Press "Enter" to skip to content

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার কল্পকাহিনি ও ওহাবীদের ষড়যন্ত্র– ২

মূল: আল্লামা সৈয়দ মুরতযা আসকারী

অনুবাদ নূর হোসেন মজিদী

ইতঃপূর্বে যেমন উল্লেখ করেছি, বিগত হাজার বছর যাবৎ যেসব ঐতিহাসিক আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা সম্পর্কিত কল্পকাহিনি বর্ণনা করেছেন তাঁদের সকলেরই মূল তথ্যসূত্র হচ্ছে মাত্র একজন। সে হচ্ছে সাইফ্ বিন ওমর তামীমী। এখন আমরা তার অবস্থা ও তার রেওয়ায়েতসমূহ পর্যালোচনা করব।

কে এই সাইফ?

সাইফ্ বিন্ ওমর বনু তামীমের শাখাগোত্র বনু উসাইয়্যাদের লোক। এ কারণে তাকে “উসাইয়‍্যাদী তামীমী” হিসেবে অভিহিত করা হয়। এছাড়া বনু তামীমের অপর এক শাখাগোত্র বারজামের সাথে বনু উসাইয়‍্যাদের মৈত্রী-বন্ধন থাকায় তাকে “তামীমী বারজামী”ও বলা হয়।

সাইফ বিন্ ওমর কৃফার অধিবাসী ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাকে “কৃষ্ণী বংশোদ্ভূত বাগদাদী” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সাফীউদ্দীন তাঁর “খুলাছাতুত্ তাহযীব্‌” গ্রন্থে সাইফের মৃত্যু হিজরি ১৭০ সালে বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইসমাঈল বাগদাদী তাঁর “হিদাইয়াতুল্ ‘আরেফীন” গ্রন্থে সাইফের মৃত্যু হিজরি ২০০ সালে বলে লিখেছেন।

সাইফের রেওয়ায়েতসমূহ

যেহেতু তৎকালে ঐতিহাসিকগণ তাঁদের বর্ণিত ঘটনাবলির বিস্তারিত ও ধারাবাহিক সূত্র উল্লেখ করতেন সেহেতু স্বীয় রচিত কল্পকাহিনিগুলোকে সত্যিকারের ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিশ্বাস করানোর লক্ষ্যে সাইফ একটি ঘটনাকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করে এবং প্রতিটি ভাগের জন্যে স্বতন্ত্র ধারাবাহিক সনদ (বর্ণনাকারী পরম্পরা) তৈরি করে উপস্থাপন করে। সে এ পদ্ধতিতে দু’টি পুস্তক রচনা করে-

১) আল্-ফুতূহুল্ কাবীর ওয়ার্-রিদ্দাহ্ এ পুস্তকে সে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ওফাতের সমসাময়িককালের ঘটনাবলি থেকে শুরু করে হযরত ওসমানের খেলাফতের সময় পর্যন্তকার ঘটনাবলি বর্ণনা করেছে। এ পুস্তকেই সে খলিফা হযরত আবুবকর কর্তৃক মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘটনাবলিও বর্ণনা করেছে। এরপর সে মুসলমানদের দ্বারা পূর্ব রোম সাম্রাজ্যভুক্ত এলাকা শাম ও ফিলিস্তিন এবং ইরান বিজয়ের ঘটনাবলি উল্লেখ করেছে। এসব ক্ষেত্রে সে অনেক অবাস্তব কল্পকাহিনিও পরিবেশন করেছে।

২) আল্-জামাল্ ওয়া মাসীরু ‘আয়েশাতা ওয়া ‘আলী: এ পুস্তকে সে খলিফা ওসমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও তাঁকে হত্যার এবং জঙ্গে জামালের ঘটনাবলি বর্ণনা করেছে। সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি সম্পর্কে তার রেওয়ায়েতসমূহ পর্যালোচনা করলে এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এ পুস্তক রচনার পিছনে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বনু উমাইয়্যাহর প্রতি সমর্থন জানানো।

উপরিউক্ত দু’টি পুস্তক রচনা ছাড়াও সাইফের আরো কিছু রেওয়ায়েত রয়েছে যা ডজন ডজন গ্রন্থের মাধ্যমে বর্তমান যুগ পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং ঐতিহাসিকগণের নিকট তার পুস্তক দু’টি ও অন্যান্য রেওয়ায়েত ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দলিল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

