Press "Enter" to skip to content

শিয়া বর্ষপঞ্জিকা (আরবী বর্ষে বিভিন্ন দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি) – ১২

প্রসঙ্গ: জিলহজ্ব মাস

সংঙ্কলন ও অনুবাদএস

১লা জিলহজ্ব

.      সুরা তওবার আয়াত প্রচার

সন ৯ হিজরীর ১লা জিলহজ্বে রাসুল (সা.) হজরত আবু কবরকে সুরা তওবা প্রচারের জন্য মক্কায় প্রেরণ করেন। কিন্তু পরে আবার ঐশি নির্দেশ আসার পরে রাসুল (সা.) হজরত আবু বকরের পরিবর্তে হজরত আলী (আ.)কে মক্কায় প্রেরণ করেন। তিনি রাসুল (সা.)এর নির্দেশ পাওয়ার পরে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং পথিমধ্যে হজরত আবু বকরকে রাসুল (সা.)এর নির্দেশ সম্পর্কে অবগত করেন অতঃপর তিনি সুরা তওবার উক্ত আয়াত সমূহকে হজরত আলী (আ.)এর কাছে হস্তান্তর করেন এবং মক্কায় ফিরে আসেন। হজরত আলী (আ.) হজের মৌসুমে হাজিদের মাঝে উক্ত আয়াত সমূহের তেলাওয়াত ও  তাবলিগ করেন।   (তৌযিহুল মাকাসেদ, পৃষ্ঠা ২৯, মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৪৪, সুনানে তিরমিযি, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৩৯, তারিখে তাবারী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮৩, কানযুল উম্মাল, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৩২)

.     ইমাম আলী (আ.) এর বিবাহ

ঐতিহাসিক সেই বিবাহের বর ছিলেন আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.) আর কনে ছিলেন নবী নন্দিনী হযরত ফাতিমাতুজ্জাহরা (সা. আ.) । দ্বিতীয় হিজরীর ১ লা জিলহজ্জ ছিল তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার দু’বছর পর অনেকেই রাসুলের কাছে ফাতিমার বিয়ে প্রস্তাব পাঠালেন। কিন্তু রাসূলেখোদা কাউকে কিছু না বলে আল্লাহর সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছিলেন। অবশেষে হযরত আলী (আঃ) তাঁর কাছে ফাতিমার বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। মহানবী এতে খুশী হলেন। আলীর প্রস্তাব নিয়ে মহানবী কন্যা হযরত ফাতিমার কাছে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “মা, তুমি কি আলীকে বিয়ে করতে রাজি আছো? আল্লাহ আমাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত ফাতিমা একথা শুনে মনে মনে খুশী হলেন। কিন্তু লজ্জায় মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলেন না। কেবল মাথা নিচু করে সম্মতি জানালেন। মহানবী মেয়ের সম্মতি জানতে পেরে খুশীতে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে উঠলেন।

এরপর দ্বিতীয় হিজরীর ১ লা জিলহজ্ব রোজ শুক্রবার হযরত আলীর সাথে হযরত ফাতেমার শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন হয়। এ বিবাহ অনুষ্ঠানে সকল আনসার ও মুহাজির উপস্থিত ছিলেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে মহানবী (সাঃ) সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,আল্লাহর আদেশে আমি ফাতেমার সাথে আলীর বিয়ে দিচ্ছি এবং তাদের বিয়ের মোহরানা বাবত ধার্য করেছি চারশ মিসকাল রৌপ্য। এরপর মহানবী (সাঃ) হযরত আলীকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আলী তুমি কি এতে রাজী আছো ? হযরত আলী সম্মতি জানিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমি রাজী। তখন নবীজী দু’হাত তুলে তাঁদের জন্য এবং তাঁদের অনাগত বংশধরদের সার্বিক কল্যাণের জন্য দোয়া করলেন।

উক্ত বিয়ের অনুষ্ঠানটি কিন্তু খুবই সাদামাটা ছিল। তাই হযরত উম্মে আয়মন এসে মহানবীর কাছে দুঃখ করে বললেন, সেদিনও তো আনসারদের এক মেয়ের বিয়ে হল। সে অনুষ্ঠানে কত জাঁকজমক ও আনন্দ ফুর্তি হল! অথচ বিশ্ববাসীর নেতা মহানবীর মেয়ের বিয়ে কিনা এতো সাদাসিধেভাবে হচ্ছে! উম্মে আয়মনের কথা শুনে রাসুল (সাঃ) বললেন, এ বিয়ের সাথে পৃথিবীর কোন বিয়ের তুলনাই হয় না। পৃথিবীতে এ বিয়ের কোন জাঁকজমক না হলেও আল্লাহর আদেশে আসমানে এ বিয়ে উপলক্ষে ব্যাপক জাকজমক হচ্ছে। বেহেশতকে অপুর্ব সাজে সাজানো হয়েছে। ফেরেশতারা, হুর-গেলমান সবাই আনন্দ করছে। বেহেশতের গাছপালা থেকে মণি-মুক্তা ঝরছে! একথা শুনে বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলের মুখ খুশীতে ভরে উঠলো।

উক্ত পবিত্র বিবাহ সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেছেন: যদি হজরত আলী (আ.) এর জন্ম না হতো তাহলে সারা পৃথিবিতে হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)কে বিবাহ করার মতো কোন উপযুক্ত ও যোগ্য পাত্র পাওয়া যেত না।   (বাশারাতুল মোস্তফা, পৃষ্ঠা ২৬৭,তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ১৩৭, মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬০০, মানলা ইয়াহ যারুহুল ফাকিহ, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৯৩, কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৬১)

৩.    মাবিয়ার উদ্দেশ্যে হজরত আলী (আ.)এর পত্র

উক্ত দিনে হজরত আলী (আ.)সিফফিনের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মাবিয়ার উদ্দেশ্যে নসিহত স্বরূপ পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু মাবিয়া মুসলিম বিশ্বের খলিফার বিরূদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং তার বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।   (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড মহরম ওয়া সফর, পৃষ্ঠা ৩০৩, তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ২৪, সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৯৩, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৩২, পৃষ্ঠা ৪৩৪, ফাতহুল বারী, খন্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৭৫)

৫ই জিলহজ্ব

সাওয়িক নামক যুদ্ধ সংঘটিত হয়

সন ২য় হিজরীর ৫ই জিলহজ্বে সাওয়িক নামক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আবু সুফিয়ান শপথ করে যে, যতদিন সে রাসুল (সা.) কে হত্যা না করতে পারবে ততদিন সে তার স্ত্রীর কাছে যাবে না, তেল ব্যাকহার করবে না। অতঃপর সে শপথকে পূরণ করার লক্ষ্যে প্রায় ২০০ লোকজনকে নিয়ে মদীনার পাশে আরিয নামক একটি  এলাকায় হামলা করে এবং দুটি ঘর এবং  কয়েকটি জমির ফসলকে জালিয়ে দেয় এবং দুইজন আনসারকে হত্যা করে। রাসুল (সা.) উক্ত খবরটি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরে আবু লোবাবকে মদীনার দ্বায়িত্ব দিয়ে প্রায় ২০০জন মুহাজির ও আনসারদেরকে সাথে নিয়ে উক্ত এলাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। আবু সুফিয়ান যখন অনুধাবন করতে পারে যে রাসুল (সা.) মুসলমানদেরকে নিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য আসছে। তখন সে তার লোকদেরকে নির্দেশ দেয় তারা যেন নিজেদের খাদ্যদ্রব্য ফেলে দিয়ে দ্রুত উক্ত স্থানটি ত্যাগ করে। যখন মুসলমানরা সেখানে পৌছায় তখন তারা আর কাউকে সেখানে দেখতে পায় না। তখন তারা মুশরিকদের ফেলে পালিয়ে যাওয়া যুদ্ধের সরন্জামাদি এবং খাদ্যদ্রব্য নিয়ে মদীনায় ফিরে আসে।   (মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২০৬, আস সহীহ  মিন সিরাহ, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৯, মুনতাহিউল আমাল, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৮, আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭২, তাবাকাতুল কুবরা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০)

৬ই জিলহজ্ব

মনসুর দাওয়ানেকির মৃত্যুদিবস

ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ি উক্ত দিনে সন ১৫৮ হিজরীতে আব্বাসীয় খলিফা “মনসুরে দাওয়ানেকি” মারা যায়। মনসুরে দাওয়ানেকি ইমাম জাফর সাদিক (আ.), আব্দুল্লাহ মাহয, হাসানে মোসাল্লাস সহ ইমাম হাসান (আ.) এর অসংখ্য সন্তানদেরকে শহীদ করে। ইতিহাসে তার মৃত্যুর কারণ এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, একবার সে হজের উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং উক্ত সফরে সে মারা যায় এং তাকে ‘হাজুন’ নামক স্থানে দাফন করা হয়।  (মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২২০, তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ১৬০, তারিখে তাবারী, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৪৭, মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২২০, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৩০, পৃষ্ঠা ৪১৯)

