আমিরে মুয়াবিয়ার ফযিলত হিসেবে খুব ফলাও করে প্রচার করা হয় যে, তিনি নবীজীর (সা.) পক্ষ থেকে কাতিবে ওহি বা ওহি লেখক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অপ্রমাণিত তথ্য এটি। আব্বাসি আমলে আমিরে মুয়াবিয়ার নামে এই মর্মে বহু হাদিস জাল করা হয়, আর তখন থেকেই এই বক্তব্য প্রসিদ্ধি লাভ করে।
মুয়াবিয়া ওহি লেখক ছিলেন এর পক্ষে একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয় যা ইমাম বায়হাকি তার দালায়েলুন নুবুওয়াত বইতে উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাটি বেশ বিখ্যাত যাতে নবীজী (সা.) শানে রিসালাতের প্রতি মুয়াবিয়ার বেয়াদবির কারণে বদদোয়া করেন। ইবনে আব্বাস থেকে তার ছাত্র আবু হামযার সূত্রে হাদিসটি আবু আওয়ানা ও শো’বা বর্ণনা করেছেন। একাধিক সূত্রে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে সহিহ মুসলিম, মুসনাদে আবু দাউদ আত-তায়ালিসি, মুসনাদে আহমদ, বালাযুরির আনসাবুল আশরাফ এবং বায়হাকির দালায়েল বইতে।
ইমাম মুসলিম হাদিসটি তার সহিহতে হাদিসটি শো’বার সূত্রে বর্ণনা করেছেন উমাইয়া বিন খালেদ এবং নাদ্বর বিন শুমাইল থেকে। তার বর্ণনাটি নিম্নরূপ:
عن ابن عباس قال : كُنْتُ أَلْعَبُ مَعَ الصِّبْيَانِ، فَجَاءَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَتَوَارَيْتُ خَلْفَ بَابٍ قَالَ: فَجَاءَ فَحَطَأَنِي حَطْأَةً وَقَالَ: اذْهَبْ وَادْعُ لِيَ مُعَاوِيَةَ قَالَ: فَجِئْتُ فَقُلْتُ: هُوَ يَأْكُلُ قَالَ: ثُمَّ قَالَ لِيَ: اذْهَبْ فَادْعُ لِيَ مُعَاوِيَةَ قَالَ: فَجِئْتُ فَقُلْتُ: هُوَ يَأْكُلُ فَقَالَ: لَا أَشْبَعَ اللهُ بَطْنَهُ
“হযরত ইবনে আব্বাস বলেন, আমি বাচ্চাদের সাথে খেলছিলাম। এমন সময় আল্লাহর রাসুল আসেন। আমি এক দরজার পেছনে লুকিয়ে পড়ি। নবীজী আমার কাছে আসেন এবং আমাকে চাপড় মেরে বলেন, যাও, মুয়াবিয়াকে ডেকে আনো। আমি গিয়ে এসে বললাম, সে খাচ্ছে। নবীজী বললেন, আবার যাও এবং মুয়াবিয়াকে ডেকে আনো। আমি গেলাম এবং বললাম, সে খাচ্ছে। নবীজী (সা.) বলে ওঠেন, আল্লাহ যেন তার পেট কখনো না ভরেন।”
বালাযুরির আনসাবুল আশরাফেও শো’বার সূত্রে আবু হামযা থেকে বর্ণিত হয়েছে। তবে এটা মুহাম্মদ আওয়ার থেকে। বর্ণনাটি নিম্নরূপ:
سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ يَقُولُ: مَرَّ بِي رَسُول اللَّهِ ﷺ وأنا أَلْعَبُ مَعَ الْغِلْمَانِ فَاخْتَبَأْتُ مِنْهُ خَلْفَ بَابٍ، فَدَعَانِي فَحَطَأَنِي حَطَأَةً ثُمَّ بَعَثَنِي إِلَى مُعَاوِيَةَ، فَرَجَعْتُ إِلَيْهِ فَقُلْتُ: هُوَ يَأْكُلُ، ثُمَّ بَعَثَنِي إِلَيْهِ فَقُلْتُ: هُوَ يَأْكُلُ بَعْدُ، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: لا أَشْبَعَ اللَّهُ بطنه، قال أبو حمزة: فَكَانَ مُعَاوِيَةُ بَعْدَ ذَلِكَ لا يَشْبَعُ.
