Press "Enter" to skip to content

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার কল্পকাহিনি ও ওহাবীদের ষড়যন্ত্র– ৫

মূল: আল্লামা সৈয়দ মুরতযা আসকারী

অনুবাদ নূর হোসেন মজিদী

প্রসঙ্গ: রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাত

রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সোমবার দুপুরে ইন্তেকাল করেন। এ সময় হযরত ওমর মদিনায় ছিলেন’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ৪র্থ খণ্ড/ ৩৩১-৩৩৪; তারীখে তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৪২) এবং হযরত আবুবকর তাঁর বাড়ির উঠানে ছিলেন। (তারীখে খামীস্, ১ম খণ্ড/ ১৮৫। সানুহ তৎকালীন মদীনা থেকে এক মাইল পূর্বে অবস্থিত; অন্যতম আনসার গোত্র বনি হারেছের বাসস্থান ছিল)

হযরত ওমর কর্তৃক রাসুলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাত অস্বীকার

হযরত ওমর ও মুগীরাহ্ বিন্ শু’বাহ্ অনুমতি নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর হুজরায় প্রবেশ করলেন এবং যে কাপড় দিয়ে তাঁর চেহারা ঢেকে দেয়া হয়েছিলো তা সরিয়ে ফেললেন। হযরত ওমর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর চেহারা দেখার পর চিৎকার করে বলে উঠলেন “দেখো! রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কেমন মারাত্মকভাবে বেহুঁশ হয়ে গেছেন।”

তিনি একথা বলে হুজরাহ্ থেকে বের হবার সময় মুগীরাহ্ তাঁকে বললেন- “হে ওমর! আল্লাহর শপথ, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।”

তখন হযরত ওমর বললেন “তুমি মিথ্যা বলেছ। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কখনো মারা যাননি। কিন্তু তুমি যেহেতু বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী লোক সেহেতু এরূপ ভান করছ। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মুনাফিকদেরকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত কখনো মারা যাবেন না। (তাবাক্বাত, ২য় খণ্ড, ক্বাফ ২/৫৪; কানযুল ‘উম্মাল্, ৪র্থ খণ্ড/ ৫০; তারীখে যাহাবী, ১ম খণ্ড/ ৩৭ঃ মুসনাদে আহমাদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ২১৯ ও অন্যান্য)

শুধু তা-ই নয়, যারাই রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ইন্তেকালের কথা বলেন “কতক হযরত ওমর তাঁদেরকেই হত্যার হুমকি দেন। তিনি বলেন মুনাফিক ব্যক্তি ধারণা করছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তা নয়, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মারা যাননি। মূসা বিন্ ‘ইমরান যেমন চল্লিশ দিনের জন্যে লোকচক্ষুর আড়ালে যান ও পরে ফিরে আসেন, আর তাঁর সম্পর্কে লোকেরা বলে যে, তিনি মারা গেছেন, তেমনি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)ও তাঁর রবের নিকট গিয়েছেন; আল্লাহর শপথ, তিনি ফিরে আসবেন এবং যারা ধারণা করছে ও বলছে যে, তিনি মারা গেছেন তাদের হাত-পা কেটে ফেলবেন। (তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড/৯৫ঃ তাবারী, ২য় খণ্ড/ ২৪২; বিদাইয়াহ ওয়া নিহাইয়াহ, ৫ম খ০/ ২৪৪ ও অন্যান্য) এরপর তিনি বলেন “যে ব্যক্তি বলবে যে, তিনি মারা গেছেন এই তলোয়ার দ্বারা আমি তার মাথা ধর থেকে আলাদা করে ফেলব। (তারীখে আবুল ফিদা, ১ম খণ্ড/ ১৬৪; তারীখে ইবনে শাহনাহ্, ৩য় খণ্ড/ ৩৯০) তিনি বলেন” রাসূলুল্লাহ (সা.) আসমানে চলে গেছেন। (তারীখে আবুল ফিদা, ১ম খণ্ড/১৬২)

এ সময় ইবনে উম্মে মাম্ মসজিদুন্নাবী (সা.)-এ কোরআন মাজীদের এ আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন (ত্বাবাক্বাত, ২য় খণ্ড, ক্বাফ ২/৫৭; কানযুল উম্মাল, ৪র্থ খণ্ড/ ৫৪, হাদিস নং ১৯০২ ও অন্যান্য) “আর মুহাম্মাদ রাসূল ছাড়া আর কিছুই নন; তাঁর পূর্বে রাসূলগণ চলে গেছেন। অতএব, তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন বা নিহত হন তাহলে কি তোমরা তোমাদের অতীত অবস্থায় ফিরে যাবে? তাহলে তারা আল্লাহর কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। আর আল্লাহ্ অচিরেই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন। (সূরা আলে ‘ইমরান: ১৪৪)

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাসও বললেন “রাসূলুল্লাহ (সা.) অবশ্যই ইন্তেকাল করেছেন। আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তানদের চেহারায় মৃত্যুকালে সব সময়ই যে চিহ্ন ও নিদর্শন দেখেছি তাঁর চেহারায়ও তা-ই দেখেছি। (আবু বাক্ বাক্কেলানী। তামহীদ, পৃ. ১৯২-১৯৩)

কিন্তু হযরত ওমর নিরস্ত হলেন না। হযরত আব্বাস জনতাকে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমাদের মধ্যে কেউ কি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে তাঁর নিজের মৃত্যু সম্পর্কে কোনো কথা বলতে শুনেছো?” সবাই বলল “না।” হযরত আব্বাস হযরত ওমরকে জিজ্ঞেস করলেন “তুমি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) থেকে কিছু জান কি?” হযরত ওমর বললেন “না।” তখন হযরত আব্বাস জনতার উদ্দেশে বললেন “হে লোকসকল! তোমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তিও কি নেই যাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে (কোনো ব্যতিক্রমী কথা বলার) দায়িত্ব দিয়েছেন। (ত্বাবাক্বাত, ২য় খণ্ড, ক্বাফ ২/ ৫৭; ইবনে কাসির, ৫ম খ০/ ২৪৩। কানযুল ‘উম্মাল, হাদিস নং ১০৯২ ও অন্যান্য সূত্র) যে আল্লাহ্ ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই তাঁর শপথ, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মৃত্যুর পেয়ালা পান করেছেন। (তারীখে আবুল ফিদা’, ১ম খণ্ড/১৫০)