ত্বাবারী তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে হিজরি ১১ সাল থেকে ৩৬ সাল পর্যন্তকার ঘটনাবলি বর্ণনার ক্ষেত্রে সাইফের রেওয়ায়েতসমূহ ব্যবহার করেছেন।

তাঁর পরে ইবনে ‘আসাকেরও তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে সাইফের রেওয়ায়েত গ্রহণ করেছেন।

এছাড়া আরো অনেক বিখ্যাত মনীষী রাসূলে আকরাম (সা.)-এর কতক সাহাবির পরিচয় ও তাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি বর্ণনার ক্ষেত্রে সাইফের রেওয়ায়েত গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন-

ইবনে আবদুল বার (ওফাত ৪৩৬ হি.) তাঁর “আল্-ইস্তি’আব্‌” গ্রন্থে।

ইবনে আছীর (ওফাত ৬৩০ হি.) তাঁর “উদুল গাবাহ্” গ্রন্থে।

আবু যাহাবী (ওফাত ৭৪৮ হি.) তাঁর “আত্-তান্ত্রীদ” গ্রন্থে।

ইবনে হাজার ‘আস্কালানী (ওফাত ৮৫২ হি.) তাঁর “আল-ইছাবাতু ফী তামিযিছু ছাহাবাহ্” গ্রন্থে।

তাঁরা সাইফ বর্ণিত কতক কাল্পনিক ব্যক্তিকে সাহাবি হিসেবে গণ্য করেছেন এবং সাইফের রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে তাদের পরিচয় উল্লেখ করেছেন। এসব গ্রন্থ পর্যালোচনা করলে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এদের মধ্যে এমন প্রায় দেড় শ’ ব্যক্তির আদৌ কোনো অস্তিত্ব ছিল না; কেবল সাইফের কল্পনাই এদের অস্তিত্বদান করেছে। সাইফ এসব কাল্পনিক ব্যক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে, সাইফের বর্ণনাকে বিশ্বাস করার কারণে এসব মনীষী ঐসব কাল্পনিক লোককে সাহাবি হিসেবে গণ্য করেছেন।’ (যেমন, সাইফ কাউকে সেনাপতি হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং এ কারণে মনীষীগণ তাকে সাহাবি হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ, স্বয়ং সাইফও উল্লেখ করেছে যে, তৎকালে নিয়ম ছিল এই যে, কেবল সাহাবিদেরকেই সেনাপতিত্ব করতে দেয়া হতো)

মুসলিম ভূগোলবিদগণও সাইফের রেওয়ায়েত গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে ইয়াকুত হামাভী তাঁর “মু’জামুল্ বুল্দান্” গ্রন্থে এবং ছাফীউদ্দীন তাঁর “মিরছাদুল্ ইত্তিলা” গ্রন্থে তার রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে এমন এমন শহরের বর্ণনা দিয়েছেন সাইফের মস্তিষ্ক ছাড়া বাস্তবে যার কোথাও অস্তিত্ব ছিল না।

অতএব, সাইফ কেবল আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামক একজন কল্পিত নায়ক তৈরি করে ও তার নামে কল্পকাহিনি রচনা করে বিরত থাকেনি, বরং সে ইতিহাসের নামে আরো শত শত কাল্পনিক ঘটনা ও শত শত নায়ক তৈরি করেছে।

এসব কল্পকাহিনি শত শত হাদিস, তাফসীর, ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য ও বংশধারাবিষয়ক গ্রন্থে দৃঢ়মূল হয়ে স্থান করে নিয়েছে। তাই সাইফের নির্ভরযোগ্যতা ও অনির্ভরযোগ্যতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া অপরিহার্য। এ ব্যাপারে প্রথমেই দেখা প্রয়োজন যে, ‘ইল্মে রিজালের গ্রন্থাবলিতে সাইফ সম্পর্কে কী অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। এরপর আমরা তার রেওয়ায়েতসমূহ নিয়ে আলোচনা করব।

লমে রিজালের দৃষ্টিতে সাইফ

১) “সুনানে আবু দাউদ”-এর সংকলক আবু দাউদ (ওফাত ২৭৫ হি.) বলেন- “মূল্যহীন; সে অনেক বেশি মিথ্যা কথা বলেছে।”

২) ইবনে আবি হাতেম (ওফাত ৩২৭ হি.) বলেন “তাঁরা (হাদিস বিশেষজ্ঞগণ) তার বর্ণিত হাদিস বর্জন করেছেন।”