৭ই জিলহজ্ব

১.      ইমাম মোহাম্মাদ বাকের (আ.)এর শাহাদত

সন ১১৪ হিজরীর ৭ই জিলহজ্ব  ইমাম বাকের (আ.) শাহাদত বরণ করেন। উক্ত দিনটি হচ্ছে আহলে বাইত (আ.)’এর অনুসারীদের জন্য একটি অত্যান্ত শোকাবহ দিন। হেশাম বিন আব্দুল মালিক ইমাম বাকের (আ.) কে বিষ দান করে এবং উক্ত বিষের কারণে তিনি বিষের অসহনিয় যন্ত্রণা সহ্য করার পরে অবশেষে শাহাদত বরণ করেন। বর্তমান জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।   (বাসায়েরুদ দারাজাত, পৃষ্ঠা ১৪১, তৌযিহুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ২৯, দুরুশুশ শারিয়া, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১২, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৬, পৃষ্ঠা ২১৭, তাসবিতুল ইমামা, পৃষ্ঠা ৭০)

.     ইমাম কাযিম (আ.) কে বাগদাদ কারাগারে প্রেরণ

ইমাম মুসা কাযিম (আ.) আব্বাসীয় শাসকদের শত অত্যাচার ও নিপীড়ন এবং কারাদণ্ড ও নির্বাসন সত্ত্বেও ইসলামের সঠিক শিক্ষা প্রচারের আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এ আন্দোলনের যে বিশেষ ধারা  তাঁর মহান পিতা ইমাম জাফর সাদিক (আ.) শুরু করেছিলেন তা আরও বিকশিত হয়েছিল পুত্রের প্রজ্ঞা, কৌশল ও ত্যাগ-তিতিক্ষাপূর্ণ অধ্যবসায়ের সুবাদে। বিশেষ করে পবিত্র কুরআনের প্রকৃত তাফসির ও হাদীস বর্ণনা তাঁর মাধ্যমে আরও বিকশিত হয়। ইমাম তাঁর অনুসারীদেরকে জ্ঞান অর্জনের জন্য অশেষ অনুপ্রেরণা যোগাতেন। তিনি বলতেন, জ্ঞান মৃত আত্মাকে জীবিত করে যেমনটি বৃষ্টি জীবিত করে মৃত ভূমিকে। ইমাম মুসা কাযিম (আ.) বিভ্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গ ত্যাগ করতে নিজ অনুসারীদের তাগিদ দিতেন। মানুষ কখনও বিভ্রান্ত ব্যক্তির কুপ্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে না এবং যখন মন্দ ব্যক্তির ওপর আল্লাহর শাস্তি নাজেল হয় তখন তার সঙ্গে থাকা সত ব্যক্তিও সেই শাস্তি এড়াতে পারে না বলে এই মহান ইমাম উল্লেখ করেছেন।

আব্বাসীয় শাসকদের বিভ্রান্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত চাল-চলন যে ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত ধারা  পিতার মতই তা তুলে ধরেছিলেন ইমাম মুসা কাযিম (আ.)।  তাই আব্বাসিয় শাসকরা চাইতেন না জনগণের সঙ্গে ইমামের যোগাযোগ বৃদ্ধি পাক। তারা জনগণের ওপর নবী বংশের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর জন্য যে কোনো ধরনের প্রতারণ, প্রচারণা, বর্বরতা ও নৃশংসতার আশ্রয় নিতে দ্বিধা বোধ করত না। এমনকি বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইত এবং তাঁদের অনুসারীদের ওপর জুলুম ও নৃশংস আচরণের ক্ষেত্রে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের চেয়েও বেশি অগ্রসর হয়েছিল, যদিও তাদের নেতৃত্বে সংঘটিত উমাইয়া বিরোধী আন্দোলন জন-সমর্থন পেয়েছিল এই প্রতিশ্রুতির কারণে যে ইসলামী খেলাফতে সমাসীন করা হবে বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতকে। আব্বাসীয়রা ইমাম জাফর সাদিক ও ইমাম মুসা কাযিম (আ.) সহ নবী বংশের বেশ কয়েকজন ইমামকে শহীদ করেছিল।

হযরত ইমাম মুসা কাযিম (আ.) তাঁর বন্দী অবস্থার নিকৃষ্টতম সময়েও বিচক্ষণতা, বীরত্ব এবং সংগ্রামী ও আপোষহীন মনোভাব ত্যাগ করেননি। ইমাম এক চিঠিতে হারুনের কাছে লিখেছিলেন: এমন কোনো দিন নেই যে আমি কষ্টে কাটাইনি অথচ এমন কোনো দিন নেই যে তুমি সুখ-স্বচ্ছন্দে কাটাওনি। কিন্তু, ওই দিন পর্যন্ত আরাম আয়েশে লিপ্ত থাক যেদিন আমরা উভয়ই এমন এক জগতে পদার্পণ করব যার কোনো শেষ নেই এবং ওই দিন অত্যাচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইমামের এ ধরনের জ্বালাময়ী  বক্তব্য ও দৃঢ় মনোবল  ছিল হারুনের কাছে অসহনীয়। হারুন কেবল ইমামের আধ্যাত্মিক খ্যাতির জন্যই ইর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে কারাগারে বন্দী করেনি।  ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.)’র অনুসারীদের সঙ্গে তাঁর সার্বক্ষণিক যোগাযোগের কথাও হারুন তার গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে জানতে পেরেছিল। হারুন এটাও বুঝতে পেরেছিল যে ইমাম যখনই উপযুক্ত সুযোগ পাবেন তখনই স্বয়ং বিপ্লব করবেন কিংবা তাঁর সঙ্গীদেরকে আন্দোলনের নির্দেশ দেবেন, ফলে তার হুকুমতের পতন হবে অনিবার্য। তাই আপোষহীন এই ইমামের প্রাণনাশের সিদ্ধান্ত নেয়।

হারুন খেলাফতকে রাজতন্ত্রে পরিণত করা ও জনগণের সম্পদ লুটের জন্য লজ্জিত ছিল না। উপরন্তু সে জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য বিশ্বনবী (সা.)’র রওজায় গিয়ে রাসূল (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলে: হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সন্তান মুসা ইবনে জাফরের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি আন্তরিকভাবে তাঁকে বন্দী করতে চাইনি। বরং আপনার উম্মতের মধ্যে যুদ্ধ ও বিরোধ সৃষ্টি হবে এ ভয়েই আমি এ কাজ করেছি।

ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.)-কে বসরায় ঈসা ইবনে জাফর নামক এক জল্লাদের কারাগারে এক বছর বন্দী রাখা হয়। সেখানে ইমামের উত্তম চরিত্র জাফরের ওপর এমন প্রভাব রাখে যে ওই জল্লাদ হারুনের কাছে এক লিখিত বার্তায় জানিয়ে দেয় যে: তাঁকে আমার কাছ থেকে ফিরিয়ে নাও, নতুবা আমি তাঁকে মুক্ত করে দেব। এরপর হারুনের নির্দেশে ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.)-কে বাগদাদে ফাযল ইবনে রাবির কাছে কারারুদ্ধ করা হয়। এছাড়াও উক্ত দিনে ইমাম কাযিম (আ.)কে হাতে পায়ে জন্জির বাঁধা অবস্থায় বাসরা এর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে এক বছর ঈসা বিন জাফর বিন আবি জাফর মানসুররের কাছে বন্দি করে রাখে। অতঃপর  তাঁকে বাগদাদে নিয়ে যাওয়া হয়।  (ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ১১১, উয়ুনে আখবারে রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৮২, আলী গিবা (শেইখ তুসী), পৃষ্ঠা ২৯, ইমামে মূসা ইবনে জাফর ফি বিহারিল আনওয়ার, পৃষ্ঠা ২০৭)

৩.    মক্কায় হজরত আব্বাস (আ.)এর ভাষণ

সন ৬০ হিজরীর উক্ত দিনে হুসাইনি কাফেলা মক্কা থেকে কারবালার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার একদিন পূর্বে হজরত আব্বাস (আ.) উচু স্থানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। তিনি ভাষণের শুরুতে মহান আল্লাহ তায়ালার হামদ ও সানা করেন অতঃপর তিনি বলেন: কুরাইশের কাফেররা রাসুল (সা.) কে হত্যা করতে চেয়েছিল কিন্তু হজরত আলী (আ.) তাঁকে সাহায্যে করেছিলেন। আর এখন মুসলমান নামধারি লোকেরা ইমাম হুসাইন (আ.) কে শহীদ করতে চায়। কিন্তু যতদিন আমি জিবিত আছি ততদিন তারা ইমাম হুসাইন (আ.) কোন ক্ষতি করতে পারবে না।  (খতিবে কাবা, আলী আসগার ইউনেসিয়ান)

