মূল: আল্লামা সৈয়দ মুরতযা আসকারী
অনুবাদ নূর হোসেন মজিদী
প্রসঙ্গ: বাই’আত সম্বন্ধে বিশিষ্ট সাহাবিদের মূল্যায়ন
ক) ফাযল্ ইবনে আব্বাস
বনি হাশেম রাসূলে আকরাম (সা.)-এর লাশের গোসল ও কাফন-দাফনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন, এমতাবস্থায় সংবাদ এল যে, বনু সা’এদাহর সাক্বীফায় হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ খবর শোনার পর এ ব্যাপারে বনি হাশেমের প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে ইয়াকুবী লিখেছেন’ – তাঁরা ঘর থেকে বের হবার পর ফাল্ ইবনে আব্বাস দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন- “হে কুরাইশের লোকেরা! প্রতারণা ও কারচুপির মাধ্যমে খেলাফত তোমাদের হবে না; আমরাই খেলাফতের উপযুক্ত, তোমরা নও। আমরা ও আমাদের নেতা তোমাদের চেয়ে খেলাফতের অধিকতর উপযুক্ত। (২য় খণ্ড/ ১০৩; শাহে নাহজুল বালাখাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ২৮৭-এ অধিকতর বিস্তারিত রেওয়ায়েত রয়েছে)
খ) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস
হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত প্রশ্নে হযরত ওমরের সাথে স্বীয় কথোপকথন সম্বন্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন: (ত্বাবারী, ৩য় খণ্ড, সীরাতে ওমর প্রসঙ্গে; ইবনে আবিল হাদীদ “লিল্লাহি বিলাদুন্ ফুলানূন”-এ ব্যাখ্যায়, দ্বাদশ খণ্ড/ ৪৯ ও ৫১)
হযরত ওমর আমাকে বললেন “ওহে আব্বাসের বেটা! তুমি জান কি মুহাম্মাদ (সা.)-এর পর তোমাদের অনুকূলে বাই’আত হওয়া থেকে কোন্ জিনিস লোকদেরকে ফিরিয়ে রেখেছে?” যেহেতু আমি এ প্রশ্নের জবাব দিতে চাননি তাই বললাম “আমি যদি অবগত না থাকি তো আমীরুল মু’মিনীন আমাকে অবগত করবেন।”
হযরত ওমর বললেন “লোকেরা এটা দেখার জন্যে প্রস্তুত ছিল না যে, নবুওয়াত ও খেলাফত উভয়ই তোমাদের ভাগে পড়ুক আর তার বদৌলতে তোমরা অন্যদের সামনে শ্রেষ্ঠত্ব ও গৌরব প্রদর্শন করো। এ কারণে কুরাইশরা খেলাফতকে নিজেদের জন্যে নির্ধারণ করে নিয়েছে এবং স্বীয় লক্ষ্য হাসিল করেছে।”
আমি বললাম – “হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি যদি অনুমতি দেন এবং আমার ওপর ক্ষিপ্ত না হন তাহলে আমিও কিছু বলতে চাই।”
বললেন – “বলো, হে আব্বাসের পুত্র!” বললাম – “আপনি যে বললেন, কুরাইশরা খেলাফতকে নিজেদের জন্যে নির্ধারণ করে নিয়েছে ও তারা এর উপযুক্ত ছিল এবং এতে সফল হয়েছে; কিন্তু কুরাইশরা যদি আল্লাহ্ তাদের জন্যে যাকে মনোনীত করেছেন তাঁকেই বেছে নিতো তাহলে না তাদের অধিকার হাতছাড়া হতো, না তাদের প্রতি কেউ ঈর্ষা পোষণ করতো। আর এই যে বললেন, তারা পছন্দ করেনি যে, নবুওয়াত ও খেলাফত একই জায়গায় একত্রিত হোক, তাহলে জেনে রাখুন, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ তা’আলা কোরআনে এ ধরনের জনগোষ্ঠীর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে “এটা এজন্য যে, আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তারা তা অপসন্দ করেছে; এ কারণে তাদের নেক আমলসমূহ বিনষ্ট হয়ে গেছে। (সূরা মুহাম্মাদ: ৯)
“আফসোস! আল্লাহর শপথ, ইবনে হযরত ওমর বললেন আব্বাস! তোমার সম্পর্কে আমার কাছে যেসব খবর এসেছিল আমি তা বিশ্বাস করতে চাননি যাতে আমার কাছে তোমার যে অবস্থান আছে তা তোমার হাতছাড়া হয়েযায়।”
বললাম “তা কী খবর এসেছে? আমি যদি সত্য বলে থাকি তাহলে আপনার কাছে আমার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাওয়া উচিত নয়, আর যদি ভুল বলে থাকি তাহলে আমার মতো লোকের মত হচ্ছে এই যে, ভুলকে বিদূরিত করবো।”
জবাবে হযরত ওমর বললেন “আমার কাছে খবর এসেছে যে, তুমি বলছো আমাদের ওপর জুলুম করে এবং ঈর্ষাবশত আমাদের কাছ থেকে খেলাফত নিয়ে গেছে।”
বললাম “এই যে বললেন যে, আমি বলেছি, জুলুম করেছে; এটা জ্ঞানী ও অজ্ঞ নির্বিশেষে সকলের কাছে সুস্পষ্ট। কিন্তু এই যে বললেন, ঈর্ষা করেছে এটা কোন নতুন ব্যাপার নয়। ইবলীস আদমের প্রতি ঈর্ষা করেছিল; আমরাও সেই আদমের সন্তান, তাই ঈর্ষার শিকার হয়েছি।”
গ) সালমান ফারসী
আবু বকর জাওহারী রেওয়ায়েত করেছেন সালমান, যুবাইর ও আনসাররা চাচ্ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পরে আলীর অনুকূলে বাই’আত হবেন। কিন্তু আবুবকর যখন লোকদের নিকট থেকে বাই’আত গ্রহণ করলেন তখন সালমান বললেন “তোমরা সামান্য কল্যাণের অধিকারী হয়েছো, কিন্তু কল্যাণের খনি হাতছাড়া করেছো।”