কিন্তু হযরত ওমর আগের মতোই গর্জন করতে ও হুমকি দিতে থাকলেন। হযরত আব্বাস বলে চললেন “শুনে রেখো, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) অন্যান্য মানুষের মতোই রোগ-ব্যাধি ও মৃত্যুর উপযোগী। তাঁর লাশকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দাফন করো। আল্লাহ্ কি তোমাদেরকে এক বার আর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে দুই বার মৃত্যু দেবেন? তিনি আল্লাহ্র নিকট এমনই প্রিয় যে, তিনি তাঁকে দুই বার মৃত্যুর পেয়ালা পান করাবেন না। তোমাদের কথা যদি সত্য হয়ে থাকে তো আল্লাহর জন্যে তাঁকে কবরের মাটি পাশে সরিয়ে দিয়ে তাঁকে বের করে আনা কঠিন ব্যাপার নয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) লোকদের জন্যে সৌভাগ্য ও নাজাতের পথ উজ্জ্বল ও সহজগম্য না করে দুনিয়া থেকে যাননি। (তাবাক্বাত, ২য় খণ্ড, ক্বাফ ২/৫৩; কানযুল ‘উম্মাল্, হাদিস নং ১০৯০; তিবরানী, ২য় খণ্ড/ ১৮৫ ও অন্যান্য সূত্র) কিন্তু হযরত ওমর তাঁর কথা বারবারই বলতে থাকলেন, ফলে তাঁর মুখে ফেনা এসে গেল, …। (তাবাক্বাত, ২য় খণ্ড, ক্বাফ ২/৫৩; কানযুল্ ‘উম্মাল্, ৪র্থ খণ্ড/ খণ্ড/ ৫৩ ও অন্যান্য সূত্র)

এরপর সালেম বিন্ ওবাইদ্ সান্‌হ গিয়ে হযরত আবুবকরকে খবর দিলেন। (তারীখে ইবনে কাসির, ৫ম খণ্ড/ ২৪৪ ও অন্যান্য সূত্র) হযরত আবুবকর মদিনায় এলেন এবং দেখলেন যে, হযরত ওমর দাঁড়িয়ে আছেন ও লোকদেরকে হুমকি দিচ্ছেন (তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৪৩ ও অন্যান্য) এবং বলছেন “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বেঁচে আছেন; মারা যাননি। তিনি বেরিয়ে আসবেন এবং যারা তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বলছে ও তাঁকে মৃত মনে করছে তিনি তাঁদের হাত কেটে দেবেন ও শিরশ্ছেদ করবেন এবং তাদেরকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাবেন।”

হযরত ওমর হযরত আবুবকরকে দেখামাত্রই শান্ত হয়ে গেলেন ও বসে পড়লেন। (কানযুল্ ‘উম্মাল, ৪র্থ খণ্ড/ ৫৩, হাদিস নং ১০৯২)

হযরত আবুবকর আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং বললেন- “যারা আল্লাহ্ ইবাদত করে তারা জেনে রাখুক যে, আল্লাহ্ সদা জীবিত। আর যারা মুহাম্মাদের ইবাদত করে তারা জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।” এরপর তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করেন “আর মুহাম্মাদ রাসূল ব্যতীত কিছু নন; তাঁর পূর্বে রাসূলগণ চলে গেছেন। (ত্ববাক্বাত, ২য় খণ্ড, ক্বাফ ২/৫৪; তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৪৪; তারীখে ইবনে কাসির, ৫ম খণ্ড/২১৯ ও অন্যান্য)

হযরত ওমর জিজ্ঞেস করলেন কোরআনের আয়াত?” হযরত আবুবকর বললেন “আপনি যা পড়লেন তা কি “হ্যাঁ। (‘ত্বাবাকাতে ইবনে সা’দ)

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ইন্তেকাল সম্বন্ধে হযরত ওমরের মত বদলে গেল। তবে তা মুগীরার কথায় বা ইবনে উম্মে মাকতুম্ কর্তৃক কোরআন মাজীদের আয়াত তেলাওয়াতের কারণে নয়, বা হযরত আব্বাসের যুক্তির কারণেও নয়; বরং হযরত আবুবকরের আগমন ও কথায়। অতঃপর তিনি নীরব ও শান্ত হলেন। পরে তিনি এ ব্যাপারে বলেন “আবুবকরকে যখন এ আয়াত তেলাওয়াত করতে শুনলাম তখন আমার হাঁটুদ্বয় এমনভাবে নিঃশক্তি হয়ে গেল যে, আমি মাটিতে পড়ে গেলাম এবং পুনরায় দাঁড়াবার শক্তি থাকল না। আমি বুঝতে পারলাম রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মৃত্যুবরণ করেছেন। (ইবনে হিশাম, ৪র্থ খণ্ড/ ২৩৫ ও ৩৩৪; তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৪২-৪৪৪; ইবনে কাসির, ৫ম খণ্ড/২৪২ ও অন্যান্য)

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাত অস্বীকারের কারণ কী?

এখানে প্রশ্ন জাগে, হযরত ওমর রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ওফাতের কথা অস্বীকার করলেন কেন? তিনি কি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর প্রতি মহব্বতের আতিশয্যে মানসিক চাপে ও মনের দুঃখে এমনটি করেছিলেন? কতক ঐতিহাসিক যে বলেছেন ” হযরত ওমর ঐদিন পাগল হয়ে গিয়েছিলেন” এটাই কি সত্য? (সীরাতে হালাবীয়্যাহ্, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৯২ এবং ৩৯১ পৃষ্ঠার পার্শ্বটীকা)

কিন্তু না, আমরা জানি যে, ব্যাপার অন্য কিছু।

আমাদের মতে, ইবনে আবিল হাদীদ প্রকৃত বিষয়টি ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন “ওমর যখন বুঝতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তখন তিনি ভয় করছিলেন যে, পাছে খেলাফতের প্রশ্নে কোন বিপ্লব ঘটে যায় এবং আনসাররা অন্যদের সাথে মিলে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নিয়ে নেন। তাই তিনি যেকোনোভাবেই হোক লোকদের নীরব করে রাখার মধ্যেই কল্যাণ দেখতে পান। অতএব, তিনি যে কথা বলেছিলেন এবং জনগণকে যে সংশয়ের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিলেন তার উদ্দেশ্য ছিল দ্বীন ও রাষ্ট্রের হেফাজত; অতঃপর হযরত আবুবকর এলেন। (শারহে ইবনে আবিল্ল হাদীদ, ১ম খণ্ড/১২৯)

অন্যদের সাথে মিলে আনসাররা প্রাধান্যের অধিকারী হবে বলে হযরত ওমর ভয় করছিলেন বলে ইবনে আবিল হাদীদ যে উল্লেখ করেছেন আমাদের মতে তা যথার্থ। কারণ, হযরত আলী ছিলেন সেই “অন্য লোকদের” অন্তর্ভুক্ত এবং হযরত ওমর ভয় করছিলেন যে, আলীই হয়তো খেলাফত লাভ করবেন।