৮ই জিলহজ্ব

.      মক্কায় ইমাম হুসাইন (আ.) কে হত্যার ষড়যন্ত্র

সন ৬০ হিজরীতে পাপিষ্ঠ এজিদ শামের অবস্থানরত বণি উমাইয়ার প্রায় ৩০ জন ব্যাক্তিদেরকে মক্কায় হজের মৌসুমে প্রেরণ করে এবং তাদেরকে নির্দেশ দেয় তারা যেন ইমাম হুসাইন (আ.)কে এজিদের বাইয়াত করতে বাধ্যে করে নতুবা তাকে এহরামের অবস্থায় হত্যা করে।  (ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ১১৩, ইয়ানাবিউল মোয়াদ্দাত, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৯, কালায়েদুন নুহুর, খন্ড জিলহজ, পৃষ্ঠা ৩৭৫, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ৯৯, ওয়াকায়েউশ শুহুর, পৃষ্ঠা ২২৫)

.     হজরত মুসলিমের প্রকাশ্যে বাইয়াতের আহবান

সন ৬০ হিজরী ৮ই জিলহজ্ব রোজ মঙ্গলবারে ইমাম হুসাইন (আ.) এর দূত মুসলিম বিন আকিল প্রকাশ্যেভাবে কুফা বাসীদেরকে ইমাম হুসাইন (আ.) এর বাইয়াতের জন্য আহবান জানায়।  (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬৬, আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৪৫, মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ১৭, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৬৩, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ১১২)

৩.    ইরাকের অভিমুখে ইমাম হুসাইন (আ.)এর যাত্রা

ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ি ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ইতিহাসে উক্ত দিনটি “ইয়াওমে তারওয়িয়েহ” নামে প্রসিদ্ধ। রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, উক্ত দিনে রোজা রাখলে ৬০ বছরের কাফফারার সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। উক্ত দিনে গোসল করা হচ্ছে উত্তম।   (আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৪৫, মুরুজুয যাহাব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৭০, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৬৬, মাকতালুল হুসাইন (আবু মাখনাফ), পৃষ্ঠা ৬১, মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ১৮)

৯ই জিলহজ্ব

.      আরাফার রাত্রি

৯ই জিলহজ্ব তারিখের রাতটি হচ্ছে ফযিলতপূর্ণ একটি রাত। উক্ত রাতে দোয়া ও তওবাকে কবুল করা হয়। যদি কেউ উক্ত রাতটিকে ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করে তাহলে তাকে ১৭০ বছরের সমপরিমাণ সওয়াব দান করা হবে। উক্ত রাতে সারা রাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকার অনেক তাক্বিদ করা হয়েছে। রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, উক্ত রাতে আকাশের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

ইমাম হুসাইন (আ.)’এর যিয়ারতের অনেক ফযিলত রয়েছে। রেওয়ায়েতে উক্ত দিন থেকে নিয়ে কুরবানির ঈদ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করার জন্য উল্লেখ করা হয়েছে। যদি কেউ এমনটি করে তাহলে সে এক বছরের জন্য বিভিন্ন বিপদ থেকে মুক্ত থাকবে।

.     আরাফার দিন

৯ই জিলহজ্ব আরাফার দিনটি উক্ত মাসের গুরুত্বপূর্ণ দিন সমূহের মধ্যে অন্যতম। উক্ত দিনে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে তাঁর ইবাদতের জন্য আহবান জানান এবং শয়তানকে উক্ত দিনটিতে সবচেয়ে বেশি অপমানিত, তুচ্ছ এবং রাগান্বিত হয়।   (মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬০০, মেসবাহুল মোতাহাজজেদ, পৃষ্ঠা ৬৫৮, মান লা ইয়াহ যারুহুল ফাকিহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৮০, তাহযিবুল আহকাম, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৫০, মুসতাদরাকুল ওসায়েল, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৮৩)

.    মুসলিম বিন আকিল (আ.)এর শাহাদত

সন ৬০ হিজরীর ৯ই জিলহজ্ব কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের মিথ্যা প্রলোভনে প্রতারিত হয়ে বেশীর ভাগ কুফাবাসীরা ইমামের প্রতিনিধির (মুসলিমকে)  সঙ্গ ত্যাগ করে। মুসলিমের সঙ্গী সাথীরা ধীরে ধীরে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল আমরা কেন গোলযোগ ও বিশৃংখলার আগুন জ্বালাচ্ছি। আমাদের তো উচিৎ ঘরে বসে থাকা আর মুসলিম ও ইবনে যিয়াদের ব্যাপারে নিজেকে না জড়ানো। আল্লাহই তাদের মধ্যে সমাধান করে দিবেন। এভাবে সবাই চলে যায় এবং অবশেষে ১০ জন লোক ছাড়া আর কেউই মুসলিমের সাথে ছিল না। হজরত মুসলিম মসজিদে এসে মাগরিবের নামাজ পড়লেন,নামাজের পর দেখলেন ঐ দশ জনও সেখানে নেই। তিনি অত্যন্ত অসহায়ভাবে মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়লেন। অলিগলির পথ চলতে চলতে তিনি ‘তাওয়া’ নাম্নী এক মহিলার ঘরের কাছে দাড়িয়ে পানি চাইলেন। মহিলাটি মুসলিমকে পানি পান করায় এবং তাঁকে আশ্রয় দেয়। কিন্তু তার ছেলে ইবনে যিয়াদকে হজরত মুসলিমের আত্মগোপনের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করে। তখন ইবনে যিয়াদ মুহাম্মদ ইবনে আশআসকে একদল লোক সহ মুসলিমকে গ্রেফতারের জন্য পাঠায়। মুসলিম তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন এবং তাদের সাথে একাই যুদ্ধে লিপ্ত হন ও তাদের বেশ কিছু লোককে হত্যা করলেন। আশআস চিৎকার করে বলে: হে মুসলিম! আমরা তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি। মুসলিম বললেন: ধোকাবাজ, ফাসেক লোকদের কথার কোন মূল্য নেই। যুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে মুসলিমের ঢাল ও তরবারী ভেঙ্গে যাওয়ায় তার মনোবল কিছুটা দূর্বল হয়ে যায়। ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি পিছন থেকে তীরের সাহায্যে আঘাত করলে তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে যান। তখন তাকে বন্দী করে ইবনে যিয়াদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় ।

ইবনে যিয়াদ বকর ইবনে হামারানকে দারুল ইমারার ছাদের উপর মুসলিমকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার নির্দেশ দেয়। মুসলিম তার শাহদতের  সময় তসবিহ পাঠ, আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছিলেন এবং ছাদের উপর পৌছা পর্যন্ত তিনি রাসূল (সা.) এর উপর দরুদ পাঠ করছিলেন।

অতঃপর তার মাথা দেহ থেকে আলাদ করে দেয়া হয়। তার হত্যাকারী অত্যন্ত ভীত বিহ্বলভাবে ছাদ থেকে নেমে আসে। ইবনে যিয়াদ জিজ্ঞেস করল তোমার কি হয়েছে? সে বলল: হে আমীর! যখন মুসলিমকে হত্যা করছিলাম তখন কুৎসিত কালো চেহারা এক লোককে দেখতে পাই যে, আমার মুখোমুখি দাড়িয়ে দাতে নিজের আঙ্গুল কামড়াচ্ছিল। তাকে দেখে এত ভয় পেয়েছি যে জীবনে কোন কিছুতেই আমি এত ভয় পাইনি। ইবনে যিয়াদ বলল: মনে হয় মুসলিমকে হত্যা করার কারণে তুমি ভয় পেয়েছ। অতঃপর তার পা বেধে টেনে হিচড়ে কুফার বাজারে আনা হয়। অতঃপর তার মাথা বিহীন শরিরকে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং তাঁর মাথাকে দামেস্কে প্রেরণ করা হয়। (মারাকেদুল মাআরেফ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩১৮, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা ৬৬, মুরুজুয যাহাব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬৯- ৭০, মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬০০, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৬৩)

.      হানি বিন উরওয়া (রা.)এর শাহাদত

সন ৬০ হিজরীর ৯ই জিলহজ্বে মুসলিম ইবনে আকিলের শাহাদতের পরে হানি বিন উরওয়া’ কে ইবনে যিয়াদের দরবারে বন্দি করে আনা হয় এবং তাঁকেও শহীদ করা হয়।  (মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, পৃষ্ঠা ২৯৪- ২৯৫, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৬৩, মারাকেদুল মাআরেফ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩১৮, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা ৬৬, মুরুজুয যাহাব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬৯- ৭০)