সেদিন তিনি বলেন – “বৃদ্ধ ব্যক্তিকে বেছে নিয়েছে এবং স্বীয় রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতকে ফেলে দিয়েছে। খেলাফতকে যদি রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতকে প্রদান করতো তাহলে এমনকি দুই জন লোকের মধ্যেও পারস্পরিক মতপার্থক্য সৃষ্টি হতো না এবং এ বৃক্ষের ফল থেকে যত বেশি সম্ভব ও সর্বোত্তমভাবে উপকৃত হত। (শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/ ১৩১ ও ৬ষ্ঠ খণ্ড/১৭ (জাওহারীর সাক্বীফাহ থেকে উদ্ধৃত)
আনছাবুল আশরাফ গ্রন্থে বলা হয়েছে, সালমান তাঁর মাতৃভাষা ফার্সিতে প্রবাদ বাক্যের ভাষায় বলেন “যা হওয়া উচিত নয় তা-ই হল, কিন্তু যা হওয়া উচিত ছিল তা হল না।” এরপর তিনি আরবি ভাষায় বলেন-“তারা যদি আলীর অনুকূলে বাই’আত হতো তাহলে অবশ্যই উপর ও নিচ উভয় দিক থেকেই তারা বরকতপ্রাপ্ত হতো।”
ঘ) উম্মে মেস্তাহ্
আবু বকর জাওহারী বলেন যেহেতু আবুবকরের অনুকূলে আলীর বাই’আত না হওয়ার বিষয় নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হতে লাগল। সেহেতু আবুবকর ও ওমর আলী সম্পর্কে অধিকতর কঠোর নীতি অনুসরণ করতে লাগলেন। এ পরিস্থিতিতে উম্মে মেস্তাহ্ বিন্ আছাছাহ্ তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কবরের পাশে গিয়ে এ কবিতাটি আবৃত্তি করেন –
“(হে রাসূল!) আপনার পরে অনেক খবর ও অনেক কথা হয়েছে আপনি যদি জীবিত থাকতেন তো কথা এতো বেশি হতো না
যে জমিতে বৃষ্টি প্রবেশ করে না তা উর্বরতা হারিয়ে ফেলে, সেভাবেই আপনার কওম লাগামছাড়া হয়ে গেছে দেখুন ও সাক্ষী থাকুন।(শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/ ১৩১-১৩২ ও ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ১৭ (জাওহারীর সাক্বীফাহ্ থেকে উদ্ধৃত)
ঙ) আবু যার
রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ইন্তেকালের সময় আবু যার মদিনায় ছিলেন। হযরত আবুবকর কর্তৃক খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি মদিনায় ফিরে আসেন। তিনি হযরত আবুবকরকে বলেন – “তুমি খুব সামান্য জিনিসই অর্জন করলে এবং তাতেই আত্মতৃপ্ত হলে, আর রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আহলে বাইতকে হাতছাড়া করলে। তোমরা যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আহলে বাইত-এর নিকট এ দায়িত্ব সোপর্দ করতে তাহলে এমন দু’জন লোকও পাওয়া যেতো না যারা তোমাদের বিরোধিতা করত। (শারহে নাহজুল বালাগাহ্, ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ৫ (জাওহারীর সাক্বীফাহ্ থেকে উদ্ধৃত); তারীখে ইয়াকুবী, আবু যারের সমালোচনা প্রসঙ্গ)
চ) মিকদাদ বিন্ ‘আম্র
ইয়াকুবী হযরত ওসমানের বাই’আতের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত আবুবকরের খেলাফত গ্রহণে মিকুদাদ বিন্ ‘আরে প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন একদিন আমি মসজিদুন্নবীতে এক ব্যক্তিকে (মিক্বদাদকে) দেখতে পেলাম; তিনি মাটিতে হাঁটু রেখে এমনভাবে বসে ছিলেন যে, মনে হল তিনি খুবই বেদনার্ত, যেন গোটা দুনিয়াই তাঁর ছিল, কিন্তু তিনি তাঁর সে সর্বস্ব পুরোটাই হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বলছিলেন -“কুরাইশদের আচরণ বড়ই বিস্ময়কর; তারা তাদের দায়িত্ব তার হকদারদের কাছ থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে। (শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/ ১৩৩ (জাওহারীর সাক্বীফাহ্ থেকে উদ্ধৃত); ত্ববাক্বাত, ২য় খণ্ড, ক্বাফ)
ছ) বনু নাজ্জারের জনৈকা মহিলা
আবু বকর জাওহারী লিখেছেন হযরত আবুবকরের সাথে বাই’আত পাকাপোক্ত হয়ে গেলে তিনি মুহাজির ও আনসার মহিলাদের নিকট বাইতুল মাল থেকে কিছু অর্থ হাদীয়া স্বরূপ পাঠােলন। তিনি বনু ‘আদী বিন্ নাজ্জার গোত্রের জনৈকা মহিলাকে দেয় অর্থ যায়েদ বিন্ ছাবেতের মাধ্যমে পাঠালেন। যায়েদ উক্ত মহিলার নিকট এলেন এবং তাঁর নিকট তা সমর্পণ করলেন। মহিলা জিজ্ঞেস করলেন “এটা কী?” যায়েদ বললেন- “আবু বকর নারীদের মধ্যে যে অংশ বণ্টন করেছেন এ তারই অংশ বিশেষ।” মহিলা বললেন- “তোমরা কি উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে আমার নিকট থেকে আমার দ্বীন কেড়ে নিতে চাও? (তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড/১১৪)
জ) মু‘আবিয়া
মু’আবিয়া হযরত আলীর সাথে তাঁর দ্বন্দ্বে আলীর সমর্থক মুহাম্মাদ বিন আবুবকরকে লেখা তাঁর পত্রে বলেন-