“আমি ইবনে আব্বাসকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমার পাশ দিয়ে আল্লাহর রাসুল অতিক্রম করেন, আমি তখন বাচ্চাদের সাথে খেলছিলাম। আমি একটি দরজার পেছনে লুকিয়ে পড়ি। তিনি আমাকে ডাকেন এবং চাপড় দেন। তারপর মুয়াবিয়ার কাছে পাঠান। আমি ফিরে এসে বললাম, সে খাচ্ছে। তিনি আমাকে আবার পাঠান, আমি এসে বললাম, সে এখনো খাচ্ছে। এতে নবীজী সা. বলেন, আল্লাহ যেন কখনো তার পেট না ভরেন। আবু হামযা বলেন, তারপর থেকে তার পেট ভরে নি।”
আবু হামযা থেকে শো’বার এই বর্ণনায় মুয়াবিয়াকে কী প্রয়োজনে ডাকা হয়েছিল তার কোন উল্লেখ নেই। তবে আবু হামযা থেকে আবু আওয়ানার বর্ণনাতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। আবু আওয়ানার সূত্রে এই হাদিসটি দুইটি ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে মুসনাদে আহমদ এবং মুসনাদে তায়ালিসিতে বর্ণিত হয়েছে। এই বর্ণনাগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, মুয়াবিয়া নবীজীর লেখক ছিল। কিন্তু ওহি লেখক ছিল এমন কোন বর্ণনা নেই।
যেমন মুসনাদে আহমদে এটি আবু আওয়ানা থেকে আবু বিশরের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে,
سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ، يَقُولُ: كُنْتُ غُلامًا أَسْعَى مَعَ الْغِلْمَانِ، فَالْتَفَتُّ، فَإِذَا أَنَا بِنَبِيِّ اللهِ ﷺ، خَلْفِي مُقْبِلًا، فَقُلْتُ: مَا جَاءَ نَبِيُّ اللهِ ﷺ إِلا إِلَيَّ، قَالَ: فَسَعَيْتُ حَتَّى أَخْتَبِئَ وَرَاءَ بَابِ دَارٍ، قَالَ: فَلَمْ أَشْعُرْ حَتَّى تَنَاوَلَنِي، فَأَخَذَ بِقَفَايَ، فَحَطَأَنِي حَطْأَةً، فَقَالَ: «اذْهَبْ فَادْعُ لِي مُعَاوِيَةَ» قَالَ: وَكَانَ كَاتِبَهُ، فَسَعَيْتُ فَأَتَيْتُ مُعَاوِيَةَ، فَقُلْتُ: أَجِبْ نَبِيَّ اللهِ ﷺ، فَإِنَّهُ عَلَى حَاجَةٍ
“আবু হামযা বলেন, আমি ইবনে আব্বাসকে বলতে শুনেছি, আমি ছোট ছিলাম এবং বাচ্চাদের সাথে খেলছিলাম। হঠাত আমি আল্লাহর নবিকে দেখলাম তিনি পেছন থেকে আমার দিকে আসছেন। আমি ভাবলাম, আল্লাহর নবি আমার উদ্দেশ্যেই আসছেন। আমি দৌড়ে এক ঘরের পেছনে লুকালাম। তিনি বলেন, নবীজি আমাকে ধরে ফেলার আগ পর্যন্ত আমি টের পাই নি। তিনি আমার মাথা ধরলেন এবং একটা চাপড় দিলেন। তারপর বললেন, যাও মুয়াবিয়াকে ডেকে আনো। তিনি বলেন, মুয়াবিয়া তার লেখক ছিলেন। তারপর আমি দৌড়ে মুয়াবিয়ার কাছে গেলাম এবং বললাম, আল্লাহর নবীর ডাকে সাড়া দাও, তার একটি প্রয়োজন আছে।”
আবু আওয়ানা থেকে দ্বিতীয় সূত্রটি পাওয়া যায় মুসনাদে তায়ালিসিতে হুশাইমের সূত্রে এই মর্মে:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، «أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ بَعَثَ إِلَى مُعَاوِيَةَ يَكْتُبُ لَهُ، فَقَالَ: إِنَّهُ يَأْكُلُ. ثُمَّ بَعَثَ إِلَيْهِ فَقَالَ: إِنَّهُ يَأْكُلُ. فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: لَا أَشْبَعَ اللهُ بَطْنَهُ»
“ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসুল (সা.) তার হয়ে লেখার জন্য মুয়াবিয়ার উদ্দেশ্যে ইবনে আব্বাসকে পাঠান। তিনি বললেন, সে খাচ্ছে। নবীজী আবার তার কাছে পাঠালে তিনি বললেন, সে খাচ্ছে। এতে আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, তার পেট যেন আল্লাহ কখনো না ভরেন।”