ঐ সময় খেলাফতের দাবিদার ছিলেন তিনজন –

প্রথম আলী ইবনে আবি তালিব। সমগ্র বনি হাশেম ছিলেন তাঁর সমর্থক। এ ছাড়া আবু সুফিয়ান, যুবাইর, খালেদ বিন সা’ঈদ উমাভী, বারাআ বিন্ গ্বারেব আনসারী, সালমান, আবু যার, মিকুদাদ ও আরো অনেক শীর্ষস্থানীয় সাহাবি তাঁর সমর্থক ছিলেন।

দ্বিতীয় হযরত সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহ্ আনসারী। তিনি ছিলেন আনসার গোত্র বনু খাযরাজের সমর্থনপুষ্ট।

তৃতীয় – হযরত আবু বকর। হযরত ওমর, আবু ওবায়দাহ্, মুগীরাহ্ বিন্ শু’বাহ্ ও আবদুর রহমান ‘আওফ ছিলেন তাঁর পক্ষে।

কিন্তু সা’দ বিন ‘উবাদাহর পক্ষে খেলাফত লাভ করার কোনোই সম্ভাবনা ছিল না। কারণ, আনসারদের মধ্যকার আউস্ গোত্র ছিল তাঁর বিরোধী। অন্যদিকে মুহাজিরদের মধ্যে তাঁর পক্ষে একজন লোকও ছিল না। এমতাবস্থায় হযরত আবুবকরের সমর্থকগণ যদি তাড়াহুড়া করে, এমনকি রাসূলে আকরাম (সা.)-এর কাফন ও দাফনের আয়োজন সমাপ্ত করার আগেই হযরত আবুবকরকে খলিফা করার পদক্ষেপ না নিতেন তাহলে হযরত আলী-ই খেলাফতের দায়িত্ব লাভ করতেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাফন ও দাফনের আয়োজনে ব্যস্ত না থেকে মজলিসে হাজির হলে, বা তাঁর হাজির হওয়া পর্যন্ত অবকাশ দেয়া হলে লোকেরা তাঁকেই খেলাফতের দায়িত্ব প্রদান করতেন। সেক্ষেত্রে হযরত আবুবকরের পক্ষে আর খলিফা হওয়া সম্ভব হত না। সম্ভবত এটাই ছিল হযরত ওমরের দুশ্চিন্তার বড় কারণ এবং কতক মনীষী যেমন মনে করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে ওয়াসিয়্যাত করার ক্ষেত্রে বাধা দান এবং তাঁর ইন্তেকালের কথা অস্বীকার করা তাঁর এ উভয় কাজের পিছনেই এ দুশ্চিন্তাই কাজ করেছিল। অন্যথায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর প্রতি মহব্বতের আতিশয্যে দিশেহারা হয়ে যাওয়াই যদি হযরত ওমর কর্তৃক রাসূলের (সা.) ইন্তেকাল অস্বীকার করা ও অস্বাভাবিক আচরণ করার কারণ হয়ে থাকত তাহলে তাঁর পক্ষে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাফন-দাফনের কাজে না গিয়ে বনু সায়েদার সাক্বীফায় ছুটে যাওয়া এবং খেলাফত প্রশ্নে আনসারদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হওয়া ও হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হওয়া সম্ভব হতো না।

এ ব্যাপারে ইবনে হিশাম লিখেছেন শাইখাইনের’ (শাইবাইন- সুই পারব অর্থাৎ হযরত আবুবকর ও হযরত আলী। -অনুবাদক) নিকট যখন সংবাদ পৌঁছল যে, আনসাররা বনু সায়েদাহর সাক্বীফায় সমবেত হয়েছে [তখনো রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশ মোবারক তাঁর গৃহে ছিল এবং কাফন-দাফনের কাজ সম্পন্ন হয়নি। (সীরাতে ইবনে হিশাম, ৪র্থ খণ্ড/ ৩০৬ ও অন্যান্য) হযরত ওমর হযরত আবুবকরকে বললেন “চলুন, আমাদের ভাইদের (আনসারদের) কাছে যাই এবং দেখি যে, তারা কী করছে। (প্রাগুক্ত; মাস’ উদী, পৃ. ২৪৭)

তাবারী বলেন, হযরত আলী যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাফন-দাফনের কাজে ব্যস্ত তখন তাঁরা দু’জন আনসারদের দিকে ছুটে গেলেন। পথে আবু ওবায়দাহ্ ইবনে জাব্রার সাথে তাঁদের দেখা হলো এবং তিনজন একত্রে গেলেন। (তারীবে তাবারী, ২য় খণ্ড/৪৫৬)

ইতঃপূর্বেই আনসাররা খেলাফত সম্বন্ধে আলোচনার জন্যে সাক্বীফায় জমায়েত হয়েছিলেন এবং কতক মুহাজিরও তাঁদের সাথে যোগদান করেছিলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাফন-দাফনের কাজে কেবল তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠ জন ছাড়া আর কেউই থাকলেন না। কেবল তাঁরাই তাঁকে গোসল দেয়া ও কাফন পরানোর দায়িত্ব পালন করলেন। (মুসনাদে আহসান, ৪র্থ ৩০/ ১০৪-১০৫। ইবনে কাসির, ৫ম খ০/ ২৬০; তারীখে তাবারী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৪৫১ ও অন্য অনেক সূত্র)

সাহাবি আবু যুওয়াইব হুযালী সেদিন মরু এলাকা থেকে মদিনায় আসেন; তিনি বলেন”( ইপ্তি’ আব, ২৩ বন্ড, পৃ. ৬৩৪। উলসুল স্বারাহ, ৫ম ৯০/ ১৮৮। ইয়াবাহ, ৪র্থ খণ্ড/ ৩৮৮) “আমি যখন মদিনায় পৌঁছলাম তখন সেখানে কান্নাকাটি ও হৈচৈ শুনতে পেলাম; এ ছিল ঠিক ইহরামের লোকদের ক্রন্দনের শব্দের মতো। জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপার কী? লোকেরা জবাব দিল-রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইন্তেকাল করেছেন। মসজিদে ছুটে গেলাম, কিন্তু তা খালি দেখলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর গৃহের দিকে ছুটে গেলাম। কিন্তু সেখানে দরজা বন্ধ দেখতে পেলাম। শুনলাম, সাহাবিগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশ তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে রেখে চলে গেছেন। জিজ্ঞেস করলাম লোকেরা কোথায়? জবাব দিলেন বনু সায়েদাহ সাক্বীফায় আনসারদের নিকট ছুটে গেছেন।”

হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর লাশ গোসল দেয়া ও কাফন-দাফনের জন্যে তাঁর পরিবারের সদস্যগণ ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন ছাড়া আর কেউই ছিলেন না। এ কাজে যারা অংশ নেন তাঁরা হলেন- আব্বাস বিন্ আবদুল মুত্তালিব, আলী ইবনে আবি তালিব, ফাল্ বিন্ আব্বাস, ক্বাসাম বিন্ আব্বাস, ওসামাহ্ বিন হারেছাহ্ ও ওসামাহর গোলাম ছালেহ। হযরত আলী তাঁদের সহায়তায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশকে গোসল দিলেন। এ সময় আউস্ বিন্ খুওয়ালী আনসারী সেখানে আসেন, তবে তিনি কোনো কাজে অংশ নেননি।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর দাফনের পূর্বে খেলাফতের দাবিদারগণ

রাসূলে আকরাম (সা.)-এর কাফন-দাফনের কাজ সম্পাদিত হবার আগেই তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও সাহাবিগণ খলিফা হিসেবে তাঁদের পছন্দীয় ব্যক্তির অনুকূলে বাই’আত হওয়ার উদ্যোগ নেন। তাঁরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে যান এবং প্রত্যেক দলই তাঁদের পছন্দনীয় ব্যক্তিকে খলিফা করার চেষ্টা করেন।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর খেলাফতের প্রথম দাবিদার

রাসূলে আকরাম (সা.)-এর খেলাফতের প্রথম দাবিদার ছিলেন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব।

ইবনে সা’দ তাঁর ত্বাবাকাতে লিখেছেন হযরত আব্বাস হযরত আলীকে বললেন “তোমার হাত বাড়িয়ে দাও; আমি তোমার নিকট বাই’আত হব যাতে জনগণও তোমার নিকট বাই’আত হয়। (মুরূজুয যাহার, ২য় খণ্ড/ ২০০; তারীখে যাহাবী, ১ম খণ্ড/ ৩২১ ও অন্যান্য সূত্র) আর মাস’উদীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত আব্বাস বলেন “এই ভাতিজা! এসো তোমার নিকট বাই’আত হই যাতে দুই ব্যক্তিও খেলাফতের ব্যাপারে তোমার বিরোধিতা না করে।”২

যাহাবী ও অন্যান্য সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত আব্বাস বলেন-“তোমার হাত বাড়িয়ে দাও; বাই’আত হব, যাতে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা রাসূলের চাচাতো ভাইয়ের নিকট বাই’আত হয়েছেন। তখন তোমার বংশের সকল লোক তোমার নিকট বাই’আত হবে। আর একবার বাই’আত হয়ে গেলে তা আর উল্টানো যাবে না।”

যাওহারীর রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, হযরত আব্বাস পরে এ ব্যাপারে আলীকে তিরস্কার করেন; তিনি বলতেন “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যখন দুনিয়া থেকে চলে গেলেন তখনই আবু সুফিয়ান বিন্ হাব আমার কাছে এল এবং আমরা তোমার নিকট বাই’আত হতে চেয়েছিলাম। আমি তোমাকে বলেছিলাম, তোমার হাত বাড়িয়ে দাও; আমি তোমার নিকট বাই’আত হব, আর এই শায়খ (তাঁর গোত্রের মুরুব্বী)ও বাই’আত হবেন। এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, আমরা দু’জন যদি তোমার নিকট বাই’আত হই তাহলে আব্দ মানাফের বংশের এমনকি একজন লোকও তোমার বিরোধিতা করবে না। আর কুরাইশরা তোমার অনুকূলে বাই’আত হলে আরবদের মধ্যে একজন লোকও তোমার বিরোধিতা করবে না। কিন্তু তুমি জবাবে বললে, আমরা আপাতত রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর জানাযাহ্ নিয়ে ব্যস্ত আছি। (ইবনে আবিল্ হাদীদ: শারহে নাহজুল বালাগাহ্, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৪ ও ১৩১)ত্বাবারীর রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, হযরত আব্বাস হযরত আলীকে বলেন- “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর আমি চাচ্ছিলাম যে, তুমি এ ব্যাপারে তাড়াতাড়ি কর, কিন্তু তুমি বিরত থাকলে …। (তাবারী, ৩য় খণ্ড/ ২৯৪; ‘ইদুল্ ফারীদ, ৩য় খণ্ড/ ৭৪)

হযরত আব্বাস ও আবু সুফিয়ান বিন্ হাব ছাড়াও আরো অনেক সাহাবি হযরত আলীর পক্ষে কাজ করছিলেন। কিন্তু হযরত আলী রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর গোসল ও কাফন-দাফনের দিকেই পূর্ণ মনোযোগ প্রদান করেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশ মোবারক কাফন-দাফন ছাড়াই ঘরে রেখে দিয়ে খেলাফত লাভ ও লোকদের নিকট থেকে বাই’আত গ্রহণে মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। এ কারণেই পরবর্তীকালে হযরত আব্বাস তাঁকে এই বলে তিরস্কার করেন যে, কেন তিনি তখন বাই’আত গ্রহণ থেকে বিরত থাকলেন?

কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো এই যে, এ ব্যাপারে আব্বাসের যুক্তি ও তিরস্কার কোনোটাই সঠিক ছিল না। কারণ, একদল মুসলমান যেমন বিশ্বাস করেন যে, রাসূলে আকরাম (সা.) হযরত আলীকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত খলিফা নিয়োগ করে গিয়েছিলেন, এটা সত্য হয়ে থাকলে তাঁর অনুকূলে লোকদের বাই’আত হওয়া না হওয়ায় প্রকৃত অবস্থায় কোনোই পার্থক্য ঘটে না এবং বাই’আত না হওয়ায় তাঁর অধিকার মোটেই হ্রাস পায় না।