“আমি ও তোমার পিতা আমরা আবু তালিবের পুত্রের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অবগত ছিলাম এবং আমাদের ওপর তাঁর হককে অপরিহার্য গণ্য করতাম। অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর নিজের নিকট যা ছিল তাঁর রাসূলের জন্যে তা নির্ধারণ করে দিলেন এবং তাঁকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা পূর্ণ করলেন, আর তাঁর আহ্বানকে সুস্পষ্ট করে দিলেন ও তাঁর দলীলকেও সুস্পষ্ট করে দিলেন, অতঃপর তাঁর রূহকে (তাঁর ওপর আল্লাহ্র দরূদ বর্ষিত হোক) নিজের দিকে কবয করে নিলেন। অতঃপর তোমার পিতা ও তাঁর বন্ধু ওমর আলীর হক আত্মসাৎকারী প্রথম ব্যক্তি হলেন এবং তাঁর বিরোধিতা করলেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এ দুই ব্যক্তি পরস্পরের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন, এরপর আলীকে বাই’আতের জন্যে আহ্বান জানালেন। আলী যেহেতু বাই’আত হওয়া থেকে বিরত থাকলেন ও অস্বীকৃতি জানালেন সেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ভয়ঙ্কর ধরনের চিন্তাভাবনা করলেন। ফলে শেষ পর্যন্ত আলী তাঁর অনুকূলে বাই’আত হলেন ও তাঁদের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। কিন্তু এ দুই ব্যক্তি কখনোই স্বীয় দায়িত্বে তাঁকে অংশীদার করতেন না এবং স্বীয় গোপন বিষয়াদি তাঁকে জানতে দিতেন না। অতঃপর আল্লাহ্ উভয়েরই জান কবয করলেন। অতএব, এখন আমি যা করছি তা যদি ভাল ও সঠিক কাজ হয়ে থাকে তাহলে প্রকৃত পক্ষে তোমার পিতাই তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন এবং আমরা শুধু তাতে শরীক হয়েছি। আর তোমার পিতা যদি এমনটি না করতেন তাহলে আমরা কখনোই আবু তালিবের পুত্রের বিরোধিতা করতাম না; বরং খেলাফতের আসন তাঁকেই অর্পণ করতাম। কিন্তু তোমার পিতা আমাদের আগেই তাঁর সাথে এ আচরণ করেছেন, আর আমরা তোমার পিতার মতোই আচরণ করেছি। অতএব, তুমি হয় তোমার পিতাকেই দোষী সাব্যস্ত করো অথবা আমাদেরকে তিরস্কার করা থেকে বিরত হও। যারা তাওবা করে তাদের ওপর আল্লাহর দরূদ বর্ষিত হোক। (মাস’উদী : মুরুজুয যাহাব, ২য় খণ্ড/ ৬০; শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/ ৬৫; নাচ্ছর বিন্ মুযাহিম: সিফফিন, পৃ. ১৩৫)
ঝ) খালেদ বিন সা‘ঈদ্
খালেদ বিন সা’ঈদ বিন্ আল-‘আছ ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তীদের অন্যতম। তিনি ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম ব্যক্তি। ইবনে কুতাইবাহ্ বলেন, খালেদ ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আবুবকরের অগ্রবর্তী ছিলেন। (আল-মা’আরিফ, পৃ. ১২৮)
খালেদ ছিলেন হাবাশায় হিজরতকারীদের অন্যতম। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁকে ও তাঁর দুই ভাই আবান ও ‘আমর্-কে মাযহাজ গোত্রের যাকাত আদায়ের দায়িত্ব অর্পণ করেন। এরপর তিনি তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে ছান্’আয় পাঠান। রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি ও তাঁর দুই ভাই তাঁদের কর্মস্থল থেকে মদিনায় ফিরে এলেন। আবুবকর তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করলেন-“তোমরা কর্মস্থল ত্যাগ করলে কেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যাকে কোনো জায়গার জন্যে কোনো দায়িত্ব দিয়েছেন সেখানকার সে দায়িত্বের জন্যে তার চেয়ে যোগ্যতর কেউ নেই। অতএব, তোমরা তোমাদের কর্মস্থলে ফিরে যাও ও দায়িত্ব পালন করতে থাকো।” তাঁরা জবাব দিলেন “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর পরে আর কারো গোলাম হবো না। (আল্-ইস্তি’আব, ১ম খণ্ড/ ৩৯৮; আল-ইছাবাহ্, ১ম খণ্ড/ ৪০৬; উসদুল্ গাবাহ, ২য় খণ্ড/ ৯২; শারহে নাহজুল বালাগাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড/১৩)
খালেদ ও তাঁর ভাই আবান হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হওয়ার ব্যাপারে গড়িমসি করেন। তিনি বনি হাশেমকে বলেন “আপনারা বনি হাশেম হচ্ছেন সুউচ্চ ফলবান বৃক্ষ, আর আমরা আপনাদের অনুসারী। (উসদুল্ খাবাহ্, ২য় খণ্ড/ ৯২; শারহে নাহজুল বালাগাহ্, ২য় খণ্ড/ ১৩৫)
খালেদ দুই মাস পর্যন্ত হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হতে বিরত থাকেন। তিনি বলতেন “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আমাকে ছান্’আর দায়িত্বশীল নিয়োগ করেছিলেন এবং তাঁর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত আমাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেননি।”