শো’বা থেকে তিনটি সূত্রে বর্ণিত বিবরণের সাথে যদি আবু আওয়ানার এই দুইটি বর্ণনা তুলনা করেন, তাহলে দেখবেন যে, শো’বা কিংবা আবু আওয়ানা কারো বর্ণনাতেই ওহির কথা উল্লেখ নেই, তবে উভয়ের বর্ণনাতেই মুয়াবিয়ার বেয়াদবির কারণে নবীজীর করা বদদোয়ার কথা উল্লেখ আছে। আবু আওয়ানার বর্ণনাতে অতিরিক্ত কথা এসেছে যে, নবীজী লেখার জন্য মুয়াবিয়াকে ডেকে ছিলেন যা শো’বার বর্ণনাতে নেই। এ থেকে বোঝা যায় যে, এটা ইবনে আব্বাস কিংবা তার ছাত্র আবু হামযার বক্তব্য না। বরং আবু হামযার ছাত্র আবু আওয়ানার মন্তব্য, আর এই কারণে শো’বা থেকে আগত তিনটি বর্ণনার কোনটাতে লেখার কথা না থাকলেও আবু আওয়ানার সবগুলো বর্ণনাতে এটা আছে। তবে আবু আওয়ানার এই বর্ণনা দুইটিতেও কেবল লেখার কথা আছে, ওহি লেখার কথা নেই।
তাহলে ওহি লেখার কথা কোত্থেকে আসল? এটা এসেছে বায়হাকির দালায়েলুন নবুওয়াত বইতে। এখানেও কথা আছে। বায়হাকি শো’বা ও আবু আওয়ানা দুইজনের সূত্রেই বর্ণনা করেছেন। শো’বার হাদিস বর্ণনা করেছেন সরাসরি নিজের শিক্ষকদের সূত্রে। তিনি বলেছেন,
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ الْحَافِظُ أَنْبَأَنَا أَبُو الْفَضْلِ بْنُ إِبْرَاهِيمَ حَدَّثَنَا أحمد ابن سَلَمَةَ، حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ مَنْصُورٍ أَنْبَأَنَا النَّضْرُ بْنُ شُمَيْلٍ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ حَدَّثَنَا أَبُو حَمْزَةَ ، قَالَ سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ
“আমাদের হাফেয মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বলেছেন, আমাদের আবুল ফযল বিন ইব্রাহিম জানিয়েছেন, আমাদের আহমদ বিন সালামা বলেছেন, আমাদের ইসহাক বিন মনসুর বলেছেন, আমাদের নাদ্বর বিন শুমাইল জানিয়েছেন, আমাদের শো’বা বলেছেন, আমাদের আবু হামযা বলেছেন, আমি ইবনে আব্বাসকে বলতে শুনেছি”
শো’বার সূত্রে বর্ণিত এই হাদিস মূলত সহিহ মুসলিমের হাদিস। আর এখানেও কী কারণে লিখতে ডেকেছিলেন তার উল্লেখ নেই। দ্বিতীয় হাদিসটি আবু আওয়ানা থেকে মুসা বিন ইসমাইলের সূত্রে বায়হাকি তার সহপাঠি ইমাম হাকিমের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কেবলমাত্র এই বর্ণনাতেই আছে যে, মুয়াবিয়া ওহি লেখক ছিলেন। লক্ষ্যনীয় যে, বায়হাকি এটা তার নিজের শিক্ষকদের থেকে সরাসরি শোনেন নি, বরং ইমাম হাকিমের সূত্রে শুনেছেন। বর্ণনাটি নিম্নরুপ –
أَخْبَرَنَاهُ أَبُو عَبْدِ اللهِ الْحَافِظُ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ حَمْشَادَ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عَلِيٍّ، حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ أَبِي حَمْزَةَ، قَالَ:
سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ، قَالَ: كُنْتُ أَلْعَبُ مَعَ الْغِلْمَانِ فَإِذَا رَسُولُ اللهِ ﷺ قَدْ جَاءَ فَقُلْتُ: مَا جَاءَ إِلَّا إِلَيَّ فَاخْتَبَأْتُ عَلَى بَابِ فَجَاءَ فَحَطَأَنِي حَطْأَةً فَقَالَ: «اذْهَبْ فَادْعُ لِي مُعَاوِيَةَ» وَكَانَ يَكْتُبُ الْوَحْيَ قَالَ: فَذَهَبْتُ فَدَعَوْتُهُ لَهُ فَقِيلَ: إِنَّهُ يَأْكُلُ، فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَأَخْبَرْتُهُ فَقَالَ: «فَاذْهَبْ فَادْعُهُ» فَأَتَيْتُهُ فَقِيلَ: إِنَّهُ يَأْكُلُ، فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَأَخْبَرْتُهُ فَقَالَ فِي الثَّالِثَةِ: «لَا أَشْبَعَ اللهُ بَطْنَهُ»، قَالَ: فَمَا شَبِعَ بَطْنُهُ»، قَالَ: فَمَا شبع بَطْنُهُ أَبَدًا