.     সাদদুল আবওয়াব

ইতিহাসের প্রসিদ্ধ ঘটনা “সাদদুল আবওয়াব” উক্ত দিনে রাসুল (সা.) শুধুমাত্র হজরত আলী (আ.) এর ঘরের দরজা ব্যাতিত মসজিদে নবাবীর দিকের খুলে রাখা সকল সাহাবীদের ঘরের দরজাকে বন্ধ করার নির্দেশ দান করেন। রাসুল (সা.) বলেন: যাদেরকে মসজিদের আওতার বাহিরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই এতে সন্তুষ্ট না যে, আলী সর্বদা মসজিদে অবস্থান করুক। মহান আল্লাহর শপথ যে, আমি তাদেরকে বাহির করে দেইনি এবং আলীকেও মসজিদে থাকার নির্দেশ দেইনি বরং উক্ত হুকুমটি মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ছিল।  (ওয়েকায়াউশ শুহুর, পৃষ্ঠা ২২৬, এলালুশ শারায়ে, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২০১, ওসায়েলুশ শিয়া, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২০৮, গায়াতুল মারাম, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১১৪, ইয়ানাবিউল মোয়াদ্দাত, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫৯)

১০ই জিলহজ্ব

.      ঈদুল আযহা

১০ই জিলহজ্ব দিনটি মুসলমানদের জন্য আরেকটি ঈদের দিন অর্থাৎ ঈদুল আযহা। উক্ত দিনে যারা মক্কায় হজের জন্য যায় তাদের জন্য বিশেষ কিছু আমল বর্ণিত হয়েছে।  (মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ১৮, তৌযিহুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ৩০)

.     আব্দুল্লাহ মাহযের শাহাদত

সন ১৪৫ হিজরী উক্ত দিনে আব্দুল্লাহ মাহয বিন হাসানে মোসান্না বিন হাসান (আ.) কে ৫৭ বছর বয়সে এবং বণি হাশিমের আরো কিছু সন্তাদেরকে আব্বাসীয় খলিফা মনসুর দাওয়ানেকি এর নির্দেশে কারাগারে শহীদ করা হয়। উক্ত কারাগরের অবস্থা এমন ছিল যে সেখানে দিন রাত বোঝা যেত না।   (মারাকেদুল মাআরেফ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৫, মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১৯, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৭, পৃষ্ঠা ৩০৫, মাকাতেলুত তালেবিন, পৃষ্ঠা ১৪৪, ১৪৯, ১৯৬, ২০৫, তারিখে তাবারী, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৭৪)

.    ইমাম রেযা (আ.) কে বাধা প্রদান

উক্ত দিনে ইমাম রেযা (আ.) আব্বাসীয় খলিফা মামুনের নির্দেশে খোরাসানে ঈদের নামাজ পড়ানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু খলিফা মামুন জন সমাগম দেখে ভয় পায় সে মনে করে হয়তো জনগণ এরপরে তার বিরূদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলবে। আর উক্ত কারণে সে ইমাম রেযা (আ.) কে ঈদের নামাজ পড়াতে নিষেধ করে। (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড জিলহ্জ, পৃষ্ঠা ৩৮৩, কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৮৯, উয়ুনে আখবারে রেযা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬১, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৯, পৃষ্ঠা ১৩৪, ওয়াকায়েউশ শুহুর, পৃষ্ঠা ১৮৯)

১১ই জিলহজ্ব

.      দোয়ায়ে সাবাহ লিখা হয়

সন ২৫ হিজরীর ১১ই হিজরী রাসুল (সা.) হজরত আলী (আ.)কে দোয়া-এ সাবাহ এর শিক্ষা দেন এবং ইমাম আলী (আ.) দোয়াটি লিখেন।  (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৯১, পৃষ্ঠা ২৪৭, মাকতিবুর রাসুল, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৯০)

২.     আবতাহ, তানইম এবং সাফফায় ইমাম হুসাইন (আ.)

সন ৬০ হিজরীর ১১ই জিলহজ্বে ইমাম হুসাইন (আ.) উল্লেখিত তিনটি স্থানে অবস্থান করেছিলেন। আবতাহ নামক স্থানে অবস্থানের পরে সেখানে ইয়াযিদ বিন সাবিত তার সন্তানগণ এবং তার সঙ্গি সাথিরা হুসাইনি কোফেলায় যোগ দেয়। ইমাম হুসাইন (আ.) তানইম নামক স্থানে পৌছান সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পরে তিনি সাফাহ নামক স্থানে অবস্থান করেন।  (ইমামুল হুসাইন ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৫- ১৫৫)

১২ই জিলহজ্ব

ওয়াদিউল আকিক নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

সন ৬০ হিজরীর ১২ই জিলহজ্ব তারিখে ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার পথে রওনা হওয়ার সময় ওয়াদিউল আকিক নামক স্থানে অবস্থান করেন।  (ইমামুল হুসাইন ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৮)

১৩ই জিলহজ্ব

.      শাককুল ক্বামার

১৩ই জিলহজ্ব তারিখের দিবাগত রাতে অর্থাৎ ২৪ তারিখে রাতে “শাককুল ক্বামার” রাসুল (সা.) মক্কায় অবস্থান কুরাইশের কাফেররা তাঁর কাছে মজেযা দেখতে চাইলে তিনি তাঁর আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করেন এবং পুণরায় তা আবার জোড়া লাগিয়ে দেন। তখন আবু জাহল বলে: আমার মনে হচ্ছে এটা জাদু। আমরা অন্যান্য এলাকার লোকজনদের কাছে জিজ্ঞাসা করবো যে তারাও কি উক্ত ঘটনাটি অবলোকন করেছে কিনা। যখন অন্যান্য এলাকার লোকজনদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তারাও বলে হ্যাঁ আমরাও দেখেছি যে চাঁদের এক খন্ড কাবার পিছন অংশে এবং অবশিষ্ট অংশটি আবু কুবাইসের পাহাড়ের পিছনে অবস্থান করছিল।  (রিয়াহিনুশ শারিয়া, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫৭, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ১২০, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৩৪৭- ৩৫৮, ওয়াকায়াউশ শুহুর, পৃ্ষ্ঠা ২৩১, হাককুল ইয়াকিন, পৃষ্ঠা ২৮)

২.     সাফরা নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় উক্ত তারিখে সাফরা নামক স্থানে অবস্থান করেন। উক্ত স্থানে মোজাম্মা এবং উব্বাদ তাদের লোকজনদের সাথে হুসাইনী কাফেলায় অংশগ্রহণ করেন। তারা উভয়েই কারবালাতে শাহাদত বরণ করেন।  (ইমাম হুসাইন ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৮- ১৫৯)

১৪ই জিলহজ্ব

.      হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)কে ফেদাক প্রদান

সন ৭ হিজরীর ১৪ই জিলহজ্ব তারিখে রাসুল (সা.)তাঁর ওফাতের ৪ বছর পূর্বে ফেদাক নামক বাগানটি হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)কে দান করেন। বিশ্বস্ত সুত্রে এটা সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত যে,রাসুল (সাঃ) তাঁর জীবদ্দশাতেই উক্ত বাগানটি তাঁর প্রানপ্রিয় কন্যা ফাতিমা (সা.আ.)কে দান করেছিলেন। আল-বাজ্জার,আবু ইয়ালা,ইবনে আবি হাতিম,ইবনে মারদুয়াই ও অন্যান্য অনেকে আবু সাঈদ খুদরী ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে বর্ননা করেছেন যে,যখন কোরানের আয়াত-“নিকটবর্তী আত্নীয় পরিজনকে তাদের প্রাপ্য দিয়ে দাও” (১৭: ২৬) নাজিল হয়েছিল তখন রাসুল(সাঃ) ফাতিমাকে ডেকে এনে তাঁকে ফেদাক দান করেছিলেন  (মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৬, কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৪৩, এহতেজাজ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৯, সিরাতুল মুস্তাকিম, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮২- ২৯৪, সাওয়াহেদুত তানযিল, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৩৮- ৪৪৫)

২.     যাতুল ইরাক নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

সন ৬০ হিজরী ১৪ই ‍জিলহজ্ব রোজ সোমবার ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় যাতুল ইরাক নামক স্থানে অবস্থান করেন। (ইমাম হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৮)

১৫ ই জিলহজ্ব

.      ইমাম আলী নাক্বি (আ.)এর জন্ম দিবস

ইমাম নাক্বি বা হাদী (আ.) ২১২ হিজরির ১৫ ই জিলহজ্ব বা খৃষ্টীয় ৮২৮ সালে সেরিয়া নামক গ্রামে যা মদীনা মুনাওয়ারা থেকে ৬ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত সেখানে তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ২২০ হিজরিতে পিতা ইমাম জাওয়াদ (আ.)’র শাহাদতের পর তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সে মুসলমানদের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব নেন। ইমাম নাক্বি (আ.)’র মায়ের নাম ছিল সুমমানা খাতুন।

