায়েত থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, এ যুদ্ধে মূলত অমুসলিম জাতিসমূহই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর ‘প্রাচ্য, পাশ্চাত্যবাসী এবং কিবলাপন্থীরা পরস্পর মতভেদ করবে’- এ বাক্য আসলে গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত যা থেকে বোঝা যায় যে, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাসীদের মতবিরোধের পরপরই মুসলমানদের মধ্যে মতপার্থক্য ঘটবে। আর এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এ মতপার্থক্য আসলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মতপার্থক্যের ফল অথবা এর অনুগামী হয়ে থাকবে। অবশ্য এ বিষয়টি ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধে নিতান্ত স্বাভাবিক হবে। কারণ, এ যুদ্ধের লক্ষ্যস্থলগুলো হবে বড় বড় দেশের রাজধানী, সামরিক ঘাঁটি ও সেনানিবাসসমূহ এবং পরোক্ষভাবে মুসলমানদের মধ্যেও এ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে। কতিপয় রেওয়ায়েতেও এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
আবু বাসির ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন: “ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: “যে পর্যন্ত দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ধ্বংস না হবে সে পর্যন্ত এ বিষয়টি (ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাব) বাস্তবায়িত হবে না।” আমি (আবু বসীর) তখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম: মানব জাতির দুই-তৃতীয়াংশ যখন ধ্বংস হয়ে যাবে তখন আর কে-ই বা বেঁচে থাকবে? তিনি বললেন: মানব জাতির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে থাকতে কি তোমরা (মুসলমানরা) পছন্দ কর না? (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ.১১৩)
সম্ভবত আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর নিম্নোক্ত এ ভাষণে অন্য সকল হাদীস ও রেওয়ায়েতের চেয়ে স্পষ্টভাবে এ যুদ্ধের সময়কাল ও কারণ উল্লিখিত হযেছে। এ খুতবায় তিনি ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের বেশ কিছু নিদর্শনও বর্ণনা করেছেন। এ ভাষণে দু’টি প্যারা আছে যা উক্ত বিশ্বযুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট।
তিনি বলেন: “হে লোকসকল! প্রাচ্যে তার নিজ পায়ের দ্বারা ফিতনা সৃষ্টি করার আগে অর্থাৎ বশীভূত করার সময় যে উটের লাগাম পায়ের খুরের নিচে আটকে যায় এবং এতে তার ভীতি ও অস্থিরতা আরো বৃদ্ধি পায় সেই উটের ন্যায় ফিতনা-ফ্যাসাদ তোমাদের দেশ ও জনপদকে ধ্বংস করার আগে অথবা দাহ্য পদার্থের দ্বারা পাশ্চাত্যে এক মহাযুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করার আগেই আমাকে তোমরা জিজ্ঞাসা কর। (ঐ যুদ্ধ যখন বাঁধবে) তখন তা উচ্চৈঃস্বরে গর্জন করতে থাকবে। সে সময় ঐ ব্যক্তির জন্য আক্ষেপ এ কারণে যে, সে রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করবে…। এ যুদ্ধ চলাকালীন নাজরান থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে ইমামের (ইমাম মাহ্দীর) আহবানে সাড়া দেবে। সে-ই হবে তার আহবানে সাড়া দানকারী প্রথম খ্রিস্টান। সে তার আশ্রম ধ্বংস করবে এবং ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবে। সে অশ্বের ওপর আরোহণ করে আজমীদের (ইরানী সেনাবাহিনী) ও নিপীড়িত জনগণের সাথে হেদায়েতের পতাকাসহ নূখাইলার (কুফার কাছে একটি এলাকার নাম) দিকে যাবে।
ঐ দিন ফারুক নামের একটি স্থান হবে পৃথিবীর সকল অঞ্চলের অধিবাসীর সমবেত হওয়ার স্থান। আর ঐ এলাকা আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর হজ্ব গমনের পথের ওপরে বার্স ও ফোরাতের মাঝখানে অবস্থিত। সেদিন তিন হাজার হাজার ইহুদী ও খ্রিস্টান পরস্পরকে হত্যা করবে। সেদিনের ঘটনা মূলত নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা বলে গণ্য হবে:
“আমরা তাদেরকে যে পর্যন্ত (তরবারি দিয়ে অথবা তরবারির নিচে) কর্তিত প্রাণহীন শস্যে পরিণত না করেছি সে পর্যন্ত সব সময় এটিই ছিল তাদের শ্লোগান। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ৮২ -৮৩)