“আমাদের হাফেয আবু আব্দিল্লাহ (ইমাম হাকিম) জানিয়েছেন, আমাদের আলী বিন হামশাদ বলেছেন, আমাদের হিশাম বিন আলী বলেছেন, আমাদের মুসা বিন ইসমাইল বলেছেন, আমাদের আবু আওয়ানা বলেছেন আবু হামযা থেকে, আমি ইবনে আব্বাসকে বলতে শুনেছি, “আমি বাচ্চাদের সাথে খেলছিলাম। এমন সময় আল্লাহর রাসুল এলেন। আমি ভাবলাম তিনি আমার জন্যই এসেছেন। আমি এক বাড়ির পেছনে লুকালাম, তিনি এসে আমাকে চাপড় দিলেন এবং বললেন, যাও মুয়াবিয়াকে ডেকে আনো। আর সে ওহি লিখত। আমি গেলাম এবং তাকে ডাকলাম। বলা হল, সে খাচ্ছে। আমি নবীজীর কাছে ফিরে এসে জানালাম। নবীজী বললেন, যাও তাকে ডেকে আনো। আমি গেলাম এবং বলা হল, সে খাচ্ছে। আমি আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে জানালাম। তিনি তৃতীয় দফায় বললেন, আল্লাহ তার পেট যেন না ভরেন। তিনি বলেন, তার পেট আর কখনো ভরে নি।”
তাহলে দেখা যাচ্ছে, মুয়াবিয়া ওহি লিখতেন – দালায়েলুন নবুওয়াতে বায়হাকির এই বর্ণনাটি অপরাপর পাঁচ-পাঁচটি ভিন্ন বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক। শো’বা থেকে তিনটি সূত্রে লেখালিখির কোন উল্লেখই নেই। আবু আওয়ানা থেকে দুইটি সূত্রে ওহি লেখার কথা নেই। কেবল এই বর্ণনাটিতে এসেছে, আর সেটাও বায়হাকি নিজের শিক্ষকদের সূত্রে সরাসরি বর্ণনা না করে ইমাম হাকিমের বরাতে উল্লেখ করেছেন। এই বর্ণনাতে দেখবেন “আলী বিন হামশাদ > হিশাম বিন আলী > মুসা বিন ইসমাইল” এই তিন ব্যাক্তির সূত্র আছে। ইমাম হাকিম তার বিখ্যাত মুসতাদরাক গ্রন্থে এই তিনজনের সূত্রে বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন, কিন্তু বায়হাকি ইমাম হাকিমের বরাতে যে বর্ণনা উল্লেখ করলেন, সেটা মুসতাদরাকে ইমাম হাকিম স্থান দেন নি! পাঁচটি বর্ণনার সাথে সাঙ্ঘর্ষিক হওয়ার পাশাপাশি খোদ হাকিমের হাদিস হাকিমের বইতে না থাকা থেকে প্রমাণ হয়ে যায় যে, এই বর্ণনা ভূল ও বিভ্রাটযুক্ত।
বিষয়টা আরো পরিষ্কার হয় যদি খোদ ইমাম বায়হাকির সুনানুল কুবরাতে নবীজীর লেখকদের পরিচিতি নিয়ে বায়হাকির আলোচনা দেখেন। সেখানেও মুয়াবিয়াকে দাপ্তরিক ও চিঠিপত্র লেখালিখির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি ইমাম বায়হাকির দালায়েলে উল্লিখিত হাদিসটি খোদ বায়হাকির দৃষ্টিতেই শুদ্ধ হত, তিনি অবশ্যই মুয়াবিয়াকে ওহি লেখক বলে পরিচয় দিতেন।
বায়হাকি তার সুনানে কুবরাতে লেখেন,
اسْتَكْتَبَ عَبْدَ اللهِ بْنَ أَرْقَمَ فَكَانَ يَكْتُبُ عَبْدُ اللهِ بْنُ أَرْقَمَ، وَكَانَ يُجِيبُ عَنْهُ الْمُلُوكَ، فَبَلَغَ مِنْ أَمَانَتِهِ أَنَّهُ كَانَ يَأْمُرُهُ أَنْ يَكْتُبَ إِلَى بَعْضِ الْمُلُوكِ فَيَكْتُبَ، ثُمَّ يَأْمُرُهُ أَنْ يَكْتُبَ وَيَخْتِمَ وَلَا يَقْرَأَه – لِأَمَانَتِهِ عِنْدَهُ – ثُمَّ اسْتَكْتَبَ أَيْضًا زَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ فَكَانَ يَكْتُبُ الْوَحْيَ، وَيَكْتُبُ إِلَى الْمُلُوكِ أَيْضًا، وَكَانَ إِذَا غَابَ عَبْدُ اللهِ بْنُ أَرْقَمَ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ وَاحْتَاجَ أَنْ يَكْتُبَ إِلَى بَعْضِ أُمَرَاءِ الْأَجْنَادِ وَالْمُلُوكِ، أَوْ يَكْتُبَ لِإِنْسَانٍ كِتَابًا يُقْطِعَهُ، أَمَرَ جَعْفَرًا أَنْ يَكْتُبَ، وَقَدْ كَتَبَ لَهُ عُمَرُ وَعُثْمَانُ وَكَانَ زَيْدٌ وَالْمُغِيرَةُ وَمُعَاوِيَةُ وَخَالِدُ بْنُ سَعِيدِ بْنِ الْعَاصِ وَغَيْرُهُمْ مِمَّنْ قَدْ سُمِيَّ مِنَ الْعَرَبِ