ইমাম হাদী (আ.)’র সাত জন আব্বাসীয় খলিফার সমসাময়িক ছিল। এই সাতজন হল যথাক্রমে খলিফা মামুন, মুতাসিম, ওয়াসিক, মোতাওয়াক্কিল, মুন্তাসির, মোস্তাইন এবং মুতাজ। খলিফা মুতাসিম ইমাম হাদী (আ.)’র পিতাকে বাগদাদে বিষ প্রয়োগে শহীদ করেছিল। এ সময় ইমাম হাদী (আ.) মদীনায় ছিলেন। ইমামতের মহান দায়িত্ব পালন এবং ইসলামী শিক্ষা ও বিধি বিধান প্রচারের জন্যে তিনি মদীনায় একটি কেন্দ্র গড়ে তোলেন। মুসলিম বিশ্বের সব স্থানে তাঁর সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ইমাম হাদী (আ.)’র জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে উপকৃত হবার জন্যে বহু দূর ও কাছের এলাকা থেকে জ্ঞান-পিপাসুরা তাঁর কাছে জড়ো হত। আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিল জনগণের মধ্যে ইমাম হাদীর এতো জনপ্রিয়তা ও প্রভাব লক্ষ্য করে ভীত হয়ে পড়ে। ইমাম হাদী (আ.) আবদুল আজিম হাসানিসহ ১৮৫ জন ছাত্রকে উচ্চ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করেছিলেন এবং তারা সবাই ছিল সে যুগের নানা জ্ঞানে শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ।  (মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, পৃষ্ঠা ৭৮৯, কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৯৭, তাহযিবুল আহকাম, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৯২, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯৮, আলামুল ওয়ারা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৯)

২.     হাজার নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

সন ৬০ হিজরী ১৫ই জিলহজ্ব রোজ বৃহস্পতিবার ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় হাজার নামক স্থান অবস্থান করেন। উক্ত স্থান থেকে তিনি আব্দুল্লাহ বিন ইয়াকতিন অথবা কাইস ইবনে মুসাহহার-এর মাধ্যমে কুফাবাসীদের উদ্দেশ্যে পত্র লিখে প্রেরণ করেন। কিন্তু কাদেসিয়া নামক স্থানে হাসিন বিন নুমাইর ইমাম হুসাইন (আ.) এর উক্ত পত্রবাহকে আটক করে।  (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭০, ইমামুল হুসাইন (আ.)ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬১, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৬৯, মাসীরুল আহযান, পৃষ্ঠা ৩০, লহুফ, পৃষ্ঠা ১৩৬)

১৬ই জিলহজ্ব

ফায়দ নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

সন ৬০ হিজরী ১৬ই জিলহজ্ব তারিখে ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় “ফায়দ” নামক স্থানে অবস্থান করেন।  (ইমামুল হুসাইন (আ.)ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬২)

১৭ই জিলহজ্ব

আজফুর নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

সন ৬০ হিজরী ১৭ই জিলহজ্ব তারিখে ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় আজফুর নামক স্থানে অবস্থান করেন।  (ইমাম হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৩)

১৮ জিলহজ্ব

১.      ঈদ-এ গাদির

১৮ই জিলহজ্বের দিনটি ইসলাম ধর্ম পূর্ণ হওয়ার দিন। রাসুল (সা.)’এর খলিফা নির্বাচনের দিন। বিভিন্ন রেওয়ায়েতে উক্ত দিনটিকে ‘ঈদুল আকবার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও ইতিহাসে দিনটির বিশেষ কিছু ঘটনাবলি উল্লেখ করা হয়েছে যেমন:

১৮ই জিলহজ্বের দিনে হজরত ইব্রাহিম (আ.)নমরুদের নির্দেশে প্রজ্বলিত আগুন থেকে পরিত্রাণ লাভ করেন।

১৮ই জিলহজ্বের দিনে হজরত আদম (আ.)এর তওবা কবুল হয়।

১৮ই জিলহজ্বের তারিখে হজরত মুসা (আ.)কে ফেরাউনের জাদুকরদের উপরে বিজয় লাভ করেন।

১৮ই জিলহজ্বের তারিখে হজরত মুসা (আ.)তার উম্মতের মাঝে ইউসা বিন নুন (আ.)কে নিজের ওয়াসি নিযুক্ত করেন।

১৮ই জিলহজ্বের তারিখে হজরত ঈসা (আ.)সামউন আসফা কে নিজের ওয়াসি নিযুক্ত করেন।

১৮ই জিলহজ্বের তারিখে হজরত সুলাইমান (আ.)আসিফ ইবনে বারখিয়া এর কাছ থেকে নিজের শাষণ ক্ষমতার স্বিকৃতির সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।,

১৮ই জিলহজ্বের তারিখে রাসুল (সা.)তার সাহাবীদেরকে মাঝে ভ্রাতুত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করেন।

১৮ই জিলহজ্বের তারিখে বিভিন্ন নবীগণ তাদের নিজেদের স্থলাভিষিক্তদের নির্বাচন করেছিলেন।  (মাশআরুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ২২, মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১২৫, তাকভিমুল আয়েম্মে, পৃষ্ঠা ১৪, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৯৭, পৃষ্ঠা ৩৮৪, ফাইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ১২৫)

২.     হজরত উসমানের মৃত্যু

সন ৩৫ হিজরী ১৮ই জিলহজ্ব তারিখে হজরত উসমানকে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর পরে লোকজন ইমাম আলী (আ.)এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন।  (মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ২১- ২২, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৩১, পৃষ্ঠা ৪৯৩, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ২৫, তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ১৬, মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১২)

৩.    খুযাইমা নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় উক্ত তারিখে যখন খুযাইমা নামক স্থানে পৌছান তখন তিনি সেখানে এক দিন ও এক রাত সেখানে অতিবাহিত করেন। সকাল হলে হজরত জয়নাব (সা.আ.) ইমাম হুসাইন (আ.)কে বলেন:ভাইয়া গতরাতে আমি একটি শব্দ শুনছিলাম। তখন ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁকে বলেন অবস্থান করেন আল্লাহ যা আমাদের ভাগ্যে রেখেছেন তার হবেই। (মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০৩, ইমামুল হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৪)

২০শে জিলহজ্ব

শুকুক নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় উক্ত তারিখে শাকুক বা শুকুক নামক স্থানে অবস্থান করেন এবং এখানেই ফারাযদাক্ব তাঁর সাথে সাক্ষাত করে।  (ইমাম হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৫- ১৬৬)

২১শে জিলহজ্ব

যারুদ নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

সন ৬০ হিজরী ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় যারুদ নামক স্থানে অবস্থান করেন এবং উক্ত স্থানে যোহাইর বিন কাইন বাজালি ইমাম হুসাইন (আ.) এর সাথে সাক্ষাত করেন।  (তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯৮, ইমামুল হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৬, কালেমাতুল ইমামিল হুসাইন (আ.), পৃষ্ঠা ৩৪২, মাকতালুল হুসাইন (আবু মাখনাফ), পৃষ্ঠা ৭৩- ৭৫, আখবারুত তেওয়াল, পৃষ্ঠা ২৪৬)

২২শে জিলহজ্ব

১.      মিসামে তাম্মার(রা.)এর শাহাদত

ইমাম আলি (আ.) মিসামে তাম্মারের শাহাদতের ভবিষ্যত বাণি রাসুল (সা.) এর কাছ থেকে শুনেছিলেন। যখন মিসামে তাম্মারের সাথে হজরত আলি (আ.) এর সাক্ষাত হয় তখন তিনি ছিলেন বণি আসাদ গোত্রের একজন নারির দাশ। অতঃপর তিনি মিসামকে ক্রয় করেন এবং তাঁকে মুক্ত করে দেন। হজরত আলি (আ.) এর সাথে মিসামের সাক্ষাত তার জিবনে এক আমুল পরিবর্তন এনে দেয় সে মুক্ত হয়, হজরত আলি (আ.)এর ছাত্র হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন এবং তিনি যথেষ্ট পরিমাণে ইসলামি জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি তাফসিরে কোরআনের শিক্ষা ইমাম আলি (আ.)এর কাছে গ্রহণ করেন এছাড়া তিনি পুস্তকও লিখেছিলেন এবং তাঁর সন্তানরা তার উক্ত তাফসির এবং লিখিত পুস্তক সমূহকে বর্ণনা করতেন।

হজরত আলি (আ.) তাঁর মৃত্যুর পূর্বে হজরত মিসামে তাম্মারকে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দেন এবং তাঁকে বলেন: কিভাবে এবং কে তাঁকে শহীদ করবে।