৩) “সহিহ্ নাসায়ী”র সংকলক নাসায়ী (ওফাত ৩০৩ হি.) বলেন-“সে দুর্বল’; (হাদিসশাস্ত্রের পরিভাষায় কোনো বর্ণনাকারীকে দুর্বল বলা মানে তাকে ও তার রেওয়ায়েতকে অনির্ভরযোগ্য ও অবিশ্বস্ত গণ্য করা। -অনুবাদক) “তাঁরা (হাদিস বিশেষজ্ঞগণ) তার বর্ণিত হাদিস বর্জন করেছেন। সে নির্ভরযোগ্যও নয়, বিশ্বস্ত (আমানতদার)ও নয়।”

৪) ইবনে সাকান (ওফাত ৩৫৩ হি.) বলেন-“দুর্বল।”

৫) ইবনে হাব্বান (ওফাত ৩৫৪ হি.) বলেন “সে নিজে যেসব হাদিস তৈরি করেছে সেগুলোকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের নামে চালিয়ে “সাইফকে যিন্দিক’ (নাস্তিক) বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। (হাদিস বিশেষজ্ঞগণ) বলেছেন, সে মিথ্যা হাদিস রচনা করেছে।

৬) দারে কুতনী (ওফাত ৩৮৫ হি.) বলেন “দুর্বল। তাঁরা (হাদিস বিশেষজ্ঞগণ) তার বর্ণিত হাদিস বর্জন করেছেন।”

৭) “মুস্তাদরাকে হাকেম”-এর সংকলক হাকেম নিশাপুরী (ওফাত ৪০৫ হি.) বলেন-“(হাদিস বিশেষজ্ঞগণ) তার হাদিসকে বর্জন করেছেন। সে যিন্দিক বলে অভিযুক্ত হয়েছে।”

৮) ইয়াহইয়া বিন মু’ঈন (ওফাত ৬৩৩ হি.) সাইফ সম্পর্কে বলেন -“তার বর্ণিত হাদিস দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য।”

-“দুর্বল।” ৯) “কামুস্” গ্রন্থের প্রণেতা ফিরোজাবাদী (ওফাত ৮১৭ হি.) বলেন

-“দুর্বল।” ১০) ইবনে হাজার ‘আস্ফালানী (ওফাত ৮৫২ হি.) বলেন

১১) সুয়ূতী (ওফাত ৯১১ হি.) বলেন “অত্যন্ত দুর্বল।”

১২) ছাফীউদ্দীন (ওফাত ৯২৩ হি.) বলেন-“(হাদিস বিশেষজ্ঞগণ) তাকে দুর্বল বলে গণ্য করেছেন।”

এ হলো সাইফ সম্পর্কে ‘ইল্মে রিজালের মনীষীগণের অভিমত। অতঃপর আমরা তার বর্ণিত রেওয়ায়েত নিয়ে আলোচনা করব যা থেকে সে যে মিথ্যা হাদিস রচনাকারী এবং তার রেওয়ায়েতের কোনোই মূল্য নেই তা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। (আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামক কাল্পনিক চরিত্র ও তার নামে কল্পকাহিনি রচয়িতা সাইফ সম্পর্কে নিম্নোক্ত সূত্রসমূহে বিস্তারিত উল্লখ করা হয়েছে ১) ফিহরিস্তে ইবনে নাদীম, ২) ইমাম রাযীর “জারদ ওয়া তা’দীল”, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৭৮ ও ২য় খণ্ড, পৃ. ১৩৬, ৩) আল-ইস্তি’আব, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৫২, ৪) আল্-ইছাবাহু ফী তামিযীছ সাহাবাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৭৫, ৫) যাহাবীর “মীযানুল ই’তিদাল”, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৩৮, ৬) ইবনে হাজারের “তাহযীবুত তাহযীব”, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ২৯৫, ৭) ছাফীউদ্দীনের খুলাছাতুত তাহযীব”, পৃ. ১২৬, ৮) ইসমাঈল বাগদাদীর “হিদাইয়াতুল ‘আরেফীন”, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪১৩, ৯) হাজী খালীফাহর “কাশফুষ যুনূন্”, পৃ. ১২৪, ১০) যুবায়দীর “তাজুল ‘আরূস”, “সাইফ’ শব্দের ব্যাখ্যা)

চলবে …..