“নবীজী আব্দুল্লাহ বিন আরকামকে লেখক হিসেবে গ্রহণ করেন। আব্দুল্লাহ বিন আরকাম লিখতেন এবং রাজাবাদশাদের উত্তর দিতেন। তার আমানত এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নবীজী তাকে কোন কোন রাজাবাদশার কাছে লিখতে আদেশ দিতেন। তিনি লিখতেন ও সিলমোহর করে দিতেন, নবীজীর কাছে তার বিশ্বস্ততার কারণে পড়ে শুনাতেন না। অতঃপর তিনি যায়দ বিন সাবেতকে লেখক হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি ওহি লিখতেন এবং রাজাবাদশাদের কাছেও লিখতেন। আব্দুল্লাহ বিন আরকাম ও যায়দ বিন সাবেত যদি না থাকতেন এবং সেনাপ্রধান কিংবা কোন রাজার কাছে কিংবা কোন মানুষের কাছে চিঠি লিখতে হত, তিনি জাফরকে আদেশ দিতেন। ওমর এবং ওসমানও তার জন্য লিখেছেন। এছাড়াও যায়দ, মুগিরা, মুয়াবিয়া, খালিদ বিন সাইদ বিন আস সহ আরো অনেক আরবের নাম উল্লেখ করা হয়।”
এরপরেও যদি কেউ একরোখামি থেকে দাবি করে দালায়েলুন নবুওয়াতের এই বিচ্ছিন্ন হাদিসটি শুদ্ধ এবং মুয়াবিয়াকে নবীজী ওহি লিখতেই ডেকেছিলেন, তারপরও মুয়াবিয়া নবীকে দাঁড় করিয়ে রেখে ভোজনবিলাসে মজে ছিলেন, তাহলে কী প্রমাণ হয়? প্রমাণ হয় যে, মুয়াবিয়ার জন্য ওহি লেখা একটা বিরক্তিকর কাজ ছিল এবং ওহি লেখার চাইতে নিজের নিজের উদরপূর্তি করা তার কাছে ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সম্মান দিতে গিয়ে অপমান করে ফেললে তো সমস্যা!
নবীজী যে মুয়াবিয়াকে ওহি লেখার জন্য নয়, বরং কোন প্রশাসনিক চিঠি লেখার জন্য ডেকেছিলেন সেটা ইবনে সিরিনের এই বর্ণনা থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায়। বালাযুরি তার আনসাবে বলেন,
الْمَدَائِنِيُّ عَنْ أَبِي أَيُّوبَ عَنْ هِشَامِ بْنِ حَسَّانٍ عَنِ ابْنِ سِيرِينَ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ بَعَثَ إِلَى مُعَاوِيَةَ لِيَكْتُبَ لَهُ شَيْئًا فَقَالَ الرَّسُولُ: هُوَ يَأْكُلُ، ثُمَّ أَعَادَهُ فَقَالَ: هُوَ يَأْكُلُ، فَقَالَ: لا أَشْبَعَ اللَّهُ بَطْنَهُ
“আল-মাদাইনি আবু আইউব থেকে তিনি হিশাম বিন হাসসান থেকে, তিনি ইবনে সিরিন থেকে বলেন, নবীজী সা. মুয়াবিয়াকে কিছু একটা লিখতে ডেকে পাঠান। দূত জবাব দেয়, সে খাচ্ছে। তিনি আবার পাঠান, দূত বলে, সে খাছে। নবীজী বলেন, আল্লাহ তার পেট কখনো না ভরুক।”
আল-মাদাইনি থেকেই ইবনে হাজার আসকালানি তার আল-ইসাবা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে,
وقال المدائنيّ: كان زيد بن ثابت يكتب الوحي، وكان معاوية يكتب للنبيّ فيما بينه وبين العرب
“আল-মাদাইনী বলেন, যায়েদ বিন সাবেত লিখতেন ওহি। আর মুয়াবিয়া নবীর হয়ে তার ও আরবদের মাঝে (চিঠি) লিখতেন।”
এটা কেবল আল-মাদাইনি কিংবা বায়হাকি নয়, বরং প্রায় সকল ঐতিহাসিকদের বক্তব্য।
ইবনে জারীর তাবারী তার তারিখ এ নবীজীর লেখকদের পরিচিতি এভাবে দিয়েছেন –
على بن ابى طالب ع وعثمان بن عفان، كانا يكتبان الوحي، فإن غابا كتبه أبي بن كعب وزيد بن ثابت. وكان خالد بن سعيد بن العاص ومعاوية بن أبي سفيان يكتبان بين يديه في حوائجه. وكان عبد الله بن الأرقم بن عبد يغوث والعلاء بن عقبة يكتبان بين القوم في حوائجهم، وكان عبد الله بن الأرقم ربما كتب إلى الملوك عن النبي ص