সন ৬০ হিজরীর ২২ জিলহজ্ব তারিখে হজরত মিসামে তাম্মার (রা.)কে ইবনে যিয়াদের নির্দেশে ফাঁসি দেয়া হয়। এছাড়াও মিসামে তাম্মার (রা.) এর মৃত্যু তারিখ সম্পর্কে অন্যান্য মতামতও বর্ণিত হয়েছে যেমন: ১৯শে জিলহজ্ব এবং আশুরার দিন। যখন মিসামে তাম্মার (রা.)কে ফাঁসিতে ঝুলানো হয় তখনও তিনি আহলে বাইত (আ.)এর ফযিলত বর্ণনা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখেনি। এমতাবস্থায় তাঁর হাত  পা কেটে ফেলা হয়। যখন সে মৃত্যু বরণ করে কখন ৭জন খুরমা বিক্রেতা তার শরীরকে ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে নিচে নামায় এবং বর্তমানে যেখানে তাঁর মাজার রয়েছে সেখানে তার দেহকে দাফন করে দেয়।  (মুসতাদরাকে সাফিতুল বিহার, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১৪, মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৬৭, আল ইরশাদ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২৩- ৩২৫, সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৩৭, শারহে নাহজুল বালাগা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯১- ২৯২)

.     ইব্রাহিম বিন মালিকে আশতার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন

২২শে জিলহজ্ব তারিখে ইব্রাহিম বিন মালিকে আশতার প্রায় ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে এবং ইবনে নোমা-এর বর্ণনামতে ২০ হাজরের চেয়ে কম সৈন্য সাথে নিয়ে আমির মোখতারের নির্দেশে ইবনে যিয়াদের বিরূদ্ধে যুদ্ধের জন্য বাহির হয়। ইব্রাহিম বিন আশতার খাযার নদীর তির থেকে প্রায় ৩০ কি:মি: মুসেল নামক স্থানে অবস্থান করে। ঐদিকে ইবনে যিয়াদ ৮০ হাজার অশ্বারোধি বাহিনি দ্বারা এলাকাটিকে ঘিরে ফেলে। অবশেষে যুদ্ধ শুরু হয় কয়েকদিন যুদ্ধের পরে এক পর্যায়ে ইবনে যিয়াদ পরাজিত হয়। ইব্রাহিম বিন মালিকে আশতার তার মাথাকে কেটে মোখতার সাকাফির কাছে প্রেরণ করেন।  (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ৩৮০- ৩৮৪, ফুরসানুল হাইজা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৩৫- ২৩৯, তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৪৮, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩০৭- ৩১০)

৩.    সাআলাবিয়া নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় উক্ত তারিখে সাআলাবিয়া নামক স্থানে অবস্থান করেন। একটি মত অনুযায়ি উক্ত স্থানে বনি আসাদের দুইজন ব্যাক্তি ইমাম (আ.)কে হজরত মুসলিম (আ.)এর শাহাদতের খবর দেয়।তখন ইমাম হুসাইন (আ.) তিনবার বলেন “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” অতঃপর ক্রন্দন করেন।  (তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯৯, ইমামুল হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি,খন্ড ১,পৃষ্ঠা ১৬৬, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৪, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৭৩, কালেমাতুল ইমামিল হুসাইন (আ.), পৃষ্ঠা ৩৪৪)

২৩শে জিলহজ্ব

যাবালে নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

২৩শে জিলহজ্ব তারিখে ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় যাবালে নামক স্থানে অবস্থান করেন। ইতিহাসের এক বর্ণনা অনুযায়ি উক্ত স্থানে বনি আসাদের দুইজন ব্যাক্তি ইমাম (আ.)কে হজরত মুসলিম (আ.)এর শাহাদতের খবর দেয়। তখন ইমাম হুসাইন (আ.) তিনবার বলেন “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” অতঃপর ক্রন্দন করেন এবং উক্ত স্থান থেকে যাদের ঈমান দূর্বল ছিল তারা ইমাম হুসাইন (আ.) থেকে পৃথক হয়ে যায়।  (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৫, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৭৩, মাসীরুল আহযান, পৃষ্ঠা ৩২)

২৪শে জিলহজ্ব

.      ঈদে মুবাহেলা

মুবাহিলার ঘটনাটি ঘটেছিল খ্রিস্টানদের সঙ্গে তিন দিন ধরে বিতর্ক চলার পর। রাসূল (সা.)’র মুখে মানুষের সঙ্গে সাদৃশ্যহীন আল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে অকাট্য যুক্তি (হযরত আদম-আ.’র উদাহরণসহ) শোনার পরও নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিরা ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র বা পুত্র-আল্লাহ বলার মত অদ্ভুত বিশ্বাসের ওপর অবিচল ছিল এবং বিশ্বনবী (সা.)-কে সত্য নবী হিসেবে মানতে অস্বীকার করছিল। (খ্রিস্টান পাদ্রিরা এ বিতর্কের সময় বলছিল যে হযরত ঈসা নবী-আ. যেহেতু পিতা ছাড়াই জন্ম নিয়েছেন তাই তিনি আসলে আল্লাহর পুত্র। জবাবে আল্লাহর রাসূল-সা. বলেছিলেন, আদম-আ. তো পিতা ও মাতা ছাড়াই জন্ম নিয়েছিলেন তাহলে তো আল্লাহর পুত্র হওয়ার সম্ভাবনা-নাউজুবিল্লাহ- তারই বেশি হওয়ার কথা ছিল!)

এ অবস্থায় রাসূল (সা.) মুবাহিলার চ্যালেঞ্জ জানান। অর্থাৎ যারা মিথ্যাবাদী তাদের ধ্বংসের জন্য উভয় পক্ষ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাবে। খ্রিস্টান পাদ্রিরা বেশ সাহস দেখিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মেনে নেয়।

এ পরিস্থিতিতে নাজেল হয় পবিত্র কুরআনের ওই আয়াত। যেখানে মহান আল্লাহ উভয় পক্ষকে তাদের নারী, পুত্র, ঘনিষ্ঠ পুরুষ এবং শিশু সন্তানসহ শহরের বাইরে একটি ময়দানে জড় হওয়ার নির্দেশ দেন।

পরের দিন বিশ্বনবী (সা.) শান্তচিত্তে ও অবিচল আস্থা নিয়ে নির্ধারিত স্থানে আসেন। সঙ্গে ছিলেন কন্যা হযরত ফাতিমা জাহরা (সালামুল্লাহি আলাইহা.), জামাতা হযরত আলী (আ.) এবং নাতি হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)। (তাঁদের সবার ওপর মহান আল্লাহর অশেষ দরুদ ও রহমত বর্ষিত হোক)

তাঁদের নুরানি চেহারা ও অভিব্যক্তি দেখেই খ্রিস্টানরা স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। ইসলাম যে সত্য ধর্ম তা তারা বুঝতে পারে। তাই তারা মিথ্যাবাদীর ওপর খোদায়ী অভিশাপ বর্ষণের আহ্বান জানানোর চ্যালেঞ্জ প্রত্যাহার করে নেয়।

নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি বা পাদ্রিদের প্রধান তখন তার সঙ্গীদের বলেছিলেন: আমি এমন জ্যোতির্ময় বা পুণ্যবান ব্যক্তিদের চেহারা দেখছি যারা খোদায়ী অভিশাপের জন্য হাত উঠালে পাহাড়গুলো তাদের স্থান থেকে সরে আসবে, তাই মুবাহিলা হতে হাত গুটিয়ে নেয়াই ভাল, নইলে কিয়ামত পর্যন্ত খ্রিস্টানদের নাম-নিশানাও থাকবে না। পরে তারা মুসলমান না হয়েই সন্ধি করে ও জিজিয়া কর দিতে সম্মত হয়।

তখন মহানবী (সা.) বলেন, “ আল্লাহর কসম! এরা যদি মুবাহিলা করত তাহলে আল্লাহ তাদের বানরে বা শুকরে রূপান্তরিত করতেন এবং ময়দান আগুনে পরিণত হত। আর নাজরানের একটি প্রাণীও এমনকি পাখি পর্যন্ত রক্ষা পেত না।”  (তাফসিরে জালালালাইন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০, বায়দ্বাভী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৮, তাফসিরে দুররুল মানসুর, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯, আদাদুল কাভিয়া, পৃষ্ঠা ৩০৭- ৩০৮, যাদুল মাআদ, পৃষ্ঠা ২৮৭)