তখনকার মুসলমানরা যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ইচ্ছাকে সম্মান প্রদর্শন ও কার্যকর করতে প্রস্তুত থাকতেন তাহলে তাঁর প্রতি প্রলাপ বকার অভিযোগ আরোপ করতেন না। অনেক মুসলামানেরই যেমন বিশ্বাস, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) খেলাফতের বিষয়টি অনির্ধারিত রেখে গেছেন, যদি তা-ই হয়ে থাকে তাহলে তাড়াহুড়া করে হযরত আলীর অনুকূলে বাই’আত হয়ে অন্যদেরকে খলিফা নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার হযরত আব্বাসের ছিল না। মোদ্দাকথা, ঐদিন হযরত আলী যদি তাঁর চাচার কথা শুনতেন এবং বাই’আত গ্রহণ করতেন তাহলে আবুবকরের অনুকূলে বাই’আতকে যেমন ভুল কাজ বলে স্বীকার করা হয়েছে’ হযরত আলীর অনুকূলে বাই’আতকেও একইভাবে ভুল কাজ বলে স্বীকার করা হয়েছে। (এটা হযরত ওমরের অভিমত। পরবর্তীকালে তিনি স্বীকার করেন যে, তাড়াহুড়া করে হযরত আবুবকরের অনকূলে বাই’আত হওয়া একটা ভুল কাজ ছিল) আর সেক্ষেত্রে তাঁর বিরোধীরা এমনভাবে যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করতো যে, বছরের পর বছর পার হলেও তা নির্বাপিত হত না। কারণ তাঁর বিরোধীরা ছিল এমন লোক যারা নবুওয়াত ও খেলাফত উভয়ের গৌরব বনি হাশেমকে দিতে প্রস্তুত ছিল না। হযরত আলী যেহেতু এসব বিষয়ে হযরত আব্বাস থেকে অধিকতর সচেতন ছিলেন তাই তিনি সর্বসাধারণ মুসলিম জনগণকে বাদ দিয়ে ঘরের মধ্যে অল্প কয়েকজনের নিকট থেকে বাই’আত গ্রহণ করতে প্রস্তুত হননি। আর একই কারণে হযরত ওসমানের হত্যাকাণ্ডের পর লোকেরা তাঁর নিকট এসে বাই’আত হতে চাইলে তিনি তাঁর ঘরে বসে অল্প সংখ্যক লোকের নিকট থেকে ঘরোয়া পরিবেশে বাই’আত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। (ইবনে আবিল্ হাদীদ: শারহে নাহজুল বালাঘাহ, ৯ম খণ্ড)

তাছাড়া রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সাথে হযরত আলীর যে নৈতিক ও আত্মিক সম্পর্ক সে বিচারে তাঁর মতো এত বড় মহান ব্যক্তিত্বের পক্ষে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশ গোসল ও কাফন-দাফন ছাড়া ফেলে রেখে অন্য লোকদের মতো খেলাফত লাভের দিকে মনোযোগ দেয়া আদৌ সম্ভব ছিল কি?

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর খেলাফতের দ্বিতীয় দাবিদার

আনসারগণ বনু সায়েদাহর সাক্বীফায় সমবেত হলেন এবং বললেন “মুহাম্মাদ (সা.)-এর পর আমরা নেতৃত্ব ও খেলাফতের দায়িত্ব সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহর ওপর অর্পণ করব।” ঐ সময় সা’দ অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা তাঁদের এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সা’কে সাক্বীফায় নিয়ে এলেন।

সা’দ আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং দ্বীনের ক্ষেত্রে আনসারদের অগ্রবর্তিতা, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর দুশমনদের বিরুদ্ধে তাঁদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ও সাহাবিগণ তাঁদেরকে যেভাবে মর্যাদা দিয়েছেন আর তাঁদের ওপর সন্তুষ্ট থেকেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তার কথাও উল্লেখ করলেন। এরপর তিনি বললেন “সমস্যার সমাধান সম্বন্ধে আপনাদেরকেই চিন্তা করতে হবে, অন্য কাউকে নয়।”

তখন সবাই এক বাক্যে বললেন “আমরা আপনার কথার সাথে একমত; আপনার কথাই সঠিক। আমরা কখনোই আপনার মতামতকে উপেক্ষা করব না। আমরা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের দায়িত্ব আপনার ওপরই অর্পণ করব।”

এরপর সকলে আলাপ-আলোচনায় মশগুল হলেন। তারপর বললেন “কিন্তু কুরাইশ মুহাজিরগণ যদি তা মেনে নিতে রাজী না হন এবং বলেন

যে, “আমরা মুহাজির ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম সহচর এবং তাঁর স্ববংশীয় ও বন্ধু; অতএব, তার পরে তোমরা এ ব্যাপারে আমাদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হবে এর কোনো কারণ নেই,” তাহলে করণীয় কী?” একদল বললেন- “এ ধরনের আপত্তি হলে আমরা জবাবে বলব “আমাদের মধ্য থেকে একজন এবং তোমাদের মধ্য থেকে একজন আমীর নির্বাচিত হবে।” তখন সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহ্ বললেন “এটাই হলো প্রথম পরাজয়। (তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৫; ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড/ ২২২ ও অন্যান্য)

তৃতীয় ও সফল দাবিদার

সাক্বীফায় আনসারদের জমায়েত ও আলাপ-আলোচনার খবর পেয়ে হযরত আবুবকর ও হযরত ওমর আবু ওবায়দাহ্ বিন্ জারাহ্ সহ দ্রুত সেদিকে রওয়ানা হলেন। উসাইদ্ বিন্ হুযাইর, ‘উওয়াইম্ বিন্ সা’এদাহ্, ‘আছেম্ বিন্ ‘আদী, মুগীরাহ্ বিন্ শু’বাহ্ ও আবদুর রহমান বিন্ ‘আওফ তাঁদের সাথে মিলিত হলেন। এদের সকলেই সেদিন হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আতের জন্যে যথেষ্ট তৎপরতা চালান। এ কারণে তাঁরা হযরত আবুবকর ও ওমর- উভয় খলিফারই বিশেষ প্রিয়পাত্র ছিলেন।

হযরত আবুবকরের নিকট আনসারদের মধ্যে উসাইদ ছিলেন সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি এবং হযরত ওমর তাঁকে তাঁর ভাই বলে উল্লেখ করতেন।

আর ‘উওয়াইম্ বিন্ সা’এদাহ্ ইন্তেকাল করলে হযরত ওমর তাঁর কবরের কাছে বসে বলেন- “এ দুনিয়ার বুকে অন্য কোনো লোকই বলতে পারবে না যে, আমি এই কবরস্থ ব্যক্তির চেয়ে অধিকতর উত্তম।”

হযরত ওমর আবু ওবায়দাহকে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেনাপতি নিয়োগ করেন। হযরত ওমর মৃত্যুর আগে যখন পরবর্তী খলিফা নিয়োগের চিন্তা করেন তখন আবু ওবায়দাহর জীবিত না থাকার জন্যে আফসোস করেন এবং বলেন যে, তিনি বেঁচে থাকলে তাঁকে খলিফা করতেন।

খলীফা ওমর মুগীরাহ্ বিন্ শু’বাহর প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ দেখান এবং সব সময়ই তাঁকে কোথাও না কোথাও প্রশাসক পদে দায়িত্ব দেন। তিনি আবদুর রহমান বিন্ ‘আওফের প্রতিও যথেষ্ট অনুগ্রহের দৃষ্টি রাখতেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি পরবর্তী খলিফা নিয়োগের জন্যে যে কমিটি গঠন করে দেন তাতে মূল দায়িত্ব দেন আবদুর রহমানের ওপর।