তিনি একদিন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব ও হযরত ওসমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁদেরকে বলেন “হে ‘আব্দ মানাফের বংশধরগণ! আপনারা নিজেদের বিষয়ের প্রতি বিমুখ হয়েছেন, আর এর ফলে অন্যরা তা হস্তগত করে নিয়েছে।” হযরত আবুবকর তাঁর এ কথায় গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ওমর এতে মনঃক্ষুণ্ণ হন। (তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৫৮৬; ইবনে ‘আসাকের তাহযীব, ৫ম খণ্ড/ ৪৮; আনছাবুল আশরাফ, ১ম খণ্ড, পৃ ৫৮৮)
এরপর তিনি হযরত হযরত আলীর কাছে এলেন এবং বললেন “আসুন, আমি আপনার অনুকূলে বাই’আত হব। আল্লাহ্র শপথ, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ত হবার জন্যে লোকদের মধ্যে আপনার চেয়ে যোগ্যতর কেউ নেই। (তারীখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড/১০৫)
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বনি হাশেম হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হলে খালেদও বাই’আত হন। (উসদুল্ খাবাহ্, ২য় খণ্ড/ ৯২; শারহে নাহজুল বালাগাহ্, ২য় খণ্ড/ ১৩৫)
বাই’আতের কাজ শেষ হলে হযরত আবুবকর যখন শামের উদ্দেশে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন তখন খালেদকে সে বাহিনীর এক চতুর্থাংশের সেনাপতি নিয়োগ করেন। কিন্তু হযরত ওমর এর বিরোধিতা করেন এবং বলেন – “আপনি এমন কাউকে সেনাপতি নিয়োগ করছেন যে অমুক অমুক কথা বলেছে।” এবং তিনি তাঁর বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন ও সেখানে বসে থাকেন। ফলে শেষ পর্যন্ত খালেদকে সেনাপতিত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় এবং তাঁর পরিবর্তে ইয়াযীদ বিন আবু সুফিয়ানকে সেনাপতি নিয়োগ করা হয়। (ত্বাবারী, ২য় খণ্ড/ ৫৮৬; ইবনে ‘আসাকের: তাহযীব, ৫ম খণ্ড/ ৪৮; আনছাবুল আশরাফ, ১ম খণ্ড, পৃ ৫৮৮)
খালেদ তাঁকে সেনাপতিত্ব থেকে বাদ দেয়ার বিষয়টিকে আদৌ গুরুত্ব দেননি। তিনি সেনাবাহিনীর সাথে শামে গিয়ে যুদ্ধ করেন এবং সে যুদ্ধে শহীদ হন।
ঞ) সা‘দ বিন্ ‘ইবাদাহ্
তিনি ছিলেন খাযরাজ গোত্রের প্রধান। তিনি ‘আক্বাবায় বাই’আত হন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে সকল যুদ্ধেই শরীক হন, যদিও তাঁর বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্পর্কে বিতর্ক আছে।
তিনি ছিলেন ক্ষমাশীল ও দাতা। মক্কা বিজয়ের সময় আনসারদের পতাকাবাহী ছিলেন। তিনি এই বলে শ্লোগান দেন, “আজ যুদ্ধের দিন; আজ নারীরা বন্দিনী হবে।” তিনি এতে কুরাইশ নারীদের বুঝাতে চেয়েছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাঁর নিকট থেকে পতাকা নিয়ে তাঁর পুত্র ক্বায়সের হাতে দেন। (ইস্তি’আব, ২য় খণ্ড/ ৪৩ ; আল্-ইছাবাহ্, ২য় খণ্ড/২৭)
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন সাকীফাহ্র বাই’আতের পর আবুবকর সা’দের ব্যাপারে আপাতত চুপ থাকাকেই উত্তম মনে করলেন। সর্বজনীন বাই’আতের পর একজনকে তাঁর কাছে পাঠিয়ে তাঁকে বাই’আত হবার জন্যে আসতে বললেন। তিনি জবাবে বললেন- “আল্লাহ্র কসম, তোমাকে লক্ষ্যে পরিণত করার জন্যে যতক্ষণ আমারে তুনীরে তির আছে এবং তোমাদের রক্তের দ্বারা আমার বর্শাকে রঞ্জিত না করছি ও যতক্ষণ আমার বাহু তলোয়ার চালাতে সক্ষম ততক্ষণ তোমাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাব এবং আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এবং আমার গোত্রের যারা এখনো আমার আদেশ মানে তাদেরকে সাথে নিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে লড়ে যাব, কিন্তু বাই’আত হব না। আবারো আল্লাহর শপথ করে বলছি, জিন ও ইনসান সবাইও যদি তোমার পক্ষে যুদ্ধ করে আমি তোমার অনুকূলে বাই’আত হবো না যতক্ষণ না আমার অবস্থার আবেদন নিয়ে আমার রবের নিকট উপস্থিত হই এবং তাঁর আদালতে তোমার সাথে আমার হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তি হয়। (তাবারী, ২য় খণ্ড/ ৪৫৯; ইবনে আছীর, ২য় খণ্ড/ ২৪৪; কানযুল ‘উম্মাল, ৩য় খণ্ড/ ১৩৪, হাদিস নং ২২৯৬ ও আরো অনেক সূত্র)