২.     হজরত আলী (আ.)এর আংটি প্রদান

২৪শে জিলহজ্বের দিনেই হজরত আলী (আ.) রুকু অবস্থায় জাকাত দান করেছিলেন। আর উক্ত জাকাত দান কে কেন্দ্র তাঁর শানে সুরা মায়েদা-এর ৫৫ নং আয়াতটি নাযিল হয়। সুতরাং উক্ত দিনটি হচ্ছে একটি পবিত্র দিন।  (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড জিলহজ, পৃষ্ঠা ৪২৬, আল সারায়ের, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪১৮, এখতিয়ারাত, পৃষ্ঠা ৪০, আনওয়ারুল আলাভিয়া, পৃষ্ঠা ১২৫, মেসবাহুল মোতাহাজজেদ, পৃষ্ঠা ৭০৩)

৩.    এলক্বা নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় উক্ত তারিখে এলক্বা নামক স্থানে অবস্থান করেন।  (ইমাম হুসাইন ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৮)

২৫শে জিলহজ্ব

১.      সুরা দাহর নাযিল হয়

উক্ত দিনে সুরা দাহর’এর “هل أتي” আয়াতটি আহলে বাইত (আ.)’এর শানে নাযিল হয়। আর তাই এ দিনে সাদকা দান করার অনেক গুরুত্ব রয়েছে। আর এ দিনে যিয়ারতে জামে এবং দোয়ায়ে মুবাহিলা পড়ার জন্যও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। (তৌযিহুল মাকাসিদ, পৃষ্ঠা ৩২, মেসবাহে কাফআমি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬০১, মেসবাহুল মোতাহাজজেদ, পৃষ্ঠা ৭১২, মাশারুশ শিয়া, পৃষ্ঠা ২৩, যাদুল মাআদ, পৃষ্ঠা ৩০৪)

২.     ইমাম আলী প্রথম জুমআর নামাজ পড়ান

ইমাম আলী (আ.)জনগণের কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণের পরে প্রথম তিনি জুমআর নামাজ পড়ান।  (মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ, পৃষ্ঠা ১৫৯, তারিখে তাবারী, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৫৭, আল ফেতনাতু ওয়া ওয়াকআতুল জামাল, পৃষ্ঠা ৯৫- ১১১, মুসতাদরাকে হাকেম, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১১৪, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৩২, পৃষ্ঠা ৮)

৩.    আকাবা নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় উক্ত তারিখে আকাবা নামক স্থানে অবস্থান করেন। উক্ত স্থানে পৌছানোর পরে ইমাম হুসাইন (আ.) এর সঙ্গিরা বলেন: হে ইমাম (আ.) আমাদের মনে হচ্ছে যে অচিরেই আমরা শত্রুরা আমাদেরকে হত্যা করবে। তখন ইমাম হুসাইন (আ.) তাদেরকে বলেন: আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমার উপরে কতগুলো কুকুর আক্রমণ করে এবং তাদের মধ্যে একটি ছিল সবচেয়ে হিংস্র এবং কুৎসিত।  (কামেলুয যিয়ারত, পৃষ্ঠা ১৫৭, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ৮৭, ইমামুল হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮১, ১৮৭)

২৬শে জিলহজ্ব

শারাফ নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় উক্ত তারিখে শারাফ নামক স্থানে অবস্থান করেন। উক্ত স্থানে পানি দেখেতে পাওয়ার পরে ইমাম (আ.) তার সঙ্গিদের বলেন: তোমরা মশকগুলোতে পানি পূর্ণ করে নাও। উক্ত স্থানে ইবনে যিয়াদের সৈন্যরা ইমাম হুসাইন (আ.)কে কুফাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করে।  (তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩০২, ইমামুল হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮১, ১৮৭, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৬, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৭৫)

২৭শে জিলহজ্ব

১.       যু’হুসুম নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় উক্ত তারিখে রোজ রবিবার যুহুসুম নামক স্থানে পৌছান। উক্ত স্থানের নামটি ইতিহাসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে যেমন:যু হুসুসি, যু খুসুব এবং যু জিসাম্মি। ইমাম হুসাইন (আ.) তার সঙ্গিদের সেখানে অবস্থান করার নির্দেশ করেন। হুর বিন ইয়াযিদ রিয়াহি উক্ত স্থানে পৌছালে ইমাম হুসাইন (আ.) তার সৈন্য এবং ঘোড়াকে পানি দ্বারা পরিতৃপ্ত করার নির্দেশ দেন।  (নাফসুল মাহমুম, পৃষ্ঠা ১৮৮, ইমামুল হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮৩, আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৭০- ৮০, যারিয়াতুন নেজাত, পৃষ্ঠা ৫৯, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৭৬)

২.      মারওয়ানের মৃত্যু

সন ১৩৩ হিজরীর উক্ত তারিখে মারওয়ান বিন মোহাম্মাদ বিন মারওয়ান বিন হাকাম ওরফে মারওয়ানে হেমারকে হত্যা করা হয়।  সে ছিল বণি উমাইয়ার শেষ খলিফা। বণি আব্বাসের বিদ্রোহের পরে সাফফা মারওয়ানকে হত্যা করার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে আলীকে প্রেরণ করে। মারওয়ান তখন মিশরে বুসির নামক স্থানে আত্মগোপন করেছিল। বণি আব্বাসের লোকজন পথে বণি আব্বাসের কোন লোকজন দেখার সাথেই তাদেরকে হত্যা করছিল। এমনকি জর্ডান নদীর কিনারায় তারা অসংখ্য লোকজনকে হত্যা করে এবং তাদের লাশের উপরে বসে খাদ্য খায়। সেখান থেকে আব্দুল্লাহ মারওয়ানকে হত্যা করার জন্য আমের বিন ইসমাইলকে প্রেরণ করে। সে মারওয়ানকে এক গির্জার মধ্যে হত্যা করে এবং তার জিহবাকে কেটে একটি বিড়ালকে খেতে দেয়। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মারওয়ান উক্ত দিনেই তার এক গোলামের জিহবাকে কেটে উক্ত বিড়ালকে খেতে দিয়েছিল।  (কালায়েদুন নুহুর, খন্ড জিলহজ, পৃষ্ঠা ৪১৩, ইকবাল, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১১৫, আত তানম্বি ওয়াল ইশরাফ, পৃষ্ঠা ২৮৩, জান্নাতুল খুলুদ, পৃষ্ঠা ৬৪, তারিখে তাবারী, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৯৭)

.     হাররার কলঙ্কময় ঘটনা

সন ৬৩ হিজরীতে উক্ত তারিখ রোজ বুধবারে ইতিহাসের কলঙ্কময় ঘটনা যা “হাররা-এর ঘটনা” নামে প্রসিদ্ধ। উক্ত ঘটনায় এজিদের নির্দেশে মসজিদে নবাবিকে ঘোড়ার আস্তাবল বানানো হয়, নারীদের সম্ভ্রমকে লুট করা হয়, রাসুল (সা.) এর সাহাবীদেরকে হত্যা করা হয়। মুসলিম বিন উকবা তার সৈন্যদের জন্য মদীনার সকল কিছুকে তিন দিনের জন্য মুবাহ বা উন্মুক্ত করে দেয়। আর উক্ত ঘটনাটি এজিদের মৃত্যুর আড়াই মাস পূর্বে সংঘটিত হয়।  (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ১৮, পৃষ্ঠা ১২৫- ১২৬, কালায়েদুন নুহুর, খন্ড জিলহজ, পৃষ্ঠা ৪৪৮, তারিখে খালিফা বিন খায়াত, পৃষ্ঠা ১৯২, তারিখে দামেস্ক, খন্ড ২৭, পৃষ্ঠা ১৯, ফেইযুল আলাম, পৃষ্ঠা ১৩২)

২৮শে জিলহজ্ব

আযিবুল হাজানাত নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় উক্ত তারিখে আযিবুল হাজানাত নামক স্থানে অবস্থান করেন। উক্ত স্থানে মোজাম্মা, তারাম্মাহ এবং নাফে হুসাইনি কাফেলায় যোগ দেয়। ইতিহাসের বর্ণনামতে উক্ত স্থানেই ইমাম হুসাইন (আ.) কাইস ইবনে মুসহহারের মৃত্যুর সংবাদ পান।  (ইমাম হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮৫)

ইয়াজিদ বাহিনীর গণহত্যা ও গণ-ধর্ষণ

কারবালার মহা-ট্র্যাজেডির দুই বছরেরও কম সময় পর ৬৩ হিজরির ২৮ জিলহজে খোদাদ্রোহী ইয়াজিদের বাহিনী মদীনায় মসজিদে নববী ও রাসূল (সা.)’র রওজার অবমাননাসহ গণহত্যা এবং গণ-ধর্ষণের মত নানা মহাঅপরাধে লিপ্ত হয়। ইয়াজিদের নর-পশু সেনারা পরে মক্কায়ও হামলা চালিয়ে পবিত্র কাবা ঘর ধ্বংস করেছিল।