এরা হলেন সেই সব বিশিষ্ট ব্যক্তি যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর লাশকে গোসল ও কাফন-দাফন বিহীন অবস্থায় রেখে দিয়ে সাক্বীফায় ছুটে যান এবং খেলাফতের ব্যাপারে আনসারদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হন ও তাতে বিজয়ী হয়ে হযরত আবুবকরকে খলিফা করতে সক্ষম হন।

সাক্বীফায় বিতর্ক

হযরত আবু বকর ও তাঁর সমর্থকগণ সাক্বীফায় এসে পৌঁছার পর খেলাফত প্রশ্নে হইচই ও দুই পক্ষের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। প্রত্যেকেই নিজ নিজ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কথা বলতে থাকেন। হযরত আবুবকরের সমর্থকদের মধ্যে হযরত ওমরই ছিলেন সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। তিনি একদিকে যেমন হযরত আবুবকরকে খলিফা করার জন্যে সকলকে উৎসাহিত করছিলেন, অন্যদিকে তাঁর বিরোধীদেরকে হুমকি দিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত আবুবকর দাঁড়িয়ে যান এবং হযরত ওমরকে থামিয়ে দিয়ে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা এবং ইসলামের খেদমতে মুহাজিরদের ভূমিকা বর্ণনা করার পর বলেন “হে জনগণ! এই মুহাজিররা হচ্ছেন তাঁরা যারা সর্বপ্রথম আল্লাহর জমিনে আল্লাহর ইবাদত করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর প্রতি ঈমান এনেছেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সহযোগী ও স্বগোত্রীয়। তাই তাঁর পরে খেলাফতের জন্যে অন্য সকলের চেয়ে তাঁরাই অধিকতর উপযুক্ত ও অধিকতর উত্তম। জালেমগণ ব্যতীত কেউ এ ব্যাপারে তাঁদের সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবে না।

এরপর তিনি আনসারদের মর্যাদা বর্ণনা করেন। এরপর তিনি বলেন – “যে সব মুহাজির ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে অগ্রবর্তী আমাদের দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যকার কেউই মর্যাদায় তাঁদের সমান নও। অতএব, আমরাই তোমাদের নেতা এবং তোমরা আমাদের সহযোগী।”

এ সময় হুবার্ বিন্ মুনযার দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বলতে লাগলেন-“হে আনসারগণ! তোমরা ক্ষমতার লাগামকে শক্ত করে নিজেদের হাতে ধরো যাতে অন্যরা তোমাদের অধীন হয়ে থাকে ও তোমাদের ছায়াতলে থাকতে বাধ্য হয় এবং কখনো তোমাদের বিরোধিতা করার সাহস না পায়। দুশমনরা যেন তোমাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করতে ও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তোমাদের রায়কে নস্যাৎ করে দিতে না পারে। কারণ, তাহলে তোমাদের পরাজয় অবধারিত হয়ে যাবে। তোমরা যা শুনলে এরা তা ছাড়া অন্য কিছুই করবে না। আমরা আমাদের নিজেদের জন্যে একজন নেতা নির্বাচন করব এবং তারা তাদের জন্যে একজন নেতা নির্বাচন করবে।”

তখন হযরত ওমর বললেন “কখনোই এক দেশে দু’জন রাজার স্থান হবে না। আল্লাহর শপথ, আরবরা কখনোই এটা মেনে নেবে না যে, তোমরা তাদের ওপর শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করবে যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তোমাদের মধ্য থেকে ছিলেন না। কিন্তু আরবরা এমন কারো শাসন ক্ষমতা মেনে নিতে আপত্তি করবে না রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যাদের মধ্য থেকে ছিলেন। আমাদের এ দাবির সপক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। আমরা মুহাম্মাদ (সা.)-এর সহচর ও স্ববংশীয় হওয়া সত্ত্বেও তাঁর শাসন ক্ষমতার উত্তরাধিকার যে আমাদের এ প্রশ্নে তোমরা আমাদের সাথে বিরোধ করছ? (হযরত ওমরের এ যুক্তির কথা যখন পরে হযরত আলীকে জানানো হলো তখন তিনি মন্তব্য করেন “নবুওয়াতের বৃক্ষের যুক্তি উপস্থাপন করল, কিন্তু তার ফলকে বিনষ্ট করল।” অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্ববংশীয় হওয়ার যুক্ততে তাঁরা আনসারদের মোকাবিলায় খেলাফতকে মুহাজিরদের হক বলে দাবি করলেন, কিন্তু একই যুক্তিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আহলে বাইতকে তথা হযরত আলীকে খলিফা করতে তাঁরা রাজি হলেন না)

তখন হুবাব বিন্ মান্যার পুনরায় দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন “হে আনসারগণ! তোমরা তোমাদের হাত গুটিয়ে রেখো (বাই’আতের জন্যে এগিয়ে দিয়ো না); এই ব্যক্তির ও তার বন্ধুদের কথায় কান দিয়ো না; এরা তোমাদের অধিকার ছিনিয়ে নেবে।… এরা তোমাদের প্রস্তাবের বিরোধিতা করলে এদেরকে শহর থেকে বের করে দাও এবং শাসন ক্ষমতার লাগাম নিজেদের হাতে নিয়ে নাও। আল্লাহ্র শপথ, এ জন্যে তোমরাই যোগ্যতম। …” তারপর তিনি বলেন “আমি তোমাদের মধ্যে উষ্ট্রশালায় স্থাপিত সেই কাষ্ঠতুল্য বস্তু উটেরা যার সাথে তাদের গা ঘষে নেয়, আমি সেই বিশাল বৃক্ষ ঝড়ো হাওয়ার সময় যার নিচে আশ্রয় গ্রহণ করা হয়, আমি সেই ব্যক্তি বড় বড় কাজে সবাই যার ওপর নির্ভর করে এবং এবং যার শক্তি থেকে সাহায্য গ্রহণ করে।” তখন হযরত ওমর বললেন “আল্লাহ্ তোমাকে ধ্বংস করুন।” হুবাব বললেন “বরং তোমাকে ধ্বংস করুন।” তখন হযরত ওমর তাঁর পেটে লাথি মারেন এবং তাঁর মুখে ধুলাবালি পুরে দেন। (শারহে নাহজুল বালাগাহ্ ইবনে আবিল্ হাদীদ, ২য় খণ্ড/ ২৯১)