তবে ‘প্রাচ্যে তার নিজ পায়ের দ্বারা ফিতনা সৃষ্টি করার আগে’- ইমামের এ বাণী থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ যুদ্ধের সূত্রপাত প্রাচ্য অর্থাৎ রাশিয়া থেকে হবে অথবা এ থেকে প্রাচ্য এলাকায় সংঘটিতব্য দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের বিষয় প্রতীয়মান হয়। শীঘ্রই ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাব-আন্দোলনের অধ্যায়ে ইমাম বাকির (আ.) থেকে একটি রেওয়ায়েত বর্ণিত হবে। এতে বর্ণিত হয়েছে যে, হিজাযের প্রতিশ্রুত রাজনৈতিক শূন্যতা ও সংকট প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার কারণ।
‘দাহ্য পদার্থের দ্বারা পাশ্চাত্যে এক মহাযুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে’- এ বাক্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ধ্বংসের প্রকৃত কেন্দ্র পাশ্চাত্যের দেশসমূহ হবে এবং দাহ্য পদার্থসমূহের আধিক্যের অর্থ হচ্ছে পাশ্চাত্য দেশসমূহের সামরিক ঘাঁটি, রাজধানী এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কেন্দ্রসমূহ। আর বাহ্যত ইমামের বাণীর অর্থ হচ্ছে পৃথিবীর বুকে মানুষের সমবেত হওয়ার স্থানটির নাম হবে ফারুক। তখন মানুষ বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য ঐ স্থানে এসে সমবেত হতে থাকবে; তাঁর সামরিক ঘাঁটি কুফা ও হিল্লার মাঝখানে অবস্থিত হবে। কারণ, নাজরানের সন্ন্যাসী নিপীড়িত জনগণের কয়েক প্রতিনিধির সাথে ঐ স্থান থেকেই তাঁর কাছে উপস্থিত হবে। ‘আলী (আ.)-এর হজ্ব গমনপথের ওপর অবস্থিত র্বাস ও ফোরাতের অন্তর্বর্তী এলাকা’- এ বাক্যাংশটি স্বয়ং রাবী অথবা পুস্তক লেখকের পক্ষ থেকে পাদটীকা হতে পারে যা মূল ভাষ্যের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে; আর সম্ভবত المحجّه (আল মুহাজ্জাহ্) শব্দটি যা এ বাক্যের মধ্যে এসেছে তার অর্থ আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর শাসনামলে হজ্ব কাফেলাসমূহের একত্রিত হওয়ার স্থান হতে পারে। অথবা এ স্থানের নামও হতে পারে যেখানে প্রেরিত প্রতিনিধিদল আলী (আ.)-এর সেনাশিবিরে প্রবেশ অথবা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য সমবেত হতো।
ঐ দিন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে (সংঘটিত যুদ্ধে) তিন হাজার (হাজার) লোক নিহত হবে- এ বাক্যটির অর্থ হচ্ছে তিন মিলিয়ন এবং ‘হাজার’ শব্দটিকে বন্ধনীর মধ্যে রাখা হয়েছে এ কারণে যে, ঐ শব্দটি বিহার গ্রন্থের ৫২তম খণ্ডের ২৭৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত একটি রেওয়ায়েতে ছিল এবং খুব সম্ভবত ঐ শব্দটি রেওয়ায়েত থেকে বাদ পড়ে গেছে। অবশ্য তা এতদর্থে নয় যে, বিশ্বযুদ্ধে মোট নিহতদের সংখ্যা তিন মিলিয়ন হবে, বরং এ সংখ্যা ঐ দিনে নিহতদের সংখ্যা অথবা অন্য কোন সময়কালেরও হতে পারে; আর এটি ঐ বিশ্বযুদ্ধের যে কোন একটি পর্যায় বা সর্বশেষ পর্যায়ও হতে পারে। আর আগেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ্বযুদ্ধে ও প্লেগ বা মহামারিতে মৃতের সংখ্যা তখনকার বিশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ হবে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বযুদ্ধের আগেই প্লেগ বা মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটবে। আরেকটি রেওয়ায়েতে মৃতের সংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার সাত ভাগের পাঁচ ভাগ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: “আল কায়েমের আবির্ভাবের আগে দু’ধরনের মৃত্যু থাকবে। একটি লাল মৃত্যু এবং অন্যটি শ্বেত মৃত্যু। (অবস্থা এমন হবে যে) প্রতি সাত জনের মধ্যে পাঁচ জনই প্রাণ হারাবে। (বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ২০৭)