তাঁর এ কথা হযরত আবুবকরের নিকট পৌঁছলে হযরত ওমর বললেন – “বাই’আত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ছাড়বেন না।” কিন্তু বাশীর বিন্ সা’দ বললেন- “আমার মতে, এ বিষয়ে চাপাচাপি করা কল্যাণকর হবে না। কারণ সা’দের এ বিরোধিতা জেদের কারণে। আর আমি সা’দের চরিত্র সম্পর্কে যতটা অবগত আছি তাতে তিনি নিহত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিরোধ করে যাবেন। বিষয়টি এত সহজ নয়। তিনি একা নন যে, তাঁর নিহত হওয়ার ফলে বিরোধিতার অবসান ঘটবে। তাঁর গোত্র অত্যন্ত বড় এবং এখনো গোত্রের লোকদের ওপর তাঁর প্রভাব শেষ হয়ে যায় নি। তাঁর পুত্রগণ, আত্মীয়-স্বজন ও গোত্রের বেশকিছু লোক নিহত না হওয়া পর্যন্ত সা’দকে স্পর্শ করা যাবে না। অতএব, তাঁকে তাঁর নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিন। তিনি একজন বৈ তো নন, অতএব এতে কোনই ক্ষতি হবে না।”
বাশীরের প্রস্তাব হযরত আবুবকরের মনঃপূত হলো এবং তিনি সা’দ বিন ‘ইবাদাহকে তাঁর নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিলেন। তিনিও আবুবকরের নামাজের জামা’আতে ও সভা-সমাবেশে আসা থেকে বিরদ থাকেন এবং হজের সময় তাঁর অনুসরণ করতেন না।… এ অবস্থায় আবুবকর দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন ও ওমর খলিফা হলেন। (আর-রিয়াউন নাফ্রাহ্, ১ম খণ্ড/ ১৬৮ এবং ইতঃপূর্বে উল্লিখিত সূত্রসমূহ)
হযরত ওমরের খেলাফতকালে একদিন মদিনার গলিতে সা’দের সাথে হযরত ওমরের সাক্ষাৎ হল। হযরত ওমর তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন-“তুমি অমুক অমুক কথা বলেছিলে?” তিনি বললেন “হ্যাঁ, বলেছিলাম। এখন ক্ষমতা তোমার হাতে। কিন্তু আল্লাহর শপথ, আমাদের কাছে আবুবকর তোমার চেয়ে অধিকতর পছন্দনীয় ছিল। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে তোমার পাশে থাকা পছন্দ করি না।” হযরত ওমর বললেন “যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর ওপর বিরক্ত থাকে তার উচিত বাসস্থান পরিবর্তন করা।” সা’দ বললেন – “তোমার প্রতিবেশিত্ব খুব একটা পছন্দ করি না। অতএব, সে কাজই করবো এবং তোমার চেয়ে উত্তম লোকের প্রতিবেশী হবো।
এ সাক্ষাতের পর অচিরেই (ওমরের খেলাফতের প্রথম দিকেই) সা’দ শামে চলে যান। (ত্বাবাক্বাত, ৩য় খণ্ড, ক্বাফ ২/ ১৪৫; ইবনে ‘আসাকের তাহযীব, ৬ষ্ঠ খণ্ড/ ৯০; কানযুল ‘উম্মাল, ৩য় খণ্ড/১৩৪, হাদিস নং ২২৯৬; সীরাতে হালাবী, ৩য় খণ্ড/ ৩৯৭)
বালাযুরী লিখেছেন- হযরত ওমর এক ব্যক্তিকে শামে পাঠালেন এবং তাকে আদেশ দিলেন, “যে কোন প্রকারেই হোক সা’দকে লোভদেখাও, হয়তো এর ফলে সে বাই’আত হবে। আর যদি বাই’আত না হয় তাহলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে এবং…।” এরপর সে ব্যক্তি রওয়ানা হয়ে গেল এবং হুরানে একটি বাগানের মধ্যে সা’দের সাক্ষাৎ পেলো। সে সা’দকে বাই’আতের জন্যে আহ্বান জানালো। সা’দ বললেন “আমি কখনোই কোনো কুরাইশ ব্যক্তির অনুকূলে বাই’আত হব না।” লোকটি বললো “বাই’আত না হলে তোমাকে হত্যা করবো।” সা’দ বললেন “সেজন্য তোমাকে আমাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে।” সে বললো- “যে বিষয়ে গোটা উম্মাহ্ মতৈক্যের অধিকারী তুমি তার বাইরে থাকবে?” সা’দ বললেন- “তোমার কথার উদ্দেশ্য যদি বাই’আত হয়ে থাকে তাহলে, হ্যাঁ।” তখন ঐ ব্যক্তি প্রাপ্ত আদেশ মোতাবেক সা’দের প্রতি তির নিক্ষেপ করে ও তাঁকে হত্যা করে। (‘ইকুদুল ফারীদ, ৩য় খণ্ড, ৬৪; আনছাবুল আশরাফ, ১ম খণ্ড/ ৫৮৮)
মাস’উদী লিখেছেন’ সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহ্ বাই’আত হননি এবং মদীনা থেকে শামে চলে যান ও হিজরি ১৫ সালে সেখানে ইন্তেকাল করেন। (মুরূজুয যাহাব, ১ম খণ্ড/৪১৪, ২য় খণ্ড/১৯৪)
ইবনে ‘আব্দি রাব্বিহ্ লিখেছেন সা’দ বিন ‘ইবাদাহ্ তির নিক্ষেপের শিকার হন এবং তির তাঁর শরীরে গেঁথে যায় ও তিনি নিহত হন। (‘ইকুদুল ফারীদ, ৩য় খণ্ড/ ৬৪)
ত্বাবাক্বাতে ইবনে সা’দে বলা হয়েছে’ সা’দ প্রস্রাব করার জন্যে একটি নিচু জায়গায় বসে ছিলেন; এ অবস্থায় তিনি হামলার শিকার হন ও নিহত হন। তাঁর শরীরের চামড়ার রং সবুজ হয়ে গিয়েছিল। (৩য় খণ্ড, ক্বাফ ২/ ১৪৫; ইবনে কুতাইবাহ: আল্-মা’আরেফ, পৃ. ১১৩)
উদুল্ থাবায় বলা হয়েছে সা’দ না আবুবকরের নিকট বাই’আত হন, না ওমরের নিকট; বরং তিনি শামে চলে যান ও হুরান শহরে বসবাস করতে থাকেন। অতঃপর হিজরি ১৫ সালে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। তাঁকে তাঁর গৃহের পার্শ্ববর্তী রাস্তার পাশে এমন অবস্থায় পাওয়া যায় যে, তাঁর শরীর সবুজ হয়ে গিয়েছিল এ ব্যাপারে বিতর্ক নেই। একটি কূপের ভিতব থেকে জনৈক অদৃশ্য কথক কর্তৃক তাঁর মৃত্যুর কথা ঘোষণা করার আগে কেউই তাঁর মৃত্যুর খবর জানতো না। (উসুদুল গাবাহ, সা’দ বিষয়ক আলোচনা; ইস্তি’আব, ২য় খণ্ড/ ৩৭)