এরপর আবু ওবায়দাহ্ বক্তৃতা শুরু করলেন “হে আনসারগণ! তোমরা ছিলে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানকারী প্রথম জনগোষ্ঠী; অতএব, এখন তোমরা পরিবর্তনকারী ও ওলট-পালটকারী প্রথম জনগোষ্ঠী হয়ো না। বললেন এ সময় খাযরাজ গোত্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি বাশীর বিন্ সা’দ উঠে দাঁড়ালেন সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহর সাথে যার দীর্ঘদিনের শত্রুতা ছিল। (শারহে নাহজুল বালাগাহ্ ইবনে আবিল্ হাদীদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড)তিনি বললেন: “হে আনসারগণ! আল্লাহর শপথ, যদিও আমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও দ্বীনের প্রসারের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ভূমিকা পালন করেছি এবং এ জন্য মর্যাদার অধিকারী, কিন্তু এর পিছনে আল্লাহর সন্তুষ্টি, রাসূলের আনুগত্য করা ও নিজেদের জন্যে কষ্ট স্বীকার করা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো লক্ষ্য ছিল না। অতএব, এজন্য মানুষের সামনে গর্ব-অহঙ্কার করা আমাদের উচিত নয়। আমাদের লক্ষ্য পার্থিব সুযোগ-সুবিধা ও ইজ্জত ছিল না।… মুহাম্মাদ ছিলেন কুরাইশ বংশোদ্ভূত, অতএব, অতএব, তাঁর আত্মীয়-স্বজনই তাঁর উত্তরাধিকারী হওয়ার ব্যাপারে অধিকতর যোগ্য। আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি কখনোই এ ব্যাপারে তাদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হবো না। তোমরাও আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁদের বিরোধিতা ও তাঁদের সাথে ঝগড়া করো না।”

তখন হযরত আবুবকর বললেন “তাহলে এখানে ওমর ও আবু ওবায়দাহ্ উপস্থিত আছে; তোমরা তাদের মধ্য থেকে যে কারো অনুকূলে বাই’আত হও।”

হযরত ওমর ও আবু ওবায়দাহ্ উভয়ই এক বাক্যে বললেন “আল্লাহ্র শপথ, আপনি থাকতে কখনোই আমরা তা গ্রহণ করব না।

আবদুর রহমান বিন্ ‘আওফ্ দাঁড়িয়ে বললেন “হে আনসারগণ! যদিও স্বীকার করতেই হবে যে, তোমাদের মর্যাদা অনেক, কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, তোমাদের মধ্যে হযরত আবুবকর, ওমর ও আলীর মতো লোক পাওয়া যাবে না।” তখন মুনযার্ বিন্ আক্বাম্ দাঁড়িয়ে বললেন – “তুমি যাদের নাম উল্লেখ করলে আমরা তাদের মর্যাদা অস্বীকার করি না। বিশেষ করে এ তিন জনের মধ্যে এমন একজন আছেন যিনি শাসন ক্ষমতার অধিকারী হলে এক ব্যক্তিও তাঁর বিরোধিতা করবে না।” তাঁর কথার উদ্দেশ্য ছিল হযরত আলী। (‘তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড/১০৩) তখন সকল আনসার বা তাঁদের একদল ধ্বনি দিয়ে উঠলেন- “আমরা আলী ছাড়া কারো অনুকূলে বাই’আত হব না।”

তাবারী ও ইবনে আছীর রেওয়ায়েত করেছেন হযরত ওমর হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হলে আনসাররা বললেন: “আমরা আলী ছাড়া আর কারো অনুকূলে বাই’আত হব না। (ত্বাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৪৩; ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড/ ২২০)

যুবাইর বিন্ বাক্কার বলেন আনসাররা যখন খেলাফত পেলেন না কখন তাঁরা বললেন “আমরা আলী ছাড়া অন্য কারো অনুকূলে বাই’আত হব না। (শারহে নাহজুল বালাগাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, “কিতাবে মুওয়াফফাক্বিয়াত” ও ২য় খণ্ড/১২২)

যেভাবে বাই‘আত সংঘটিত হলো

সাক্বীফায় হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত সম্বন্ধে হযরত ওমর বলেন- “এত হইচই হচ্ছিল যে, আমি ভয় করছিলাম যে, মতভেদের সৃষ্টি হবে। তাই আবুবকরকে বললাম আপনার হাত বাড়িয়ে দিন; বাই’আত হব। (সীরাতে ইবনে হিশাম, ৪র্থ খণ্ড/ ৩৩৬। সমস্ত ঐতিহাসিকগণই এ বাক্যটি উদ্ধৃত করেছেন; কেবল তারীখে ইবনে কাছীরে বাক্যটি এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে “আমরা ভয় পাচ্ছিলাম যে, আরেকটি বিশৃঙ্খলা (ফাসাদ) না ঘটে যায়)

হযরত ওমর থেকে উদ্ধৃত অন্য এক রেওয়ায়েত অনুযায়ী তিনি বলেন- “আমরা ভয় পাচ্ছিলাম যে, এ সমাবেশে যদি বাই’আত গ্রহণ করা না হয় তাহলে অন্য একটি বাই’আত সমুপস্থিত হবে, আর তখন আমরা আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তা মেনে নিতে বাধ্য হবো, অথবা সে বাই’আতের বিরোধিতা করবো ও ফলে আরেকটি বিশৃঙ্খলা (ফাসাদ) সংঘটিত হবে।”

হযরত ওমর ও আবু ওবায়দাহ্ বাই’আত হওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত আবুবকরের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু তার আগেই সা’দ বিন্ বাশীর্ এগিয়ে গিয়ে তাঁর নিকট বাই’আত হলেন। তখন হুবাব বিন্ মুনযার চিৎকার করে উঠলেন “ওহে বাশীর বিন্ সা’দ! এ্যায় অভিশপ্ত কুলক্ষুণে! আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করলে! তোমার চাচাতো ভাই শাসক হবেন এটা দেখতে চাচ্ছিলে না?” জবাবে বাশীর বিন্ সা’দ বললেন – “আল্লাহর শপথ, তা নয়। কিন্তু আল্লাহ্ যাদেরকে অধিকার দিয়েছেন তাঁদের সাথে সংঘাতে যেতে চাচ্ছিলাম না।”

আউস্ গোত্রের লোকেরা এতক্ষণ এসব ঘটনার দর্শক ছিলেন। তাঁরা বাশীর বিন্ সা’দের বাই’আতের দৃশ্য দেখলেন এবং তার আগে কুরাইশদের আহ্বান ও সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহকে খলিফা নির্বাচনে আগ্রহী খাযরাজীদের কথাও শুনেছিলেন। উসাইদ্ বিন্ হুযাইর সহ আউসের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বললেন “আল্লাহর শপথ, খাযরাজরা যদি এক বারের জন্যেও শাসন ক্ষমতা হাতে নিতে পারে… তাহলে চিরদিনের জন্যে তারা এ মর্যাদার অধিকারী হবে এবং তোমরা কখনোই তার অংশ বিশেষেরও অধিকারী হবে না। অতএব, শীগগির ওঠো, আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হও।”