আরো কিছু রেওয়ায়েতে দশ ভাগের নয় ভাগও বর্ণিত হয়েছে…, অবশ্য রেওয়ায়েতসমূহের মধ্যকার পার্থক্য কখনো কখনো অঞ্চলসমূহের পার্থক্যের কারণে অথবা অন্য কারণেও হতে পারে। যাহোক এ বিশ্বযুদ্ধে মুসলমানদের প্রাণহানি ও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ খুব সামান্য বা অনুল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে।
সংক্ষেপে: রেওয়ায়েতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের একটু আগে অথবা তাঁর আবির্ভাবের বছরেই ভয়-ভীতি সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করবে; আর সার্বিকভাবে অমুসলমানরাই ব্যাপক ও ভয়াবহ ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আর একে ব্যাপক যুদ্ধ বলে ব্যাখ্যা করা যায় যে যুদ্ধে উন্নত বিধ্বংসী অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে এবং এর ফলে বিশ্বব্যাপী আতংক ছড়িয়ে পড়বে। কারণ, যদি এ যুদ্ধের পদ্ধতি সনাতনধর্মী হতো তাহলে যে মাত্রায় আতংক রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত হয়েছে সেই মাত্রায় ঐ যুদ্ধ হতো না এবং ভয়-ভীতিও ব্যাপক হতো না অথবা অন্ততপক্ষে বিশ্বের এক বা একাধিক অঞ্চল ভয়-ভীতি, আতংক, লুণ্ঠন ও হত্যাযজ্ঞ থেকে মুক্ত থাকতে পারত।
তবে এমন কিছু সংখ্যক রেওয়ায়েত ও প্রমাণ আছে যেগুলোর মাধ্যমে ঐ বিশ্বযুদ্ধকে কতগুলো আঞ্চলিক যুদ্ধ বলে ব্যাখ্যা করার বিষয়টি প্রাধান্য লাভ করতে পারে। বিশেষ করে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব সংক্রান্ত ইমাম বাকির (আ.)-এর নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন: “বিশ্বের বুকে যুদ্ধসমূহ অগণিত হবে।” এ রেওয়ায়েতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আবির্ভাবের বছরেই অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হবে। তাই এ রেওয়ায়েত ও অন্যান্য রেওয়ায়েত যেগুলোয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাসীদের মধ্যে মতভেদ ও যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কথা উল্লিখিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে আমরা সমন্বয় সাধন করে বলতে পারি যে, এ যুদ্ধগুলো আঞ্চলিক যুদ্ধ আকারে তাদের মধ্যে সংঘটিত হবে। তবে এ সব যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক দিক কেবল পাশ্চাত্যেই কেন্দ্রীভূত থাকবে।
রেওয়ায়েতসমূহ থেকে যা জানা যায় তা হচ্ছে, এ যুদ্ধের সময়কাল ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের কালের খুব নিকটবর্তী হবে, যেমন এ যুদ্ধ তাঁর আবির্ভাবের বছরেই হবে…। যদি আমরা যে সব রেওয়ায়েতে এ যুদ্ধ এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করি তাহলে এ কথা বলাই উত্তম হবে যে, উক্ত বিশ্বযুদ্ধ বহু পর্যায় বিশিষ্ট হবে। কারণ, এ যুদ্ধ মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের কিছু আগে থেকে শুরু হয়ে বাকী পর্যায় তাঁর আবির্ভাবের আন্দোলনের পরেও চলতে থাকবে। এ যুদ্ধ চলাকালেই তিনি হিজায অঞ্চল মুক্ত করবেন। ঐ বিশ্বযুদ্ধ ইরাক বিজয়ের পরে শেষ হবে। আর রুশ জাতি অথবা তাদের বাকী অংশের বিরুদ্ধে ইমাম মাহ্দীর যুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হবার পরেই সংঘটিত হবে। কারণ, রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) সর্বপ্রথম যে সেনাবাহিনীকে গঠন করবেন সেটাকে তিনি তুর্কীদের (রুশজাতি) বিরুদ্ধে প্রেরণ করে তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করবেন।
তবে যে সব রেওয়ায়েতে এ যুদ্ধের কথা বর্ণিত হয়েছে সেগুলো যদি ব্যাপক পারমাণবিক যুদ্ধ বলে ব্যাখ্যা করি এবং আজকের সংবাদ মাধ্যমসমূহে এরূপ যুদ্ধের ব্যাপারে যে সব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রচার ও প্রকাশ করা হচ্ছে সে দিকে ভালোভাবে মনোনিবেশ করি তাহলে অবশ্যই বলতে হবে যে, এ যুদ্ধের সময়কাল খুবই সংক্ষিপ্ত হবে। সংবাদ ও প্রচার মাধ্যমগুলোর বক্তব্য অনুসারে সম্ভবত এ যুদ্ধ এক মাসের বেশি স্থায়ী হবে না। মহান আল্লাহ্ই এ ব্যাপারে একমাত্র ভালো জানেন।
তথ্যসূত্র: ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশ
লেখক: আল্লামা আলী আল কুরানী
অনুবাদ: মোহাম্মদ মুনীর হোসেন খান