“আলী বিন আবি তালেব এবং ওসমান বিন আফফান ওহি লিখতেন। তাদের অনুপস্থিতিতে উবাই বিন কাব ও জায়েদ বিন সাবেত ওহি লিখতেন। আর খালিদ বিন সাঈদ বিন আস ও মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান নবীজীর সামনে তার প্রয়োজনীয় বিষয়ে লিখতেন। এদিকে আবদুল্লাহ বিন আরকাম বিন আব্দে ইয়াগুস এবং আলা বিন উকবা গোত্রের উদ্দেশ্যে তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়ে লিখতেন। কখনো কখনো আবদুল্লাহ বিন আরকাম নবীজীর হয়ে রাজাবাদশার জন্য লিখতেন।”
ইবনে আব্দে রাব্বিহি আল আন্দালুসি (মৃত্যু ৩২৭ হি) তার বিখ্যাত আল ইকদুল ফরিদ গ্রন্থে বলেন,
كتاب النبي ﷺ:
فمن أهل هذه الصناعة: علي بن أبي طالب كرم الله وجهه، وكان مع شرفه ونبله وقرابته من رسول الله ﷺ يكتب الوحي، ثم أفضت عليه الخلافة بعد الكتابة، وعثمان بن عفان- كانا يكتبان الوحي، فإن غابا كتب أبيّ بن كعب وزيد بن ثابت، فإن لم يشهد واحد منهما، كتب غيرهما. وكان خالد بن سعيد بن العاص، ومعاوية بن أبي سفيان، يكتبان بين يديه في حوائجه. وكان المغيرة بن شعبة، والحصين بن نمير، يكتبان ما بين الناس، وكانا ينوبان عن خالد ومعاوية إذا لم يحضرا. وكان عبد الله بن الأرقم بن عبد يغوث، والعلاء بن عقبة، يكتبان بين القوم في قبائلهم ومياههم، وفي دور الأنصار بين الرجال والنساء. وكان ربما كتب عبد الله بن الأرقم إلى الملوك عن النبي ﷺ وعلى آله. وكان حذيفة بن اليمان يكتب خرص «١» ثمار الحجاز. وكان زيد بن ثابت يكتب إلى الملوك مع ما كان يكتبه من الوحي
“নবীজীর লেখকগণ
এই কাজের দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের মাঝে আছেন, আলী বিন আবি তালেব কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু। তিনি তার সম্মান, মর্যাদা ও আল্লাহর রাসূলের আত্মীয়তার নৈকট্য সহ ওহি লেখার দায়িত্ব পালন করতেন। কিতাবাত (লেখনীর) এর পর তিনি খিলাফতের সম্মানও লাভ করেন। এছাড়াও ওসমান বিন আফফান। তারা উভয়েই ওহি লিখতেন। তাদের অনুপস্থিতিতে উবাই বিন কাব ও যায়েদ বিন সাবেত ওহি লিখতেন। তারাও অনুপস্থিত থাকলে ভিন্ন কেউ লিখতেন।
আর খালিদ বিন সাঈদ বিন আস ও মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান নবীজীর সামনে তার প্রয়োজনীয় বিষয়ে লিখতেন। তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের স্থানে মুগীরা বিন শোবা ও হুসাইন বিন নুমায়ের মানুষের মধ্যবর্তী বিষয়ে লিখতেন। এদিকে আবদুল্লাহ বিন আরকাম বিন আব্দে ইয়াগুস এবং আলা বিন উকবা গোত্রের বিভিন্ন কবিলা ও তাদের জলাশয়ের বিষয়ে লিখতেন। এছাড়াও তারা আনসারদের ঘরবাড়ি বিষয়ে নারী ও পুরুষদের মধ্যবর্তী বিষয়ে লিখতেন। কখনো কখনো আবদুল্লাহ বিন আরকাম নবীজীর হয়ে রাজাবাদশার জন্যও লিখতেন। হুযাইফা বিন ইয়ামান হিজাজের ফসলের উৎপাদনের হিসাব লিখতেন। আর যায়েদ বিন সাবেত ওহি লেখার পাশাপাশি রাজাবাদশাদের উদ্দেশ্যেও লিখতেন।”
ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণিত নবীজীর বদদোয়ার এই হাদিস ছাড়াও মুয়াবিয়াকে ওহি-লেখক প্রমাণের জন্য তাবারানির আল-মুজামুল আওসাতের একটি জাল হাদিস উল্লেখ করা হয়।