নরপশু ইয়াজিদের নির্দেশে কুফায় নিযুক্ত তার গভর্নরের অনুগত সেনাদের হাতে বিশ্বনবী (সা.)’র প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবার-পরিজনসহ প্রায় ১০০ জন সঙ্গীর বেশিরভাগেরই কারবালায় শাহাদত বরণের  হৃদয়বিদারক এবং মহাবিয়োগান্তক ঘটনার খবর শুনে মদীনাবাসী ইয়াজিদের চরিত্র ও প্রকৃতি সম্পর্কে তদন্ত চালায়। তারা এ লক্ষ্যে দামেস্কে একটি তদন্ত-টিম পাঠায়। তদন্ত-টিম তাকে ইসলামী মূল্যবোধ-শূন্য  ও একজন নৈতিক চরিত্রহীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে পায়। ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তাঁর মহান বিপ্লব ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের সহযোগিতা করতে না পারার জন্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গণ-অনুশোচনা ক্রমেই জোরদার হতে থাকে।

এ অবস্থায় মদীনাবাসী তাদের শহর থেকে ইয়াজিদের নিযুক্ত গভর্নরকে বের করে দেয় এবং ইয়াজিদের অনৈসলামী শাসনকে বৈধ শাসন হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। ফলে মহাপাপিষ্ঠ ইয়াজিদ সিরিয়া থেকে  কুখ্যাত মুসলিম বিন উকবার নেতৃত্বে ১০ হাজার সেনা পাঠায়। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফও ছিল এই সেনাবাহিনীর এক সাধারণ সেনা।

উকবা মদীনার উত্তর-পূর্ব দিকে হাররা অঞ্চলে মদীনার প্রতিরোধকামীদের ওপর হামলা চালায়। অস্ত্রে সুসজ্জিত উমাইয়ারা বিপুল সংখ্যক মুজাহিদকে হত্যার পর শহরের ভেতরেও প্রতিরোধকামীদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়ে তাদের শহীদ করে। এমনকি যারা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ(সা.)’র পবিত্র মসজিদে ও তাঁর পবিত্র মাজার বা রওজায় আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরকেও নির্মমভাবে শহীদ করেছিল ইয়াজিদের পাষণ্ড সেনারা। বিশ্বনবী (সা.)’র বহু সাহাবীসহ ৭০০ জন গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব শহীদ হয় তাদের হামলায়। ইয়াজিদের সেনারা মদীনায় অন্তত ১০ হাজার মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে। এরপর উকবার নির্দেশে তার নেতৃত্বাধীন ইয়াজিদের সেনারা তিন দিন ধরে মদীনা লুট-তরাজ চালায় এবং নারীদের সম্ভ্রমহানি করে। তারা মদিনার মসজিদে নববীকে ঘোড়ার আস্তাবল বানায় এবং ঘোড়ার মলমূত্রে অবমাননা করা হয় মুসলিম বিশ্বের পবিত্রতম এই স্থানের। এরপর এই  অভিশপ্ত সেনাদল মক্কার দিকে যায় এবং এমনকি পবিত্র কাবা ঘরেও হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে।

মদীনায় নারীদের ওপর ইয়াজিদ-সেনাদের গণ-ধর্ষণের পরিণতিতে এক হাজারেরও বেশি অবৈধ সন্তান জন্ম নিয়েছিল এবং তাদের বাবা কে ছিল তা সনাক্ত করার কোনো উপায় ছিল না। ইতিহাসে এদেরকে ‘হাররা বিদ্রোহের সন্তান’বলে উল্লেখ করা হত। হাররার যুদ্ধ বা হাররার গণহত্যা নামে পরিচিত এই ঘটনা বহু বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে স্মরণ করা হয়েছে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত আলেম মাওলানা শাহ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলাভী-র. প্রণীত ‘কারবালার পর পবিত্র মক্কা ও মদীনায় ইয়াজিদি তাণ্ডবলীলা’ শীর্ষক প্রবন্ধ)

২৯শে জিলহজ্ব

কাতকাতানিয়া নামক স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.)

ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কা থেকে কারবালার অভিমুখে যাওয়ার সময় ২৯শে জিলহজ্ব তারিখে কাতকাতানিয়া নামক স্থানে অবস্থান করেন।  (আমালী সাদুক্ব, পৃষ্ঠা ২১৯, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩১৪, ইমাম হুসাইন (আ.) ওয়া আসহাবিহি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮৬)

জিলহজ্ব মাসের শেষ দিন

.      রাসুল (সা.) বিভিন্ন বাদশাদেরকে চিঠি লিখেন

সন ৬ হিজরী রাসুল (সা.) বিভিন্ন দেশের বাদশাহদেরকে চিঠি লিখেন এবং তাদেরকে দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দেন।  (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ২০, পৃষ্ঠা ৩৮২, তারিখে তাবারী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮৮, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২০৬, ২৯৮, মাকাতিবুর রাসুল (সা.), খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮২)

২.     হজরত আবু যার (রা.)এর মৃত্যু

হজরত আবু যার (রা.) ছিলেন রাসুল (সা.)এর সেই সাহাবী যাকে তিনি সত্যবাদি বলে আখ্যায়িত করেছেন। যখন তিনি মাবিয়ার অপকর্ম সমুহকে দেখলেন তখন তিনি আর চুপ থাকতে পারেননি এবং মাবিয়ার বিরোধিতা করেন। মাবিয়া উক্ত খবরটি হজরত উসমানকে অবগত করলে হজরত উসমান তাকে ডেকে পাঠায় এবং তাকে “রাবেযা” নামক স্থানে নির্বাসন দেন। তিনি স্বপরিবারে রাবেযাতে চলে যান। সন ৩২ হিজরীতে সেখানে তিনি তাঁর সন্তান, স্ত্রী  মারা যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ তার জানাযার নামাজ পড়ান এবং এবং মালিকে আশতার তাঁকে কাফন পরান ও দাফন করে দেন।  (বেদায়াতুন নেহায়া, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৮৫, তারিখে তাবারী, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৫৪, তারিখে দামেস্ক, খন্ড ৬৬, পৃষ্ঠা ২১৭, আশ শিয়া ফি আহাদিসিল ফারিকাইন, পৃষ্ঠা ৫১৮, আদ দারাজাতুর রাফিয়া, পৃষ্ঠা ৪৩২)

.    যোরারে বিন আয়ুন (রহ.)এর মৃত্যু

সন ১৪৮ হিজরী ইমাম জাফর সাদিক (আ.)এর শাহাদতের প্রায় দুই মাস পরেই যোরারে বিন আয়ুন (রহ.) মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তার জিবদ্দশায় তিন ইমাম (আ.)এর সান্নিধ্যে অর্জনের সৌভাগ্যে লাভ করেন।  (মুসনাদে যোরারে ইবনে আয়ুন, পৃষ্ঠা ২৬, রেজালে নাজ্জাশি, পৃষ্ঠা ১৭৫, আল ফাওয়ায়েদুর রেজালিয়া, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩২, আল কুনিয়া ওয়াল আলকাব, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৩, মুনতাহিউল আমাল, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭১)

৪.      হজরত আবু বকরের পিতার মৃত্যু

সন ১৩ হিজরীর শেষের দিকে হজরত আবু বকরের বাবা আবু কুহাফা উসমান বিন আমের ৯৭, ৯৯ অথবা ১০৪ বছর বয়সে মারা যায়।  আবু কুহাফা মক্ক বিজয়ের পরে ঈমান আনেন। সে হজরত উমরের খেলাফতকালে এবং হজরত আবু বকরের মৃত্যুর ছয় মাস এবং কয়েকদিন পরে ইহলোক ত্যাগ করেন।  (মুসতাদরাকে সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১০, আত তাম্বিহ ওয়াল ইশরাফ, পৃষ্ঠা ২৪৯, মুরুজুয যাহাব, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০৭, তাবাকাতুল কুবরা, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২১১, তারিখে তাবারী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৬১৭)

৫.     কলিজাখোর হিন্দার মৃত্যু

ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ি ‍১৩ হিজরীর উক্ত তারিখে রাসুল (সা.)এর চাচা হজরত হামযা (রা.) এর কলিজাখোর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী ও মাবিয়ার মা হিন্দা ও মৃত্যু বরণ করে। উক্ত দিনটি হচ্ছে আরবি বর্ষের শেষ দিন। (তাতেম্মাতুল মুনতাহা, পৃষ্ঠা ৪৩, উসদুল গাবা, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৬৩, ফাতহুল বারী, খন্ড ৯, পৃষ্ঠা ৪১৯, ইসতিআব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৯২৩, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ৬০)

More from ঐতিহাসিক ঘটনাবলিMore posts in ঐতিহাসিক ঘটনাবলি »
More from বর্ষ পঞ্জিকাMore posts in বর্ষ পঞ্জিকা »