আবদুল ফাত্তাহ্ লিখেছেন’ কতক নির্বোধ লোক বলে যে, সা’দের হত্যার ঘটনা ছিল জ্বিনদের কাজ। কিন্তু যিনি প্রকৃত ঘটনা অবগত আছেন বা ধারণা করছেন যে, তিনি প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পেরেছেন এমন এক ব্যক্তি বলেন- খালেদ বিন ওয়ালীদ ও তাঁর সহযোগী তাঁর একজন বন্ধু রাতের বেলা সা’দের জন্যে ওৎ পেতে থাকেন এবং তাঁকে হত্যা করেন। তারপর তাঁর লাশকে কূপের মধ্যে ফেলে দেন।” তাঁকে প্রশ্ন করা হয় “তাহলে আমরা যে জ্বিনের কণ্ঠ শুনতে পেলাম, সেটা কী?” জবাবে তিনি বললেন “তা ছিল খালেদের সহযোগীর কণ্ঠস্বর যার উদ্দেশ্য ছিল নির্বোধ লোকেরা যা বলছে তাদেরকে দিয়ে তা-ই বলানো। (আল্-ইমাম ‘আলী বিন্ আবী ত্বালিব, ১ম খণ্ড/৭৩)
বালাযুরী লিখেছেন ওমর সা’দকে হত্যার জন্যে খালেদ বিন্ ওয়ালীদ ও মুহাম্মাদ বিন্ মুসলিমাহকে দায়িত্ব দেন। তাঁরাও এ দায়িত্ব পালন করেন এবং দু’টি তির নিক্ষেপ করে সা’দকে হত্যা করেন। বালাযুরী এ ঘটনা বর্ণনার পর জনৈক আনসার কর্তৃক সা’দের স্মরণে লিখিত শোকগাথা থেকে এ পঙক্তিগুলো উদ্ধৃত করেছেন-
“তারা বলে যে, জ্বিনরা সা’ দের উদরকে বিদীর্ণ করেছে
জেনে রেখো কত লোকই না ধুরন্ধরীর সাথে কাজ করে থাকে
সা’দের অপরাধ এ ছিল না যে, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেছিলেন
বরং এই যে, সা’দ আবুবকরের পক্ষে বাই’আত হননি।”
হ্যাঁ, সা’দের জীবনেতিহাস বেশ জটিল ছিল। যেহেতু এ ঐতিহাসিক ঘটনা ইতিহাসকারদের জন্যে খুবই অস্বস্তিদায়ক ছিল সেহেতু অনেকে এ ঘটনাকে আদৌ উল্লেখ করেন নি’ এবং অনেকে মোটামুটি এই বলে শেষ করেছেন যে, সা’দ বিন্ ‘ইবাদাহকে জ্বিনরা হত্যা করেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, সা’দের সাথে জ্বিনদের কী শত্রুতা ছিল তা তাঁরা উল্লেখ করেননি। করেননি। (তাবারী, ইবনে আছীর ও ইবনে কাসির যেমন: মুহিব্বুদ্দীন তাবারী তাঁর “রিয়াযুন্ নাফ্রাহ্” গ্রন্থে ও ইবনে আব্দুল্ বার তাঁর “আল্-ইত্তি’আব্” গ্রন্থে, সা’দ যে হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হননি এ ঘটনা ইবনে সা’দ, ইবনে জারীর, ইবনে কুতাইবাহ্, বালাযুরী, ইবনে হাজার, ইবনে আছীর, ইবনে আবদু রাব্বিহ্, ইবনে আবদুল্ বার, ইবনে আবদুল হাদীদ প্রমুখ ১৪ জন বিখ্যাত ইতিহাসকার উল্লেখ করেছেন)
ট) ওমর বিন খাত্তাব্
হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আতের ক্ষেত্রে হযরত ওমরের ভূমিকা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এ বাই’আতের অবস্থা সম্পর্কে স্বয়ং হযরত ওমর কী ধারণা পোষণ করতেন?
হযরত ওমর বলেন “আমার কাছে খবর এসেছে যে, এক ব্যক্তি বলেছে, ‘আল্লাহ্র শপথ, ওমর বিন খাত্তাব মারা গেলে আমি অমুকের অনুকূলে বাই’আত হবো।’ কেউ যেন এ ধরনের কাজকে সঠিক মনে না করে। কারণ, আবুবকরের পক্ষে বাই’আত ছিল একটি ত্রুটপূর্ণ ও ভুল কাজ যা ঘটে গেছে ও অতীত হয়ে গেছে। হ্যা এমনটাই ছিল। তবে আল্লাহ্ লোকদেরকে এ ত্রুটিপূর্ণ কাজের অশুভ পরিণতি থেকে রক্ষা করেছেন…। (ত্বাবারী, ইবনে আছীর ও ইবনে কাসির কর্তৃক সাক্বীফাহর ঘটনার বর্ণনা দ্রষ্টব্য)
ঠ) আবু সুফিয়ান
আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, কিন্তু মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ইন্তেকালের সময় তিনি মদিনায় ছিলেন না। (তাঁর সফরের বিবরণ দেখুন: ‘ইকুদুল্ ফারীদ, ৩য় খণ্ড/ ৬২। শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড, পৃ ১৩০)
সফর থেকে ফেরার পথে তিনি মদীনা থেকে আগত এক ব্যক্তির নিকট থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাতের কথা জানতে পারেন। হযরত আবুবকর খলিফা হয়েছেন শুনে জিজ্ঞেস করলেন – “আলী ও আব্বাস এই দুই মজলুমের প্রতিক্রিয়া কী?” লোকটি বলল- “তাঁরা ঘরে বসে আছেন।” তখন আবু সুফিয়ান বললেন “আল্লাহর শপথ, আমি যদি বেঁচে থাকি তো তাঁদের পা সুউচ্চ টিলার ওপরে পৌঁছে দেব।” এরপর বললেন- “আমি সমাজ পরিবেশকে ধূলিময় দেখতে পাচ্ছি যা রক্তবৃষ্টি ছাড়া অন্য কোন কিছু দ্বারা দূরীভূত হবে না।”
তিনি মদিনায় ফেরার পর সেখানকার গলিতে গলিতে ঘুরে এ কবিতা পাঠ করতে লাগলেন-
“হে বনি হাশেম! লোকদেরকে তোমাদের ওপর লোভ করতে দিও না না (বানী) তীম বিন্ মাত্রাহকে, না (বানী) ‘আদীকে