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ قَالَ: نا السَّرِيُّ بْنُ عَاصِمٍ قَالَ: نا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يَحْيَى بْنِ أَبِي كَثِيرٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: لَمَّا كَانَ يَوْمُ أُمِّ حَبِيبَةَ مِنَ النَّبِيِّ ﷺ، دَقَّ الْبَابَ دَاقٌّ، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: «انْظُرُوا مَنْ هَذَا» قَالُوا: مُعَاوِيَةُ، فَقَالَ: «ائْذَنُوا لَهُ» وَدَخَلَ، وَعَلَى أُذُنِهِ قَلَمٌ لَهُ يَخْطُ بِهِ، فَقَالَ: «مَا هَذَا الْقَلَمُ عَلَى أُذُنِكَ يَا مُعَاوِيَةُ؟» قَالَ: قَلَمٌ أَعْدَدْتُهُ لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ. قَالَ: «جَزَاكَ اللَّهُ عَنْ نَبِيَّكَ خَيْرًا، وَاللَّهِ مَا اسْتَكْتَبْتُكَ إِلَّا بِوَحْيٍ مِنَ اللَّهِ ، وَمَا أَفْعَلُ مِنْ صَغِيرَةٍ وَلَا كَبِيرَةٍ إِلَّا بِوَحْيِ مِنَ اللَّهِ
“আমাদের আহমদ বলেছেন, আমাদের সারি বিন আসেম বলেছেন, আমাদের আব্দুল্লাহ বিন ইয়াহিয়া বিন আবি কাসির বলেছেন, তার পিতা থেকে, তিনি হিশাম বিন উরওয়া থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি আয়েশা থেকে যে, তিনি বলেছেন, নবীজীর যেদিন উম্মে হাবিবার ঘরে ছিলেন সেদিক দরজায় কেউ কড়া নাড়ে। নবীজী বললেন, দেখ তো কে? তারা বলল, মুয়াবিয়া। নবি বললেন, তাকে অনুমতি দাও এবং সে প্রবেশ করে এবং তার কানে ছিল একটি কলম যা দিয়ে সে লিখত। নবি বললেন, তোমার কানে কলম কেন মুয়াবিয়া? মুয়াবিয়া বলে, আল্লাহ ও রাসুলের জন্য এই কলম প্রস্তুত করেছি। নবি বলেন, আল্লাহ তোমাকে তাঁর নবির পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দিন। আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি পেয়েই লেখক হিসেবে নিযুক্ত করেছি। আমি ছোট, বড় কোন কাজই আল্লাহর ওহি ছাড়া করি না।”
তাবারানি বলেন, تَفَرَّدَ بِهِ: السَّرِيُّ “সারি এককভাবে এটি বর্ণনা করেছে।”
সারি থেকে অপর সূত্রে ইবনে আসাকির তার তারিখে বর্ণনা করেছেন যে,
عن جابر أن رسول الله ﷺ استشار جبريل في استكتاب معاوية فقال: استكتبه فإنه أمين
“জাবের থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল মুয়াবিয়াকে লেখক নিয়োগের ব্যাপারে জিব্রিলের সাথে পরামর্শ করেন। এতে জিব্রিল বলেন, তাকে লেখক হিসেবে নিয়োগ দিন। নিশ্চয়ই সে বিশ্বস্ত।”
ইবনে কাসির এই হাদিসের ব্যাপারে মন্তব্য করেন,
فإنه حديث غريب بل منكر والسري بن عاصم هذا هو: أبو عاصم الهمداني وكان يؤدب المعتز بالله، كذبه في الحديث ابن خراش. وقال ابن حبان وابن عدي: كان يسرق الحديث. زاد ابن حبان: ويرفع الموقوفات لا يحل الاحتجاج به.
“এটা অদ্ভূত হাদিস, বরং আপত্তিকর। এই সারি বিন আসেম হল আবু আসেম হামদানি, সে (আব্বাসি খলিফা মুতাওয়াক্কিলের পুত্র) মুতায বিল্লাহর শিক্ষক ছিল। ইবনে খাররাশ তাকে হাদিসের ক্ষেত্রে মিথ্যুক বলেছেন। ইবনে হিব্বান ও ইবনে আদী বলেছেন, সে হাদিস চুরি করত। ইবনে হিব্বান আরো বলেছেন, সে মাওকুফ হাদিস মারফু বানিয়ে দিত। তার মাধ্যমে দলিল দেওয়া বৈধ না।“
মূলত মুয়াবিয়াকে নিয়ে এসব বানোয়াট ফযিলত আব্বাসিদের আমলে তৈরি হয়। এই নিয়ে আমি ভিন্ন একটি লেখায় ইমাম ইবনে কুতাইবার “আর রদ আলাল জাহমিয়া” বই থেকে বক্তব্য অনুবাদ করেছি। কমেন্টে দিচ্ছি। মুয়াবিয়াকে নবীজী তার প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে লেখার জন্য ডাকতেন এটা সত্য। কিন্তু ওহি লেখার জন্য কোনদিন ডাকেন নি। মুয়াবিয়া ইসলাম গ্রহণ করেছেন মক্কা বিজয়ের পর। কুরআনের তিনটি সুরা ও কিছু আয়াত বাদে এরপর আর কিছুই নাযিল হয় নি। হযরত আবু বকরের আমলে যখন যায়দ বিন সাবেতকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনি বহু সাহাবির কাছে গিয়েছেন কোরআন জমা করতে, কিন্তু মুয়াবিয়ার কাছে গিয়েছেন বলে একটা প্রমাণও নাই। এমনকি হযরত ওসমানের আমলেও কোরআন সংকলনের জন্য মুয়াবিয়ার কোন ভূমিকা ছিল না।