আবু বকর জাওহারী তাঁর “সাক্বীফাহ” গ্রন্থে লিখেছেন আউস গোত্রের লোকেরা যখন খাযরাজের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হতে দেখলেন তখন সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহর সাফল্য রোধ করার জন্যে এ সুযোগকে কাজে লাগালেন এবং অত্যন্ত দ্রুত উঠে গিয়ে আবু বকরের অনুকূলে বাই’আত হলেন। (ইবনে আবিল হাদীদ কর্তৃক শারহে নাহজুল বালাঘায় উদ্ধৃত “ওয়া মিন্ কালামি লাহু ফী মা’নাল্ আনুছার” অধ্যায়)

এভাবে খাযরাজদের আশা-ভরসা নস্যাৎ হয়ে গেলে লোকেরা সকল দিক থেকে ছুটে এলেন এবং হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হলেন। এ সময় ভিড়ের কারণে সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহ্র অন্য লোকদের দ্বারা পদদলিত হওয়ার অবস্থা হয়।

তারীখে ইয়াকুবীর বর্ণনা অনুযায়ী’ (তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড/১০৩) লোকেরা হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হওয়ার জন্যে সা’দ্ বিন্ ‘ইবাদাহ্ ও তাঁর জন্যে বিছানো কার্পেটের ওপর দিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সা’দের পদদলিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন সা’দকে ঘিরে রাখা লোকেরা বলছিলেন, “খেয়াল রেখো, সা’দকে পদদলিত করো না।” তখন হযরত ওমর বলেন- “ওকে হত্যা করো; আল্লাহ্ ওকে ধ্বংস করুন।” তারপর তিনি সা’দের শিয়রের কাছে’ (‘সা’দ তখন অসুস্থ ছিলেন) গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন- “তোমাকে আমি এমনভাবে পদদলিত করতে চাই যে, তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো যেন ভেঙ্গেচুড়ে যায়।

এ সময় ক্বায়স্ বিন্ সা’দ এলেন এবং হযরত ওমরের দাড়ি ধরে ফেললেন এবং বললেন – “আল্লাহর শপথ, তাঁর শরীরের এক গাছি পশমও যদি কমাও তো দাঁত নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না।” তখন হযরত আবুবকর ডাক দিলেন – “ওহে ওমর! শান্ত হও; এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শান্ত হওয়া বেশি প্রয়োজন।”

হযরত ওমর সা’দের কাছ থেকে চলে এলেন। তখন সা’দ তাঁর দিকে ফিরে বললেন- ” আল্লাহ্র শপথ, আমি যদি উঠতে পারতাম তাহলে সর্বত্র ও মদিনার গলিসমূহে আমার এমন গর্জন শুনতে পেতে যে, তুমি ও তোমার বন্ধুরা ভয়ে গর্তে আশ্রয় নিতে। আল্লাহ্র কসম, তাহলে তোমাকে এমন লোকদের কাছে পাঠাতাম তুমি যাদের শাসক নয়, হুকুম পালনকারী হতে।” এরপর তিনি তাঁর সঙ্গীসাথীদের বললেন “এখান থেকে বেরিয়ে যাও।” তখন তাঁর সঙ্গী-সাথিরা তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়ে তাঁর বাড়িতে চলে গেলেন। (তারীখে তাবারী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৫৫-৪৫৯)

আবু বকর জাওহারী বলেন এদিন (অর্থাৎ বাই’আতের দিন) হযরত ওমর কোমর বেঁধে হযরত আবুবকরের সামনে ছুটাছুটি করছিলেন এবং বলছিলেন “সবাই দেখো, লোকেরা আবুবকরের নিকট বাই’আত হয়েছে। (শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭৪ ও ১৩৩ (আবু বকর জাওহারীর “সাক্বীফাহ” থেকে উদ্ধৃত)

সাক্বীফাহ্র বাই‘আতের পর

সাক্বীফায় হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আতের পর তাঁকে নিয়ে তাঁর সঙ্গী-সাথিরা মসজিদে এলেন যাতে অন্য লোকেরাও তাঁর অনুকূলে বাই’আত হতে পারে।

হযরত আলী ও হযরত আব্বাস তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে গোসল দিচ্ছিলেন; গোসলের কাজ তখনো শেষ হয়নি, এমন অবস্থায় তাঁরা মসজিদ থেকে তাকবীর ধ্বনি শুনতে পেলেন। হযরত আলী জিজ্ঞেস করলেন -হইচই কীসের?” আব্বাস বললেন: “এত “অতীতে কখনোই এমনটি ঘটেনি।”

তারপর তিনি হযরত আলীর দিকে ফিরে বললেন: “আমি তোমাকে কী বলেছিলাম? (ইকদুল ফারীদ, ৩য় খণ্ড/ ২৬৩; শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/ ৭৪ ও ১৩৩ (সাক্বীফাহ থেকে উদ্ধৃত)

সাক্বীফায় হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত অনুষ্ঠিত হবার পর বারাআ বিন্ ‘আযেব্‌ আতঙ্কিতভাবে বনি হাশেমের লোকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে “বানী হাশেমের তাঁদের ঘরের দরজায় করাঘাত করে বলতে লাগলেন লোকেরা। শুনে রেখো, লোকেরা আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হয়েছে।”

বানী হাশেমের লোকেরা এ খবর শুনে বিস্ময়ে পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন “আমরা মুহাম্মাদের আত্মীয়-স্বজন; আমাদেরকে ছাড়া তো মুসলমানরা কোনো কাজ করতো না!”

হযরত আব্বাস বললেন, “কা’বাহর রবের শপথ, তারা সেই কাজই করল যা তাদের না করাই উচিত ছিল।”

ইয়াকুবী বারাআ বিন্ ‘আযেব থেকে উদ্ধৃত করেছেন, হযরত আব্বাস বনি হাশেমকে সম্বোধন করে বলেন “তোমাদের হাত চিরদিনের জন্য মাটিমাখা হয়ে গেল: জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমার কথা শোনোনি।”

সাকীফায় হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত এভাবেই সমান্ত হয় এবং পরদিন থেকে তাঁর অনুকূলে সর্বজনীন বাই’আত গ্রহণ শুরু হয়।

চলবে …..