এ তো (হুকুমত) তোমাদের থেকেই, ফিরে আসবে তোমাদের কাছেই আর নহে তা আবু হাসান আলী ছাড়া অন্য কারো তরে। (বনি তীম মাররাহ আবু বকরের গোত্র ও বনি আদি ওমরের গোত্র, তারীখে ইয়াকুবী, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৫, শারহে নাহজুল বালাগা, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৭)
তাবারী লিখেছেন’ আবু সুফিয়ান এ কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসেন- “আল্লাহর শপথ, আমি সমাজ পরিবেশকে ধূলিময় দেখতে পাচ্ছি বংশধরগণ! তোমাদের ব্যাপারে আবুবকরের কী কাজ? আলী ও আব্বাস এই যা রক্তবৃষ্টি ছাড়া অন্য কোন কিছু দ্বারা দূরীভূত হবে না। হে আব্দ মানাফের দুই মযলুম ও লাঞ্ছিত কোথায়?” তারপর বলেন- “হে আবুল হাসান! হাত বাড়িয়ে দাও; তোমার পক্ষে বাই’আত হবো।” কিন্তু হযরত আলী তাতে সাড়া দিলেন না। তখন আবু সুফিয়ান এই কবিতাটি পাঠ করলেন- (তারীখে তাবারী, ২য় খণ্ড/৪৪৯)
“নিঃসন্দেহে গৃহপালিত গর্দভই লাঞ্ছনা মেনে নেয় স্বাধীন ও শক্তিমান বীর পুরুষ তা উপেক্ষা করে কোন কিছুই নীচতা ও লাঞ্ছনা সহ্য করে না কেবল প্রাণহীন দুই জিনিস চরম লাঞ্ছিত; তাঁবুর খুঁটি হাতুড়ীর আঘাতে সে বাঁকা হয়ে যায় আর সেই ভারবাহী উষ্ট্র যার তরে কাঁদে না’ক কেহ। (শারহে নাহজুল বালাগাহ্, ২য় খণ্ড/ ১৩০ (জাওহারীর সাক্বীফাহ থেকে উদ্ধৃত)
আবু সুফিয়ানের এ উস্কানিমূলক কবিতা বনি আব্দ মানাফের বংশধরদের উত্তেজিত করণ ও ইতিহাসকে বদলে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু হযরত আলী আবু সুফিয়ানের নিকট থেকে বাই’আত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে তা আর ঘটেনি।
এখানে হযরত আলীকে খলিফার আসনে বসানোর জন্যে আবু সুফিয়ানের উদগ্র আকাঙ্ক্ষা এবং হযরত আলী কর্তৃক বাই’আতের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান অনেকের মধ্যেই বিস্ময়ের সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, হযরত আলী হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হওয়া থেকে বিরত থাকেন এবং তাঁর হক আদায়ের জন্যে তাঁর সাথে সহযোগিতা করার জন্যে আনসার ও মুহাজিরদের দ্বারে আঘাত হানেন। অথচ তিনিই হযরত আব্বাস ও আবু সুফিয়ানের পক্ষ থেকে আসা বাই’আতের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর কারণ কী? এর কারণ একদিকে হযরত আলী এবং অপরদিকে হযরত আব্বাস ও আবু সুফিয়ানের উদ্দেশ্যের মধ্যকার পার্থক্য।
হযরত আলীর খেলাফত দাবির কারণ দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ছিল তাঁর হক। তিনি ছিলেন আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর হুকুমত ও দ্বীনি নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত। এমনকি এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত থাকলেও সাধারণভাবেই দ্বীনি জ্ঞান এবং সামরিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর যোগ্যতম হওয়ার ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। আনসার ও মুহাজির নির্বিশেষে প্রায় সকলেরই কথা ছিল এই যে, শুরুতেই হযরত আলী খেলাফতের জন্যে এগিয়ে এলে কেউই তাঁর ব্যাপারে দ্বিমত করতেন না, কিন্তু যেহেতু তাঁরা হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হয়ে গেছেন তাই এখন আর কিছু করার নেই।
হযরত আলী তাঁর দ্বীনি হক পুনরুদ্ধার করতে চাচ্ছিলেন বলেই কেবল তাঁর বংশীয় লোকদের নিয়ে অগ্রসর হতে চাননি এবং এ কারণেই বংশ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মুসলমানের কাছে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে হযরত আব্বাসের দৃষ্টিতে হযরত আলী ছিলেন বনি হাশেমের যোগ্যতম ব্যক্তি, আর আবু সুফিয়ানের দৃষ্টিতে হযরত আলী ছিলেন বনি আব্দ মানাফের যোগ্যতম ব্যক্তি। যেহেতু বনি উমাইয়াহ্ (আবু সুফিয়ান যে বংশের লোক) ও বনি হাশেম ছিল বনি আব্দ মানাফেরই দু’টি শাখা এবং নেতৃত্ব বনি উমাইয়ার নিকট আসার কোনোই সম্ভাবনা ছিল না, সেহেতু তিনি বনি আব্দ মানাফের বাইরের লোক আবুবকরের নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। আর আব্দ মানাফের বংশধর শাখাগোত্রসমূহের মোট জনসংখ্যা ছিল এতই বেশি যে, তারা একত্রে মাঠে নামলে হযরত আবুবকর ও ওমরের বংশের লোকেরা তাদের সামনে মোটেই দাঁড়াতে পারত না। এ কারণেই আবু সুফিয়ান আব্দ মানাফের নামে শ্লোগান উচ্চারণ করেন। কিন্তু হযরত আলী বংশীয় ভিত্তিতে শক্তি সংহত করে তাঁর দ্বীনি হক আদায়ে প্রস্তুত ছিলেন না বলেই আবু সুফিয়ানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