মুয়াবিয়া ওহি লিখতেন এটা একটা বানোয়াট কল্প-কাহিনী বৈ নয়। তারপরও কিছু কথা বলা প্রয়োজন। কেউ ওহি লেখক হবার মাধ্যমে প্রমাণ হয় না যে, সে মাসুম-নিষ্পাপ ব্যাক্তি কিংবা তার ঈমান খালেস। কারণ নবীজী (সা.) ওহি লেখার দায়িত্ব ঈমানের জোর কার কত বেশি সেটা মেপে দিতেন না। বরং তিনি মূল যে বিষয়টি লক্ষ্য করতেন, সেটা হল ব্যাক্তি লিখতে-পড়তে জানে কিনা। আরবে সেসময় অধিকাংশ মানুষ নিরক্ষর ছিল। পড়ালেখা জানা ছিল দূর্লভ গুণ। আর নবীজী মেধার কদর করতেন। মেধাকে কাজে লাগাতেন। এই কারণে যারাই লিখতে ও পড়তে জানতেন, তাদেরকেই নবিজি বিভিন্ন লেখার দায়িত্ব দিতেন। এই কথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল আব্দুল্লাহ বিন আবি সারহ!
ইবনে হাজার আসকালানি বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে লিখেছেন,
وَأَوَّلُ مَنْ كَتَبَ لَهُ بِمَكَّةَ مِنْ قُرَيْشٍ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ ثُمَّ ارْتَدَّ
“মক্কায় অবস্থানকালে কুরাইশদের মাঝে সর্বপ্রথম নবিজি যাকে লেখার দায়িত্ব দেন তার নাম আব্দুল্লাহ বিন সাদ বিন আবি সারহ। অতঃপর সে মুরতাদ হয়ে যায়।”
এমনকি খোদ ওহি লেখাই আব্দুল্লাহ বিন সাদ বিন আবি সারহের মুরতাদ হবার কারণ হয় কারণ সে ভাবা শুরু করে আমিও নিজে থেকে এমন ওহি লিখতে পারব! এমনকি এই মুরতাদের ব্যাপারে আল্লাহ কোরআনের আয়াত নাযিল করেন। সুরা মাইদার ৯৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারী বলেন,
وأولى الأقوال في ذلك عندي بالصواب أن يقال: إن الله قال: ” ومن أظلم ممن افترى على الله كذبًا أو قال أوحي إليّ ولم يوح إليه شيء “، ولا تمانُع بين علماء الأمة أن ابن أبي سرح كان ممن قال: ” إني قد قلت مثل ما قال محمد “, وأنه ارتدّ عن إسلامه ولحق بالمشركين، فكان لا شك بذلك من قيله مفتريًا كذبًا
“এই বিষয়ে আমার দৃষ্টিতে সঠিকতর ব্যাখ্যা হল এটা বলা যে, আল্লাহ “তার চেয়ে বড় যালেম আর কে হতে পারে যে আল্লাহর নামে মিথ্যা রটায় কিংবা বলে আমার কাছে ওহি আসে অথচ তার কাছে কোন ওহি আসে নি” বলেছেন এবং উম্মতের আলেমদের মাঝে কোন বিরোধ নেই যে ইবনে আবি সারহ বলত “মুহাম্মদ যেমন বলে আমিও তেমন বলতে পারি” তারপর সে ইসলাম পরিত্যাগ করে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়। সুতরাং কোন সন্দেহ নেই যে, তার এই কথা মিথ্যা রটনা ও অপবাদ ছিল।” (তাফসিরে তাবারী)
এই ইবনে আবি সারহ মক্কায় নবীজীর প্রধানতম শত্রুতে পরিণত হয়, নবীজীর নামে মিথ্যা ও কুৎসা ছড়াতে থাকে। এমনকি নবীজী মক্কা বিজয়ের সময় সকলের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও ইবনে আবি সারহের ব্যাপারে বলেন, তাকে যেখানে পাবে সেখানে হত্যা করবে এমনকি যদি কাবার গিলাফ ধরে ঝুলে থাকতে দেখ তবুও। এছাড়াও আরেক ওহি লেখক ছিল যার ঘটনা বুখারিতে এসেছে, যে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হয়ে যায়। সুতরাং ওহি লেখার সাথে জড়িত হলেই কেউ পুত-পবিত্র, মাসুম-নিষ্পাপ ব্যাক্তি হয়ে যাবে এমন কোন গ্যারান্টি নাই।
পোস্টঃ দফতরে সাদী