বস্তুত আরবরা ইসলাম গ্রহণ করলেও তখনো তাদের মধ্য থেকে গোত্রপ্রীতি দূর হয়ে যায় নি। এ গোত্রপ্রীতি হযরত আবুবকর ও ওমরের গোত্রের মধ্যেও ছিল এবং হযরত আলীকে খেলাফত থেকে বঞ্চিত করার পিছনেও এ গোত্রপ্রীতি তথা অন্য গোত্রের প্রতি বিদ্বেষ কাজ করেছিল। এ কারণেই হযরত আবুবকরের পিতা আবু কাহাফাহ্ যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর পুত্র খলিফা হয়েছেন তখন তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। অথচ তিনিও রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বংশ হিসেবে এ নেতৃত্বকে বনি আব্দ মানাফের প্রাপ্য বলে মনে করতেন। এ কারণেই আবুবকরের খলিফা হওয়ার সংবাদ দেয়া হলে তিনি সাথে সাথে উদ্বেগের সাথে প্রশ্ন করেন “আব্দ মানাফের
বংশধররা তার নেতৃত্ব মেনে নিতে রাজি আছে তো?” যখন জবাব দেয়া হলো “হ্যাঁ,” তখন তিনি বললেন “আল্লাহ্ তা’আলা যখন কাউকে কোনো কিছু প্রদান করেন তখন কিছুই তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। (আনছাবুল আশরাফ, ১ম খণ্ড/ ৫৮৯/; শারহে নাহজুল বালাঘাহ্, ১ম খণ্ড/৫২)
কেবল হযরত আলীই ছিলেন এ ধরনের গোত্রপ্রীতির ঊর্ধ্বে। কিন্তু হযরত আলীর এ সঠিক অবস্থানকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাজে লাগানোর জন্যে মিথ্যা রেওয়ায়েত রচনা করা হয়েছে যে, আবু সুফিয়ানের প্রস্তাবের জবাবে হযরত আলী বলেছিলেন “হে আবু সুফিয়ান! তুমি তোমার জীবনের সুদীর্ঘ কাল ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে দুশমনিতে কাটিয়েছ, কিন্তু দ্বীনের কোনোই ক্ষতিসাধন করতে পারনি। আমরা আবুবকরকে এ দায়িত্বের জন্যে যোগ্য মনে করি।” (!)
প্রথমত এ রেওয়ায়েতের সনদের’ ব্যাপারে আমাদের আপত্তি আছে। কারণ এর বর্ণনাকারী এ ঘটনার কয়েক দশক পরের লোক। অন্যদিকে এসব রেওয়ায়েতের অন্যতম বর্ণনাকারী আবু ‘আওয়ানাহ্ (মৃত্যু ১৫০ হিজরি) মিথ্যা হাদিস রচনার জন্যে পরিচিত ছিল। অপর এক বর্ণনাকারী মারাহ্ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, সে হযরত আবুবকর ও ওমরকে দেখেনি। (তাবারী, ৩য় খণ্ড/ ২০২, লিসানুল মীযান, ৪র্থ খণ্ড/ ৩৮৪ ও অন্যান্য সূত্র, তাহযীবুত তাহযীব, ১০ম খণ্ড/৮৯)
তাছাড়া রেওয়ায়েতের বক্তব্যও ত্রুটিপূর্ণ। কারণ, হযরত আলী একথা বলে থাকলে আবু সুফিয়ান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতেন, “তাহলে তুমি আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হচ্ছ না কেন?”
ইতঃপূর্বে আমরা দলিলসহ উল্লেখ করেছি, হযরত আলী বলেছিলেন যে, চল্লিশ জন নিষ্ঠাবান যোদ্ধা সাথে থাকলেও তিনি অভ্যুত্থান করতেন। অতএব, বলা বাহুল্য যে, হযরত আলী হযরত আবুবকরকে যোগ্য বলেননি; বরং আবু সুফিয়ান যে হযরত আলীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন হযরত আলী তা ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি মু’আবিয়াকে লেখা তাঁর পত্রে বলেন- “তোমার পিতা আমার অধিকারকে (হক) তোমার চেয়ে উত্তমভাবে স্বীকার করতেন। তোমার পিতা আমার অধিকারকে যতটুকু স্বীকার করতেন তুমি যদি ততটুকু স্বীকার করতে তাহলে বুঝা যেত যে, তুমি চৈন্তিক ও বিচারবুদ্ধিগত পরিপক্বতার অধিকারী। (সিফফিন, পৃ. ৪৯; আল্-‘ইকুদুল ফারীদ, ৩য় খণ্ড/ ১৩; শারহে নাহজুল বালাগাহ, ২য় খণ্ড/২২১)
একদিকে আবু সুফিয়ান হযরত আলীকে যুদ্ধে উস্কানি দিয়ে হতাশ হন, অন্যদিকে সমকালীন সরকার তাঁর ব্যাপারে আতঙ্কের মধ্যে ছিল। তাই ওমর আবুবকরের নিকট গিয়ে বলেন “এই লোকটা এসেছে; ওর নষ্টামি থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। এ কারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)ও সব সময়ই তার মন জয়
করে রাখার চেষ্টা করতেন। তাই ওর কাছে ছাদাক্বাহ্ ও বাইতুল মালের যে অংশ রয়েছে তা ওর কাছেই অর্পণ করুন।” হযরত আবুবকর তা-ই করলেন। ফলে আবু সুফিয়ান সন্তুষ্ট হলেন এবং হযরত আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হলেন। (আল-‘ইকুদুল ফারীদ, ৩য় খণ্ড/ ৬২)
তাবারীর রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায় যে, সিরিয়ায় প্রেরিত সেনাবাহিনীর সেনাপতিত্ব তাঁর পুত্র ইয়াযীদ বিন্ আবু সুফিয়ানকে দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত আবু সুফিয়ান আবুবকরের অনুকূলে বাই’আত হননি। (আল-‘ইকুদুল ফারীদ, ২য় খণ্ড/৪৪৯)
চলবে …..।


